📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 নবী করীম (সাঃ)-এর দাফনের সময়ের আলোচনা

📄 নবী করীম (সাঃ)-এর দাফনের সময়ের আলোচনা


নবী করীম ﷺ-এর দাফন নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে।

রওয়ায় বর্ণিত হয়েছে হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দাফন বিষয়ে আমাদের কিছুই জানাই ছিলো না। পরিশেষে মঙ্গলবার ভোরে খুন্তি দিয়ে মাটি খোঁড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম।[1]

আর আল-মুওয়াত্তা গ্রন্থে এসেছে, ইমাম মালিক (ইবনে আনাস) জানতে পেরেছেন যে, নবী করীম ﷺ ইন্তিকাল করেছেন সোমবারে, আর তাঁকে দাফন করা হয়েছে মঙ্গলবারে।[2]

ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনা মতে, যে-মাটিতে তিনি ইন্তিকাল করেন সেই মাটিতে তাঁকে রাতে দাফন করা হয়।[3]

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ সোমবার বিদায় নেন, সেদিন ও মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি ওই অবস্থায় ছিলেন। এর পরের রাত অর্থাৎ বুধবার তাঁকে দাফন করা হয়।[4]

কেউ কেউ বলেছেন, মঙ্গলবারে সূর্যাস্তের পর তাঁকে দাফন করা হয়। ইমাম আশ-শাআবী-এর কিফায়া গ্রন্থে আছে, মঙ্গলবার তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর নামাযে জানাযা আদায় করেন এবং এরপর তাঁকে দাফন করা হয়।[5]

যদি আপনি জানতে চান, নবী করীম ﷺ-এর দাফনে বিলম্ব করা হলো কেন? অথচ নবী করীম ﷺ তাঁর পরিবার যাঁরা তাঁদের কোন মৃতব্যক্তি দাফনে বিলম্ব করছিলেন তাঁদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা তোমাদের মৃতদেহ দ্রুত দাফন কর, বিলম্ব করো না।

এর জবাব হচ্ছে, উল্লিখিত হয়েছে যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকাল নিয়ে সাহাবাগণের ঐক্যমতে না পৌছুতে পারা এবং তাঁর দাফনের স্থান নিয়ে তাঁদের মতপার্থক্য এর অন্যতম কারণ। অথবা খিলাফতের নেতা মনোনয়ন নিয়ে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যকার মতভেদ নিরসনে তাঁরা প্রয়াসী ছিলেন। যা ইসলামের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতঃপর তাঁরা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর হাতে বায়আত নেন। এরপর সবাই সমবেতভাবে দ্বিতীয়বার বায়আত নেন। এরপর তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর দিকে মনোযোগ দেন এবং তাঁর দাফনের কাজে লেগে যান। পর্যায়ক্রমে তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর গোসল, কাফন ও দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন। আল্লাহ সর্বাধিক পরিজ্ঞাত।[6]

ইমাম আদ-দারিমী-এর বর্ণনায় এসেছে হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের (মদীনায়) আগমন করেন সেদিনটির চেয়ে সুন্দর ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিন দ্বিতীয়টি আমি দেখিনি। আর যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ছেড়ে বিদায় নেন সেই দিনটার মতো গুমোট ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন দিন দ্বিতীয়টা আমি দেখিনি।[7]

ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনাতে আগমন করেন সবকিছু ছিলো ঝলমলে। আর যেদিন তিনি প্রভুর ডাকে সাড়া দেন সেদিন সবকিছুই ছিল শোকাচ্ছন্ন। আমরা দাফনের কাজ সম্পন্ন করে হাতের মাটি এখনো ঝেড়ে নেইনি, ইত্যবসরে আমাদের মানসিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠে।[8]

টিকাঃ
[1] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৬৫, হাদীস: ২৪১৯
[2] মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ১, পৃ. ৩৮৩, হাদীস: ১৭২
[3] আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২
[4] (ক) আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২; (খ) আত-তিরমিযী, আশ-শামায়িল, পৃ. ৩৫, হাদীস: ৩৯৫
[5] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৬৫, হাদীস: ২৪২১ ও ২৪২২; (খ) আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২
[6] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৮৫-৫৮৬
[7] আদ-দারিমী, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ২২৩, হাদীস: ৮৯
[8] আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৫৮৮-৫৮৯, হাদীস: ৩৬১৮

