📄 প্রথম প্রবন্ধ : শাবান মাস এবং পঞ্চদশ রাত নির্বিশেষে এ-মাসে সিয়াম পালনের ফযীলতের আলোচনা
বিশিষ্ট ছয় কিতাবের হাদীসসমূহ :
শَعْبَانُ بَيْنَ رَجَبٍ وَشُهِرٍ رَمَضَانَ، يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ، يَرْفَعُ فِيْهِ أَعْمَالَ الْعِبَادِ، فَأُحِبُّ أَنْ لَّا يُرْفَعَ عَمَلِي إِلَّا وَأَنَا صَائِمٌ».
'রজব ও রামাযান মাসের মধ্যবর্তী মাস হলো শাবান। এ-মাসের ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এ-মাসে বান্দাদের আমলসমূহ বিশ্বপ্রতিপালকের কাছে পেশ হয়। সেজন্য আমি পছন্দ করি, আমি সিয়াম পালনকারী—এ-অবস্থায় আমার আমল পেশ করা হোক।'
হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী শুআবুল ঈমান গ্রন্থে হযরত উসামা থেকে বর্ণনা করেছেন।[1]
شَعْبَانُ شَهْرِي، وَرَمْضَانُ شَهْرُ الله .
'শাবান আমার মাস আর রামাযান আল্লাহর মাস।'
হাদীসটি ইমাম আদ-দায়লামী ফিরদাউসুল আখবার গ্রন্থে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ أَنَسٍ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا دَخَلَ رَجَبٌ، قَالَ: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ.
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অভ্যাস ছিলো, যখন রজব আগমন করতো তখন তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! রজব ও শাবানে আমাদের জন্য বরকত অবতীর্ণ করুন এবং রামাযান পর্যন্ত আমাদের পৌছে দিন।'
হাদীসটি ইমাম ইবনে আসাকির ও ইমাম ইবনুন নাজ্জার বর্ণনা করেছেন।[2]
وَعَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَصُوْمُ حَتَّى تَقُولَ لَا يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لَا يَصُوْমُ، وَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ قَطُّ إِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ مِنْهُ صِيَامًا فِي شعبان.
'হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সিয়াম পালন করতেন, আমাদের মনে হতো, তিনি বুঝি আর কখনো ইফতার করবেন না। আর যখন সিয়াম পালন থেকে অবসর নিতেন তখন মনে হতো, তিনি হয়তো আর কখনো সিয়াম পালন করবেন না। আমি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রামাযান ছাড়া পুরো মাসব্যাপী সিয়াম পালন করতে কখনো দেখিনি। তবে শাবানের তুলনায় অন্য কোনো মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেও দেখিনি।'[3]
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত আবু সালমা বলেন, আমি হযরত আয়িশা-কে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সিয়াম পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেছেন, তিনি অল্প ক'দিন ছাড়া পূর্ণ শাবান সিয়াম পালন করতেন।[4]
ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, শাবানের তুলনায় অন্য কোনো মাসে নবী করীম ﷺ-কে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতে আমি দেখিনি। তিনি অল্প ক'দিন ছাড়া পুরো শাবান সিয়াম পালন করতেন, বরং তিনি পুরো শাবানই সিয়াম পালন করতেন।[5]
ইমাম আবু দাউদ-এর অপর বর্ণনায় এসেছে, হযরত আয়িশা বলেছেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট অন্যান্য মাসের তুলনায় শাবান মাসে সিয়াম পালন অধিক পছন্দনীয় ছিল। তিনি রামাযান পর্যন্ত সিয়াম পালন করতেন।[6]
ইমাম আন-নাসায়ী-এর বর্ণনায়ও এসেছে, তিনি বলেছেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সিয়াম পালন করতেন, আমাদের মনে হতো, তিনি বুঝি আর কখনো ইফতার করবেন না। আর যখন সিয়াম পালন থেকে অবসর নিতেন তখন মনে হতো, তিনি হয়তো আর কখনো সিয়াম পালন করবেন না। তিনি শাবানে বা পুরো শাবান সিয়াম পালন করতেন।[7]
ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, শাবানের তুলনায় অন্য কোনো মাসে নবী করীম ﷺ বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন না। তিনি পুরো শাবান সিয়াম পালন করতেন। তিনি বলতেন, 'তোমাদের সাধ্যমতো আমল করো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্লান্ত হন না বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়ো।'
عَنْ أُمَّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَصُومُ شَهْرَيْنِ مُتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَرَمَضَانَ.
