📄 নবী করীম (সাঃ)-এর সালাতে জানাযা
হযরত মুহাম্মদ (ইবনে আলী ইবনে হুসাইন) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ-এর নামায ইমাম ছাড়াই পড়া হয়েছে। পৃথক পৃথকভাবে (নবী করীম-এর নামায পড়া হয়েছে); নবী করীম ﷺ-এর নামাযে কোন ইমাম ছিল না। মুসলিমরা জনে জনে (নবী করীম-এর হুজরায়) প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর নামায আদায় করে বেরিয়ে পড়েছেন। যখন সবাই নামায পড়া শেষ করেন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) ডেকে বললেন, জানাযার জন্য আহলে বায়তকে সুযোগ দাও।
হযরত আলী, হযরত আব্বাস ও বনী হাশিমের লোকজন (সর্বপ্রথম) নবী করীম ﷺ-এর জানাযার নামায পড়েন। তারপর মুহাজিরগণ প্রবেশ করেন, এরপর আনসারগণ, এরপর অন্যান্য লোকজন; পৃথক পৃথকভাবে (নবী করীম ﷺ-এর নামায পড়েছেন); তাঁর নামাযে কোন ইমাম ছিল না। অতঃপর মহিলাগণ, এরপর শিশু-কিশোরগণ (জানাযা আদায় করেন)।
মঙ্গবারে যখন সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর গোসলের কাজ শেষ করেন, তখন তাঁকে তাঁর ঘরের ভেতরে তাঁরই খাটের ওপর রাখা হয়। এরপর লোকজন দলে দলে ঘরে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নামাযে জানাযা আদায় করেন। তাঁদের নামায আদায়ের পর মহিলারা প্রবেশ করেন, তাঁদের অব্যবহিত পর শিশু-কিশোরগণ প্রবেশ করেন। হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জানাযায় কোনো ইমাম ছিল না। সর্বপ্রথম দলে দলে নবী করীম ﷺ-এর জানাযা নামায পড়েন ফেরেশতাগণ, এরপর নবী করীম ﷺ-এর পরিবার-পরিজন, এরপর সাধারণ মুসলিমরা দলে দলে (তাঁর জানাযার নামায পড়েন), এরপর অন্যান্য মহিলাগণ।
টিকাঃ
১. ইবনে সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ২, পৃ. ২৫৪, হাদীস: ২৩৪৯
২. (ক) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭১; (খ) ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৫২, হাদীস: ২৩৩৬
৩. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫২০, হাদীস: ১৬২৮
৪. মোল্লা আলী আল-কারী, জমউল ওয়াসায়িল শরহশ শামায়িল, খ. ২, পৃ. ২১৭
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর দাফন ও রওযা শরীফের ধরন বিষয়ে আলোচনা
মদীনায় দু'জন কবর খননকারী লোক ছিলেন; একজন বগলী কবর তৈরি করতেন, অন্যজন কবর বগলী করতেন না। হযরত আব্বাস দু'জন লোক ডেকে বললেন, একজন যেন হযরত আবু ওবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর কাছে যাবে যিনি মক্কাবাসীর জন্য সিন্দুকি কবর খনন করেন এবং অন্যজন যেন হযরত আবু তালহা আল-আনসারী-এর কাছে যাবে যিনি মদীনাবাসীর জন্য বগলী কবর খনন করেন। এরপর হযরত আব্বাস বললেন, হে আল্লাহ! তুমি তোমার রাসুলের জন্য উত্তম ব্যবস্থাটিই করো। তাঁরা দু'জনই বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবু ওবায়দা-এর নিকট পাঠানো লোকটি হযরত আবু ওবায়দা -কে খুঁজে পাননি। অতঃপর হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য বগলী কবর খনন করা হয়।
সাহাবায়ে কেরামের মাঝে নবী করীম ﷺ-এর দাফনের স্থান নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একপর্যায়ে হযরত আবু বকর বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ নবীগণকে সেই জায়গাতেই ইন্তিকালের ব্যবস্থা করেন, যেখানে তিনি সমাধিস্থ হতে পছন্দ করেন।' অতএব তোমরা নবী করীম ﷺ-এর বিছানাপত্র উঠিয়ে এবং বিছানার নিচেই তাঁর জন্য সমাধি তৈরি কর।
হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, হযরত আব্বাস, তাঁর দু'পুত্র হযরত ফযল (ইবনে আব্বাস) ও হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস) প্রমুখ নবী করীম ﷺ-এর কবরে অবতরণ করেন। আর হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খিদমতে শেষ পর্যন্ত যিনি ছিলেন তিনি হলেন হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস)। কেননা তিনিই নবী করীম ﷺ-এর রওযা থেকে সর্বশেষে ওঠে এসেছেন।
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কবরে রাখার সময় হযরত শুকরান একটি চাদর বিছিয়ে দেন, এটি একটি লাল নজরানি চাদর যা খায়বার যুদ্ধের দিন তাঁর হস্তগত হয়েছিল। হযরত রাসূলুল্লাহ এটি পরতেন এবং বিছানায় ব্যবহার করতেন। অতঃপর চাদরখানি তিনি নবী করীম ﷺ-এর (রওযার) তলায় বিছিয়ে দেন আর এটিও নবী করীম ﷺ-এর সাথে রওযায় দাফন করে দেন। আর নবী করীম ﷺ-এর রওযায় কিছু ইঁট লাগানো হয়েছিল। বলা হয় যে, ৯টি ইঁট ছিল।
এরপর যথারীতি নবী করীম ﷺ-এর কবরে মাটি ফেলা হয়। আর নবী করীম ﷺ-এর রওযা (মাটির সাথে) সমান করে দেওয়া হয়। হযরত জাবির ইবনে (আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ-এর কবরে যিনি পানি ঢেলেছিলেন তিনি হলেন হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ, তিনি এক মশক পানি নিয়ে নবী করীম ﷺ-এর মাথার দিক থেকে (ঢালা) শুরু করে পায়ের দিক পর্যন্ত গিয়ে শেষ করেন।
হযরত সুফিয়ান ইবনুত তামার থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম ﷺ-এর রওযা উটের পিঠের মতো দেখেছেন। হযরত আয়িশা কাসিম ইবনে মুহাম্মদের জন্য নবী করীম-এর রওযা ও তাঁর দু'সঙ্গী (হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব); এই তিন জনের রওযা খুলে দেন। যা বেশি উঁচুও ছিল না, আবার নিচুও ছিল না। আর এগুলোর ওপর ময়দানের লাল কাঁকর ছড়ানো ছিল। নবী করীম ﷺ-এর রওযা মাটি থেকে এক বিঘতের মতো উঁচু ছিল।
টিকাঃ
১. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৫২, হাদীস: ৩২১৭
২. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৩, পৃ. ৩২৯, হাদীস: ১০১৮; (খ) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১, পৃ. ২০৬, হাদীসঃ ২৭
৩. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৫৪, হাদীস: ৩২২১
৪. আস-সনদী, কিফায়াতুল হাজা, খ. ১, পৃ. ৪৯৭, হাদীস: ১৬২৮
৫. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ২১৫, হাদীস: ৩২২০; (খ) আল-হাকিম, আল-মুসতাদরাক, খ. ১, পৃ. ৫২৪, হাদীস: ১৩৬৮
৬. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৬৬৬, হাদীস: ৯২ (১৬৮), হযরত সুমামা ইবনে সুফাইয়া থেকে বর্ণিত
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর দাফনের সময়ের আলোচনা
নবী করীম ﷺ-এর দাফন নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে।
রওয়ায় বর্ণিত হয়েছে হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দাফন বিষয়ে আমাদের কিছুই জানাই ছিলো না। পরিশেষে মঙ্গলবার ভোরে খুন্তি দিয়ে মাটি খোঁড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম।[1]
আর আল-মুওয়াত্তা গ্রন্থে এসেছে, ইমাম মালিক (ইবনে আনাস) জানতে পেরেছেন যে, নবী করীম ﷺ ইন্তিকাল করেছেন সোমবারে, আর তাঁকে দাফন করা হয়েছে মঙ্গলবারে।[2]
ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনা মতে, যে-মাটিতে তিনি ইন্তিকাল করেন সেই মাটিতে তাঁকে রাতে দাফন করা হয়।[3]
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ সোমবার বিদায় নেন, সেদিন ও মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি ওই অবস্থায় ছিলেন। এর পরের রাত অর্থাৎ বুধবার তাঁকে দাফন করা হয়।[4]