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 নবী করীম (সাঃ)-এর ওপর শোকগাঁথা ও মরসিয়া বিষয়ে আলোচনা

📄 নবী করীম (সাঃ)-এর ওপর শোকগাঁথা ও মরসিয়া বিষয়ে আলোচনা


আর যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন হয়, হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এসে বললেন, "তোমাদের মন কীভাবে সায় দিলো হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে?"[1]

যখন সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন, তখন হযরত ফাতিমা এসে বললেন, "হে হাসানের পিতা! আপনারা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দাফন করেছেন?" তিনি জবাব দিলেন, "হ্যাঁ।" হযরত ফাতিমা বললেন, "হে হাসানের পিতা! তোমাদের মন কীভাবে সায় দিলো যে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে? তিনি কি রহমতের নবী নন?" তিনি (হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "হ্যাঁ, (নিশ্চয় নবী করীম ﷺ শান্তির দূত)। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হুকুম কেউ এতটুকু হেরফের করতে পারে না।" একথায় হযরত ফাতিমা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলতে লাগলেন, "হায় পিতা! হায় হযরত রাসূলুল্লাহ! হায় রহমতের নবী! এখন থেকে আর ওহী আসবে না, এখন থেকে হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম-এর আসাও বন্ধ হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে নবী করীম ﷺ-এর আত্মার সাথে মিলিয়ে দিন। তাঁর দর্শনের মাধ্যমে আমার চক্ষু শীতল করুন। কিয়ামতের দিন তাঁর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত করো না।"[2]

হযরত ফাতিমা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র (রওযার) মাটি থেকে কিছু মাটি উঠিয়ে চোখে-মুখে মাখলেন, কবিতা আবৃত্তি করলেন:

কবিতা:
যে নিয়েছে মাটির সুগন্ধি হাবীবে খোদার রওযা মোবারকের।
প্রয়োজন হয় না, তার মিশক কিংবা অন্য কোন সুঘ্রাণের।

আমার ওপর রয়েছে যে, কঠিন বিপদের ঘনঘটা
বৈত যদি দিনের ওপর হয়ে যেত আঁধার রূপান্তর।[3]

আর হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন নবী করীম ﷺ-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এ-অবস্থায় হযরত ফাতিমা বললেন, "উহ! আমার পিতার ওপর কত কষ্ট!" তখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'লাইসা আলা আবিকা কারবুন বা'দাল ইয়াওম... আজকের পরে তোমার পিতার ওপর আর কোনো কষ্ট নেই।' অতঃপর যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন হযরত ফাতিমা বললেন, "হায় আমার পিতা! প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাওস তাঁর ঠিকানা। হায় পিতা! হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম-কে তাঁর ইন্তিকালের খবর পরিবেশন করছি।" যখন নবী করীম ﷺ-কে সমাহিত করা হলো, তখন হযরত ফাতিমা বললেন, "হে আনস! হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে তোমাদের মন কীভাবে সায় দিল?" হাদীসটি এককভাবে ইমাম আল-বুখারী-ই বর্ণনা করেছেন।[4]

ইমাম আত-তাবরানী অতিরিক্ত এটুকু বর্ণনা করেছেন: "হায় পিতা! আপনার প্রভুর কেমন নৈকট্যই না আপনি লাভ করেছেন।"[5]

নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের অব্যবহিত পর হযরত ফাতিমা মাত্র ৬ মাস বেঁচে ছিলেন। তাঁকে দাফন করা হয়েছে রাতে। এ-সময়ের মধ্যে তিনি কখনো হাসেননি। বস্তুত না হাসাই তাঁর জন্য স্বাভাবিক ছিল।[6]

আর হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি নবী করীম ﷺ-এর জন্য শোকপ্রকাশ করে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন:

কবিতা:
হে সেই নবী! যিনি কখনো পেটভরে তৃপ্ত হয়ে রুটিও খেতে পারেননি।
হে সেই নবী! যিনি পালঙ্কের পরিবর্তে সাদামাটা চাটাইয়ের বিছানা বেছে নিয়েছিলেন।
হে সেই নবী! যিনি জাহান্নামের মালিকের শাস্তির ভয়ে কখনো রাতে ঘুমাননি।[7]

