📄 যৌক্তিক জীবনযাপন
আমরা সবসময় মানুষ ও সমাজের কাছে ভালোটাই আশা করি। সমাজের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক, আমরা এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখি। নিঃসন্দেহে এধরনের চিন্তা-ভাবনা ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দেয়; কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমরা যেমনটা চাই, তেমনটা সবসময় হবে না। কোনো সমাজে বসবাস করার অর্থ হলো, বিরাজমান অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে চলা এবং পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা। পাশাপাশি নিজেদেরকে এ পরিবেশের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। তা না হলে আমরা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে অকর্মা বা অনুপযুক্ত মানুষ বলে বিবেচিত হব।
এ জগতে মানুষ কিছু মূলনীতি মেনে অগ্রসর হয়। আবার কিছু উপকার বা ফায়দা হাসিলের জন্যও চেষ্টা চালায়। সঙ্গীন পরিস্থিতিতে পড়লে অনেক মানুষই মূল্যবোধ ও মূলনীতি ছেড়ে ফায়দা হাসিলের দিকে এগিয়ে যায়। এমনটা নিন্দনীয় হলেও সমাজে এর উপস্থিতি অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তবতা হিসেবে একে আমাদের মেনে নিতেই হবে। মানুষ-মাত্রই নিজ মূলনীতির ওপর সাধ্যমতো অটল থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। এমনকি কোনো ডাকাত যদি রক্তপাত ছাড়াই কোনোকিছু অর্জন করতে পারে, তবে সে অহেতুক কাউকে হত্যার জন্য অগ্রসর হয় না। অর্থাৎ সমাজের প্রত্যেক ক্ষেত্রেই একটি নীতি আছে। প্রতিটি সম্পর্কেরই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আবার এ প্রতিটি ক্ষেত্র বা সম্পর্কের যৌক্তিক অবস্থানও আছে। সেই যৌক্তিক অবস্থানটা বুঝে নিয়ে আমাদের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
যৌক্তিক অবস্থান বোঝার প্রথম ধাপ হলো নিজেকে চেনা। আমাদের নিজেকে চেনার মাধ্যমে বিশ্বকে চেনার চেষ্টা চালানো উচিত। একমাত্র এর মাধ্যমেই অন্যের
হৃদয়ের ভালো দিকগুলো অনুভব করা সম্ভব। মানুষের হৃদয়ে অনুগ্রহ ও অনুকম্পা রয়েছে। তাদের মাঝে রয়েছে আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত। তারা বিনামূল্যে কাজ করে যেতে পারে; কিন্তু এ সবকিছুরই একটা সীমা আছে, যা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। সবশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, এমন কোনো মানুষ নেই, যে নিজের উপকার বা ভালোকে গুরুত্ব দেয় না। হতে পারে তা দুনিয়াবী বা আখিরাতের উপকার। কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা যাক-
ধরুন, আপনার ভাইয়ের একটি কারখানা রয়েছে। এদিকে আপনি কাজ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বেকার জীবনযাপন করছেন। ভাই কাজে নিচ্ছে না বলে হয়তো আপনি মর্মাহত; কিন্তু আপনার ভাইয়েরও তো হিসাব-নিকাশ আছে। সে হয়তো বিশ্বাস করে যে, আপনাকে সে যে বেতন দিতে পারবে, তা খুবই নগণ্য। এ সামান্য বেতন আপনার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, কারখানা অনবরত ক্ষতির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তাই সে আপনাকে তার কারখানায় কাজের জন্য ডাকেনি। এমনও হতে পারে, আপনার ভাই মনে করে, আত্মীয়দের চাকরি দিলে শুধু সমস্যাই সৃষ্টি হয়। তাই সে তাদেরকে নানারকম সাহায্য করেই ক্ষান্ত হয়, চাকরি দেয় না। একবার নিজেকে ওই কারখানার মালিকের আসনে বসিয়ে দেখুন। দেখবেন, আপনি নিজেও আপনার ভাইয়ের মতোই আচরণ করছেন।
