📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ : তারাবীহে কিরাআতের পরিমান

📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ : তারাবীহে কিরাআতের পরিমান


এ-ব্যাপারে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মাগরিবে যে-পরিমান কিরাআত পড়া হয় তারাবীহেও সে-পরিমান কিরাআত পড়বে। কেননা তারাবীহ ফরয সহজ সালাত থেকেও বেশ সহজ। এই মতটা যথার্থ নয়। কেননা এতো অল্পপরিমান কিরাআতে রামাযানে কুরআনের খতম হবে না।

আর কেউ কেউ বলেন, ইশায় যে-পরিমান কিরাআত পড়া হয় তারাবীহেও সে-পরিমান কিরাআত পড়বে।[1] কেননা সময়ের দিক দিয়ে তারাবীহ ইশার অনুসারী। বর্ণিত আছে,
(عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ ، أَنَّهُ يَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ عَشْرَ آيَاتٍ .. وَنَحْوَهَا.
"ইমাম হাসান প্রস্ত্র থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি প্রত্যেক রাকাআতে আনুমানিক দশ আয়াত পড়তেন।"[2]
এ-পরিমান কিরাআত পড়লে কুরআন একবার খতম হয়। কেননা তারাবীহের রাকাআত-সংখ্যা হলো ছয়শ। আর কুরআনের আয়াত রয়েছে ছয় হাজার। সে-অনুযায়ী প্রতি রাকাআতে প্রায় দশ আয়াত পড়ে।

কেউ কেউ বলেছেন, বিশ থেকে ত্রিশটি আয়াত পড়বে। যেহেতু বর্ণিত হয়েছে যে,
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ، أَنَّهُ دَعَا ثَلَاثَةٌ مِّنْ الْأَئِمَّةِ، فَأَمَرَ أَحَدَهُمْ أَنْ يَقْرَأَ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ ثَلَاثِينَ آيَةً، وَأَمَرَ الثَّانِ أَنْ يَقْرَأَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ آيَةً، وَأَمَرَ الثَّالِثَ أَنْ يَقْرَأَ عِشْرِينَ آيَةٌ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ.
"হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) থেকে বর্ণিত, তিনি তিনজন ইমামকে ডেকে পাঠান। অতঃপর তাদের একজনকে প্রত্যেক রাকাআতে ত্রিশটি করে আয়াত পড়ার নির্দেশ দেন, দ্বিতীয়জনকে নির্দেশ দেন পঁচিশটি করে আয়াত পড়তে এবং তৃতীয়জনকে প্রত্যেক রাকাআতে বিশটি করে আয়াত পড়তে নির্দেশ দেন।"[3]

এখানে হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর নির্দেশ হলো ফযীলতের আর ইমাম আবু হানিফা -এর বক্তব্য হলো সুন্নাতের। এর কারণ হলো, আলিমদের ঐক্যমতে, কুরআন খতম একবার সুন্নাত, দুইবার খতম করা ফযীলতপূর্ণ এবং তিনবার খতম করা অনেক উত্তম। ইমাম আবু হানিফা -এর বক্তব্য-অনুযায়ী কুরআন খতম হবে একবার। আর হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) -এর নির্দেশ-অনুযায়ী খতম হবে দুই বা তিনবার।[4]

ফকীহরা এ-রকমই বলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে আবার লায়লাতুল কদরের ফযীলত লাভের আশায় সাতাইশে রামাযানে খতম-অনুষ্ঠান পছন্দ করেন। কেননা হাদীস থেকে বেশ স্পষ্ট যে, সাতাইশে রামাযানই লায়লাতুল কদর। এজন্য বুখারার আলিমরা কুরআনে পাঁচশত চল্লিশটি রুকু নির্ণয় করেছেন এবং সে-অনুসারে মাসহাফে চিহ্ন বসিয়েছেন, যাতে সাতাইশতম রাতে খতম অনুষ্ঠিত হয়।

আমাদের পূর্ববর্তী আলিমদের অনেকে যারা বলেছেন, উত্তম হলো প্রত্যেক রাকাআতে ত্রিশটি করে আয়াত পড়া। এতে প্রতি দশদিনে এক খতম অনুষ্ঠিত হবে। কেননা মাসের প্রতি দশদিন পৃথক ও সতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। হাদীসে এসেছে,
إِنَّهُ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ، وَآخِرُهُ عِلْقٌ مِنْ النَّارِ».
'নিশ্চয়ই এটি এমন একটি মাস যার প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফিরাত, তৃতীয় দশদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি।'[5]

বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ، أَنَّهُ كَانَ يَخْتِمُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ إِحْدَى وَسِتِّينَ خَتْمَةٌ؛ ثَلَاثِينَ فِي اللَّيَالِي، وَثَلَاثِينَ فِي الْأَيَّامِ، وَوَاحِدَةٌ فِي التَّرَاوِيحِ.
'ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণিত, তিনি রামাযান মাসে একষট্টিটি খতম করতেন; প্রতিদিন একটি খতম, প্রতিরাত একটি খতম এবং পুরো তারাবীহে একটি খতম করতেন।'[6] আল-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়ায় ইমাম আশ-শাফিয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আজমাইন থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।[7]

আলিমগণ আরও বলেছেন, সকল সালামে (প্রতি দু'রাকাআতে) কিরাআতের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উত্তম। এ-রকমই ইমাম আল- হাসান ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) থেকে এসেছে, এর পরিপন্থিতে তবে কোনো অসুবিধা নেই। আর এক সালামে (একটি দু'রাকাআতের সালাতের মধ্যে) দ্বিতীয় রাকাআতে কিরাআত দীর্ঘ করা অন্যান্য সালাতের মতো সর্বসম্মতভাবে মুস্তাহাবের পরিপন্থী।[8] অবশ্য প্রথম রাকাআতে দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় কিরাআত দীর্ঘ করা হয় তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।

অবশ্য উত্তম কোনটি: এ-ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ-এর নিকট উভয় রাকাআতে সমানভাবে কিরাআত পছন্দসই। আর ইমাম মুহাম্মদ এর নিকট পছন্দসই মত হলো ফরয সালাতের মতো দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় প্রথম রাকাআতে কিরাআত দীর্ঘ পড়বে।[9]

মাসআলা: যদি তারাবীহে কোনো ভুল করে বসে; যার কারণে কোনো সুরা যা আয়াত ছুটে যায় এবং এর পরবর্তী (কোনো সুরা বা আয়াত) পড়ে ফেলে, তাহলে মুস্তাহাব হলো ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রথমে ছুটে যাওয়া সুরা বা আয়াত পড়বে, তারপর পূর্বে পঠিত আয়াত বা সুরাগুলো পড়বে।

মাসআলাঃ যদি তারাবীহের কোনো জোড় ভেঙে যায় এবং এতে কিছু পড়া হয় তবে কি যা পড়া হয়েছে তা পুনরায় পড়তে হবে? কেউ কেউ বলেছেন, পুনরায় পড়তে হবে না। কেননা কিরাআতই উদ্দেশ্য আর কিরাআতের তো কোনো বিশৃঙ্খলা সঙ্ঘটিত হয়নি। আর কেউ কেউ বলেছেন, পুনরায় পড়তে হবে। যাতে এই নামাযে একটি সুষ্ঠু খতমে কুরআন অনুষ্ঠিত হয়।[10] শুধরে দেওয়ার বিধান অন্যান্য সালাতে যেমন জেনেছি অনুরূপভাবে কিছুটা মতবিরোধপূর্ণ। তবে ফাতাওয়া হলো শুধরে দিলে সালাত নষ্ট হবে না। কেউ কেউ বলেছেন, তারাবীহে প্রয়োজনীয় স্থানে শুধরে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই।[11]

ফকীহবর্গ বলেন, তারাবীহে ইমাম হিসেবে সুকণ্ঠীদের অগ্রাধিকার দেওয়া জনগণের জন্য উচিৎ নয়। বরং বিশুদ্ধ তিলাওয়াকারীকে ইমাম হিসেবে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ যখন ইমাম সুমিষ্ট কণ্ঠে কিরাআত পড়েন তখন মানুষ একাগ্রতা, একনিষ্ঠত, আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্যে চিন্তা-ফিকর ইত্যাদি থেকে উদাসীন থাকে। যদি ইমাম কোনো লাহান করেন (কিরাআতে ভুল পড়েন) তবে তার মসজিদ ছেড়ে দেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। সুনান আল-হুদা গ্রন্থে এ-রকমই বলা হয়েছে। যদি কোনো ফকীহ ব্যক্তি কারীও হন তবে তাঁর জন্য উত্তম হলো নিজের কিরাআতেই সালাত আদায় করা এবং কারো পিছনে ইকতিদা না করা।[12]

