📄 পরিশিষ্ট: স্বপ্নযোগে নবী করীম (সাঃ)-এর দর্শন লাভের আলোচনা
স্বপ্নে নবী করীম ﷺ-এর দর্শনলাভ সম্পর্কিত আলোচনার মধ্য দিয়ে চলমান প্রসঙ্গের ইতি টানব ইনশাআল্লাহ। কোনো কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার তাওফীকদাতা মহান আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর হাতে গন্তব্যে পৌঁছার চাবিকাঠি সংরক্ষিত।
আল-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে একমাত্র নবী করীম ﷺ-এর স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, مَنْ رَآهُ فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآهُ حَقًّا، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَّثْلُ بِهِ. 'কেউ স্বপ্নযোগে তাঁকে দেখলে সে নিশ্চিতরূপে তাঁকেই দেখল কেননা শয়তান কখনো তাঁর রূপ ধারণ করতে পারে না।'[1] ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হযরত আবু কাতাদা-এর হাদীসে আছে, مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ، فَقَدْ رأى الحق... 'যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে নিশ্চিতভাবে আমার দর্শনই লাভ করল।'[2] ইমাম মুসলিম কর্তৃক হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে আরও বর্ণিত আছে, مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِلشَّيْطَانِ أَنْ يَتَشَبَّهَ بِي. 'যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে নিশ্চিতভাবে আমার দর্শনই লাভ করল। কেননা শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।'[3]
ইমাম আল-বুখারী বর্ণিত হযরত আবু সাঈদ (আল-খুদরী)-এর হাদীসে এসেছে যে, فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَكَوَّتُنِي. "কারণ শয়তান আমার রূপ ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই।"[4] لَا يَكُونُ كَوْنِ، وَ لَا يَتَكَوَّنُنِي ছিল। এখানে সম্বন্ধিত পদকে বিলুপ্ত করে সম্বন্ধপদকে ক্রিয়াপদের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ইমাম আল-বুখারী বর্ণিত হযরত আবু কাতাদা-এর হাদীসে আছে, 'সে আমার রূপ ধারণ করতে সক্ষম নয়।' لَا يَتَرَاءَى بي. 'এর অর্থ হচ্ছে, শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে সমর্থ নয়। অর্থাৎ যদিও আল্লাহ তাআলা শয়তানকে বিভিন্ন রূপ ধারণ করার শক্তি দান করেছেন, তা সত্ত্বেও নবী করীম ﷺ-এর রূপ ধারণ করার ক্ষমতা শয়তানের নেই।[5]
কারো কারো বক্তব্য হলো, স্বপ্নে যদি কেউ নবী করীম ﷺ-এর দর্শন লাভ করে তাহলে নবী করীম ﷺ-কে সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় দেখাটা বাঞ্চনীয়। কোনো কোনো সংকীর্ণ মানসিকতাসম্পন্ন লোকের কথা হলো নবী করীম ﷺ ইন্তিকালের পূর্বে অসুস্থ অবস্থায় যেরূপে ছিলেন দেখতে তেমনই দেখা যাবে। এমনকি ইন্তিকালের পূর্বে তাঁর যে-কুড়িটির মতো চুল পেকেছিল তাও দেখা যাবে।
وَعَنْ حَمَّادِ بْنِ زَيْدٍ، قَالَ: لَمَّا كَانَ مُحَمَّد يَعْنِي ابْنَ سِيْرِيْنَ إِذَا قَصَّ عَلَيْهِ رَجُلٌ أَنَّهُ رَأَى النَّبِيَّ ﷺ... 'হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খ্যাতিমান স্বপ্নব্যাখ্যাতা) ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরীনের কাছে যখন কেউ হযরত নবী করীম ﷺ-কে স্বপ্নে দেখার দাবি নিয়ে আসত, তখন তাকে তিনি বলতেন, কেমন দেখছ তার বিবরণ দাও। যদি সে এরূপ বিবরণ দেয় যেরূপের সাথে তিনি পরিচিত নন, তখন তিনি জোর দিয়ে বলতেন, তুমি কখনো নবী করীম ﷺ-কে স্বপ্নে দেখনি।'[6] বর্ণনাটির সূত্র বিশুদ্ধ।
ইমাম আল-হাকিম হযরত আসিম ইবনে কুলাইব-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, 'আমার পিতা আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-কে বললাম, আমি স্বপ্নে নবী করীম ﷺ-কে দেখেছি। তিনি বললেন, কেমন দেখছ আমাকে বর্ণনা কর। আমি হযরত হাসান ইবনে আলী-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, তাহলে সত্যিই তো তুমি নবী করীম ﷺ-কে দেখেছ।”[7] এর সনদ শক্তিশালী। তবে ইমাম ইবনে আবু আসিম-এর অন্য আরেকটি বর্ণনার সাথে এর সাংঘর্ষিকতা রয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে: হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখেছে সে নিশ্চিতভাবে আমাকেই দেখেছে। কারণ আমি যেকোনো রূপেই দৃশ্যমান হতে পারি।'