📄 প্রথম অধ্যায়: الطِّيَرَةُ (অশুভ লক্ষণ)
ইমাম আত-তীবী আলাইহি-এর বর্ণনা মতে, الطَّيَرَةُ শব্দটি ৬ বর্ণ ই-কার ওড় বর্ণে আ-কার-সহকারে, এ বর্ণ কখনো হসন্তপূর্ণও হয়ে থাকে—এর অর্থ হচ্ছে, কোনো বস্তুকে অলক্ষুণে মনে করা। تخيرخيره-এর মতো طير طرة হচ্ছে ক্রিয়ামূল।
বস্তুত اطَّرَةُ হচ্ছে শিকারে গমনের পূর্বে পাখি বা হরিণ ইত্যাদি দিয়ে শুভ কিংবা অশুভ যাচাই করে নেওয়া। সে-অনুযায়ী লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে যেত। শরীয়ত এই ধরনের লক্ষণ বিচারকে নাকচ করে দিয়েছে। এ-ধরনের প্রচলন বাতিল এবং তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে লাভ-লোকসানের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ও কার্যকরিতা নেই।
الْفَأْلُ শব্দটি مَهْمُوزُ (শব্দের মূল ধাতুর দ্বিতীয় পদ হামযা বিশিষ্ট) শুভ-অশুভ উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়, কিন্তু الطَّيَرَةُ কেবল অশুভ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কদাচিৎ শুভ অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
আমার বক্তব্য হচ্ছে, উপর্যুক্ত অর্থসমূহ আভিধানিক। পক্ষান্তরে শরীয়তে الْفَأْلُ-এর ব্যবহার সাধারণভাবে কেবল শুভ নির্ধারিত এবং الطَّيَرَةُ ব্যবহৃত নেতিবাচক অর্থে। অবশ্য কোনো বিশেষণবন্দী হয়ে অশুভ অর্থেও ব্যবহৃত হয। যেমন- বলা হয়: الْفَأْلُ السَّيْءُ وَالْفَأْلُ الْمَكْرُوهُ (মন্দ ফাল বা মাকরুহ ফাল)।
এদিকে ইমাম আত-তীবী বলেন, হযরত আনাস (ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত নিম্ন হাদীস থেকে الطَّيَرَةُ ও الْفَأْلُ-এর মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়:
عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: «لَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْفَأْلُ»، قَالُوا: وَمَا الْفَأْلُ؟ قَالَ: كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ».
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইরশাদ করেন, ‘রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, শুভ-অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই। তবে ফাল আমাকে মুগ্ধ করে।' সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ফাল কী? তিনি উত্তর দিলেন, 'ফাল হচ্ছে ইতিবাচক ধারণা।”
ইমাম আল-কিরমানী-এর শরহুল বুখারী গ্রন্থে এসেছে, বস্তুত জাহেলি যুগে লোকেরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার আগে কোনো হরিণ- পাখিকে উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দিতো। প্রাণীটা ডান দিকে চলে গেলে শুভলক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হতো। বামদিকে গেলে মনে করা হতো অশুভ লক্ষণ।
(সহীহ) মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে ইমাম আন-নাওয়াওয়ী বলেন, এ-ধরনের বিশ্বাস স্পষ্টত শিরক। এর নিয়ম হচ্ছে, যে-নীতি-বিশ্বাসে কোনো ক্ষতি নেই এবং কোনো কিছু সাফল্যমণ্ডিত হওয়ার ক্ষেত্রে এর বিশেষ বা সাধারণ কোনো বিশেষত্বও নেই, তাহলে সে-নীতি-বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়।
....আর র্তা এমনই একট ভ্রান্ত বিশ্বাসের নাম। আর যেখানে সাধারণভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অবশ্য তা স্থায়ী নয়, এমনটা কখনো-সখনো ঘটতে পারে, বারবার নয়; যেমন- মহামারী। এ-ধরনের এলাকায় বাইরে থেকে কারো প্রবেশও করা যাবে না আবার সে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াও না। যা নির্দিষ্ট বা ব্যাপাকভাবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, যেমন- বাড়ি, ঘোড়া ও নারী। এসব এড়িয়ে চলা মুবাহ।
আন-নিহায়া গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ফাল শব্দটি-বিশিষ্ট। এটি শুভ-অশুভ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শব্দটা সাধারণত শুভ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে মাঝে-মধ্যে অশুভ অর্থেও ব্যবহার হয় বটে। অবশ্য লোকজন সহজের জন্যে শব্দটির বর্জন করে মিলিয়েও উচ্চারণ করে থাকে।
হযরত রাসূলুল্লাহ ফাল পছন্দ করতেন। কেননা মানুষ যখন আল্লাহর কাছে কোনো বিষয়ে প্রার্থনা করেন, তখন তারা তাদের প্রত্যেকটি ছোট-বড় সব প্রত্যাশার ক্ষেত্রে শুভপরিণতিই কামনা করে। যদিও তাদের প্রত্যাশাপদ্ধতি সঠিক নাও হয়। যাবতীয় প্রত্যাশা আল্লাহর কাছে কামনাই মানুষের জন্য একমাত্র সঠিক। মানুষের আশা-প্রত্যাশা যখন আল্লাহমুখী না হয় তখন সেটা অবশ্যই কু-চিন্তাপ্রসূত হয়ে থাকে।
পক্ষান্তরে الطَّيَرَةُ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি একটা মন্দধারণা, এতে মানুষ বিভিন্ন বিপদাপদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ-ধরনের বিশ্বাস বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় এবং শরীয়তের তরফেও তা নিষিদ্ধ। আর الفَأْلُ (সুলক্ষণ গ্রহণ) হচ্ছে, যেমন- কোনো অসুস্থ বা কিছু হারিয়ে তার খোঁজকারী ব্যক্তি কারো মুখে শুনতে পেল (তাকে উদ্দেশ্য করে কেউ বলছে), يَا بَارِي (হে সুস্থ ব্যক্তি) বা يَا وَاجِدُ (তোমার জিনিস তো পেয়েই গেছো)—এতে রুগ্ন ব্যক্তি সুস্থতার ক্ষেত্রে আর কিছু হারিয়ে তার খোঁজকারী ব্যক্তি হৃত বস্তুটি পাওয়ার বেলায় আশান্বিত হলো।
আমার মতে, এটিই হাদীসের ভাষায়: لِ«-এর তাৎপর্য।
আন-নিহায়া গ্রন্থে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, الطَّيَرَةُ শব্দটি ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক আর الفَأْلُ বিশেষ অর্থবাচক। যেমনটি বলা হয়ে থাকে, أَصْدَقُ الطَّيَرَةِ الْفَأْلُ-এর মধ্যে الفَأْلُ-ই হচ্ছে সঠিক)।
আমার অভিমত হচ্ছে, উভয় শব্দ প্রায় সমার্থক। অবশ্য অভিধানে الطَّيَرَةُ শব্দটি সন্দেহাতীতভাবে মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সেই সাথে الفَأْلُ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আল-কামূস গ্রন্থে বলা হয়েছে, الطَّيَرَةُ হলো যা সাধারণভাবে অলক্ষুণে ভাবা হয়।
الطَّيَرَةُ (শুভ-অশুভ ধারণা) ও الفَأْلُ (শুভ লক্ষণ গ্রহণ)-এর অর্থ বোঝার পর এ-অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা পেশ করছি।
উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে বেশ কিছু হাদীসে اَلْمَدْوَى (রোগ-বালাইয়ে সংক্রমণের ধারণা) ও الفَأْلُ (শুভ লক্ষণ গ্রহণ) উভয়ের আলোচনা এসেছে। অতএব এর মধ্যে যেকোনোটি ব্যাপারে সেসব হাদীস আমরা একবার আলোচনা করেছি তা দ্বিতীয়বার আবারো আলোচনায় আনবো না। সফর মাসের অশুভ ধারণার খণ্ডনে আলোচিত হাদীসসমূহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অবশ্য বিষয়ের প্রয়োজনে ও প্রেক্ষাপটে কিছু হাদীসের পুনরুল্লেখ প্রয়োজন হতেও পারে।
জামিউল উসূলের হাদীসসমূহ
عَنْ بُرَيْدَةَ، قَالَ: أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَانَ لَا يَتَطَيَّرُ مِنْ شَيْءٍ، وَكَانَ إِذَا بَعَثَ عَامِلًا يَسْأَلُ عَنِ اسْمِهِ، فَإِذَا أَعْجَبَهُ فَرِحَ بِهِ وَرُنِيَ بِشْرُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ، وَإِنْ كَرِهَ اسْمَهُ رَأَيْتُ كَرَاهَةُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ، وَإِذَا دَخَلَ قَرْيَةً سَأَلَ عَنِ اسْمِهَا، فَإِذَا أَعْجَبَهُ فَرِحَ بِهَا وَرُشِيَ بِشْرُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ، وَإِنْ كَرِهَ اسْمَهَا رَأَيْتُ كَرَاهَهُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ».
