📄 নবী করীম (সাঃ)-এর বয়সের আলোচনা
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: أُنْزِلَ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِينَ، وَأَقَامَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةٌ، وَبِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِيْنَ، وَتُوُفِّيَ وَهُوَ ابْنُ ثَلَاثٍ وَسِتِّينَ سَنَةٌ.
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ৪০ বছর বয়সে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহি নাযিল হয় (নুবুওয়াতপ্রাপ্ত হন)। এরপর তিনি মক্কায় ১৩ এবং মদীনায় ১০ বছর অবস্থান করেন। ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।”[1] হাদীসটি দু'সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে হযরত আবু বকর, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) ও হযরত আয়িশা ৬৩ বছর বয়স পেয়েছেন মর্মে বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।[2]
وَعَنْ أَنَسٍ، أَنَّهُ تُوُفِّيَ وَلَهُ سِتُّوْنَ سَنَةٌ.
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ৬০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।[3]
অন্য এক বর্ণনা মতে, ৬৫ বছর।[4] ইমাম আবু হাতিম তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে মত দিয়েছেন। ইমাম ইবনে আসাকির এর ইতিহাসগ্রন্থে আছে, তিনি সাড়ে ৬২ বছর জীবন পেয়েছিলেন। ইমাম ইবনে শায়বা-এর গ্রন্থাদিতে বলা হয়েছে, ৬১ বা ৬২ বছর জীবন পেয়েছিলেন তিনি; আমি জানি না, তিনি ৬৩ বছর জীবন পেয়েছিলেন কি না।[5]
সবগুলো বর্ণনার মাঝে সমন্বয় করা হয় এভাবে: যারা বয়স ৬৫ বলেছেন, তারা জন্মসাল ও মৃত্যুসালকে যোগ করে নিয়েছেন আর যারা ৬৩ বছর বলেছেন; যা প্রসিদ্ধ, তারা জন্মসাল ও মৃত্যুসালকে হিসেবে ধরেননি। আর যারা ৬০ বছর বলেছেন, তারা খুচরো মাসগুলো হিসেব থেকে বাদ দিয়েছেন। যারা বলেছেন, সাড়ে ৬২ বছর; হয়তো তারা আল-আকলীল-বর্ণিত হাদীসের ওপর নির্ভর করেছেন।
এই কথা বর্ণিত আছে যে, 'লম ইয়াকুন নাবিয়্যুন ইল্লা আশা নিসফা উমরি আখিহিল্লাযি কানা ক্ববলাহু... প্রত্যেক নবী তাঁর পূর্ববর্তী নবীর অর্ধেক জীবন লাভ করেন।' হযরত ঈসা ১২৫ বছর জীবন লাভ করেছিলেন।"[6]
আর যারা বলেছেন, ৬১ বা ৬২ বছর; তাদের বক্তব্য অনুমান-ভিত্তিক, তথ্য-নির্ভর নয়। নবী করীম নুবুওয়াতপ্রাপ্তির পর পবিত্র মক্কায় কতদিন তিনি অবস্থান করেন এ-ব্যাপারে মতভেদের কারণে উপর্যুক্ত মতবিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত। ইমাম মুগলতায়ী-এর সিরাতগ্রন্থে অনুরূপই এসেছে।[7]
টিকাঃ
[1] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ৪৫, হাদীস: ৩৮৫১; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৮২৬, হাদীস: ১১৭-১১৮ (২৩৫১)
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৫৯১, হাদীস: ৩৬২১
[3] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৮২৫, হাদীস: ১১৪ (২৩৪৮)
[4] حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ الله - - ، تُوفِّيَ وَهُوَ ابْنُ خَمْسٍ وَসিক্তিনা. ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন'। (ক) আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ১৬১, হাদীস: ৫৯০০; (খ) মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮২৪, হাদীস: ১১৩ (২৩৪৭)
[5] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮২৭, হাদীস: ১২২ (২৩৫৩)
[6] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ.১৬৬
[7] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৫, হাদীস: ২০০২, হযরত ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ ইবনে আবু যিয়াদ আল-মুখযুমী-মারফাত মুরসাল সূত্রে বর্ণিত; আলাউদ্দীন মুগলতায়ী, মুখতাসারুস সিরাতিন নাবাওরিয়া, পৃ. ১০৭-১০৯
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর বিদায় বেলার আলোচনা
হিজরী ১১ সালে ১২ রবিউল আউওয়াল সোমবার দুপুরে নবী করীম ইন্তিকাল করেন। যে-তারিখটিতে তিনি প্রীত-সফর করে মদীনায় পদার্পণ করেছিলেন।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: وُلِدَ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَاسْتُنْبِيَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَخَرَجَ مُهَاجِرًا مِّنْ مَّكَّةَ إِلَى الْمَدِينَةِ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَرَفَعَ الْحَجَرَ الْأَسْوَدَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَقُبِضَ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ فِي كِسَاءٍ مُلَبَّدٍ».