আর হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তাঁর রওযায় হযরত আবু বকর প্রবেশ করলেন। অতঃপর নবী করীম ﷺ-এর দু'চোখের বরাবর মুখোমুখী হন এবং নবী করীম ﷺ-এর কানপট্টির উপরিভাগে হাত রেখে বললেন, "হায় নবী! হায় বন্ধু! হায় প্রিয়বন্ধু!"[8]

হযরত আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর বক্তব্যে যখন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের বিষয়ে নিশ্চিত হন তখন তিনি তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করে নেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার ওপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আপনি খেঁজুরের একটি ডালে ভর দিয়ে খুতবা দান করতেন। যখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন আপনি একটি মিম্বর তৈরি নিয়েছিলেন, লোকজনকে আপনার বক্তব্য শোনানোর উদ্দেশ্যে। এরপর সেই খেজুর শাখাটি আপনার বিরহে ক্রন্দন করেছিল। পরে নবী করীম ﷺ খেজুর শাখাটির ওপর আপনার হাত বুলিয়ে দিলেন শাখাটির কান্না থামে। এ-দৃষ্টিতে আপনার বিদায়ের জন্য আপনার উম্মত অঝোর ধারায় কান্নার বেশি হকদার।

হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার ওপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; আপনার অনুসরণকে তিনি তাঁর অনুসরণ বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, 'যে রাসুলের অনুসরণ করবে সে যেন আল্লাহকে অনুসরণ করল।'[9]

হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; আপনাকে তিনি শেষনবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন আর আপনার আলোচনা করেছেন সবার আগে। মহান আল্লাহ বলেন, '(হে রাসূল! সে সময়ের কথা স্মরণ করুন), যখন আমি নবীদের কাছ থেকে; আপনি ও নুহের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছি।'[10]

হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; জাহান্নামবাসীগণ আযাব ভোগ করা অবস্থায় পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষা করবে, হায় যদি তারা আপনার অনুসারী হতো! তারা বলবে, 'হায়! আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করতাম!'"[11]

কোনো মদীনাবাসী কষ্টে পতিত হলে অন্যজন তাঁর সাথে হাত মিলিয়ে বলতো, "হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর, কেননা আল্লাহর রাসুলের অনুসরণের ফলেই অনুপম চরিত্রের রূপ প্রতিফলিত হয়।"[12]

কোন কবি চমৎকার বলেছেন:

কবিতা:
প্রত্যেক বিপদে ধৈর্য ধরো এবং দৃঢ়বিশ্বাস রাখো!
আর জেনে রেখ, কোনো মানুষ চিরস্থায়ী নয়।
বড়দের মতো তুমিও সহ্য করো।
কেননা বিপদ একটা যন্ত্রণা যা আজ আছে, কাল থাকবে না।
তুমিও যখন কোনো বিপদে পতিত হয়ে চিন্তিত হও,
তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর কষ্টের কথা ভেবে
নিজের বিপদে ধৈর্যধারণের সাহস সঞ্চয় কর।[13]

বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের পর হযরত বিলাল আযান দিতেন; যখন একপর্যায়ে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলতেন তখন কাঁদাকাটি ও পরিবেদনায় পুরো মসজিদ উদ্বেলিত হয়ে ওঠতো। এজন্য নবী করীম ﷺ-এর ওফাতের পর তিনি আযান দেওয়া ছেড়ে দেন।[14]

কবিতা:
যদি রাযওয়া পাহাড়ও এই বিরহের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারতো
তবে সে বিপর্যস্ত হয়ে যেতো,
শোকসন্তাপের বাঁধভাঙা আবেগের তোড়ে আমি ভাসছি
যা ইস্পাতের ক্ষেত্রে হলেও সে গলে যেতো।[15]

নবী করীম ﷺ-এর ফুফী সাফিয়াও বহু শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন। এর মধ্যে তাঁর কয়েকটি গীতি হচ্ছে:

কবিতা:
হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
আপনি আমাদের পরম হিতৈষী। আপনি কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করেন না।
আপনি দয়ালু, পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক।
তাই আজ সকলেই আপনার বিরহে মূহ্যমান।
আপনার জীবনের শপথ! নবী করীম ﷺ-এর বিরহে আমি কাঁদছি তা নয়।
আমি তো ভবিষ্যতে তাঁর শূন্যতার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন।
মুহাম্মদের স্মরণে আমার অন্তর পরিপূর্ণ।
আমি নবী করীম ﷺ-এর অবর্তমানে (জাতির) বিভ্রান্তি নিয়ে আশঙ্কা করছি।
আপনার ওপর আল্লাহর তরফ থেকে শান্তি ও শুভেচ্ছা রইল।
আপনি আদনের (জান্নাতের) পুষ্পোদ্যানে সন্তুষ্টচিত্তে বিচরণ করবেন।[16]

নবী করীম ﷺ-এর চাচাতো ভাই হযরত আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন।[17]
হযরত আবু বকর সিদ্দীকও শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন:

কবিতা:
আমি যখন আমাদের প্রিয়নবীকে নিথর-অসাড় দেখি
তখন প্রশস্ততা সত্ত্বেও পুরো ঘরটি আমার কাছে অত্যন্ত সংকুচিত-সংকীর্ণ মনে হয়।
সেসময় আমার মন যেন তখন মৃত্যু কামনা করছিল।
আমার হাড়গুলো যেন গুড়িয়ে যাচ্ছিলো।
ওহে আতিক (হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ)! আমার খুবই দুঃখ হচ্ছে, তোমার বন্ধু চলে গেছেন।
এখন সারা জীবন কি ধৈর্যধারণ তোমার পক্ষে সহজ হবে?[18]

হযরত হাসসান বলেন, কবিতা:
কুনতাস সাওয়াদা লিনাযিরি... ওহে প্রিয়তম তুমি আমার চোখের জ্যোতি ছিলে। তোমার সৌন্দর্য দর্শন থেকে বঞ্চিত আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। তোমার পর পৃথিবীর যে কেউ মৃত্যুবরণ করুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি তো কেবল তোমার মৃত্যুর উৎকণ্ঠায় ভীত বিহ্বল ছিলাম।[19]

টিকাঃ
[1] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১৫, হাদীস: ৪৪৬২
[2] (ক) আত-তাবারানী, আল-মুজামুল আওসাত, খ. ৩. পৃ. ৬৪, হাদীস: ২৬৭৬; (খ) আবু নুআইম আল-আসবাহানী, হিলরাতুল আওলিয়া, খ. ৪, পৃ. ৭৩
[3] (ক) ইবনে নাসিরুদ্দীন আদ-দামিশকী, সালওয়াতুল কারীব, পৃ. ১৬২; (খ) আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলল হুদা ওয়ার রাশাদ, খ. ১২, পৃ. ৩৩৭; (গ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৩
[4] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১৫, হাদীস: ৪৪৬২
[5] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ২২, পৃ. ৪১৫-৪১৬, হাদীস: ১০২৮ ও ১০২৯
[6] (ক) ইবনে কসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ৬, পৃ. ৩৬৭; (খ) আল-কাস্স্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭১
[7] (ক) আস-সাফুরী, নুষহাতুল মাজালিস, খ. ২, পৃ. ১৩০; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৩
[8] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪০, পৃ. ৩২, হাদীস: ২৪০২৯
[9] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা ৪:৮০
[10] আল-কুরআন, সুরা আল-আহযাব ৩৩:৭
[11] আল-কুরআন, সুরা আল-আহযাব ৩৩:৬৬
[12] (ক) আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২; (খ) মোল্লা আলী আল-কারী, জমউল ওরাসারিল শরহুশ শামায়িল, খ. ২, পৃ. ২২৩
[13] আল-কাস্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২
[14] আল-কাস্স্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২
[15] কাযী আয়ায, মাশারিকুল আনওয়ার, খ. ১, পৃ. ৫৯; رضوى (রাযওয়া); হচ্ছে মক্কা ও মদিনা শরীফের মধ্যস্থিত একটি পাহাড়।
[16] (ক) ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৮২, হাদীস: ২৪৮৯; (খ) আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩. পৃ. ৫৭৩
[17] আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৫৯৮
[18] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৭৮, হাদীস: ২৪৭৯
[19] (ক) ইবনে কসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ৩৭৯; (খ) আল-কাস্স্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩. পৃ. ৫৭৪