'হযরত বুরায়দা থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ কোনো বস্তুকে অলক্ষুণে মনে করতেন না। তিনি যখন কোনো এলাকায় কাউকে গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠাতেন তখন তার নাম জিজ্ঞেস করতেন। নাম সুন্দর হলে তাঁর চেহারায় প্রসন্নভাবে পরিদৃষ্ট হতো আর নামের শব্দগুলো ভালো না হলে তাঁর জ্যোতির্ময় চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ লক্ষ করা যেতো। আর যখন তিনি এলাকায় প্রবেশ করতেন তখন তার নাম জিজ্ঞেস করতেন। নাম সুন্দর হলে তাঁর চেহারায় প্রসন্নভাবে পরিদৃষ্ট হতো আর নামের শব্দগুলো ভালো না হলে তাঁর জ্যোতির্ময় চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ লক্ষ করা যেতো।' হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَانَ يُعْجِبُهُ إِذَا خَرَجَ لِحَاجَتِهِ أَنْ يَسْمَعَ: يَا رَاشِدُ يَا نَجِيحُ .
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কাজে বেরুতেন, কারো মুখ থেকে হে সৎকর্মপরায়ণ! হে সফল ব্যক্তি! এরূপ সম্বোধন শুনলে তাঁকে খুশি মনে হতো।' হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ عُرْوَةَ بْنِ عَامِرٍ الْقُرَشِيِّ، قَالَ: ذُكِرَتِ الطَّيَرَةُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «أَحْسَنُهَا الْفَالُ وَلَا تُرَدُّ مُسْلِمًا، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ، فَلْيَقُلِ: «اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ بِالسَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ».
'হযরত ওরওয়া ইবনে আমির আল-কুরাশী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে الطَّرَةُ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, তার চেয়ে الْفَالُ উত্তম। এটি মুসলমানকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলে না। তোমরা কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পেলে তাহলে বলবে: اللَّهُمَّ لَا يَأْتِ بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ بِالسَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ».
'হে আল্লাহ! সৌন্দর্য ও কল্যাণ তোমার নির্দেশেই আসে এবং আমাদের যাবতীয় মন্দ ব্যাপার তুমিই দূরীভূত করে থাকো। সর্বপ্রকার শক্তি-সামর্থ্য তোমার হাতে সংরক্ষিত।” হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ ابْنِ مَسْعُوْدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «الطَّيَرَةُ شِرْكٌ، الطَّيَرَةُ شِرْكٌ، وَمَا مِنَّا إِلَّا ، لَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكَّلِ».
'কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক, কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক'-একথা তিনি তিন বার বলেছেন। 'যদি (পরোক্ষভাবে হলেও) সাধারণত অধিকাংশ লোক কুলক্ষণ ধারণায় বিশ্বাস করে, কিন্তু আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের বরকতে এর কাল্পনিক প্রভাব থেকে আল্লাহ মানুষকে হিফাযত করেন।"
হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আত-তিরমিযী-এর বর্ণনায় এসেছে, قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «الطَّيِّرَةُ مِنَ الشَّرْكِ، وَمَا مِنَّا إِلَّا ، وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكَّلِ».
'তিনি (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক। যদি (পরোক্ষভাবে হলেও) সাধারণত অধিকাংশ লোক কুলক্ষণ ধারণায় বিশ্বাসী। কিন্তু আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের বরকতে এর কাল্পনিক প্রভাব থেকে আল্লাহ মানুষকে হিফাযত করেন।'
ইমাম আত-তিরমিযী বলেন, আমি হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল-কে বলতে শুনেছি যে, হযরত সুলাইমান ইবনে হারব এ-হাদীস : وَمَا مِنَّا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكَّلِ -এর ব্যাপারে বলেছেন, আমার মতে এটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ -এর বক্তব্য।
وَعَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: «لَا عَدْوَى، وَلَا طِيرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْقَالُ»، قَالُوا: وَمَا الْقَالُ؟ قَالَ: كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ».
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, শুভ-অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই। তবে তা আমাকে মুগ্ধ করে।' সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, 'ফাল কী? তিনি উত্তর দিলেন, 'ফাল হচ্ছে ইতিবাচক ধারণা।"
হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আল-বুখারী-এর অনুরূপ অন্য একটি বর্ণনা আছে, এতে নবী করীম ইরশাদ করেন,
يُعْجِبُنِي الْقَالُ الصَّالِحُ : الْكَلِمَةُ الْحَسَنَةُ».
'ভালো ফাল আমাকে মুগ্ধ করে; তা একটি কল্যাণধর্মী ধারণা।”
অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, আর এতে নবী আলায়হি করীম ইরশাদ করেন, الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ».
'একটি ইতিবাচক ধারণা।'
ইমাম আল-বুখারী-এর অনুরূপ ইমাম আবু দাউদ ও একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর প্রথম হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।
[۱۱] وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ : لَا عَدْوَى، وَلَا طِيرَةَ، وَإِنَّمَا السُّؤْمُ فِي ثَلَاثٍ: فِي الْفَرَسِ، وَالْمَرْأَةِ، وَالدَّارِ».
'(১) [হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত আছে যে,] তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, শুভ-অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই। অবশ্য অলক্ষুণে হলে এ-তিনটাই হতে পারে, ঘোড়া, নারী এবং বাড়ি।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর) বলেন,
[۱۲] ذَكَرُوا الشَّوْمَ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ ، فَقَالَ : «إِنْ كَانَ السُّؤْمُ فِي شَيْءٍ؛ نَفِي الدَّارِ، وَالْمَرْأَةِ، وَالْفَرَسِ».
'(২) রাসূলুল্লাহ সামনে অলক্ষণ প্রসঙ্গে উত্থাপন করা হলে তিনি ইরশাদ করেন, 'অলক্ষণ বলে কিছু থাকলে তা ঘোড়া, নারী ও বসতবাড়িতে থাকতো।”
হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
ইমাম মুসলিম -এর অন্য বর্ণনায় এসেছে,
[3] فِي الْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ وَالْمَسْكَنِ».
'(৩) (অলক্ষণ বলে কিছু থাকলে তা) নারী, ঘোড়া এবং বাসগৃহেই থাকতে পারে।'
হাদীসটি আল-মুওয়াত্তার গ্রন্থকার, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম আত-তিরমিযী এবং ইমাম আন-নাসায়ী প্রথম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অবশ্য তিনি রোগের সংক্রমণ ও কুলক্ষণ বিশ্বাসের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেননি।
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «إِنْ كَانَ فِي شَيْءٍ، فَفِي الْفَرَسِ، وَالْمَرْأَةِ، وَالْمَسْكَنِ، يَعْنِي الشَّوْمَ .
'হযরত সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'যদি কোনো বস্তুতে কুলক্ষণ থাকা সম্ভব হতো তবে তা ঘোড়া, নারী এবং বসতবাড়িতে থাকতো।"
হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী, ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন এবং আল-মুওয়াত্তায় ও বর্ণিত হয়েছে। [হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে ও অনুরূপ বর্ণিত আছে,] তিনি তাঁর হাদীসে উল্লেখ করেছেন,
فَفِي الرَّبْعِ، وَالْخَادِمِ، وَالْفَرَسِ.
'যদি কুলক্ষণ থেকে থাকে তবে তা চারটা জিনিসে: এর মধ্যে সেবক ও ঘোড়া অন্যতম।'
হাদীসটি ইমাম মুসলিম ও ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন।
وَ عَنْ حَكِيمِ بْنِ مُعَاوِيَةَ، قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: «لَا سُؤْمَ، وَقَدْ يَكُوْنُ الْيُمْنُ فِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ».
'হযরত হাকিম ইবনে মুআবিয়া থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম -কে বলতে শুনেছি, 'অলক্ষণ বলতে কিছু নেই। বরং ঘরবাড়ি, নারী ও ঘোড়ার বেলায় সুখ-সৌভাগ্য হয়।”
হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ أَنْ هُرَيْرَةَ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُولُ: «لَا طِيرَةَ، وَخَيْرُهَا الْفَالُ»، قِيْلَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ وَمَا الْفَالُ؟ قَالَ: «الْكَلِمَةُ الصَّالِحَةُ يَسْمَعُهَا أَحَدُكُمْ».
'হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'অলক্ষণের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই তবে, শুভলক্ষণ গ্রহণ ভালো।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! শুভলক্ষণ গ্রহণ কী? তিনি জবাবে ইরশাদ করেন, 'এটা হলো তোমরা যেসব ভালো কথা শোন তা-ই।"
হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
وَ عَنْ سَعْدِ بْنِ مَالِكٍ، عَنْ أَبِيْهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُوْلُ: الْعِيَافَةُ، وَالطَّيَرَةُ، وَالطَّرْقُ مِنَ الْجِبْتِ».
