📄 হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র সৌভাগ্যবান শহীদ-সরদার সাইয়িদুনা ইমাম আবু আবদুল্লাহ আল-হুসাইন সালামুল্লাহি আলায়হি ওয়া আবায়িহিল করীমের শাহাদতের আলোচনা:
عَنْ عَلِيَّ، قَالَ، قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: «أَخْبَرَنِي جِبْرِيلُ أَنَّ حُسَيْنَا يُقْتَلُ بِشَاطِئِ الْفُرَاتِ.
'হযরত আলী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'হযরত জিবরাইল আমাকে জানিয়েছেন ফোরাতের তীরে হযরত হুসাইনকে শহীদ করে দেওয়া হবে।'
ইমাম ইবনে সা'দ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «أَنَّ ابْنِي الْحُسَيْنَ يُقْتَلُ بَعْدِي بِأَرْضِ الطَّفِّ، وَجَاءَنِي بِهَذِهِ التَّرْبَةِ، وَأَخْبَرَنِي أَنَّ فِيْهَا مَضْجَعَهُ».
'হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'আমার পরবর্তীকালে আমারই সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ) হুসাইনকে তফ নামক স্থানে শহীদ করা হবে। (হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম) আমাকে তাঁর রক্তমাখা লাল মাটির টুকরো এনে দেখিয়েছেন এবং জানিয়েছেন।'
হাদীসটি ইমাম ইবনে সা'দ ও ইমাম আত-তাবারানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীরে বর্ণনা করেছেন।[2]
وَعَنْ أُمَّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «أَنَّ أُمَّتِي سَتَقْتُلُ ابْنِي هَذَا يَعْنِيَ الْحُسَيْنَ، وَأَتَانِي بِتُرْبَةٍ مِّنْ تُرْبَةٍ حَمْرَاءَ».
'হযরত উম্মুল ফযল বিনতুল হারিস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'আমার উম্মতের কতিপয় লোক আমার এই সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ) অর্থাৎ হুসাইনকে শহীদ করবে। হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম আমাকে তাঁর রক্তে রঞ্জিত মাটি এনে দেখিয়েছেন।'
হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম আল-হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাকে বর্ণনা করেছেন।[3]
وَعَنْ أُمَّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ: أَخْبَرَنِي جِبْرِيلُ: أَنَّ ابْنِي يُقْتَلُ بِأَرْضِ الْفُرَاتِ، فَقُلْتُ لِجِبْرِيلَ: أَرِنِي تُرْبَةَ الْأَرْضِ الَّتِي يُقْتَلُ فِيْهَا، فَجَاءَ بِهَا، فَهَذِهِ تُرْبَتُهَا».
'হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'হযরত জিবরাইল আমাকে অবগতি করেছেন যে, ফুরাত-ভূমিতে আমার সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ)-কে শহীদ করা হবে। আমি জিবরাইল-কে বললাম, আমাকে সেই জায়গার মাটি এনে দেখান যেখানে তাঁকে শহীদ করা হবে। তিনি তার কিছু নিয়ে এসেছেন আর এ হলো সেই জায়গার মাটি।' ইমাম ইবনে সা'দ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[4]
إِنَّ ابْنِي هَذَا يَعْنِيَ الْحُسَيْنَ يُقْتَلَ بِأَرْضِ يُقَالُ لَهَا: كَرْبَلَاءَ، فَمَنْ شَهِدَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَلْيَنْصُرْهُ».
'আমার সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ) অর্থাৎ হুসাইনকে যেখানে শহীদ করা হবে তার নাম কারবালায়। অতএব যারা সে-সময় তা প্রত্যক্ষ করবে তারা যেন হযরত হুসাইন-এর সহযোগিতা করে।' হাদীসটি ইমাম আল-বাগাওয়ী[5], ইমাম ইবনুস সাকান, ইমাম আল-বাওয়ারদী, ইমাম ইবনে মুনদা ও ইমাম ইবনে আসাকির[6] হযরত আনাস ইবনুল হারিস ইবনে মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেছেন।[7]
ইমাম আল-বাগাওয়ী বলেছেন, এটি হযরত আনাস ইবনুল হারিস ছাড়া অন্য কেউ বর্ণনা করেছেন কিনা তা জানা নেই। ইমাম ইবনুস সাকান বলেন, হযরত আনাস ইবনুল হারিস-এর এই সূত্রটি ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে এটি বর্ণিত হয়নি। এটি ছাড়া তাঁর কাছ থেকে আর কোনো হাদীসও বর্ণিত হয়নি।
إِنَّ جِبْرِيلَ أَخْبَرَنِي: أَنَّ ابْنِي الْحُسَيْنَ يُقْتَلُ وَهَذِهِ تُرْبَهُ تِلْكَ الْأَرْضِ».
'হযরত জিবরাইল আমাকে অবহিত করেছেন, আমার সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ) হযরত হুসাইনকে শহীদ করা হবে। এই মাটিই হলো সেই জায়গার।'
ইমাম আল-খলীলী তাঁর আল-ইরশাদে হযরত আয়িশা ও হযরত উম্মু সালামা থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[8]
إِنَّ جِبْرِيلَ كَانَ مَعَنَا فِي الْبَيْتِ، فَقَالَ: أَتُحِبُّهُ؟ فَقُلْتُ: أَمَّا فِي الدُّنْيَا، فَنَعَمْ. قَالَ: إِنَّ أُمَّتَكَ سَتَقْتُلُ هَذَا بِأَرْضِ يُقَالُ لَهَا: كَرْبَلَاءُ، فَتَنَاوَلَ جِبْرِيلُ مِنْ تُرْبَتِهِ، فَأَرَانِيْهُ».
'একদিন হযরত জিবরাইল আয়িশার ঘরে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং বললেন, আপনি কি হুসাইনকে ভালোবাসেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, ইহকালেও। হযরত জিবরাইল বললেন, তাঁকে আপনার উম্মতের কতিপয় লোক এই কারবালা-ভূমিতে শহীদ করে দেবে। অতঃপর হযরত জিবরাইল সেই স্থানের মাটি দেখালেন, আমি মাটিগুলো দেখেছি।'
ইমাম আত-তাবারানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীরে হযরত উম্মু সালামা থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[9]
إِنَّ جِبْرِيلَ أَخْبَرَنِي: أَنَّ ابْنِي هَذَا يُقْتَلُ، وَأَنَّهُ اشْتَدَّ غَضَبَ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَقْتُلُه .
'হযরত জিবরাইল আমাকে জানালেন যে, আমার এ-সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ)-কে শহীদ করে দেওয়া হবে। আর হত্যাকারীদের ওপর আল্লাহর ভয়াবহ গযব নেমে আসবে।' হাদীসটি ইমাম ইবনে আসাকির হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণনা করেছেন।[10]
إِنَّ جِبْرِيلَ أَرَانِيَ التَّرْبَةَ الَّتِي يُقْتَلُ عَلَيْهَا الْحُسَيْنُ، فَاشْتَدَّ غَضَبُ الله عَلَى مَنْ يُسْفِكَ دَمَهُ، فَيَا عَائِشَةُ! وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّهُ لِيَحْزِنُنِي، فَمَنْ هَذَا مِنْ أُمَّتِي يَقْتُلُ حُسِيْنًا بَعْدِي؟
'হযরত জিবরাইল যেখানে হুসাইন শাহাদাত-বরণ করবেন তার মাটি এনে আমাকে দেখিয়েছেন। যারা তাঁর রক্ত প্রবাহিত করবে তাদের ওপর আল্লাহর ভয়াবহ গযব আসবে। হে আয়িশা! সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি ভীষণ মনোকষ্ট অনুভব করছি। আমার পরে আমার উম্মতে এমন কোন্ ব্যক্তি হবে যে হুসাইনকে হত্যা করবে'? হাদীসটি ইমাম ইবনে সা'দ হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।[11]
إِنَّ جِبْرِيلَ أَتَانِي، فَأَخْبَرَنِي: أَنَّ ابْنِي يَقْتُلُهُ أُمَّتِي، فَقُلْتُ: فَأَرِنِ تُزْبَتَهُ، فَأَرَانِي بِتُرْبَةٍ حَمْرَاءَ».