আবার ধরা যাক, আপনার ভাই বাবার কথা বেশি শোনে, তার ডাকে দ্রুত সাড়া দেয়। পারিবারিক দেখভালের ক্ষেত্রেও সে আপনার তুলনায় বেশি দক্ষ। এমন অবস্থায় কী ঘটতে পারে? যৌক্তিক অবস্থান বলে যে, আপনার ভাইয়ের প্রতি আপনার বাবার বেশি টান থাকবে, তিনি তাকে বেশি স্নেহ করবেন এবং তার কাছ থেকে এমন অনেক কিছু চাইবেন—যা আপনার কাছ থেকে চাইবেন না। আপনার চাইতে তার প্রতিই তিনি বেশি সন্তুষ্ট থাকবেন, তাকে আপনার চেয়ে বেশি দেবেন। অবশ্য আপনিও আপনার বাবারই সন্তান। তাই আপনার জন্য তিনি দু’আ করবেন। তবুও তার কাছে আপনাদের দু’জনের অবস্থান ভিন্ন হবে।
মাঝেমাঝে এমন হয়, কোনো লোক আপনাকে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, যা আপনার মাঝে নেই। যেমন—সে হয়তো অভিযোগ করল আপনি কোনো এক মিটিং-এ তার নামে নিন্দা করেছেন, অথচ আপনি তা করেননি। এক্ষেত্রে যৌক্তিক অবস্থান হলো, আপনি আত্মপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে এর জবাব দেবেন; কিন্তু জবাব দিতে গিয়ে তাকে গালি দেবেন না বা ঝগড়া করে সীমা অতিক্রম করবেন।
না। যদি সীমা অতিক্রম করে ফেলেন, তাহলে আপনি সামাজিক প্রথা ও যৌক্তিক অবস্থানের বাইরে চলে গেলেন। আর এটাই অনেক মানুষ করে থাকে। তারা নির্যাতিত ব্যক্তি থেকে অত্যাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
আমরা কেউ যদি চাই যে, ইউরোপের ইতিহাসে দক্ষ হব তাহলে যৌক্তিক অবস্থান হবে যে, আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দুই-তিনটি ভাষা শিখব। তা না হলে আমাদের অবস্থানটা যৌক্তিক হবে না।
এজন্য আমাদের উচিত, যেকোনো ক্ষেত্রে, যেকোনো পরিস্থিতিতে যৌক্তিক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করা। যেমন—কেউ যদি ইতালির পণ্য নিয়ে ব্যবসা করতে চায়, তাহলে তাকে কিছুটা হলেও ইতালির ভাষা জানতে হবে। কেউ যদি ভালো একটা উপন্যাস লিখতে চায়, তাহলে তার জন্য যৌক্তিক অবস্থান হলো, যে স্থান বা পরিবেশ নিয়ে সে উপন্যাসটা লিখছে, সে সম্পর্কে কমপক্ষে চল্লিশ-পঞ্চাশটা বই পড়া। তা না হলে তার অবস্থান অযৌক্তিক হয়ে পড়বে।
কাজকর্ম যাতে ভুল খাতে প্রবাহিত না হয়ে যায়, সেজন্যই মূলত সবসময় আমাদের যৌক্তিক অবস্থানে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর অনুগ্রহের চাদরে বেষ্টিত করুন।
📄 সুখময় জীবনের সন্ধানে
মুসলিম যুবক-যুবতীদের সবার মনেই একটা উচ্চাশা কাজ করে। তারা চায় একটি ভালোবাসাপূর্ণ দ্বীনী পরিবার গঠন করতে। এটি মানুষের সহজাত প্রত্যাশা। নারী-পুরুষের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে, পুরুষকে নারীর পাশে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আবার নারীকেও পুরুষের পাশে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকেরই অপরকে খুবই প্রয়োজন। আবার এরা একে অপরকে এমন প্রশান্তি, আর নিরাপত্তা দিতে পারে, যা অন্য কোনো সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
আমি মনে করি, যে যুবক বিবাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা একে গুরুত্ব দেয় না এবং যে যুবতী একজন সংসারী বা মা হওয়ার উচ্চাশা পোষণ করে না তাদের ব্যক্তিত্বের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি আমি এটাও বলব যে, মানুষ বিয়ের পর নতুনরূপে নিজেকে আবিষ্কার করে। বিয়ের পর জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। নতুন অনুভূতি বা মনোভাবের সৃষ্টি হয়। খেয়াল করলে দেখতে পাবো, আমাদের বাবা-মা একে অপরের প্রতি এবং পরিবারের প্রতি ভীষণ সচেতন। আমাদের উচিত, তাদের আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ঘনিষ্ঠতা, বুঝ, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার দিকে লক্ষ্য করা। এ সকল গুণাবলি বাবা-মায়ের মাঝে পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত থাকে। অথচ অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের মাঝে তেমনটা থাকে না। বিয়ের ব্যাপারে আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুললে চলবে না—