কেউ কেউ বলেছেন, মঙ্গলবারে সূর্যাস্তের পর তাঁকে দাফন করা হয়। ইমাম আশ-শাআবী-এর কিফায়া গ্রন্থে আছে, মঙ্গলবার তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর নামাযে জানাযা আদায় করেন এবং এরপর তাঁকে দাফন করা হয়।[5]
যদি আপনি জানতে চান, নবী করীম ﷺ-এর দাফনে বিলম্ব করা হলো কেন? অথচ নবী করীম ﷺ তাঁর পরিবার যাঁরা তাঁদের কোন মৃতব্যক্তি দাফনে বিলম্ব করছিলেন তাঁদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা তোমাদের মৃতদেহ দ্রুত দাফন কর, বিলম্ব করো না।
এর জবাব হচ্ছে, উল্লিখিত হয়েছে যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকাল নিয়ে সাহাবাগণের ঐক্যমতে না পৌছুতে পারা এবং তাঁর দাফনের স্থান নিয়ে তাঁদের মতপার্থক্য এর অন্যতম কারণ। অথবা খিলাফতের নেতা মনোনয়ন নিয়ে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যকার মতভেদ নিরসনে তাঁরা প্রয়াসী ছিলেন। যা ইসলামের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতঃপর তাঁরা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর হাতে বায়আত নেন। এরপর সবাই সমবেতভাবে দ্বিতীয়বার বায়আত নেন। এরপর তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর দিকে মনোযোগ দেন এবং তাঁর দাফনের কাজে লেগে যান। পর্যায়ক্রমে তাঁরা নবী করীম ﷺ-এর গোসল, কাফন ও দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন। আল্লাহ সর্বাধিক পরিজ্ঞাত।[6]
ইমাম আদ-দারিমী-এর বর্ণনায় এসেছে হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের (মদীনায়) আগমন করেন সেদিনটির চেয়ে সুন্দর ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিন দ্বিতীয়টি আমি দেখিনি। আর যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ছেড়ে বিদায় নেন সেই দিনটার মতো গুমোট ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন দিন দ্বিতীয়টা আমি দেখিনি।[7]
ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, যেদিন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনাতে আগমন করেন সবকিছু ছিলো ঝলমলে। আর যেদিন তিনি প্রভুর ডাকে সাড়া দেন সেদিন সবকিছুই ছিল শোকাচ্ছন্ন। আমরা দাফনের কাজ সম্পন্ন করে হাতের মাটি এখনো ঝেড়ে নেইনি, ইত্যবসরে আমাদের মানসিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠে।[8]
টিকাঃ
[1] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৬৫, হাদীস: ২৪১৯
[2] মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ১, পৃ. ৩৮৩, হাদীস: ১৭২
[3] আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২
[4] (ক) আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২; (খ) আত-তিরমিযী, আশ-শামায়িল, পৃ. ৩৫, হাদীস: ৩৯৫
[5] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৬৫, হাদীস: ২৪২১ ও ২৪২২; (খ) আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭২
[6] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৮৫-৫৮৬
[7] আদ-দারিমী, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ২২৩, হাদীস: ৮৯
[8] আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৫৮৮-৫৮৯, হাদীস: ৩৬১৮
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর ওপর শোকগাঁথা ও মরসিয়া বিষয়ে আলোচনা
আর যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন হয়, হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এসে বললেন, "তোমাদের মন কীভাবে সায় দিলো হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে?"[1]