[8] এর সনদে একজন ইবনুত তাওআমা রয়েছেন। তিনি বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। কারণ তখনকার সময়ে লোকটির জ্ঞান-বুদ্ধি পুরোপুরি ঠিক ছিল না। তার মানসিক অসুস্থতার সময়েই বর্ণনাটি তার কাছ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী বলেন, নবী করীম ﷺ-এর সর্বপরিচিত রূপ-বৈশিষ্ট্যসহ দর্শন লাভ হচ্ছে প্রকৃতরূপে জানা আর অপরিচিত কোনোরূপে তাঁর দর্শন লাভ হলো প্রতীকিভাবে জানা। বস্তুত যেহেতু আম্বিয়ায়ে কেরামের দেহ-অবয়ব কবরে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে, উম্মতের যেকোনো লোক স্বপ্নে তাঁকে হুবহু প্রকৃত অবয়বেই দেখে থাকেন। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসহ দেখলে সেটা প্রতীকী দর্শন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
কাযী আয়ায বলেন, নবী করীম ﷺ-এর এসব ইরশাদের সম্ভাব্য মর্মার্থ হচ্ছে, জীবদ্দশায় নবী করীম ﷺ যে-অবয়ববিশিষ্ট ছিলেন এমনরূপে দেখলে তবে তাঁকে হুবহু দেখা হলো, অন্যরূপে দেখতে পেলে স্বপ্নের ভিন্ন ব্যাখ্যার অবকাশ আছে। ইমাম নাওয়াওয়ী বলেন, কোনো ব্যক্তি পরিচিতরূপে হোক কিংবা অপরিচিতরূপে হোক নবী করীম ﷺ-কে স্বপ্নে দেখলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে সে নবী করীম ﷺ-কেই দেখেছে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজর আল-আসকালানী বলেন, কাযী আয়ায-এর কথাতেও স্বপ্নে নবী করীম ﷺ-এর দর্শন সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু নেই। বরং তিনিও বলতে চেয়েছেন যে, উভয় অবস্থাতেই নবী করীম ﷺ-কে সত্যি সত্যি দেখা যায়। তবে প্রথম অবস্থায় স্বপ্নের ব্যাখ্যার দরকার নেই, দ্বিতীয় অবস্থায় ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। যারা বলে, 'নবী করীম ﷺ-কে তাঁর পরিচিত অবয়ব ছাড়া স্বপ্নে দেখা যেতে পারে না।' তাঁদের এ-বক্তব্য দ্বারা যারা তাঁকে অন্যরূপে স্বপ্নে দেখেন তা অপরিহার্যরূপে দুঃস্বপ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। বাস্তবতা হচ্ছে, নবী করীম ﷺ-কে স্বপ্নে এমন অবস্থায়ও দেখা যেতে পারে যা তাঁর ইহকালীন অবয়বের সাথে মিল নয়। বস্তুত শয়তান কোনোক্রমেই নবী করীম ﷺ-এর রূপ ধারণ করতে পারে না; এমনকি তাঁর কোনো অবস্থা বা কোনো বৈশিষ্ট্যেও সে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করতে সক্ষম নয়। তা না হলে 'শয়তান কোনো অবস্থায় আমার রূপ ধারণ করতে পারে না' নবী করীম ﷺ-এর এ-ঘোষণার কার্যকারিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়।[9]
অতএব সঠিক বক্তব্য হচ্ছে, নবী করীম ﷺ-এর কোনো অবস্থা বা তাঁর দিকে সম্পর্কিত কোনো বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত হওয়া শয়তানের জন্য অসম্ভব। এ-ধরনের দুঃস্বপ্ন থেকে তিনি পবিত্র। কেননা এটি নবী করীম-এর উচ্চ মর্যাদা এবং তাঁর নিষ্পাপ বৈশিষ্ট্যের জন্য অতিগুরুত্ব বিষয়। অতএব নবী করীম ﷺ পৃথিবীতে জীবিত থাকা অবস্থায় যেমন শয়তান থেকে মুক্ত ও নিরাপদ ছিলেন কবরেও তাই আছেন।
আর হাদীসটির বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হচ্ছে, হাদীসের মূল উদ্দেশ্য এখানে নবী করীম-কে স্বপ্নে দেখার পর বিষয়টি কোনো অবস্থায়ই বাতিলযোগ্য নয় এবং তা কখনো কারো দুঃস্বপ্ন হতে পারে না। বরং সেটি সন্দেহাতীতভাবে নবী করীম ﷺ-এর দর্শন লাভ হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি কেউ নবী করীম ﷺ-কে তাঁর নিজস্ব সত্তায় নাও দেখেন তবুও তা কোনোভাবেই শয়তানের ছবি বা হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অবকাশ নেই, বরং এটা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে।[10]
হাদীসে আমাদের শায়খুল মাশায়িখ হাফিয ইবনে হাজর আল-হায়সামী-এর বক্তব্য থেকে নবী করীম আলায়হিস সালাতু ওয়াস সালামকে স্বপ্নযোগে দর্শনের ওপর উল্লিখিত আমাদের বক্তব্যগুলো সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। দর্শনপ্রাপ্ত লোক নবী করীম-কে যে-অবস্থায়ই দেখুন না কেন। তবে শর্ত হচ্ছে, নিজস্ব সত্তায় তাঁকে দেখতে হবে; তবে যৌবন, বার্ধক্য ও অন্তিম যেকোনো অবস্থায়ই দেখা হোক না কেন সবই সমান। তবে কেউ নবী করীম-কে ভিন্নরূপে ও বিশেষ অবস্থায় স্বপ্নে দেখলে দর্শনপ্রাপ্ত ব্যক্তির অবস্থার সাথেই এর ব্যাখ্যার সম্পর্ক।[11]