ইমাম সাহেব রুকু-সাজদায় তিনবারের কম তাসবীহ পড়বেন না। শুরুতে সানা পরিত্যাগ করবে না এবং নবী করীম -এর ওপর দারুদ পড়াও ত্যাগ করবে না। যেহেতু এসব সুন্নাত। অবশ্য ফিকহের কিছু কিতাবে তার বিপরীতও বলা হয়েছে। তবে সঠিক কথা হলো প্রথমটি।[13] এখন থাকলো দুআর কথা। মানুষের অবস্থা থেকে বোঝা যায় যে, কষ্টকর না হলে পড়া যায়, অন্যথায় নয়।

যখন শেষ জোড়ে (দু'রাকাআতে) পড়া হয়: প্রথম রাকাআতে সুরা আল-ফালাক ও আন-নাস পড়ে ফেলে কারো মতে দ্বিতীয় রাকাআতে ফাতিহা আল-কিতাব এবং আল-বাকারা থেকে কিছু পড়ে নেবে-এটা মুসাফিরের এক মনযিলে পৌছার পর দ্বিতীয় মনযিলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়ে গেলো। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ছন্দ ও ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে দ্বিতীয় রাকাআতে পুনরায় সুরা আন-নাস পড়বে। আল-বাকারা থেকে কিছু পড়বে না।

এটি মসনুন এবং হারামাইন শরীফাইন ও আরব-বিশ্বে সর্বস্বীকৃত। খতমের শেষ পর্যায়ে সুরা আয-যুহা থেকে কুরআনের শেষ পর্যন্তের তাকবীর পড়বে। এ-ক্ষেত্রে পছন্দসই হলো لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ। যদি শুধু اَللهُ اَكْبَرُ পড়া হয় তবুও শুদ্ধ হবে।

যদি ইমাম সাহেব হাফিযে কুরআন না হন, তবে কারো মতে তারাবীহের প্রতি রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়া উত্তম। কেউ কেউ বলেন, ছোট ছোট সুরা পড়া ভালো। এটি অত্যন্ত ভালো নিয়ম। এতে করে রাকাআতের সংখ্যা গণনায় সন্দেহের সৃষ্টি হবে না এবং মনে রাখতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। এতে কুরআনের ভাব ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে মনোযোগ সৃষ্টি।

বর্তমানে মক্কা-মদীনা ও আরব-বিশ্বের প্রচলন অনুযায়ী প্রথম জোড়ের (প্রথম দু'রাকাআতের) প্রথম রাকাআতে সুরা আল-ফিল ও দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়বে। দ্বিতীয় জোড়ের (দ্বিতীয় দু'রাকাআতের) প্রথমে রাকাআতে সুরা আল-কুরাইশ ও দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়বে। এভাবে অষ্টম জোড় (অষ্টম দু'রাকাত) পর্যন্ত, উভয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস। আর নবম জোড়ে (নবম দু'রাকাআতে) সুরা আল-ইখলাস ও সুরা আল-ফালাক এবং দশম জোড়ে (দশম দু'রাকাআতে) সুরা আল-ইখলাস ও সুরা আন-নাস।

টিকাঃ
১. ইবনে মাযা, আল-মুহীতুল বুরহানী, খ. ১, পৃ. ৪৫৯
২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ. ২, পৃ. ১৪৬
৩. আস-সারাখসী, প্রাগুক্ত
৪. ইবনে মাযা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৯
৫. ইবনে খুযায়না, আস-সহীহ, খ. ৩, পৃ. ১৯১, হাদীসঃ ১৮৮৭
৬. আগ-পিলবী, আল-হাশিয়া আলা তাবরীনিল হাকায়িক, খ. ১, পৃ. ১৭৯; (খ) কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ২৩৮
৭. আল-কাস্তাম্লানী, আস-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া, খ. ৩, পৃ. ৩০৮
৮. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২০১৭
৯. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৮
১০. কাযী খান, প্রাগুক্ত
১১. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৮-২৮৯
১২. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১১৪
১৩. ইবনে মাযা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৭