যখন সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন, তখন হযরত ফাতিমা এসে বললেন, "হে হাসানের পিতা! আপনারা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দাফন করেছেন?" তিনি জবাব দিলেন, "হ্যাঁ।" হযরত ফাতিমা বললেন, "হে হাসানের পিতা! তোমাদের মন কীভাবে সায় দিলো যে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে? তিনি কি রহমতের নবী নন?" তিনি (হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, "হ্যাঁ, (নিশ্চয় নবী করীম ﷺ শান্তির দূত)। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হুকুম কেউ এতটুকু হেরফের করতে পারে না।" একথায় হযরত ফাতিমা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলতে লাগলেন, "হায় পিতা! হায় হযরত রাসূলুল্লাহ! হায় রহমতের নবী! এখন থেকে আর ওহী আসবে না, এখন থেকে হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম-এর আসাও বন্ধ হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে নবী করীম ﷺ-এর আত্মার সাথে মিলিয়ে দিন। তাঁর দর্শনের মাধ্যমে আমার চক্ষু শীতল করুন। কিয়ামতের দিন তাঁর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত করো না।"[2]
হযরত ফাতিমা হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র (রওযার) মাটি থেকে কিছু মাটি উঠিয়ে চোখে-মুখে মাখলেন, কবিতা আবৃত্তি করলেন:
কবিতা:
যে নিয়েছে মাটির সুগন্ধি হাবীবে খোদার রওযা মোবারকের।
প্রয়োজন হয় না, তার মিশক কিংবা অন্য কোন সুঘ্রাণের।
আমার ওপর রয়েছে যে, কঠিন বিপদের ঘনঘটা
বৈত যদি দিনের ওপর হয়ে যেত আঁধার রূপান্তর।[3]
আর হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন নবী করীম ﷺ-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এ-অবস্থায় হযরত ফাতিমা বললেন, "উহ! আমার পিতার ওপর কত কষ্ট!" তখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'লাইসা আলা আবিকা কারবুন বা'দাল ইয়াওম... আজকের পরে তোমার পিতার ওপর আর কোনো কষ্ট নেই।' অতঃপর যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন হযরত ফাতিমা বললেন, "হায় আমার পিতা! প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাওস তাঁর ঠিকানা। হায় পিতা! হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম-কে তাঁর ইন্তিকালের খবর পরিবেশন করছি।" যখন নবী করীম ﷺ-কে সমাহিত করা হলো, তখন হযরত ফাতিমা বললেন, "হে আনস! হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর মাটি ঢালতে তোমাদের মন কীভাবে সায় দিল?" হাদীসটি এককভাবে ইমাম আল-বুখারী-ই বর্ণনা করেছেন।[4]
ইমাম আত-তাবরানী অতিরিক্ত এটুকু বর্ণনা করেছেন: "হায় পিতা! আপনার প্রভুর কেমন নৈকট্যই না আপনি লাভ করেছেন।"[5]
নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের অব্যবহিত পর হযরত ফাতিমা মাত্র ৬ মাস বেঁচে ছিলেন। তাঁকে দাফন করা হয়েছে রাতে। এ-সময়ের মধ্যে তিনি কখনো হাসেননি। বস্তুত না হাসাই তাঁর জন্য স্বাভাবিক ছিল।[6]
আর হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি নবী করীম ﷺ-এর জন্য শোকপ্রকাশ করে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন:
কবিতা:
হে সেই নবী! যিনি কখনো পেটভরে তৃপ্ত হয়ে রুটিও খেতে পারেননি।
হে সেই নবী! যিনি পালঙ্কের পরিবর্তে সাদামাটা চাটাইয়ের বিছানা বেছে নিয়েছিলেন।
হে সেই নবী! যিনি জাহান্নামের মালিকের শাস্তির ভয়ে কখনো রাতে ঘুমাননি।[7]
আর হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তাঁর রওযায় হযরত আবু বকর প্রবেশ করলেন। অতঃপর নবী করীম ﷺ-এর দু'চোখের বরাবর মুখোমুখী হন এবং নবী করীম ﷺ-এর কানপট্টির উপরিভাগে হাত রেখে বললেন, "হায় নবী! হায় বন্ধু! হায় প্রিয়বন্ধু!"[8]
