📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র রওযা পরিদর্শন এবং সেখানে অবস্থানের সময় সম্মান ও সালাম জ্ঞাপন

📄 নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র রওযা পরিদর্শন এবং সেখানে অবস্থানের সময় সম্মান ও সালাম জ্ঞাপন


মহানবী কুরাইশী হাশিমী মক্কী মাদানী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম, যিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুলের—তাঁর ওপর ও সকল (অনুসারীর) ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও সালাম রইল—সমাধি পরিদর্শন করা উৎসাহজ্ঞাপিত কাজ ও মুস্তাহাব। এটি মুস্তাহাব কাজসমূহের অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎকৃষ্টতর ইবাদতও বটে। তা ছাড়া যার সামর্থ্য ও সুযোগ আছে তার জন্য এটি ওয়াজিবের পর্যায়ে পড়ে। যেহেতু নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'মান ওয়াজাদা সাআত ওয়াসাল লাম ইয়াফিদ আলাইয়্যি ফাকাদ জাফানি... সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে-ব্যক্তি আমার কাছে এলো না সে আমার ওপর যুলম করলো।'[1]

আর অন্য বর্ণনায় আছে, 'আমার উম্মতের মধ্যে কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমার যিয়ারত না করলে তার কোনো অপরাগতা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হবে না।'[2]

নবী করীম ﷺ থেকে আরও বর্ণিত আছে, 'মান জাআনি ঝাইরান লা ইউহিমমুহু ইল্লা ঝিয়ারতি... যদি কোনো ব্যক্তি কেবল আমার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওযায় আগমন করে তবে কিয়ামত-দিবসে তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করা আমার কর্তব্য হয়ে যায়।'[3]

হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেন, 'মান ঝারা ক্বাবরি ওয়াজাবাত লাহু শাফাআতি... যে-ব্যক্তি আমার রওযা যিয়ারত করবে তার জন্য সুপারিশ করা আমার ওপর আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।'[4]

নবী করীম ﷺ থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, 'যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার যিয়ারত করল সে যেন জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাত করল।'[5]

যখন কেউ পবিত্র মদীনার উদ্দেশ্যে বের হবে সফরের পুরো সময় তার উচিৎ নবী করীম ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা। কেননা এই সফরের পথে ফরযসমূহের পর এরচেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই। যিয়ারতকারী যখন মদীনার গাছপালা ও তার হারাম দৃষ্টিগোচর হয়; তখন নবী করীম ﷺ-এর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পেশ করবে। আর মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যেন, তাঁর যিয়ারত কল্যাণকর হয় এবং এর মাধ্যমে ইহকাল ও পরকাল সৌভাগ্যময় হয়। আর মুখে এই দুআটি পড়বে: 'اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا حَرَمُ رَسُوْلِكَ... হে আল্লাহ! এটি আপনার রাসুলের হারাম। অতএব এই জায়গাটাকে তুমি আমার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার এবং আযাব ও কঠিন হিসাব থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানাও।'

পবিত্র মদীনায় প্রবেশের সময় গোসল করা, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা, সুগন্ধি লাগানো এবং সাধ্যমতো সাদকা করা মুস্তাহাব। এরপর এই দুআটি পড়তে পড়তে মদীনায় প্রবেশ করবে: 'بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ... আল্লাহর নামে এবং হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মিল্লাতভুক্ত হয়ে...। হে পালনকর্তা! আমাকে প্রবেশ করান সত্যরূপে এবং আমাকে বের করান সত্যরূপে এবং দান করুন আমাকে নিজের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য।'[6]

অতঃপর মসজিদে (নববীর) গেইটে পৌঁছে প্রবেশকালে ডান পা আগে রেখে এই দুআটি পড়বে, 'اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي... হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার জন্যে তোমার দয়া ও করুণার দরোজাগুলো উন্মুক্ত করে দাও।'[7]