'হযরত সা'দ ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, 'রেখা টেনে, পাখি উড়িয়ে এবং পাথর নিক্ষেপ করে শুভাশুভ নির্ধারণ মূর্তিপূজার শামিল।"
হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, الطَّرْقُ অর্থ: اَلزَّجْرُ (পাখি উড়িয়ে ডানদিকে গেলে সুলক্ষণ এবং বামদিকে গেলে কুলক্ষণ গ্রহণ করা) এবং اَلْمِن অর্থ: اَلْخَطٌ (রেখা টানা)।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে اَلْعِين অর্থ পাখি উড়িয়ে ডানদিকে গেলে সুলক্ষণ গ্রহণ করা। আরবের লোকেরা এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা করতো। عَافَ الطَّيْرُ يَمِيتُهُ বলা হয় যখন পাখি উড়িনো হয়।
الطَّرْقُ অর্থ পাথর নিক্ষেপ। কারো কারো মতে, বালুময় জমিতে রেখা টানা। ভাগ্য গণনার জন্য জ্যোতিষীগণ তা এঁকে থাকে।
اَلْجِبْتُ অর্থ আল্লাহ ব্যতীত যেসবের ইবাদত করা হয়। কারো মতে, এর অর্থ জ্যোতিষী ও শয়তান।
ইমাম আত-তীবী বলেন, عِيَافَة অর্থ পাখি উড়িয়ে তাদের নাম, বুলি ও যাতায়াতের ওপর ভিত্তি করে শুভাশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা। আরবের লোকেরা সফরের প্রাক্কালে এসব প্রথা খুব বেশি প্রতিপালন করতো। يَعِيفُ عَيْنًا বলা হয় যখন পাখি উড়ায়ে আন্দাজে শুভাশুভ পূর্বাভাস ধারণা পোষণ করা হয়।
اَلطَّرْقُ অর্থ পাথর ছোঁড়া। মেয়েরা ভাগ্য পরীক্ষার জন্যে এরকম পাথর ছুঁড়ে মারতো। কারো মতে, বালুময় জায়গাতে রেখা অঙ্কণ। اَلْجِبْتُ অর্থ জাদু ও জ্যোতিষ। কারো মতে, এর অর্থ আল্লাহ ব্যতীত অন্য যেসবের ইবাদত করা হয়। কারো মতে, এর অর্থ জাদুকর। হাদীসের বক্তব্য: »مِنَ الْجِبْتِ । এর অর্থ হচ্ছে, পৌত্তলিক কর্মকাণ্ড। তাঁদের মতে, শব্দটি আরবি নয়।
হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণিত, এটি ইথিওপিয় শব্দ। কুতরুব বলেন, তা হচ্ছে যেখানে কোনোই কল্যাণ নেই।
وَعَنْ أَنَسٍ ، قَالَ : قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺا إِنَّا كُنَّا فِي دَارٍ كَثِيرٌ فِيهَا عَدَدْنَا، وَكَثِيرٌ فِيْهَا أَمْوَالُنَا، فَتَحَوَّلْنَا إِلَى دَارٍ أُخْرَى، فَقَلَّ فِيهَا عَدَدْنَا، وَقَلَّتْ فِيْهَا أَمْوَالُنَا، فَقَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ: ذَرُوْهَا ذَمِيْمَةٌ».
'হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক লোক বলল, হে হযরত রাসূলুল্লাহ ! আমরা প্রথমে পরিবারের সবাই একটি ঘরেই বসবাস করতাম। জনসংখ্যা ও ধন- সম্পদে সমৃদ্ধ ছিলাম। পরবর্তীতে বসবাসের জন্য আরেকটি ঘরে যখন স্থানান্তরিত হই তখন আমাদের মানুষজন ও ধন-সম্পত্তিতে অবনতি দেখা দিলো। হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'এটি ছেড়ে দাও, এটি তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়।” হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَتْ: دَارٌ سَكَنَاهَا، وَالْعَدَدُ كَثِيرٌ، وَالْمَالُ وَافِرٌ، فَتَحَوَّلْنَا إِلَى دَارٍ أُخْرَى، فَقَلَّ الْعَدَدُ، وَذَهَبَ الْمَالُ، فَقَالَ: «دَعُوهَا ذَمِيْمَةٌ).
'হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ -এর নিকট এক মহিলা এসে আরয করল, আমরা প্রথমে পরিবাবের সবাই একটি ঘরেই বসবাস করতাম, জনসংখ্যা বেশি ছিল ও ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ ছিলাম। পরবর্তীতে বসবাসের জন্য আরেকটি ঘরে যখন স্থানান্তরিত হই তখন আমাদের মানুষজন কমে গেল ও ধন-সম্পত্তিতে অবনতি দেখা দিলো। হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'সেটা ছেড়ে দাও, তা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়।" হাদীসটি আল-মুওয়াত্তায় বর্ণিত হয়েছে।
আল-জামিউল কবীরের হাদীসসমূহ
'শুভাশুভের ধারণা তাকদীরের সাথে সংশ্লিষ্ট।' «الطَّيِّرَةُ تَجْرِي بِقَدْرِ». হাদীসটি ইমাম আল-হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাকে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।
'শুভাশুভের বিশ্বাস শিরক।' «الطَّيِّرَةُ شِرْكَ». হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী, ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল), ইমাম আল-বুখারী আল-আদাবুল মুফরাদে, ইমাম ইবনে মাজাহ ও ইমাম আল-হাকিম আল-মুসতাদরাকে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন।
وَكَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُوْلُوْنَ: إِنَّمَا الطَّيِّرَةُ فِي الْمَرْأَةِ وَالدَّابَّةِ وَالدَّارِ».
'জাহেলি যুগে লোকেরা বলতো, নারী, ঘোড়া ও ঘরে অলক্ষণ থাকা সম্ভব।' ইমাম আল-হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাকে ও ইমাম আল-বায়হাকী তাঁর শুআবুল ঈমানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
«الشَّوْمُ فِي ثَلَاثٍ فِي الْمَرْأَةِ، وَالْمَسْكَنِ، وَالدَّابَّةِ».
'অলক্ষণ তিন জিনিসে: নারী, বসতঘর ও বাহনের পশুতে।' হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আন-নাসায়ী হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেছেন।
إِنْ كَانَ الشُّؤْمُ فِي شَيْءٍ؛ فَفِي الدَّارِ، وَالْمَرْأَةِ، وَالْفَرَسِ».
'অলক্ষুণে বলে কিছু থাকলে তা বসতবাড়ি, নারী ও ঘোড়াতেই থাকত।'
হাদীসটি ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল) ও ইমাম আল-বুখারী হযরত সাহল ইবনে সা'দ থেকে, ইমাম আল-বায়হাকী (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে এবং ইমাম আন-নাসায়ী হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
فِي الْإِنْسَانِ ثَلَاثَةٌ: الطَّيِّرَةُ، وَالظَّنُّ، وَالْحَسَدُ، فَمَخْرَجُهُ مِنَ الطَّيَرَةِ أَنْ لَّا يَرْجِعَ ، وَتَخْرُجُهُ مِنَ الظَّنِّ أَنْ لَّا يُحَقِّقَ، وَتَخْرُجُهُ مِنَ الْحَسَدِ أَنْ لَّا يَبْغِي.
'মানুষের তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে: কুলক্ষণে বিশ্বাস, সন্দেহপ্রবণতা ও হিংসা। কুলক্ষণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে তার কল্পনাও মনে প্রশ্রয় দেবে না, সন্দেহপ্রবণতা থেকে আত্মরক্ষার জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে (সন্দেহের বশীভূত হয়ে) নিরীক্ষণ ও অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা এড়িয়ে চলবে আর হিংসা থেকে বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিহিংসা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করবে।'
হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী তাঁর ‘শুআবুল ঈমানে' হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম ইবনে সাসাসারা তাঁর আমালীতে ও ইমাম আদ-দায়লমী মুসনদুল ফিরদাউসে হাদীসটি এভাবেও বর্ণনা করেছেন,
فِي الْمُؤْمِنِ ثَلَاثُ خِصَالٍ ...
'মুমিনের তিনটা বৈশিষ্ট্য...।' আল-হাদীস।
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ وَلَا مَنْ تُطَيَّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكُهِنَ لَهُ، أَوْ تَسَخَّرُ أَوْ تُسْخَرُ لَهُ.
'যে-লোক অশুভে বিশ্বাস করে এবং যারা অশুভকে সত্যায়ন করে, ভবিষ্যদ্বাণী করে বা ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করে কিংবা জাদু করে এবং জাদুতে বিশ্বাস করে সে উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।' হাদীসটি ইমাম আত-তাবরানী তাঁর (আল-মু'জামুল) কবীরে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন।
مَنْ رَدَّتْهُ الطَّيَرَةُ مِنْ حَاجَةٍ، فَقَدْ أَشْرَكَ. 'যে-লোক কোনো প্রয়োজনে অলক্ষণে বিশ্বাস করে সে শিরক করে।' হাদীসটি ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল) ও ইমাম আত-তাবরানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীরে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেছেন।
الطَّيَرَةُ شِرْكٌ، الطَّيَرَةُ شِرْكٌ، الطَّيَرَةُ شِرْكٌ. 'কুলক্ষণে বিশ্বাস রাখা শিরক, কুলক্ষণে বিশ্বাস রাখা শিরক ও কুলক্ষণে বিশ্বাস রাখা শিরক।'
مَنْ خَرَجَ يُرِيدُ السَّفْرَ، فَرَجَعَ مِنْ طَيْرٍ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ». 'যে-লোক সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর অলক্ষণের ধারণায় ফেরত আসে সে যেন হযরত মুহাম্মদ-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করলো।'
لَا شُؤْمَ، فَإِنْ يَكُ شُؤْمٌ؛ فَفِي الْفَرَسِ وَالْمَرْأَةِ وَالْمَسْكَنِ). 'কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। যদি থাকতো তবে ঘোড়া, নারী ও বাড়িতেই থাকতো।'
مَنْ رَدَّتْهُ الطَّيَرَةُ عَنْ حَاجَتِهِ، فَقَدْ أَشْرَكَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا كَفَّارَهُ ذَلِكَ؟ قَالَ: يَقُوْلُ: «اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ».