'হযরত উম্ম সালমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ-কে শাবান-রামাযান ছাড়া লাগাতার দুইমাস সিয়াম পালন করতে দেখিনি।'
অন্যান্য কিতাবের হাদীসসমূহ: আল-জামিউল কবীর এবং শায়খ ইমাম আরিফ বিল্লাহ আবুল হাসান আল-বাকরী-বর্ণিত হাদীসসমূহ:
'শাবান আমার মাস আর রামাযান আল্লাহর মাস।' হাদীসটি ইমাম আদ-দায়লামী মুসনদুল ফিরদাউস গ্রন্থে করেছেন।
وَعَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ امْرَأَةً ذَكَرَتْ لَهَا أَنَّهَا تَصُومُ رَجَبَ، فَقَالَتْ: إِنْ كُنْتِ صَائِمَةً شَهْرًا لَا تَخَالَةَ، فَعَلَيْكَ بِشَعْبَانَ، فَإِنَّ فِيْهِ الْفَضْلِ.
'হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, জনৈক মহিলা তাঁকে বললো, সে রজবের সিয়াম পালন করছে, তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ তুমি যেকোনো মাসেই সিয়াম পালন করতে পারো-এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শাবানে অবশ্যই রেখো, কেননা এর অনেক ফযীলত রয়েছে।'
وَعَنْهَا، قَالَتْ: لَمَّا كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ صِيَامًا مِّنْهُ فِي شَعْبَانَ لِأَنَّهُ تُنْسَخُ فِيْهِ أَرْوَاحُ الْأَحْيَاءِ فِي الْأَمْوَاتِ، حَتَّى أَنَّ الرَّجُلَ بَيَتَزَوَّجُ وَقَدْ وَقعَ اسْمُهُ فِيمَنْ يَمُوْتُ...
'তাঁর কাছ থেকে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ শাবানের তুলনায় অন্যান্য মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন না। তার কারণ হচ্ছে, মৃত্যুপথযাত্রী জীবের রুহের তালিকা এ মাসেই প্রস্তুত করা হয় এমনকি কোনো কোনো লোক বিয়ে করছে অথচ তার নাম মৃতপথযাত্রীদের তালিকায় আর কোনো কোনো লোক হজ করবে অথচ তার নামও মৃতপথযাত্রীদের তালিকায়।'[8]
তাঁর কাছ থেকে আরও বর্ণিত, নবী করীম ﷺ পুরো শাবান সিয়াম পালন করতেন। আমি এ-ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, তিনি ইরশাদ করেন, 'আল্লাহ এ-বছরের সকল মৃত্যু লোকদের এ-মাসেই তালিকাভুক্ত করেন। এজন্যে আমি পছন্দ করি, আমার জীবনের পরিসমাপ্তি হোক আমার সিয়াম পালনরত অবস্থায়।'[9]
'আমার জীবনের পরিসমাপ্তি লেখা হোক'-এ-বক্তব্যের উদ্দেশ্যঃ এ-থেকে বোঝা গেলো নবী করীম-এর জীবনের পরিসমাপ্তি লেখা হয়েছে তাঁর ইবাদত-অবস্থায়। আর মৃত্যু নির্ধারিত ব্যক্তি চায় তার শেষবিদায়টা ইবাদত-সহকারে অতিবাহিত হোক। আর সে-সময়ের ইবাদত হিসেবে সিয়াম পালনই উত্তম।
হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, 'মৃত্যুপথযাত্রীদের নামের তালিকা পনের শাবান রাতে তৈরি করা হয়।'[10] রাত সিয়াম পালনের সময় নয়। কাজেই অর্থ হবে রাতে তালিকা প্রস্তুত করার সময় আল্লাহ সিয়ামের বরকত বহাল রাখেন।
টিকাঃ
[1] আল-বায়হাকী, শুআবুল ইমান, খ. ৫, পৃ. ৩৫২, হাদীস: ৩৫৪০
[2] (ক) ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশ্ক, খ. ৪০, পৃ. ৫৭, হাদীস: ৪৬৫৭; (খ) ইবনুন নাজ্জার, যারীখ তারিখি দামাস্কাস, খ. ১৬, পৃ. ৮৫, হাদীস: ৭০
[3] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৩. পৃ. ৩৮, হাদীস: ১৯৬৯; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২. পৃ. ৮০১, হাদীস: ১৭৫ (১১৫৬)
[4] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৮০১, হাদীস: ১৭৫ (১১৫৬)
[5] আত-তিরমিযী, আস-জামিউল কবীর, খ. ৩. পৃ. ১০৫, হাদীস: ৭৩৭
[6] আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ২. পৃ. ৩২৩, হাদীস: ২৪৩১
[7] আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা নিনাস সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৯৯, হাদীস: ২৩৫০
[8] ইবনে আসাকির, তারিখু সামিশক, খ. ৬১, পৃ. ২৫০, হাদীস: ৮৮৬৮
[9] আবু ইয়া'লা আল-মুসিলী, আল-মুসনদ, খ. ৮, পৃ. ৩১১, হাদীস: ৪৯১১
[10] আন-নায়সানী, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২৭৪, হাদীস: ৮১৬৫
📄 দ্বিতীয় প্রবন্ধ: পনেরই শাবানের রাতের বিশেষ ফযীলতের আলোচনা
عَنْ عِكْرِمَةَ، فِي قَوْلِ اللَّهِ سُبْحَانَهُ ﴿فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ﴾ [الدخان : ৪] قَالَ : فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، يُبْرَمُ فِيْهِ أَمْرُ السَّنَةِ، وَيُنْسَخُ الْأَحْيَاءُ وَيُكْتَبُ الْحَاجُ ، فَلَا يُزَادُ فِيهِمْ أَحَدٌ، وَلَا يُنْقَصُ مِنْهُمْ أَحَدٌ.
