📄 নবী করীম (সাঃ)-এর গোসলের আলোচনা
নবী করীম ﷺ-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর-এ খলীফা মনোনীত হওয়া এবং তাঁর হাতে লোকজনকে বায়আত সম্পন্ন হওয়া মধ্য দিয়ে আল্লাহর মেহেরবানিতে উম্মার ঐক্য অটুট থাকে এবং যাবতীয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে। হযরত আবু বকর-এর বায়আত সম্পন্নে অব্যবহিত পর সাহাবাগণ নবী করীম-এর শেষক্রিয়া ও এর প্রস্তুতির জন্য মনোযোগী হন।
বর্ণিত আছে যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করা হল, নবী করীম ﷺ-এর গোসল কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে? জবাবে তিনি বলেছেন, হযরত আব্বাস একটি ঝিল্লিসমৃদ্ধ ইয়ামেনি চাদর দিয়ে তাঁর চারপাশে পর্দা টাঙিয়ে নেন। পরবর্তী কালে এটি আমাদের মাঝে এবং অনেক পুণ্যবানদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে যায়। এরপর বনী হাশিমের লোকরা যারা পর্দা ও দেওয়ালসমূহের মাঝে বসা ছিলেন তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হল। তারপর হযরত আব্বাস পর্দার ভেতরে প্রবেশ করে হযরত আলী, হযরত ফযল, হযরত আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ও হযরত উসামা ইবনে যায়দ-কে ডেকে নেন। অতঃপর যখন তাঁরা সবাই পর্দার ভেতরে সমবেত হলেন, তাঁরা, পর্দার বাইরের লোকজন এবং পরিবার-পরিজন সকলেই হঠাৎ নিদ্রা আচ্ছন্ন করে ফেললো। এরপর একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হল, নবী করীম ﷺ-কে গোসল দিও না, তিনি সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র। তবে হযরত আব্বাস বললেন, তবুও গোসল দিতে হবে। আর নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, এই আওয়াজ সম্পূর্ণ সত্য। অতএব তাঁকে গোসল দিতে হবে না। হযরত আব্বাস বললেন, কে বা কার যাকে আমরা জানি না সেরকম একটি আওয়াজ শুনে আমরা সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। এরপর তাঁরা সবাই আবারো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলেন। এবারও একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তিনি বললেন, তোমরা হযরত রাসূলুল্লাহ-কে গোসল দিতে পার, তবে কাপড়সহ তাঁকে গোসল দেবে। নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, না, এটি হতে পারে না। হযরত আব্বাস বললেন, হ্যাঁ, এটিই ঠিক থাকলো।
আর হযরত আব্বাস যখন পর্দার ভেতর গোসলের জন্য গেলেন চারজানু বিছিয়ে বসলেন, হযরত আলীও চারজানু বিছিয়ে বসলেন; তাঁরা উভয়ে মুখোমুখি (হয়ে বসলেন) এবং নবী করীম ﷺ-কে উভয়ের কোলে বসালেন। অতঃপর আওয়াজ আসল, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে চিৎ করে শোয়ানো হোক এবং পর্দাসহকারে গোসল দেওয়া হোক। অতঃপর তাঁরা তক্তা থেকে সরে গেলেন এবং এর ওপর নবী করীম ﷺ-কে শোয়ালেন। তক্তার পা পূর্ব দিকে আর মাথা পশ্চিম দিকে ছিল। এরপর গোসলের কাজ আরম্ভ করা হলো। তাঁর শরীরের জামা ছিল; যার একটি আস্তিন একদিক থেকে খোলা ছিল। এর ওপরই তাঁকে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দেওয়া হয় এবং কাফুরের সুগন্ধি লাগানো হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-এর জামা ও আস্তিন নিংড়ানো হয় এবং কপালে সাজদার অংশ ও শরীরের জোড়াগুলোতে সুগন্ধি মাখানো হয়। নবী করীম ﷺ-এর চেহারা, দুই হাত কনুই পর্যন্ত অংশগুলো অযুর পদ্ধতিতে ধোয়া হয়। এরপর তাঁর জামা ও খোলা আস্তিনের ওপরই কাফন পরানো হয় এবং বেজোড় সংখ্যায় তাঁকে সুগন্ধির ধূপ করা হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-কে উঠিয়ে খাটিয়ার ওপর শোয়ানো হয় এবং ঢেকে দেওয়া হয়।