'হযরত জিবরাইল এসে আমাকে অবহিত করেছেন, আমার উম্মতের কিছু লোক সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ)-কে শহীদ করবে। আমি তাঁকে বললাম, জায়গাটার কিছু মাটি এনে আমাকে দেখান। তিনি আমাকে সেই স্থানের রক্তরাঙা মাটি তুলে এনে দেখিয়েছেন।' ইমাম আত-তাবারানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীরে হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[12]
أَوْحَى اللَّهُ تَعَالَى إِلَى: أَنِّي قَتَلْتُ بِيَحْيَى بْنِ زَكَرِيَّا سَبْعِينَ أَلْفًا، وَإِنِّي قَاتِلٌ بِابْنِ بْنَتِكَ سَبْعِينَ أَلْفًا وَسَبْعِينَ أَلْفًا».
'আমাকে মহান আল্লাহ প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন যে, আমি হযরত ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া -এর হত্যার বদলা হিসেবে ৭০ হাজার লোককে হত্যা করেছি, আমি আমার দৌহিত্রের হত্যার বদলা হিসেবে ৭০ হাজারের ৭০ গুণ লোককে হত্যা করবো।' হাদীসটি ইমাম আল-হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাকে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেছেন।[13]
قَامَ عِنْدِي جِبْرِيلُ مِنْ قَبْلُ ، فَحَدَّثَنِي: أَنَّ الْحُسَيْنَ يُقْتَلُ بِشَطٌ الْفُرَاتِ، وَقَالَ : هَلْ لَكَ أَنْ أُشِمَّكَ مِنْ تُرْبَتِهِ؟ قُلْتُ : نَعَمْ. فَمَدَّ يَدَهُ، فَقَبَضَ قَبْضَةٌ مِّنْ تُرَابٍ، فَأَعْطَانِيهَا، فَلَمْ أَمْلِكُ عَيْنَيَّ أَنْ فَاضَتْ.
'একদিন আগ থেকেই হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম আমার কাছে উপস্থিত ছিলো, এক পর্যায়ে তিনি বললেন, হযরত হুসাইনকে ফোরাতের তীরে শহীদ করা হবে। তিনি বললেন, আপনি যদি তাঁর কবরের মাটি শুঁকতে চান? আমি বললাম, হ্যাঁ। হযরত জিবরাইল তাঁর হাত সম্প্রসারণ করে সেই জায়গার মাটি নিয়ে আসলেন এবং আমার সামনে পেশ করলেন। এ-অবস্থায় আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।'
হাদীসটি ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল)[14], ইমাম আবুল ইয়া'লা[15], ইমাম ইবনে সা'দ ও ইমাম আত-তাবরানী (প্রমুখ)[16] হযরত আলী, হযরত আবু উমামা, হযরত আনাস (ইবনে মালিক ) ও হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।
এ ছাড়াও হযরত উম্মু সালমা, হযরত আব্বাস-এর স্ত্রী হযরত উম্মুল ফযল বিনতে হারিস থেকে ইমাম ইবনে আসাকির[17] হযরত আয়িশা থেকে ইমাম ইবনে সা'দ এবং হযরত যায়নাব থেকে ইমাম আবুল ইয়া'লা বর্ণনা করেছেন।
كَأَنَّي أَنْظُرُ إِلَى كَلْبِ أَبْقَعَ يَلِغُ فِي دَمِ أَهْلِ بَيْتِي.
'আমি যেন কুকুর দেখছি যে আমার অধঃস্তন পুরুষের রক্ত পান করছে।'
এটি ইমাম ইবনে আসাকির সাইয়িদ হুসাইন ইবনে আলী থেকে বর্ণনা করেছেন।[18]
يَا عَائِشَةُ! أَلَا أُعَجِّبُكِ؟ لَقَدْ دَخَلَ عَلَيَّ مَلَكُ آنفًا مَا دَخَلَ عَلَيَّ قَطُّ، فَقَالَ: إِنَّ ابْنِي هَذَا مَقْتُولٌ، وَقَالَ: إِنْ شِئْتَ أَرَيْتُكَ تُرْبَةً يُقْتَلُ فِيْهَا، فَتَنَاوَلَ الْمَلَكُ بِيَدِهِ، فَأَرَانِي تُرْبَةٌ حَمْرَاءَ».
'হে আয়িশা! খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এইমাত্র আমার কাছে এমন একজন ফেরেশতা এসেছেন, যিনি ইতঃপূর্বে আমার কাছে কখনো আসেননি। তিনি এসে আমাকে বললেন, আমার এ-সন্তান (অধঃস্তন পুরুষ)-কে শহীদ করা হবে। তিনি আরও বললেন, আপনি চাইলে আমি আপনাকে যে জায়গায় তাঁকে শহীদ করা হবে তার মাটি এনে দেখাতে পারি। একথা বলেই ফেরেশতা তাঁর হাত সম্প্রসারণ করে আমাকে সে-জায়গার রক্তরঞ্জিত মাটি এনে আমাকে দেখালেন।'
বর্ণনাটি ইমাম আত-তাবরানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীরে হযরত আয়িশা থেকে বর্ণনা করেছেন।[19]
«يَزِيدُ، لَا بَارَكَ اللَّهُ فِي يَزِيدَ الطَّعَانِ اللَّعَانِ، أَمَّا إِنَّهُ نُعِيَ إِلَيَّ حَبِيبِي وَسَخِيْلِي حُسَيْنٌ أُبَيْتُ بِتُرْبَتِهِ، وَرَأَيْتُ قَاتِلَهُ، أَمَّا إِنَّهُ يُقْتَلُ بَيْنَ ظَهْرَانِي قَوْمٍ، وَلَا يَنْصُرُونَهُ إِلَّا عَمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِ».
'খুনি অভিশপ্ত ইয়াযিদ; আল্লাহর সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। কারণ সে আমার প্রিয়বৎস হুসাইনের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। হুসাইনের রক্তভেজা মাটি আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আমি তাঁর হত্যকারীকে দেখেছি। অবশ্য হুসাইনকে লোকসম্মুখে হত্যা করা হবে, অথচ তারা কেউ তাঁর সহায়তায় এগিয়ে আসবে না, বিধায় তাদের ওপর সর্বব্যাপী আযাব নেমে এসেছে।'
এ-বর্ণনাটি ইমাম ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেছেন।[20]
«يُقْتَلُ الْحُسَيْنُ عَلَى رَأْسِ سِتِّينَ سَنَةٌ مِّنْ مُهَاجَرَي».
'হিজরী ষাটের দশকে হযরত হুসাইন-কে হত্যা করা হবে।'
ইমাম আত-তাবরানী বর্ণনাটি তাঁর আল-মু'জামুল কবীর গ্রন্থে[21], ইমাম খতীব (আল-বগদাদী)[22] ও ইমাম ইবনে আসাকির[23] হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণনা করেছেন। এতে একজন বর্ণনাকারী সা'দ ইবনে তরীফ রয়েছেন, যিনি অগ্রহণযোগ্য। ইমাম ইবনে হিব্বান বলেন, তিনি হাদীস বানোয়াট করতেন।[24] ইমাম ইবনুল জওযী বর্ণনাটিকে তাঁর আল-মওযূআতে অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।[25]
يُقْتَلُ حُسَيْنٌ حِيْنَ يَعْلُوْهُ الْقَتِيرُ».
'হযরত হুসাইন যখন শহীদ হবেন তখন তিনি বার্ধক্যে উপনীত হবেন।'
বর্ণনাটি ইমাম আত-তাবরানী তাঁর আল-মু'জামুল কবীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।[26] এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন সা'দ ইবনে তরীফ রয়েছেন (হাদীসে বানোয়াটির দায়ে প্রত্যাখ্যাত তিনি)।
نُعِيَ إِلَيَّ الْحُسَيْنُ، وَأُتِيْتُ بِتُرْبَتِهِ، وَأُخْبِرْتُ بِقَاتِلِهِ».