এক. নিজেকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা। হারাম কিছু দেখা থেকে নিজের চোখকে বাঁচানো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
GG
يا معشر الشباب، من استطاع منكم الباءة فَلْيَتَزَوَّج، ومَن لم يَسْتَطِعْ فعليه بالصوم فإنه له وجاء
যুবকেরা, তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে; কেননা, তা দৃষ্টি সংবরণে ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণে অধিক কার্যকরী। আর যে তা না পারে সে যেন সাওম পালন করে। কেননা, এটি তার কামনা হ্রাস করবে।[১]
এটা বিয়ের প্রতি সুস্পষ্ট আহ্বান। এখানে দ্রুত বিয়ে করার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যুবক বয়সেই সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো চমৎকার ব্যাপার আর কী হতে পারে! এতে অল্প বয়সেই সন্তানদের সাহচর্য পাওয়া যায়। অপরদিকে আল্লাহ চাইলে সন্তানরাও দীর্ঘ সময় ধরে মা-বাবার সঙ্গ পায়। তাছাড়া তরুণ বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েদের আবেগ-অনুভূতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং তাদের লেখাপড়া ও শিক্ষাদানে বেশি তৎপর হয়।
দুই. পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের আবেগ পূর্ণ করা। আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষের মাঝে এ আবেগ সহজাত করে দিয়েছেন। বিয়ের অন্যতম বরকত হলো এ আবেগের প্রাপ্তি। শিশুরা জীবনের আনন্দ। এরাই মানুষের আশার দিগন্তকে বিস্তৃত করে এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে উৎসাহ দেয়। আর যদি তারা সৎকর্মশীল হয়, তাহলে বাবা-মায়ের সাওয়াবের পাল্লা ভারী করতে থাকে। কারণ, এই বাবা-মাই তার অস্তিত্ব ও সততার পেছনের কাজ করে গেছেন।
তাই বিয়ের মাধ্যমে দ্বীনি সৌহার্দপূর্ণ পরিবার গঠনের উচ্চাশা লালন করা প্রয়োজন। এজন্য অনেক কিছুই করা জরুরী, তবে এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা করছি।
প্রথমত, বিয়ে ও পরিবার গঠনের চিন্তাটা ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার মাঝে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মানে হলো, পড়াশোনা করার সময়ই ছেলে-মেয়েদের মাথায় এ চিন্তা থাকবে—বিয়ে কবে করা উচিত? পড়াশোনা ও বিয়ের মাঝে কি সমন্বয় করা সম্ভব? সমন্বয় করা গেলে কীভাবে করতে হবে? নাকি পড়াশোনা শেষ করেই বিয়ে করতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মেয়েদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মেয়েরা এমন এক বিষয়ে পড়া শুরু করে যা শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনোও উচ্চশিক্ষা শুরু করার ফলে পড়াশোনা শেষ করতে তাদের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে যায়। এসময় তাদের বিয়ের সুযোগগুলো সীমিত হয়ে যায়। এমনকি তখন তারা এমন মানুষকে বিয়ে করতে রাজি হয়, যে কিনা তার জন্য অনুপযুক্ত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, টাকা-পয়সা থাকলে বিয়ে কখনোও পড়াশোনার পথে বাঁধা হয় না। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে সময়কে যথাযথরূপে কাজে লাগাতে হবে। তাই কোনো মেয়ে যদি উচ্চমাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে যাওয়ার পর পড়াশোনা ও বিয়ের মাঝে সমন্বয় করতে না পারে, তবে তার বিয়েকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তারপর না হয় সে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, অথবা অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল।
