📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: তারাবীহের রাকাআতসমূহ

📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: তারাবীহের রাকাআতসমূহ


আমাদের মতে তারাবীহ বিশ রাকাআত। যেহেতু ইমাম আল-বায়হাকী (আলাইহিস সালাম) বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেছেন,
إِنَّهُمْ كَانُوا يَقُوْمُوْنَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَفِي عَهْدِ عُثْمَانَ وَعَلَيَّ مِثْلَهُ.
'তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব -এর শাসনামলে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়তেন। হযরত ওসমান (ইবনে আফফান) ও হযরত আলী-এর শাসনামলেও অনুরূপ পড়া হতো।'[1]

বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ صَلَّى رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي رَمَضَانَ، ثُمَّ أَوْنَرَ بِثَلَاثِ .
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ রামায়ানে বিশ রাকআত সালাত আদায় করতেন। তারপর তিন রাকাআত বিতর সালাত পড়তেন।'[2] অবশ্য মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এ-হাদীসটি দুর্বল। হযরত আয়িশা -এর বর্ণনাটি বিশুদ্ধ।
أَنَّهُ صَلَّى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً.
'নবী করীম এগার রাকাআত সালাত আদায় করতেন।'[3] রাতজাগরণের ক্ষেত্রে নবী করীম -এর অনুরূপ অভ্যাসই ছিলো। বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয -এর শাসনামলে অনেক পূর্বসূরি হযরত রাসূলুল্লাহ -এর আমলের সাথে সামঞ্জস্য করে এগার রাকাআত সালাত পড়তেন।

আর সাহাবা, তাবেয়িবর্গ ও তাঁদের পরবর্তীদের থেকে যে-বিষয়টি সাব্যস্ত এবং প্রসিদ্ধ হয়ে আসছে তা হলো তারাবীহ হবে বিশ রাকাআত। অন্য একটি বর্ণনা মতে, তারাবীহ হলো তেইশ রাকাআতের। সে-হিসেবে বিতরও তারাবীহের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম মালিক (ইবনে আনাস) বলেছেন, ইমাম আশ-শাফিয়ী থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, তারাবীহ হলো ছত্রিশ রাকাআত অথবা বিতরসহ উনচল্লিশ রাকাআত। এই আমল বিশেষত মদীনাবাসীর। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, মক্কার অধিবাসীরা পবিত্র কাবা সাতবার প্রদক্ষিণ করতেন এবং তাওয়াফের দু'রাকাআত সালাত প্রত্যেক দু'তারাবীহের মাঝখানে আদায় করতেন। তবে যেহেতু মদীনাবাসীদের পক্ষে এ-ফযীলত লাভ করা দুরুহ ছিলো তাই তারা ওই দু'তারাবীহের মাঝখানে চার রাকাআত করে অতিরিক্ত পড়তে শুরু করেন। তারা এর নাম দেন সিত্তা আশারিয়া। তাদের এই অভ্যাস ওইভাবে এখনও প্রচলিত আছে।

ওই রকম হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) ও হযরত আলী থেকে বর্ণিত আছে, তবে তা প্রসিদ্ধ নয়।

যদি মদীনাবাসী ছাড়া অন্যরাও অতিরিক্ত সালাত পড়ে তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। আর এ-ক্ষেত্রে ইমাম ও অন্যরা সকলেই সমান। এসব সালাত ব্যক্তিগতভাবে পড়া উচিত। কেননা তারাবীহ ছাড়া জামাআত-সহকারে নফল পড়া আমাদের মতে মাকরুহ। তবে মদীনাবাসী এসব সালাত জামাআত-সহকারে আদায় করেন। কারণ তাদের মতে জামাআতের সাথে নফল পড়া মাকরুহ নয়। মিসরের পরবর্তী যুগের আলেমদের মাঝে শায়খ কাসিম আল-হানাফি বলেছেন, জামাআতের সাথে নফল পড়া মাকরুহ। কেননা জামাআতের সাথে নফল পড়া যদি মুস্তাহাবও হতো, তবে তা ফরযের মতো ফযীলতপূর্ণ হতো। আর যদি ফযীলতপূর্ণই হতো তবে তাহাজ্জুদ আদায়কারী ও রাত জেগে ইবাদত পালনকারীরা সকলে সমবেত হয়ে ফযীলত লাভের জন্যে জামাআতের সাথে আদায় করতেন। কিন্তু যেহেতু হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবা রিযওয়ান আল্লাহ আজমাইন থেকে বিষয়টি প্রমাণিত নয়-তাই বোঝা গেলো এতে কোনো ফযীলত নেই।

