📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 কল্যাণের চাবি যেথায় আছে

📄 কল্যাণের চাবি যেথায় আছে


‘কল্যাণের চাবি’ কথাটির মাঝে চিন্তার খোরাক আছে। আমরা কি জানি, কল্যাণের চাবি কী? কীসের হাত ধরে কল্যাণ আসে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই হাদীসে :
إنَّ الصدق يهدى إلى البر وإنَّ البر يهدى إلى الجنَّةِ وإِنَّ الرَّجلَ ليصدقُ حَتَّى يُكتبَ صَدِّيقًا وَإِنَّ الكذب يهدى إلى الفجور وإنَّ الفجور يهدى إلى النَّارِ وإِنَّ الرَّجلَ ليكذب حتَّى يُكتبَ كَذَّابًا
সত্য কল্যাণে পথ দেখায়। কল্যাণ জান্নাতের পথ দেখায়। একজন লোক সত্য বলতে থাকে; এমনকি সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী বলে গণ্য হয়। আর মিথ্যে পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। একজন লোক মিথ্যে বলতে থাকে; এমনকি সে আল্লাহর কাছে মিথ্যুক বলে গণ্য হয়।[১]
কল্যাণ হলো সব ধরনের ভালোকাজের সমষ্টি। আর সত্যবাদী যেন কল্যাণের ধারক-বাহক! এ জাতির উত্তম ব্যক্তিদের মাঝে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্মানটা সে অর্জন করে নেয়। যে সত্যের ওপর অবিচল, সে যাবতীয় পদস্থলন থেকে নিরাপদ। তার মতো লোকেরাই সমাজের সার্বিক উপকারে আসে।
অন্যদিকে মিথ্যে মানুষের জীবনে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের ভোগবাদী মানসিকতার সুযোগ নিয়ে এখনকার বিজ্ঞাপনগুলোও দেদারসে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপন এমন এক জিনিস—যা প্রকৃতপক্ষে মানুষকে কেনাকাটা করতে
উদ্বুদ্ধ করে। পাশাপাশি মানুষ এখন নিজ সুবিধা বা স্বার্থ আদায়ের জন্য অতিমাত্রায় আগ্রহী। ফলে যে কোনো উপায়ে সর্বক্ষেত্রে সুযোগ লাভের প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে। এ অবস্থায় সত্যের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কল্যাণলাভের আশা নেই।
সত্যবাদিতার মানে হলো, সঠিক পথে অবিচল থাকা। ব্যক্তির অন্তর ও বাহির একই রকম হওয়া। সত্যবাদিতা সবসময় একজন মানুষকে তার ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে সহায়তা করে। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি-মাত্রই জানে যে, ভুল-ভ্রান্তিতে জড়ালে মিথ্যের স্রোতে ভেসে যেতে হবে। তখন নিজের ভুলকে বৈধ করা ও আত্মরক্ষার জন্য মিথ্যে বলতেই হবে। তাই সত্যবাদী-মাত্রই সরল পথে চলার চেষ্টা করে।
মুসলিমজাতির প্রতিটি সদস্যের সত্যবাদী হওয়া খুব প্রয়োজন। কারণ, পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে সততাই মূল ভূমিকা রাখে। তাছাড়া আস্থা অর্জন না হলে সামাজিক অবকাঠামো ধ্বসে পড়বে। একবার আস্থা হারিয়ে ফেললে কয়েক যুগ চেষ্টা করেও তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ওদিকে মিথ্যেবাদী বেশ বড় পরিসরে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে। সে নিজের যেমন ক্ষতি করে, অন্যেরও তেমন ক্ষতি করে। সত্যবাদিতা আমাদের নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও সুস্পষ্ট জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। এ উম্মাহ্র সালাফগণ সত্যবাদিতা ও সঠিক কথার প্রতি ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মিথ্যাবাদিতা ও অশ্লীলতার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা মারাত্মক অপরাধ। এ ব্যাপারে বর্ণিত আছে-
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনিল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু কাবাঘরের চারদিকে তাওয়াফ শেষে দুই রাকাআত সালাত আদায় করলেন। এ সময় কুরাইশের এক লোক তাকে বলল, 'আপনি এত দ্রুত তাওয়াফ করলেন! এত দ্রুত সালাত আদায় করলেন, হে আবু আব্দির রহমান।' ইবনু উমার বললেন, 'তোমরা আমাদের থেকে বেশি বেশি তাওয়াফ করে থাকো, সিয়াম পালন করে থাকো; কিন্তু আমরা তোমাদের থেকে উত্তম। কেননা, আমরা সত্য বলি, আমানত রক্ষা করি আর ওয়াদা পূরণ করি।'

