📄 সপ্তম পরিচ্ছেদ
শুধু রামাযানে বিতর জামাআত-সহকারে পড়া উত্তম, এর ওপর মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য রয়েছে। তবে এটি সর্বোত্তম কিনা সে-ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকে বলেছেন, জামাআত-সহকারে পড়া সর্বোত্তম।
অন্যরা বলেছেন, সর্বোত্তম হলো নিজ বাড়িতে একা একা বিতর আদায় করা। এটিই পছন্দসই। কেননা সাহাবা জামাআত-সহকারে বিতর পড়ার ক্ষেত্রে সর্বসম্মত ছিলেন না। যেমনটি তারাবীহের ব্যাপারে তাঁরা সর্বসম্মত ছিলেন। আত-তাবয়ীন[1] ও ইমাম ইবনুল হুমাম-কৃত আল-হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ[2] ও আল-ইনায়ায়[3] এ-রকমই আছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তারাবীহের পরপরই জামাআত-সহকারে বিতর পড়ে নেবে। তবে যে-ব্যক্তি তাহাজ্জুদ আদায় করে সে পড়বে তাহাজ্জুদের পরে।
আর ইমাম সাহেব রামাযানের বিতরের তিন রাকাআতেই কিরাআত উচ্চৈঃস্বরে পড়বে। একাকিভাবে আদায়কারীর ইখতিয়ার আছে (উচ্চৈঃস্বরে কিংবা অনুচ্চ স্বরে সে পড়তে পারে)। কুনূতের দুআর ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, উচ্চৈঃস্বরে পড়বে। আর কেউ কেউ বলেছেন, অনুচ্চ স্বরে পড়বে। তবে (উচ্চৈঃস্বরে পড়ার ক্ষেত্রে) এর আওয়াজ কিরাআত থেকে অনুচ্চ হতে হবে। কুনূতের দুআ পড়ার সময় উভয় হাত বাঁধবে, না ছেড়ে দেবে—এ-বিষয়ে আলিমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। আর মুক্তাদীদের ভূমিকা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কেউ কেউ বলেন, কুনূতের দুআ ‘মুলহিক্ব বিল কুফফার’ পর্যন্ত পড়বে। তখন মুক্তাদীগণ নিশ্চুপ থাকবে। আর কেউ বলেন, আমিন বলবে। কেউ কেউ বলেছেন, মুক্তাদীদের জন্য ইখতিয়ার রয়েছে, চাইলে সে কুনূত পড়বে কিংবা আমিন বলবে।
আত-তাবয়ীনে আছে, বিতরে কুনূতের পাঠক তার কুনূতে ইমামের অনুসরণ করে আস্তে আস্তে কুনূত পড়বে। কেননা কুনূত আসলে একটি দুআ। কেউ কেউ বলেন, উচ্চৈঃস্বরে পড়বে।[4] কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম মুহাম্মদের মতে কুনূত পড়বেন ইমাম সাহেব, মুক্তাদীগণ পড়বে না। যেমন- তারা কিরআত পড়ে না। প্রথম মতটি সঠিক।
মাসআলা: যদি কারো এক বা দু'তারবিয়াহ (চার রাকাআতের তারাবীহ) ছুটে যায়, অথচ ইমাম বিতর আরম্ভ করেছেন—আলিমদের মাঝে মতভিন্নতা আছে। কেউ কেউ বলেছেন, সে ইমামের সাথে বিতর আদায় করে, তারপর ছুটে যাওয়া তারাবীহ পড়বে। আর কেউ কেউ বলেছেন যে, আগে কাযা পড়বে।[5]
মাসআলা: মুক্তাদী কুনূত পড়া শেষ করার আগেই যদি ইমাম রুকুতে চলে যান, তবে মুক্তাদীও ইমাম সাহেবের অনুসরণ করবে। কেননা কুনূতের ওপর সালাত নির্ভর করে না এবং ঠেকে থাকে না।[6]
মাসআলা: বিতরের সালাতে মাসবুক (রাকাআত বিশেষ হারানো লোক) যদি ইমামের সাথে কুনূত পড়ে নেয়, ছুটে যাওয়া সালাত আদায়ের সময় পুনরায় কুনূত পড়বে না।[7]
মাসআলা: যদি মুসল্লীরা অভিযোগ করে যে, তারা সালাত নয় বা দশ সালাম পড়েছে তবে সে সময়ের করণীয় সম্পর্কে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন, সতর্কতার জন্য জামাআত-সহকারে এক সালামের সালাত পুনরায় আদায় করবে। আর কেউ কেউ বলেছেন, অতিরিক্ত পড়বে না। কারণ শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারাবীহে অতিরিক্ত পড়া না-জায়িয। সঠিক মত হলো, একাকিভাবে এক সালামের সালাত আদায় করে নেবে তারা। এতে করে সুন্নাতের আমল পরিপূর্ণ হবে এবং তারাবীহ ছাড়া জামাআত-সহকারে নফল আদায়ের আশঙ্কা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।[8]
মাসআলা: যদি দু'জন ইমাম এক তারবিয়াহ (চার রাকাআত); প্রত্যেকে এক সালাম করে পড়ান তবে সে-সম্পর্কে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। সঠিক মতে এটি মুস্তাহাবের বরখেলাপ। তবে পুরো এক তারবিয়াহ (চার রাকাআত) এক ইমাম পড়াতে পারবেন। হারামাইনের অধিবাসী ও অন্যান্যরা এর ওপরই আমল করেন। এতে ইমাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্রাম হয়ে যায়।[9]
টিকাঃ
[1] ফখরউদ্দিন আয-যায়লায়ী, তাবরীনুল হাকায়িক, খ. ১, পৃ. ১৮০
[2] ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ১৮০