'যে-লোক কোনো প্রয়োজনে কুলক্ষণ বিশ্বাস করে তাহলে সে শিরক করলো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে এর কাফফারা কী? হযরত রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তবে সে বলবে,
اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ».
হে আল্লাহ! ভালো-মন্দ, সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য সবই তোমার হাতে। তুমি ছাড়া কেউ ইবাদতদের যোগ্য নন।”
الْفَالُ مُرْسَلٌ، وَالْعُطَاسُ شَاهِدُ عَدْلٍ. 'শুভ ধারণা আল্লাহ-প্রেরিত এবং হাঁচি হচ্ছে ন্যায়ের প্রতীক।”
لَا شُؤْمَ، وَقَدْ يَكُوْنُ الْيُمْنُ فِي الدَّارِ وَالْفَرَسِ وَالْمَرْأَةِ». 'অলক্ষণ বলতে কিছু নেই। বরং ঘরবাড়ি, নারী ও ঘোড়ার বেলায় সুখ-সৌভাগ্য হয়।'
হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম ইবনে মাজাহ হযরত হাকিম ইবনে মুআবিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন।
يَا لَبَّيْكَ نَحْنُ أَخَذْنَا فَالَكَ مِنْ فِيْكَ». 'হ্যাঁ! লাব্বাইক হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে সৌভাগ্যের সম্ভাবনা প্রার্থনা করি।'
وَلَا شَيْءٍ فِي الْهَامِ، وَالْعَيْنُ حَقٌّ، وَأَصْدَقُ الطَّيِّرَةِ الْفَالُ».
'পেঁচায় কোনো কুলক্ষণ নেই। দৃষ্টিপড়া সত্য, সৌভাগ্যের আগাম অনুমান একটি ইতিবাচক ধারণা।' হাদীসটি ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল) ও ইমাম আত-তিরমিযী হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
لَا طِيَرَةَ، وَخَيْرُهَا الْفَالُ ؛ الكَلِمَةُ الصَّالِحَةُ يَسْمَعُهَا أَحَدُكُمْ».
'অলক্ষণের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই তবে, এর তুলনায় সৌভাগ্যের আগাম অনুমান ভালো। আর তা হলো তোমরা যেসব ভালো কথা শোন তা-ই।' হাদীসটি ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল) ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ أَنْ هُرَيْرَةَ، وَلَا عَدْوَى، وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الْفَالُ».
'হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, 'রোগের কোনো সংক্রমণ নেই, শুভ-অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই। তবে শুভ লক্ষণ গ্রহণ আমার কাছে পছন্দনীয়।" হাদীসটি ইমাম আদ-দারাকুতনী ও তাঁর আল-মুত্তাফিক আলায়হি গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ ابْنَ أَنْ مُلَيْكَةً، قَالَ : قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ: كَيْفَ تَرَى فِي جَارِيَةٍ لِّي فِي نَفْسِي مِنْهَا شَيْءٌ؟ فَإِنِّي سَمِعْتُهُمْ يَقُولُونَ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: إِنْ كَانَ شَيْءٌ، فَفِي الرَّبْعِ وَالْفَرَسِ وَالْمَرْأَةِ، قَالَ: فَأَنْكَرَ أَنْ يَكُوْنَ سَمِعَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيُّ ﷺ أَشَدَّ النَّكَرَةِ.
'ইবনে আবু মুলায়কা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস কে বললাম, আমার দাসী সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? তার ব্যাপারে আমার মনে একটু খটকা রয়েছে। কারণ আমি লোকমুখে বলতে শুনেছি, নবী করীম ইরশাদ করেছেন, 'যদি অশুভ বলতে কিছু থাকে তবে ঘরবাড়ি, ঘোড়া ও নারীতে থাকতে পারে।' ইবনে আবু মুলায়কা বলেন, একথা নবী করীম এর থেকে শুনেছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে তা তিনি (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস) কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, فَأَنْكَرَ أَنْ يَكُونَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَهُ، وَأَنْ يَكُونَ السُّوْمُ فِي شَيْءٍ، وَقَالَ: إِذَا وَقَعَ فِي نَفْسِكَ مِنْهَا شَيْءٌ فَفَارِقْهَا: بِعْهَا أَوْ أَعْتِقْهَا.
'কোনো বস্তুবিশেষ অলক্ষুণে হওয়া এবং হযরত রাসূলুল্লাহ উপর্যুক্ত কথা বলেছেন বলে যে দাবি রয়েছে তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি বলেন, যখন তোমার মনে তার সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হয় তবে তাকে অব্যাহতি দিয়ে দাও; বিক্রি বা মুক্ত করে দাও।' হাদীসটি ইমাম ইবনে জরীর (আত-তাবারী) বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَبِي حَسَّانَ، أَنَّ رَجُلَيْنِ دَخَلَا عَلَى عَائِشَةَ، فَحَدَّثَنَاهَا أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ: إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ: «الطَّيَرَةُ فِي الْمَرْأَةِ، وَالْفَرَسِ وَالدَّارِ، فَغَضِبَتْ غَضَبًا شَدِيدًا، وَقَالَتْ: مَا قَالَ؟ إِنَّمَا قَالَ: «كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَتَطَيَّرُوْنَ مِنْ ذَلِكَ.
'হযরত কাতাদা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি আবু হাসসান থেকে বর্ণনা করেন, দুইজন লোক হযরত আয়িশা -এর খিদমতে হাজির হয়ে বললেন, হযরত আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'নারী, ঘোড়া ও ঘরবাড়িতে অলক্ষণ রয়েছে।' একথা শুনে হযরত আয়িশা ভীষণ রাগান্বিত হয়ে বললেন, এসব কে বলেছেন? বরং তিনি বলেছেন, 'জাহিলি যুগের লোকেরা এসব অলক্ষুণে বলে বিশ্বাস করতো।"
হাদীসটি ইমাম ইবনে জরীর (আত-তাবারী) বর্ণনা করেছেন।
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ امْرَأَةً، جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ ، فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ الله سَكَنَّا دَارًا وَنَحْنُ ذُو مَالِ وَافِرٍ، فَاحْتَجْنَا، وَسَاءَتْ ذَاتُ بَيْنِنَا، وَاخْتَلَفْنَا، فَقَالَ: «بِيْعُوْهَا، أَوْ ذَرُوهَا، وَهِيَ ذَمِيمَةٌ».
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত আছে, একদিন জনৈক মহিলা নবী করীম-এর দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা একটি বাড়িতে বসবাস করছি। (তার আগে) আমরা বেশ সম্পদশালী ও সুখী-সমৃদ্ধ ছিলাম। এখন অভাব-অনটন আমাদের কাবু করে ফেলেছে। পরিবারের সদস্যদের সদস্যদের মাঝে মনোমালিন্যতার কারণে সবাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হযরত রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, 'বাড়িটি তোমাদের জন্য ভালো নয়, সেটি বিক্রি বা বদলে ফেল।”
হাদীসটি ইমাম ইবনে জরীর (আত-তাবারী) বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য, এ-প্রসঙ্গে আরও অনেক হাদীস আছে। আমরা যা উল্লেখ করেছি বিষয়-প্রসঙ্গে তা যথেষ্ট বেশি হয়েছে। এসবের প্রায় হাদীস দ্বারা বোঝা যাচ্ছে কুলক্ষণের প্রভাব সম্পূর্ণ অমূলক এবং সাধারণভাবে এই ধরনের বিশ্বাসও নিষিদ্ধ। অবশ্য কিছু কিছু হাদীসে নারী, যানবহন ও ঘরবাড়ির ক্ষেত্রে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তাও নিচক সম্ভাবনা মাত্র।
হ্যাঁ, এই সম্ভাবনা কি এখনো বিদ্যমান? নাকি তা জাহিলিয়া যুগের কুসংস্কার মাত্র। উভয় অবস্থায় এ-জাতীয় ধারণাকে সম্পূর্ণ নাকচ এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথবা (কিছু কিছু হাদীসে নারী, যানবহন ও ঘরবাড়ির ক্ষেত্রে কুলক্ষণের যে সত্যতা পাওয়া যায় তা অবশ্য) শর্তসাপেক্ষে। যেমন- 'যদি কোনো বস্তুতে কুলক্ষণ থেকে থাকে তবে এসব বস্তুতেই থাকতো।' এর মর্মার্থ এমনটাই। আল্লাহই সর্বাধিক পরিজ্ঞাত।
বস্তুত কোনো জিনিসে কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই। যদি মেনেই নেওয়া হয় যে, উপর্যুক্ত জিনিসে কুলক্ষণ রয়েছে তবে তা জিনিসসমূহের অবস্থান, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের কারণে। হযরত রাসূলুল্লাহ -এর বক্তব্যেও এর উদাহরণ পাওয়া যায়।
لَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ لَسَبَقَتْهُ الْعَيْنُ».