আর হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, যখন সাহাবাগণ হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে গোসল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁদের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়; তাঁরা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা কি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাপড় খুলে ফেলব, যেমন- আমরা আমাদের অন্যান্য মৃত ব্যক্তির কাপড় খুলে ফেলি অথবা আমরা তাঁকে কাপড় পরা অবস্থায় গোসল দেব? যখন তাঁরা এ-নিয়ে তাঁদের মতভেদ করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেন। এমনকি তাঁদের একজনও ছিলেন না (নিদ্রার কারণে) যার থুতনী তার বুকের ওপর আপতিত হয়নি। এ-সময় জনৈক ব্যক্তি ঘরের এক কোণা থেকে বলল, তাঁরা জানতেন না তিনি কে: যে তোমরা নবী করীম ﷺ-কে তাঁর পরিধেয় কাপড়সহ গোসল দাও। তখন সাহাবাগণ উঠে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কাপড়সহ গোসল দিতে শুরু করেন। তখন তাঁর পরনে জামা পরিহিত ছিল।
তাঁরা জামার ওপর পানি ঢেলে দেন এবং ওই জামা দিয়ে তাঁর দেহ মুবারক ঘর্ষণ করেন। হযরত আয়িশা বলেন, আমি যদি আগে বুঝতে পারতাম, যা আমি পরে বুঝতে পারি, তবে তাঁকে তাঁর বিবিগণ ছাড়া আর কেউই গোসল দিতে পারত না।
অনেকের মতে, নবী করীম ﷺ-এর গোসলে আরও যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা হলেন, চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, তাঁরই দু'ছেলে: হযরত ফযল (ইবনে আব্বাস) ও হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস), নবী করীম ﷺ-এর পরম ভক্ত হযরত উসামা ইবনে যায়দ এবং নবী করীম ﷺ-এর ক্রীতদাস হযরত শুকরান প্রমুখ।
হযরত আলী নবী করীম ﷺ-কে বড়ই (পাতায় সিদ্ধ) পানি দিয়ে গোসল দেন। সচরাচর মৃত লোকজনের শরীরে যা পরিদৃষ্ট হয়; আল্লাহর রাসুলের শরীরে তার কিছুই দেখা যায়নি। হযরত আলী বলেন, তাঁর ওপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আপনি জীবনে-মরণে কতই না পূত-পবিত্র। হযরত আলী নিজের হাতে কাপড় মুড়িয়ে নবী করীম-এর জামার নিচে হাত চালিয়ে গোসল করান। নবী করীম ﷺ-এর প্রথম গোসল ছিল খালি পানি দিয়ে, দ্বিতীয়বার বরই পাতার পানি দিয়ে আর তৃতীয়বারে কাপুর মিশ্রিত পানি দিয়ে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫১০, হাদীস: ১৫৯৯
২. আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৮৫
৩. আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭০
৪. ইবনে কাসীর, আস-সীরাতুন্নাবাবিয়া, খ. ৪. পৃ. ৫২১
৫. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৯৬-১৯৭, হাদীস: ৩১৪১; (খ) আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৮-৫৯
৬. আত-তাবরীযী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৬৭৫-১৬৭৬, হাদীস: ৫৯৪৮ (৫)
৭. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৪২, হাদীস: ৩১৯৬
৮. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪, পৃ. ১৮৬-১৮৭, হাদীস: ২৩৫৭
৯. আল-বাযযার, আল-বাহরুষ বাঘযার, খ. ২, পৃ. ১৩৫-১৩৬, হাদীস: ৯২৫
১০. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৭১, হাদীস: ১৪৬৮
১১. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৫, হাদীস: ৬৬৫৭
১২. আস-সামহুদী, ওয়াফাউল ওয়াফা, খ. ৩, পৃ. ১৪৪
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর কাফনের আলোচনা
অতঃপর সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর গোসল সম্পন্নের পর তাঁর শরীর মুছে শুকিয়ে নেন। তারপর অন্যান্য মৃত মানুষের সাথে যা যা করা হয় নবী করীম ﷺ-এর বেলায়ও তার সবই করা হয়। এরপর ৩টি কাপড় পরানো হয়; যার দুটো ছিল সাদা ও অন্যটি ছিল ইয়েমেনি চাদর।
হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী করীম ﷺ-কে ৩টি সাহুলী-ইয়েমেনের একটি শহর-সাদা চাদরে কাফন দেওয়া হয়েছে। এতে জামা ও পাগড়ি ছিল না। তিনি (হযরত আয়িশা) বলেন, আমি হযরত আবু বকর -এর কাছে গিয়েছিলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। এরপর অসুস্থকালীন তাঁর পরিধেয় কাপড়ের প্রতি লক্ষ করে তিনি বললেন, আমার এ কাপড়টি ধুয়ে তার সাথে আরও দুটো কাপড় বৃদ্ধি করে আমার কাফন দেবে। আমি (হযরত আয়িশা) বললাম, এতো পুরোনো! তিনি বললেন, মৃতব্যক্তির চেয়ে জীবিতদের নতুন কাপড়ের অধিকার বেশি। আর কাফন হল বিগলিত শবদেহের জন্য।