দ্বিতীয়ত, ছেলে বা মেয়ে প্রত্যেকে যেন চরিত্র ও দ্বীনদারী খোঁজে। কারণ, এ দুটিই দাম্পত্য-জীবনকে পরিচালিত করার মৌলিক উপাদান। কিছু ছেলে বা মেয়ে আছে যারা ফরয সালাত-সাওম পালন করে, কবীরাহ গুনাহ করে না; কিন্তু তাদের আচার-ব্যবহার বেশ খারাপ। আবার কিছু ছেলে বা মেয়ে আছে যাদের আচার-আচরণ খুবই নম্র ও পছন্দনীয়; কিন্তু যারা ফরয পালন করা বা হারাম ত্যাগ করার ক্ষেত্রে খুবই উদাসীন। উভয় প্রকার ছেলে বা মেয়েই বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ, এদের মাঝে দ্বীনদারী ও উত্তম আখলাক নেই। বর্তমানে পরিবারগুলো যত সমস্যার সম্মুখীন, তার পেছনে দায়ী দ্বীনদারীর অভাব বা চারিত্রিক ত্রুটি।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচ্ছেদ ও পারিবারিক অশান্তি সম্পর্কে ধারণা থাকা। বর্তমান সময়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ও পারিবারিক সমস্যার পরিমাণ লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। এর কারণ, বিশ্বায়নের ছড়িয়ে দেওয়া সংস্কৃতি, যা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে উসকে দেয়। এ সংস্কৃতি আমিত্বকে গুরুত্ব দেয় এবং খেল-তামাশায় লিপ্ত থাকতে উৎসাহিত করে। শান্তিপূর্ণ বৈবাহিক জীবনকে স্থায়ী করার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল বাধা। তাই প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের উচিত, সেই সংস্কৃতি অর্জন করা, যা তাদেরকে একটি উত্তম পরিবারের উত্তম সদস্যে পরিণত করবে। এটি তখনই সম্ভব হবে, যখন সে বৈবাহিক জীবনের শিষ্টাচার, দায়িত্ব ও পারিবারিক সৌহার্দ্যের শর্তাবলি সঠিকভাবে জানবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সন্তান প্রতিপালনের জন্যও তাকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
যে দুজন মানুষ একে অপরকে সবচেয়ে খুশি করতে পারে, বা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে, তারা হলো স্বামী-স্ত্রী। তাই সফল পরিবার গঠনের উপায়গুলো জানা এবং তা বাস্তবায়ন করা জরুরী। উত্তম প্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করলে দ্রুত তালাকের পথ খুলে যেতে পারে।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৫০৬৫
📄 সামনে তাকাও
অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত নিয়ে মানুষের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অন্ত নেই। কেউ কেউ ভবিষ্যতটাকে অতীতের আদলে সাজাতে চায়। আর অতীত যদি ভবিষ্যত হয়ে তাদের কাছে ধরা না দেয়, তখন তীব্র মনঃকষ্টে ভোগে। আবার কেউ কেউ কেবল বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত। সময়টা খেল-তামাশায় কাটিয়ে দেওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তাদের চিন্তা ও সমস্যাবলি শুধু বর্তমানের সাথেই সম্পৃক্ত। অতীত বা ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সময় তাদের নেই। আবার এমন মানুষও আছে, যে কিনা ভবিষ্যত অর্জনের তাগিদে বর্তমানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অথচ যে ভবিষ্যত নিয়ে তার এত স্বপ্ন, সে ভবিষ্যত কীভাবে গড়ে তুলবে তা তার জানা নেই।
এজন্যই ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে; কিন্তু ভবিষ্যত নিয়ে আমরা কীভাবে সচেতন হবো? কেনই বা একে গুরুত্ব দেব? বর্তমানের সাথে এর তুলনা করার মাধ্যমই বা কী?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সামনের দিকে তাকাতে বলেছেন। ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, সে ভবিষ্যতের জন্য কী এগিয়ে রেখেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো তা সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।