[3] আল-বাবাতী, ফাতহ-ইনায়া, খ. ১, পৃ. ৪৭০
[4] ফখরউদ্দিন আয-যায়লায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ১. পৃ. ১৭১
[5] আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাতুন নাইয়্যারা, খ. ১, পৃ. ৯৯
[6] কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ৯৭
[7] ইবনুল হমাম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৫২০
[8] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৯
[9] আল-কাসানী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৮৯
📄 অষ্টম পরিচ্ছেদ : তারাবীর ওয়াক্ত
এ-বিষয়ে আলিমদের মাঝে মতবিভিন্নতা রয়েছে। আমাদের হানাফী আলিমরা বিশেষত শায়খ ইসমাইল আয-যাহিদ বলেছেন, পুরো রাত—ফজর উদয় পর্যন্ত, ইশার পূর্ব-পর এবং বিতর পড়ার পূর্ব-পর তারাবীহের সময়। কেননা তারাবীহ হলো রাত জেগে ইবাদত করার নাম। আর এর জন্য শর্ত হলো রাত। ব্যস।
বুখারার সর্বজন আলিমগণ বলেছেন, তারাবীহের ওয়াক্ত ইশা ও বিতরের মাঝখানে। অতএব কেউ যদি ইশার আগে বা বিতরের পরে তারাবীহ পড়ে তাহলে তা সময় মতো পড়া হয়নি। কেননা হাদীসে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। তাই তারাবীহে হাদীসেরই অনুসরণ করতে হবে।
সঠিক মতে তারাবীহের ওয়াক্ত হলো ইশার পর থেকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত। তাই কেউ যদি বিতরের পর তারাবীহ পড়ে তবুও জায়িয হবে। তবে যদি ইশার পূর্বে তারাবীহ পড়ে তাহলে জায়িয হবে না। কেননা তারাবীহ হচ্ছে নফল ইশার পরের সুন্নত। অতএব রামাযান ছাড়া অন্য সময়ের ইশার পরের মাসনুন নফলের সাথে এর সাদৃশ্য হয়ে গেলো।[1]
সালাত বিতরের পরে পড়াও জায়িয আছে। মোট কথা হলো বিতর রাতের শেষ সালাত হওয়া সর্বোত্তম। যেমন- ইতঃপূর্বে প্রয়োজনীয় স্থানে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মুস্তাহাব হলো রাতের এক তৃতীয় প্রহর বা দ্বিপ্রহর পর্যন্ত দেরিতে তারাবীহ পড়া।
কেউ কেউ বলেছেন, রাতের দ্বিপ্রহর পর তারাবীহ পড়লে ইশার সালাত দেরিতে পড়ার ন্যায় মাকরূহ হবে। সঠিক মতে তারাবীহ দেরিতে আদায়ে মাকরূহ হবে না। কেননা তারাবীহ রাতের সালাত আর তা শেষ সময়ে পড়াই উত্তম। ফাতাওয়া কাযিখানে আছে, রাতের দ্বিপ্রহর পর্যন্ত দেরি করে তারাবীহ পড়া মুস্তাহাব। আরও অনেকে অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং এটিই সঠিক।[2]
আল-খুলাসা গ্রন্থে আছে, উত্তম হলো পুরো রাত সালাত আদায়, অপেক্ষা ও বিশ্রাম গ্রহণের মাধ্যমে কাটানো, যদিও রাতের শেষ ভাগ পর্যন্ত দেরি করতে হয়। এমনটি সঠিক এবং জায়িয, আদৌ মাকরুহ নয়।[3]
মাসআলা: যদি তারাবীহ ছুটে যায় তবে কি তা তারাবীহের অন্য সময়ে জামাআত-সহকারে পড়বে, না জামাআত ছাড়া পড়বে? উত্তর হলো, জামাআত-সহকারে কাযা করবে না। অবশ্য জামাআত ছাড়া কাযার ক্ষেত্রে আলিমদের মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন, রামাযান শেষ না-হওয়ার আগেই কাযা করবে। আর অনেকে বলেছেন, কোনো কাযা করবে না। এটিই সঠিক। যেহেতু তারাবীহ মাগরিব ও ইশার সুন্নাতের চেয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর এ-ধরনের সালাত একাকিভাবে আমাদের মতে কাযা করা যায় না। অতএব তারাবীহ এ-রকমই। এর প্রমাণ হলো, সর্বসম্মতভাবে জামাআত-সহকারে তারাবীহের কাযা নেই।[4] যদি তারাবীহের কাযা হতো তবে যেভাবে ছুটে যায় সেভাবে কাযা করতে হতো। অতএব যদি তারাবীহ একাকিভাবে কাযা করা হয় তবে মুস্তাহাব হবে। যেমন- মাগরিবের সুন্নাত যদি কাযা করা হয়।[5] শায়খ কাসিম আল-হানাফী অনুরূপ বলেছেন, তিনি সুনান আল-হুদায় আস-সিরাজিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন, যদি একাকিভাবে কাযা করে তবে উত্তম কাজ হবে।
তারাবীহের মাসায়িল সমাপ্ত হলো।
টিকাঃ
[1] কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ২৩৫
[2] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৫-২৩৬
[3] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৬
[4] আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাতুন নাইয়্যারা, খ. ১, পৃ. ৯৯
[5] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৬