📄 নবী করীম (সাঃ)-এর প্রচণ্ড অসুস্থতার আলোচনা
নবী করীম -এর প্রচণ্ড অসুস্থতার সময়কাল ছিলো ১২ দিন মতান্তরে ১৮ দিন। আর হযরত রাসূলুল্লাহ অসুস্থতার সময় ইরশাদ করেন, 'সুদ্দু হাযিহিল আবওয়াবাশ শারিয়া... মসজিদে আসা-যাওয়ার এসব দরজা বন্ধ করে দাও, হযরত আবু বকর -এর দরজাটি ছাড়া। কারণ সাহাবাদের মধ্যে আবু বকরের চেয়ে আমার সর্বাধিক উপকারী ব্যক্তি হিসেবে কাউকে জানি না।'[1]
অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'সুদ্দু আন্নি কুল্লা খাওখাতিন... আমার রুম থেকে মসজিদ দিকের সব জানালা বন্ধ করে দাও, আবু বকরের জানালাটি ছাড়া।"[2]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، جَاءَ أَبُو بَكْرٍ ﷺ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ ائْذَنْ لِي فَأُمَرِّضُكَ وَأَكُوْنُ الَّذِي أَقُومُ عَلَيْكَ، فَقَالَ: «يَا أَبَا بَكْرًا إِنْ لَّمْ أَحْمِلْ أَزْوَاجِيْ وَبَنَانِ وَأَهْلَ بَيْتِي عِلَاجِي ازْدَادَتْ مُصِيبَتِيْ عَلَيْهِمْ عِظَمًا، وَقَدْ وَقَعَ أَجْرُكَ عَلَى اللَّه».
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সেবাশুশ্রূষার জন্য আমাকে আপনার খিদমতে থাকার অনুমতি প্রদান করুন। অতঃপর নবী করীম বললেন, 'হে আবু বকর! যদি আমার সহধর্মিনী, কন্যা ও ঘরের সদস্যদেরকে আমার সেবা-শুশ্রূষা থেকে অব্যাহতি দেই তবে আমার কারণে তারা বেশ ব্যথিত হবে। তোমার সওয়াব আল্লাহর দায়িত্বে অর্পিত হয়ে গেছে।”[3]
নবী করীম -এর অসুস্থ সময়ের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নবী করীম অসুস্থতার সময় লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন যে, 'ইন্নাল্লাহা খয়য়্যারা আবদান... আল্লাহ তাঁর প্রিয় এক বান্দাকে পার্থিব ভোগ-বিলাস এবং এর মধ্যে রক্ষিত নিয়মতসমূহ এ-দু'য়ের মধ্যে যেকোনো একটি গ্রহণ করার ইখতিয়ার দান করেছেন। আর ওই বান্দা আল্লাহর নিকট রক্ষিত নিয়মতসমূহ গ্রহণ করেছেন। একথা শুনে হযরত আবু বকর কাঁদতে শুরু করলেন। হযরত আবু বকর -এর অবস্থা দেখে বিস্মিত হলাম। হযরত রাসূলুল্লাহ এক বান্দার খবর দিচ্ছে যাকে এভাবে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে (তাতে কান্নার কারণ কী থাকতে পারে?) কিন্তু আমরা পরে বুঝতে পারলাম যে, ওই বান্দা ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ। আর হযরত আবু বকর আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন।”[4]
وَأَنَّهُ أَعْتَقَ فِي مَرَضِهِ أَرْبَعِينَ نَفْسًا.
'আর নবী করীম অসুস্থতার সময় ৪০ জন গোলাম আযাদ করেন।'[5]
আরও বর্ণিত আছে, 'ইন্না রাসূলুল্লাহ ﷺ লাম ইয়াশতাকি শাকওয়াতুন... হযরত রাসূলুল্লাহ অসুস্থ হলে তবে তিনি আল্লাহ-এর কাছে আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করতেন। কিন্তু যে-অসুস্থতায় তিনি ওফাত পান সে-রোগে তিনি সুস্থতার জন্য দুআ করেননি। বরং তিনি নিজেকে সতর্ক করে বলছিলেন যে, 'ইয়া নাফসু মা লাকি তালুযিনা কুল্লা মালাদিন... ওহে নফস (প্রবৃত্তি)! কী হলো তোমার, সবত্রই তুমি আশ্রয় প্রার্থনা করবে!'[6]
নবী করীম-এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: 'ইন্নাহু আসাররা ইলা ফাতিমাহ... তিনি হযরত ফাতিমা -কে অস্ফুটভাবে কি যেন বললেন, এতে তিনি কাঁদ লাগলেন। এরপর অস্ফুটভাবে আবারও কিছু একটা বললেন, এতে তিনি হাসতে শুরু করেন। হযরত আয়িশা বলেন, আমি হযরত ফাতিমা -কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করি, জবাবে তিনি বললেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -এর রহস্য ফাঁস করতে চাই না। নবী করীম -এর ওফাতের পর একসময় ফাতিমাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, নবী করীম আমাকে অস্ফুটভাবে বলেছেন, 'প্রতিবছর হযরত জিবরাঈল আমাকে একবার কুরআন শুনিয়ে থাকেন কিন্তু এ-বছর শুনিয়েছেন দু'বার। এ থেকে আমি এই আভাস পাই যে, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সবার আগে আমার কাছে পৌছুবে।' একথা শুনে আমি কাঁদতে শুরু করি। এরপর তিনি বললেন, 'তুমি কি খুশি নও যে, তুমি এ-উম্মতের নারীকুল বা মুমিন নারীকুলের সরদার হবে?' একথা শুনে আমি হাসতে থাকি।”[7]
নবী করীম-এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: নবী করীম অসুস্থতার দিনগুলোতে লোকজনের ইমামতি করেছেন। তিনদিন ইমামতিতে তিনি অপারগ ছিলেন। কারো মতে, ১৭ ওয়াক্ত সালাতে তিনি অপারগ ছিলেন। তারপর সালাতের আযান হওয়া সত্ত্বেও প্রথম যে-সালাতে নবী করীম ইমামতি করেননি তা ছিলো সালাতুল ইশা।[8] তিনি বললেন, 'মুরু আবা বাকরিন ফাল ইউসাল্লি বিননাস... হযরত আবু বকর -কে বলো, তিনি যেন লোকজনের ইমামতি করেন।”[9]
عَنِ الزُّهْرِيُّ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَمْعَةَ: «مُرِ النَّاسَ فَلْيَصُلُّوا»، فَخَرَجَ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ زَمْعَةً، فَلَقِيَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، فَقَالَ: صَلِّ بِالنَّاسِ، فَصَلَّى عُمَرُ بِالنَّاسِ، فَجَهَرَ بِصَوْتِهِ وَكَانَ جَهِيْرَ الصَّوْتِ، فَسَمِعَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ، فَقَالَ: «أَلَيْسَ هَذَا صَوْتَ عُمَرَ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ! فَقَالَ: «يَأْبَى اللَّهُ ذَلِكَ وَالْمُؤْمِنُونَ، لِيُصَلِّ بِالنَّاسِ أَبُوْ بَكْرٍ».
'ইমাম আয-যুহরী থেকে বর্ণিত, নবী করীম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ -কে বললেন, 'লোকজনকে বলো, সালাত পড়ে নিতে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ বেরুলেন, পথে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাঁকে বললেন, লোকজনের সালাত পড়িয়ে দিন। অতঃপর হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) সালাত পড়ালেন। তিনি উচ্চকণ্ঠে সালাত পড়ালেন, যেহেতু তিনি উঁচুকণ্ঠী ছিলেন। হযরত রাসূলুল্লাহ তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে জিজ্ঞেস করলেন, 'এই কণ্ঠস্বর কি ওমরের নয়'? লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! হ্যাঁ। অতঃপর তিনি বললেন, 'আল্লাহ ও মুমিনগণ এটা পছন্দ করেন না। তোমরা আবু বকরকে বলবে ইমামতি করতে।”[10]
অনুরূপ বিবৃত হয়েছে আল-মুনতাকি কিতাবে। শরহুল মাওয়াকিফে আছে, নবী করীম -এর অসুস্থতার একসময় হযরত বিলাল সালাতের আযান ঘোষণা করলে নবী করীম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ-কে বললেন, 'যাও, আবু বকরকে বল, সালাত পড়াতে।' (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ) যখন বেরুচ্ছিলেন দরজায় হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) -কেই পাওয়া গেলো, সমবেত লোকজনের মধ্যে হযরত আবু বকর ছিলেন না। তাই (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ) বললেন, হে ওমর! আপনিই লোকজনের সালাতে ইমামতি করুন। অতঃপর যখন তিনি তাকবীর বললেন, তিনি জোরালো গলার লোক ছিলেন। নবী করীম তাঁর (উঁচু কণ্ঠ) শুনে বললেন, 'ইয়াবাল্লাহু ওয়াল মুসলিমুনা ইল্লা আবা বাকরিন... আল্লাহ ও মুসলিমরা এটা পছন্দ করেন না, তবে আবু বকর (লোকদের সালাত পড়াবে)।' একথা তিনি তিনবার বললেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ-কে বললেন, তুমি খুব মন্দ কাজ করলে। আমি তো মনে করেছিলাম, আল্লাহর রাসূল তোমাকে নির্দেশ করেছেন আমাকে আদেশ করতে। (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যামআ) বলেন, না, আল্লাহর কসম! আমার পক্ষ থেকে কাউকে আদেশ করতে নবী করীম আমাকে আদেশ করেননি।”[11]
আরও বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত বিলাল আযান দেওয়ার পর নবী করীম -এর দরজায় গিয়ে বললেন, আস-সালামু আলায়কুম ইয়া রাসূলাল্লাহ! (ওহে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)। জবাবে নবী করীম বললেন, ‘আবু বকরকে বল, লোকজনকে নিয়ে সালাত পড়াতে।’ একথা শুনে হযরত বিলাল হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে বেরিয়ে আসলেন আর বললেন, হায় ফরিয়াদ! আশা- আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে গেছে, কোমর ভেঙে গেছে। যদি আমার মা আমাকে জন্ম না দিতেন তবেই উত্তম হতো, যখন তিনি আমাকে জন্ম দিলেনই তবে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর এমন অসুস্থাবস্থা কেন আমাকে দেখতে হল! এরপর তিনি মসজিদে এসে বললেন, হে আবু বকর! হযরত রাসূলুল্লাহ আপনাকে সালাতে ইমামতি করার হুকুম করেছেন। অতঃপর হযরত আবু বকর যখন মসজিদে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর শূন্যতা দেখতে পেলেন-তিনি অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ-তাই এতে তিনি স্থির থাকতে পারলেন না, মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। ফলে সাধারণ মুসলিমদের মাঝে শোরগোল পড়ে গেলো। হট্টগোলের আওয়াজ শুনে হযরত রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হে ফাতিমা! এই হইচই কিসের'? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অনুপস্থিতির কারণে মুসলিমরা হায়-হুতাশ করছে। তখন তিনি হযরত আলী ও হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-কে ডেকে পাঠালেন। তাঁদের কাঁধে ভর করে মসজিদে গেলেন এবং সালাত পড়ালেন। অতঃপর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে মুসলিম-সমাজ! তোমাদেরকে আল্লাহর নিরাপত্তা ও তাঁর হিফাযতে সোপর্দ করলাম। আল্লাহর কসম! আমার একজন খলীফা থাকবে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর আনুগত্যে সুদৃঢ় থেকো। কারণ আমি শিগগিরই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি।”[12]
وَعَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: لَمَّا ثَقُلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ جَاءَ بِلَالٌ يُؤْذِنُهُ بِالصَّلَاةِ فَقَالَ: «مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ»، قَالَتْ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ أَسِيْفٌ وَإِنَّهُ مَتَى يَقُوْمُ মাকামাকা... 'আর হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন অসুস্থত হয়ে পড়লেন, হযরত বিলাল তাঁকে সালাতের কথা জানাতে তাঁর কাছে আসলেন, তিনি বললেন, 'আবু বকরকে লোকজনকে নিয়ে সালাত পড়াতে বলো।' (হযরত আয়িশা) বললেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হযরত আবু বকর অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি আপনার জায়গায় দাঁড়ালে লোকজনকে (কিরাআত) শোনাতে সক্ষম হবেন না। আপনি যদি হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-কে নির্দেশ দিতেন! তিনি বললেন, 'লোকজনকে নিয়ে সালাত পড়ার জন্য আবু বকরকে নির্দেশ দাও।' (হযরত আয়িশা) বললেন, এরপর আমি হাফসা- কে বললাম, তুমি ব্যাপারটি নিয়ে নবী করীম-এর সাথে কথা বল। তখন হযরত হাফসা তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! হযরত আবু বকর তো অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি যখন আপনার জায়গায় দাঁড়াবেন, লোকজনকে (কিরাআত) শোনাতে সক্ষম হবেন না। আপনি যদি হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-কে নির্দেশ দিতেন। তখন নবী করীম বললেন, 'ইন্নাকুন্না সওয়াাহিবু ইউসুফা... তোমরা তো দেখছি হযরত ইউসুফ-এর স্ত্রীদের মতোই। যাও! আবু বকরকে লোকজনকে নিয়ে সালাত পড়তে বলো।' বর্ণনাকারী বলেন, হযরত আবু বকর-কে ব্যাপারটি অবগত করা হলো। অতঃপর তিনি যখন সালাত আরম্ভ করলেন, নবী করীম কিছুটা সুস্থতা বোধ করলেন। তিনি দাঁড়িয়ে দুজনের কাঁধে ভর করে মসজিদে আসলেন। তাঁর উভয় পা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে মাটিতে দাগ কেটে যাচ্ছিলো। হযরত আবু বকর তাঁর আগমন টের পেয়ে পিছে সরে আসতে প্রস্তুত হলেন। হযরত রাসূলুল্লাহ তাঁকে ইশারায় বললেন, 'নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে থেকো।' নবী করীম এসে হযরত আবু বকর-এর বামপাশে বসলেন। হযরত রাসূলুল্লাহ বসে বসে লোকজনের সালাত পড়ালেন এবং হযরত আবু বকর দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন। হযরত আবু বকর নবী করীম-এর সালাতের সাথে ইকতিদা করলেন আর লোকজন হযরত আবু বকর -এর সালাতের সাথে ইকতিদা করলো।”[13]
ইবনে হিশামের সিরাত-গ্রন্থে আছে, 'যখন হযরত রাসূলুল্লাহ আগমন করলেন, তখন লোকজন দুপাশে সরে যেতে লাগলো। ব্যাপারটি হযরত আবু বকর বুঝে গেলেন। কারণ লোকজন কেবল হযরত রাসূলুল্লাহ -এর আগমন- উপলক্ষ্যে এমনটি করে থাকে। তাই তিনি নিজের সালাতের জায়গা থেকে পিছনে সরতে চাইলেন। তখন হযরত রাসূলুল্লাহ তাঁর পিঠে হাত রাখলেন এবং বললেন, 'লোকজন নিয়ে সালাত পড়।' আর হযরত রাসূলুল্লাহ তাঁর (হযরত আবু বকর র) পাশে বসে পড়লেন এবং হযরত আবু বকর-এর ডানপাশে বসে বসে নবী করীম সালাত পড়লেন। সালাত শেষ হওয়ার পর হযরত আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া আপনার কিছুটা সুস্থতা লক্ষ করছি। আর আজকের এই দিনটি বিনত খারিজার পেটে পীড়ার দিন, আমি কি তাঁর কাছে যেতে পারি? নবী করীম বললেন, 'নিশ্চয়ই।' অতঃপর হযরত রাসূলুল্লাহ বাসায় প্রবেশ করেন এবং হযরত আবু বকর সুনখ নামক স্থানে অবস্থানরত নিজের পরিবার-পরিজনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।[14]
বস্তুত উল্লিখিত সবকটি বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আবু বকর-ই এ-সময় ইমাম ছিলেন। আরও বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ﷺ তাঁর উম্মতের মধ্যে কেবল আবু বকরের পেছনেই সালাত পড়েছেন। একবার সফরকালে আবদুর রহমান ইবনে আওফের পেছনে এক রাকাআত সালাত পড়েছিলেন।”[15]
وَعَنْ أَنْ سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، عَنْ أَبِيْهِ، أَنَّهُ كَانَ مَعَ النَّبِيِّ فِي سَفَرٍ غَزْوَةِ، فَذَهَبَ النَّبِيُّ ﷺ لِحَاجَتِهِ، فَأَقামুল... 'হযরত আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আওফ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা (হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি নবী করীম ﷺ-এর সাথে এক যুদ্ধাভিযানে সঙ্গে ছিলেন। সফরে নবী করীম ﷺ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান। এদিকে লোকেরা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ - এর ইমামতিতে সালাত শুরু করে দেয়। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ লোকজন কে নিয়ে এক রাকাআত সালাত পড়িয়েও ফেললেন, অতঃপর নবী করীম ﷺ আসলেন এবং হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর (হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর) পেছনে সালাত আদায় করেন। আর যা তিনি ছেড়েছিলেন তা পুরো করলেন এবং বললেন, 'মা কুবিযা নাবিয়্যুন হাত্তা ইউসাল্লিয়া খালফা রাজুলিন সলিহিন মিন উম্মাতিহি... কোনো নবীরই নিজের উম্মতের কোনো পূণ্যবান ব্যক্তির পেছনে সালাত না পড়া ছাড়া ওফাত হয়নি।”[16]
عَنِ الْمُغِيرَةِ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْسِيْتَ؟ قَالَ: «بَلْ أَنتَ نَسِيتَ، بِهَذَا أَمَرَنِي رَبِّي .
‘হযরত আল-মুগীরা থেকে বর্ণিত, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি ভুলে গিয়েছেন? তিনি বললেন, 'বাল আনতা নাসিতা... বরং তুমিই ভুলে গিয়েছ। আমাকে আমার রব এ-রকম করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ এই বর্ণনাটি অনুরূপ অর্থে ইমাম আবু দাউদ[17] ও ইমাম আদ-দারিমী ও বর্ণনা করেছেন।
হযরত আল-মুগীরা আরও বলেন, 'এরপর নবী করীম সওয়ারিতে আরোহণ করলে আমিও আরোহণ করলাম। পরে আমরা লোকদের কাছে গিয়ে পৌছুলাম। এ-সময় তাঁরা সালাত পড়ছিলো। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ তাদেরকে নিয়ে সালাত পড়ছিলেন। তখন নবী করীম তাদের সাথে এক রাকাআত সালাত শেষ করেছেন। তিনি যখন নবী করীম -এর আগমন বুঝতে পারলেন তখন পিছনে সরে যেতে উদ্যত হলেন। কিন্তু নবী করীম তাঁকে (সালাত শেষ করার জন্য) ইশারা করলেন। অতএব নবী করীম তাঁর সাথে এক রাকাআত পান। (সালাত শেষে) তিনি সালাম ফেরালে নবী করীম উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর এভাবে আমরা যে-রাকাআতটি পাইনি তা পড়ে নিলাম।”[18] হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, আল-মিশকাত গ্রন্থেও আলোচিত হয়েছে।[19]
আস-সাফওয়া কিতাবে এটি বিবৃত হয়েছে।[20] وَعَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، أَنَّهُ غَزَا مَعَ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ تَبُوكَ... 'হযরত আল-মুগীরা ইবনে শুবা থেকে বর্ণিত, তিনি তাবুক-যুদ্ধে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর সাথে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। হযরত আল-মুগীরা বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ফজরের সালাতের পূর্বে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে রওনা হলেন। আমি এক ঘটি পানি নিয়ে তাঁর সাথে গেলাম। তিনি যখন প্রয়োজন সেরে ফিরে আসলেন, আমি তাঁর উভয় হাতে পাত্র থেকে পানি ঢালতে লাগলাম। তিনি তাঁর উভয় হাত ও মুখমণ্ডল ধুলেন। তখন তাঁর গায়ে ছিলো একটি পশমের জুব্বা। অতঃপর তিনি দু'হাত থেকে জুব্বার হাতা সরাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু জুব্বার হাতা সংকীর্ণ বিধায় জুব্বার ভেতর দিক দিয়ে হাত বের করে নিলেন। আর জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধুলেন। আর মাথার অগ্রভাগ, পাগড়ি ও মোজার ওপর মাসহ কলেন। এরপর আমি তাঁর মোজা খুলতে উদ্যত হলে, তিনি বললেন, 'দা'হুমা ফাইন্নি আদখালতুহুমা তাহিরাতাইনি... রাখো, আমি পবিত্র অবস্থায় এ-দুট পরিধান করেছিলাম'-এ-বলে তিনি মোজার ওপর মাসহ করলেন।”[21]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, 'হযরত রাফে ইবনে আমর ইবনে ওবাইদ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা (হযরত আমর ইবনে ওবাইদ থেকে বর্ণনা করেন, অসুস্থতা বৃদ্ধির কারণে নবী করীম যখন বেরুতে পারছিলেন না, তখন হযরত আবু বকর-কে তাঁর আসন গ্রহণ করতে হুকুম দেন। তাই হযরত আবু বকর লোকজন নিয়ে সালাত পড়ছিলেন। একসময় হযরত আবু বকর সালাত শুরুর পরপর নবী করীম বের হন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেন। তিনি (হযরত আবু বকর) ব্যতীত আর কারো পেছনে নবী করীম সালাত পড়েননি, তবে এক সফরে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর পেছনে এক রাকআত সালাত পড়েছিলেন।”[22]