হযরত আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর বক্তব্যে যখন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের বিষয়ে নিশ্চিত হন তখন তিনি তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করে নেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার ওপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আপনি খেঁজুরের একটি ডালে ভর দিয়ে খুতবা দান করতেন। যখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন আপনি একটি মিম্বর তৈরি নিয়েছিলেন, লোকজনকে আপনার বক্তব্য শোনানোর উদ্দেশ্যে। এরপর সেই খেজুর শাখাটি আপনার বিরহে ক্রন্দন করেছিল। পরে নবী করীম ﷺ খেজুর শাখাটির ওপর আপনার হাত বুলিয়ে দিলেন শাখাটির কান্না থামে। এ-দৃষ্টিতে আপনার বিদায়ের জন্য আপনার উম্মত অঝোর ধারায় কান্নার বেশি হকদার।
হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার ওপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; আপনার অনুসরণকে তিনি তাঁর অনুসরণ বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, 'যে রাসুলের অনুসরণ করবে সে যেন আল্লাহকে অনুসরণ করল।'[9]
হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; আপনাকে তিনি শেষনবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন আর আপনার আলোচনা করেছেন সবার আগে। মহান আল্লাহ বলেন, '(হে রাসূল! সে সময়ের কথা স্মরণ করুন), যখন আমি নবীদের কাছ থেকে; আপনি ও নুহের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছি।'[10]
হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বহু উঁচুতে; জাহান্নামবাসীগণ আযাব ভোগ করা অবস্থায় পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষা করবে, হায় যদি তারা আপনার অনুসারী হতো! তারা বলবে, 'হায়! আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করতাম!'"[11]
কোনো মদীনাবাসী কষ্টে পতিত হলে অন্যজন তাঁর সাথে হাত মিলিয়ে বলতো, "হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর, কেননা আল্লাহর রাসুলের অনুসরণের ফলেই অনুপম চরিত্রের রূপ প্রতিফলিত হয়।"[12]
কোন কবি চমৎকার বলেছেন:
কবিতা:
প্রত্যেক বিপদে ধৈর্য ধরো এবং দৃঢ়বিশ্বাস রাখো!
আর জেনে রেখ, কোনো মানুষ চিরস্থায়ী নয়।
বড়দের মতো তুমিও সহ্য করো।
কেননা বিপদ একটা যন্ত্রণা যা আজ আছে, কাল থাকবে না।
তুমিও যখন কোনো বিপদে পতিত হয়ে চিন্তিত হও,
তখন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর কষ্টের কথা ভেবে
নিজের বিপদে ধৈর্যধারণের সাহস সঞ্চয় কর।[13]
বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তিকালের পর হযরত বিলাল আযান দিতেন; যখন একপর্যায়ে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলতেন তখন কাঁদাকাটি ও পরিবেদনায় পুরো মসজিদ উদ্বেলিত হয়ে ওঠতো। এজন্য নবী করীম ﷺ-এর ওফাতের পর তিনি আযান দেওয়া ছেড়ে দেন।[14]
কবিতা:
যদি রাযওয়া পাহাড়ও এই বিরহের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারতো
তবে সে বিপর্যস্ত হয়ে যেতো,
শোকসন্তাপের বাঁধভাঙা আবেগের তোড়ে আমি ভাসছি
যা ইস্পাতের ক্ষেত্রে হলেও সে গলে যেতো।[15]
নবী করীম ﷺ-এর ফুফী সাফিয়াও বহু শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন। এর মধ্যে তাঁর কয়েকটি গীতি হচ্ছে:
কবিতা:
হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
আপনি আমাদের পরম হিতৈষী। আপনি কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করেন না।
আপনি দয়ালু, পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক।
তাই আজ সকলেই আপনার বিরহে মূহ্যমান।
আপনার জীবনের শপথ! নবী করীম ﷺ-এর বিরহে আমি কাঁদছি তা নয়।