'হযরত ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ সুবহানাহুর বাণী 'এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা দেওয়া হয়।'—প্রসঙ্গে বলেন, পনেরই শাবানের রাতে বছরের যাবতীয় কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জীবিতদের তালিকা তৈরি করা হয় এবং হাজিদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। পরে এতে কোনো প্রকারের বাড়াবাড়ি হয় না এবং কোনো প্রকারের হেরফেরও করা হয় না।'
এটি ইমাম ইবনে জরীর আত-তাবারী, ইমাম ইবনুল মুনযির ও ইমাম ইবনে আবু হাতিম বর্ণনা করেছেন।[1]
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, এসব লায়লাতুল কদরে হয়ে থাকে। তবে তার সূচনা হয় পনেরই শাবান রাত থেকে。
وَعَنِ الْقَاسِمِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي بَكْرِ الصِّدِّيقِ، عَنْ أَبِيهِ، أَوْ عَنْ عَمِّهِ، عَنْ جَدِّهِ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: يَنْزِلُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا لَيْلَةً النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِكُلِّ شَيْءٍ إِلَّا رَجُلٍ مُّشْرِكٍ أَوْ فِي قَلْبِهِ شَحْنَاءُ.
'আল-কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর আস-সিদ্দীক আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা পনেরই শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি সকলকে ক্ষমা করেন কিন্তু মুশরিক এবং অন্তরে হিংসুক লোকদের তিনি ক্ষমা করেন না।' ইমাম আল-বায়হাকী এটি বর্ণনা করেছেন।[2]
وَعَنْ عَلِيَّ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُوْمُوا لَيْلَهَا، وَصُوْمُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيْهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا...
হযরত আলী থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, 'যখন পনেরই শাবানের রাত আসে, তাহলে সে-রাতে তোমরা ইবাদত উদ্যাপন করো এবং দিনে সিয়াম পালন করো। কেননা এ-রাত সূর্যাস্ত যাওয়ার পর আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন আর বলেন, 'কেউ কি আছে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দিতাম! কেউ কি আছে রিযকপ্রার্থী, আমি তাকে রিযক দান করতাম! কেউ আছে কি বিপদগ্রস্থ, আমি তাকে উদ্ধার করতাম! কেউ কি আছে! কেউ কি আছে! এভাবে ফজর উদয় হয়ে যায়।'
এটি ইমাম ইবনে মাজাহ ও ইমাম আল-বায়হাকী বর্ণনা করেছেন।[3]
অধম বান্দা বলেন, প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে আগমন করেন। তবে তা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে হয়ে থাকে। আর পনেরই শাবান রাতে হয় সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত সময়ে, এ-ক্ষেত্রে শেষ তৃতীয়াংশের সময়টা নির্দিষ্ট নয় আর এটি এই রাতের বিশেষত্ব। হাদীসের ভাষ্য মতে এ-রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য বিশাল পুরস্কার প্রস্তুত রাখেন।
'আল্লাহ তাআলা পনেরই শাবান রাতের বেলা অবতরণ করেন। অতঃপর তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক, হিংসুক ও আত্মীয়তাচ্ছিন্নকারী ছাড়া।' হাদীসটি হযরত আবু মুসা (আল-আশআরী) থেকে ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন।[4]
'লায়লাতুল কদরের পর পনেরই শাবানের রাত থেকে উত্তম কোনো রাত নেই; এ-রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং তাঁর সকল বান্দাদের ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক, হিংসুক, আত্মীয়তাছিন্নকারী না হতে হবে।' হাদীসটি হযরত আতা ইবনে ইয়াসার থেকে ইমাম সাঈদ ইবনে মানসুর বর্ণনা করেছেন।