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 নবী করীম (সাঃ)-এর উত্তরাধিকার ও এর বিধান বিষয়ে আলোচনা

📄 নবী করীম (সাঃ)-এর উত্তরাধিকার ও এর বিধান বিষয়ে আলোচনা


নবী করীম ﷺ দিনার-দিরহাম (অর্থ-কড়ি), দাস-ধন কিছুই উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাননি। তবে নিজের একটি সাদা খচ্চর, কিছু যুদ্ধাস্ত্র এবং কিছু জমিজমা ছিল যা তাঁর জীবদ্দশায় তিনি সাদকা করে দিয়েছিলেন।

খুলাসাতুস সিয়ার গ্রন্থে আছে, ওয়াফাতের দিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ দুটো ইয়েমেনি চাদর, একটি উম্মানি লুঙ্গি, দুটো সাহারি কাপড়; এর একটি সাহারি জামা অন্যটি সাহুলী, একটি ইয়েমেনি জুব্বা; যার চৌকোণ ছিলো কারুকাজ- বিশিষ্ট এবং কাপড় ছিলো সাদা চাদর এবং তিন-চারটি ছোট ছোট টুপি ইত্যাদি উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া লুঙ্গি ছিলো আড়াই হাত লম্বা এবং চাদরগুলো ছিলো পুরোনো।[1]

আর হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, 'নাহনু মাআাশির আল-আম্বিয়া; লা নুরাছু, আম্মা তারাকনাহু সদকাহ... আমরা নবীর পরিবার; আমাদের কোনো উত্তরাধিকারী নেই, আমরা যা ছেড়ে যাই তা সবই সাদকা।'[2]

নবী করীম ﷺ আরও ইরশাদ করেন, 'আমার উত্তরাধিকারে ভাগ-বণ্টন হবে না। আমরা যা ছেড়ে যাই তা থেকে আমার সহধর্মিনী ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ নির্বাহের পর অবশিষ্ট সম্পদ সাদকা।'[3]

হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মেয়ে হযরত ফাতিমা হযরত আবু বকর সমীপে হাযির হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ওয়ারিস কারা? হযরত আবু বকর জবাব দিলেন, আমার সন্তান-সন্ততি ও পরিবার। অতঃপর তিনি (হযরত ফাতিমা) বললেন, তাহলে আমি কেন আমার পিতার উত্তরাধিকার পাবো না? হযরত আবু বকর বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে একথা বলতে শুনেছি, 'আমাদের কোনো উত্তরাধিকার নেই।' অবশ্য হযরত রাসূলুল্লাহ যাঁদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করেছেন আমিও তাঁদের ভরণ- পোষণের দায়িত্ব পালন করবো। হযরত রাসূলুল্লাহ যাঁদের জন্য খরচ করতেন আমিও তাঁদের জন্য খরচ করবো।[4]

হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, আমি হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর খায়বার ও ফাদাক এবং মদীনার সাদকা থেকে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ত্যাজ্য সম্পত্তি উত্তরাধিকার স্বত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তখন হযরত আবু বকর বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'আমাদের (নবীগণ)-এর কোনো উত্তরাধীকারী হয় না, আমরা যা রেখে যাবো তা সাদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।' একথা বলে হযরত আবু বকর হযরত ফাতিমা-কে এ-সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করতে অস্বীকার করলেন। এতে হযরত ফাতিমা (মানবোচিত কারণে) হযরত আবু বকর-এর ওপর নারাজ হয়ে গেলেন এবং তাঁর থেকে নিস্পৃহ হয়ে রইলেন। পরে তাঁর ওফাত পর্যন্ত (মানসিক সংকোচের দরুন) হযরত আবু বকর-কে এড়িয়ে চলেন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করলে তাঁর স্বামী হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রাতের বেলা তাঁর দাফনকার্য শেষ করে নেন। হযরত আবু বকর-কেও এ-সংবাদ দেননি এবং হযরত আলী নিজেই জানাযার নামায আদায় করেন নেন। হযরত ফাতিমা জীবিত থাকা পর্যন্ত লোকজনের মনে হযরত আলী-এর বেশ সম্মান ও প্রভাব ছিলো। এরপর যখন ফাতিমা ইন্তিকাল করলেন, তখন হযরত আলী লোকজনের চেহারায় অসন্তুষ্টির চিহ্ন দেখতে পেলেন। (হযরত ফাতিমা-এর অসুস্থতা ও অন্যান্য) ব্যস্ততার দরুন এ-ছয় মাসে তাঁর পক্ষে বায়আত গ্রহণের অবসর হয়নি। অতঃপর হযরত আবু বকর-এর হাতে তিনি বায়আত নেন। দু'বিশুদ্ধ গ্রন্থে (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম) এভাবে বর্ণিত আছে।[5]