আমি তো ভবিষ্যতে তাঁর শূন্যতার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন।
মুহাম্মদের স্মরণে আমার অন্তর পরিপূর্ণ।
আমি নবী করীম ﷺ-এর অবর্তমানে (জাতির) বিভ্রান্তি নিয়ে আশঙ্কা করছি।
আপনার ওপর আল্লাহর তরফ থেকে শান্তি ও শুভেচ্ছা রইল।
আপনি আদনের (জান্নাতের) পুষ্পোদ্যানে সন্তুষ্টচিত্তে বিচরণ করবেন।[16]
নবী করীম ﷺ-এর চাচাতো ভাই হযরত আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন।[17]
হযরত আবু বকর সিদ্দীকও শোকগাথা আবৃত্তি করেছেন:
কবিতা:
আমি যখন আমাদের প্রিয়নবীকে নিথর-অসাড় দেখি
তখন প্রশস্ততা সত্ত্বেও পুরো ঘরটি আমার কাছে অত্যন্ত সংকুচিত-সংকীর্ণ মনে হয়।
সেসময় আমার মন যেন তখন মৃত্যু কামনা করছিল।
আমার হাড়গুলো যেন গুড়িয়ে যাচ্ছিলো।
ওহে আতিক (হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ)! আমার খুবই দুঃখ হচ্ছে, তোমার বন্ধু চলে গেছেন।
এখন সারা জীবন কি ধৈর্যধারণ তোমার পক্ষে সহজ হবে?[18]
হযরত হাসসান বলেন, কবিতা:
কুনতাস সাওয়াদা লিনাযিরি... ওহে প্রিয়তম তুমি আমার চোখের জ্যোতি ছিলে। তোমার সৌন্দর্য দর্শন থেকে বঞ্চিত আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। তোমার পর পৃথিবীর যে কেউ মৃত্যুবরণ করুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি তো কেবল তোমার মৃত্যুর উৎকণ্ঠায় ভীত বিহ্বল ছিলাম।[19]
টিকাঃ
[1] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১৫, হাদীস: ৪৪৬২
[2] (ক) আত-তাবারানী, আল-মুজামুল আওসাত, খ. ৩. পৃ. ৬৪, হাদীস: ২৬৭৬; (খ) আবু নুআইম আল-আসবাহানী, হিলরাতুল আওলিয়া, খ. ৪, পৃ. ৭৩
[3] (ক) ইবনে নাসিরুদ্দীন আদ-দামিশকী, সালওয়াতুল কারীব, পৃ. ১৬২; (খ) আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলল হুদা ওয়ার রাশাদ, খ. ১২, পৃ. ৩৩৭; (গ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৩
[4] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১৫, হাদীস: ৪৪৬২
[5] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ২২, পৃ. ৪১৫-৪১৬, হাদীস: ১০২৮ ও ১০২৯
[6] (ক) ইবনে কসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ৬, পৃ. ৩৬৭; (খ) আল-কাস্স্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭১
[7] (ক) আস-সাফুরী, নুষহাতুল মাজালিস, খ. ২, পৃ. ১৩০; (খ) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৩
[8] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪০, পৃ. ৩২, হাদীস: ২৪০২৯
[9] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা ৪:৮০
[10] আল-কুরআন, সুরা আল-আহযাব ৩৩:৭
[11] আল-কুরআন, সুরা আল-আহযাব ৩৩:৬৬
[12] (ক) আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২; (খ) মোল্লা আলী আল-কারী, জমউল ওরাসারিল শরহুশ শামায়িল, খ. ২, পৃ. ২২৩
[13] আল-কাস্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২
[14] আল-কাস্স্তান্নানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭২
[15] কাযী আয়ায, মাশারিকুল আনওয়ার, খ. ১, পৃ. ৫৯; رضوى (রাযওয়া); হচ্ছে মক্কা ও মদিনা শরীফের মধ্যস্থিত একটি পাহাড়।
[16] (ক) ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৮২, হাদীস: ২৪৮৯; (খ) আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩. পৃ. ৫৭৩
[17] আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৫৯৮
[18] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৭৮, হাদীস: ২৪৭৯
[19] (ক) ইবনে কসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ৩৭৯; (খ) আল-কাস্স্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩. পৃ. ৫৭৪