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ : জামাআত-সহকারে তারাবীহ আদায়

📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ : জামাআত-সহকারে তারাবীহ আদায়


যে-ব্যক্তি তারাবীহের জামাআত ত্যাগ করে এবং ঘরে পড়ে নেয় তবে সে-সম্পর্কে আলিমদের মাঝে মতভেদ আছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, সে একজন সুন্নাত ত্যাগী এবং সে একটি মন্দ কাজের সূচনা করল। যেহেতু বর্ণিত আছে যে, عَنْ النَّبِيِّ ﷺ، أَنَّهُ قَدْرُ مَا صَلَّى التَّرَاوِيْحَ صَلَّى بِالْجَمَاعَةِ. 'নবী করীম ﷺ থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় তিনি যতো তারাবীহ পড়েছেন জামাআত-সহকারেই পড়েছেন।'[1] আর সাহাবা রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলায়হিম আজমাইন থেকেও অনুরূপই বর্ণিত আছে। যে-বিষয়ে বরেণ্য সকল ফকীহ ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, সে একজন ফযীলত ত্যাগী। এতে কোনো অসুবিধা নেই।[2] কেননা অনেক পূর্বসূরি থেকে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু নবী করীম ﷺ লোকজনের সাথে তারাবীহ আদায় মুলতবি করার পর তাদের এড়িয়ে চলতেন। তখন লোকজন নিজ নিজ ঘরে যেভাবে ইচ্ছা তারাবীহ আদায় করে নিতেন। বস্তুত হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শাসনামল ও হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর প্রাক-খিলাফত আমলেও অনুরূপ প্রচলিত ছিলো। তারপর জামাআতবদ্ধভাবে আদায়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি খুবই উত্তম।[3]

শায়খ কাসিম আল-হানাফী বলেন, সঠিক মতে জামাআত-সহকারে আদায় করা সুন্নাতে কিফায়া। যদি মসজিদের প্রতিবেশী সকলেই জামাআত ত্যাগ করে তাতে তারা সুন্নাত পরিত্যাগ করেছে আর এজন্য তারা গোনাহগার হবে। যদি মসজিদে জামাআত-সহকারে তারাবীহ অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো লোক যদি পিছুটান দেয় এবং ঘরে গিয়ে পড়ে তাহলে সে ফযীলত ত্যাগ করেছে। এতে সে গোনাহগার হবে না।

যদি লোকজন ঘরেই জামাআত-সহকারে তারাবীহ আদায় করে তবে সে-ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। সঠিক মতে জামাআতের জন্য ফযীলত অবশ্যই আছে। তবে মসজিদে জামাআতের ফযীলত আলাদা। অতএব এই লোক দুইটি ফযীলতের মধ্য থেকে একটিই লাভ করেছে এবং অন্যটি ত্যাগ করেছে। ফরযের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

কেউ কেউ বলেছেন, অন্যান্য সুন্নাতের মতো তারাবীহও একা একা পড়বে। কেননা আমলের এ-নিয়ম একনিষ্ঠতার নিকটবর্তী এবং লোকদেখানো থেকে দূরবর্তী। বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, أَفْضَلُ صَلَاةِ الْمَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلَّا الْمَكْتُوبَةَ. 'পুরুষদের জন্য ফরয ছাড়া অন্য সকল সালাত নিজ ঘরে পড়াই উত্তম।'[4] আমি বলবো, এ-বক্তব্যটি পছন্দসই নয়। কেননা হাদীসটি জামাআতের নিয়ম নেই সে-ধরনের সালাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তারাবীহে জামাআতের নিয়ম আছে। এ-ব্যাপারে আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি।

ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত, যে-ব্যক্তি মাসনুন কিরাআত-সহকারে ঘরে আদায়ে সক্ষম সে ঘরেই সালাত আদায় করে নেবে। অবশ্য কোনো মহান ফকীহ ব্যক্তি; মানুষ যার অনুসরণ করে, তাঁর উপস্থিতিতে লোকসমাগম বেশি হয় তবে তাঁর জন্য জামাআত ত্যাগ উচিত নয়।