আর ইমাম আল-বায়হাকী বর্ণনা করেন হযরত আশ-শা'বী থেকে বর্ণিত, অসুস্থতার সময় একবার হযরত আবু বকর হযরত ফাতিমা-এর খোঁজ নিতে আসেন। তখন হযরত আলী বললেন, ইনি হযরত আবু বকর, তিনি ভেতরে আসতে অনুমতি চান। হযরত ফাতিমা বললেন, তাঁকে অনুমতি দেওয়া কি তুমি পছন্দ করবে? তিনি (হযরত আলী) বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর হযরত ফাতিমা তাঁকে (ভেতরে আসার) অনুমতি দেন। তারপর হযরত আবু বকর ভেতরে প্রবেশ করে হযরত ফাতিমা-কে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হন এবং তাঁর বক্তব্যে হযরত ফাতিমা সত্যিসত্যি সন্তুষ্ট হয়ে যান।[6]

ইমাম মুহিব্বুত তাবারী-এর রিয়াযুন নাফ্রা গ্রন্থে এসেছে, হযরত আবু বকর হযরত ফাতিমা-এর ঘরে প্রবেশ করে হযরত ফাতিমা-কে নিজের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন এবং আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে হযরত ফাতিমা বিষয়টি সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন।[7]

হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর খিলাফতকালে একবার হযরত আলী ও হযরত আব্বাস-এর মাঝে নবী করীম ﷺ-এর উত্তরাধিকার স্বত্ব নিয়ে মতদ্বন্দ্ব হয়। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) তালহা, হযরত যুবাইর, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ ও হযরত সাআদ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি আপনাদেরকে আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি যে, আপনারা কি হযরত রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছেন যে, 'আমি যা ভোগ করে যাচ্ছি তা ব্যতীত সবই সম্পদই সাদকা। কেননা আমাদের (নবীগণ)-এর কোনো উত্তরাধিকারী হন না।' তাঁরা বললেন, হে আল্লাহ! অবশ্যই।[8]

টিকাঃ
[1] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, খুলাসাতু সিয়ারি সাইয়্যিদিল বশর, পৃ. ১৭৬
[2] আন-নাসায়ী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৬, পৃ. ৯৮, হাদীস: ৬৩৭৫; হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণিত
[3] (ক) আল-বুখারী, খ. ৪, পৃ. ১২, হাদীস: ২৭৭৬; (খ) মুসলিম, খ. ৩. পৃ. ১৩৮২, হাদীস: ৫৫ (১৭৬০)
[4] আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১৫৭, হাদীস: ১৬০৮
[5] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ১৩৯-১৪০, হাদীস: ৪২৪০; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ খ. ৩, পৃ. ১৩৮০, হাদীস: ৫২ (১৭৫৯)
[6] (ক) আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৬, পৃ. ৪৯১, হাদীস: ১২৭৩৫; (খ) আল-বায়হাকী, দালাইলুন নুবuওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৮১, হাদীস: ৩২৭৭
[7] মুহিবুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়ায়ুন নাযূরা, খ. ১, পৃ. ১৭৬
[8] (ক) আত-তিরমিযী, আশ-শামারিল, পৃ. ৩৪২, হাদীস: ৪০২; (খ) আদ-দিয়ার বরুরী, প্রাগুক্ত

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র রওযা পরিদর্শন এবং সেখানে অবস্থানের সময় সম্মান ও সালাম জ্ঞাপন