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবী করীম সোমবার জন্মলাভ করেছেন, নুবুওয়াত পেয়েছেন সোমবার, মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন সোমবার, হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপিত হয় সোমবার এবং সোমবারেই চাদর জড়ানো অবস্থায় তিনি বিদায় নেন।”[1]
قَالَ أَبُوْ بُرْدَةَ: أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا، فَقَالَتْ: قُبِضَ رُوْحُ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فِي هَذَيْنِ.
'হযরত আবু বুরদা বলেন, হযরত আয়িশা আমাদেরকে একটি সেলাই করা চাদর ও একটি মোটা লুঙ্গি দেখিয়ে বলেছেন, এ- দু'কাপড়ে হযরত রাসূলুল্লাহ-এর প্রাণ বায়ু চলে যায়।”[2]
আর আল-ইকতিফা গ্রন্থে আছে, 'হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন ইস্তিকাল করেন, তখন চারিদিক কান্নার রোল ওঠে ও ফেরেশতাগণ তাসবীহ-ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠেন। কোনো সাহাবার মতে, লোকজন অত্যন্ত শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন। তাঁদের হিতাহিতজ্ঞান লোপ পায়, তাঁরা আত্মবিস্তৃত হয়ে পড়েন এবং অপ্রকৃতগ্রস্থ হয়ে যান। তাঁদের কেউ কেউ পাগল হয়ে পড়েন, কেউ কেউ নির্বাক হয়ে যান, কেউ কেউ মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি করছিলেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) তাঁদের মধ্যে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রীতিমতো চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। মুনাফিকদের কেউ কেউ বলছিলো, তাদের ধারণা নিশ্চয় হযরত রাসূলুল্লাহ নাকি মৃত্যুবরণ করেছে! তবে, আল্লাহর কসম! তিনি মৃত্যুবরণ করেননি; নিশ্চয় তিনি তাঁর প্রভুর কাছে চলে গেছেন মাত্র, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান গিয়েছিলেন; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ দিন আত্মগোপনে থাকার পর ফিরে এসেছিলেন। তখন বলা হয়েছিলো, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহর কসম! হযরত রাসূলুল্লাহও অবশ্যই ফিরে আসবেন, যেভাবে হযরত মুসা প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। যারা হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।”[3]
কোনো কোনো বর্ণনা এসেছে, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) হাতে তরবারি নিয়ে বলতে থাকেন, যাদের মুখে শুনি যে হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন, আমি আমার এই তরবারি দিয়ে মেরে ফেলব।[4]
'অাম্মা উসমানু ইবনু আফফান ফাখুরিসা... হযরত ওসমান ইবনে আফফান ছিলেন শোকে নির্বাক। এমনকি কেউ তাঁর কাছে যেতেন, নিয়ে আসতেন; কারো সাথে কথাই বলতেন না। এভাবে দুই দু'দিন অতিবাহিত হয়। হযরত আলী নীরব-নিথর হয়ে স্থাণুর মতো বসে থাকতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়স অসুস্থ হয়ে একপর্যায়ে মৃত্যুবরণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যে হযরত আবু বকর ও হযরত আব্বাস-এর তুলনায় স্থিরচিত্ত ও দৃঢ়মনোবল প্রতীয়মান হয়নি।”[5]
অন্য একটি বর্ণনা এসেছে, 'সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবু বকর সবচেয়ে স্থিরচিত্ত ছিলেন, তবে তাঁর দু'চোক অনবরত অশ্রু প্রবাহিত করছিলো। তাঁর দৃঢ় কঠিন মনোবলও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলো, তাঁর উঠানামা করছিলো। অতঃপর তিনি নবী করীম -এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন, এরপর অধোমুখী হয়ে নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরালেন এবং বললেন, আপনার জীবন ও মরণ শুভ হোক। আপনার বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে যা অন্য কোনো নবী দ্বারা বন্ধ হয়নি। প্রশংসার অনেক ঊর্ধ্বে আপনার অবস্থান, শোক-সন্তাপের ক্ষুদ্রগণ্ডি থেকে বিশালতায় আপনার ব্যাপ্তি। যদি আপনার ওফাতের ক্ষেত্রে ইচ্ছা-অনিচ্ছার অবকাশ থাকত, তবে আপনার পরিবর্তে আমি নিজের জীবনটা সঁপে দিতাম। হে মুহাম্মদ ! আপনার প্রভুর কাছে আমাদের কথা স্মরণে রাখুন। আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় আমাদের একটু জায়গা দিন।”[6]
অপর এক বর্ণনা আছে, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন তখন সাহাবায়ে কিরামের মাঝে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি-না এ-ব্যাপারে মত- পার্থক্য দেখা দেয়।[7]