'তাকদীরকে অতিক্রম করার মতো যদি কিছু থাকতো তবে তা হতো মানুষের দৃষ্টি।'
এর ওপর কাযী আয়ায বিশদ আলোচনা করেছেন, তিনি বলেন, নবী করীম -এর বক্তব্য: لَاطِيرَة-এর পর 'যদি' শর্তারোপ থেকে বোঝা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে উপর্যুক্ত হাদীস (নারী, ঘোড়া ও ঘরবাড়িতে কুলক্ষণ সম্পর্কিত হাদীস) থেকেও কুলক্ষণের ধারণারই নাকচ করা হয়েছে। অর্থাৎ অলক্ষণের যদি কোনো অস্তিত্ব থেকে থাকত তাহলে তা উল্লিখিত বস্তুসমূহের মধ্যেই থাকতো। কারণ এসব বস্তুই কুলক্ষণের উপযোগী। কিন্তু এসবের মধ্যেও তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে কুলক্ষণেরই কোনো অস্তিত্ব নেই। এখানে কাযী আয়াযে বক্তব্য সমাপ্ত।
বস্তুত হযরত আয়িশা ও হযরত (আবদুল্লাহ্) ইবনে আব্বাস উল্লিখিত বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে কুলক্ষণের ব্যাপারটা বেশ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রমাণিত। পক্ষান্তরে যেসব হাদীস অলক্ষণের পক্ষে পাওয়া যায় সেসবের মাঝে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যেতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে কোনো বস্তুর নিজস্ব কোনো প্রভাব-প্রতিক্রিয়া নেই। প্রত্যেক বস্তুর প্রকৃত ক্রিয়াশীলতা আল্লাহর হাতেই। আর সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি ও অদৃষ্টের অন্তর্ভুক্ত। এখন এই যেসব বস্তুর ক্ষেত্রে প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার প্রমাণ রয়েছে তা আল্লাহ সুবহানাহুর প্রদত্ত স্বভাব-প্রকৃতি যা তার মধ্যে তিনি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আল্লাহ বস্তুর স্বভাব-প্রকৃতিকে উপর্যুক্ত প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার কারণ বানিয়েছেন। যেমন- আগুনের স্বভাব হলো জ্বালানো। বস্তুত এখানে কোনো বস্তুর মৌলিকভাবে নিজস্ব প্রভাব-প্রতিক্রিয়া থাকার ব্যাপাটি অস্বীকার করা হয়েছে। আর যে-প্রভাব-প্রতিক্রিয়া প্রমাণিত তা মূলত স্বভাব-প্রকৃতিগত। তবে নবী করীম উপর্যুক্ত বস্তুসমূহকে বিশেষভাবে উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রকৃত হিকমত সম্পর্কে শরীয়ার প্রবর্তকই সার্বিকভাবে জ্ঞাত।
কেউ কেউ বলেন, নারীর মন্দ লক্ষণগুলো হচ্ছে, বন্ধ্যাত্ব ও স্বামীর অবাধ্যতা অথবা স্বামীর চোখে অপছন্দনীয় ও কুৎসিত হওয়া। ঘরের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ ও ছোট হওয়া, পর্যাপ্ত আবহাওয়ার অভাব এবং প্রতিবেশী খারাপ হওয়া। ঘোড়ার বেলায় মন্দ লক্ষণ ধরা হয়, অবাধ্যতা, চড়ামূল্য আর প্রভুর জন্য সুবিধাজনক না হওয়া ইত্যাদি।
এখানে কুলক্ষণ বস্তুত রূপক অর্থে। কোনো জিনিস-পত্রে যেকোনো বিষয় শরীয়ত বা মানুষের অভিরুচির পরিপন্থী হওয়ার দরুন যা অপছন্দনীয় তাই মূলত অলক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
একথার সমর্থনে শারহুস সুন্নাহে উল্লেখ করা হয়েছে; গ্রন্থকার বলেন, যদি তোমাদের কারো কাছে বসবাসের জন্য নিজের বাড়ি পছন্দ না হয় বা স্ত্রীর সাথে সান্নিধ্য বিরক্তিকর মনে হতে থাকে অথবা নিজের ঘোড়াটি আর ভালো না লাগে তখন তা বাড়ি পরিবর্তন, স্ত্রীকে তালাক এবং ঘোড়াটি বিক্রি করার মাধ্যমে তা থেকে নিষ্কৃত করবে। যাতে মনের অস্বস্তি ও অশান্তি বিদূরিত হয়। যেমন- এক লোক প্রশ্ন করেছিলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ! إِنَّا كُنَّا فِي دَارٍ كَثِيرٌ فِيهَا عَدَدُنَا ......
'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যে বাড়িতে বসবাস করি তাতে আমরা লোকসংখ্যা খুব বেশি।' জবাবে নবী করীম ইরশাদ করেন,
ذَرُوهَا ذَمِيْمَةً».
'তাহলে এটি পরিত্যাগ কর, এটি তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়।” অতঃপর হযরত রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বাড়িটি পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে তারা বাড়িটির ক্ষেত্রে তাদের আত্ম-অস্বস্তি দূর হয়ে যায়। এই নির্দেশ এই কারণে নয় যে, বাড়িটিই এই অস্বস্তির কারণ ছিল।
অতএব কুলক্ষণ ও অশুভ ধারণা সম্পূর্ণরূপে নাকচ করা হয়েছে। বাকি প্রকৃতি সম্পর্কে আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।
টিকাঃ
১. (ক) ইবনুল আসীর, আন-নিহারা, খ. ৩, পৃ. ১৫২; (খ) আত-তীবী, প্রাগুক্ত, খ. ৯, পৃ. ২৯৭৮
২. (ক) ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৪০৫; (খ) আত-তীবী, প্রাগুক্ত
৩. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৯, হাদীস: ৫৭৭৬; (খ) আত-তীবী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৯৭৮
৪. আল-কিরমানী, প্রাগুক্ত, খ. ২১, পৃ. ৩১
৫. আন-নাওয়াওয়ী, আল-মিনহাজ, খ. ১৪, পৃ. ২১৯ ও ২২২২
৬. ইবনুল আসীর, আন-নিহায়া, খ. ৩, পৃ. ৪০৫-৪০৬
৭. ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৪০৬
৮. আল-ফীরযাবাদী, আল-কামূসুল মুহীত, খ.১, পৃ. ৮২
৯. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৯, হাদীসঃ ৩৯২০; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬২৮, হাদীস: ৫৭৯৮
১০. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬১, হাদীস: ১৬১৬; (খ) ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৬২৯, হাদীস: ৫৮০০।
১১. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৮-১৯, হাদীস: ৩৯১৯; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬২৯, হাদীস: ৫৮০১।
১২. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৭, হাদীস: ৩৯১০১
১৩. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬১, হাদীস: ১৬১৪; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৩০, হাদীস: ৫৮০২
১৪. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৯, হাদীস: ৫৭৭৬; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৬, হাদীস: ১১২ (২২২৪)
১৫. আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ১৩৫, হাদীস: ৫৭৫৬
১৬. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৬, হাদীসঃ ১১১ (২২২৪)
১৭. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৮, হাদীস: ৩৯১৬
১৮. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬১, হাদীস: ১৬১৫; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৩১, হাদীস: ৫৮০৩
১৯. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮-১৩৯, হাদীস: ৫৭৭২ ও পৃ. ৮, হাদীস: ৫০৯৪; (খ) মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৭, হাদীস: ১১৬ ও ১১৭ (২২২৫)
২০. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৭, হাদীস: ১১৮ (২২২৫)
২১. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৪১৬, হাদীস: ৭৯২
২২. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৯, হাদীস: ৩৯২২
২৩. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫, পৃ. ১২৭, হাদীস: ২৮২৪-
২৪. আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৬, পৃ. ২২০, হাদীস: ৩৫৬৯
২৫. ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৩১-৬৩২, হাদীস: ৫৮০৪
২৬. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ৮, হাদীস: ৫০৯৫
২৭. মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৮, হাদীস: ১১৯ (২২২৬)
২৮. মালিক ইবনে আনাস, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ১৪১৬, হাদীস: ৭৯১
২৯. ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৬৩২, হাদীস: ৫৮০৫
৩০. মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৮, হাদীস: ১২০ (২২২৭)
৩১. আন-নাসায়ী, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২২০, হাদীস: ৩৫৭০
৩২. ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৩৩, হাদীস: ৫৮০৬
৩৩. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১২৭, হাদীস: ২৮২৫; (খ) ইবনুল আসীর, প্রান্তক্ত, খ. ৭, পৃ. ৬৩৩, হাদীস: ৫৮০৭