[১]
বাস্তবতা হলো একজন দ্বীনদার মুসলিম ভবিষ্যত সম্পর্কে খুবই সচেতন। সে তার প্রতিটি কাজ আখিরাতের মুক্তির জন্য করে থাকে। এটিই তার মূলনীতি। আমাদের এ মূলনীতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রকৃত ভবিষ্যত দুনিয়ায় নয়, বরং আখিরাতে। এ চিরন্তন ভবিষ্যতের সামনে সব বর্তমানই মূল্যহীন। এ ভবিষ্যতের কোনো শেষ নেই। তাই প্রতিটি সূর্যোদয় যেন আমাদেরকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তোলে। আমাদের দিনটা যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়, তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পরিচালিত হয়। আর এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যেতে হবে।
আলোকিত ভবিষ্যতের রাস্তা একটাই। আজকে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তা যেন সুন্দরভাবে নিই, প্রতিদিনকার কাজগুলো যেন সঠিক খাতে পরিচালিত করি। উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে শুধু জল্পনা-কল্পনা করে গেলেই চলবে না। আমাদেরকে বাস্তবতা বুঝে এগিয়ে চলতে হবে। অন্যথায় তা নিজের সাথে প্রতারণা করা হবে। অধিকাংশ মানুষই এ বড় ভুলটি করে থাকে। এধরনের মানুষ ফেলে আসা অতীতকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে। এর কারণ, তারা বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে জানে না।
ভবিষ্যতকে গুরুত্ব দিতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করতে হবে। লক্ষ্যগুলো আরও সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করতে হবে। আর এসব লক্ষ্য অর্জনের পথগুলোও চিনে নিতে হবে। প্রতিটি উপলক্ষ্য যেন হয় চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক। আর সেই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহকে খুশি করা। যদি আমরা সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে উপলক্ষ্য নির্ধারণ না করতে পারি, তাহলে আল্লাহকে খুশি করা রীতিমতো অসম্ভব। ফলে আমাদের মাঝে যে সুপ্ত শক্তি তা সুপ্তই থেকে যাবে। একদিন আমরা আবিষ্কার করব যে, আমাদের জীবনে 'আত্মোন্নয়ন' নামক কোনো শব্দের অস্তিত্বই নেই। প্রকৃতপক্ষে সময় ও কাজ থেকে সর্বোচ্চ উপকারিতা অর্জন করা খুবই কঠিন। তার ওপর যদি আমাদের একটি মহান লক্ষ্য না থাকে এবং লক্ষ্যের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে, তাহলে আমরা কিছুতেই নিজেদেরকে ত্যাগী বানাতে পারব, পারব না নিজেদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে। স্পষ্ট লক্ষ্য না থাকলে আমরা মহান কিছু অর্জনের পরিবর্তে সহজ ও তুচ্ছ অর্জনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ব।
কিছু মানুষ আছে যারা বর্তমানে বসবাস করেও বর্তমান নিয়ে ভীষণ উদাসীন। ভবিষ্যতের চিন্তায় তারা হাতের কাছে যা আছে, তা উপভোগ করতে পারে না। তাদের হাতে কিছু অর্থ জমা হলে প্রতিবারই তা পরবর্তী কোনো প্রকল্পে খাটিয়ে
ফেলে। এমনকি নিজের ও পরিবারের ব্যাপারে খুবই কৃপণতা অবলম্বন করে। তাদের একমাত্র চিন্তা ভবিষ্যত নিয়ে। যৌবন শেষ হয়ে এলে তারা অনুভব করতে পারে যে, তারা যে পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেছিল তা আরও উত্তমরূপে ভোগ করতে পারত। এদের ব্যাপারে এ সতর্কবাণী প্রযোজ্য-
ওই লোকের মতো হবেন না, যে কিনা জীবনের প্রথমার্ধ শেষ করে দ্বিতীয়ার্ধ উপভোগ করার জন্য। আর দ্বিতীয়ার্ধ শেষ করে দেয় প্রথমার্ধের ব্যাপারে আফসোসের মাধ্যমে!