'পনেরই শাবানের রাতে আল্লাহ অবতরণ করেন। তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক ও হিংসুক লোককে তিনি ক্ষমা করেন না।' হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী হযরত মুআয ইবনে জাবাল থেকে বর্ণনা করেছেন।[5]
'পনেরই শাবানের রাতে আল্লাহ মালাকুল মওতের প্রতি এ-বছরে যাদের প্রাণ কবজা করতে তিনি ইচ্ছুক তাদের প্রাণ সংহারের প্রত্যাদেশ জারি করেন।' ইমাম আদ-দায়নাওরী তাঁর রচিত আল-মাজালিসা গ্রন্থে হযরত রাশিদ ইবনে সা'দ থেকে মুরসাল-সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন।
'আল্লাহ চারটি রাতে কল্যাণ দ্বার খুলে দেন: আল-আযহার রাত, আল-ফিতরের রাত, পনেরই শাবানের রাত; এ-রাতে মানব-জীবনের পরিণতি ও রিযক নির্ধারিত হয় এবং হজব্রত পালনকারীদের তালিকা তৈরি করা হয় এবং আরাফার রাত-আযান (সকাল থেকে সন্ধ্যা) পর্যন্ত।'[6]
'আমার নিকট হযরত জিবরীল এসে বলেছেন, এটি পনেরই শাবানের রাত; এতে আল্লাহ কলব গোত্রের ছাগলের লোমের সমপরিমাণ জাহান্নামীদের মুক্তি দেন।' হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী বর্ণনা করেছেন।[7]
وَعَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: فَقَدْتُ النَّبِيَّ ﷺ ذَاتَ لَيْلَةٍ... হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একরাত নবী করীম ﷺ-কে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অতঃপর আল-বক্ষিতে আসমানের দিকে হাত উঠিয়ে অবস্থান করছিলেন তিনি। তিনি ইরশাদ করলেন, 'আল্লাহ পনেরই শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর কলব গোত্রের ছাগলের লোমের সমপরিমাণ তো বটে তার চেয়ে অধিকসংখ্যক মানুষকে তিনি ক্ষমা করে দেন।' হাদীসটি ইমাম ইবনে আবু শায়বা, ইমাম আত-তিরমিযী, ইমাম ইবনে মাজাহ ও ইমাম আল-বায়হাকী বর্ণনা করেছেন।[8]
'আল্লাহ এ-রাতে (অর্থাৎ পনেরই শাবেনর রাতে) মুশরিক, হিংসুক, আত্মীয়তাছিন্নকারী, অহঙ্কারবশত মাটি পর্যন্ত কাপড় ঝুলিয়ে চলাফেরাকারী, মাতা-পিতার প্রতি বিদ্রোহী ও মদ্যপায়ীর দিকে দৃষ্টিপাত করেন না।' হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী শুআবুল ঈমানে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।
'যখন পনেরই শাবানের রাত আসে তখন এক আহ্বনকারী আহ্বান করেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী কি আছে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিতাম! আছে কি কোনো প্রার্থনাকারী? আমি তাকে দান করতাম! তখন কেউ খালি হাতে ফেরেন না, সকলকে দান করা হয় কিন্তু ব্যভিচারিনী মহিলা ও মুশরিককে কিছুই দেওয়া হয় না।' হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী হযরত আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণনা করেছেন।
শব্দার্থ:
আল-কামূসে আছে যে, اَلْمُشَاحِنُ-এর অর্থ বিদআতি; যে ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অবাধ্য। আন-নিহায়া গ্রন্থে আছে, الشُّحْنَاءُ অর্থ اَلْمَدَارَةُ (শত্রুতা)। ইমাম আল-আওযায়ী বলেন, 'এখানে আল-মুশাহিন থেকে উদ্দেশ্য বিদআতপন্থি লোক, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পক্ষত্যাগী।'
الْعَرِيفُ অর্থ اَلْمَرَّاتُ। এখানে উদ্দেশ্য اَلْمُتَجُمُ (জ্যোতিষী) অথবা যে-লোক অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান রাখে বলে দাবি করে। اَلشُّرْطَةُ (পুলিশবাহিনী) দ্বারা স্বৈরশাসক ও দোসরদের বোঝানো হয়েছে। اَلْجَابِي (কর সংগ্রাহক) থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শুল্ককর্মকর্তা যারা অবৈধভাবে খাজনা সংগ্রহ করে। اَلْكُوْبَةُ অর্থ اَلطَّبْلُ (ঢোল-তবলা) এবং اَلْعُرْطُبَةُ হলো اَلطَّنْبُورُ (গিটার সদৃশ তারের বাদ্যযন্ত্র বিশেষ)।