৩৪. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৫, হাদীস: ৫৭৫৪ ও ৫৭৫৫
৩৫. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৫, হাদীস: ১১০ (২২২৩)
৩৬. ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৬৩৫-৬৩৬, হাদীস: ৫৮০৯
৩৭. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৬, হাদীস: ৩৯০৭
৩৮. ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৩৯-৬৪০, হাদীস: ৫৮১০
৩৯. (ক) আত-তুরবুশৃতী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১০১২-১০১৩ঃ (খ) আত-তীবী, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২৯৮২-২৯৮৩
৪০. (ক) আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ২০, হাদীসঃ ৩৯২৪; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৭, পৃ. ৬৪০, হাদীসঃ ৫৮১২
৪১. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ۱۴১৭, হাদীস: ৭৯৩
৪২. ইবনুল আসীর, প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৬৪১, হাদীস: ৫৮১৩
৪৩. আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৮৬, হাদীস: ৮৯
৪৪. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১৬০-১৬১, হাদীস: ১৬১৪
৪৫. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ৬, পৃ. ২১০, হাদীস: ৩৬৮৭ ও খ. ৭, পৃ. ২৫০, হাদীস: ৪১৯৪
৪৬. আল-বুখারী, আল-আদাবুল মুফরদ, পৃ. ৩১৩, হাদীস: ৯০৯
৪৭. ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ২, পৃ. ১১৭০, হাদীস: ৩৫৩৮
৪৮. আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬৪, হাদীস: ৪৩
৪৯. আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৫২১, হাদীস: ৩৭৮৮
৫০. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৮, পৃ. ২৪১, হাদীসঃ ১৬৫২৫
৫১. আত-তিরমিযী, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ১২৬, হাদীস: ২৮২৪।
৫২. আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৬, পৃ. ২২০, হাদীস: ৩৫৬৮
৫৩. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, খ. ৩৭, পৃ. ৪৮৯, হাদীস: ২२৮৩৬
৫৪. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ৮, হাদীস: ৫০৯৪
৫৫. আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, খ. ৮, পৃ. ২৪১, হাদীস: ১৬৫২৪
৫৬. আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৬, পৃ. ২২০, হাদীস: ৩৫৭০
৫৭. আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ২, পৃ. ৪০১, হাদীস: ১১৩০
৫৮. আদ-দায়লামী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৩৬, হাদীস: ৪৩৬৭
৫৯. আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ১৮, পৃ. ১৬২, হাদীস: ৩৫৫
৬০. আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, খ. ১১, পৃ. ৬২৩, হাদীস: ৭০৪৫
৬১. আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ. ১৩, পৃ. ২২, হাদীসঃ ৩৮
৬২. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ১৮, হাদীস: ৩৯১০; হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত
৬৩. আদ-দায়লামী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৪৮১, হাদীস: ৫৪৯২; হযরত আবু যর আল-গিফারী থেকে বর্ণিত
৬৪. (ক) আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ১২২, হাদীস: ৫৭০৭; হযরত সহল ইবনে সা'দ আস-সাঈদী থেকে বর্ণিত
৬৫. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১১, পৃ. ৬২৩, হাদীস: ৭০৪৫; (খ) আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ১৩, পৃ. ২২, হাদীস: ৩৮ঃ (গ) ইবনুস সুন্নী, আমলুল ইয়াওমি ওয়াল লায়ল, পৃ. ২৫৪, হাদীস: ২৯২; হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত
৬৬. আল-হাকীমুত তিরমিযী, নাওয়াদিরুল উসুল, খ. ৩. পৃ. ৬, হযরত আর-রুওয়াইহিব আস-সুলায়মী থেকে বর্ণিত
৬৭. (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ১২৭, হাদীস: ২৮২৫; (খ) ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৬৪২, হাদীস: ১৯৯৩
৬৮. (ক) আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ. ১৭, পৃ. ২০, হাদীস: ২৩; (খ) আবু নুআইম আল-আসবাহানী, আত-তিব্বুন্নবওয়ী, খ. ১, পৃ. ৩১১, হাদীস: ২১৯; হযরত আমর ইবনে আওফ থেকে বর্ণিত
৬৯. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১৭, পৃ. ১৮১, হাদীস: ১৬৬২৭ ও খ. ৩৮, পৃ. ২৫৯, হাদীস: ২৩২১৬; (খ) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ৩৯৭, হাদীস: ২০৬১; মূলত হযরত হাবিস আত-তামীমী থেকে বর্ণিত
৭০. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, খ. ১৩, পৃ. ৫৭, হাদীস: ৭৬১৮, খ. ১৫, পৃ. ১৪৯, হাদীস: ৯২৬২ ও খ. ১৬, পৃ. ৪৬০, হাদীস: ১০৭৯০; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৫, হাদীস: ১১০ (২২২৩); হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
৭১. আল-খতীবুল বগদাদী, আল-মুত্তাফিক ওরাল মুফতারিক, খ. ১, পৃ. ২৬২, হাদীস: ১১০
৭২. ইবনে জরীর আত-তাবারী, তাহযীবুল আসার, খ. ৩, পৃ. ২৭, হাদীস: ৭০ ও ৭১
৭৩. ইবনে জরীর আত-তাবারী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৭, হাদীস: ৩৭
৭৪. ইবনে জরীর আত-তাবারী, তাহযীবুল আসার, খ. ৩, পৃ. ২৬, হাদীসঃ ৬৯
৭৫. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭১৯, হাদীস: ৪২ (২১৮৮), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত
৭৬. মোল্লা আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ, খ. ৭, পৃ. ২৮৯৯
৭৭. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ২০, হাদীস: ৩৯২৪, হযরত আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত।
৭৮. আল-বাগাওয়ী, শরহুস সুন্নাহ, খ. ১২, পৃ. ১৭৩
📄 দ্বিতীয় অধ্যায়: الْعَدْوَى (রোগ সংক্রমণ)
ইতঃপূর্বে সংক্রামক ব্যাধি ও ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কিত ধারণার অসারতা বিষয়ক হাদীসগুলো আমরা উল্লেখ করেছি যাতে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো পোষণের ব্যাপারে বারণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ লোকদের একটি প্রশ্ন হলো, ছোঁয়াচ সংক্রমণকে নাকচ করার পরও রাসূল ইরশাদ করেছেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِهِ (শ্বেতরোগী থেকে সেভাবে দূরত্ব বজায় রাখো যেমনটি তোমরা বাঘ থেকে পালিয়ে বাঁচো।) তিনি আরও ইরশাদ করেন, وَلَا عَحِلُّ تُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ (রোগা উটকে সুস্থ উটের সাথে রাখা উচিত নয়।) অন্য এক বর্ণাতে এসেছে, وَلَا يُوْرِدَنَ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ (যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে) এখানে অসুস্থ বলতে রুগ্ণ উটের মালিক এবং সুস্থ বলতে সুস্থ উটের মালিক। অথচ নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ،لَا يُعْدِي شَيْ: شَيْئًا (একজনের রোগবালাই অন্যের কাছে পার হয় না।)
জনৈক বেদুঈন নবী করীম -এর দরবারে এসে বলল, فَمَا بَالُ إِبِلٍ، يَكُوْنُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظَّبَاءُ، فَيَأْتِي الْبَعِيرُ الْأَجْرَبُ، فَيَدْخُلُ فِيْهَا فَيُجْرِبُهَا ؟
'এ-ব্যাপারে আপনার মত কি যে, হরিণের ন্যায় সুস্থ উট প্রান্তরে থাকে। পরে কোনো চর্মরোগগ্রস্থ উট এদের সাথে মিশে সবগুলোকে চর্মরোগে আক্রান্ত করে।'
বেদুঈনের বক্তব্য খণ্ডন করে হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ»؟
'তা যদি হয় তবে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,
جَاءَ أَعْرَابِ إِلَى النَّبِيِّ ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ التَّقْبَةُ تَكُوْنُ بِمِشْفَرٍ الْبَعِيرِ، أَوْ بِعَجْبِهِ، فَيَشْتَمِلُ الْإِبِلَ كُلَّهَا جَرَبًا، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ لَا عَدْوَى، وَلَا هَامَةَ، وَلَا صَفَرَ، خَلَقَ اللَّهُ كُلَّ نَفْسٍ، فَكَتَبَ حَيَاتِهَا وَمُصِيبَاتِهَا وَرِزْقَهَا».