ইমাম আবু আবদুল্লাহ মালিক ইবনে আনাস -এর মুওয়াত্তায় আছে, কُفِّنَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي ثَلَاثَةِ أَثْوَابِ حِبَرَةٍ وَسَخَّارِيْنَ... 'হযরত রাসূলুল্লাহ-কে ৩টি ইয়েমেনি ও সাহারি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে।” আল-ইকলীল গ্রন্থে আছে, নবী করীম-কে ৭টি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে। আর এ-বিষয়ে সবাই একমত যে, নবী করীম ﷺ-এর কাফনে জামা ও প্রিয় পাগড়ি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নবী করীম ﷺ-এর কাফনে কাফুর মেশানো হয়েছিল। কারো মতে, সুগন্ধি মেশানো হয়েছিল।
হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, নবী করীম-কে ৩টি সাদা সূতি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে। শায়খ তকীউদ্দীন ইবনে দাকীকুল ঈদ বলেছেন, 'উদ্দেশ্যগতভাবে কাফনে জামা ও পাগড়ি আসলেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' ইমাম আন-নাওয়াওয়ী সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, 'নিশ্চয়ই প্রথম মতটিই (কাফনে জামা ও পাগড়ি আসলেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না) অধিকাংশ আলিমের মত।'
টিকাঃ
১. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৮
২. আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭১
৩. আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৬০
৪. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৩, পৃ. ৩১২, হাদীস: ৯৯৬
৫. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৭৭, হাদীস: ১২৭৩; (খ) মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ১, পৃ. ৩৯৯, হাদীস: ১০১০
৬. ইবনে দকীকুল ঈদ, ইহকামুল ইহকাম, খ. ১, পৃ. ৩৬৬, হাদীস: ১৫৯ (৪)
৭. আন-নাওয়াওয়ী, আল-মিনহাজ, খ. ৭, পৃ. ৭, হাদীস: ৯৪১
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর সালাতে জানাযা
হযরত মুহাম্মদ (ইবনে আলী ইবনে হুসাইন) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ-এর নামায ইমাম ছাড়াই পড়া হয়েছে। পৃথক পৃথকভাবে (নবী করীম-এর নামায পড়া হয়েছে); নবী করীম ﷺ-এর নামাযে কোন ইমাম ছিল না। মুসলিমরা জনে জনে (নবী করীম-এর হুজরায়) প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর নামায আদায় করে বেরিয়ে পড়েছেন। যখন সবাই নামায পড়া শেষ করেন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) ডেকে বললেন, জানাযার জন্য আহলে বায়তকে সুযোগ দাও।
হযরত আলী, হযরত আব্বাস ও বনী হাশিমের লোকজন (সর্বপ্রথম) নবী করীম ﷺ-এর জানাযার নামায পড়েন। তারপর মুহাজিরগণ প্রবেশ করেন, এরপর আনসারগণ, এরপর অন্যান্য লোকজন; পৃথক পৃথকভাবে (নবী করীম ﷺ-এর নামায পড়েছেন); তাঁর নামাযে কোন ইমাম ছিল না। অতঃপর মহিলাগণ, এরপর শিশু-কিশোরগণ (জানাযা আদায় করেন)।
মঙ্গবারে যখন সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর গোসলের কাজ শেষ করেন, তখন তাঁকে তাঁর ঘরের ভেতরে তাঁরই খাটের ওপর রাখা হয়। এরপর লোকজন দলে দলে ঘরে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নামাযে জানাযা আদায় করেন। তাঁদের নামায আদায়ের পর মহিলারা প্রবেশ করেন, তাঁদের অব্যবহিত পর শিশু-কিশোরগণ প্রবেশ করেন। হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জানাযায় কোনো ইমাম ছিল না। সর্বপ্রথম দলে দলে নবী করীম ﷺ-এর জানাযা নামায পড়েন ফেরেশতাগণ, এরপর নবী করীম ﷺ-এর পরিবার-পরিজন, এরপর সাধারণ মুসলিমরা দলে দলে (তাঁর জানাযার নামায পড়েন), এরপর অন্যান্য মহিলাগণ।
টিকাঃ
১. ইবনে সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ২, পৃ. ২৫৪, হাদীস: ২৩৪৯
২. (ক) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭১; (খ) ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৫২, হাদীস: ২৩৩৬
৩. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫২০, হাদীস: ১৬২৮