'হযরত হুসাইন-কে হত্যা করা হবে, আমাকে তাঁর শাহাদাতস্থলের মাটি এনে দেখানো হয়েছে এবং তাঁর হত্যাকারী শনাক্ত করে দেওয়া হয়েছে।'
বর্ণনাটি ইমাম আদ-দায়লমী হযরত মুআয (ইবনে জাবাল) থেকে বর্ণনা করেছেন।[27]
জামিউল উসূলে ইমাম আত-তিরমিযী -এর হাদীস হিসেবে এসেছে,
عَنْ سَلْمَى : امْرَأَةٍ مِّنَ الْأَنْصَارِ، قَالَتْ: دَخَلْتُ عَلَى أُمَّ سَلَمَةَ، وَهِيَ تَبْكِي، قُلْتُ: مَا يُبْكِيْكِ ؟ قَالَتْ: رَأَيْتُ الْآنَ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ فِي الْمَنَامِ، وَعَلَى رَأْسِهِ وَلِحْيَتِهِ التَّرَابُ، وَهُوَ يَبْكِيْ، فَقُلْتُ: مَا لَكَ؟ يَا رَسُوْلَ الله ! قَالَ: شَهِدْتُ قَتْلَ الْحُسَيْنِ آنِفًا».
'হযরত সালমা নামে এক আনসারী মহিলা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন আমি উম্মু সালামা-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে কান্নারত দেখতে পাই। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি এই মাত্র হযরত রাসূলুল্লাহ -কে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি খুব বেশি কাঁদছেন, তাঁর পবিত্র মাথা ও দাড়িতে মাটি লেগে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কী হয়েছে? তিনি বলেন, 'আমি এই মাত্র হযরত হুসাইনকে শহীদ হতে দেখেছি।”[28]
জামিউল উসূলে ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম আত-তিরমিযী -এর হাদীস হিসেবে এও এসেছে যে,
[١] عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: أُتِيَ عُبَيْدُ اللهِ بْنُ زِيَادٍ بِرَأْسِ الْحُسَيْنِ، فَجُعِلَ فِي طَسْتٍ، فَجَعَلَ يَنْكُتُ، وَقَالَ فِي حُسْنِهِ شَيْئًا، فَقَالَ أَنَسٌ : فَقُلْتُ: وَاللهِ! إِنَّهُ كَانَ أَشْبَهَهُمْ بِرَسُوْلِ اللهِ ، وَكَانَ تَحْضُوْبًا بِالْوَسْمَةِ».
'(১) হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত আছে, ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কাছে হযরত হুসাইন-এর ছিন্ন মস্তক এনে একটি তশতরীতে রাখা হয়। এ-অবস্থায় নাড়াচাড়া করলেন এবং তাঁর প্রশংসায় কিছু বললেন। হযরত আনাস (ইবনে মালিক) বললেন, আল্লাহর কসম! তাঁর অবয়ব হযরত রাসূলুল্লাহ -এর সাথে খুব বেশি মিল। তখন হযরত হুসাইন-এর মাথার চুল মেহেদিরাঙা ছিলো।'
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
[٢] قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ زِيَادٍ، فَجِيءَ بِرَأْسِ الْحُسَيْنِ، فَجَعَلَ يَضْرِبُ بِقَضِيْبٍ فِي أَنْفِهِ، وَيَقُولُ: «مَا رَأَيْتُ مِثْلَ هَذَا حُسْنًا»، فَقُلْتُ: «أَمَا إِنَّهُ كَانَ مِنْ أَشْبَهِهِمْ بِرَسُوْلِ اللهِ ﷺ.
'(২) তিনি (হযরত আনাস) বলেন, আমি (ওবায়দুল্লাহ) ইবনে যিয়াদের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তার দরবারে হযরত হুসাইন-এর ছিন্ন মস্তক নীত হলে তিনি তাঁর নাকে একটি লাকড়ি লাগালেন এবং বললেন, আমি জীবনের এর চেয়ে সুদর্শন মানুষ দেখিনি। তখন আমি বললাম, নিশ্চয় তাঁর আকৃতি হযরত রাসূলুল্লাহ -এর সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ।'
প্রথম হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী[29] ও দ্বিতীয়টি ইমাম আত-তিরমিযী[30] বর্ণনা করেছেন。
জামিউল উসূলে আরও এসেছে,
عَنْ عُمَارَةَ بْنِ عُمَيْرٍ، قَالَ: لَمَّا جِيْءَ بِرَأْسِ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ زِيَادٍ وَأَصْحَابِهِ، فَصَدَّتْ فِي الْمَسْجِدِ فِي الرَّحَبَةِ، فَانْتَهَيْتُ إِلَيْهِمْ وَهُمْ يَقُولُونَ: قَدْ جَاءَتْ، فَإِذَا حَيَّةٌ قَدْ جَاءَتْ تَخَلَّلُ الرُّءُوسَ حَتَّى دَخَلَتْ فِي مَنْخَرِ عُبَيْدِ الله بْنِ زِيَادٍ، فَمَكَثَتْ هُنَيْئَةً، ثُمَّ خَرَجَتْ، فَذَهَبَتْ حَتَّى تَغَيَّبَتْ، ثُمَّ قَالُوا : قَدْ جَاءَتْ، قَدْ جَاءَتْ، فَفَعَلَتْ ذَلِكَ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا.
'হযরত উমারা ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ও তার অনুসারীদের ছিন্ন মস্তক আনা হয়। তখন মসজিদ-প্রাঙ্গনে লোকজনের প্রচ- ভীড় ছিলো। আমিও ভিড় ঠেলে সেখানে পৌঁছে যাই। সমবেত লোকেরা বলছিলো, ওই দেখো বেরিয়েছে; সাপ এসেছে। সাপটি নিহত লোকদের স্তুপিকৃত মস্তকগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের মাথার কাছে এসে থামলো। তার নাক দিয়ে প্রবেশ করে ভেতরে কিছুক্ষণ অবস্থান করে বেরিয়ে আসে। অতঃপর অদৃশ্য হয়ে গেলো। এ-দৃশ্য দেখে সমবেত লোকজন বলতে লাগল, ওই দেখো সে এসেছে, সে এসেছে। সাপটি এভাবে কয়েকবার বা তিনবার করলো।'
হাদীসটি ইমাম আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।[31]
আল্লামা আস-সুযুতী-এর তারীখুল খুলাফা ও ইমাম আল- বায়হাকী-এর দালায়িলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ نِصْفَ النَّهَارِ، أَشْعَثَ أَغْبَرَ، وَبِيَدِهِ قَارُورَةٌ فِيْهَا دَمْ؛ فَقُلْتُ بِأَنْ أَنتَ وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذَا؟ قَالَ: «دَمُ الْحُسَيْنِ وَأَصْحَابِهِ، لَمْ أَزَلْ الْتَقِطُهُ مُنْذُ الْيَوْمَ، فَأُحْصِيَ ذَلِكَ الْيَوْمَ، فَوَجَدُوهُ قُتِلَ يَوْمَئِذٍ.
