📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 দ্বিতীয় অধ্যায়: الْعَدْوَى (রোগ সংক্রমণ)

📄 দ্বিতীয় অধ্যায়: الْعَدْوَى (রোগ সংক্রমণ)


ইতঃপূর্বে সংক্রামক ব্যাধি ও ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কিত ধারণার অসারতা বিষয়ক হাদীসগুলো আমরা উল্লেখ করেছি যাতে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো পোষণের ব্যাপারে বারণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ লোকদের একটি প্রশ্ন হলো, ছোঁয়াচ সংক্রমণকে নাকচ করার পরও রাসূল ইরশাদ করেছেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِهِ (শ্বেতরোগী থেকে সেভাবে দূরত্ব বজায় রাখো যেমনটি তোমরা বাঘ থেকে পালিয়ে বাঁচো।) তিনি আরও ইরশাদ করেন, وَلَا عَحِلُّ تُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ (রোগা উটকে সুস্থ উটের সাথে রাখা উচিত নয়।) অন্য এক বর্ণাতে এসেছে, وَلَا يُوْرِدَنَ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ (যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে) এখানে অসুস্থ বলতে রুগ্‌ণ উটের মালিক এবং সুস্থ বলতে সুস্থ উটের মালিক। অথচ নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ،لَا يُعْدِي شَيْ: شَيْئًا (একজনের রোগবালাই অন্যের কাছে পার হয় না।)

জনৈক বেদুঈন নবী করীম -এর দরবারে এসে বলল, فَمَا بَالُ إِبِلٍ، يَكُوْنُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظَّبَاءُ، فَيَأْتِي الْبَعِيرُ الْأَجْرَبُ، فَيَدْخُلُ فِيْهَا فَيُجْرِبُهَا ؟
'এ-ব্যাপারে আপনার মত কি যে, হরিণের ন্যায় সুস্থ উট প্রান্তরে থাকে। পরে কোনো চর্মরোগগ্রস্থ উট এদের সাথে মিশে সবগুলোকে চর্মরোগে আক্রান্ত করে।'
বেদুঈনের বক্তব্য খণ্ডন করে হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ»؟
'তা যদি হয় তবে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?'

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,
جَاءَ أَعْرَابِ إِلَى النَّبِيِّ ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ التَّقْبَةُ تَكُوْنُ بِمِشْفَرٍ الْبَعِيرِ، أَوْ بِعَجْبِهِ، فَيَشْتَمِلُ الْإِبِلَ كُلَّهَا جَرَبًا، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ لَا عَدْوَى، وَلَا هَامَةَ، وَلَا صَفَرَ، خَلَقَ اللَّهُ كُلَّ نَفْسٍ، فَكَتَبَ حَيَاتِهَا وَمُصِيبَاتِهَا وَرِزْقَهَا».
'জনৈক বেদুঈন নবী করীম -এর দরবারে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চর্মরোগ প্রথমে উটের ঠোটে বা লেজে দেখা যায়, এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উটের শরীরেও তা ছড়িয়ে পড়ে। একথার প্রতিক্রিয়ায় রাসূলে ইরশাদ করেন, 'প্রথম যে-উটের শরীরে রোগটি হয়েছে তা কোথা থেকে এসেছিলো? মনে রেখো! রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই, পেঁচায় কোনো অশুভ নেই এবং সফর মাসের মধ্যে অমঙ্গলের কিছু নেই। আল্লাহ প্রত্যেকটি প্রাণী সৃষ্টির পর তার জীবন, বিপদাপদ ও রিযক নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”

বর্ণিত আছে যে, প্রথম প্রথম হযরত আবু হুরায়রা নবী করীম -এর দুটো হাদীস বর্ণনা করতেন: لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই) ও ،لَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٌ« (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে।) পরে لَا عَدْوَى হাদীসটি বর্ণনা থেকে তিনি নিরবতা অবলম্বন করেন এবং لَا يُوْرِدَنٌ تُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ হাদীসটিই কেবল বর্ণনা করতেন তিনি। বরং হযরত আবু হুরায়রা প্রথম হাদীসটি অস্বীকার করেন। লোকজন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি لَا عَدْرَى হাদীসটি বর্ণনা করেননি? এ-সময় তিনি হাবশি ভাষায় কি যেন বললেন। হযরত আবু সালামা বলেন, আমি হযরত আবু হুরায়রা এ-হাদীসটি ভিন্ন অন্য কোন হাদীস ভুলে যেতে দেখিনি।