টিকাঃ
১. আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ১৮, পৃ. ২৪৬, হাদীসঃ ৬১৮; (খ) আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ. ২, পৃঃ ১৪৫
২. আল-আইনী, আল-বিনায়া শরহুল হিদায়া, খ. ২, পৃ. ৩৩৭
৩. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ২, পৃ. ৬৯৮, হাদীস: ৪২৮৮
৪. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ২, পৃ. ৬৯৯, হাদীস: ৪২৯০
৫. আবদ ইবনে হুমায়দ, আল-মুনতাখাব, পৃ. ২১৮, হাদীস: ৩৫৩
৬. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ২, পৃ. ৩০৩, হাদীস: ৪৪০
৭. মালিক ইবনে আনাস, আল-মাদুনা, খ. ১, পৃ. ২৮৭
৮. আল-ইমরানী, আল-বায়ান, খ. ২, পৃ. ২৭৮

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ


প্রত্যেক দু'তারাবীহের মাঝখানে এক তারাবীহ পরিমান বসা মুস্তাহাব। অনুরূপভাবে পঞ্চম তারাবীহ ও বিতরের মাঝখানেও। ইমাম আবু হানিফা থেকে এমনটি বর্ণিত আছে। التَّرَاوِيحُ শব্দটি الرَّاحَة (বিশ্রাম) থেকে নির্গত। তাই এই (বিশ্রাম গ্রহণই) তারাবীহ নামকরণের নেপথ্য কারণ। পূর্বসূরি ওলামা ও হারামাইনের অধিবাসী সকলেই এ-ব্যাপারে একমত।

মক্কা-অধিবাসীরা পবিত্র কাবার সাত সাতবার তাওয়াফ করতেন এবং মদীনাবাসীরা চার চার রাকাআত সালাত পড়তেন। অনুরূপভাবে মুসলিম-বিশ্বের অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের জন্য তাসবীহ, তাহলীল, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত কিংবা নীরব বসে থাকার ইখতিয়ার আছে। যদি দু'তারাবীহের পর বিশ্রামে না বসা হয়, তবে অনেকের মতে এতে কোনো অসুবিধা নেই। আর কেউ কেউ বলেছেন, এটা মুস্তাহাব নয়। কেননা এটা হারামাইন শরীফাইনের অধিবাসীদের -আল্লাহ তাঁদের সম্মানে-মর্যাদা বাড়িয়ে দিন- আমলের পরিপন্থি।[1]

অধম বান্দা-আল্লাহ তার জীবনকে শুধরে দিন এবং সূচনা ও শেষ পরিণাম শুভ করুন—বলেন, বর্তমানে হাফিযদের তারাবীহের মধ্যে দীর্ঘ কিরাআত পড়ার যে-প্রচলন রয়েছে তার কারণে মুসাল্লীদের দু'তারাবীহের মধ্যখানে বিশ্রাম নেওয়া কষ্টকর। হ্যাঁ! এভাবে (বিশ্রাম নিতে গেলে তো) সারারাত কেটে দেওয়া যাবে। এ-থেকে স্পষ্ট হলো যে, দীর্ঘ কিরাআত উত্তম নয়। কারণ এতে পূর্বসূরি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচলিত মুস্তাহাব আমল পরিত্যাগ করা হচ্ছে। বরং কিরাআতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। এতে বিশ্রাম করা সহজ হবে। তারাবীহে কিরাআতের আহকাম সম্পর্কিত আলোচনা সামনে আসছে। এক তারাবীহ পড়তে যে-সময় লাগে সে-পরিমাণ না হলেও মধ্যপন্থি কিরাআতে চার রাকাআতের স্বল্প সময়ের বিশ্রামও যথেষ্ট হবে ইনশা-আল্লাহ। আমরা আল্লাহর নিকট স্বীয় আমলের মঞ্জুরি কামনা করি।