হযরত আনাস (ইবনে মালিক) বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন, তখন লোকজন অত্যন্ত কান্নাকাটি করছিলেন। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদে দাঁড়িয়ে এক ভাষণে বললেন, হযরত মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন এ-ধরনের মন্তব্য আমি বরদাশত করবো না। হ্যাঁ, তাঁকে প্রভুর কাছে ডেকে নেওয়া হয়েছে, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান-কে ডেকে নেওয়া হয়েছিলো; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ রাত অন্যত্র অবস্থান করেছিলেন। আল্লাহর কসম! আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা নবী করীম মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।"[8]
হযরত ইকরামা বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন, তখন লোকজন অত্যন্ত কান্নাকাটি করছিলেন। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব আল্লাহর কসম! তিনি মৃত্যুবরণ করেননি; মুহাম্মদ সালাম মৃত্যুবরণ করেছেন এ-ধরনের মন্তব্য আমি বরদাশত করবো না। হ্যাঁ, তাঁকে প্রভুর কাছে ডেকে নেওয়া হয়েছে, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান-কে ডেকে নেওয়া হয়েছিলো; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ রাত অন্যত্র অবস্থান করেছিলেন। আল্লাহর কসম! আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা নবী করীম মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।'[9]
'হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন তখন হযরত আবু বকর সানহ তথা আলিয়ায় তাঁর স্ত্রী হযরত বিবতে খারিজা-এর কাছে ছিলেন। নবী করীম তাঁকে তাঁর স্ত্রীর নিকট যেতে অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব নিজের তরবারি বের করে যারা হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন বলছেন তাদেরকে ধমকাচ্ছিলেন। হযরত আবু বকর -এর এ- খবর পৌছুতেই তিনি সানহ থেকে সোজা হযরত আয়িশা-এর ঘরে আসেন। অতঃপর তিনি নবী করীম -এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন, এরপর নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরাতে সরাতে হাঁটু গেড়ে বসলেন, তাঁকে চুমু খেলেন এবং কাঁদছিলেন। আর বললেন, আপনার ওফাত হয়েছে; শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার জীবন ও মরণ কতই শুভ।'
ইমাম আত-তাবারী তাঁর আর-রিয়ায গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন।[10] আর অন্য কয়েকটি বর্ণনায় এসেছে যে, 'ফাওয়াযউল বুরদা আন ওয়াজহিহি... তিনি নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরিয়ে তাঁর মুখ নবী করীম -এর মুখ মুবারক বরাবর রেখে সুঘ্রাণ নেন। তারপর তাঁকে কাপড়ে আচ্ছাদিত করে দেন তথা তিনি তাঁর ওফাতের ঘ্রাণ অনুভব করেন।[11]
আরও বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর শুনে অবস্তিত তাঁর বাড়ি থেকে ঘোড়ায় চড়ে চলে এলেন-মদীনা অধিবাসী খাযরাজের বংশধর হারিস গোত্রের একটি গ্রাম; যা নবী করীম -এর ঘরের মাঝে এক মাইলের দূরুত্বে অবস্থিত- (হযরত আয়িশা) বলেন, তিনি নেমে সোজা মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে লোকদের সাথে কোনো কথা না বলে হযরত আয়িশা -এর ঘরে প্রবেশ করে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর দিকে অগ্রসর হলেন। তখন তিনি একখানি 'হিবারা' চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। হযরত আবু বকর নবী করীম -এর মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে তাঁর ওপর ঝুকে পড়লেন এবং চুমু খেলেন, তারপর কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু বরাদ্দ করেননি। তবে যে-মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিলো তা তো আপনি কবুল করেছেন।' হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন।[12]
(লা ইয়াজমাউল্লাহু আলাইকা মাওতাতাইনি) (আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু একত্রিত করবেন না।) হযরত আবু বকর -এর এই বক্তব্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারো মতে, এ-বক্তব্যে সুস্পষ্টত যারা নবী করীম পুনরুত্থিত হবেন ধারণা করেন এবং (এর বিরুদ্ধবাদী) লোকের হাত-পা কেটে নেবেন সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত করে। যদি তাদের ধারণা সঠিক হয় তবে তাঁকে দ্বিতীয়বার মৃত্যুবরণ করতে হবে। হযরত আবু বকর বিবৃতিতে বলেন, 'আন্নাহু আকরামু আলাল্লাহি... নবী করীম -এর মর্যাদা আল্লাহর নিকট তাঁর জন্য দুই দুইবার মৃত্যু নির্ধারণের চেয়ে অনেক বেশি। তবে অন্য অনেকের জন্য তিনি দুই দুইবার মৃত্যু ঠিক করেছেন; যেমন হাজার হাজার লোক যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। আরও যেমন- সেসব লোক যারা একটি বিশেষ গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে।