হযরত আবু হুরায়রা -এর চাচাতো ভাই হযরত হারিস বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তুমি তো এ-হাদীসটির অন্য হাদীসটিও বর্ণনা করতে, এখন দেখছি সে ব্যাপারে নিরবতা অবলম্বন করছ! তুমি বলতে, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)।

প্রতিক্রিয়ায় হযরত আবু হুরায়রা হাদীসটি সম্পর্কে তাঁর জানাশোনার ব্যাপারটি অস্বীকার করেন। বরং তিনি বলেন, لَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٌ (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে।) এ-নিয়ে হযরত হারিস-এর বিতর্কে হযরত আবু হুরায়রা একপর্যায়ে রেগে যান এবং হাবশি ভাষায় কি যেন বলেন। হযরত আবু সালামা বলেন, আমার প্রাণের শপথ! হযরত আবু হুরায়রা অবশ্যই আমাদেরকে এ-হাদীসটি বর্ণনা করতেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)। জানি না, হযরত আবু হুরায়রা কি ভুলে গেলেন? নাকি এ-দুটো হাদীসের একটি রহিত হয়ে গেল।

যদি আপনি প্রশ্ন তুলেন যে, যেহেতু হযরত আবু হুরায়রা নিজে বর্ণনাটি অস্বীকার করেছেন সেহেতু সেটি আর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। এ-ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে, এখানে উসুলে হাদীসের বিধান হচ্ছে, সাধারণত যদি কোনো বর্ণনাকারী তাঁর কোনো হাদীস বর্ণনা অস্বীকার করেন তাতে হাদীসটির প্রমাণ্যতা বাতিল হয়ে যায় না। যদি আমরা মেনেও নিই তবুও لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই) হাদীসটি অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত অনেক হাদীস দ্বারা সুপ্রমাণিত। সে-ধরনের হাদীসও আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি।

রোগে সংক্রমণ নাকচকারী ও শ্বেতরোগীকে এড়িয়ে চলতে নিদের্শক হাদীসদুটোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে ...ا لَا يُوْرِدَنَّ مُمْرِضُ عَلَى مُصِحٌّ (রোগা উটকে সুস্থ উটের সাথে বাঁধা উচিত নয়) বা وَلَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضُ عَلَى মুছিহ (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে) হাদীসদুটোর মধ্যেও পারস্পরিক দ্বন্ধ বিদ্যমান। সুতরাং রোগে সংক্রমণ নাকচকারী ও শ্বেতরোগীকে এড়িয়ে চলতে নিদের্শক হাদীসদুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে বিশেষজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের প্রসিদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য অভিমতসমূহ উল্লেখ করবো। এতে দ্বিতীয় হাদীসের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের তথ্য-সূত্র সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে। প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন।

অতএব আমার বক্তব্য হচ্ছে, নবী করীম -এর ইরশাদ: )لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)-এর বিশ্লেষণে সহীহ আল- বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, 'স্বভাবভাবে রোগব্যাধি সংক্রমিত হতে পারে না। এটি বস্তুত আল্লাহ তাআলার হুকুম ও তাঁর পরিচালিত প্রাকৃতিক নিয়ম।” এ কারণেই নবী করীম অসুস্থ উটের কাছে সুস্থ উটকে যেতে নিতে নিষেধ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরত্ব বজায় রেখো...।) কেউ কেউ বলেছেন, হাদীসটি لَا عَدْوَى থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র (এ-দুটোর মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ রয়েছে।)

ইমাম আত-তূরবর্তী বলেন, 'নবী করীম -এর ইরশাদ: لَا عَدْوَى-এর মর্মার্থ বিশ্লেষণে ওলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম বলেন, স্পষ্ট হাদীসের বক্তব্য এবং ছোঁয়াচের ওপর পূর্বে আলোচিত আলামত দ্বারাই রোগের সংক্রমণ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসার একথা সুপ্রতিষ্ঠিত। অতএব এখানে এটিই উদ্দেশ্যে।