ইমাম আরিফ ইবনে আবু জামরা বলেন, যে-ব্যক্তি নবীজীকে সুন্দর অবয়বে স্বপ্নে দেখেন তাহলে দর্শনপ্রাপ্ত লোকটি একজন দীনদারি ও ভালো মানুষ। আর তাঁকে কোনো অঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত বা কোনো অঙ্গহীন দেখে তাহলে লোকটার দীনদারিতে ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে। এটিই সঠিক। এর সত্যতা বহুবার প্রমাণিত। তবুও স্বপ্নযোগে নবী করীম ﷺ-কে দেখার বড় ফায়দা হলো, সে দীনের ওপর বিশ্বাসে অটল না দুর্বল? তা অনুধাবন হবে। যেহেতু নবীজী নুরানী, যার উদাহরণ স্বচ্ছ-নির্মল আয়না। আয়নায় যেমন নিজের বাস্তব প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে, তদ্রূপ স্বপ্নেও যে-ব্যক্তি তাঁকে দেখেন তার নিজের অবস্থার ভালো-মন্দ রূপ-প্রকৃতিও নবী করীম ﷺ-এর আকৃতিতে ভেসে ওঠে।[12]
স্বপ্নে নবীজী আলায়হিস সালাতু ওয়াস সালামের কথা বলা সম্পর্কে সুন্নাহর সাথে কিছু সাংঘর্ষিকতা রয়েছে। যদি তা সুন্নাহ মুতাবিক হয় তাহলে অবশ্যই সঠিক। যদি হ্যাঁ সুন্নাতের বরখেলাপ হয় তবে তা লোকটির শোনার দুর্বলতা। অর্থাৎ স্বপ্নে দেখা লোকটির শোনায় ভুল ছিল। বস্তুত স্বপ্নযোগে নবীজীর দর্শন লাভ সত্য। যতো সমস্যা তা শুধু দর্শনপ্রাপ্ত ব্যক্তির শোনা ও দেখার সমস্যা।
অধম বান্দা বলেন, আমার মুরশিদ আরিফ বিল্লাহ শায়খ আবদুল ওয়াহহাব ইবনে ওয়ালী উল্লাহ আল-মুত্তাকী থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আমার মুরশিদ আরিফ বিল্লাহ শায়খ আলী ইবনে হুসাম উদ্দীন আল-মুত্তাকী-কে বলতে শুনেছি, মিসর থেকে এ-মর্মে একটি পত্র আসে যে, যদি কোনো লোক হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে স্বপ্নে দেখেন, তিনি নির্দেশ দিয়ে বলছেন, أَشْرُبِ الْخَمْرَ (মদ পান করো)। শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দীনের কাছে প্রশ্ন, এর ব্যাখ্যা কী হবে? পত্রটি যাদের কাছেই পৌঁছেছে তারা অনেকই কিছু না কিছু লিখেছেন এবং যথাসম্ভব বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা ও ইঙ্গিতবার্তা দিতে চেষ্টা করেছেন। অতঃপর আল্লাহর একান্ত প্রিয় বান্দা আরিফ বিল্লাহ শায়খ আল-মুকতাদী মুহাম্মদ ইবনে ইরাক এর জবাবে লিখেন, লোকটির শোনার ভুল হয়েছে। নিশ্চয়ই নবী করীম ﷺ আসলে বলেছেন, لَا تَشْرِبِ الْخَمْر (মদ পান করো না)। কিন্তু লোকটি ভুল শুনেছেন।[13]
ইমাম মুসলিম-এর এক বর্ণনায় এসেছে, 'যে-ব্যক্তি স্বপ্নে আমাকে দেখল সে শিগগিরই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে বা সে বাস্তবেই আমাকে দেখল। কেননা অভিশপ্ত শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।'[14] ইমাম ইবনে মাজাহও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।[15] বর্ণনাটি ইমাম আত-তিরমিযী-এর মতে বিশুদ্ধ।[16]
ইবনে আবু জামরা কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন যে, 'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি স্বপ্নে নবী করীম ﷺ-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। অতঃপর জাগ্রত হয়ে উপর্যুক্ত হাদীসের ওপর চিন্তা-ফিকর করছিলেন। ওই অবস্থায় উম্মুল মুমিনীনদের কারো ঘরে হয়তো তাঁর খালা হযরত মায়মুনা-এর কাছে যান। তিনি তাঁকে নবী করীম ﷺ-এর ব্যবহৃত একটি আয়না এনে দেন। তখন তিনি তাতে নবী করীম ﷺ-এর ছবি দেখতে পান, নিজের ছবি দেখতে পেলেন না।'[17]
বাস্তবতা আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। আর তাঁর দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে এবং তিনিই আমাদের গন্তব্য।
টিকাঃ
[1] আল-কাস্স্তালানী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৬৫
[2] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৭৬, হাদীস: ১১ (২২৬৭)
[3] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৭৭৬, হাদীস: ১৩ (২২৬৮)
[4] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ৯, হাদীস: ৬৯৯৭
[5] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৯, পৃ. ৩৩, হাদীস: ৬৯৯৫
[6] ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৩-৩৮৪
[7] আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৪০২, হাদীস: ৮১৮৬
[8] ইবনে হাজর আল-আসকালানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৪