পবিত্র রওযা শরীফের প্রতি অভিমুখী হবে। আর রওযা নবী করীম ﷺ-এর সমাধি ও মসজিদের মিম্বরের মধ্যখানে অবস্থিত। এটি জান্নাতের পুষ্পোদ্যানসমূহের মধ্যে একটি পুষ্পোদ্যান। অতঃপর সম্ভব হলে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুসাল্লায় তাহিয়্যাতুল মসজিদের সালাত আদায় করবে যদি তা সম্ভব না হয় তবে রওযা বা মসজিদে নববির অন্যত্র এ-নামাযটি পড়ে নেবে। তারপর এই পুণ্যময় স্থানে পৌঁছার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে সাজদা করবে। যিয়ারতকারীর উচিৎ রওযার জালি ঘেঁষে দাঁড়াবে না, বরং চার-পাঁচ হাত তফাতে দাঁড়াবে।

অতঃপর হযরত রাসূলে আকরাম, হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে ও নিম্নস্বরে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করে এভাবে সালাম জানাবে: 'اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا سَيِّدَ الْمُرْسَلِيْنَ... তোমাকে সালাম জানাই হে রাসূলগণের শিরোমণি। তোমাকে সালাম জানাই হে সর্বশেষ রাসূল। তোমাকে সালাম জানাই হে জ্যোতির্ময়-সুন্দরতম মানুষের নেতা। তোমাকে সালাম জানাই হে সৃষ্টিজগতের করুণার আধার। তোমার পরিবার-পরিজন, সহধর্মিণী ও সাহাবা-সহচরদেরও সালাম জানাই। তোমার ওপর শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল হোক।'

এরপর এ-দুআটি করবে যে, 'اللَّهُمَّ قَدْ সয়মিন্না ক্বাওলাকা... হে আল্লাহ আমরা আপনার ফরমান শুনেছি। আপনার হুকুম বাস্তবায়ন করেছি। আপনার নবীর দরবারে হাযির হয়েছি যিনি আপনার দরবারে আমাদের পাপগুলো ক্ষমার জন্য সুপারিশ করবেন। রহমতে আলমের যিয়ারতের উসিলায় আমাদের ভাগ্যবানদের তালিকাভুক্ত করুন। হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! নিজেদের ওপর অপরিসীম-যুলুম করার পর আমরা আপনার দরবারে হাযির হয়েছি। পাপাচার ও অপরাধজনিত কারণে নিজেদের ওপর যুলুম করে আপনার কোনো উম্মত যদি আপনার দরবারে হাযির হয়, আপনি তার জন্য সুপারিশ করে থাকেন। আমার জন্য আপনি দয়া করে গুনাহ মার্জনার সুপারিশ করুন।'

হজ্জ বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে কবিদের বহু কবিতা সংকলিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। তা থেকে নিম্নের কবিতাসমূহ পড়বে:

কবিতা:
সমতলভূমিতে যত মানবসন্তানকে দাফন করা হয়েছে তুমি তাদের শ্রেষ্ঠতম।
সমগ্র ভূগর্ভ তোমার কারণে সুরভিত হয়েছে।
তোমার রওযার তরে আমার জীবন উৎসর্গিত হোক, ওহে প্রিয়তম!
যেখানে পবিত্রতা, মহানুভবতা ও অনুগ্রহ পাশাপাশি বাস করে।
তুমি সেই মহান রাসূল, যার সুপারিশই সেদিন পুলসিরাতের কঠিন সেতু পারাপারে
কম্পনরত বিপন্ন মানুষের একমাত্র ভরসা।[8]

অতঃপর নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য এবং প্রিয়বন্ধু-বান্ধবের জন্য দুআ কামনা করবে। নবী করীম ﷺ-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে দুআ কামনা মুস্তাহাব।

টিকাঃ
[1] (ক) আল-গাযালী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৫৮; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৪
[2] ইবনুন নাজ্জার, আদ-দিব্ৰাতুস সমীনা, পৃ. ১৫৫
[3] (ক) আত-তাবারানী, খ. ১২, পৃ. ২৯১, হাদীস: ১৩১৪; (খ) আল-গাযালী, খ. ১, পৃ. ২৫৮
[4] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪, হাদীস: ২৬৫৯
[5] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ৩৩৩-৩৩৪, হাদীস: ২৬৯৪
[6] (ক) আল-গাযালী, খ. ১, পৃ. ২৫৮-২৫৯; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, খ. ২, পৃ. ১৭৪
[7] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ২৫৩, হাদীস: ৭৭২; হযরত ফাতিমা থেকে বর্ণিত
[8] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px