'জনৈক বেদুঈন নবী করীম -এর দরবারে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চর্মরোগ প্রথমে উটের ঠোটে বা লেজে দেখা যায়, এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উটের শরীরেও তা ছড়িয়ে পড়ে। একথার প্রতিক্রিয়ায় রাসূলে ইরশাদ করেন, 'প্রথম যে-উটের শরীরে রোগটি হয়েছে তা কোথা থেকে এসেছিলো? মনে রেখো! রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই, পেঁচায় কোনো অশুভ নেই এবং সফর মাসের মধ্যে অমঙ্গলের কিছু নেই। আল্লাহ প্রত্যেকটি প্রাণী সৃষ্টির পর তার জীবন, বিপদাপদ ও রিযক নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”
বর্ণিত আছে যে, প্রথম প্রথম হযরত আবু হুরায়রা নবী করীম -এর দুটো হাদীস বর্ণনা করতেন: لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই) ও ،لَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٌ« (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে।) পরে لَا عَدْوَى হাদীসটি বর্ণনা থেকে তিনি নিরবতা অবলম্বন করেন এবং لَا يُوْرِدَنٌ تُمْرِضٌ عَلَى مُصِحُ হাদীসটিই কেবল বর্ণনা করতেন তিনি। বরং হযরত আবু হুরায়রা প্রথম হাদীসটি অস্বীকার করেন। লোকজন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি لَا عَدْرَى হাদীসটি বর্ণনা করেননি? এ-সময় তিনি হাবশি ভাষায় কি যেন বললেন। হযরত আবু সালামা বলেন, আমি হযরত আবু হুরায়রা এ-হাদীসটি ভিন্ন অন্য কোন হাদীস ভুলে যেতে দেখিনি।
হযরত আবু হুরায়রা -এর চাচাতো ভাই হযরত হারিস বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তুমি তো এ-হাদীসটির অন্য হাদীসটিও বর্ণনা করতে, এখন দেখছি সে ব্যাপারে নিরবতা অবলম্বন করছ! তুমি বলতে, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)।
প্রতিক্রিয়ায় হযরত আবু হুরায়রা হাদীসটি সম্পর্কে তাঁর জানাশোনার ব্যাপারটি অস্বীকার করেন। বরং তিনি বলেন, لَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٌ (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উঠের সাথে না রাখে।) এ-নিয়ে হযরত হারিস-এর বিতর্কে হযরত আবু হুরায়রা একপর্যায়ে রেগে যান এবং হাবশি ভাষায় কি যেন বলেন। হযরত আবু সালামা বলেন, আমার প্রাণের শপথ! হযরত আবু হুরায়রা অবশ্যই আমাদেরকে এ-হাদীসটি বর্ণনা করতেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)। জানি না, হযরত আবু হুরায়রা কি ভুলে গেলেন? নাকি এ-দুটো হাদীসের একটি রহিত হয়ে গেল।
যদি আপনি প্রশ্ন তুলেন যে, যেহেতু হযরত আবু হুরায়রা নিজে বর্ণনাটি অস্বীকার করেছেন সেহেতু সেটি আর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। এ-ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে, এখানে উসুলে হাদীসের বিধান হচ্ছে, সাধারণত যদি কোনো বর্ণনাকারী তাঁর কোনো হাদীস বর্ণনা অস্বীকার করেন তাতে হাদীসটির প্রমাণ্যতা বাতিল হয়ে যায় না। যদি আমরা মেনেও নিই তবুও لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই) হাদীসটি অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত অনেক হাদীস দ্বারা সুপ্রমাণিত। সে-ধরনের হাদীসও আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি।
রোগে সংক্রমণ নাকচকারী ও শ্বেতরোগীকে এড়িয়ে চলতে নিদের্শক হাদীসদুটোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে ...ا لَا يُوْرِدَنَّ مُمْرِضُ عَلَى مُصِحٌّ (রোগা উটকে সুস্থ উটের সাথে বাঁধা উচিত নয়) বা وَلَا يُوْرِدَنَّ عُمْرِضُ عَلَى মুছিহ (কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে) হাদীসদুটোর মধ্যেও পারস্পরিক দ্বন্ধ বিদ্যমান। সুতরাং রোগে সংক্রমণ নাকচকারী ও শ্বেতরোগীকে এড়িয়ে চলতে নিদের্শক হাদীসদুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে বিশেষজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের প্রসিদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য অভিমতসমূহ উল্লেখ করবো। এতে দ্বিতীয় হাদীসের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের তথ্য-সূত্র সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে। প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন।
অতএব আমার বক্তব্য হচ্ছে, নবী করীম -এর ইরশাদ: )لَا عَدْوَى (রোগের মধ্যে কোনো সংক্রামক শক্তি নেই)-এর বিশ্লেষণে সহীহ আল- বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, 'স্বভাবভাবে রোগব্যাধি সংক্রমিত হতে পারে না। এটি বস্তুত আল্লাহ তাআলার হুকুম ও তাঁর পরিচালিত প্রাকৃতিক নিয়ম।” এ কারণেই নবী করীম অসুস্থ উটের কাছে সুস্থ উটকে যেতে নিতে নিষেধ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরত্ব বজায় রেখো...।) কেউ কেউ বলেছেন, হাদীসটি لَا عَدْوَى থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র (এ-দুটোর মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ রয়েছে।)
ইমাম আত-তূরবর্তী বলেন, 'নবী করীম -এর ইরশাদ: لَا عَدْوَى-এর মর্মার্থ বিশ্লেষণে ওলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম বলেন, স্পষ্ট হাদীসের বক্তব্য এবং ছোঁয়াচের ওপর পূর্বে আলোচিত আলামত দ্বারাই রোগের সংক্রমণ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসার একথা সুপ্রতিষ্ঠিত। অতএব এখানে এটিই উদ্দেশ্যে।
আর কারো কারো রায় হচ্ছে, এখানে রোগের সংক্রমনশক্তি নাকচ করা উদ্দেশ্য নয়। হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُوْمِ فِرَارَكَ مِنَ الْأَسَدِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরে থাকো যেমটি মানুষ বাঘ থেকে পালিয়ে বাঁচে। তিনি আরও ইরশাদ করেন, لَا يُوْرَدَنْ ذُوْ عَامَةِ عَلَى مُصِح (কেউ যেন কখনো উন্মাদ উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে)। এসব দ্বারা প্রকৃতিবাদীদের বিশ্বাসই মূলত নাকচ করা হয়েছে। যারা বিভিন্ন অশুভ প্রভাবের অপরিহার্য প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। এখানে তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হল যে, তারা যেমন ধারণা ব্যাপারটি ঠিক সে-রকম নয়। বস্তুত ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে সেটা কারো শরীরে ক্রিয়া করবে, না চাইলে করবে না। এ-দিকে ইঙ্গিত করতে গিয়ে নবী করীম ইরশাদ করেন, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ»؟ (তাহলে প্রথম অসুস্থ উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?) অর্থাৎ যদি তোমাদের ধারণা অনুযায়ী এখানে অসুস্থতার একমাত্র কারণ সংক্রমণই প্রতিক্রিয়াশীল হয় তাহলে প্রথম অসুস্থ উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করল?
অবশ্য নবী করীম এও ইরশাদ করেছেন যে, »وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ (শ্বেতরোগী থেকে দূরত্ব বজায় রেখো...।) তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, لَا يُوْرَدَنَّ ذُوْ عَامَةِ عَلَى مُصِحُ (কেউ যেন কখনো উন্মাদ উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখে)। এসব অসুস্থতার কারণসমূহ হেলেপড়া দেয়াল এবং ভাঙা নৌকো থেকে দূরে থাকার নির্দেশের সাথে তুলানা রাখে।
উদ্ধৃত হাদীসদুটো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে প্রথমপক্ষ দ্বিতীয়পক্ষের দাবিকে রদ করেছেন। হাদীসদুটোতে শ্বেতরোগী ও অসুস্থ উট যেকারো সাথে মেলামেশা করতে নিষেধের ব্যাপারটি সহানুভূতিমূলক। কেউ যেন ঘটনাক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়লে অথবা উট রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে সংক্রামিত হওয়ার প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে।
তিনি আরও বলেন, উপর্যুক্ত বিশ্লেষণদুটোর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্লেষণটিই অধিক যথার্থ। কেননা এতে সেসব হাদীসের মধ্যেই সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে যা প্রসঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট। অবশ্য প্রথম বিশ্লেষণ দ্বারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো অসার করে দেয়। তবে ইসলামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো বাতিল করা হয়নি। বরং শরীরবৃত্তীয় অনেক বক্তব্য ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ। অতএব এখানে এমনভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে যাতে, তাওহীদী বিশ্বাসের বিপরীতও যেন না হয় এবং আমরা উপরে যা বলেছি তারও বিপরীত না হয়।...