টিকাঃ
১. কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ২৩৫

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ : তারাবীহের নিয়ত

📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ : তারাবীহের নিয়ত


যদি তারাবীহ, সময়ের সুন্নাত কিংবা রামাযানের কিয়ামুল লায়লের নিয়ত করা হয় তবে জায়িয আছে। আর যদি সাধারণ সালাত কিংবা নফলের নিয়ত করা হয় তবে সে-ব্যাপারে ওলামা-মাশায়িখের মাঝে সেই একই রকম মতপার্থক্য রয়েছে যা সুন্নাতে মুআক্কাদার আদায় সম্পর্কে রয়েছে।

কতিপয় পূর্ববর্তী আলিমরা বলেছেন যে, সঠিক মতে জায়িয নয়। কারণ তারাবীহ হলো সুন্নাত। আর সুন্নাত নফলের নিয়ত বা সাধারণ সালাতের নিয়তে আদায় হবে না। যেহেতু ফজরের দু'রাকাআত এবং এ-বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা থেকে ইমাম আল-হাসান এর এ-রকমই বর্ণনা করেছেন। কেননা তারাবীহও ফরয সালাতের মতোই একটি বিশেষ সালাত। তাই এতেও ফরয সালাতের বৈশিষ্ট্যের খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য সাধারণ সালাতের নিয়তে তারাবীহ আদায় হবে না।

অধিকাংশ পরবর্তী আলিমরা বলেন, তারাবীহসহ যাবতীয় সুন্নাত সালাত সাধারণ সালাতের নিয়তে আদায় হয়ে যাবে। কেননা তারাবীহ হলো নফল আর নফল সাধারণ সালাতের নিয়তে আদায় হয়। সাবধানতা হলো, তারাবীহের ক্ষেত্রে তারাবীহ, সময়ের সুন্নাত কিংবা রামাযানের কিয়ামুল লায়লের নিয়ত করবে। আর অন্যান্য সুন্নাতসমূহে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণে সুন্নাতের নিয়ত করবে কিংবা সাধারণ সালাতের নিয়ত করবে। যাতে অর্ন্তদ্বন্ধ থেকে বাঁচা যায়।

অতঃপর প্রশ্ন হলো: তারাবীহের প্রত্যেক জোড় রাকাআতে পৃথকভাবে নিয়ত করার প্রয়োজন আছে কি? বিশুদ্ধ মত হলো, এর কোনো প্রয়োজন নেই। যেহেতু পুরো তারাবীহই মূলত একটি সালাত।

টিকাঃ
১. ইবনে মাযা, আল-মুহীতুল বুরহানী, খ. ১. পৃ. ৪৫৯

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ : তারাবীহে কিরাআতের পরিমান

📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ : তারাবীহে কিরাআতের পরিমান


এ-ব্যাপারে আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মাগরিবে যে-পরিমান কিরাআত পড়া হয় তারাবীহেও সে-পরিমান কিরাআত পড়বে। কেননা তারাবীহ ফরয সহজ সালাত থেকেও বেশ সহজ। এই মতটা যথার্থ নয়। কেননা এতো অল্পপরিমান কিরাআতে রামাযানে কুরআনের খতম হবে না।