[9] (ক) ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৩-৩৮৪; (খ) আল-কাসতাল্লানী, প্রাক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৬৫-৩৬৮
[10] ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৩-৩৮৪
[11] ইবনে হাজর আল-হায়সামী, আল-ফাতাওয়া আল-হাদীসিয়া, পৃ. ২০৬
[12] (ক) ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৭; (খ) আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৭০
[13] ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৩-৩৮৪
[14] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৭৫, হাদীস: ১১ (২২৬৬)
[15] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ২, পৃ. ১২৮৪, হাদীস: ৩৯০০
[16] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ৫৩৫, হাদীস: ২২৭৬
[17] (ক) ইবনে হাজর আল-আসকালানী, ফতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৫; (খ) আল-কাস্তালানী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৬৮-৩৬৯
📄 পরিশিষ্ট : মাহে রবিউল আখির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা
এই পবিত্র মাস তথা রবিউল আউওয়াল সম্পর্কে বিস্তারিত বৃত্তান্তের সংযুক্তি ও পরিশিষ্ট হিসেবে রবিউল আখিরের সামান্য আলোকপাত করা সমীচিন মনে করি। আল্লাহ আমাদেরকে এ-মাসে বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত ফয়েয দ্বারা বিশেষিত করেছেন।
এই মাসে সাইয়িদুনা, মাওলানা, মহান কুতুব ও গাওস, শায়খুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন, মানব ও দানব জগতের গাওস, শায়খ মুহিউদ্দীন আবু মুহাম্মদ আবদুল কাদির আল-হাসানী আল-হুসায়নী আল-জিলানী আল-হাম্বলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আরদাহু আন্না ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এখানে মহান প্রভুর নিকট তাঁর শুভগমনের দিন সম্পর্কে মতভেদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে।
এই মহান শায়খের জীবন-বৃত্তান্তের ওপর প্রসিদ্ধ কিতাব বাহজাতুল আসরারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক রামাযানে শায়খ ক'দিন থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হিজরী ৫৬১ সালের নয়ই রবিউল আখির শনিবার রাতে শায়খ ইন্তিকাল করেন।[1]
তাঁর জীবন-চরিতে বুযর্গানে দীন উল্লেখ করেছেন যে, প্রত্যেক চান্দ্রমাস নতুন চাঁদ উদয় হওয়ার পূর্বে তাঁর দৃষ্টিতে ধরা দিতো। বাহজাতুল আসরার ও খুলাসাতুল মাখাফির গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি একবার বলেছিলেন, হিজরী ৫৬০ সালের জুমাদাল আখিরের শেষ জুমুআবার দিনে একজন সুদর্শন যুবক আগমন করে বললেন, আস-সালামু আলায়কা ইয়া ওয়ালিয়াল্লাহ! আমি হচ্ছি মাহে রজব। আমি এসেছি আপনাকে একটি সুসংবাদ দিতে যে, এ-মুহূর্তে আমার মাঝে মানুষের জন্য সাধারণ কোনো দুঃসংবাদ নির্ধারিত নেই। বাস্তবেই ওই রজব মাসে মানুষ কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি।[2]
আমি বলবো, এ-বর্ণনা মতে তাঁর ওরস হবে নয়ই রবিউল আখির। এ-তারিখ; যার ওপর আমি সাইয়িদুনা শায়খ, আলিম, মহান আরিফ, শায়খ আবদুল ওয়াহহাব আল-কাদিরী আল-মুত্তাকী আল-মক্কী-কে পেয়েছি। শায়খ কুদ্দিসা সিরুহু এ-তারিখকে তাঁর ওরস-দিবস হিসেবে স্মরণ রাখতেন।
অবশ্য আমাদের দেশে এই এগারোই রবিউল আখিরের দিনটি সমধিক প্রসিদ্ধ। ভারত উপমহাদেশে আমাদের মাশায়িখ ও বংশধরের কাছে এ-তারিখটিরই প্রচলন রয়েছে। শায়খ ইমাম আবদুল্লাহ আল-ইয়াফিয়ী তাঁর মিরআতুল জিনান নামের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর ওফাত হয়েছে রবিউল আখিরের ৫৬০ বা ৫৬১ সালে।[3] কেউ কেউ বলেছেন যে, তাঁর ওফাত হয়েছে সতেরই রবিউল আখির। এর কোনো ভিত্তি নেই।
যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আমাদের দেশে প্রচলিত পীর-মাশায়িখে ওফাত-দিবসে যেসব ওরস-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, এর কি কোনো ভিত্তি আছে? আমি বলবো, এ-প্রসঙ্গে আমি আমার শায়খ ইমাম আবদুল ওয়াহ্হাব আল-মুত্তাকী আল-মক্কী-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। এর জবাবে তিনি বলেছেন যে, এটি আমাদের পীর-মাশায়িখের তরিকা ও প্রথা আর এতে তাঁদের জন্যে মান্নত করা হয়। তিনি বলেন, সাধারণভাবে মেহমানদারি সুন্নাত। তো দিন নির্ধারণ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেখো। আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞানী।