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি দুপুরে হযরত রাসূলুল্লাহ-কে (স্বপ্নে) অত্যন্ত বিষণ্ণ ও ক্লান্ত অবস্থা দেখলাম। এ-সময় তাঁর হাতে একটি ছোট বোতলে কিছু রক্ত ছিলো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা- পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। এসব কী (কী হয়েছে আপনার)? তিনি জবাব দিলেন, 'এ হলো হযরত হুসাইন ও তাঁর অনুসারীদের রক্ত, যা আজ পর্যন্ত একত্র করে যাচ্ছি।' লোকেরা এই স্বপ্নের তারিখ মিলিয়ে দেখেছে এটি ছিলো হযরত হুসাইন-এর শাহাদাতের দিন।”[32]
ইমাম আবু নুআইম (আল-আসবাহানী) দালায়িলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
عَنْ أُمَّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: سَمِعْتُ الْجِنَّ تَبْكِي عَلَى الْحُسَيْنِ، وَتَنُوحُ. 'হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি হযরত হুসাইন-এর শাহাদাতে জিনজাতি শোকাহত হতে ও কান্না করতে শুনেছি।”[33]
ইমাম সা'লব তাঁর আমালীতে বর্ণনা করেছেন,
عَنْ أَبِي حُبَابِ الْكَلْبِي، قَالَ: أَتَيْتُ كَرْبَلَاءَ، فَقُلْتُ لِرَجُلٍ مِّنْ الْأَشْرَافِ بِهَا: بَلَغَنَيْ أَنَّكُمْ تَسْمَعُوْنَ نَوْحَ الْجِنِّ؟ فَقَالَ: مَا تَلْقِي أَحَدًا إِلَّا خَبَّرَكَ أَنَّهُ سَمِعَ ذَلِكَ، قُلْتُ: فَأَخْبِرْنِي مَا سَمِعْتَ أَنْتَ، قَالَ: سَمِعْتُهُمْ يَقُولُونَ: شِعْرُ:
مَسَحَ الرَّسُولُ جَيْبَهُ * فَلَهُ بَرِيقٌ فِي الْخُدُودِ أَبَوَاهُ مِنْ عُلْيَا قُرَيْشٍ * وَجَدَّهُ خَيْرُ الْجُدُودِ
'আবু হুবাব আল-কালবী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি কারবালায় পৌঁছে সেখানকার সম্ভ্রান্ত লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, আমি জানতে পেরেছি আপনারা হযরত হুসাইন-এর শাহাদাতে জিনজাতির শোকগীতি শুনেছেন? তারা জবাবে বলেছে, আপনি যার সাথে সাক্ষাৎ করেই এ-কথা জিজ্ঞেস করবেন, সবাই আপনাকে ইতিবাচক উত্তরই দেবেন এবং বলবেন, তারা নিজ কানেই জিনজাতির কান্না শুনেছে। আমি তাদেরকে বললাম, আপনারা কী শুনেছেন তাদের? তারা বলল, আমরা তাদের বলতে শুনেছি: কবিতা
রাসূল যখন বোলালেন হাত হুসাইনের ললাটে
আলোকিত হলো কপোল তাঁহার ঝিকঝিক ঝলমলে।
পিতা-মাতা তাঁর সেরা কুরাইশী সবে
দাদাও তাঁহার শ্রেষ্ঠ জাহান-ভবে।'[34]
ইমাম আবু ইয়া'লা একটি দুর্বলসূত্রে তাঁর মুসনদে বর্ণনা করেন,
عَنْ أَنْ عُبَيْدَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ: «لَا يَزَالُ أَمْرُ أُمَّتِي قَاتِها بِالْقِسْطِ حَتَّى يَكُوْنَ أَوَّلَ مَنْ يَظْلِمُهُ رَجُلٌ مِّنْ بَنِي أُمَيَّةَ يُقَالُ لَهُ: يَزِيدُ».
'হযরত আবু উবায়দা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, 'আমার উম্মত যেকোনো ব্যাপারে সর্বদা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তবে উমাইয়া বংশের এক লোকই প্রথম যে হঠকারিতার পথে চলবে; তার নাম ইয়াযিদ।”[35]
ইমাম আর-রূয়ানী তাঁর মুসনদে বর্ণনা করেন,
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُولُ: «أَوَّلُ مَنْ يُبَدِّلُ سُنَّتِي رَجُلٌ مِّنْ بَنِي أُمَيَّةَ؛ يُقَالُ لَهُ: يَزِيدُ».
'হযরত আবুদ দারদার থেকে বর্ণিত আছে, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, 'উমাইয়া বংশের এক লোকই প্রথম যে আমার সুন্নাহর পরিবর্তন করবে, তার নাম ইয়াযিদ।”[36]
وَقَالَ نَوْفَلُ بْنُ أَبِي الْفُرَاتِ : كُنْتُ عِنْدَ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ، فَذَكَرَ رَجُلٌ يَزِيدَ، فَقَالَ: أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ يَزِيدُ بْنُ مُعَاوِيَةَ، فَقَالَ: تَقُوْلُ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِيْنَ! وَأَمَرَ بِهِ، فَضُرِبَ عِشْرِيْنَ سَوْطًا.
'হযরত নওফাল ইবনে আবুল ফুরাত বলেন, একদিন আমি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয -এর দরবারে ছিলাম, জনৈক লোক ইয়াযিদের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে আমিরুল মুমিনীন ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়া বললো। এর প্রতিক্রিয়ায় হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয বললেন, তুমি (ইয়াযিদকে) আমীরুল মুমিনীন বললে? অতএব তাকে শাস্তির নির্দেশ দিলেন তিনি, এর দায়ে বিশটি বেত্রাঘাত করা হয়。[37]
আল্লামা আস-সুযুতী -এর বক্তব্য এখানে সমাপ্ত।
টিকাঃ
[1] শাহাদাতে হোসাইন, ইয়াযিদ ও কারবালা ট্রাজেডি সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি ইসলামের ইতিহাসে একদিকে বিয়োগান্তক ও অতীব বেদনাদায়ক, অন্যদিকে সমকালীন বিভিন্ন মতাবলম্বী ইতিহাসবিদদের পরস্পর বিপরীতমুখী তথ্যের দ্বন্দ্বে এটি বহুল বিতর্কিত বিষয়ও। এ সুযোগে শিয়া, খারেজী-রাফেজীসহ কতিপয় ভ্রান্তবিশ্বাসী সম্প্রদায় এসব ঘটনার বিবরণে মনের মতো রঙ চড়িয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে সুক্ষভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। যাতে সাধারণ মুসলমানগণ ইসলামের ধারক-বাহকদের সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইসলাম সম্পর্কে বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে।- অনুবাদক
[2] ইবনে সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৬, পৃ. ৪১৯, হাদীস: ৭৫03
[3] (ক) ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ৪১৭, হাদীস: ৭৪৯৭, হযরত উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত; (খ) আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১০৭, হাদীসঃ ২৮১৪
[4] আল-হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, খ. ৩, পৃ. ১৯৪, হাদীস: ৪৮১৮
[5] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ৪১৭, হাদীস: ৭৪৯১
[6] আল-বাগাওয়ী, মু'জামুস সাহাবা, খ. ১, পৃ. ৬৩-৬৪, হাদীস: ৪৬
[7] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ১৪, পৃ. ২২৪
[8] আলী আল-মুত্তাকী, প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ১২৬, হাদীস: ৩৪৩১৪
[9] আল-খলীলী, আল-ইরশাদ, الإرشاد في معرفة علماء الحديث ,. ১, পৃ. ৭০৩, হাদীস: ৪৭
[10] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১০৮, হাদীস: ২৮১৯
[11] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ১৪, পৃ. ১৯৩
[12] ইবনে সা'দ, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ৪১৮, হাদীস: ৭৫০০
[13] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ২৪, পৃ. ৫৪, হাদীস: ১৪১
[14] আল-হাকিম : প্রাগুক্ত, كتاب الغير تفسير سورة آل عمران , ২, পৃ. ৩১৯, হাদীস: ৩১৪৭
[15] আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, খ. ২, পৃ. ৭৭, হাদীস: ৬৪৮
[16] আবু ইয়া'লা আল-মুসিলী, আল-মুসনদ, খ. ১, পৃ. ২৯৮, হাদীস: ৩৬৩
[17] আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১০৫, হাদীস: ২৮১১
[18] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ২৩, পৃ. ১৯০ ও খ. ৫৫, পৃ. ১৬, হাদীস: ১১৫৮২২
[19] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১০৭, হাদীস: ২৮১৫