উসুদুল গাবা গ্রন্থে এসেছে, হযরত হাসান আল-বাসারী থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আলী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, স্বয়ং হযরত রাসূলুল্লাহ হযরত আবু বকর-কে ইমাম নিয়োগ করেন এবং তিনি লোকজনকে নিয়ে সালাত পড়ান। ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী, আমি ছিলাম সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, অসুস্থ ছিলাম না। যদি নবী করীম আমাকে ইমাম নিয়োগ করতেন, আমি ইমামতি করতাম। তবে আমরা আমাদের পার্থিব ব্যাপার সেটিই পছন্দ করি যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদের দীনি ব্যাপারে পছন্দ করেন।”[23]
নবী করীম -এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: বৃহস্পতিবারের দিকে নবী করীম -এর অসুস্থতা প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যায়। এই পর্যায়ে তিনি একটি বিশেষ অসিয়ত লেখার ইচ্ছা পোষণ করে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর -কে বললেন, 'অতিনী বিকাইফিন আও লাওহিন... একটি পাত বা ফলক নিয়ে এসো। যেখানে আমি আবু বকরের জন্যে একটি পত্র লিখবো, এতে তাঁর ব্যাপারে কারো ভিন্নমত থাকবে না।' ফলক আনতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর যাওয়ার জন্য ওঠে দাঁড়ালে নবী করীম ইরশাদ করলেন, 'আবাল্লাহু ওয়াল মুমিনুনা আন তুখতালাফা আলাইকা ইয়া আবা বাকরিন... হে আবু বকর! তোমার ব্যাপারে কোনো বিতর্ক করা স্বয়ং আল্লাহ ও মুমিনগণ অপছন্দ করেন।”[24]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، لَمَّا حُضِرُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ وَفِي الْبَيْتِ رِجَالٌ مِنْهُمْ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ، قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: هَلْ أَكْتُبْ لَكُمْ كِتَابًا لَّا تَضِلُّوا بَعْدَهُ؟»، قَالَ عُمَرُ : إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَدْ غَلَبَ عَلَيْهِ الْوَجَعُ وَعِنْدَكُمُ الْقُرْآنُ، فَحَسْبُنَا كِتَابُ اللهِ... 'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তিকালের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন ঘরের মধ্যে অনেক মানুষের সমাবেশ ছিলো। যাঁদের মধ্যে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাবও ছিলেন। তখন নবী করীম বললেন, আমি কি তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখে দেবো, যাতে পরবর্তীতে তোমরা বিভ্রান্তর না হও। তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) বললেন, হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ওপর রোগ যাতনা তীব্রতর হয়ে উঠেছে, আর তোমাদের নিকট কুরআন বিদ্যমান। আর আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এ-সময় আহলে বায়তের মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো। তাঁরা বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে লাগলেন, কাগজ আনা হোক এবং হযরত রাসূলুল্লাহ তোমাদের জন্য কিছু লিখে দেবেন, যাতে পরবর্তীতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। আবার তাঁদের মধ্যে অন্যরা হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) যা বললেন, তা বলে যেতে লাগলেন। এভাবে তাঁদের বাকবিতণ্ড ও মতানৈক্য বেড়ে চললো। তখন হযরত রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কুমু আন্নি... তোমরা উঠে যাও।' হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস বলেন, বড় মসিবত হলো লোকজনের সেই মতানৈক্য ও তর্ক-বিতর্ক, যা হযরত রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সেই লিখে দেওয়ার মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিলো।” এটি ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন।[25]
নবী করীম -এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: নবী করীম -এর কাছে কেবল ৭টি দিনার ছিলো। সেগুলো খরচ হয়ে তবে তাঁর ওফাত হয়।
হযরত সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ-এর কাছে মাত্র ৭টি দিনার ছিল যা তিনি হযরত আয়িশা-এর কাছে জমা রেখেছিলেন। অসুস্থতার সময় হযরত আয়িশা-কে ডেকে তিনি বললেন, 'ইয়া আইশা ইবআছি বিল্লাহাবি... তোমার কাছে রাখা স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে এসো।' এর পরপরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তখন হযরত আয়িশা তাঁর শুশ্রূষায় লেগে যান। নবী করীম তিন তিনবার এভাবে বললেন আর প্রতিবারেই তিনি অজ্ঞান হারান এবং হযরত আয়িশা ও তাঁর শুশ্রূষায় লেগেছিলেন। পরে নবী করীম দিনারগুলো হযরত আলী-এর কাছে পাঠিয়ে দেন আর তিনি সেসব সাদকা করে দেন। এরপর সোমবার রাতে হযরত রাসূলুল্লাহ এ লৌহ কঠিন মৃত্যু-সন্ধ্যায় পৌছুলে, সেদিন হযরত আয়িশা উম্মুল মুমিনীনদের কারো কাছে তাঁর চেরাগটি পাঠিয়ে বলেছিলেন, আমার জন্য আমার চেরাগে তোমাদের পক্ষ থেকে কিছু তেল দাও। আর হযরত রাসূলুল্লাহ এখন লৌহ কঠিন মৃত্যু-সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন।"[26]
অপর এক বর্ণনা মতে, নবী করীম হযরত আয়িশা-এর কোলে নিজের মাথা মুবারক হেলিয়ে তাঁকে বললেন, 'হে আয়িশা! স্বর্ণমুদ্রাগুলোর কী করেছিলে? তিনি জবাব দিলেন যে, সেগুলো আমার কাছে আছে। নবী করীম ইরশাদ করলেন, 'ফ আনফিকিহি... হে আয়িশা! সেসব স্বর্ণমুদ্রা দান করে দাও।' এরপর হযরত রাসূলুল্লাহ অজ্ঞান হয়ে যান। সে- সময় নবী করীম হযরত আয়িশা -এর কোলে মাথা রাখা ছিলেন। যখন নবী করীম আলায়হিস সালাত ওয়াস সালামের জ্ঞান ফিরে আসলে তিনি পুনঃজিজ্ঞেস করলেন, 'আনফাকতি তিলকায যাহাবা ইয়া আইশা... হে আয়িশা! স্বর্ণমুদ্রাগুলো দান করে দিয়েছো'? তিনি জবাব দিলেন, না! অতঃপর তিনি মুদ্রাগুলো তলব করলেন এবং হাতে নিয়ে বললেন, 'মা যন্নু মুহাম্মাদিন বিরাব্বিহি... রব সম্পর্কে মুহাম্মদের ধারণা কী এই যে, তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবেন অথচ এসব তাঁর কাছে গচ্ছিত থাকবে!' অতঃপর তিনি সবগুলো মুদ্রা দান করে দেন আর এই দিনই তিনি ইন্তিকাল করেন।”[27]
নবী করীম-এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: ওফাতের সময় নবী করীম-এর স্বাধীন পছন্দ প্রসঙ্গ।
হযরত আয়িশা বলেন, আমি শুনেছি যে, ইহকাল ও পরকালের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ারপূর্ব কোনো নবীর ওফাত হয়নি। হযরত রাসূলুল্লাহ -কে তাঁর অন্তিম দিনগুলোয় বলতে শুনেছি যে, 'মাআল্লাযিনা আনআমতা আলাইহিম মিনান নাবিয়্যিনা... নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও পূণ্যবান ব্যক্তিবর্গ যাদের আপনি পুরস্কৃত করেছেন তাঁদের সাথে মিলিত করুন; বন্ধু হিসেবে তারাই উত্তম।' এতে আমার ধারণা হলো, তিনিও অনুরূপ ইখতিয়ার লাভ করেছেন।[28]
অন্য এক বর্ণনা মতে, 'জান্নাতে মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে; 'নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও পূণ্যবান ব্যক্তিবর্গ যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন তাঁদের সহযাত্রী করুন; বন্ধু হিসেবে তারাই উত্তম।”[29]
নবী করীম -এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: ওফাতের পূর্বে নবী করীম -এর মিসওয়াক ব্যবহার প্রসঙ্গ।
হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হচ্ছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তিকাল করেছেন আমার ঘরে, আমার পালায়; আমার কোল ও বুকের মাঝে।[30] অপর বর্ণনা মতে, 'আমার চিবুক ও আমার তুখনীর মাঝে।"[31] 'নবী করীম -এর ইন্তিকালের সময় আল্লাহ আমার থুথু তাঁর থুথুর সাথে মিশ্রিত করে দেন। এ-সময় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর আমার নিকট প্রবেশ করেন, তাঁর হাতে মিসওয়াক ছিলো। আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -কে (আমার বুকে) হেলান লাগান অবস্থায় রেখেছিলাম। আমি লক্ষ করলাম যে, তিনি আবদুর রহমানের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি অনুভব করতে পারলাম যে, নবী করীম মিসওয়াক চাচ্ছেন। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি এটি আপনার জন্য নরম করে দেব? তখন তিনি মাথার ইশারায় হ্যাঁ বললেন। তখন আমি মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি মিসওয়াক করলেন। তাঁর সম্মুখে পাত্র অথবা পেয়ালা ছিলো তাতে পানি ছিলো। নবী করীম এর দ্বারা তাঁর চেহারা মসেহ করছিলেন এবং বলছিলেন, (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ইন্না লিলমাওতি সাকারতিন... আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই, সত্যিই মৃত্যুযন্ত্রণা কঠিন।) তারপর হাত উপর দিকে উত্তোলন করে বলছিলেন, 'ফীর রফিকিল আ'লা... আমি মহান বন্ধুর সাথে মিলিত হবো।' এ-অবস্থায় তাঁর ইন্তিকাল হলো আর হাত শিথিল হয়ে গেল।"[32]