📄 নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র রওযা পরিদর্শন এবং সেখানে অবস্থানের সময় সম্মান ও সালাম জ্ঞাপন


মহানবী কুরাইশী হাশিমী মক্কী মাদানী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম, যিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুলের—তাঁর ওপর ও সকল (অনুসারীর) ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও সালাম রইল—সমাধি পরিদর্শন করা উৎসাহজ্ঞাপিত কাজ ও মুস্তাহাব। এটি মুস্তাহাব কাজসমূহের অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎকৃষ্টতর ইবাদতও বটে। তা ছাড়া যার সামর্থ্য ও সুযোগ আছে তার জন্য এটি ওয়াজিবের পর্যায়ে পড়ে। যেহেতু নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'মান ওয়াজাদা সাআত ওয়াসাল লাম ইয়াফিদ আলাইয়্যি ফাকাদ জাফানি... সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে-ব্যক্তি আমার কাছে এলো না সে আমার ওপর যুলম করলো।'[1]

আর অন্য বর্ণনায় আছে, 'আমার উম্মতের মধ্যে কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমার যিয়ারত না করলে তার কোনো অপরাগতা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হবে না।'[2]

নবী করীম ﷺ থেকে আরও বর্ণিত আছে, 'মান জাআনি ঝাইরান লা ইউহিমমুহু ইল্লা ঝিয়ারতি... যদি কোনো ব্যক্তি কেবল আমার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওযায় আগমন করে তবে কিয়ামত-দিবসে তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করা আমার কর্তব্য হয়ে যায়।'[3]

হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেন, 'মান ঝারা ক্বাবরি ওয়াজাবাত লাহু শাফাআতি... যে-ব্যক্তি আমার রওযা যিয়ারত করবে তার জন্য সুপারিশ করা আমার ওপর আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।'[4]

নবী করীম ﷺ থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, 'যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার যিয়ারত করল সে যেন জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাত করল।'[5]

যখন কেউ পবিত্র মদীনার উদ্দেশ্যে বের হবে সফরের পুরো সময় তার উচিৎ নবী করীম ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা। কেননা এই সফরের পথে ফরযসমূহের পর এরচেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই। যিয়ারতকারী যখন মদীনার গাছপালা ও তার হারাম দৃষ্টিগোচর হয়; তখন নবী করীম ﷺ-এর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পেশ করবে। আর মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যেন, তাঁর যিয়ারত কল্যাণকর হয় এবং এর মাধ্যমে ইহকাল ও পরকাল সৌভাগ্যময় হয়। আর মুখে এই দুআটি পড়বে: 'اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا حَرَمُ رَسُوْلِكَ... হে আল্লাহ! এটি আপনার রাসুলের হারাম। অতএব এই জায়গাটাকে তুমি আমার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার এবং আযাব ও কঠিন হিসাব থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানাও।'

পবিত্র মদীনায় প্রবেশের সময় গোসল করা, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা, সুগন্ধি লাগানো এবং সাধ্যমতো সাদকা করা মুস্তাহাব। এরপর এই দুআটি পড়তে পড়তে মদীনায় প্রবেশ করবে: 'بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ... আল্লাহর নামে এবং হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মিল্লাতভুক্ত হয়ে...। হে পালনকর্তা! আমাকে প্রবেশ করান সত্যরূপে এবং আমাকে বের করান সত্যরূপে এবং দান করুন আমাকে নিজের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য।'[6]

অতঃপর মসজিদে (নববীর) গেইটে পৌঁছে প্রবেশকালে ডান পা আগে রেখে এই দুআটি পড়বে, 'اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي... হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার জন্যে তোমার দয়া ও করুণার দরোজাগুলো উন্মুক্ত করে দাও।'[7]