আমাদের জীবনটা আল্লাহর আনুগত্যেই কাটাতে হবে। এর পাশাপাশি হালাল বিনোদন আমাদের মানসিক প্রশান্তি দেবে। ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান বা বর্তমানের জন্য ভবিষ্যতটা নষ্ট করার মতো বোকামী আর হয় না। একমাত্র মধ্যমপন্থার মাঝেই সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি যেন বুকের ওপর চেপে বসা দুশ্চিন্তা না হয়ে দাঁড়ায়। এ চিন্তা যেন সারাক্ষণ আমাদেরকে আচ্ছন্ন না করে রাখে; বরং ভবিষ্যতকে আমরা দেখব আশার উৎস হিসেবে। তবেই আমরা কাজেকর্মে প্রেরণা পাব, সামনের দিকে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যেতে পারব।
টিকাঃ
[১] সূরা হাশর, ৫৯ : ১৬
📄 সুসংবাদ ছড়িয়ে দাও
আমাদের সমাজ নিন্দা ও সমালোচনায় ভরপুর। আমরা যেন সমালোচনার চরম পর্যায়ে চলে গেছি। বর্তমানে সহায়-সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তিসহ যা-কিছু আছে, তা আগেকার যুগে ছিল না। তারপরও আমরা সন্তুষ্ট নই, সবার কেবল অভিযোগ, অনুযোগ আর বিরক্তি। এ জীবনে যেন আনন্দ, আর নিরাপত্তার বড়ই অভাব। এখানে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো বিচ্ছেদের বার্তা বয়ে আনে, আর আনন্দঘন অনুষ্ঠানেও বিষাদের সুর বাজে।
তাই আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করতে ভুলবেন না। সবার আগে স্মরণ করবেন ঈমান নামক নিয়ামতের কথা। সবসময় মনে রাখবেন, আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের জন্য অজস্র সাওয়াবের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। পড়ে দেখুন সেই হাদীসগুলো, যেগুলো নম্র-বিনয়ী ও সরল হতে বলে। কারণ, এর দ্বারাই হতাশা ও দুশ্চিন্তাকে বিদায় জানানো সম্ভব। আমাদের কিছু হাদীস জানা থাকা দরকার, যা সহজ জীবনের দিকে আহ্বান করে-
GG
إن الله تعالى رضى لهذه الأُمَّةِ اليُسْرَ، وَكَرِه لَها العُسر
আল্লাহ এ উম্মতের জন্য সহজতাকে পছন্দ করেছেন এবং কঠোরতা অপছন্দ করেছেন।[১]
" إِنَّ اللهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا وَلَا مُتَعَنِّتًا وَلَكِنْ بَعَثَنِي مُعَلِّمًا مُيَسِّرًا
আল্লাহ আমাকে কঠিন বা কঠোররূপে পাঠাননি; বরং তিনি আমাকে সহজকারী শিক্ষকরূপেই প্রেরণ করেছেন [১]
" إِنَّ رَبَّكُم تَبَارَكَ وَتَعَالَى حَيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحْيِ مِنْ عَبْدِهِ إِذَا رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا
নিশ্চয় তোমাদের রব লজ্জাশীল ও দানশীল। বান্দা তার দিকে হাত প্রসারিত করলে তিনি তা ফিরিয়ে দিতে লজ্জা বোধ করেন।[২]
" إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ
আল্লাহ সকল বিষয়ে কোমলতা পছন্দ করেন [৩]
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, দূরে সরিয়ে দিয়ো না [৪]
" بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ ، وَالدِّينِ ، وَالرِّفْعَةِ وَالنَّصْرِ ، وَالتَّمْكِينِ فِي الْأَرْضِ
এই জাতিকে তোমরা গৌরব, দ্বীন, শ্রেষ্ঠত্ব, সাহায্য ও যমীনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুসংবাদ দাও [৫]
❝ الكلمة الطيبة صدقة
উত্তম কথা এক প্রকার সাদাকা।[১]
ঈমান ও হিদায়াত এমন এক নিয়ামত, যা চিরন্তন সফলতার পথ দেখায়। আর এ দু'টি নিয়ামত আমাদেরকে সুসংবাদ গ্রহণ করতে এবং আল্লাহর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশায় বুক বাঁধতে বলে। আমরা নিয়ামত পাওয়ার ব্যাপারে অতিমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার মতে, এ হাদীসগুলো এমন অভ্যস্ততা কাটিয়ে আল্লাহর জন্য কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির অনুভূতি জাগ্রত করবে। যেমন এ হাদীসের কথাই ধরা যাক—
❝ يَعْجَبُ رَبُّكم من راعي غنم فى رأس شظية بجبل يؤذن بالصلاة ويُصلّي فيقول الله عز وجل انظروا إلى عبدى هذا يؤذن ويُقيمُ الصلاة يخاف منى قد غفرت لعبدى وأدخلته الجنة
তোমার রব পাহাড়ের ওই মেষপালককে দেখে বিস্মিত হন, যে কিনা সালাতের জন্য আযান দেয় এবং সালাত আদায় করে। আল্লাহ তখন বলেন, আমার এই বান্দাকে তোমরা দেখো। সে আমার ভয়ে আযান দেয় ও সালাত আদায় করে। আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালাম।[২]
আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী অনুভব না করি, সবসময় কেবল অন্যান্য জাতির সাথে শিল্প-প্রযুক্তি-বিনোদনের ক্ষেত্রে নিজেদের তুলনা করি, তাহলে হতাশ ও বিরক্ত হওয়া খুব স্বাভাবিক। আর এটা তো ঈমান নামক নিয়ামতকে অস্বীকারেরই নামান্তর! পৃথিবীর অসংখ্য জাতি এ নিয়ামত থেকে দূরে। ঈমান হারিয়ে, স্রষ্টাকে না জেনে নিজের জীবনের বড় লক্ষ্যকে বিনষ্ট করে এই জাতিগুলো কি আদৌ কিছু অর্জন করছে?!