আর কারো কারো মতে, হযরত আবু বকর বুঝাতে চেয়েছেন যে, কবরে নবী করীম দ্বিতীয়বার মৃত্যুমুখোমুখী হবেন না। যেমন- সাধারণ মানুষকে পুনর্জীবিত করা হয়, এবং সওয়াল-জওয়াব পর্ব শেষে তারা পুনরায় মৃত্যুবরণ করে। অন্য কারো কারো মতে, আল্লাহ আপনার ইন্তিকালে আপনার শরিয়তের বিলুপ্তি ঘটাননি। অপর কারো কারো মতে, দ্বিতীয়বার মৃত্যু দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানসিক অস্থিরতা অর্থাৎ আজকের পর আপনি দ্বিতীয়বার মানসিক কষ্টে নিপতিত হবেন না। এসব বক্তব্য ফতহুল বারী থেকে উদ্ধৃত।[13]
وَعَنِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ خَرَجَ وَعُمَرُ يُكَلِّمُ النَّاسَ، فَقَالَ: اجْلِسْ يَا عُمَرُ فَأَبَى عُمَرُ أَنْ تَجْلِسَ، فَأَقْبَلَ النَّاسُ إِلَى أَنْ بَكْرٍ، وَتَرَكُوْا عُمَرَ، فَقَالَ أَبُو বকর... 'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর বের হয়ে আসেন তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব ) লোকজনের সাথে কথা বলছিলেন। এ-সময় (হযরত আবু বকর ) তাঁকে বলেন, হে ওমর! বসে পড়। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব ) বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব )-কে ছেড়ে হযরত আবু বকর-এর প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তখন হযরত আবু বকর একটি ভাষণ দিলেন, এরপর আপনাদের মধ্যে যারা হযরত মুহাম্মদ -এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ চিরঞ্জীব, চির অমর। মহান আল্লাহ বলেন, 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূলুন কদ খলাত মিন ক্ববলিহির রুসুলু... হযরত মুহাম্মদ একজন রাসূলমাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।”[14] হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম! হযরত আবু বকর-এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানতো না যে, আল্লাহ এরূপ আয়াত নাযিল করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সকলে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন।[15]
সহীহ আল-বুখারী গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু বকর যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) বসে পড়লেন। হযরত আবু বকর আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, যারা হযরত মুহাম্মদ -এর ইবাদত করতে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মদ ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে তারা নিশ্চিত জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি অমর। তারপর হযরত আবু বকর তিলাওয়াত করলেন, 'নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[16] তিনি আরও তিলাওয়াত করলেন, 'মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।[17] বর্ণনাকারী বলেন, (হযরত আবু বকর -এর একথা শুনে) ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নারত লোকজনের কাঁদা থেমে যায়।[18]
ইমাম ইবনে আবু শায়বা-বর্ণিত হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর-এর হাদীসে আছে, 'ইন্না আবা বাকরিন মাররা বি উমারা... হযরত আবু বকর হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-কে সাথে নিয়ে চলে যান; হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) যেতে যেতে বলছিলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইত্তিকাল করেননি। আল্লাহ মুনাফিকদের ধ্বংস করে দেবেন।"[19] কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, 'হাত্তা ইউফনিয়াল মুনাফিকীন... মুনাফিকরা ধ্বংস হোক।'[20]
বর্ণনাকারী বলেন, মুনাফিকরা সেদিন বেশ উল্লসিত হয়েছিলো, তারা সেদিন মাথা সোজা করে দাঁড়িয়েছিলো। তাই হযরত আবু বকর বলেন, হে লোকসকল! নিশ্চয় হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন। তোমরা কি আল্লাহর বাণী শোননি?: 'ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন... নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[21] হযরত আবু বকর আরও বলেন, (আল্লাহর বাণী:) 'ওয়ামা জাআলনা লিবাশারিন মিন ক্ববলিকাল খুলদা... আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি।' অতঃপর হযরত আবু বকর মিম্বরে আরোহন করেন।"[22]