ইমাম আল-হাকিম ও ইমাম ইবনে সা'দ বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, 'নবী করীম হযরত আলী -এর কোলে মাথা মুবারক রেখে ইন্তিকাল করেন।"[33] হাফিয ইবনে হাজর (আল-আসকলানী)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এর সবকটি সূত্রই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়, তাই বর্ণনাগুলো বিবেচনায় আনার কিছু নেই।[34]
নবী করীম-এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা: সোমবার নবী করীম পর্দা সরিয়ে দেখতে পেলেন যে, লোকজন ফজরের সালাত আদায় করছে।
হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ -এর অন্তিম রোগের সময় হযরত আবু বকর সকলকে নিয়ে সালাত আদায় করতেন। অবশেষে যখন সোমবার এলো এবং তারা সালাতের জন্য কাতারবদ্ধ হলো, তখন, নবী করীম হুজরা শরীফের পরদা উঠিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর চেহারা যেন কুরআনে করীমের পৃষ্ঠা (-এর ন্যায় ঝলমল করছিলো)। তিনি মুসকি হাসলেন। নবী-কে দেখতে পেয়ে আমরা খুশিতে প্রায় আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম এবং হযরত আবু বকর কাতারে দাঁড়ানোর জন্য পিছন দিকে সরে আসছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, নবী করীম হয়তো সালাতে আসবেন। নবী করীম আমাদেরকে ইশারায় বললেন যে, তোমরা সালাত পূর্ণ করে নাও। এরপর তিনি পরদা ফেলে দিলেন। সেদিনই তিনি ইন্তিকাল করেন।[35]
নবী করীম -এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা প্রসঙ্গে আরও বর্ণিত আছে: হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস ও হযরত আলী হযরত রাসূলুল্লাহ-এর অসুস্থতার সময় তাঁর কাছ থেকে বেরিয়ে আসলেন, তখন এক লোক তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল হাসান! হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্বাস্থ্যের অবস্থা কী? তিনি বললেন, তাঁর স্বাস্থ্য ভালো আছে। এরপর হযরত আলী -কে লক্ষ করে হযরত আব্বাস বললেন, তিনদিন পর তুমি নিরাশ্রয় হতে যাচ্ছো! অতঃপর তাঁরা ওই লোক থেকে পৃথক হন তখন তিনি আরও বললেন, আমার ধারনা বরং আমি নিশ্চিতভাবে জানি, আবদুল মুত্তালিব বংশের সন্তানদের মৃত্যুর সময় চেহারা চামড়া কী রূপ ধারণ করে থাকে। আমার ভয় হচ্ছে এই অসুস্থতা থেকে হযরত রাসূলুল্লাহ বুঝি আর সুস্থ হয়ে উঠবেন না। সুতরাং আমার সাথে চলো, রাসুলুল্লাহ -এর কাছে জিজ্ঞেস করি যে, এ-নেতৃত্ব যেন আমাদের প্রতি অর্পিত হয়; বিষয়টি আমরা জেনে নেবো। যদি আমাদের প্রতি নেতৃত্ব অর্পিত না হয় তবে ভালো কোনো অসিয়ত লিখিয়ে নিতে পারি। হযরত আলী তাঁকে বললেন, দেখুন! যদি নবী করীম -এর কাছে গেলে আমাকে তিনি নেতৃত্ব অর্পন না করেন তবে আপনি কি মনে করেন লোকেরা আমাকে নেতৃত্ব অর্পন করবে? আল্লাহর কসম! আমি তাঁর কাছে গিয়ে এ-প্রসঙ্গে কিছুই জিজ্ঞেস করব না।”[36]
নবী করীম -এর অসুস্থতা সময়ের ঘটনা প্রসঙ্গে আরও বর্ণিত আছে: 'নবী করীম -এর ওফাতের পূর্ব তিনদিন হযরত জিবরাইল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পত্র নিয়ে আসতেন, যেখানে তাঁকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন যে, আপনি নিজেকে কেমন পাচ্ছেন? ওই দিনগুলো ছিলো: শনি, রবি ও সোমবার। আর সোমবার মালাকুল মওত তাঁর ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন।[37] বর্ণিত আছে, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, যে-অসুস্থতার দরুন নবী করীম ইন্তিকাল করেন সে-দিনগুলোতে জিবরাইল নবী করীম -এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আপনি নিজেকে কেমন পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বললেন, 'আজিদুনি ওয়াজিয়ান ইয়া আমিনাল্লাহ... হে আল্লাহর আমানতদার! আমি অসুস্থ।”[38]
কিছু কিছু বর্ণনায় আছে, 'আজিদুনি ইয়া জিবরাইলু মাগমূমান... হে জিবরাইল! আমি পেরেশান ছিলাম, হে জিবরাইল! আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম।” অতঃপর এর পরের দিনও তিনি এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আপনি নিজেকে কেমন পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর আমানতদার! আমি অসুস্থ।' অতঃপর তিনি তৃতীয় দিনও আসলেন; তাঁর সাথে মালাকুল মওতও ছিলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আপনি নিজেকে কেমন পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর আমানতদার! আমি অসুস্থ। আপনার সাথে ইনি কে?' জবাবে জিবরাইল বললেন, ইনি হলেন মালাকুল মওত। আর এবারই দুনিয়ায় আমার সর্বশেষ আগমন এবং আপনার অন্তিম সময়। আপনার পর আর কোনো ধ্বংসশীল মানব-সন্তানের কাছে আমি আসবো না, আপনার পর আর কারো উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবো না। তখন নবী করীম-এর ওপর মৃত্যু-কষ্ট অনুভব হচ্ছিলো। তাঁর পাশে একটি পাত্রে পানি রাখা ছিলো, যখনই তাঁর মৃত্যু-কষ্ট অনুভূত হতো সেখান থেকে পানি নিয়ে মুখে ছিটা দিতেন আর বলতেন, 'আল্লাহুম্মা আইন্নি আলা সাকারাতিল মাওতি... হে আল্লাহ! মৃত্যু-কষ্টের সময় আপনি আমাকে সাহায্য করুন।”[39]
وَعَنْ أَنْ هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ: مَا زَالَتْ أَكْلَةُ خَيْبَرَ تُعَادِنِي فَالْآنُ أَوَانُ انْقِطَاعِ أَبْهَرِي .
'হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ বলেন, 'খায়বারের (সেই বিষমিশ্রিত) খাবারের উপসর্গ মাঝে মাঝে আমার শরীরে দেখা দেয়। এখনো তা আমার গলার কাটা হয়ে আছে।'[40]
ইমাম ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, 'নিশ্চয়ই মুসলিম উম্মাহ বিশ্বাস করে, হযরত রাসূলুল্লাহ -কে মহান আল্লাহ নুবুওয়তের মর্যাদার পাশাপাশি শাহাদাত মর্যাদাও নসিব করেছেন।' আশ-শিফা গ্রন্থে উপর্যুক্ত বক্তব্যটি বিবৃত হয়েছে।[41]
وَعَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ يَتَعَوَّذُ بِهَذِهِ الْكَلِمَاتِ: «أَذْهِبِ الْبَاسَ، رَبَّ النَّاسِ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِফَاؤُكَ، شِفَاءً لا يُغَادِرُ سَقَمًا».
'আর হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ নিম্নোক্ত বাক্যাবলি দ্বারা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করতেন, 'আযহিবিল বা'সা রাব্বান নাসি... কষ্ট দূর করে দাও। হে মানুষের রব! আরোগ্য দান কর এবং তুমিই একমাত্র আরোগ্যদাতা। তোমার আরোগ্য ব্যতীত অন্য কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান কর যাতে রোগের লেশমাত্রও বাকি না থাকে।"[42] হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম।
কলাত: 'তিনি (হযরত আয়িশা) বলেন, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন, যে অসুস্থতার মধ্যে তিনি ইন্তিকাল করেন। আমি তাঁর হাত মুবারক ধরে উপর্যুক্ত বাক্যসমূহ পড়ে তাঁর শরীরে মাসেহ করতে থাকলাম। তিনি আমার কাছ থেকে তাঁর হাত সরিয়ে নিয়ে বললেন, 'রাব্বিগফিরলি ওয় আলহিকনি বির রফিকিল আ'লা... ওহে প্রভু! আমাকে তুমি ক্ষমা করো। আর আমাকে মহান বন্ধুর সাথে মিলিত করো।' এই হলো আমার শোনা তাঁর সর্বশেষ বাক্য।”[43] হাদীসটি দু'সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আস-সুহায়লী বলেন, আমি ইমাম আল-ওয়াকিদী এর কোনো কোনো গ্রন্থে দেখেছি যে, নবী করীম প্রথম যে-বাক্যটি উচ্চারণ করেন তা হলো 'আল্লাহু আকবার' তখন তিনি মহিয়সী হালিমা-এর কাছে দুগ্ধপোষ্য ছিলেন। আর অন্তিম মুহূর্তে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, 'আর-রফিক আল-আ'লা'।[44]
ইমাম আল-হাকিম বর্ণনা করেন, হযরত আনাস (ইবনে মালিক)-এর হাদীস, নবী করীম - এর অন্তিমকালে সর্বশেষ বাক্য ছিল: 'জালালু রাব্বির রফিয়ি... আমার প্রভুর মর্যাদা সর্বোচ্চ।”[45] আল-মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।[46]
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ: آخِرُ مَا عَهِدَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ قَالَ: لَا يُتْرَكُ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ دِيْنَانِ».
'হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ অন্তিম অঙ্গীকার করে বলেন, 'আরব উপদ্বীপে দুই ধর্মের অবস্থান মেনে নেওয়া হবে না।”[47]
وَقَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: كَانَتْ عَامَّةُ وَصِيَّةِ رَسُولِ اللهِ ﷺ عِنْدَ مَوْتِهِ: الصَّلَاةَ، وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ حَتَّى جَعَلَ يُلَجْلِجُ فِي صَدْرِهِ، وَمَا يَفِيضُ بِهَا لِسَانُهُ.