اَلْمُسْبِلُ (যে-লোক হাঁটার সময় অহংকার প্রকাশের জন্য কাপড়ের কিছু অংশ মাটিতে গড়ায় মতো করে পরে)। নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'লুঙ্গি, জামা ও পাগড়িতে অতিরিক্ত কাপড় ঝুলিয়ে যেসব লোক অহংকার করে হেঁটে চলে, আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তার দিকে তাকাবেন না।'
টিকাঃ
[1] ইবনে জরির আত-তাবারী, জামিউল বায়ান, খ. ২১, পৃ. ৯-১০; ইবনে আবু হাতিম আর-রাধী, তাফসীরুল কুরআনিস আযীম, খ. ১০, পৃ. ৩২৮৭, হাদীস: ১৮৫৩১
[2] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৫৭, হাদীস: ৩৫৪৬
[3] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৪৪, হাদীস: ১৩৮৮; আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৫৪, হাদীস: ৩৫৪২
[4] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৪৫, হাদীস: ১৩৯০
[5] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬০, হাদীস: ৩৫৫২
[6] আদ-দায়লামী, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২৭৪, হাদীস: ৮১৬৫
[7] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬৩, হাদীস: ৩৫৫৬
[8] ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ১০৮; আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১০৭; ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৪৪
📄 তৃতীয় প্রবন্ধ: পনেরই শাবানের রাতে ইবাদত পালন, দিনে সিয়াম পালন ও এ-দিবসের সুসাব্যস্ত দ‘আ ও যিকরের আলোচনা
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُوْمُوا لَيْلَهَا، وَصُوْمُوا يَوْمَهَا».
'হযরত আলী ইবনে আবু তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, 'পনেরই শাবানের রাত আসলে তোমরা রাতের বেলা ইবাদত উদ্যাপন করো এবং দিনের বেলা সিয়াম পালন করো।'
وَعَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ لَيْلَتِي... হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পনেরই শাবানের রাত ছিলো আমার। মধ্যরাতের সময় আমি তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি ঘরে ফিরে আসি। কাপড়ের স্তুপের মতো অবস্থায় আমি তাঁকে খুঁজে পাই। তিনি সাজদায় গিয়ে বলছিলেন,
سَجَدَ لَكَ خَيَالِي وَسَوَادِي، وَآمَنَ بِكَ فُؤَادِي...
'আমার হৃদয়প্রাণ, তোমার সাজদায় অবনত। আমার হৃদয়মন তোমার ওপর বিশ্বাস করেছে। এই আমার হাত যা দিয়ে আমি আমার প্রবৃত্তির ওপর অপরাধ করেছি। হে মহান! আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রাণকেন্দ্র! হে মহান! মহাপাপ ক্ষমা করে দাও। আমার কপালও সেই সত্তাকে সাজদা করছি যিনি তার অবয়ব ও রূপ সৃষ্টি করেছেন এবং চোখ ও কান দান করেছেন।'
অতঃপর তিনি মাথা উঠান। তারপর পুনরায় সাজদায় গমন করেন এবং বলেন,
أَعُوْذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَأَعُوْذُ بِعَفْوِكَ مِنْ عِقَابِكَ...
'তোমার অসন্তুষ্টি থেকে তোমার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই, তোমার সাজা থেকে তোমার ক্ষমাপ্রাপ্তির আশ্রয় চাই এবং তোমার কাছ থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমার পক্ষে তোমার এমন প্রশংসা অসম্ভব যে-ধরনের প্রশংসা তুমি নিজেই নিজের করেছ।'
অতঃপর মাথা উঠান এবং বললেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي قَلْبًا تَقِيًّا مِّنَ الشِّرْকِ...