[20] (ক) আলী আল-মুত্তাকী, প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ১২৮, হাদীস: ৩৪৩২৪; (খ) ইবনুল জওযী, আল- মওবুআত, খ. ২, পৃ. ৪৬
[21] আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১০৫, হাদীস: ২৮০৭
[22] আল-খতীবুল বগদাদী, তারিখ বাগদাদ, খ. ১, পৃ. ১৫২
[23] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ১৪, পৃ. ১৯৮
[24] ইবনে হিব্বান, আল-মজরূহীন, খ. ১, পৃ. ৩৫৭, ক্রমিক: ৪৬৭
[25] ইবনুল জওযী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৪০৮
[26] আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১০৫, হাদীসঃ ২৮০৮
[27] আদ-দায়লামী, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ২৮৫, হাদীস: ৬৮৪১
[28] (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৬৫৭, হাদীস: ৩৭৭১; (খ) ইবনুল আসীর, আমিউল উসুল, খ. ৯, পৃ. ৩৫. হাদীস: ৬৫৬৭
[29] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ৫, পৃ. ২৬, হাদীস: ৩৭৪৮
[30] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৬৫৯, হাদীস: ৩৭৭৮
[31] ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৯, পৃ. ৩৫-৩৬, হাদীস: ৬৫৬৮ কুফার গভর্নর ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের ছিন্নমস্তক প্রথমে কুফার রাজপ্রাসাদে গভর্নর মুখতার ইবনে ওবাইদের সামনে রাখা হয়েছে। অতঃপর এই যালিমকে মুখতারের আদেশে লাশ মসজিদে আনা হয়। যাতে মানুষ ক্ষমতাসীন গভর্নর মুখতারের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। (ক) আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৫, পৃ. ৬৬০, হাদীস: ৩৭৮০; (খ) ইবনুল আসীর, জামিউল উসুল, খ. ৯, পৃ. ৩৬, হাদীস: ৬৫৬৯
[32] (ক) আল-বায়হাকী, দালায়িলুন নুবুওয়াত, খ. ৬, পৃ. ৪৭১, হাদীস: ২৮০৯ ও খ. ৭, পৃ. ৪৮, হাদীস: ২১৭৭; (খ) আস-সুযুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৮
[33] আস-সুযুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৮
[34] (ক) সা'লব, আল-মাজালিস, খ. ৮, পৃ. ১; (খ) আস-সুযুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৮
[35] (ক) আবু ইয়া'লা আল-মুসিলী, আল-মুসনদ, খ. ২, পৃ. ১৭৬, হাদীস: ৮৭১; (খ) আস-সুযুতী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮
[36] (ক) আয-যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৩, পৃ. ২০০; (খ) আল-বায়হাকী, দালাইলুন নুবুওয়াত, খ. ৬. পৃ. ৪৬৬-৪৬৭, হাদীস: ২৮০২, হযরত আবু যর আল-গিফারী থেকে বর্ণিত।
[37] (ক) আয-যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৫, পৃ. ২৭৫; (খ) আস-সুযুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৮
📄 সাইয়িদুনা ইমাম হাসান ইবনে আলী (রাঃ) ও হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর মধ্যকার সন্ধি
জেনে রাখুন যে, ৪১ হিজরীতে হযরত মুআবিয়া হযরত হাসান ইবনে আলী -এর মুখোমুখী হন। এতে হযরত হাসান খিলাফতের দাবি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। এ-কারণে এই বছরকে ঐক্যবর্ষ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারণ এ-বছর মুসলিম উম্মাহ এক খলীফার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। একই বছর হযরত মুআবিয়া মারওয়ান ইবনুল হাকামকে মদীনার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করেন。
৪৩ হিজরীতে হযরত মুআবিয়া সিজিস্তানের রায় ও সুদানের কুওয়ারা জয় করেন এবং সেখানে তিনি যিয়াদ ইবনে উমাইয়াকে নিজের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। এটাই ইসলামি ইতিহাসের প্রথম ঘটনা যেখানে রাসূল -এর যুগ থেকে চলে আসা প্রতিষ্ঠিত রীতির পরিবর্তন করা হয়েছে। সা'লবী প্রমুখ এ-কথা উল্লেখ করেছেন।
৫০ হিজরীতে হযরত মুআবিয়া সিরিয়াবাসীদেরকে স্বীয় পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী নেতৃত্বের প্রতি বায়আতগ্রহণের আহ্বান জানান[1]। এতে তারা সকলে তার হাতে বায়আত নেন। এটাই প্রথম যিনি তাঁর পুত্রকে খলীফা মনোনীত করলেন। খলীফার সুস্থ অবস্থায় পরবর্তী খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রেও এটা ছিল প্রথম ঘটনা। এরপর মদীনার শাসক মারওয়ানের কাছে মদীনাবাসী থেকে ইয়াযিদের পক্ষে বায়আতগ্রহণের জন্য ফরমান লিখেন। নির্দেশ অনুযায়ী মারওয়ান মদীনাবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বললেন, আমীরুল মুমিনীনের ইচ্ছে হলো তিনি তাঁর পুত্র ইয়াযিদকে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব)-এর সুন্নতের অনুসরণে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত করবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর দাঁড়িয়ে বললেন, বরং বলুন, কায়সার ও কিসরার নীতি অনুসরণে। কেননা হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) তাঁরা তাঁদের পুত্রদের কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের কাউকে খলীফা মনোনীত করে যাননি।
৫১ হিজরীতে হযরত মুআবিয়া হজ পালন করেন এবং নিজের পুত্রের পক্ষে বায়আত নেন। এ-উদ্দেশ্যে তিনি হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর (এ)-কে ডেকে পাঠান, সাক্ষাৎ হলে তাঁকে বললেন, হে ইবনে ওমর! আপনি আমাকে বলেছিলেন, নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় আপনি একটি রাতও ঘুমোতে পছন্দ করেন না। তাই আমি আপনাকে মুসলমানের সংহতিভঙ্গ ও তাদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা থেকে সতর্ক করছি। এ-পর্যায়ে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে বললেন, 'এ-কথা আপনিও জানেন যে, আপনার আগেও খলীফা ছিলেন, তাঁদেরও সন্তান ছিলো, তাঁদের করো সন্তানদের চেয়ে আপনার পুত্র উত্তম নয়। তাঁদের সন্তানদের মাঝে এমন খারাপ কিছুও দেখা যায়নি যা আপনার পুত্রের মাঝে দেখা যায়। তা সত্ত্বেও তাঁরা বিষয়টা মুসলমানের স্বাধীন ইখতিয়ারে ছেড়ে দিয়েছেন[2]। আর আপনিই আমাকে সতর্ক করছেন, আমি মুসলমানের সংহতি বিনষ্ট করছি! আমি এমন কিছুই করছি না। আমি সাধারণ মুসলমানের একজন। এ-ব্যাপারে পুরো উম্মাহ ঐকমত্য পোষণ করলে আমিও তাঁদের সাথেই থাকবো। হযরত মুআবিয়া বললেন, আল্লাহ আপনার ওপর কৃপা করুন। এরপর হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর চলে যান।
অতঃপর হযরত মুআবিয়া হযরত (আবদুর রহমান) ইবনে আবু বকর-কেও ডেকে পাঠালেন। তিনি দেখা করলেন। হযরত মুআবিয়া কথা বলতে শুরু করলেন। হযরত (আবদুর রহমান) ইবনে আবু বকর কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার ধারণা হচ্ছে, আপনার পুত্রকে স্থলাভিষিক্ত বানানোর জন্যে আমরা আপনাকে আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিনিধি বানিয়েছি, আল্লাহর কসম! আপনি এমনটি করতে পারেন না। আল্লাহর কসম! অবশ্যই এ-ব্যাপারটিকে মুসলমানের শূরা-ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়াই আপনার উচিত হবে। নতুবা এর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব আপনাকেই বহন করতে হবে। এতটুকু বলে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর ওঠে পড়লেন এবং (সেখান থেকে) চলে গেলেন। এতে হযরত মুআবিয়া বললেন, হে আল্লাহ! আপনার যেমন মর্জি তাঁর ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন। তিনি আরও বললেন, হে প্রস্থানোদ্যত ব্যক্তি! থামুন, এখনই সিরিয়াবাসীদের উদ্দেশ্যে যাবেন না। আমার আশঙ্কা সে-ক্ষেত্রে আমাকে আপনার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে বাধ্য করবে। অবশ্য আমি লোকজনকে একথাটি বলে দেই যে, আপনি বায়আত গ্রহণ করে নিয়েছেন। এরপর আপনি যা খুশি করতে পারবেন।