মাসআলা: কোনো লোককে বেতন দিয়ে ইমাম নিয়োগ দেওয়া মাকরুহ। যেহেতু ইমামের বেতন ধার্য করা ফাসিদ।

মাসআলাঃ যদি মুসল্লীগণ দু'ইমামের পেছনে তারাবীহ পড়ে এবং প্রত্যেক ইমাম এক সালাম (দু'দু'রাকাআত) করে পড়ান তাহলে তা সঠিক মতে মুস্তাহাবের বরখেলাপ। মুস্তাহাব হলো প্রত্যেক ইমাম এক তারওয়িহা (চার রাকাআত) করে পড়াবেন। এমনও করা যায় যে, একজন ফরয পড়াবেন অন্যজন তারাবীহ।

মাসআলা : যদি একজন ইমাম দুই মসজিদে তারাবীহ পড়ান—প্রত্যেক মসজিদে পুরোপুরিভাবে, তবে সে-ব্যাপারে আলিমদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, দু'মসজিদবাসীর জন্য এটি জায়িয। যেমন- যদি মুয়াযযিন আযান দিলো, ইকামত বললো এবং সালাত পড়লেন, অতঃপর অন্য মসজিদে চলে যান, সেখানে আযান দিলো, ইকামত বললো এবং তাদের পড়লো—এতে মাকরূহ হবে না।

টিকাঃ
[1] ইবনে মাযা, আল-মুহীতুল বুরহানী, খ. ১, পৃ. ৪৫৭
[2] ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, খ. ১, পৃ. ৫৫২
[3] ইবনে মাযা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৮
[4] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৩৫, পৃ. ৪৯৩, হাদীস: ২১৬২৪; হযরত যায়দ ইবনে সাবিত থেকে বর্ণিত

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

📄 ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ


যদি কোনো কারণ ছাড়া তারাবীহ বসে পড়া হয় তবে তার বৈধতা ও মুস্তাহাব হওয়া—দু'বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।

বৈধতা বিষয়ক আলোচনা
এ-বিষয়ে আলিমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, না-জায়িয। আবার কেউ কেউ বলেছেন, জায়িয; এটিই বিশুদ্ধ মত। অবশ্য আলিমরা এ-ব্যাপারে সর্বসম্মত যে, ফজরের দু'রাকাআত সুন্নাত কোনো কারণ ছাড়া বসে পড়া জায়িয নয়। ইমাম আল-হাসান ইমাম আবু হানিফা থেকে এ-রকম বর্ণনা করেছেন।[1] অতঃপর যারা না-জায়িয বলতে চান তারা বলেন, তারাবীহ ফজরের দু'রাকাআত সুন্নাতের সাথে সাদৃশ্য রাখে। আর যারা জায়িয বলতে চান, তারা বলেন, তারাবীহ হলো নফল। এতে ফজরের সুন্নাতের অনুরূপ অতিরিক্ত তাগিদে বিশেষত্ব করা যায় না। তাই এর বিধান অন্যান্য সুন্নাত ও নফলসমূহের অনুরূপ। দলিল হলো, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ থেকে হযরত আবু সুলায়মান বর্ণনা করেছেন, ওযর বা ওযরবিহীন অবস্থার কোনো প্রভেদ স্বীকার করেন না।

মুস্তাহাব হওয়া বিষয়ক আলোচনা
বিশুদ্ধ মতে বসে তারাবীহ পড়া কোনো অবস্থাতেই মুস্তাহাব নয়। কেননা তা পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকসূত্রে প্রচলিত আমলেরও পরিপন্থী। যদি ইমাম সাহেব কোনো কারণে বা কারণ ছাড়া বসে তারাবীহ পড়ান আর মুক্তাদীরা দাঁড়িয়ে পড়েন তার বৈধতা ও মুস্তাহাব হওয়া—দু'বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।

বৈধতা বিষয়ক আলোচনা
এ-বিষয়ে আলিমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে জায়েয আছে। ইমাম মুহাম্মদের মতে ফরযের দৃষ্টিকোণ থেকে জায়িয নয়। আর কেউ কেউ বলেছেন, তাঁদের সকলের মতেই জায়িয। এ-মতটিই বিশুদ্ধ। কেননা মুক্তাদীদেরও বসে পড়া তো জায়িয আছেই, তাই যদি তারা দাঁড়িয়ে পড়ে তবে সেটা তো আরও উত্তম।