'হে আল্লাহ! আমাকে সেই পবিত্রাত্মা দান করো; শিরক-বিমুক্ত, পাপাচারী নয়, গোঁড়াও নয়।'
'আজ পনেরই শাবানের রাত। এতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করেন।'[1]
শায়খ আবুল হাসান আল-বাকারী বলেছেন, এ-রাতের দুআসমূহে উত্তম দুআ হলো: 'اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي' (হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি করুণাময়, দয়ালু। ক্ষমা তুমি ভালোবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দাও)।[2]
হযরত আবু বারযা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'যখন হযরত আদম-কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বায়তুল্লাহ সাতবার প্রদক্ষিণ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের বিপরীতে দু'রাকাআত সালাত আদায় করেন। অতঃপর বলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ سِرِّي وَعَلَانِي فَاقْبِلْ مَعْذَرَنِي...
'হে আল্লাহ! তুমি আমার বাইরে ও ভেতরের সব অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত। অতএব তুমি আমার আরযি কবুল করো। তুমি আমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত। অতএব তুমি আমার প্রার্থনা পূরণ করো। তুমি আমার প্রবৃত্তির খবর রাখো। অতএব আমার পাপসমূহ মার্জনা করো। আমি তোমার কাছে এমন ঈমান কামনা করি, যা আমার অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং সত্যিকারের আস্থা কামনা করি। যাতে আমার বুঝে আসে যে, তুমি আমার জন্য যা লিখে রেখেছো তা ছাড়া অন্যকিছু আমাকে গ্রাস করতে পারবে না। আর আমাকে তোমার সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট রেখো।'
অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহি পৌঁছান, 'হে আদম! নিশ্চয় তুমি যে দুআ-সহকারে আমাকে আহ্বান করেছ আমি তা তোমার জন্য কবুল করে নিয়েছি। তোমার পর তোমার বংশধরের মধ্যে কেউ এই দুআ করবে তার দুআও কবুল করবো।"[3]
এই রাতে জেগে থাকা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আছে। হযরত খালিদ ইবনে মাদান, হযরত মাকহুল ও ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাওয়ায়হ মসজিদে এ-রাত জেগে থাকতেন। ইমাম আল-আওযায়ী বলেছেন, যদি কোনো লোক ব্যক্তিগতভাবে এই রাত জেগে থাকে তাহলে তা মুস্তাহাব। ইমাম আশ-শাফিয়ী বলেন, 'নিশ্চয় পাঁচটি বিশিষ্ট রাতে দুআ কবুল হয়: জুমুআ ও দু'ইদের রাত এবং রজবের প্রথম রাত ও পনেরই শাবানের রাত।'[4]
নবী করীম ﷺ-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, পনেরই শাবান রাতে মুমিন নর-নারী ও শহীদগণের মাগফিরাতের জন্য কবরস্থানে তাশরীফ নিয়ে যেতেন। হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে বকিউল গরকদে দেখতে পাই; তিনি মুমিন নর-নারী এবং শহীদগণের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন।
এই রাতের সালাত-বিষয়ে হযরত আলী থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী করীম ﷺ-কে এ-রাতে চৌদ্দ রাকাআত সালাত আদায় করতে দেখেছেন। তবে ইমাম আল-বায়হাকী ও ইমাম ইবনুল জওযী বলেছেন, এ-হাদীসটি মাওযু (বানোয়াট)।[5]
নোংরা বিদআতসমূহ: ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় আলোকসজ্জা, আতশবাজি ও গোলা ছোড়াছুড়ির যে প্রচলন রয়েছে প্রামাণ্য কিতাবে এর কোনো ভিত্তি নেই। শায়খ তকীউদ্দীন বলেন, বিশেষ রাতগুলোতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা নিকৃষ্ট রকমের বিদআত। প্রথম আলোকসজ্জার প্রচলন হয় বারামিক থেকে, যারা পূর্বে অগ্নিপূজারি ছিলো। তারা হিদায়তি সুন্নাতের প্রলেপ দিয়ে এসব ইসলামে ঢুকিয়ে দেয়।
টিকাঃ
[1] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬৪, হাদীস: ৩৫৫৭
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫. পৃ. ৫৩৪, হাদীস: ৩৫১৩
[3] আল-বায়হাকী, আদ-দা'ওয়াতুল কবীর, খ. ১, পৃ. ৩৫২, হাদীস: ২৬২
[4] আন-নাওয়াওয়ী, রাওযাতুত তালিবীন, খ. ২, পৃ. ৭৫
[5] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৬৬; ইবনুল জওযী, আল-মাওযু'আত, খ. ২, পৃ. ১২৭