এরপর হযরত মুআবিয়া হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর -কে ডেকে বললেন, হে ইবনে যুবায়ের! তুমি সেই শৃগালের মতো ক্ষীপ্র যে কিনা একটি বন থেকে বেরিয়ে অপর জঙ্গলে দ্রুত প্রবেশ করো। নিশ্চয়ই আপনি এই দু'ব্যক্তির সাথে মিলিত হয়েছেন এবং আপনি তাঁদের কান ভারি করেছেন। তাঁদেরকে তাঁদের মতের বাইরে পরিচালিত করতে প্ররোচিত করেছেন। জবাবে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর বললেন, আপনি যদি নিজেকে খিলাফতের মালিক মনে করেন তবে তা থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করুন। এরপরই আপনার পুত্রকে নিয়ে আসুন, আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করবো। যদি একই সাথে আপনার ও আপনার পুত্র উভয়ের কাছে বায়আত গ্রহণ করি তবে কার কথা শুনবো, কাকে মানবো? একই সময়ে আপনারা দু'জনের বায়আত তো চলতে পারে না! এই বলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর স্থানত্যাগ করেন।
তারপর হযরত মুআবিয়া মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে বললেন, আমি জানতে পেরেছি যে, কিছু লোক এই মর্মে গুজব ছড়াচ্ছে যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর, হযরত (আবদুর রহমান) ইবনে আবু বকর ও হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর কোনো মূল্যেই ইয়াযিদের খিলাফতের পক্ষে বায়আত গ্রহণ করবেন না। অথচ তাঁরা তিনজনই কথা শুনেছেন এবং আনুগত্যের বায়আত গ্রহণ করেছেন। একথা শুনে সিরিয়াবাসী বললো, যে পর্যন্ত আমরা এই তিন ব্যক্তিকে জনসম্মুখে বায়আত গ্রহণ করতে না দেখবো সে পর্যন্ত আমরা এতে কোনোক্রমেই সন্তুষ্ট হতে পারবো না। অন্যথায় আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দেবো। এর প্রতিক্রিয়ায় হযরত মুআবিয়া বললেন, সুবহানাল্লাহ! কুরাইশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এতো দ্রুততা কেন? (এটা ধৃষ্টতার শামিল)। আমি এরপর কোনোদিন তোমাদের মুখে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ বাক্য আর শুনতে চাই না। এটা বলেই তিনি মিম্বর থেকে নেমে গেলেন। এতে জনগণের মধ্যে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা গেল, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর, হযরত (আবদুর রহমান) ইবনে আবু বকর ও হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর ইয়াযিদের সমর্থনে তাঁরা বায়আত গ্রহণ করেছেন! একদল মানুষ বলল, হ্যাঁ আল্লাহর কসম। অন্য একদল মানুষ বলল, না (এ হতে পারে না)। এ-পরিস্থিতি হযরত মুআবিয়া সিরিয়া ফিরে গেলেন।[3]
হযরত হাসান আল-বাসারী বলেন, সে-সময় জনসাধারণের মধ্যে বিশৃঙ্খলার পেছনে দু'জন ব্যক্তির কিছু দায় রয়েছে। একজন হযরত আমর ইবনুল আস তিনি হযরত মুআবিয়া-কে কুরআন ঊর্ধ্বে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আর তা সেভাবে উত্তোলন করাও হয়েছিলো। হযরত ইবনুল ফররা বলেন, অতঃপর খারেজীদেরকে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোও হয়। আর এই তৃতীয়পক্ষ কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে। অপর ব্যক্তি হলেন হযরত আল-মুগীরা ইবনে শু'বা; তিনি হযরত মুআবিয়া -এর পক্ষ থেকে কুফায় নিযুক্ত গভর্নর ছিলেন। তাঁর নামে হযরত মুআবিয়া পত্র পাঠিয়েছিলেন, আমার এই বার্তা পাঠমাত্রই আপনি নিজের পদ থেকে অব্যাহতি বরণ করবেন। হযরত মুআবিয়া ফরমান বাস্তবায়নে একটু সময় নিলেন। এরপর যখন তিনি হযরত মুআবিয়া -এর দরবারে উপস্থিত হন। হযরত মুআবিয়া বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, একটি সমস্যা ছিলো যা সমাধান করে এবং ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার জন্য দেরি করতে হয়েছে। হযরত মুআবিয়া জিজ্ঞেস করলেন, বিষয়টা কী? তিনি বললেন, আপনার পরবর্তী খলীফা হিসেবে ইয়াযিদের পক্ষে জনগণের বায়আত গ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি। হযরত মুআবিয়া জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তাই করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হযরত মুআবিয়া বললেন, তাহলে আপনি আপনার কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেন (গভর্নর পদে আপনাকে পুনর্বহাল করা হলো।) হযরত আল-মুগীরা ইবনে শু'বা যখন হযরত মুআবিয়া-এর দরবার থেকে কর্মস্থলে ফিরে আসেন তখন তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করলেন, কেমন পরিস্থিতির মুখোমুখী হতে হলো আপনাকে? তিনি জবাব দিলেন, আমি হযরত মুআবিয়া -কে এমন দিকভ্রান্ত ঘোড়ার পিঠে সওয়ার করে দিয়েছি, যেখানে তিনি কিয়ামত অবধি (উদভ্রান্তের মতো শুধু ঘুরে বেড়াবেন বটে) মনযিলে পৌঁছুতে পারবেন না।[4]
ইমাম ইবনে সিরীন বলেন, আমর ইবনে হাযম দূতের বেশে হযরত মুআবিয়া-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়ে বলুন তো, কেমন ব্যক্তিকে আপনি উম্মতে মুহাম্মদিয়ার খলীফা নিযুক্ত করে চলেছেন? আপনার উপদেশ শিরোধার্য! তবে আমার ব্যক্তিগত রায় হলো, খিলাফতের উত্তরাধিকারের জন্য যোগ্যতা বিচারে তাঁদের ও আমার সন্তান ব্যতীত আর কোনো বিকল্প ব্যক্তি চোখে পড়ছে না। আর আমার সন্তান সমধিক যোগ্য।
হযরত আতিয়া ইবনে কায়িস বলেন, হযরত মুআবিয়া এক ভাষণে বললেন, হে আল্লাহ! যদি আমি ইয়াযিদকে তার যোগ্যতা বিবেচনায় খলীফা পদে মনোনীত করে থাকি তাহলে আপনি আমার এ-প্রচেষ্টা সফল করুন এবং ইয়াযিদকে সাহায্য করুন। আর যদি আমি সে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু সন্তান হিসেবে স্নেহবাৎসল্যের কারণে তাকে এ পদে মনোনীত করে থাকি তাহলে মসনদে পদার্পণের আগেই তাকে মৃত্যুমুখে পতিত করো।[5]
২৫ বা ২৬ হিজরীতে হঠকারী ইয়াযিদের জন্ম হয়। জনসাধারণের প্রত্যাখ্যানের মুখেও তার পিতা তাকে খিলাফতের পদে মনোনীত করেন। ৬০ হিজরী মাহে রজবে যখন হযরত মুআবিয়া-এর ইন্তিকাল হয় সিরিয়াবাসীরা ইয়াযিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করে। এরপর মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে তার বায়আত গ্রহণের সম্মতি আদায় করতে ইয়াযিদ তার একজন প্রতিনিধিকে মদীনায় পাঠালেন। হযরত হুসাইন ও হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর ইয়াযিদের আনুগত্যে বায়আত গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন এবং রাতেই তাঁরা মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।
হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর ইয়াযিদের হাতে বায়আতও গ্রহণ করেননি, অন্যদিকে নিজের পক্ষে খিলাফতের দাবি করেননি। পক্ষান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন-এর ব্যাপার ছিলো; হযরত মুআবিয়া-এর খিলাফত-আমল থেকেই কুফাবাসীরা তাঁর কাছে চিঠি লিখত তাদের সাথে সম্মিলিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে। কিন্তু তিনি এ-আহ্বান বরাবরই নাকচ করে এসেছেন। পরে যখন ইয়াযিদের বায়আত হয়ে যায়, তখন তিনি বেশ দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে গেলেন; কখনো নিজের অবস্থানে থেকে যাবেন বলে চিন্তা করতেন আবার কখনো কুফায় গমনের ইচ্ছা হতো। এ অবস্থায় হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনু যুবাইর তাঁকে কুফা গমনের পরামর্শ দেন। অন্যদিকে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস বলেন, আপনি কুফা যাবেন না। হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর বলেছিলেন, আপনি মদীনা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কেননা হযরত রাসূলুল্লাহ-কে ইহ-পরকালের যেকোনো একটি পছন্দ করতে এখতেয়ার দিয়েছিলেন, তিনি পরকালই বেছে নেন। নিশ্চয় আপনি তাঁর কলিজার টুকরো। সুতরাং সেটি অর্থাৎ আপনিও গ্রহণ করবেন না। এসব বলেই তিনি হযরত হুসাইন-কে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন এবং বিদায় জানালেন। তা ছাড়া হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর প্রায় সময় বলতেন, মদীনা ছাড়ার ক্ষেত্রে হযরত হুসাইন-এর ইচ্ছাই জয়ীই হলো। আমার জীবনের কসম! যদি তিনি তাঁর পিতা ও বড় ভাইয়ের সাথে কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা থেকে শিক্ষা নিতেন! এ ছাড়াও হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, হযরত আবু সাঈদ (আল-খুদরী) ও হযরত আবু ওয়াকিদ আল-লায়সীসহ অনেক সাহাবী তাঁকে কুফা যাওয়ার ক্ষেত্রে একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কারো কথা মানেননি।
বরং ইরাকের দিকে রওনা হওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিলেন। এতে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস তাঁকে এ-পর্যন্ত বলেছিলেন, হে হুসাইন! আমি আশঙ্কা করি, আপনি নিজের স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির সামনে আপনাকে নির্মমভাবে শহীদ হয়ে যাবে যেমনটি হযরত ওসমান -কে শহীদ করা হয়। হযরত হুসাইন তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলেন না। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপনি হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে যুবাইর-এর চোখ ঠান্ডা করলেন কেবল। যখন হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে যুবাইর-এর সাথে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস-এর দেখা হওয়া মাত্র বললেন, আপনি যা চেয়েছেন তাই হলো। এই হযরত হুসাইন আপনাকে এবং হিজায ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এরপর তিনি এ-কবিতা আবৃত্তি করেন,
مَا لَكِ مِنْ تُنْبُرَةٍ بِمَعْمَرٍ
خَلَا لَكِ الْجَوُّ فَابِيْضِيْ وَاصْفِرِي
وَتَقْرِي مَا شِئْتِ أَنْ تُنَقِّرِي
صَيَادَكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ فَابْشِرِي
হে পাখি! কেবল এই বিস্তৃর্ণ সবুজভূমি নয়; উন্মুক্ত আকাশও তোমার জন্য অবারিত। যেখানে খুশি তুমি ডিম দাও, বাচ্চা ফোটাও। সেখান থেকে ইচ্ছে খাবার সংগ্রহ করো। কারণ তোমার শিকারী আজ তোমার সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরাকবাসীর পক্ষ থেকে হযরত হুসাইন-কে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বহু চিঠিপত্র ও দূত পাঠিয়েছিল। এ-কারণে হযরত হুসাইন ১০ যুলহজ মক্কা থেকে ইরাকের পথে রওনা হন। তাঁর সাথে পবিত্র আহলে বায়তের পুরুষ-নারী ও শিশুদের বিশাল একটি দল ছিলেন। অন্যদিকে ইয়াযিদ ইরাকের গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে হযরত হুসাইন-এর সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেন। যুদ্ধের ৪ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন জন্যে আমর ইবনে সাআদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস। সেই পরিস্থিতিতে কুফাবাসী তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী হযরত হুসাইন-এর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে, যেমনটা ইতঃপূর্বে তারা তাঁর পিতা ও বড় ভাইয়ের সাথে করেছিলো। সশস্ত্র বাহিনী যখন পথিমধ্যে হযরত হুসাইন-কে ঘিরে ফেলে তিনি সন্ধি, মক্কার ফিরে যেতে বা সরাসরি ইয়াযিদের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তাব করেন, এতে তিনি ইয়াযিদের হাতে হাত রেখেই বায়আত গ্রহণ করবেন। তারা তাঁর কথা নাকচ করে দিল এবং তাঁকে হত্যা করতে এগিয়ে গেল। অতঃপর তাঁকে শহীদ করা হলো এবং (ইরাকের গভর্নর ওবাইদুল্লাহ) ইবনে যিয়াদের সামনে তাঁর ছিন্ন মস্তক একটি পাত্র করে নিয়ে আসা হলো। তাঁর সকল খুনি বিশেষত ইবনে যিয়াদ উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত হোক, ইয়াযিদের ওপরও।
হযরত হুসাইন কারবালা-প্রান্তরে শাহাদত বরণ করেছেন। এই ঘটনা বেশ লম্বা। এমন হৃদয়বিদারক যে তার বর্ণনা লেখকের পক্ষে সবিস্তারে আলোচনা সম্ভব নয়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হযরত হুসাইন -এর সাথে আহলে বায়তের সতের জন লোক শাহাদত বরণ করেছিলেন।
হযরত হুসাইন-এর শাহাদতের পর সাত দিন ধরে পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিলো। সূর্যের মৃয়মান আলো হলুদ বর্ণ ধারণ করে দেয়ালে দৃশ্যমান হতো। আকাশের তারকাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছিলো। তাঁর শাহাদতের দিনটি ছিল আশুরা-দিবস। এই দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তাঁর শাহাদাতের পর ছয়মাস ধরে পশ্চিমাকাশে লাল আভা ছড়িয়ে থাকতো। আর সে-দিন থেকেই (সূর্যের অস্তাচলে) আজো সে-রক্তিমাভা পরিদৃষ্ট হয়, তা হযরত হুসাইন-এর শাহাদাতের পূর্বে কখনো দেখা যেত না।)
কথিত আছে, হযরত হুসাইন-এর শাহাদাতের দিন বায়তুল মুকাদ্দাসের যেখানেই যেকোনো পাথর উল্টানো হয় তার নিচে তরতাজা রক্ত দেখা গেছে। পক্ষান্তরে শত্রু-সৈন্যদের তর-তাজা সব শষ্য-ফসল মাটি হয়ে গিয়েছিলো। শত্রু-সেনাদের জন্য যদি কোনো উট যবেহ করা হলে তার গোশতে আগুন দেখা যেতো। গোশতগুলো রান্না করা হলে তা তিক্ত হয়ে যেতো। একদিন জনৈক লোক হযরত হুসাইন সম্পর্কে একটি কটূক্তি করলে সাথে সাথে আসমান থেকে একটি নক্ষত্র নিক্ষেপিত হয় এবং লোকটির চোখ অন্ধ হয়ে যায়。
ইমাম আস-সা'লাওয়ী বলেন, বেশ কিছু বর্ণনার মধ্যে এও বর্ণিত হয়েছে যে,
عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ عَمْرٍو اللَّيْنِي، قَالَ: رَأَيْتُ فِي هَذَا الْقَصَرِ وَأَشَارَ إِلَى قَصَرِ الْإِمَارَةِ بِالْكُوفَةِ رَأْسَ الْحُسَيْنِ بْنِ عَلِيٌّ بَيْنَ يَدَيْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ زِيَادٍ عَلَى تَرْضٍ، ثُمَّ رَأَيْتُ رَأْسَ عُبَيْدَ اللَّهِ بْنِ زِيَادٍ بَيْنَ يَدَيِ الْمُخْتَارِ بْنِ أَنْ عُبَيْدٍ، ثُمَّ رَأَيْتُ رَأْسَ الْمُخْتَارَ بَيْنَ يَدَيْ مُصْعَبِ بْنِ الزُّبَيْرِ، ثُمَّ رَأَيْتُ رَأْسَ مُصْعَبٍ بَيْنَ يَدَيْ عَبْدِ الْمَلِكِ، فَحَدَّثْتُ بِهَذَا الْحَدِيْثِ عَبْدُ الْمَلِكِ، فَتُطِيْرُ مِنْهُ وَفَارَقَ مَكَانَهُ».