ইমাম আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব থেকে শুনেছেন যে, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মসজিদে হযরত আবু বকর -এর হাতে বায়আত অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) নবী করীম - এর মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রথমে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন, অতঃপর হামদ-সালাত পড়লেন এবং লোকদের সম্বোধন করে বললেন, হে লোকসকল! গতকাল আমি তোমাদেরকে একটি কথা বলেছিলাম কিন্তু আমি যেমনটি বলেছি, বাস্তবতা সেরূপ নয়। আল্লাহর কসম! আমি যা বলেছি আল্লাহর কিতাব এবং হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এ তার প্রমাণ নেই। আসলে আমার আশা ছিলো যে, আমাদের মৃত্যুর পরও হযরত রাসূলুল্লাহ আমাদের থেকেও দীর্ঘ বেঁচে থাকবেন অর্থাৎ আমাদের পরেই তিনি ওফাত পাবেন-অথবা কোনো বাক্য তিনি বলেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসুলের জন্য তাঁর নিকট উপস্থিতিই পছন্দ করেছেন, চিরদিন তোমাদের সামনে বেঁচে থাকার ওপর। আর এই মহাগ্রন্থ যা আল্লাহ তাঁর রাসুলের মাধ্যমে হিদায়েতের বার্তারূপে পেশ করেছেন, তোমরা সবাই দৃঢ়ভাবে সে-মতো জীবন গড়ো, আলোকপ্রাপ্ত হবে। ঠিক হযরত রাসূলুল্লাহ-এর আদর্শ অনুযায়ী আমল কর।”[23]
ইমাম আবু নসর বলেন, 'বস্তুত হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) হয়তো প্রচণ্ড মর্মযাতনা, মুনাফিকদের আত্মপ্রকাশ আশঙ্কা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা দমনের মানসিকতা থেকে উপর্যুক্ত বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে সেই পরিস্থিতিতে সিদ্দিকে আকবর (হযরত আবু বকর)-এর দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করলেন এবং তাঁর কণ্ঠে আল্লাহ -এর বাণী: 'কুল্লু নাফসিন যোয়িকতুল মাওত... প্রত্যেক প্রাণীর অবধারিত।”[24] এবং তিনি আরও ইরশাদ করেন, 'ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন... নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[25] প্রতিধ্বনিত হওয়ায় উপর্যুক্ত বক্তব্য থেকে তিনি ফিরে আসেন।"[26]
ইমাম ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, হযরত আবু যুওয়াইব আল-হুযালী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম -এর অসুস্থতার খবর পেয়ে আমাদের গোত্রের মাঝে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ রাত নির্ঘুম কাটিয়ে ভোরের সময় একটু ঘুম এলে এক অদৃশ্য কণ্ঠে নিম্নের কবিতাটি ধ্বনিত হলো:
এটি একটি বড় ঘটনা যে, ইসলাম তার বাগানে মজবুত মাটিতে শিকড় গেড়েছে আর হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা বিদায় নিয়েছেন। তাঁর বিরহবেদনায় আমার দু'চোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা বইতে শুরু করেছে।
অতঃপর ভয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আমি আসমানের দিকে চোখ ফেরাতেই সেখানে সা'আদুয যাবিহ (বিষুবরেখা) দেখতে পাই। এতে আমি নিশ্চিত হই যে, নবী করীম নিশ্চয় বিদায় নিয়েছেন বা তিনি বিদায় নিতে যাচ্ছেন। অতঃপর আমি দ্রুত মদীনা পৌঁছুলাম, (এসে দেখি) হাজিরা ইহরামের সময় যেভাবে পাগলবেশে লাব্বায়েক বলতে থাকে মদীনাবাসীরা সেখানে বেসামাল কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? তাদের কেউ একজন বলল, হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন।”[27]
ইমাম আদ-দামীরী তাঁর হায়াতুল হায়ওয়ান গ্রন্থে বর্ণনা করেন, ইমাম আল-ওয়াকিদী থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর শায়খবর্গ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলেছেন, যখন নবী করীম ﷺ-এর ওফাত নিয়ে মানুষের মাঝে সংশয় দানা বাঁধে; তখন হযরত আসমা বিনতে উমায়স স্বীয় হাত নবী করীম -এর কাঁধে রেখে বললেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন। কারণ নবী করীম -এর কাঁধ থেকে মোহরে নুবুওয়ত উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ থেকে পরিস্কার যে, নবী করীম ইত্তিকাল করেছেন।[28] হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী ও ইমাম আবু নুআইম (আল- আসবাহানী) বর্ণনা করেছেন।[29]
وَرُوِيَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ: وَضَعْتُ يَدِي عَلَى صَدْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ يَوْمَ مَاتَ... 'এ ছাড়াও হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তিকালের সময় আমার হাতটি তাঁর পবিত্র বুকের ওপর রেখেছিলাম। এরপর অনেক দিন অতিবাহিত হয়েছে, আমি খাবার খেয়েছি, অযু করেছি। তবুও আমার হাত থেকে মিশকের সুগন্ধি যায়নি।”[30]
ইমাম আবু নুআইম (আল-আসবাহানী) বর্ণনা করেন, হযরত আলী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন, তখন মালাকুল মওত কাঁদতে কাঁদতে আসমানে পৌছুান। সেই সত্ত্বার কসম! যিনি তাঁকে সত্যসহকারে প্রেরণ করেছেন তখন আমি আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পাই, হে মুহাম্মদ! এ-মসিবতের সামনে অন্য সব মসিবত তো অত্যন্ত সহজ।'[31]
টিকাঃ
[1] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪, পৃ. ৩০৪, হাদীস: ২৫০৬
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ২২৪, হাদীস: ১৭৩৩
[3] আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৬-৪৭
[4] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়াতুন নাবরা, খ. ১, পৃ. ১৪৩
[5] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৭
[6] আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৭
[7] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৭
[8] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৩৩, হাদীসঃ ২২৩২
[9] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৩৩, হাদীস: ২২৩৩
[10] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়ামুন নাবরা, খ. ১, পৃ. ১৪৫
[11] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৪৪
[12] (ক) ইয়াকুত আল-হামওয়ী, মুজামুল বুলসান, খ. ৩, পৃ. ২৬৫; (খ) আল-বুখারী, জাস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৭১, হাদীসঃ ১২৪১
[13] ইবনে হাজর আল-আসকালানী, ফতহুল বারী, খ. ৩. পৃ. ১১৪
[14] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪
[15] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬. পৃ. ১৩, হাদীস: ৪৪৫৪
[16] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[17] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪
[18] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ৬, হাদীস: ৩৬৬৭ ও ৩৬৬৮
[19] ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৪২৭, হাদীস: ৩৭০২১
[20] ইসহাক ইবনে রাহাওয়াই, আল-মুসনদ, খ. ৩, পৃ. ৯৯১, হাদীসঃ ১৭১৮, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[21] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[22] (ক) ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৪২৭, হাদীস: ৩৭০২১; (খ) আল-কুরআন, সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৪
[23] ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, খ. ১৪, পৃ. ৫৮৯-৫৯০, হাদীস: ৬৬২০
[24] আল-কুরআন, সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৪
[25] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[26] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭০
[27] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ১৭, পৃ. ৫৪, হাদীসঃ ২০২৭৮
[28] আদ-দামীরী, হায়াতুল হায়ওয়ান, খ. ১, পৃ. ৩২৪
[29] আল-বায়হাকী, দালায়েলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৮
[30] আল-বায়হাকী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৯
[31] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭১
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর গোসলের আলোচনা
নবী করীম ﷺ-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর-এ খলীফা মনোনীত হওয়া এবং তাঁর হাতে লোকজনকে বায়আত সম্পন্ন হওয়া মধ্য দিয়ে আল্লাহর মেহেরবানিতে উম্মার ঐক্য অটুট থাকে এবং যাবতীয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে। হযরত আবু বকর-এর বায়আত সম্পন্নে অব্যবহিত পর সাহাবাগণ নবী করীম-এর শেষক্রিয়া ও এর প্রস্তুতির জন্য মনোযোগী হন।