টিকাঃ
[1] আশ-শাতানুফী, বাহজাতুল আসরার, পৃ. ৫০-৫১
[2] আল-ইয়াফিয়ী, খুলাসাতুল মাখাফির, পৃ. ২২৬
[3] আল-ইয়াফিয়ী, মিরআতুল জিনান, খ. ৪, পৃ. ৯৬
📄 মাহে রজব
আরবরা এ-মাসকে বিশেষভাবে সম্মান করতো। আল-কামূসে রয়েছে, রজব মাস এসেছে কারণ আরবরা একে সম্মান করতো। মুযার গোত্রের রজব হিসেবেও এটি পরিচিত যা জুমাদা ও শাবানের মাঝামাঝি একটি মাস।[1] নবী করীম ﷺ-এর বক্তব্য: 'বাইন জুমাদা ওয়াস শা'বান'... মাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ।
রজবকে 'আল-আসাব' (বধির)ও বলা হয়। আরবরা এই মাসে এলে তাদের অস্ত্র-শস্ত্র বন্ধ রাখতো এবং সেসব খুলে রাখতো। এতে মানুষ এই মাসে নিরাপদে থাকতো। জামিউল কবীরে রজবের ফযীলতের ওপর বর্ণিত হাদীসসমূহ হলো: 'রজব হলো আল্লাহর মাস এবং শাবান আমার মাস এবং রামাযান আমার উম্মার মাস।'[2] 'নিশ্চয় রজব একটি মহিমান্বিত মাস, ভালো আমলের কয়েকগুণ সওয়াব দেওয়া হয়। যে-ব্যক্তি এই মাসে একদিন সিয়াম-সাধনা করে তা পূর্ণ একবছর সিয়াম-সাধনার মতো।'[3]
رَجَبٌ شَهْرٌ عَظِيمٌ ، يُضَاعِفُ اللهُ فِيهِ الْحَسَنَاتِ... 'রজব একটি মহিমান্বিত মাস। এতে আল্লাহ ভালো কাজের সওয়াব কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। যে-ব্যক্তি সাতটি দিন সিয়াম পালন করবে তার জন্য জাহান্নামের সাতটা দরজা বন্ধ থাকবে। যে-ব্যক্তি আটটি দিন সিয়াম পালন করবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে।' হাদীসটি ইমাম আত-তাবারানী বর্ণনা করেছেন।[4]
'রজব মাসে একটি দিন ও একটি রাত এমন রয়েছে, যে-ব্যক্তি সেই দিন সিয়াম পালন করবে এবং সেই রাতে ইবাদত যাপন করবে সে যেন একশত বছরকালের একযুগ সিয়াম পালন করল। সেটি ২৭ রজব।'[5] হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি রজব মাসে (বেশি গুরুত্ব দিয়ে) সিয়াম পালনের কারণে লোকদেরকে হাতে পেটাতেন যেন তারা এটাকে জাহেলিয়াতের মতো সম্মান না করে।[6]
জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যা রজব মাসে সিয়াম পালনকারীদের জন্য।[7] 'নিশ্চয় জান্নাতে রজব নামে একটি হ্রদ আছে। যার পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও সুমিষ্ট।'[8] 'রজব মাসের প্রথম দিনের সিয়াম পালন তিন বছরের কাফফারা হয়ে যাবে।'[9]
হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ রজব আসলে বলতেন, 'اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ' (হে আল্লাহ! রজব ও শাবানে আমাদের জন্য বরকত নাযিল করুন এবং রমযান আমাদেরকে নসীব করুন)।[10]
এ-মাসে সাধারণ মানুষের কাছে অন্যতম প্রসিদ্ধ হলো লায়লাতুর রাগায়িব। রজবের প্রথম জুমুআর রাতকে লায়লাতুর রাগায়িব বলে। ইমাম মুহিউদ্দীন আন-নাওয়াওয়ী বলেছেন যে, আর-রাগায়িবের রাতের সালাত সুন্নাত নয়, বরং এটি একটি জঘন্য ধরনের বিদআত। এ-ক্ষেত্রে ইমান আন-নাওয়াওয়ী তাঁর ফাতাওয়ায়ও এই প্রথাকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন।[11]
হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ সালাতুর রাগায়িবের আলোচনা করেছেন। এতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে বার রাকাআত সালাত পড়ার কথা এসেছে। জামিউল উসূল বলেছেন, এই হাদীসটি রযিনের কিতাব থেকে উদ্ধৃত, সিহাহ সিত্তায় এর খোঁজ নেই।[12]
ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় রজবে আলোকসজ্জা, আতশবাজি ও হই-হল্লা করার যে প্রচলন রয়েছে প্রামাণ্য কিতাবে এর কোনো ভিত্তি নেই। এ-জাতীয় আলোকসজ্জা নিকৃষ্ট রকমের বিদআত।
প্ৰাক-ইসলামি যুগে রজব মাসে 'আল-আতীরা' (পশুবলি) প্রচলিত ছিল। ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেন, 'লা ফারআ ওয়া লা আতীরতা... ফারআ ও আতীরার কোনো ভিত্তি নেই।'[13] যদিও অন্য হাদীসে এর উল্লেখ আছে, তবে অধিকাংশ আলিমের মতে এর আবশ্যকতা রহিত হয়ে গেছে।[14]
টিকাঃ
[1] আল-ফীরযাবাদী, আল-কামুসুল মুহীত, পৃ. ৮৮; আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১০৭
[2] আস-সুযুতী, জামউল জাওয়ামি, হাদীসঃ ১২৬৮২
[3] আর-রাফিয়ী, আত-তাদওয়ীন, খ. ৩, পৃ. ৪৩৯
[4] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৬, পৃ. ৬৯, হাদীস: ৫৫৩৮