আর কারো কারো রায় হচ্ছে, এখানে রোগের সংক্রমনশক্তি নাকচ করা উদ্দেশ্য নয়। হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ فِرَارَكَ مِنَ الْأَسَدِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরে থাকো যেমটি মানুষ বাঘ থেকে পালিয়ে বাঁচে। তিনি আরও ইরশাদ করেন, لَا يُوْرَدَنْ ذُوْ عَامَةِ عَلَى مُصِح (কেউ যেন কখনো উন্মাদ উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে)। এসব দ্বারা প্রকৃতিবাদীদের বিশ্বাসই মূলত নাকচ করা হয়েছে। যারা বিভিন্ন অশুভ প্রভাবের অপরিহার্য প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। এখানে তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হল যে, তারা যেমন ধারণা ব্যাপারটি ঠিক সে-রকম নয়। বস্তুত ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে সেটা কারো শরীরে ক্রিয়া করবে, না চাইলে করবে না। এ-দিকে ইঙ্গিত করতে গিয়ে নবী করীম ইরশাদ করেন, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ»؟ (তাহলে প্রথম অসুস্থ উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?) অর্থাৎ যদি তোমাদের ধারণা অনুযায়ী এখানে অসুস্থতার একমাত্র কারণ সংক্রমণই প্রতিক্রিয়াশীল হয় তাহলে প্রথম অসুস্থ উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?

অবশ্য নবী করীম এও ইরশাদ করেছেন যে, »وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরত্ব বজায় রেখো...।) তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, لَا يُوْرَدَنَّ ذُوْ عَامَةِ عَلَى مُصِحُ (কেউ যেন কখনো উন্মাদ উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে)। এসব অসুস্থতার কারণসমূহ হেলেপড়া দেয়াল এবং ভাঙা নৌকো থেকে দূরে থাকার নির্দেশের সাথে তুলানা রাখে।

উদ্ধৃত হাদীসদুটো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে প্রথমপক্ষ দ্বিতীয়পক্ষের দাবিকে রদ করেছেন। হাদীসদুটোতে শ্বেতরোগী ও অসুস্থ উট যেকারো সাথে মেলামেশা করতে নিষেধের ব্যাপারটি সহানুভূতিমূলক। কেউ যেন ঘটনাক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়লে অথবা উট রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে সংক্রামিত হওয়ার প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে।

তিনি আরও বলেন, উপর্যুক্ত বিশ্লেষণদুটোর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্লেষণটিই অধিক যথার্থ। কেননা এতে সেসব হাদীসের মধ্যেই সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে যা প্রসঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট। অবশ্য প্রথম বিশ্লেষণ দ্বারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো অসার করে দেয়। তবে ইসলামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো বাতিল করা হয়নি। বরং শরীরবৃত্তীয় অনেক বক্তব্য ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ। অতএব এখানে এমনভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে যাতে, তাওহীদী বিশ্বাসের বিপরীতও যেন না হয় এবং আমরা উপরে যা বলেছি তারও বিপরীত না হয়।...

অবশ্য রোগের সংক্রমণে ধারণা ভিত্তিহীন প্রমাণে তাঁরা বিভিন্ন আলামতকে ভিত্তি করে যে-দলিল উপস্থাপন করেছেন তার জবাবে বলা যায় যে, সাহেবে শরীয়তের অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একই সাথে একটি বিষয়কে হারাম ও মাকরুহ বলা হয়েছে। কোনো বিষয় যা একটি মাত্র কারণে নিষিদ্ধ এবং আরেকটি বিষয় যা অনেকগুলো কারণে নিষিদ্ধ উভয়কেও এক করে ফেলা হয়েছে। আমাদের এ- বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় নবী করীম-এর হাতে বায়আত গ্রহণে ইচ্ছুক এক শ্বেতরোগীর উদ্দেশ্যে নবী করীম -এর এ-পবিত্র ইরশাদ قَدْ بَايَعْنَاكَ (نَازَجِ (তোমাকে আমি বায়আত করে নিলাম, তুমি যাও) থেকে। অথচ খোদ নবী করীম অন্য সময় এক শ্বেতরোগী হাত ধরে তা একটি খাবারের পাত্রে রেখে ইরশাদ করেন, كُلِّ يَقَةٌ بِاللهِ، وَتَوَكَّلًا عَلَيْهِ (আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ভরসা রেখে খাও)। এ-উভয় হাদীসের মাঝে সুসঙ্গতির কোনো পথ খোলা নেই, তবে প্রথম হাদীসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপসর্গসমূহ থেকে সতর্কতা অবলম্বন আর দ্বিতীয় হাদীসের ক্ষেত্রে উক্ত ক্ষতিকর কারণসমূহ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-এ-ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। অতএব প্রথম হাদীস দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির কারণসমূহ থেকে সতর্কতা অবলম্বন প্রমাণিত হয়, এটি সুন্নতও বটে। দ্বিতীয় হাদীস থেকে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ক্ষতির কারণসমূহকে প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশনা প্রমাণিত হয়।