বর্ণিত আছে যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করা হল, নবী করীম ﷺ-এর গোসল কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে? জবাবে তিনি বলেছেন, হযরত আব্বাস একটি ঝিল্লিসমৃদ্ধ ইয়ামেনি চাদর দিয়ে তাঁর চারপাশে পর্দা টাঙিয়ে নেন। পরবর্তী কালে এটি আমাদের মাঝে এবং অনেক পুণ্যবানদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে যায়। এরপর বনী হাশিমের লোকরা যারা পর্দা ও দেওয়ালসমূহের মাঝে বসা ছিলেন তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হল। তারপর হযরত আব্বাস পর্দার ভেতরে প্রবেশ করে হযরত আলী, হযরত ফযল, হযরত আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ও হযরত উসামা ইবনে যায়দ-কে ডেকে নেন। অতঃপর যখন তাঁরা সবাই পর্দার ভেতরে সমবেত হলেন, তাঁরা, পর্দার বাইরের লোকজন এবং পরিবার-পরিজন সকলেই হঠাৎ নিদ্রা আচ্ছন্ন করে ফেললো। এরপর একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হল, নবী করীম ﷺ-কে গোসল দিও না, তিনি সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র। তবে হযরত আব্বাস বললেন, তবুও গোসল দিতে হবে। আর নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, এই আওয়াজ সম্পূর্ণ সত্য। অতএব তাঁকে গোসল দিতে হবে না। হযরত আব্বাস বললেন, কে বা কার যাকে আমরা জানি না সেরকম একটি আওয়াজ শুনে আমরা সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। এরপর তাঁরা সবাই আবারো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলেন। এবারও একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তিনি বললেন, তোমরা হযরত রাসূলুল্লাহ-কে গোসল দিতে পার, তবে কাপড়সহ তাঁকে গোসল দেবে। নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, না, এটি হতে পারে না। হযরত আব্বাস বললেন, হ্যাঁ, এটিই ঠিক থাকলো।
আর হযরত আব্বাস যখন পর্দার ভেতর গোসলের জন্য গেলেন চারজানু বিছিয়ে বসলেন, হযরত আলীও চারজানু বিছিয়ে বসলেন; তাঁরা উভয়ে মুখোমুখি (হয়ে বসলেন) এবং নবী করীম ﷺ-কে উভয়ের কোলে বসালেন। অতঃপর আওয়াজ আসল, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে চিৎ করে শোয়ানো হোক এবং পর্দাসহকারে গোসল দেওয়া হোক। অতঃপর তাঁরা তক্তা থেকে সরে গেলেন এবং এর ওপর নবী করীম ﷺ-কে শোয়ালেন। তক্তার পা পূর্ব দিকে আর মাথা পশ্চিম দিকে ছিল। এরপর গোসলের কাজ আরম্ভ করা হলো। তাঁর শরীরের জামা ছিল; যার একটি আস্তিন একদিক থেকে খোলা ছিল। এর ওপরই তাঁকে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দেওয়া হয় এবং কাফুরের সুগন্ধি লাগানো হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-এর জামা ও আস্তিন নিংড়ানো হয় এবং কপালে সাজদার অংশ ও শরীরের জোড়াগুলোতে সুগন্ধি মাখানো হয়। নবী করীম ﷺ-এর চেহারা, দুই হাত কনুই পর্যন্ত অংশগুলো অযুর পদ্ধতিতে ধোয়া হয়। এরপর তাঁর জামা ও খোলা আস্তিনের ওপরই কাফন পরানো হয় এবং বেজোড় সংখ্যায় তাঁকে সুগন্ধির ধূপ করা হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-কে উঠিয়ে খাটিয়ার ওপর শোয়ানো হয় এবং ঢেকে দেওয়া হয়।
আর হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, যখন সাহাবাগণ হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে গোসল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁদের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়; তাঁরা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা কি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাপড় খুলে ফেলব, যেমন- আমরা আমাদের অন্যান্য মৃত ব্যক্তির কাপড় খুলে ফেলি অথবা আমরা তাঁকে কাপড় পরা অবস্থায় গোসল দেব? যখন তাঁরা এ-নিয়ে তাঁদের মতভেদ করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেন। এমনকি তাঁদের একজনও ছিলেন না (নিদ্রার কারণে) যার থুতনী তার বুকের ওপর আপতিত হয়নি। এ-সময় জনৈক ব্যক্তি ঘরের এক কোণা থেকে বলল, তাঁরা জানতেন না তিনি কে: যে তোমরা নবী করীম ﷺ-কে তাঁর পরিধেয় কাপড়সহ গোসল দাও। তখন সাহাবাগণ উঠে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কাপড়সহ গোসল দিতে শুরু করেন। তখন তাঁর পরনে জামা পরিহিত ছিল।
তাঁরা জামার ওপর পানি ঢেলে দেন এবং ওই জামা দিয়ে তাঁর দেহ মুবারক ঘর্ষণ করেন। হযরত আয়িশা বলেন, আমি যদি আগে বুঝতে পারতাম, যা আমি পরে বুঝতে পারি, তবে তাঁকে তাঁর বিবিগণ ছাড়া আর কেউই গোসল দিতে পারত না।
অনেকের মতে, নবী করীম ﷺ-এর গোসলে আরও যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা হলেন, চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, তাঁরই দু'ছেলে: হযরত ফযল (ইবনে আব্বাস) ও হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস), নবী করীম ﷺ-এর পরম ভক্ত হযরত উসামা ইবনে যায়দ এবং নবী করীম ﷺ-এর ক্রীতদাস হযরত শুকরান প্রমুখ।