মুস্তাহাব হওয়া বিষয়ক আলোচনা
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ-এর মতে কোনো ওযর না থাকলে মুক্তাদীদের দাঁড়িয়ে পড়া মুস্তাহাব। কেননা তাদের জন্য বসা ও দাঁড়ানো উভয়ই জায়িয। অতএব দাঁড়িয়ে পড়াটা উত্তম—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ইমাম মুহাম্মদ -এর মতে না-দাঁড়ানো মুস্তাহাব। তাঁর নিকট এই মতপার্থক্যের কারণ হলো, তিনি ফরযে (ইমাম বসে পড়ালে মুক্তাদীদের দাঁড়ানোকে) বৈধতা দেন না, তাই নফলে তিনি মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি মানেন না।[2]

মাসআলা: তারাবীহে মুক্তাদীদের বসে থাকা, যখন ইমাম সাহেবের রুকু করার সময় হয় তখন দাঁড়ানো মাকরূহ। কেননা এতে অলসতার প্রকাশ ঘটে এবং মুনাফিকদের সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلُوةِ قَامُوا كَسَالَى : 'যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় একান্ত অলসভাবে।'[3]

অনুরূপভাবে যদি অতিরিক্ত তন্দ্রা হয় তবে তন্দ্রাবস্থায় সালাত আদায় মাকরূহ। বরং সালাত স্থগিত রাখবে সম্পূর্ণরূপে জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত। তন্দ্রাবস্থায় সালাতে দুর্বলতা, অলসতা ভর করে এবং ধ্যান-ধারণার শক্তি লোপ পায়।

অনুরূপভাবে গরমের কারণে ছাদে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও। যেমন- আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ . 'বলুন হে নবী! জাহান্নামের আগুন অত্যন্ত গরম, যদি তারা তা বুঝতো।'[4]

টিকাঃ
[1] আল-কাসানী, বাদায়িউস সানায়ি, খ. ১, পৃ. ২৯০
[2] কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ২৪৩-২৪৪
[3] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা, ৪:১৪২
[4] আল-কুরআন, সুরা আত-তাওবা, ৯:৮১

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 সপ্তম পরিচ্ছেদ

📄 সপ্তম পরিচ্ছেদ


শুধু রামাযানে বিতর জামাআত-সহকারে পড়া উত্তম, এর ওপর মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য রয়েছে। তবে এটি সর্বোত্তম কিনা সে-ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকে বলেছেন, জামাআত-সহকারে পড়া সর্বোত্তম।

অন্যরা বলেছেন, সর্বোত্তম হলো নিজ বাড়িতে একা একা বিতর আদায় করা। এটিই পছন্দসই। কেননা সাহাবা জামাআত-সহকারে বিতর পড়ার ক্ষেত্রে সর্বসম্মত ছিলেন না। যেমনটি তারাবীহের ব্যাপারে তাঁরা সর্বসম্মত ছিলেন। আত-তাবয়ীন[1] ও ইমাম ইবনুল হুমাম-কৃত আল-হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ[2] ও আল-ইনায়ায়[3] এ-রকমই আছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তারাবীহের পরপরই জামাআত-সহকারে বিতর পড়ে নেবে। তবে যে-ব্যক্তি তাহাজ্জুদ আদায় করে সে পড়বে তাহাজ্জুদের পরে।

আর ইমাম সাহেব রামাযানের বিতরের তিন রাকাআতেই কিরাআত উচ্চৈঃস্বরে পড়বে। একাকিভাবে আদায়কারীর ইখতিয়ার আছে (উচ্চৈঃস্বরে কিংবা অনুচ্চ স্বরে সে পড়তে পারে)। কুনূতের দুআর ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, উচ্চৈঃস্বরে পড়বে। আর কেউ কেউ বলেছেন, অনুচ্চ স্বরে পড়বে। তবে (উচ্চৈঃস্বরে পড়ার ক্ষেত্রে) এর আওয়াজ কিরাআত থেকে অনুচ্চ হতে হবে। কুনূতের দুআ পড়ার সময় উভয় হাত বাঁধবে, না ছেড়ে দেবে—এ-বিষয়ে আলিমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। আর মুক্তাদীদের ভূমিকা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কেউ কেউ বলেন, কুনূতের দুআ ‘মুলহিক্ব বিল কুফফার’ পর্যন্ত পড়বে। তখন মুক্তাদীগণ নিশ্চুপ থাকবে। আর কেউ বলেন, আমিন বলবে। কেউ কেউ বলেছেন, মুক্তাদীদের জন্য ইখতিয়ার রয়েছে, চাইলে সে কুনূত পড়বে কিংবা আমিন বলবে।

