📄 তৃতীয় প্রবন্ধ: পনেরই শাবানের রাতে ইবাদত পালন, দিনে সিয়াম পালন ও এ-দিবসের সুসাব্যস্ত দ‘আ ও যিকরের আলোচনা
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُوْمُوا لَيْلَهَا، وَصُوْمُوا يَوْمَهَا».
'হযরত আলী ইবনে আবু তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, 'পনেরই শাবানের রাত আসলে তোমরা রাতের বেলা ইবাদত উদ্যাপন করো এবং দিনের বেলা সিয়াম পালন করো।'
وَعَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ لَيْلَتِي... হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পনেরই শাবানের রাত ছিলো আমার। মধ্যরাতের সময় আমি তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি ঘরে ফিরে আসি। কাপড়ের স্তুপের মতো অবস্থায় আমি তাঁকে খুঁজে পাই। তিনি সাজদায় গিয়ে বলছিলেন,
سَجَدَ لَكَ خَيَالِي وَسَوَادِي، وَآمَنَ بِكَ فُؤَادِي...
'আমার হৃদয়প্রাণ, তোমার সাজদায় অবনত। আমার হৃদয়মন তোমার ওপর বিশ্বাস করেছে। এই আমার হাত যা দিয়ে আমি আমার প্রবৃত্তির ওপর অপরাধ করেছি। হে মহান! আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রাণকেন্দ্র! হে মহান! মহাপাপ ক্ষমা করে দাও। আমার কপালও সেই সত্তাকে সাজদা করছি যিনি তার অবয়ব ও রূপ সৃষ্টি করেছেন এবং চোখ ও কান দান করেছেন।'
অতঃপর তিনি মাথা উঠান। তারপর পুনরায় সাজদায় গমন করেন এবং বলেন,
أَعُوْذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَأَعُوْذُ بِعَفْوِكَ مِنْ عِقَابِكَ...
'তোমার অসন্তুষ্টি থেকে তোমার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই, তোমার সাজা থেকে তোমার ক্ষমাপ্রাপ্তির আশ্রয় চাই এবং তোমার কাছ থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমার পক্ষে তোমার এমন প্রশংসা অসম্ভব যে-ধরনের প্রশংসা তুমি নিজেই নিজের করেছ।'
অতঃপর মাথা উঠান এবং বললেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي قَلْبًا تَقِيًّا مِّنَ الشِّرْকِ...
'হে আল্লাহ! আমাকে সেই পবিত্রাত্মা দান করো; শিরক-বিমুক্ত, পাপাচারী নয়, গোঁড়াও নয়।'
'আজ পনেরই শাবানের রাত। এতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করেন।'[1]
শায়খ আবুল হাসান আল-বাকারী বলেছেন, এ-রাতের দুআসমূহে উত্তম দুআ হলো: 'اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي' (হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি করুণাময়, দয়ালু। ক্ষমা তুমি ভালোবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দাও)।[2]
হযরত আবু বারযা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'যখন হযরত আদম-কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বায়তুল্লাহ সাতবার প্রদক্ষিণ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের বিপরীতে দু'রাকাআত সালাত আদায় করেন। অতঃপর বলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ سِرِّي وَعَلَانِي فَاقْبِلْ مَعْذَرَنِي...
'হে আল্লাহ! তুমি আমার বাইরে ও ভেতরের সব অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত। অতএব তুমি আমার আরযি কবুল করো। তুমি আমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত। অতএব তুমি আমার প্রার্থনা পূরণ করো। তুমি আমার প্রবৃত্তির খবর রাখো। অতএব আমার পাপসমূহ মার্জনা করো। আমি তোমার কাছে এমন ঈমান কামনা করি, যা আমার অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং সত্যিকারের আস্থা কামনা করি। যাতে আমার বুঝে আসে যে, তুমি আমার জন্য যা লিখে রেখেছো তা ছাড়া অন্যকিছু আমাকে গ্রাস করতে পারবে না। আর আমাকে তোমার সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট রেখো।'
অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহি পৌঁছান, 'হে আদম! নিশ্চয় তুমি যে দুআ-সহকারে আমাকে আহ্বান করেছ আমি তা তোমার জন্য কবুল করে নিয়েছি। তোমার পর তোমার বংশধরের মধ্যে কেউ এই দুআ করবে তার দুআও কবুল করবো।"[3]
এই রাতে জেগে থাকা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আছে। হযরত খালিদ ইবনে মাদান, হযরত মাকহুল ও ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাওয়ায়হ মসজিদে এ-রাত জেগে থাকতেন। ইমাম আল-আওযায়ী বলেছেন, যদি কোনো লোক ব্যক্তিগতভাবে এই রাত জেগে থাকে তাহলে তা মুস্তাহাব। ইমাম আশ-শাফিয়ী বলেন, 'নিশ্চয় পাঁচটি বিশিষ্ট রাতে দুআ কবুল হয়: জুমুআ ও দু'ইদের রাত এবং রজবের প্রথম রাত ও পনেরই শাবানের রাত।'[4]
নবী করীম ﷺ-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, পনেরই শাবান রাতে মুমিন নর-নারী ও শহীদগণের মাগফিরাতের জন্য কবরস্থানে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে বকিউল গরকদে দেখতে পাই; তিনি মুমিন নর-নারী এবং শহীদগণের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন।
এই রাতের সালাত-বিষয়ে হযরত আলী থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী করীম ﷺ-কে এ-রাতে চৌদ্দ রাকাআত সালাত আদায় করতে দেখেছেন। তবে ইমাম আল-বায়হাকী ও ইমাম ইবনুল জওযী বলেছেন, এ-হাদীসটি মাওযু (বানোয়াট)।[5]
নোংরা বিদআতসমূহ: ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় আলোকসজ্জা, আতশবাজি ও গোলা ছোড়াছুড়ির যে প্রচলন রয়েছে প্রামাণ্য কিতাবে এর কোনো ভিত্তি নেই। শায়খ তকীউদ্দীন বলেন, বিশেষ রাতগুলোতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা নিকৃষ্ট রকমের বিদআত। প্রথম আলোকসজ্জার প্রচলন হয় বারামিক থেকে, যারা পূর্বে অগ্নিপূজারি ছিলো। তারা হিদায়তি সুন্নাতের প্রলেপ দিয়ে এসব ইসলামে ঢুকিয়ে দেয়।
টিকাঃ
[1] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬৪, হাদীস: ৩৫৫৭
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫. পৃ. ৫৩৪, হাদীস: ৩৫১৩
[3] আল-বায়হাকী, আদ-দা'ওয়াতুল কবীর, খ. ১, পৃ. ৩৫২, হাদীস: ২৬২
[4] আন-নাওয়াওয়ী, রাওযাতুত তালিবীন, খ. ২, পৃ. ৭৫
[5] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬৬; ইবনুল জওযী, আল-মাওযু'আত, খ. ২, পৃ. ১২৭