'আর উম্মু সালামা বলেন, ওফাতের সময় হযরত রাসূলুল্লাহ -এর সাধারণ অসিয়ত ছিলো, 'সালাত পড় ও তোমাদের অধীনস্ত ক্রীতদাসদের অধিকার রক্ষা কর।' এমনকি নবী করীম বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেও তিনি মুখে অন্য কিছু উচ্চারণ করেননি।”[48] আল-ইকতিফা গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।[49]
وَ عَنْ اَنَسٍ، كَانَتْ وَصِيَّةُ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ حِيْنَ حَضَرَهُ الْمَوْتُ: الصَّلَاةَ وَمَا مَلَكَتْ اَيْمَانُكُمْ... 'আর হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, অন্তিমকালে হযরত রাসূলুল্লাহ-এর অসিয়ত ছিলো, 'সালাত পড় ও তোমাদের অধীনস্ত ক্রীতদাসদের অধিকার রক্ষা করো।' এমনকি নবী করীম -এর বুকে গরগর শব্দ হলেও তাঁর মুখে অন্য কিছু ধ্বনিত হয়নি।'[50]
আরও বর্ণিত হয়েছে যে, মালাকুল মওত নবী করীম থেকে অনুমতি প্রার্থনা করেন। তখন হযরত জিবরাইল সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত জিবরাইল বললেন, হে আহমদ! ইনি হলেন মালাকুল মওত; তিনি আপনার কাছে আসতে অনুমতি প্রার্থনা করছেন। আপনার আগে কোনো মানুষের কাছে যেতে তিনি অনুমতি নেননি এবং আপনার পরেও কোনো মানুষের কাছে যেতে অনুমতি নেবে না। নবী করীম বললেন, 'হে জিবরাইল! তাঁকে অনুমতি দাও।' অতঃপর মালাকুল মওত নবী করীম -এর ঘরে প্রবেশ করেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! হে আহমদ! আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন আমি যেন আপনি যা হুকুম করেন তা তামিল করি; যদি আপনার অনুমতি হয় তাহলে রুহ কবজ করব, যদি আপনি ছেড়ে যেতে আদেশ করেন তবে আমি ফিরে যাব। জবাবে নবী করীম বললেন, 'হে মালাকুল মওত! তুমি কি এমনটি করবে'? আপনি আমাকে যাই আদেশ করেন তাই পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জিবরাইল বললেন, আল্লাহ আপনার সাক্ষাতে আগ্রহী। নবী করীম বললেন, 'হে মালাকুল মওত! তুমি যে-ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছো তা পালন কর।' জিবরাইল বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজকেই পৃথিবীতে আমার সর্বশেষ আগমন। পৃথিবীতে আপনিই একমাত্র উপলক্ষ ছিলেন। এরপর হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন।”[51]
আল-ইকতিফা' গ্রন্থে আছে, হযরত আয়িশা বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ বলেন, আমার কণ্ঠ ও বুকের মধ্য বরাবর মাথা রেখে আমার পালার দিন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন। এ-ব্যাপারে তিনি কারো ওপর অবিচার করেননি। আমি তখন কিছুটা আত্মভোলা ও কম বয়সের ছিলাম। হযরত রাসূলুল্লাহ যখন প্রভুর ডাকে সাড়া দেন তখন তিনি আমার কোলেই ছিলেন, পরে আমি তাঁর মাথা মুবারক বালিশের ওপর রেখে দেই এবং তাঁর অন্যান্য সহধর্মিনীদের সাথে কাঁদতে শুরু করি।'[52]
وَلَا تُوُفِّيَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ جَاءَ التَّعْزِيَةُ يَسْمَعُونَ الصَّوْتَ وَالْحِسَ، وَلَا يَرَوْنَ الشَّخْصَ... 'যখন হযরত রাসূলুল্লাহ এর ইন্তিকাল করেন তখন একজন সান্ত্বনাদানকারী আসেন, তখন তারা আওয়াজ ও কোলাহল শুনতে পেলেন অথচ কাউকে দেখা যাচ্ছিলো না: হে আহলে বায়ত! আপনাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আল্লাহর কিতাবে প্রত্যেকটি বিপদের সময় সান্ত্বনা ও ধৈর্যের উপাদান রয়েছে। আল্লাহ প্রত্যেক ধ্বংসের উত্তম বিনিময়দানকারী এবং প্রত্যেক হারানো বস্তুর ক্ষতিপূরণকারী। সুতরাং তোমরা একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে চল এবং তাঁর কাছেই সর্বময় কল্যাণের কামনা কর। কারণ প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত। আবারও আপনাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। অতঃপর হযরত আলী (রাঃ) বললেন, তোমরা কি জান এই সান্ত্বনাবানী প্রদানকারী লোকটি কে? ইনি হলেন, হযরত খাযির।'[53]
আল-মিশকাতে 'দালায়িলুন নুবুওয়াত' থেকে অনুরূপ উদ্ধৃত করা হয়েছে।[54] আরও বর্ণিত হয়েছে, হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন তখন তাঁর সাহাবায়ে কিরাম নবী করীম -এর পাশে সমবেত হয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। এ-সময় (দেখতে) লম্বা, কাঁধ পর্যন্ত চুলধারী, লুঙ্গি ও চাদর পরিহিত একব্যক্তি হযরত রাসূলুল্লাহ-এর সাহাবাদের ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়েন এবং ঘরের চৌকাট ধরে হযরত রাসূলুল্লাহ- এর জন্য ক্ষাণিকক্ষণ কাঁদতে থাকেন। এরপর সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ থেকে সকল বিপদ-আপদে সমবেদনা এবং প্রত্যেক পরগতের জন্য প্রতিদান রয়েছে। আল-হাদীস। এরপর লোকটি চলে যান। হযরত আবু বকর বলেন, লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তখন সাহাবায়ে কিরাম ডানে-বামে দেখতে লাগলেন, কেউ দেখতে পেলেন না। হযরত আবু বকর বললেন, হয়তো এই লোকটি হলেন হযরত খাযির; তিনি আমাদেরকে সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন।”[55]
ইমাম ইবনে আবুদ দুনয়া বর্ণনাটি হযরত আলী ইবনে আবু তালিব-এর হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর ওপর মুহাদ্দিসগণের বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে। ইমাম আশ-শাফিয়ী বর্ণনাটি তাঁর আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[56] তবে এতে হযরত খাযির -এর প্রসঙ্গ নেই। আল- মাওয়াহিবুল লুদুনিয়ায় এভাবেই রয়েছে।[57]
টিকাঃ
[1] আদ-দুলাওয়ী, আল-কুনা ওয়াল আসমা, খ. ২, পৃ. ৪৭৫, হাদীস: ৮৫৮, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[2] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ১০০, হাদীস: ৪৬৭, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত
[3] ইবনুল আওয়া, আল-মুনতাযাম, খ. ৪, পৃ. ২৬, হাদীস: ৪০৬, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত
[4] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ৪, হাদীস: ৩৬৫৪, হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী থেকে বর্ণিত
[5] ইবনুল জওযী, আল-মুনতাযাম, খ. ৪, পৃ. ৩৩, হাদীস: ৪১৭, হযরত ওয়াহিব ইবনুল আকীম থেকে বর্ণিত
[6] আল-বায়হাকী, দালারিপুন মুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২১০, হাদীস: ৩১৪৭, হযরত আবুল হওয়ারিস আবদুর রহমান ইবনে মুআবিয়া আল-আনসারী থেকে বর্ণিত। ইমাম আল-বায়হাকি বলেন, هُنَا إِسْتَادٌ مُنْقَطِع অর্থাৎ এটি একটি বিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
[7] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ২০৩, হাদীস: ৩৬২৩: (খ) মুসলিম, আস-সহীহ খ. ৪, পৃ. ১৯০৫, হাদীস: ৯৯ (২৫৫০), হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[8] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬২-১৬৩
[9] আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৩৩, হাদীসঃ ৬৬৪, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[10] আবদুর রায্যাক আস-সানআনী, আল-মুসান্নাফ, খ. ৫. পৃ. ৪৩২, হাদীস: ১৫২২
[11] আবুদুদ্দীন আল-ইজী, আল-মাওয়াকিফ, খ. ৩, পৃ. ৬৩০-৬৩১
[12] আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬২-১৬৩
[13] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৩
[14] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ৩১৩, হাদীস: ৯৫ (৪১৮)
[15] ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাওমিয়া, খ. ২, পৃ. ৬৫৩-৬৫৪, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু মুলায়কা থেকে বর্ণিত।
[16] আবুদুদ্দীন আল-ইজী, আল-বাওয়াকিফ, ৭. ৩, পৃ. ৬০৯
[17] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৩-১৬৪
[18] আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৪
[19] আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪০, হাদীস: ১৫৬
[20] আদ-দিয়ার বকরী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৪
[21] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ২৩০, হাদীস: ৮১ (২৭৪)
[22] আত-তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, খ. ১, পৃ. ১৬০, হাদীস: ৫১৮ (২)
[23] ইবনুল জওযী, সিফাতুস সাফওয়া, খ. ১, পৃ. ১৩১
[24] (ক) আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৪; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ২০০ ও ৩১৭, হাদীস: ৭৯, ৮১ ও ১০৫ (২৭৪)
[25] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৪
[26] ইবনুল আসীর, উসুদুল গাবা ফী মারিফাতিস সাহাবা, খ. ৩. পৃ. ৩২৮, বর্ণনা: ৮৪০
[27] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, খ. ৪০, পৃ. ২৩৫, হাদীস: ২৪১৯৯, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[28] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭ ও ৯, পৃ. ১২০ ও ১১িল, হাদীস: ৫৬৬৯ ও ৭৩৬৬
[29] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৬, পৃ. ১৯৮, হাদীস: ৫৯৯০
[30] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২০৯, হাদীসঃ ২২৩৪
[31] আন-নাসায়ী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৬, পৃ. ৩৯০, হাদীস: ৭০৬৬
[32] (ক) আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা, ৪:৬৯: (খ) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪০, পৃ. ৫১০, হাদীস: ২৪৪৫৪, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[33] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১৩, হাদীস: ৪৪৪৯
[34] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬, পৃ. ১২, হাদীস: ৪৪৪৯
[35] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৩০, হাদীস: ২২১৯ ও ২২২০
[36] ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী, খ. ৮, পৃ. ১৩৯
[37] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ১, পৃ. ১৩৬-১৩৭, হাদীস: ৬৮০
[38] আবদুর রাযযাক আস-সানআনী, আল-মুসান্নাফ, খ. ৫, পৃ. ৪৩৫-৪৩৬, হাদীসঃ ৯৭৫৪
[39] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৫
[40] ইবনুল জওযী, আল-মুনতাযাম, খ. ৪, পৃ. ৩৬, হাদীস: ৪২১
[41] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১২৮, হাদীস: ২৮৯০, হযরত হুসাইন ইবনে আলী থেকে বর্ণিত
[42] ইবনুল জওযী, আল-মুনতাদাম, খ. ৪, পৃ. ৩৬, হাদীস: ৪২১
[43] আল-বাযযার, আল-বাহরুৰ যাগ্খার, খ. ১৪, পৃ. ৩৩৩, হাদীস: ৮০০৭।
[44] কাযী আয়ায, আশ-শিকা, খ. ১, পৃ. ৩১৭
[45] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২১ ও ১৩৪, হাদীস: ৫৬৭৫ ও ৫৭৫০
[46] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭২১-১৭২৩, হাদীসঃ ৪৬, ৪৭, ৪৮ ও ৪৯ (২১৯১)
[47] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫১৭, হাদীস: ১৬১৯
[48] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ খ. ৬৩৭, পৃ. ১১ ও ১২১, হাদীসঃ ৪৪৩৯, ৪৪৪০ ও ৫৬৭৪; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৮৯৩, হাদীস: ৮৫ (২৪৪৪)
[49] আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৫৭৫
[50] আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৮, হাদীস: ৪৩৮৭
[51] আল-কাসুতাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৬৬
[52] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪৩, পৃ. ৩৭১, হাদীস: ২৮৩৫২
[53] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪৪, পৃ. ৩৭২, হাদীস: ২৬৬৮৪
[54] আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৫
[55] আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, খ. ১৯, পৃ. ২০৯, হাদীস : ১২১৬৯
[56] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১২৮, হাদীস: ২৮৯০, হযরত হুসাইন ইবনে আলী থেকে বর্ণিত
[57] আবু রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৩৬
[58] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, দার তুক আন-নাজাত (১৪২২ হি.), খ. ৪, পৃ. ৮১, হাদীস: ৩১০০। (খ) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪৩, পৃ. ৩৬৮, হাদীসঃ ২৬৩৪৮, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[59] আত-তাবরীযী, প্রাক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৬৮৫, হাদীস: ৫৯৭২ (১৭)
[60] আল-বায়হাকী, দালায়েলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৬৭, হাদীস: ৩২৫২
[61] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল আওসাত, খ. ৮, পৃ. ১০৯-১১০, হাদীস: ৮২১০
[62] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৬৪-৫৬৫
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর বয়সের আলোচনা
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: أُنْزِلَ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِينَ، وَأَقَامَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةٌ، وَبِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِيْنَ، وَتُوُفِّيَ وَهُوَ ابْنُ ثَلَاثٍ وَسِتِّينَ سَنَةٌ.
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ৪০ বছর বয়সে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অহি নাযিল হয় (নুবুওয়াতপ্রাপ্ত হন)। এরপর তিনি মক্কায় ১৩ এবং মদীনায় ১০ বছর অবস্থান করেন। ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।”[1] হাদীসটি দু'সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে হযরত আবু বকর, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) ও হযরত আয়িশা ৬৩ বছর বয়স পেয়েছেন মর্মে বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।[2]
وَعَنْ أَنَسٍ، أَنَّهُ تُوُفِّيَ وَلَهُ سِتُّوْنَ سَنَةٌ.