আত-তাবয়ীনে আছে, বিতরে কুনূতের পাঠক তার কুনূতে ইমামের অনুসরণ করে আস্তে আস্তে কুনূত পড়বে। কেননা কুনূত আসলে একটি দুআ। কেউ কেউ বলেন, উচ্চৈঃস্বরে পড়বে।[4] কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম মুহাম্মদের মতে কুনূত পড়বেন ইমাম সাহেব, মুক্তাদীগণ পড়বে না। যেমন- তারা কিরআত পড়ে না। প্রথম মতটি সঠিক।

মাসআলা: যদি কারো এক বা দু'তারবিয়াহ (চার রাকাআতের তারাবীহ) ছুটে যায়, অথচ ইমাম বিতর আরম্ভ করেছেন—আলিমদের মাঝে মতভিন্নতা আছে। কেউ কেউ বলেছেন, সে ইমামের সাথে বিতর আদায় করে, তারপর ছুটে যাওয়া তারাবীহ পড়বে। আর কেউ কেউ বলেছেন যে, আগে কাযা পড়বে।[5]

মাসআলা: মুক্তাদী কুনূত পড়া শেষ করার আগেই যদি ইমাম রুকুতে চলে যান, তবে মুক্তাদীও ইমাম সাহেবের অনুসরণ করবে। কেননা কুনূতের ওপর সালাত নির্ভর করে না এবং ঠেকে থাকে না।[6]

মাসআলা: বিতরের সালাতে মাসবুক (রাকাআত বিশেষ হারানো লোক) যদি ইমামের সাথে কুনূত পড়ে নেয়, ছুটে যাওয়া সালাত আদায়ের সময় পুনরায় কুনূত পড়বে না।[7]

মাসআলা: যদি মুসল্লীরা অভিযোগ করে যে, তারা সালাত নয় বা দশ সালাম পড়েছে তবে সে সময়ের করণীয় সম্পর্কে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন, সতর্কতার জন্য জামাআত-সহকারে এক সালামের সালাত পুনরায় আদায় করবে। আর কেউ কেউ বলেছেন, অতিরিক্ত পড়বে না। কারণ শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারাবীহে অতিরিক্ত পড়া না-জায়িয। সঠিক মত হলো, একাকিভাবে এক সালামের সালাত আদায় করে নেবে তারা। এতে করে সুন্নাতের আমল পরিপূর্ণ হবে এবং তারাবীহ ছাড়া জামাআত-সহকারে নফল আদায়ের আশঙ্কা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।[8]

মাসআলা: যদি দু'জন ইমাম এক তারবিয়াহ (চার রাকাআত); প্রত্যেকে এক সালাম করে পড়ান তবে সে-সম্পর্কে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। সঠিক মতে এটি মুস্তাহাবের বরখেলাপ। তবে পুরো এক তারবিয়াহ (চার রাকাআত) এক ইমাম পড়াতে পারবেন। হারামাইনের অধিবাসী ও অন্যান্যরা এর ওপরই আমল করেন। এতে ইমাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্রাম হয়ে যায়।[9]

টিকাঃ
[1] ফখরউদ্দিন আয-যায়লায়ী, তাবরীনুল হাকায়িক, খ. ১, পৃ. ১৮০
[2] ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ. ১, পৃ. ১৮০
[3] আল-বাবাতী, ফাতহ-ইনায়া, খ. ১, পৃ. ৪৭০
[4] ফখরউদ্দিন আয-যায়লায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ১. পৃ. ১৭১
[5] আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাতুন নাইয়্যারা, খ. ১, পৃ. ৯৯
[6] কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ৯৭
[7] ইবনুল হমাম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৫২০
[8] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৯
[9] আল-কাসানী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৮৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px