আর কেউ কেউ বলেন, ইশায় যে-পরিমান কিরাআত পড়া হয় তারাবীহেও সে-পরিমান কিরাআত পড়বে।[1] কেননা সময়ের দিক দিয়ে তারাবীহ ইশার অনুসারী। বর্ণিত আছে,
(عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ ، أَنَّهُ يَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ عَشْرَ آيَاتٍ .. وَنَحْوَهَا.
"ইমাম হাসান প্রস্ত্র থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি প্রত্যেক রাকাআতে আনুমানিক দশ আয়াত পড়তেন।"[2]
এ-পরিমান কিরাআত পড়লে কুরআন একবার খতম হয়। কেননা তারাবীহের রাকাআত-সংখ্যা হলো ছয়শ। আর কুরআনের আয়াত রয়েছে ছয় হাজার। সে-অনুযায়ী প্রতি রাকাআতে প্রায় দশ আয়াত পড়ে।

কেউ কেউ বলেছেন, বিশ থেকে ত্রিশটি আয়াত পড়বে। যেহেতু বর্ণিত হয়েছে যে,
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ، أَنَّهُ دَعَا ثَلَاثَةٌ مِّنْ الْأَئِمَّةِ، فَأَمَرَ أَحَدَهُمْ أَنْ يَقْرَأَ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ ثَلَاثِينَ آيَةً، وَأَمَرَ الثَّانِ أَنْ يَقْرَأَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ آيَةً، وَأَمَرَ الثَّالِثَ أَنْ يَقْرَأَ عِشْرِينَ آيَةٌ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ.
"হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) থেকে বর্ণিত, তিনি তিনজন ইমামকে ডেকে পাঠান। অতঃপর তাদের একজনকে প্রত্যেক রাকাআতে ত্রিশটি করে আয়াত পড়ার নির্দেশ দেন, দ্বিতীয়জনকে নির্দেশ দেন পঁচিশটি করে আয়াত পড়তে এবং তৃতীয়জনকে প্রত্যেক রাকাআতে বিশটি করে আয়াত পড়তে নির্দেশ দেন।"[3]

এখানে হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর নির্দেশ হলো ফযীলতের আর ইমাম আবু হানিফা -এর বক্তব্য হলো সুন্নাতের। এর কারণ হলো, আলিমদের ঐক্যমতে, কুরআন খতম একবার সুন্নাত, দুইবার খতম করা ফযীলতপূর্ণ এবং তিনবার খতম করা অনেক উত্তম। ইমাম আবু হানিফা -এর বক্তব্য-অনুযায়ী কুরআন খতম হবে একবার। আর হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) -এর নির্দেশ-অনুযায়ী খতম হবে দুই বা তিনবার।[4]

ফকীহরা এ-রকমই বলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে আবার লায়লাতুল কদরের ফযীলত লাভের আশায় সাতাইশে রামাযানে খতম-অনুষ্ঠান পছন্দ করেন। কেননা হাদীস থেকে বেশ স্পষ্ট যে, সাতাইশে রামাযানই লায়লাতুল কদর। এজন্য বুখারার আলিমরা কুরআনে পাঁচশত চল্লিশটি রুকু নির্ণয় করেছেন এবং সে-অনুসারে মাসহাফে চিহ্ন বসিয়েছেন, যাতে সাতাইশতম রাতে খতম অনুষ্ঠিত হয়।

আমাদের পূর্ববর্তী আলিমদের অনেকে যারা বলেছেন, উত্তম হলো প্রত্যেক রাকাআতে ত্রিশটি করে আয়াত পড়া। এতে প্রতি দশদিনে এক খতম অনুষ্ঠিত হবে। কেননা মাসের প্রতি দশদিন পৃথক ও সতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। হাদীসে এসেছে,
إِنَّهُ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ، وَآخِرُهُ عِلْقٌ مِنْ النَّارِ».
'নিশ্চয়ই এটি এমন একটি মাস যার প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফিরাত, তৃতীয় দশদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি।'[5]

বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ، أَنَّهُ كَانَ يَخْتِمُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ إِحْدَى وَسِتِّينَ خَتْمَةٌ؛ ثَلَاثِينَ فِي اللَّيَالِي، وَثَلَاثِينَ فِي الْأَيَّامِ، وَوَاحِدَةٌ فِي التَّرَاوِيحِ.
'ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণিত, তিনি রামাযান মাসে একষট্টিটি খতম করতেন; প্রতিদিন একটি খতম, প্রতিরাত একটি খতম এবং পুরো তারাবীহে একটি খতম করতেন।'[6] আল-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়ায় ইমাম আশ-শাফিয়ী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আজমাইন থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।[7]