[5] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ৩৪৫, হাদীস: ৩৫৩০
[6] ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৪৫, হাদীস: ১৭৫৮
[7] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ২৫, পৃ. ৩৩৪
[8] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৩, পৃ. ৩৬৭, হাদীস: ৩৮০০
[9] আল-হাসান আল-খালাল, ফাযায়িলু শাহরি রজব, পৃ. ৬২, হাদীস: ১০
[10] ইবনে আসাকির, তারিখ দামিশক, খ. ৪০, পৃ. ৫৭, হাদীস: ৪৬৫৭; ইবনুন নাজ্জার, যাররু তারিখি বগদাদ, খ. ১৬, পৃ. ৮৫
[11] আন-নাওয়াওয়ী, আল-মজমু' শরহুল মুহায্যাব, খ. ৪, পৃ. ৫৬
[12] ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, খ. ৬, পৃ. ১৫৪, হাদীস: ৪২৬৮
[13] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ৮৫; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ খ. ৩, পৃ. ১৫৬৪
[14] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ৯৯; আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩. পৃ. ৯৩
📄 মাহে শাওয়াল
হজের প্রধান মাসসমূহের মধ্যে শাওয়াল একটি মহিমান্বিত মাস। এটিকে ফিতরের মাস বলা হয়। এ-মাসে ঈদ ও গোনাহ মাফের দিন রয়েছে। হাদীসে এসেছে,
হযরত আনস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, ইন্নাহু কানা ইয়াওমাল ইদি বাহাল্লাহু তাআলা... ঈদের দিন আসলে আল্লাহ তাআলা নিজের সৎ বান্দাদের নিয়ে গর্বভরে ফেরেশতাদের বলেন, 'হে ফেরেশতা! সেসব শ্রমিকের প্রতিদান কী হওয়া উচিৎ, যে তার কাজ পুরো করে'? তারা বললেন, 'হে প্রভু! তাদের প্রতিদান হলো তাদের পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দেওয়া।' আল্লাহ বলেন, 'হে ফেরেশতারা! আমার এসব বান্দা ও গোলামদের প্রতিদান কী দেওয়া যেতে পারে যারা আমার ফরয যা তাদের ওপর দায়িত্ব ছিলো পালন করছে, অতঃপর বের হয়ে আমার কাছে ডেকে ডেকে দুআ করছে। আমার সম্মান, আমার প্রতাপ, আমার মর্যাদা, আমার পরাক্রম ও উচ্চাসনের শপথ! আমি তাঁদের প্রার্থনা কবুল করে নেবো।' তিনি আরও বলেন, 'ফিরে যাও! তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম, তোমাদের পাপকে পুণ্য দ্বারা বদলে দিলাম। (হযরত আনাস ইবনে মালিক) বলেন, সত্যিই তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে। হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী শুআবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।[1]
ঈদের দিন ঈদগাহে রওয়ানা হবার পূর্বে কিছু খেয়ে নেওয়া সুন্নত। হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বেজোড় কয়েকটি খেজুর খেয়ে নিতেন। হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে ইমাম আল-বুখারী-এর বর্ণনা এ-রকম এসেছে।[2] ইমাম আল-হাকিম বর্ণনা করেন হযরত ওতবা ইবনে হুমায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি (নবী করীম ﷺ) ৩ বা ৫ বা ৭টি কিংবা কম-বেশি খেজুর খেতেন।[3]
মুহাদ্দিসগণ বলেন, খেজুর খাওয়া মুস্তাহাব—এর হিকমত হলো খেজুর মিষ্টান্ন জিনিস। আর মিষ্টি সিয়াম পালনে দুর্বল দৃষ্টিকে শক্তিশালী করে। তা ছাড়া শিন্নি আত্মাকে কোমল করে এবং বিশ্বাসবদ্ধ মস্তিস্কের জন্য খুব উপাদেয়। এজন্য বলা হয়, মুমিনরা মিষ্টভাষী। যদি কেউ শিন্নি খেতে স্বপ্নে দেখে তবে তার ব্যাখ্যা হলো সে শিগগিরই ঈমানের স্বাদ ভোগ করবে। সে কারণে মধু ও খেজুরের ন্যায় শিন্নি দিয়েও ইফতার করা উত্তম। যদিও খেজুরে পুষ্টিগুণ পর্যাপ্ত বিশেষত মদীনার খেজুরে। উপর্যুক্ত আলোচনার সারকথা হলো ৩ বা ৫ কিংবা ৭টি খেজুর খেয়েই ঈদগাহে যাবে।
এ-মাসের বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ছয় দিনের সিয়াম পালন। ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহে বর্ণনা করেছেন: হযরত আবু আইয়ুব আল-আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'যে-ব্যক্তি রমযানে সিয়াম পালন করলো, অতঃপর শাওয়ালের ছয় তার অনুকরণ করলো, সে তো পুরো জীবন সিয়াম পালন করলো।[4] যদি সে পুরো জীবন এ-ধরনের সিয়াম পালন করে সে-ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। আর যদি সে একমাসেই মাত্র সিয়াম পালন করে তবে তা এক বছর সিয়াম পালনের ন্যায় হবে। এ-অর্থেই হযরত সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন।[5]