আর ইমাম আত-তীবী হযরত আমর ইবনে শারিদ বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, বনী সাকীফের প্রতিনিধি দলে একজন শ্বেতরোগী ছিলেন, লোকটিকে নবী করীম ফেরত পাঠিয়ে বলেছিলেন যে, قَدْ بَايَعْنَاكَ (نَازَجِ (তোমার আমি মঞ্জুর করে নিলাম এবার তুমি ফিরে যাও)। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। এ-হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, নবী করীম -এর পক্ষ থেকে এটি একটি মঞ্জুরি সেসব লোকের জন্য যারা তাওয়াক্কুলের কাঙ্ক্ষিত স্তরে তখনো পৌঁছাতে পারেনি এবং বিভিন্ন কার্যকারণকেই মূলত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অবশ্যই একথা অনস্বীকার্য যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুলে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ রেখেছেন।

আর ইমাম আল-বাগাওয়ী বলেন, কারো কারো বক্তব্য হচ্ছে, শ্বেতরোগীর শরীরের একধরণের দুর্গন্ধ থাকে। তার সাথে উঠাবসা, খাওয়া- দাওয়া এবং চলাফেরা করলে তাই অনুভূত হয়। এর সাথে কিন্তু সংক্রমণ শক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। এসব তো বরং স্বাস্থ্য ও অভিরুচির ব্যাপার। বাসি ও পঁচা খাবারগ্রহণ এবং অরুচিকর পরিবেশে বসবাস যেমন স্বাস্থ্য- উপযোগী নয় (শ্বেতরোগীর শরীরের দুর্গন্ধও তেমন, এটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। এটা সংক্রমক শক্তির প্রভাব নয়)। প্রকৃত সত্য হলো, পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটে কেবল আল্লাহর হুকুমেই ঘটে।

وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
'বস্তুত তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুরই কারো ক্ষতি সাধণের ক্ষমতা নেই।

শায়খ ইমাম হাফিয ইবনে হাজর আল-আসকালানী শরহু নুখবাতিল ফিকার গ্রন্থে বলেন, উপর্যুক্ত দু'ধরনের হাদীসের মাঝে কোনো বৈপরিত্য নেই, বরং সামঞ্জস্য আছে। প্রকৃতপক্ষে কোনো রোগ আপনা আপনি সংক্রমিত হয় না। তবে আল্লাহ তাআলা অসুস্থ মানুষের সাথে সুস্থ মানুষের সংশ্রবকে রোগবালাইয়ের একটি পার্থিব কার্যকারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অতএব কখনো এ-ধরনের সংশ্রবে রোগবালাই ছড়াতেও পারে। আবার কখনো কখনো এসব কারণের উপস্থিতিতেও রোগ ছড়ায় না। ইবনুস সালাহও এভাবে সামঞ্জস্য বর্ণনা করেছেন।

উভয় হাদীসের মধ্যকার সামঞ্জস্য বিধানে আমাদের বলা উচিত হবে যে, নবী করীম -এর সংক্রমণ সম্পর্কে ভ্রান্তধারণা পোষণ থেকে বারণ করা সাধারণভাবে যথাস্থানে ঠিকই আছে। সেই সাথে ،لَا يُعْدِي شَيْءٌ شَيْئًا (একজনের রোগ অন্যজনের প্রতি ছড়ায় না) মর্মে যে-বক্তব্য দিয়েছেন তাও সম্পূর্ণ সঠিক। নবী করীম এও বলেছেন যে, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟ (তবে কে প্রথম লোকটিকে অসুস্থ করল?) অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তিকে যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অসুস্থ করেছেন ঠিক অনুরূপভাবেই তিনি অপরাপর লোকগুলোকে অসুস্থ করেন।