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ৬০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।[3]
অন্য এক বর্ণনা মতে, ৬৫ বছর।[4] ইমাম আবু হাতিম তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে মত দিয়েছেন। ইমাম ইবনে আসাকির এর ইতিহাসগ্রন্থে আছে, তিনি সাড়ে ৬২ বছর জীবন পেয়েছিলেন। ইমাম ইবনে শায়বা-এর গ্রন্থাদিতে বলা হয়েছে, ৬১ বা ৬২ বছর জীবন পেয়েছিলেন তিনি; আমি জানি না, তিনি ৬৩ বছর জীবন পেয়েছিলেন কি না।[5]
সবগুলো বর্ণনার মাঝে সমন্বয় করা হয় এভাবে: যারা বয়স ৬৫ বলেছেন, তারা জন্মসাল ও মৃত্যুসালকে যোগ করে নিয়েছেন আর যারা ৬৩ বছর বলেছেন; যা প্রসিদ্ধ, তারা জন্মসাল ও মৃত্যুসালকে হিসেবে ধরেননি। আর যারা ৬০ বছর বলেছেন, তারা খুচরো মাসগুলো হিসেব থেকে বাদ দিয়েছেন। যারা বলেছেন, সাড়ে ৬২ বছর; হয়তো তারা আল-আকলীল-বর্ণিত হাদীসের ওপর নির্ভর করেছেন।
এই কথা বর্ণিত আছে যে, 'লম ইয়াকুন নাবিয়্যুন ইল্লা আশা নিসফা উমরি আখিহিল্লাযি কানা ক্ববলাহু... প্রত্যেক নবী তাঁর পূর্ববর্তী নবীর অর্ধেক জীবন লাভ করেন।' হযরত ঈসা ১২৫ বছর জীবন লাভ করেছিলেন।"[6]
আর যারা বলেছেন, ৬১ বা ৬২ বছর; তাদের বক্তব্য অনুমান-ভিত্তিক, তথ্য-নির্ভর নয়। নবী করীম নুবুওয়াতপ্রাপ্তির পর পবিত্র মক্কায় কতদিন তিনি অবস্থান করেন এ-ব্যাপারে মতভেদের কারণে উপর্যুক্ত মতবিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত। ইমাম মুগলতায়ী-এর সিরাতগ্রন্থে অনুরূপই এসেছে।[7]
টিকাঃ
[1] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ৪৫, হাদীস: ৩৮৫১; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৮২৬, হাদীস: ১১৭-১১৮ (২৩৫১)
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামি'উল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৫৯১, হাদীস: ৩৬২১
[3] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৮২৫, হাদীস: ১১৪ (২৩৪৮)
[4] حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ الله - - ، تُوفِّيَ وَهُوَ ابْنُ خَمْسٍ وَসিক্তিনা. ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন'। (ক) আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ১৬১, হাদীস: ৫৯০০; (খ) মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮২৪, হাদীস: ১১৩ (২৩৪৭)
[5] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮২৭, হাদীস: ১২২ (২৩৫৩)
[6] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ.১৬৬
[7] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭৫, হাদীস: ২০০২, হযরত ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ ইবনে আবু যিয়াদ আল-মুখযুমী-মারফাত মুরসাল সূত্রে বর্ণিত; আলাউদ্দীন মুগলতায়ী, মুখতাসারুস সিরাতিন নাবাওরিয়া, পৃ. ১০৭-১০৯
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর বিদায় বেলার আলোচনা
হিজরী ১১ সালে ১২ রবিউল আউওয়াল সোমবার দুপুরে নবী করীম ইন্তিকাল করেন। যে-তারিখটিতে তিনি প্রীত-সফর করে মদীনায় পদার্পণ করেছিলেন।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: وُلِدَ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَاسْتُنْبِيَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَخَرَجَ مُهَاجِرًا مِّنْ مَّكَّةَ إِلَى الْمَدِينَةِ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَرَفَعَ الْحَجَرَ الْأَسْوَدَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَقُبِضَ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ فِي كِسَاءٍ مُلَبَّدٍ».
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবী করীম সোমবার জন্মলাভ করেছেন, নুবুওয়াত পেয়েছেন সোমবার, মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন সোমবার, হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপিত হয় সোমবার এবং সোমবারেই চাদর জড়ানো অবস্থায় তিনি বিদায় নেন।”[1]
قَالَ أَبُوْ بُرْدَةَ: أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا، فَقَالَتْ: قُبِضَ رُوْحُ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فِي هَذَيْنِ.
'হযরত আবু বুরদা বলেন, হযরত আয়িশা আমাদেরকে একটি সেলাই করা চাদর ও একটি মোটা লুঙ্গি দেখিয়ে বলেছেন, এ- দু'কাপড়ে হযরত রাসূলুল্লাহ-এর প্রাণ বায়ু চলে যায়।”[2]
আর আল-ইকতিফা গ্রন্থে আছে, 'হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন ইস্তিকাল করেন, তখন চারিদিক কান্নার রোল ওঠে ও ফেরেশতাগণ তাসবীহ-ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠেন। কোনো সাহাবার মতে, লোকজন অত্যন্ত শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন। তাঁদের হিতাহিতজ্ঞান লোপ পায়, তাঁরা আত্মবিস্তৃত হয়ে পড়েন এবং অপ্রকৃতগ্রস্থ হয়ে যান। তাঁদের কেউ কেউ পাগল হয়ে পড়েন, কেউ কেউ নির্বাক হয়ে যান, কেউ কেউ মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি করছিলেন। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) তাঁদের মধ্যে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রীতিমতো চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। মুনাফিকদের কেউ কেউ বলছিলো, তাদের ধারণা নিশ্চয় হযরত রাসূলুল্লাহ নাকি মৃত্যুবরণ করেছে! তবে, আল্লাহর কসম! তিনি মৃত্যুবরণ করেননি; নিশ্চয় তিনি তাঁর প্রভুর কাছে চলে গেছেন মাত্র, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান গিয়েছিলেন; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ দিন আত্মগোপনে থাকার পর ফিরে এসেছিলেন। তখন বলা হয়েছিলো, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহর কসম! হযরত রাসূলুল্লাহও অবশ্যই ফিরে আসবেন, যেভাবে হযরত মুসা প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। যারা হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।”[3]
কোনো কোনো বর্ণনা এসেছে, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) হাতে তরবারি নিয়ে বলতে থাকেন, যাদের মুখে শুনি যে হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন, আমি আমার এই তরবারি দিয়ে মেরে ফেলব।[4]
'অাম্মা উসমানু ইবনু আফফান ফাখুরিসা... হযরত ওসমান ইবনে আফফান ছিলেন শোকে নির্বাক। এমনকি কেউ তাঁর কাছে যেতেন, নিয়ে আসতেন; কারো সাথে কথাই বলতেন না। এভাবে দুই দু'দিন অতিবাহিত হয়। হযরত আলী নীরব-নিথর হয়ে স্থাণুর মতো বসে থাকতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনায়স অসুস্থ হয়ে একপর্যায়ে মৃত্যুবরণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যে হযরত আবু বকর ও হযরত আব্বাস-এর তুলনায় স্থিরচিত্ত ও দৃঢ়মনোবল প্রতীয়মান হয়নি।”[5]
অন্য একটি বর্ণনা এসেছে, 'সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবু বকর সবচেয়ে স্থিরচিত্ত ছিলেন, তবে তাঁর দু'চোক অনবরত অশ্রু প্রবাহিত করছিলো। তাঁর দৃঢ় কঠিন মনোবলও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলো, তাঁর উঠানামা করছিলো। অতঃপর তিনি নবী করীম -এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন, এরপর অধোমুখী হয়ে নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরালেন এবং বললেন, আপনার জীবন ও মরণ শুভ হোক। আপনার বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে যা অন্য কোনো নবী দ্বারা বন্ধ হয়নি। প্রশংসার অনেক ঊর্ধ্বে আপনার অবস্থান, শোক-সন্তাপের ক্ষুদ্রগণ্ডি থেকে বিশালতায় আপনার ব্যাপ্তি। যদি আপনার ওফাতের ক্ষেত্রে ইচ্ছা-অনিচ্ছার অবকাশ থাকত, তবে আপনার পরিবর্তে আমি নিজের জীবনটা সঁপে দিতাম। হে মুহাম্মদ ! আপনার প্রভুর কাছে আমাদের কথা স্মরণে রাখুন। আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় আমাদের একটু জায়গা দিন।”[6]
অপর এক বর্ণনা আছে, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন তখন সাহাবায়ে কিরামের মাঝে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি-না এ-ব্যাপারে মত- পার্থক্য দেখা দেয়।[7]
হযরত আনাস (ইবনে মালিক) বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন, তখন লোকজন অত্যন্ত কান্নাকাটি করছিলেন। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদে দাঁড়িয়ে এক ভাষণে বললেন, হযরত মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন এ-ধরনের মন্তব্য আমি বরদাশত করবো না। হ্যাঁ, তাঁকে প্রভুর কাছে ডেকে নেওয়া হয়েছে, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান-কে ডেকে নেওয়া হয়েছিলো; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ রাত অন্যত্র অবস্থান করেছিলেন। আল্লাহর কসম! আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা নবী করীম মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।"[8]
হযরত ইকরামা বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন, তখন লোকজন অত্যন্ত কান্নাকাটি করছিলেন। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব আল্লাহর কসম! তিনি মৃত্যুবরণ করেননি; মুহাম্মদ সালাম মৃত্যুবরণ করেছেন এ-ধরনের মন্তব্য আমি বরদাশত করবো না। হ্যাঁ, তাঁকে প্রভুর কাছে ডেকে নেওয়া হয়েছে, যেভাবে হযরত মুসা ইবনে ইমরান-কে ডেকে নেওয়া হয়েছিলো; তিনি নিজ সম্প্রদায় থেকে ৪০ রাত অন্যত্র অবস্থান করেছিলেন। আল্লাহর কসম! আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা নবী করীম মারা গেছেন মর্মে মন্তব্য করবে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে।'[9]
'হযরত রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তিকাল করেন তখন হযরত আবু বকর সানহ তথা আলিয়ায় তাঁর স্ত্রী হযরত বিবতে খারিজা-এর কাছে ছিলেন। নবী করীম তাঁকে তাঁর স্ত্রীর নিকট যেতে অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব নিজের তরবারি বের করে যারা হযরত রাসূলুল্লাহ মারা গেছেন বলছেন তাদেরকে ধমকাচ্ছিলেন। হযরত আবু বকর -এর এ- খবর পৌছুতেই তিনি সানহ থেকে সোজা হযরত আয়িশা-এর ঘরে আসেন। অতঃপর তিনি নবী করীম -এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন, এরপর নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরাতে সরাতে হাঁটু গেড়ে বসলেন, তাঁকে চুমু খেলেন এবং কাঁদছিলেন। আর বললেন, আপনার ওফাত হয়েছে; শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার জীবন ও মরণ কতই শুভ।'
ইমাম আত-তাবারী তাঁর আর-রিয়ায গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন।[10] আর অন্য কয়েকটি বর্ণনায় এসেছে যে, 'ফাওয়াযউল বুরদা আন ওয়াজহিহি... তিনি নবী করীম -এর চেহারা থেকে চাদর সরিয়ে তাঁর মুখ নবী করীম -এর মুখ মুবারক বরাবর রেখে সুঘ্রাণ নেন। তারপর তাঁকে কাপড়ে আচ্ছাদিত করে দেন তথা তিনি তাঁর ওফাতের ঘ্রাণ অনুভব করেন।[11]