৪. মোল্লা আলী আল-কারী, জমউল ওয়াসায়িল শরহশ শামায়িল, খ. ২, পৃ. ২১৭
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর দাফন ও রওযা শরীফের ধরন বিষয়ে আলোচনা
মদীনায় দু'জন কবর খননকারী লোক ছিলেন; একজন বগলী কবর তৈরি করতেন, অন্যজন কবর বগলী করতেন না। হযরত আব্বাস দু'জন লোক ডেকে বললেন, একজন যেন হযরত আবু ওবাইদা ইবনুল জাররাহ-এর কাছে যাবে যিনি মক্কাবাসীর জন্য সিন্দুকি কবর খনন করেন এবং অন্যজন যেন হযরত আবু তালহা আল-আনসারী-এর কাছে যাবে যিনি মদীনাবাসীর জন্য বগলী কবর খনন করেন। এরপর হযরত আব্বাস বললেন, হে আল্লাহ! তুমি তোমার রাসুলের জন্য উত্তম ব্যবস্থাটিই করো। তাঁরা দু'জনই বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবু ওবায়দা-এর নিকট পাঠানো লোকটি হযরত আবু ওবায়দা -কে খুঁজে পাননি। অতঃপর হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য বগলী কবর খনন করা হয়।
সাহাবায়ে কেরামের মাঝে নবী করীম ﷺ-এর দাফনের স্থান নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একপর্যায়ে হযরত আবু বকর বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ নবীগণকে সেই জায়গাতেই ইন্তিকালের ব্যবস্থা করেন, যেখানে তিনি সমাধিস্থ হতে পছন্দ করেন।' অতএব তোমরা নবী করীম ﷺ-এর বিছানাপত্র উঠিয়ে এবং বিছানার নিচেই তাঁর জন্য সমাধি তৈরি কর।
হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, হযরত আব্বাস, তাঁর দু'পুত্র হযরত ফযল (ইবনে আব্বাস) ও হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস) প্রমুখ নবী করীম ﷺ-এর কবরে অবতরণ করেন। আর হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খিদমতে শেষ পর্যন্ত যিনি ছিলেন তিনি হলেন হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস)। কেননা তিনিই নবী করীম ﷺ-এর রওযা থেকে সর্বশেষে ওঠে এসেছেন।
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কবরে রাখার সময় হযরত শুকরান একটি চাদর বিছিয়ে দেন, এটি একটি লাল নজরানি চাদর যা খায়বার যুদ্ধের দিন তাঁর হস্তগত হয়েছিল। হযরত রাসূলুল্লাহ এটি পরতেন এবং বিছানায় ব্যবহার করতেন। অতঃপর চাদরখানি তিনি নবী করীম ﷺ-এর (রওযার) তলায় বিছিয়ে দেন আর এটিও নবী করীম ﷺ-এর সাথে রওযায় দাফন করে দেন। আর নবী করীম ﷺ-এর রওযায় কিছু ইঁট লাগানো হয়েছিল। বলা হয় যে, ৯টি ইঁট ছিল।
এরপর যথারীতি নবী করীম ﷺ-এর কবরে মাটি ফেলা হয়। আর নবী করীম ﷺ-এর রওযা (মাটির সাথে) সমান করে দেওয়া হয়। হযরত জাবির ইবনে (আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ-এর কবরে যিনি পানি ঢেলেছিলেন তিনি হলেন হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ, তিনি এক মশক পানি নিয়ে নবী করীম ﷺ-এর মাথার দিক থেকে (ঢালা) শুরু করে পায়ের দিক পর্যন্ত গিয়ে শেষ করেন।
হযরত সুফিয়ান ইবনুত তামার থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম ﷺ-এর রওযা উটের পিঠের মতো দেখেছেন। হযরত আয়িশা কাসিম ইবনে মুহাম্মদের জন্য নবী করীম-এর রওযা ও তাঁর দু'সঙ্গী (হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব); এই তিন জনের রওযা খুলে দেন। যা বেশি উঁচুও ছিল না, আবার নিচুও ছিল না। আর এগুলোর ওপর ময়দানের লাল কাঁকর ছড়ানো ছিল। নবী করীম ﷺ-এর রওযা মাটি থেকে এক বিঘতের মতো উঁচু ছিল।
টিকাঃ
১. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৫২, হাদীস: ৩২১৭
২. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৩, পৃ. ৩২৯, হাদীস: ১০১৮; (খ) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১, পৃ. ২০৬, হাদীসঃ ২৭
৩. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৫৪, হাদীস: ৩২২১
৪. আস-সনদী, কিফায়াতুল হাজা, খ. ১, পৃ. ৪৯৭, হাদীস: ১৬২৮
৫. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ২১৫, হাদীস: ৩২২০; (খ) আল-হাকিম, আল-মুসতাদরাক, খ. ১, পৃ. ৫২৪, হাদীস: ১৩৬৮
৬. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৬৬৬, হাদীস: ৯২ (১৬৮), হযরত সুমামা ইবনে সুফাইয়া থেকে বর্ণিত