'হযরত আবদুল মালিক ইবনে আমর আল-লায়সী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি কুফার প্রশাসনিক ভবনের দিকে অঙ্গুলি দেখিয়ে বলেন, আমি এই ভবনে ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের সম্মুখে হযরত হুসাইন ইবনে আলী-এর ছিন্ন মস্তক একটি গাছের ডালে ঝোলানো দেখেছি। একইভাবে পরে হযরত মুখতার ইবনে আবু ওবায়দের সম্মুখে ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কর্তিত মস্তক ঝুলতে দেখেছি। পরবর্তীতে এভাবে মুসআব ইবনুয যুবায়রের সম্মুখে মুখতারের বিচ্ছিন্ন মস্তক ঝুলতে দেখেছি। এরপরে অনুরূপভাবে আবদুল মালিকের সম্মুখে মুসআব (ইবনুয যুবায়র)-এর ছিন্ন মস্তক ঝুলতে দেখেছি। পুরো ঘটনা যখন তৎকালীন প্রশাসক আবদুল মালিকের কাছে আমি বর্ণনা করি। তখন তিনি এই ভবনকে অলক্ষুণে আখ্যায়িত করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।'
যখন হযরত হুসাইন ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করে তাঁদের ছিন্নমস্তক ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ইয়াযিদের কাছে পাঠায়। এতে তিনি প্রথমে আনন্দিত হন, পরে এ-ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মুসলমানের ভৎর্সনা, তার প্রতি জনগণের বৈরি মনোভাবের মুখে সে অনুতপ্ত হয়। ইয়াযিদের প্রতি জনগণের বৈরিতা অবশ্য ন্যায়ানুগ ছিল।
৬৩ হিজরীতে ইয়াযিদ জানতে পারলেন যে, মদীনাবাসী ইয়াযিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরুচ্ছে এবং তার বায়আত বাতিল করে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেন। একই সাথে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর -কে হত্যার করতে মক্কার পথে আরেকটি সেনাদল প্রেরণ করেন। মদীনা অভিমুখে প্রেরিত সেনারা পবিত্র নগরীর কাছে এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায় যা হাররা যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। হাররা- আগ্রাসন সম্পর্কে কী জানেন আপনারা? সেটা এমন এক ট্রাজেডি যার আলোচনা কোনো হৃদয়বান মানুষ সহ্য করতে পারে না, যার বর্ণনা শোনার মতো শক্তি মনুষ্যকর্ণের নেই। হাররা-আগ্রাসন সম্পর্কে হযরত হাসান আল- বাসারীর বলেন, আল্লাহর কসম! এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কেউ রেহাই পায়নি। এতে সাহাবায়ে কেরামসহ বহুসংখ্যক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শাহাদাতবরণ করেন। মদীনা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, সহস্রাধিক নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন নবী করীম ইরশাদ করেন,
مَنْ أَخَافَ الْمَدِينَةَ أَخَافَهُ اللهُ، وَكَانَتْ عَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.
'যে ব্যক্তি মদীনাবাসীর মনে ত্রাসের সৃষ্টি করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ত্রাস ও আতঙ্ক তাকে সর্বদা তাড়া করে ফিরবে। এ ব্যক্তির ওপর আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা ও গোটা মানবজাতির অভিশাপ।' হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।[6]
মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে ইয়াযিদের বায়আত প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণ হচ্ছে যে, তিনি স্বেচ্ছাচারিতায় সীমা ছাড়িয়েছিলেন।
একাধিক সূত্রে ইতিহাসবেত্তা ইমাম আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা ইবনুল গাসীল বলেন,
وَاللَّهِ مَا خَرَجْنَا عَلَى يَزِيدَ حَتَّى خِفْنَا أَنْ نُرْمَى بِالْحِجَارَةِ مِنَ السَّمَاءِ إِنَّ رَجُلًا يَنْكِحُ أُمَّهَاتَ الْأَوْلَادِ وَالْبَنَاتِ وَالْأَخَوَاتَ، وَيَشْرِبُ الْخَمْرَ، وَيَدَعُ الصَّلَاةَ .
'আল্লাহর কসম! আমরা ইয়াযিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেরুতাম না, তবে আমরা আশঙ্কা করছিলাম, কখন জানি আমাদের ওপর আসমান থেকে পাথর বর্ষিত হয়। কারণ সে-সময় লোকজন নিজেদের বোন ও কন্যাদের বিয়ে করছিল, মদ্যপান করছিল এবং সালাত বর্জন করছিল।'
ইমাম আয-যাহাবী বলেন, ইয়াযিদ মদীনাবাসীর সাথে যা করার করেছে। এ ছাড়াও তিনি মদ্যপায়ী এবং বহুবিধ অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। এ-কারণে মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধের ডাক দেয়। আল্লাহ ইয়াযিদের জীবনকে অশুভ করুন, তিনি হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনুয যুবাইর -এর সাথে লড়াইয়ে জন্যে মক্কায় সৈন্য প্রেরণ করেছেন। অতঃপর পথে সেনাপতি মারা যায়। দ্বিতীয় সেনাপতি নিয়োগ করেন তিনি। সে মক্কায় প্রবেশ করে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে যুবাইর -কে অবরোধ করে, তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁকে কামান দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এসব ঘটেছে ৬৪ হিজরীর সফর মাসে। এই কালো দিবসে তাদের ধ্বংসযজ্ঞের অগ্নিস্ফুলিঙ্গে কাবার গিলাফ ও ছাদ এবং হযরত ইসমাইল -এর ফিদিয়া হিসেবে দেয়া সেই ভেড়া দুই সিংহ যা কাবা শরীফের ছাদে ছিল সবই পুড়ে যায়। এ-বছর রবিউল আউওয়ালের মাঝামাঝি সময়ে ইয়াযিদকে আল্লাহ ধ্বংস করেন। মুহূর্তে এ-খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।[7]
টিকাঃ
[1] এ অধ্যায়ে বর্ণিত তথ্যগুলো যুগযুগ ধরে বহুল তর্কিত বিষয় হওয়ায় এর ঐতিহাসিক যথার্থতা যাচাই, বাস্তব সত্য উদঘাটন ও বিস্তারিত সূত্র সন্ধানে আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ও তারিখে ইবনে খালদুন প্রভৃতি ইতিহাসগ্রন্থ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।- অনুবাদক
[2] মজলিসে শুরা বা সর্বোচ্চ পরামর্শ পরিষদ কর্তৃক খলিফা মনোনীত হতেন এবং জনগণ তাঁদের হাতে আনুগত্যেও শপথ নেয়।
[3] (ক) আয-যাহাবী, তারিখুল ইসলাম, খ. ৪, পৃ. ১৪৮-১৪৯; (খ) আস-সুযুতী, তারিখুশ খুলাফা, পৃ. ১৪৯-১৫০
[4] হাসান বসরীর এই উক্তি সম্পর্কে লেখক সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যসূত্র বা প্রমাণ পেশ করেন নি। উক্তিটি বেশ আপত্তিকর ও সাহাবির শানে ধৃষ্টতাপূর্ণ। অনুবাদক
[5] (ক) আয-যাহাবী, তারিখুল ইসলাম, খ. ৫. পৃ. ২৭২; (খ) আস-সুয়ুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৬
[6] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ১৯৪, হাদীস: ৪৬৩ ও ৪৬৪ (১৩৬৬)
[7] (ক) আয-যাহাবী, তারিখুল ইসলাম, খ. ৫, পৃ. ৩০; (খ) আস-সুয়ুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৫৬-১৫৯