পবিত্র রওযা শরীফের প্রতি অভিমুখী হবে। আর রওযা নবী করীম ﷺ-এর সমাধি ও মসজিদের মিম্বরের মধ্যখানে অবস্থিত। এটি জান্নাতের পুষ্পোদ্যানসমূহের মধ্যে একটি পুষ্পোদ্যান। অতঃপর সম্ভব হলে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুসাল্লায় তাহিয়্যাতুল মসজিদের সালাত আদায় করবে যদি তা সম্ভব না হয় তবে রওযা বা মসজিদে নববির অন্যত্র এ-নামাযটি পড়ে নেবে। তারপর এই পুণ্যময় স্থানে পৌঁছার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে সাজদা করবে। যিয়ারতকারীর উচিৎ রওযার জালি ঘেঁষে দাঁড়াবে না, বরং চার-পাঁচ হাত তফাতে দাঁড়াবে।

অতঃপর হযরত রাসূলে আকরাম, হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে ও নিম্নস্বরে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করে এভাবে সালাম জানাবে: 'اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا سَيِّدَ الْمُرْسَلِيْنَ... তোমাকে সালাম জানাই হে রাসূলগণের শিরোমণি। তোমাকে সালাম জানাই হে সর্বশেষ রাসূল। তোমাকে সালাম জানাই হে জ্যোতির্ময়-সুন্দরতম মানুষের নেতা। তোমাকে সালাম জানাই হে সৃষ্টিজগতের করুণার আধার। তোমার পরিবার-পরিজন, সহধর্মিণী ও সাহাবা-সহচরদেরও সালাম জানাই। তোমার ওপর শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল হোক।'

এরপর এ-দুআটি করবে যে, 'اللَّهُمَّ قَدْ সয়মিন্না ক্বাওলাকা... হে আল্লাহ আমরা আপনার ফরমান শুনেছি। আপনার হুকুম বাস্তবায়ন করেছি। আপনার নবীর দরবারে হাযির হয়েছি যিনি আপনার দরবারে আমাদের পাপগুলো ক্ষমার জন্য সুপারিশ করবেন। রহমতে আলমের যিয়ারতের উসিলায় আমাদের ভাগ্যবানদের তালিকাভুক্ত করুন। হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! নিজেদের ওপর অপরিসীম-যুলুম করার পর আমরা আপনার দরবারে হাযির হয়েছি। পাপাচার ও অপরাধজনিত কারণে নিজেদের ওপর যুলুম করে আপনার কোনো উম্মত যদি আপনার দরবারে হাযির হয়, আপনি তার জন্য সুপারিশ করে থাকেন। আমার জন্য আপনি দয়া করে গুনাহ মার্জনার সুপারিশ করুন।'

হজ্জ বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে কবিদের বহু কবিতা সংকলিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। তা থেকে নিম্নের কবিতাসমূহ পড়বে:

কবিতা:
সমতলভূমিতে যত মানবসন্তানকে দাফন করা হয়েছে তুমি তাদের শ্রেষ্ঠতম।
সমগ্র ভূগর্ভ তোমার কারণে সুরভিত হয়েছে।
তোমার রওযার তরে আমার জীবন উৎসর্গিত হোক, ওহে প্রিয়তম!
যেখানে পবিত্রতা, মহানুভবতা ও অনুগ্রহ পাশাপাশি বাস করে।
তুমি সেই মহান রাসূল, যার সুপারিশই সেদিন পুলসিরাতের কঠিন সেতু পারাপারে
কম্পনরত বিপন্ন মানুষের একমাত্র ভরসা।[8]

অতঃপর নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য এবং প্রিয়বন্ধু-বান্ধবের জন্য দুআ কামনা করবে। নবী করীম ﷺ-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে দুআ কামনা মুস্তাহাব।

টিকাঃ
[1] (ক) আল-গাযালী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৫৮; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৪
[2] ইবনুন নাজ্জার, আদ-দিব্ৰাতুস সমীনা, পৃ. ১৫৫
[3] (ক) আত-তাবারানী, খ. ১২, পৃ. ২৯১, হাদীস: ১৩১৪; (খ) আল-গাযালী, খ. ১, পৃ. ২৫৮
[4] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ৩৩৪, হাদীস: ২৬৫৯
[5] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ৩৩৩-৩৩৪, হাদীস: ২৬৯৪
[6] (ক) আল-গাযালী, খ. ১, পৃ. ২৫৮-২৫৯; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, খ. ২, পৃ. ১৭৪
[7] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ২৫৩, হাদীস: ৭৭২; হযরত ফাতিমা থেকে বর্ণিত
[8] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px