অন্য একটি বর্ণনায় 'ছুম্মা' (অতঃপর) সহকারে এসেছে। তাই এখানে প্রকৃত ধারাবাহিকতা উদ্দেশ্য নয়। কারণ এতে ঈদের দিনও সিয়াম পালন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অতএব মাসের প্রথম ও শেষ দিকে সিয়াম পালন করলেও সুষ্ঠু হবে। ইমাম আশ-শাফিয়ী-এর কাছে পছন্দসই হলো মাসের প্রথম থেকে লাগাতার পালন করা। আমাদের মতে সাধারণভাবে পালিত হবে। ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল)-এর মতও অনুরূপ। বরং তাঁরা বলেছেন যে, আমাদের মতে তা মাকরুহ হওয়া এবং খ্রিস্টানদের সাথে সামঞ্জস্য হওয়া থেকে অনেক দূরে।
দুই ঈদের দিন গোসল করা সুন্নত বলে ফকীহগণ মত ব্যক্ত করেছেন। সম্মিলন হিসেবে জুমুআর ওপর কিয়াস করে এটি প্রমাণের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে হযরত ফাকিহ ইবনে সা'দ থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে—যিনি নবী করীম ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তবে এই হাদীসটি ছাড়া তাঁর ব্যাপারে আর কিছু জানা যায় না—তিনি বলেন, 'কানা রাসূলুল্লাহ ﷺ ইয়াগতাসিলু ইয়াওমাল ফিতরি... হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতর-দিবস, আযহা-দিবস ও আরাফা-দিবসে গোসল করতেন। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে[6], ইমাম আত-তাবারানী রচিত মু'জামুল (কবীরে)[7], ইমাম আল-বাযযার তাঁর মুসনদে বর্ণনা করেছেন এমনটি।
ইমাম আস-সুযুতী জামউল জাওয়ামি'য়ে বর্ণনা করেছেন যিয়াদ ইবনে আয়ায আল-আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি একদল লোক সম্পর্কে বলেন, তাদের প্রত্যেকে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যা করতে দেখেছি তার সবই পালন করতে দেখেছি কিন্তু তাদের কেউ দু'ঈদে গোসল করতেন না।[8] ছয় বিশিষ্ট কিতাবে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর-এর একটি আমল ছাড়া এ-ধরনের কোনো হাদীস পাওয়া যায় না: 'আন্নাহু কানা ইয়াগতাসিলু ইয়াওমাল ফিতরি... তিনি ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।'[9] মুহাদ্দিসবর্গ বলেন, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) নবী করীম ﷺ-এর সুন্নাতের কঠোর অনুসারী। এজন্য হাদীসটি বিশুদ্ধ বলে দাবি রাখে।
ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর পড়া তিন বিশিষ্ট ইমামের মতে, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ-এর মতে সুন্নত। তবে ইমাম আবু হানিফা-এর মতে এটি ঈদ আল-আযহার সুন্নাত, ফিতরের নয়। উচ্চৈঃস্বরে পড়ার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে। যদি অনুচ্চ স্বরে তাকবীর পড়া হয় তবে তাই ভালো। আর আল্লাহর স্মরণ সর্বসময়েই মুস্তাহাব। বলাবাহুল্য আমাদের বোঝা হয়ে গেলো যে, মতপার্থক্য মূল তাকবীরকে কেন্দ্র করে। অবশ্য ইমাম আবু হানিফা থেকে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর পড়ার বিষয়টিও বর্ণিত হয়েছে।[10]
ইমামবর্গ ইমাম আদ-দারাকুতনী কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীর পড়তেন।[11] ইমাম আবু জাফর বলেন, সাধারণ মানুষকে তাকবীর পড়তে বারণ না করা উচিৎ। কেননা তাদের ভালো কাজে উৎসাহ কম।
ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করা সুন্নাত: বেরুবে এক রাস্তা দিয়ে এবং ফিরে আসবে অন্য রাস্তা দিয়ে। ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ﷺ ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করতেন।[12] ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আদ-দারিমী বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের দিন এক পথে যেতেন, অন্য পথে ফিরতেন।[13] আলিমরা বলেছেন যে, এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক দূরদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম-রহস্য রয়েছে।