অবশ্য রোগের সংক্রমণে ধারণা ভিত্তিহীন প্রমাণে তাঁরা বিভিন্ন আলামতকে ভিত্তি করে যে-দলিল উপস্থাপন করেছেন তার জবাবে বলা যায় যে, সাহেবে শরীয়তের অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একই সাথে একটি বিষয়কে হারাম ও মাকরুহ বলা হয়েছে। কোনো বিষয় যা একটি মাত্র কারণে নিষিদ্ধ এবং আরেকটি বিষয় যা অনেকগুলো কারণে নিষিদ্ধ উভয়কেও এক করে ফেলা হয়েছে। আমাদের এ- বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় নবী করীম-এর হাতে বায়আত গ্রহণে ইচ্ছুক এক শ্বেতরোগীর উদ্দেশ্যে নবী করীম -এর এ-পবিত্র ইরশাদ قَدْ بَايَعْنَاكَ (نَازَجِ (তোমাকে আমি বায়আত করে নিলাম, তুমি যাও) থেকে। অথচ খোদ নবী করীম অন্য সময় এক শ্বেতরোগী হাত ধরে তা একটি খাবারের পাত্রে রেখে ইরশাদ করেন, كُلِّ يَقَةٌ بِاللهِ، وَتَوَكَّلًا عَلَيْهِ (আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ভরসা রেখে খাও)। এ-উভয় হাদীসের মাঝে সুসঙ্গতির কোনো পথ খোলা নেই, তবে প্রথম হাদীসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপসর্গসমূহ থেকে সতর্কতা অবলম্বন আর দ্বিতীয় হাদীসের ক্ষেত্রে উক্ত ক্ষতিকর কারণসমূহ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-এ-ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। অতএব প্রথম হাদীস দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির কারণসমূহ থেকে সতর্কতা অবলম্বন প্রমাণিত হয়, এটি সুন্নতও বটে। দ্বিতীয় হাদীস থেকে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ক্ষতির কারণসমূহকে প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশনা প্রমাণিত হয়।
আর ইমাম আত-তীবী হযরত আমর ইবনে শারিদ বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, বনী সাকীফের প্রতিনিধি দলে একজন শ্বেতরোগী ছিলেন, লোকটিকে নবী করীম ফেরত পাঠিয়ে বলেছিলেন যে, قَدْ بَايَعْنَاكَ (نَازَجِ (তোমার আমি মঞ্জুর করে নিলাম এবার তুমি ফিরে যাও)। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। এ-হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, নবী করীম -এর পক্ষ থেকে এটি একটি মঞ্জুরি সেসব লোকের জন্য যারা তাওয়াক্কুলের কাঙ্ক্ষিত স্তরে তখনো পৌঁছাতে পারেনি এবং বিভিন্ন কার্যকারণকেই মূলত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অবশ্যই একথা অনস্বীকার্য যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুলে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ রেখেছেন।
আর ইমাম আল-বাগাওয়ী বলেন, কারো কারো বক্তব্য হচ্ছে, শ্বেতরোগীর শরীরের একধরণের দুর্গন্ধ থাকে। তার সাথে উঠাবসা, খাওয়া- দাওয়া এবং চলাফেরা করলে তাই অনুভূত হয়। এর সাথে কিন্তু সংক্রমণ শক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। এসব তো বরং স্বাস্থ্য ও অভিরুচির ব্যাপার। বাসি ও পঁচা খাবারগ্রহণ এবং অরুচিকর পরিবেশে বসবাস যেমন স্বাস্থ্য- উপযোগী নয় (শ্বেতরোগীর শরীরের দুর্গন্ধও তেমন, এটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। এটা সংক্রমক শক্তির প্রভাব নয়)। প্রকৃত সত্য হলো, পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটে কেবল আল্লাহর হুকুমেই ঘটে।
وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
'বস্তুত তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুরই কারো ক্ষতি সাধণের ক্ষমতা নেই।
শায়খ ইমাম হাফিয ইবনে হাজর আল-আসকালানী শরহু নুখবাতিল ফিকার গ্রন্থে বলেন, উপর্যুক্ত দু'ধরনের হাদীসের মাঝে কোনো বৈপরিত্য নেই, বরং সামঞ্জস্য আছে। প্রকৃতপক্ষে কোনো রোগ আপনা আপনি সংক্রমিত হয় না। তবে আল্লাহ তাআলা অসুস্থ মানুষের সাথে সুস্থ মানুষের সংশ্রবকে রোগবালাইয়ের একটি পার্থিব কার্যকারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অতএব কখনো এ-ধরনের সংশ্রবে রোগবালাই ছড়াতেও পারে। আবার কখনো কখনো এসব কারণের উপস্থিতিতেও রোগ ছড়ায় না। ইবনুস সালাহও এভাবে সামঞ্জস্য বর্ণনা করেছেন।
উভয় হাদীসের মধ্যকার সামঞ্জস্য বিধানে আমাদের বলা উচিত হবে যে, নবী করীম -এর সংক্রমণ সম্পর্কে ভ্রান্তধারণা পোষণ থেকে বারণ করা সাধারণভাবে যথাস্থানে ঠিকই আছে। সেই সাথে ،لَا يُعْدِي شَيْءٌ شَيْئًا (একজনের রোগ অন্যজনের প্রতি ছড়ায় না) মর্মে যে-বক্তব্য দিয়েছেন তাও সম্পূর্ণ সঠিক। নবী করীম এও বলেছেন যে, فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟ (তবে কে প্রথম লোকটিকে অসুস্থ করল?) অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তিকে যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অসুস্থ করেছেন ঠিক অনুরূপভাবেই তিনি অপরাপর লোকগুলোকে অসুস্থ করেন।
শ্বেতরোগী এড়িয়ে চলার এ-নির্দেশনা ভ্রান্তি নিরসনের জন্যে। কারণ হতে কোনো ব্যক্তি শ্বেতরোগীর সংশ্রবের পর ঘটনাক্রমে আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী অসুস্থ হয়ে পড়ে, যা কখনো নিন্দিত সংক্রমক শক্তির প্রভাবে হয়েছে এমন নয়। তবুও সে ধারণা করে বসতে পারে যে, এটা শ্বেতরোগীর সাথে সংশ্রবের ফলে সংক্রমিত হয়েছে। ফলে সে ভ্রান্ত সংক্রমণ ধারণাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে। এতে সে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অতএব হাদীসে এ-ভ্রান্ত বিশ্বাস সমূলে উপড়ে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন সবকিছু।
এই ছিল শায়খ ইবনে হাজার আল-আসকলানী -এর বক্তব্য যা নুখবাতুল ফিকারের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। টীকায় বলা হয়েছে, তিনি আরও বলেন, একজন শ্বেতরোগীর সাথে নবী করীম একপাত্রে একসাথে খাওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না। নবী করীম ও আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে বিন্দুপরিমাণ সন্দিহান হবেন তা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। এটা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এটা মূলত আত্মবিশ্বাসে দোদুল্যমান, সন্দেহপ্রবণ লোকদের ব্যাপার যারা কোনো রোগ দেখা দিলে তা অন্য কারো থেকে সংক্রমিত বলে ধারণা পোষণ করে। বস্তুত নবী করীম ছিলেন সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তিনি এর মধ্য দিয়ে যাতে মানুষ শিরকের সাগরে সামান্যটুকুও পতিত না হয় সে জন্য তিনি কাজটি করে দেখিয়েছেন। আল্লাহ তাঁর নবীর অপরিসীম অনুগ্রহের এই বিস্তৃত ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের পূণ্য-আমলের তওফীক দিন। দয়া ও মমতার আধার নবী করীম -এর ওপর অগুণিত শুভেচ্ছা ও সালাম প্রেরণ করছি।
এসব বক্তব্য হাফিয ইবনে হাজর আল-আসকালানী -এর। তিনি নবী করীম আলায়হিস সালাত ওয়াস সালামের সালাম ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে প্রসঙ্গটির ইতি টেনেছেন। আমিও সেভাবেই আলোচনার সমাপ্তি টানলাম। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী।
টিকাঃ
১. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীস: ৫৭0৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
২. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৩৮০, হাদীস: ৭৫০, হযরত আবু আতিয়া আল-আশজায়ী থেকে বর্ণিত
৩. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
৪. আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৪, পৃ. ৪৫০-৪৫১, হাদীস: ২১৪৩, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত
৫. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৮, হাদীস: ৫৭১৭ ও পৃ. ১৩৭, হাদীস: ৫৭৭০, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
৬. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১৪, পৃ. ৮৫, হাদীস: ৮৩৪৩; (খ) ইবনে হিব্বান, আস- সহীহ, খ. ১৩, পৃ. ৪৮৭, হাদীস: ৬১১৯, হযরত আবু হয়ায়রা থেকে বর্ণিত
৭. (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৩, হাদীসঃ ১০৪ (২২২১), হযরত আবু সালামা থেকে বর্ণিত
৮. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪৩, হাদীস: ১০৪ (২২২১), হযরত আবু সালামা থেকে বর্ণিত
৯. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, খ. ৫, পৃ. ১৩৮০, হাদীস: ৭৫০, হযরত আবু আতিয়া আল-আশজায়ী থেকে বর্ণিত
১০. আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ৫৭৭১, হযরত আবু হরায়রা থেকে বর্ণিত
১১. আল-কিরমানী, প্রাগুক্ত, খ. ২১, পৃ. ৩
১২. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ১৫, পৃ. ৪৪৯, হাদীস: ৯৭২২; (খ) আল-বুখারী, আস- সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীস: ৫৭০৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
১৩. আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত
১৪. (ক) আহমদ ইবনে হাম্বল, প্রাগুক্ত, (খ) আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৭, পৃ. ১২৬, হাদীসঃ ৫৭০৭, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত
১৫. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৫২, হাদীসঃ ১২৬ (২২৩১), হযরত শারীদ ইবনে সুওয়াইদ আস- সাকাফী থেকে বর্ণিত
১৬. আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ২০, হাদীস: ৩৯২৫, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত
১৭. আত-তূরবুন্সী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১০১০-১০১১
১৮. মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ৪, পৃ. ১৭৫২, হাদীসঃ ১২৬ (২২৩১), হযরত শারীদ ইবনে সুওয়াইদ আস- সাকাফী থেকে বর্ণিত
১৯. আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:১০২
২০. ইবনে হাজর আল-আসকলানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৩-৯৪ ও ২১৬-২১৭