আলিমগণ আরও বলেছেন, সকল সালামে (প্রতি দু'রাকাআতে) কিরাআতের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উত্তম। এ-রকমই ইমাম আল- হাসান ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) থেকে এসেছে, এর পরিপন্থিতে তবে কোনো অসুবিধা নেই। আর এক সালামে (একটি দু'রাকাআতের সালাতের মধ্যে) দ্বিতীয় রাকাআতে কিরাআত দীর্ঘ করা অন্যান্য সালাতের মতো সর্বসম্মতভাবে মুস্তাহাবের পরিপন্থী।[8] অবশ্য প্রথম রাকাআতে দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় কিরাআত দীর্ঘ করা হয় তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।

অবশ্য উত্তম কোনটি: এ-ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ-এর নিকট উভয় রাকাআতে সমানভাবে কিরাআত পছন্দসই। আর ইমাম মুহাম্মদ এর নিকট পছন্দসই মত হলো ফরয সালাতের মতো দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় প্রথম রাকাআতে কিরাআত দীর্ঘ পড়বে।[9]

মাসআলা: যদি তারাবীহে কোনো ভুল করে বসে; যার কারণে কোনো সুরা যা আয়াত ছুটে যায় এবং এর পরবর্তী (কোনো সুরা বা আয়াত) পড়ে ফেলে, তাহলে মুস্তাহাব হলো ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রথমে ছুটে যাওয়া সুরা বা আয়াত পড়বে, তারপর পূর্বে পঠিত আয়াত বা সুরাগুলো পড়বে।

মাসআলাঃ যদি তারাবীহের কোনো জোড় ভেঙে যায় এবং এতে কিছু পড়া হয় তবে কি যা পড়া হয়েছে তা পুনরায় পড়তে হবে? কেউ কেউ বলেছেন, পুনরায় পড়তে হবে না। কেননা কিরাআতই উদ্দেশ্য আর কিরাআতের তো কোনো বিশৃঙ্খলা সঙ্ঘটিত হয়নি। আর কেউ কেউ বলেছেন, পুনরায় পড়তে হবে। যাতে এই নামাযে একটি সুষ্ঠু খতমে কুরআন অনুষ্ঠিত হয়।[10] শুধরে দেওয়ার বিধান অন্যান্য সালাতে যেমন জেনেছি অনুরূপভাবে কিছুটা মতবিরোধপূর্ণ। তবে ফাতাওয়া হলো শুধরে দিলে সালাত নষ্ট হবে না। কেউ কেউ বলেছেন, তারাবীহে প্রয়োজনীয় স্থানে শুধরে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই।[11]

ফকীহবর্গ বলেন, তারাবীহে ইমাম হিসেবে সুকণ্ঠীদের অগ্রাধিকার দেওয়া জনগণের জন্য উচিৎ নয়। বরং বিশুদ্ধ তিলাওয়াকারীকে ইমাম হিসেবে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ যখন ইমাম সুমিষ্ট কণ্ঠে কিরাআত পড়েন তখন মানুষ একাগ্রতা, একনিষ্ঠত, আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্যে চিন্তা-ফিকর ইত্যাদি থেকে উদাসীন থাকে। যদি ইমাম কোনো লাহান করেন (কিরাআতে ভুল পড়েন) তবে তার মসজিদ ছেড়ে দেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। সুনান আল-হুদা গ্রন্থে এ-রকমই বলা হয়েছে। যদি কোনো ফকীহ ব্যক্তি কারীও হন তবে তাঁর জন্য উত্তম হলো নিজের কিরাআতেই সালাত আদায় করা এবং কারো পিছনে ইকতিদা না করা।[12]