তাই আমরা হতাশ না হই; বরং আশেপাশের মানুষগুলোর মাঝে প্রশান্তি ও আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিই। আমরা কারও পাশে থাকলে যেন তারা অনুভব করে যে, জীবনটা খুবই সুন্দর। এরকম নৈকট্য অর্জনে আমরা উত্তম কথা, মৃদু ঠাট্টা ও
বিনয়ী আচরণ করতে পারি। এছাড়াও আমাদের উচিত বন্ধুদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে আবিষ্কার করা, তাদের অর্জিত সফলতার জন্য সাধুবাদ জানানো এবং তাদেরকে বেশি করে উৎসাহ দেওয়া।
আমরা ইতিবাচক মানসিকতার ধারক হব। মানুষ যখন ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করবে, তখন আমরা তাদেরকে লাভের কথা স্মরণ করিয়ে দেব। তারা যখন ব্যর্থতার গল্প শোনাবে, তখন আমরা সফলতার ইতিহাস তুলে ধরব। তারা যখন বন্ধ রাস্তার বর্ণনা দেবে, তখন আমরা উন্মোচিত দিগন্তের দিকে তাদের দৃষ্টি ফেরানোর আহ্বান করব। সবকিছুর আলোকিত দিকটাই আমাদের চিন্তায় আনতে হবে। গ্লাসের যে অর্ধেকটা পূর্ণ তার দিকে নজর রাখতে হবে।
জীবন সহজ ও আনন্দময় করার একটা কার্যকর উপায় হলো, শিশুসুলভ সরলতাকে নিজেদের মাঝে ধারণ করা। আমরা কি খেয়াল করেছি, সামান্য একটি চকলেট বা এক টুকরো কাপড় পেয়ে তারা কী ভীষণ খুশি হয়? নিজেদের যা আছে তা উপভোগ করা তাদের কাছ থেকেই শেখা সম্ভব। আমরা জীবন উপভোগ করব, আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাব। অন্যকে আল্লাহ কী দিয়েছেন তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব না। তাহলে আমাদের মাঝে ঈর্ষা ও হিংসা দানা বাঁধবে। এমনকি এর ফলে আমরা আল্লাহর নিয়ামতকেও অস্বীকার করে বসতে পারি।
নিজেদের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য সুন্দর, তাৎপর্যপূর্ণ ও আশাবাদী মন্তব্য করা প্রয়োজন। কারণ, একজন বক্তার মনে কিন্তু তার নিজের কথাও প্রভাব ফেলে। আবার শ্রোতার মনেও সেই একই প্রভাব পড়ে। আর আমরা বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসা করব; কারণ, তিনিই সকল নিয়ামত দান করেন।
টিকাঃ
[১] আল-জামিউস সাগীর, ১৭৩৬; হাদীসটি সহীহ
[১] সহীহ মুসলিম, ১৪৭৮
[২] সুনান আবু দাউদ, ১৪৮৮
[৩] সহীহ বুখারী, ৬০২৪
[৪] সহীহ বুখারী, ৬৯; সহীহ মুসলিম, ১৭৩৪
[৫] সহীহ আল-জামি, ২৮২৫
[১] সহীহ বুখারী, ২৯৮৯; সহীহ মুসলিম, ১০০৯
[২] সুনান আবু দাউদ, ১২০৩; সনদ গ্রহণযোগ্য