আরও বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর শুনে অবস্তিত তাঁর বাড়ি থেকে ঘোড়ায় চড়ে চলে এলেন-মদীনা অধিবাসী খাযরাজের বংশধর হারিস গোত্রের একটি গ্রাম; যা নবী করীম -এর ঘরের মাঝে এক মাইলের দূরুত্বে অবস্থিত- (হযরত আয়িশা) বলেন, তিনি নেমে সোজা মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে লোকদের সাথে কোনো কথা না বলে হযরত আয়িশা -এর ঘরে প্রবেশ করে হযরত রাসূলুল্লাহ -এর দিকে অগ্রসর হলেন। তখন তিনি একখানি 'হিবারা' চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। হযরত আবু বকর নবী করীম -এর মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে তাঁর ওপর ঝুকে পড়লেন এবং চুমু খেলেন, তারপর কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু বরাদ্দ করেননি। তবে যে-মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিলো তা তো আপনি কবুল করেছেন।' হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন।[12]
(লা ইয়াজমাউল্লাহু আলাইকা মাওতাতাইনি) (আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু একত্রিত করবেন না।) হযরত আবু বকর -এর এই বক্তব্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারো মতে, এ-বক্তব্যে সুস্পষ্টত যারা নবী করীম পুনরুত্থিত হবেন ধারণা করেন এবং (এর বিরুদ্ধবাদী) লোকের হাত-পা কেটে নেবেন সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত করে। যদি তাদের ধারণা সঠিক হয় তবে তাঁকে দ্বিতীয়বার মৃত্যুবরণ করতে হবে। হযরত আবু বকর বিবৃতিতে বলেন, 'আন্নাহু আকরামু আলাল্লাহি... নবী করীম -এর মর্যাদা আল্লাহর নিকট তাঁর জন্য দুই দুইবার মৃত্যু নির্ধারণের চেয়ে অনেক বেশি। তবে অন্য অনেকের জন্য তিনি দুই দুইবার মৃত্যু ঠিক করেছেন; যেমন হাজার হাজার লোক যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। আরও যেমন- সেসব লোক যারা একটি বিশেষ গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে।
আর কারো কারো মতে, হযরত আবু বকর বুঝাতে চেয়েছেন যে, কবরে নবী করীম দ্বিতীয়বার মৃত্যুমুখোমুখী হবেন না। যেমন- সাধারণ মানুষকে পুনর্জীবিত করা হয়, এবং সওয়াল-জওয়াব পর্ব শেষে তারা পুনরায় মৃত্যুবরণ করে। অন্য কারো কারো মতে, আল্লাহ আপনার ইন্তিকালে আপনার শরিয়তের বিলুপ্তি ঘটাননি। অপর কারো কারো মতে, দ্বিতীয়বার মৃত্যু দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানসিক অস্থিরতা অর্থাৎ আজকের পর আপনি দ্বিতীয়বার মানসিক কষ্টে নিপতিত হবেন না। এসব বক্তব্য ফতহুল বারী থেকে উদ্ধৃত।[13]
وَعَنِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ خَرَجَ وَعُمَرُ يُكَلِّمُ النَّاسَ، فَقَالَ: اجْلِسْ يَا عُمَرُ فَأَبَى عُمَرُ أَنْ تَجْلِسَ، فَأَقْبَلَ النَّاسُ إِلَى أَنْ بَكْرٍ، وَتَرَكُوْا عُمَرَ، فَقَالَ أَبُو বকর... 'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর বের হয়ে আসেন তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব ) লোকজনের সাথে কথা বলছিলেন। এ-সময় (হযরত আবু বকর ) তাঁকে বলেন, হে ওমর! বসে পড়। হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব ) বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব )-কে ছেড়ে হযরত আবু বকর-এর প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তখন হযরত আবু বকর একটি ভাষণ দিলেন, এরপর আপনাদের মধ্যে যারা হযরত মুহাম্মদ -এর ইবাদত করতেন, তিনি তো ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহ চিরঞ্জীব, চির অমর। মহান আল্লাহ বলেন, 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূলুন কদ খলাত মিন ক্ববলিহির রুসুলু... হযরত মুহাম্মদ একজন রাসূলমাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।”[14] হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম! হযরত আবু বকর-এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানতো না যে, আল্লাহ এরূপ আয়াত নাযিল করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তাঁর থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সকলে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন।[15]
সহীহ আল-বুখারী গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু বকর যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) বসে পড়লেন। হযরত আবু বকর আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, যারা হযরত মুহাম্মদ -এর ইবাদত করতে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মদ ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে তারা নিশ্চিত জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি অমর। তারপর হযরত আবু বকর তিলাওয়াত করলেন, 'নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[16] তিনি আরও তিলাওয়াত করলেন, 'মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন।[17] বর্ণনাকারী বলেন, (হযরত আবু বকর -এর একথা শুনে) ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নারত লোকজনের কাঁদা থেমে যায়।[18]
ইমাম ইবনে আবু শায়বা-বর্ণিত হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর-এর হাদীসে আছে, 'ইন্না আবা বাকরিন মাররা বি উমারা... হযরত আবু বকর হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-কে সাথে নিয়ে চলে যান; হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) যেতে যেতে বলছিলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইত্তিকাল করেননি। আল্লাহ মুনাফিকদের ধ্বংস করে দেবেন।"[19] কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, 'হাত্তা ইউফনিয়াল মুনাফিকীন... মুনাফিকরা ধ্বংস হোক।'[20]
বর্ণনাকারী বলেন, মুনাফিকরা সেদিন বেশ উল্লসিত হয়েছিলো, তারা সেদিন মাথা সোজা করে দাঁড়িয়েছিলো। তাই হযরত আবু বকর বলেন, হে লোকসকল! নিশ্চয় হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন। তোমরা কি আল্লাহর বাণী শোননি?: 'ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন... নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[21] হযরত আবু বকর আরও বলেন, (আল্লাহর বাণী:) 'ওয়ামা জাআলনা লিবাশারিন মিন ক্ববলিকাল খুলদা... আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি।' অতঃপর হযরত আবু বকর মিম্বরে আরোহন করেন।"[22]
ইমাম আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব থেকে শুনেছেন যে, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মসজিদে হযরত আবু বকর -এর হাতে বায়আত অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো তখন হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) নবী করীম - এর মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রথমে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন, অতঃপর হামদ-সালাত পড়লেন এবং লোকদের সম্বোধন করে বললেন, হে লোকসকল! গতকাল আমি তোমাদেরকে একটি কথা বলেছিলাম কিন্তু আমি যেমনটি বলেছি, বাস্তবতা সেরূপ নয়। আল্লাহর কসম! আমি যা বলেছি আল্লাহর কিতাব এবং হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এ তার প্রমাণ নেই। আসলে আমার আশা ছিলো যে, আমাদের মৃত্যুর পরও হযরত রাসূলুল্লাহ আমাদের থেকেও দীর্ঘ বেঁচে থাকবেন অর্থাৎ আমাদের পরেই তিনি ওফাত পাবেন-অথবা কোনো বাক্য তিনি বলেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসুলের জন্য তাঁর নিকট উপস্থিতিই পছন্দ করেছেন, চিরদিন তোমাদের সামনে বেঁচে থাকার ওপর। আর এই মহাগ্রন্থ যা আল্লাহ তাঁর রাসুলের মাধ্যমে হিদায়েতের বার্তারূপে পেশ করেছেন, তোমরা সবাই দৃঢ়ভাবে সে-মতো জীবন গড়ো, আলোকপ্রাপ্ত হবে। ঠিক হযরত রাসূলুল্লাহ-এর আদর্শ অনুযায়ী আমল কর।”[23]
ইমাম আবু নসর বলেন, 'বস্তুত হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) হয়তো প্রচণ্ড মর্মযাতনা, মুনাফিকদের আত্মপ্রকাশ আশঙ্কা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা দমনের মানসিকতা থেকে উপর্যুক্ত বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে সেই পরিস্থিতিতে সিদ্দিকে আকবর (হযরত আবু বকর)-এর দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করলেন এবং তাঁর কণ্ঠে আল্লাহ -এর বাণী: 'কুল্লু নাফসিন যোয়িকতুল মাওত... প্রত্যেক প্রাণীর অবধারিত।”[24] এবং তিনি আরও ইরশাদ করেন, 'ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন... নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল।”[25] প্রতিধ্বনিত হওয়ায় উপর্যুক্ত বক্তব্য থেকে তিনি ফিরে আসেন।"[26]
ইমাম ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, হযরত আবু যুওয়াইব আল-হুযালী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম -এর অসুস্থতার খবর পেয়ে আমাদের গোত্রের মাঝে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ রাত নির্ঘুম কাটিয়ে ভোরের সময় একটু ঘুম এলে এক অদৃশ্য কণ্ঠে নিম্নের কবিতাটি ধ্বনিত হলো:
এটি একটি বড় ঘটনা যে, ইসলাম তার বাগানে মজবুত মাটিতে শিকড় গেড়েছে আর হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা বিদায় নিয়েছেন। তাঁর বিরহবেদনায় আমার দু'চোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা বইতে শুরু করেছে।
অতঃপর ভয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আমি আসমানের দিকে চোখ ফেরাতেই সেখানে সা'আদুয যাবিহ (বিষুবরেখা) দেখতে পাই। এতে আমি নিশ্চিত হই যে, নবী করীম নিশ্চয় বিদায় নিয়েছেন বা তিনি বিদায় নিতে যাচ্ছেন। অতঃপর আমি দ্রুত মদীনা পৌঁছুলাম, (এসে দেখি) হাজিরা ইহরামের সময় যেভাবে পাগলবেশে লাব্বায়েক বলতে থাকে মদীনাবাসীরা সেখানে বেসামাল কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? তাদের কেউ একজন বলল, হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন।”[27]
ইমাম আদ-দামীরী তাঁর হায়াতুল হায়ওয়ান গ্রন্থে বর্ণনা করেন, ইমাম আল-ওয়াকিদী থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর শায়খবর্গ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলেছেন, যখন নবী করীম ﷺ-এর ওফাত নিয়ে মানুষের মাঝে সংশয় দানা বাঁধে; তখন হযরত আসমা বিনতে উমায়স স্বীয় হাত নবী করীম -এর কাঁধে রেখে বললেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেছেন। কারণ নবী করীম -এর কাঁধ থেকে মোহরে নুবুওয়ত উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ থেকে পরিস্কার যে, নবী করীম ইত্তিকাল করেছেন।[28] হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী ও ইমাম আবু নুআইম (আল- আসবাহানী) বর্ণনা করেছেন।[29]
وَرُوِيَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ: وَضَعْتُ يَدِي عَلَى صَدْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ يَوْمَ مَاتَ... 'এ ছাড়াও হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তিকালের সময় আমার হাতটি তাঁর পবিত্র বুকের ওপর রেখেছিলাম। এরপর অনেক দিন অতিবাহিত হয়েছে, আমি খাবার খেয়েছি, অযু করেছি। তবুও আমার হাত থেকে মিশকের সুগন্ধি যায়নি।”[30]
ইমাম আবু নুআইম (আল-আসবাহানী) বর্ণনা করেন, হযরত আলী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন হযরত রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল করেন, তখন মালাকুল মওত কাঁদতে কাঁদতে আসমানে পৌছুান। সেই সত্ত্বার কসম! যিনি তাঁকে সত্যসহকারে প্রেরণ করেছেন তখন আমি আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পাই, হে মুহাম্মদ! এ-মসিবতের সামনে অন্য সব মসিবত তো অত্যন্ত সহজ।'[31]
টিকাঃ
[1] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪, পৃ. ৩০৪, হাদীস: ২৫০৬
[2] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ২২৪, হাদীস: ১৭৩৩
[3] আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৬-৪৭
[4] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়াতুন নাবরা, খ. ১, পৃ. ১৪৩
[5] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৭
[6] আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪৭
[7] আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৬৭
[8] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৩৩, হাদীসঃ ২২৩২
[9] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২৩৩, হাদীস: ২২৩৩
[10] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, আর-রিয়ামুন নাবরা, খ. ১, পৃ. ১৪৫
[11] মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৪৪
[12] (ক) ইয়াকুত আল-হামওয়ী, মুজামুল বুলসান, খ. ৩, পৃ. ২৬৫; (খ) আল-বুখারী, জাস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৭১, হাদীসঃ ১২৪১
[13] ইবনে হাজর আল-আসকালানী, ফতহুল বারী, খ. ৩. পৃ. ১১৪
[14] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪
[15] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৬. পৃ. ১৩, হাদীস: ৪৪৫৪
[16] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[17] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪
[18] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ৬, হাদীস: ৩৬৬৭ ও ৩৬৬৮
[19] ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৪২৭, হাদীস: ৩৭০২১
[20] ইসহাক ইবনে রাহাওয়াই, আল-মুসনদ, খ. ৩, পৃ. ৯৯১, হাদীসঃ ১৭১৮, হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত
[21] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[22] (ক) ইবনে আবু শায়বা, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৪২৭, হাদীস: ৩৭০২১; (খ) আল-কুরআন, সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৪
[23] ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, খ. ১৪, পৃ. ৫৮৯-৫৯০, হাদীস: ৬৬২০
[24] আল-কুরআন, সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৪
[25] আল-কুরআন, সুরা আয-যুমার, ৩৯:৩০
[26] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭০
[27] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ১৭, পৃ. ৫৪, হাদীসঃ ২০২৭৮
[28] আদ-দামীরী, হায়াতুল হায়ওয়ান, খ. ১, পৃ. ৩২৪
[29] আল-বায়হাকী, দালায়েলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৮
[30] আল-বায়হাকী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ২১৯, হাদীস: ৩১৫৯
[31] আল-কাস্তাল্লানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৫৭১
📄 নবী করীম (সাঃ)-এর গোসলের আলোচনা
নবী করীম ﷺ-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর-এ খলীফা মনোনীত হওয়া এবং তাঁর হাতে লোকজনকে বায়আত সম্পন্ন হওয়া মধ্য দিয়ে আল্লাহর মেহেরবানিতে উম্মার ঐক্য অটুট থাকে এবং যাবতীয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে। হযরত আবু বকর-এর বায়আত সম্পন্নে অব্যবহিত পর সাহাবাগণ নবী করীম-এর শেষক্রিয়া ও এর প্রস্তুতির জন্য মনোযোগী হন।
বর্ণিত আছে যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করা হল, নবী করীম ﷺ-এর গোসল কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে? জবাবে তিনি বলেছেন, হযরত আব্বাস একটি ঝিল্লিসমৃদ্ধ ইয়ামেনি চাদর দিয়ে তাঁর চারপাশে পর্দা টাঙিয়ে নেন। পরবর্তী কালে এটি আমাদের মাঝে এবং অনেক পুণ্যবানদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে যায়। এরপর বনী হাশিমের লোকরা যারা পর্দা ও দেওয়ালসমূহের মাঝে বসা ছিলেন তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হল। তারপর হযরত আব্বাস পর্দার ভেতরে প্রবেশ করে হযরত আলী, হযরত ফযল, হযরত আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ও হযরত উসামা ইবনে যায়দ-কে ডেকে নেন। অতঃপর যখন তাঁরা সবাই পর্দার ভেতরে সমবেত হলেন, তাঁরা, পর্দার বাইরের লোকজন এবং পরিবার-পরিজন সকলেই হঠাৎ নিদ্রা আচ্ছন্ন করে ফেললো। এরপর একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হল, নবী করীম ﷺ-কে গোসল দিও না, তিনি সম্পূর্ণ পূত-পবিত্র। তবে হযরত আব্বাস বললেন, তবুও গোসল দিতে হবে। আর নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, এই আওয়াজ সম্পূর্ণ সত্য। অতএব তাঁকে গোসল দিতে হবে না। হযরত আব্বাস বললেন, কে বা কার যাকে আমরা জানি না সেরকম একটি আওয়াজ শুনে আমরা সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। এরপর তাঁরা সবাই আবারো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলেন। এবারও একজন (অদৃশ্য) আহ্বায়কের আওয়াজে তাঁদের সবার ঘুম ভেঙে যায়, তিনি বললেন, তোমরা হযরত রাসূলুল্লাহ-কে গোসল দিতে পার, তবে কাপড়সহ তাঁকে গোসল দেবে। নবী করীম ﷺ-এর পরিবারবর্গ বললেন, না, এটি হতে পারে না। হযরত আব্বাস বললেন, হ্যাঁ, এটিই ঠিক থাকলো।
আর হযরত আব্বাস যখন পর্দার ভেতর গোসলের জন্য গেলেন চারজানু বিছিয়ে বসলেন, হযরত আলীও চারজানু বিছিয়ে বসলেন; তাঁরা উভয়ে মুখোমুখি (হয়ে বসলেন) এবং নবী করীম ﷺ-কে উভয়ের কোলে বসালেন। অতঃপর আওয়াজ আসল, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে চিৎ করে শোয়ানো হোক এবং পর্দাসহকারে গোসল দেওয়া হোক। অতঃপর তাঁরা তক্তা থেকে সরে গেলেন এবং এর ওপর নবী করীম ﷺ-কে শোয়ালেন। তক্তার পা পূর্ব দিকে আর মাথা পশ্চিম দিকে ছিল। এরপর গোসলের কাজ আরম্ভ করা হলো। তাঁর শরীরের জামা ছিল; যার একটি আস্তিন একদিক থেকে খোলা ছিল। এর ওপরই তাঁকে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দেওয়া হয় এবং কাফুরের সুগন্ধি লাগানো হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-এর জামা ও আস্তিন নিংড়ানো হয় এবং কপালে সাজদার অংশ ও শরীরের জোড়াগুলোতে সুগন্ধি মাখানো হয়। নবী করীম ﷺ-এর চেহারা, দুই হাত কনুই পর্যন্ত অংশগুলো অযুর পদ্ধতিতে ধোয়া হয়। এরপর তাঁর জামা ও খোলা আস্তিনের ওপরই কাফন পরানো হয় এবং বেজোড় সংখ্যায় তাঁকে সুগন্ধির ধূপ করা হয়। এরপর নবী করীম ﷺ-কে উঠিয়ে খাটিয়ার ওপর শোয়ানো হয় এবং ঢেকে দেওয়া হয়।
আর হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, যখন সাহাবাগণ হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে গোসল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁদের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়; তাঁরা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা কি হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাপড় খুলে ফেলব, যেমন- আমরা আমাদের অন্যান্য মৃত ব্যক্তির কাপড় খুলে ফেলি অথবা আমরা তাঁকে কাপড় পরা অবস্থায় গোসল দেব? যখন তাঁরা এ-নিয়ে তাঁদের মতভেদ করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেন। এমনকি তাঁদের একজনও ছিলেন না (নিদ্রার কারণে) যার থুতনী তার বুকের ওপর আপতিত হয়নি। এ-সময় জনৈক ব্যক্তি ঘরের এক কোণা থেকে বলল, তাঁরা জানতেন না তিনি কে: যে তোমরা নবী করীম ﷺ-কে তাঁর পরিধেয় কাপড়সহ গোসল দাও। তখন সাহাবাগণ উঠে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কাপড়সহ গোসল দিতে শুরু করেন। তখন তাঁর পরনে জামা পরিহিত ছিল।
তাঁরা জামার ওপর পানি ঢেলে দেন এবং ওই জামা দিয়ে তাঁর দেহ মুবারক ঘর্ষণ করেন। হযরত আয়িশা বলেন, আমি যদি আগে বুঝতে পারতাম, যা আমি পরে বুঝতে পারি, তবে তাঁকে তাঁর বিবিগণ ছাড়া আর কেউই গোসল দিতে পারত না।
অনেকের মতে, নবী করীম ﷺ-এর গোসলে আরও যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা হলেন, চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, তাঁরই দু'ছেলে: হযরত ফযল (ইবনে আব্বাস) ও হযরত কুসাম (ইবনে আব্বাস), নবী করীম ﷺ-এর পরম ভক্ত হযরত উসামা ইবনে যায়দ এবং নবী করীম ﷺ-এর ক্রীতদাস হযরত শুকরান প্রমুখ।
হযরত আলী নবী করীম ﷺ-কে বড়ই (পাতায় সিদ্ধ) পানি দিয়ে গোসল দেন। সচরাচর মৃত লোকজনের শরীরে যা পরিদৃষ্ট হয়; আল্লাহর রাসুলের শরীরে তার কিছুই দেখা যায়নি। হযরত আলী বলেন, তাঁর ওপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আপনি জীবনে-মরণে কতই না পূত-পবিত্র। হযরত আলী নিজের হাতে কাপড় মুড়িয়ে নবী করীম-এর জামার নিচে হাত চালিয়ে গোসল করান। নবী করীম ﷺ-এর প্রথম গোসল ছিল খালি পানি দিয়ে, দ্বিতীয়বার বরই পাতার পানি দিয়ে আর তৃতীয়বারে কাপুর মিশ্রিত পানি দিয়ে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫১০, হাদীস: ১৫৯৯
২. আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৮৫
৩. আদ-দিয়ার বক্সী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১৭০
৪. ইবনে কাসীর, আস-সীরাতুন্নাবাবিয়া, খ. ৪. পৃ. ৫২১
৫. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৯৬-১৯৭, হাদীস: ৩১৪১; (খ) আবুর রবী আল-কালায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫৮-৫৯
৬. আত-তাবরীযী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৬৭৫-১৬৭৬, হাদীস: ৫৯৪৮ (৫)
৭. আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৭, পৃ. ২৪২, হাদীস: ৩১৯৬
৮. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৪, পৃ. ১৮৬-১৮৭, হাদীস: ২৩৫৭
৯. আল-বাযযার, আল-বাহরুষ বাঘযার, খ. ২, পৃ. ১৩৫-১৩৬, হাদীস: ৯২৫
১০. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪৭১, হাদীস: ১৪৬৮
১১. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৫৫৫, হাদীস: ৬৬৫৭
১২. আস-সামহুদী, ওয়াফাউল ওয়াফা, খ. ৩, পৃ. ১৪৪