শ্বেতরোগী এড়িয়ে চলার এ-নির্দেশনা ভ্রান্তি নিরসনের জন্যে। কারণ হতে কোনো ব্যক্তি শ্বেতরোগীর সংশ্রবের পর ঘটনাক্রমে আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী অসুস্থ হয়ে পড়ে, যা কখনো নিন্দিত সংক্রমক শক্তির প্রভাবে হয়েছে এমন নয়। তবুও সে ধারণা করে বসতে পারে যে, এটা শ্বেতরোগীর সাথে সংশ্রবের ফলে সংক্রমিত হয়েছে। ফলে সে ভ্রান্ত সংক্রমণ ধারণাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। এতে সে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অতএব হাদীসে এ-ভ্রান্ত বিশ্বাস সমূলে উপড়ে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন সবকিছু।

এই ছিল শায়খ ইবনে হাজার আল-আসকলানী -এর বক্তব্য যা নুখবাতুল ফিকারের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। টীকায় বলা হয়েছে, তিনি আরও বলেন, একজন শ্বেতরোগীর সাথে নবী করীম একপাত্রে একসাথে খাওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না। নবী করীম ও আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে বিন্দুপরিমাণ সন্দিহান হবেন তা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এটা মূলত আত্মবিশ্বাসে দোদুল্যমান, সন্দেহপ্রবণ লোকদের ব্যাপার যারা কোনো রোগ দেখা দিলে তা অন্য কারো থেকে সংক্রমিত বলে ধারণা পোষণ করে। বস্তুত নবী করীম ছিলেন সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তিনি এর মধ্য দিয়ে যাতে মানুষ শিরকের সাগরে সামান্যটুকুও পতিত না হয় সে জন্য তিনি কাজটি করে দেখিয়েছেন। আল্লাহ তাঁর নবীর অপরিসীম অনুগ্রহের এই বিস্তৃত ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের পূণ্য-আমলের তওফীক দিন। দয়া ও মমতার আধার নবী করীম -এর ওপর অগুণিত শুভেচ্ছা ও সালাম প্রেরণ করছি।

এসব বক্তব্য হাফিয ইবনে হাজর আল-আসকালানী -এর। তিনি নবী করীম আলায়হিস সালাত ওয়াস সালামের সালাম ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে প্রসঙ্গটির ইতি টেনেছেন। আমিও সেভাবেই আলোচনার সমাপ্তি টানলাম। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী।

টিকাঃ
১. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীস: ৫৭0৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
২. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৩৮০, হাদীস: ৭৫০, হযরত আবু আতিয়া আল-আশজায়ী থেকে বর্ণিত
৩. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
৪. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৫০-৪৫১, হাদীস: ২১৪৩, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত
৫. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৮, হাদীস: ৫৭১৭ ও পৃ. ১৩৭, হাদীস: ৫৭৭০, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
৬. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১৪, পৃ. ৮৫, হাদীস: ৮৩৪৩; (খ) ইবনে হিব্বান, আস- সহীহ, খ. ১৩, পৃ. ৪৮৭, হাদীস: ৬১১৯, হযরত আবু হয়ায়রা থেকে বর্ণিত
৭. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৩, হাদীসঃ ১০৪ (২২২১), হযরত আবু সালামা থেকে বর্ণিত
৮. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৩, হাদীস: ১০৪ (২২২১), হযরত আবু সালামা থেকে বর্ণিত
৯. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৩৮০, হাদীস: ৭৫০, হযরত আবু আতিয়া আল-আশজায়ী থেকে বর্ণিত
১০. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
১১. আল-কিরমানী, প্রাগুক্ত, খ. ২১, পৃ. ৩
১২. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১৫, পৃ. ৪৪৯, হাদীস: ৯৭২২; (খ) আল-বুখারী, আস- সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীস: ৫৭০৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
১৩. আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত
১৪. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, (খ) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীসঃ ৫৭০৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
১৫. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৫২, হাদীসঃ ১২৬ (২২৩১), হযরত শারীদ ইবনে সুওয়াইদ আস- সাকাফী থেকে বর্ণিত
১৬. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ২০, হাদীস: ৩৯২৫, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত
১৭. আত-তূরবুন্সী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১০১০-১০১১
১৮. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৫২, হাদীসঃ ১২৬ (২২৩১), হযরত শারীদ ইবনে সুওয়াইদ আস- সাকাফী থেকে বর্ণিত
১৯. আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:১০২
২০. ইবনে হাজর আল-আসকলানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৩-৯৪ ও ২১৬-২১৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px