ইমাম সাহেব রুকু-সাজদায় তিনবারের কম তাসবীহ পড়বেন না। শুরুতে সানা পরিত্যাগ করবে না এবং নবী করীম -এর ওপর দারুদ পড়াও ত্যাগ করবে না। যেহেতু এসব সুন্নাত। অবশ্য ফিকহের কিছু কিতাবে তার বিপরীতও বলা হয়েছে। তবে সঠিক কথা হলো প্রথমটি।[13] এখন থাকলো দুআর কথা। মানুষের অবস্থা থেকে বোঝা যায় যে, কষ্টকর না হলে পড়া যায়, অন্যথায় নয়।

যখন শেষ জোড়ে (দু'রাকাআতে) পড়া হয়: প্রথম রাকাআতে সুরা আল-ফালাক ও আন-নাস পড়ে ফেলে কারো মতে দ্বিতীয় রাকাআতে ফাতিহা আল-কিতাব এবং আল-বাকারা থেকে কিছু পড়ে নেবে-এটা মুসাফিরের এক মনযিলে পৌছার পর দ্বিতীয় মনযিলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়ে গেলো। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ছন্দ ও ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে দ্বিতীয় রাকাআতে পুনরায় সুরা আন-নাস পড়বে। আল-বাকারা থেকে কিছু পড়বে না।

এটি মসনুন এবং হারামাইন শরীফাইন ও আরব-বিশ্বে সর্বস্বীকৃত। খতমের শেষ পর্যায়ে সুরা আয-যুহা থেকে কুরআনের শেষ পর্যন্তের তাকবীর পড়বে। এ-ক্ষেত্রে পছন্দসই হলো لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ। যদি শুধু اَللهُ اَكْبَرُ পড়া হয় তবুও শুদ্ধ হবে।

যদি ইমাম সাহেব হাফিযে কুরআন না হন, তবে কারো মতে তারাবীহের প্রতি রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়া উত্তম। কেউ কেউ বলেন, ছোট ছোট সুরা পড়া ভালো। এটি অত্যন্ত ভালো নিয়ম। এতে করে রাকাআতের সংখ্যা গণনায় সন্দেহের সৃষ্টি হবে না এবং মনে রাখতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। এতে কুরআনের ভাব ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে মনোযোগ সৃষ্টি।

বর্তমানে মক্কা-মদীনা ও আরব-বিশ্বের প্রচলন অনুযায়ী প্রথম জোড়ের (প্রথম দু'রাকাআতের) প্রথম রাকাআতে সুরা আল-ফিল ও দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়বে। দ্বিতীয় জোড়ের (দ্বিতীয় দু'রাকাআতের) প্রথমে রাকাআতে সুরা আল-কুরাইশ ও দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস পড়বে। এভাবে অষ্টম জোড় (অষ্টম দু'রাকাত) পর্যন্ত, উভয় রাকাআতে সুরা আল-ইখলাস। আর নবম জোড়ে (নবম দু'রাকাআতে) সুরা আল-ইখলাস ও সুরা আল-ফালাক এবং দশম জোড়ে (দশম দু'রাকাআতে) সুরা আল-ইখলাস ও সুরা আন-নাস।

টিকাঃ
১. ইবনে মাযা, আল-মুহীতুল বুরহানী, খ. ১, পৃ. ৪৫৯
২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ. ২, পৃ. ১৪৬
৩. আস-সারাখসী, প্রাগুক্ত
৪. ইবনে মাযা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৯
৫. ইবনে খুযায়না, আস-সহীহ, খ. ৩, পৃ. ১৯১, হাদীসঃ ১৮৮৭
৬. আগ-পিলবী, আল-হাশিয়া আলা তাবরীনিল হাকায়িক, খ. ১, পৃ. ১৭৯; (খ) কাযী খান, আল-ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ২৩৮
৭. আল-কাস্তাম্লানী, আস-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া, খ. ৩, পৃ. ৩০৮
৮. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২০১৭
৯. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৮
১০. কাযী খান, প্রাগুক্ত
১১. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৩৮-২৮৯
১২. কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১১৪
১৩. ইবনে মাযা, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px