রইলো ঈদের সালাতের আগে-পরে সালাত পড়ার বিধানের আলোচনা; এ-বিষয়ে লোকদের অবগত করা দরকার। ইমাম আল-বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের দিন বের হন, অতঃপর দু'রাকাআত সালাত আদায় করেন, তবে তার পূর্বাপর কোনো সালাত আদায় করেননি।[14] ইমাম আত-তিরমিযী বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবু সাঈদ (আল-খুদরী)-এর বর্ণনা মতে, নবী করীম ﷺ-এর অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ সাহাবা এবং তাঁদের পরবর্তী অধিকাংশ আলিম এর ওপর আমল করতেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব আল-বারকীর ব্যাখ্যায় বলেছেন, হযরত আলী হযরত আবু মাসউদ আল-আনসারী-কে লোকজনের ওপর স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেন, অতঃপর তিনি ঈদের দিবসে বেরুলেন এবং বললেন, হে লোকসকল! নিশ্চয় ইমামের আগে কোনো সালাত আদায় সুন্নাত নয়।[15] এটি ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন।[16]
এ-নিষেধাজ্ঞা কি শুধু ঈদগাহের সাথে সম্পৃক্ত, নাকি ঈদগাহ ও সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য—এ নিয়েও মতভেদ আছে। অনেকে বলেছেন, যদি ঈদগাহ ব্যতীত অন্যত্র সালাত আদায় করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। বর্ণিত আছে হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের সালাতের পূর্বে কোনো সালাত আদায় করতেন না। ঘরে ফিরে দু'রাকাআত সালাত আদায় করতেন।[17] ফাতাওয়া হিদায়ায় আছে, ঈদগাহে ঈদের সালাতের পূর্বে নফল পড়া যাবে না।
অতঃপর জেনে রাখুন! ছুটে যাওয়া ঈদের সালাত নিয়ে আলিমদের মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানিফা-এর স্পষ্ট মাযহাব হলো, ঈদের সালাতের কোনো কাযা নেই। হিদায়ার কতিপয় ব্যাখ্যাগ্রন্থে আছে, যুহার সালাতের মতো ইচ্ছে মাফিক দুই বা চার রাকাআত সালাত পড়ে নেবে। আল-মুহীত ও ফাতাওয়া কাযীখানে আছে, সর্বোত্তম হলো চার রাকাআত পড়ে নেবে এতে তার যুহার সালাত আদায় হয়ে যাবে।[18] যেমন- হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'মান ফাতাহু সালাতুল ইদি... যে-ব্যক্তির ঈদের সালাত ছুটে যায় সে চার রাকাআত সালাত পড়ে নেবে।'[19] আর এর প্রথম রাকাআতে সুরা আল-আলা, দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আশ-শামস, তৃতীয় রাকাআতে সুরা আল-লায়ল এবং চতুর্থ রাকাআতে সুরা আয-যুহা পড়বে।
ইমাম আবু হানিফা-এর মতে তার ইখতিয়ার আছে, ইচ্ছে করলে পড়বে, ইচ্ছে করলে পড়বে না। এই অবস্থায় দুই কিংবা চার রাকাআত সালাত আদায়ের ইখতিয়ার আছে তার। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।[20]
টিকাঃ
[1] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ২৯০, হাদীস: ৩৪৪৪
[2] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ১৭, হাদীসঃ ৯৫৩ (আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কয়েকটি খেজুর খেতেন)
[3] আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৩৩, হাদীস: ১০৯০
[4] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৮২২, হাদীস: ২০৪ (১১৬৪)
[5] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫৪৭, হাদীস: ১৭১৫ (সাওবান থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রসুল ইরশাদ করেছেন, 'ঈদুল ফিতরের পর ছয়দিন সিয়াম পালন করে তা পুরো বছরের সিয়াম পালনের ন্যায় হবে')
[6] ইবনে মাজাহ, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪১৭, হাদীসঃ ১৩১৬
[7] আত-তাবারানী, আস-মু'জামুল আওসাত, খ. ৭, পৃ. ১৮৬, হাদীস: ৭২৩০
[8] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ৪৭, পৃ. ২৫১-২৫২, হাদীস: ৫৪৮৪
[9] মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, খ. ২, পৃ. ২৪৮, হাদীস: ৬০৯
[10] ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ. ২. পৃ. ৭২
[11] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ২. পৃ. ৩৮০, হাদীস: ১৭১৪
[12] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ২৩, হাদীস: ৯৮৬
[13] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ২, পৃ. ৪২৪, হাদীস : ৫৩৭
[14] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ খ. ২. পৃ. ২৪, হাদীস: ৯৮৯; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৬০৬, হাদীস: ১৩ (৮৮৪)
[15] আয-যারকাশী, খ. ২. পৃ. ২০১, হাদীস। ১০৪
[16] আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৮১, হাদীস। ১৫৬১
[17] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪১০, হাদীস: ১২৯৩
[18] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৮৪
[19] ইবনে মাজা, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১১২
[20] আদ-দুলাবী, আল-কুনা ওয়াল আসমা, খ. ২, পৃ. ২৩