হযরত আলী নবী করীম ﷺ-কে বড়ই (পাতায় সিদ্ধ) পানি দিয়ে গোসল দেন। সচরাচর মৃত লোকজনের শরীরে যা পরিদৃষ্ট হয়; আল্লাহর রাসুলের শরীরে তার কিছুই দেখা যায়নি। হযরত আলী বলেন, তাঁর ওপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আপনি জীবনে-মরণে কতই না পূত-পবিত্র। হযরত আলী নিজের হাতে কাপড় মুড়িয়ে নবী করীম-এর জামার নিচে হাত চালিয়ে গোসল করান। নবী করীম ﷺ-এর প্রথম গোসল ছিল খালি পানি দিয়ে, দ্বিতীয়বার বরই পাতার পানি দিয়ে আর তৃতীয়বারে কাপুর মিশ্রিত পানি দিয়ে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫১০, হাদীস: ১৫৯৯
২. আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৮৫
৩. আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭০
৪. ইবনে কাসীর, আস-সীরাতুন্নাবাবিয়া, খ. ৪. পৃ. ৫২১
৫. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৯৬-১৯৭, হাদীস: ৩১৪১; (খ) আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৮-৫৯
৬. আত-তাবরীযী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৬৭৫-১৬৭৬, হাদীস: ৫৯৪৮ (৫)
৭. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৪২, হাদীস: ৩১৯৬
৮. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪, পৃ. ১৮৬-১৮৭, হাদীস: ২৩৫৭
৯. আল-বাযযার, আল-বাহরুষ বাঘযার, খ. ২, পৃ. ১৩৫-১৩৬, হাদীস: ৯২৫
১০. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৭১, হাদীস: ১৪৬৮
১১. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৫, হাদীস: ৬৬৫৭
১২. আস-সামহুদী, ওয়াফাউল ওয়াফা, খ. ৩, পৃ. ১৪৪
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর কাফনের আলোচনা
অতঃপর সাহাবাগণ নবী করীম ﷺ-এর গোসল সম্পন্নের পর তাঁর শরীর মুছে শুকিয়ে নেন। তারপর অন্যান্য মৃত মানুষের সাথে যা যা করা হয় নবী করীম ﷺ-এর বেলায়ও তার সবই করা হয়। এরপর ৩টি কাপড় পরানো হয়; যার দুটো ছিল সাদা ও অন্যটি ছিল ইয়েমেনি চাদর।
হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী করীম ﷺ-কে ৩টি সাহুলী-ইয়েমেনের একটি শহর-সাদা চাদরে কাফন দেওয়া হয়েছে। এতে জামা ও পাগড়ি ছিল না। তিনি (হযরত আয়িশা) বলেন, আমি হযরত আবু বকর -এর কাছে গিয়েছিলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। এরপর অসুস্থকালীন তাঁর পরিধেয় কাপড়ের প্রতি লক্ষ করে তিনি বললেন, আমার এ কাপড়টি ধুয়ে তার সাথে আরও দুটো কাপড় বৃদ্ধি করে আমার কাফন দেবে। আমি (হযরত আয়িশা) বললাম, এতো পুরোনো! তিনি বললেন, মৃতব্যক্তির চেয়ে জীবিতদের নতুন কাপড়ের অধিকার বেশি। আর কাফন হল বিগলিত শবদেহের জন্য।
ইমাম আবু আবদুল্লাহ মালিক ইবনে আনাস -এর মুওয়াত্তায় আছে, কُفِّنَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي ثَلَاثَةِ أَثْوَابِ حِبَرَةٍ وَسَخَّارِيْنَ... 'হযরত রাসূলুল্লাহ-কে ৩টি ইয়েমেনি ও সাহারি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে।” আল-ইকলীল গ্রন্থে আছে, নবী করীম-কে ৭টি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে। আর এ-বিষয়ে সবাই একমত যে, নবী করীম ﷺ-এর কাফনে জামা ও প্রিয় পাগড়ি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নবী করীম ﷺ-এর কাফনে কাফুর মেশানো হয়েছিল। কারো মতে, সুগন্ধি মেশানো হয়েছিল।
হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, নবী করীম-কে ৩টি সাদা সূতি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে। শায়খ তকীউদ্দীন ইবনে দাকীকুল ঈদ বলেছেন, 'উদ্দেশ্যগতভাবে কাফনে জামা ও পাগড়ি আসলেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' ইমাম আন-নাওয়াওয়ী সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, 'নিশ্চয়ই প্রথম মতটিই (কাফনে জামা ও পাগড়ি আসলেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না) অধিকাংশ আলিমের মত।'
টিকাঃ
১. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৮
২. আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭১
৩. আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৬০
৪. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৩, পৃ. ৩১২, হাদীস: ৯৯৬
৫. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৭৭, হাদীস: ১২৭৩; (খ) মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ১, পৃ. ৩৯৯, হাদীস: ১০১০
৬. ইবনে দকীকুল ঈদ, ইহকামুল ইহকাম, খ. ১, পৃ. ৩৬৬, হাদীস: ১৫৯ (৪)
৭. আন-নাওয়াওয়ী, আল-মিনহাজ, খ. ৭, পৃ. ৭, হাদীস: ৯৪১