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম, ২৬০৭

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 প্রান্তিকতা পরিহার করো

📄 প্রান্তিকতা পরিহার করো


নিজেকে ভালোবাসা, নিজের কাজে সন্তুষ্ট হওয়া মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। যা-কিছু নিজের সাথে জড়িত তার সব নিয়েই মানুষ ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, সে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করা ও অর্থোপার্জনের ব্যাপারে খুবই উদ্যোগী। এরপরও একে অন্যের সাথে লেনদেন বা আচার-ব্যবহার করার সময় মানুষকে নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আবার মানুষ যখন বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখনও তারা সমস্যায় পড়ে। এ সমস্যাগুলোর উদ্ভব হয় সাধারণত প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে, মনের চাহিদা দমনে দুর্বল হওয়ার কারণে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্য ও সঠিক কথা বলতে এবং কাছে দূরের সবার সাথে ইনসাফ বজায় রাখতে আদেশ দিয়েছেন। এসব ব্যাপারে যেন নিন্দার ভয় আমাদের দমিয়ে রাখতে না পারে। সত্য সত্যই, ভালো ভালোই-সেটা বন্ধু করুক বা শত্রু। সত্য ও ইনসাফ কায়েম করার জন্য আমাদেরকে একটি মূলনীতি মেনে চলতে হবে। আমরা সবাই-ই আল্লাহর এ বাণীটা জানি-
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্যে দুর্ভোগ। যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সেই মহাদিবসে, যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে [১]
আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ আয়াতটি আবু জুহাইনা নামের এক লোক সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। তার এক বড় পাত্র ছিল। কেনার সময় সেটা দিয়ে মেপে নিত। আর ছোট্ট একটা পাত্র ছিল। বিক্রি করার সময় সেটা দিয়ে মেপে দিত। নিঃসন্দেহে এ ধরনের কাজ নিন্দনীয়। অনেক মানুষই কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই এ ধরনের কাজ করে থাকে।
এরকম আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক, এক কবি কোনো শাসকের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করল, প্রশংসা করতে করতে তাকে বেশ উপরে তুলল। কিছুদিন পর তার সাথে মনোমালিন্য হলো। এবার তার নিন্দা করে কবিতা লিখল। তাকে এমন খারাপ বিশেষণ দিল যে, লোকেরা বলেই ফেলল, 'আপনি কীভাবে একই লোকের এত প্রশংসা করে আবার এত নিন্দা করলেন?!'
পাঠক, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, কবি যখন সন্তুষ্ট ছিল, তখন শাসক সম্পর্কে বেশ ভালো বলল; কিন্তু যখন অসন্তুষ্ট হলো তখন আর ভালো থাকতে পারল না, সীমা ছাড়িয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলল। অথচ আমরা যাদেরকে পছন্দ করি বা ঘৃণা করি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন। তিনি বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো, এটাই আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।[১]
এ অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
فمن أحب أن يزحزح عن النار ويدخل الجنة ، فلتأته منيته وهو يؤمن بالله واليوم الآخر وليأت إلى الناس الذي يحب أن يؤتى إليه
যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন মৃত্যুর সময় আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান রাখে আর মানুষের সাথে তেমন আচরণই করে যেমন আচরণ তার সাথে হওয়াকে সে পছন্দ করে [১]
আমরা চাই অন্যেরা আমাদেরকে সঠিকভাবে বুঝুক। আমরা ভুল করে থাকলে তারা আমাদের পক্ষে অজুহাত খুঁজে নিক। আবার আমাদের মাঝে যে দোষ নেই, কেউ যেন সে দোষে আমাদের অভিযুক্ত না করে। আমরা এটাও চাই যে, আমাদের যে গুণাবলি, যে সক্ষমতা আছে সেগুলোকে যেন তারা ছোট করে না দেখে।
আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে চাই, তাহলে যেন ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে অন্যদের পাশে দাঁড়াই। কারণ, এটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় ও ইনসাফের সাক্ষ্য প্রদান করে।
এর মানে হলো, মানুষের সাথে কোনোরকম চেষ্টা ছাড়াই অনায়াসে ইনসাফ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার আল্লাহর ভয় ও নফসের সাথে যুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে নফসের সাথে যুদ্ধ প্রতিটা পথে, প্রতিটা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়াও প্রান্তিকতা এড়ানোর জন্য অবশ্যই আমাদের কথাবার্তায় বিচক্ষণ হতে হবে। তাই কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিত তা জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। যেমন-খুব সাধারণ কোনো ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সেটাকে 'চমৎকার', 'অসাধারণ' বলে অভিহিত করা অতিরঞ্জনের পর্যায়ে পড়ে। আবার মামুলি কোনো অপরাধকে যদি আমরা খুব গর্হিত হিসেবে অন্যের সামনে উপস্থাপন করি, সেটাও ইনসাফ-বহির্ভূত বলে বিবেচিত হবে। মোটকথা, আমরা বিচক্ষণতার সাথে নিজেকে এবং অন্যকে মূল্যায়ন করব।
ইনসাফ করতে হলে কেবল ধারণার মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। ব্যক্তিগত অনুমান বা সংবাদ থেকে একটা ফলাফলে চলে আসা উচিত হবে না। কেননা, এ রকম সিদ্ধান্ত এক প্রকারের গুরুদায়িত্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন-
۞ وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমান-ভিত্তিক কথাবার্তা বলে থাকে।[১]
তাই মানুষের নিয়ত বা মনের ইচ্ছে, যা আমরা জানি না, তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে চলে আসা থেকে আমরা বিরত থাকব। কারণ, এমন বিষয় আল্লাহ তাআলাই জানেন। আমরা কেবল বাহ্যিকতা দেখে বিচার করব। আর আল্লাহ অন্তরের খবর বলতে পারবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নেব কথা ও কাজের ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে নিয়তসহ যাবতীয় উহ্য বিষয়ে আল্লাহর ভয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকব, যেন কারও ব্যাপারে আমরা এমন কিছু বলে না ফেলি, যা তাদের মাঝে নেই। তাই একটু আগে উল্লিখিত হাদীসের কথা ভুলে গেলে চলবে না। সবসময় মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তেমন ব্যবহারই করা উচিত, যেমনটা আমরা নিজেরা তাদের থেকে প্রত্যাশা করি।

টিকাঃ
[১] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ০১-০৬
[১] সূরা মায়িদা, ০৫:০৮
[১] সহীহ মুসলিম, ১৮৪৪
[১] সূরা আনআম, ০৬ : ১১৬

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 যৌক্তিক জীবনযাপন

📄 যৌক্তিক জীবনযাপন


আমরা সবসময় মানুষ ও সমাজের কাছে ভালোটাই আশা করি। সমাজের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক, আমরা এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখি। নিঃসন্দেহে এধরনের চিন্তা-ভাবনা ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দেয়; কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমরা যেমনটা চাই, তেমনটা সবসময় হবে না। কোনো সমাজে বসবাস করার অর্থ হলো, বিরাজমান অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে চলা এবং পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা। পাশাপাশি নিজেদেরকে এ পরিবেশের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। তা না হলে আমরা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে অকর্মা বা অনুপযুক্ত মানুষ বলে বিবেচিত হব।
এ জগতে মানুষ কিছু মূলনীতি মেনে অগ্রসর হয়। আবার কিছু উপকার বা ফায়দা হাসিলের জন্যও চেষ্টা চালায়। সঙ্গীন পরিস্থিতিতে পড়লে অনেক মানুষই মূল্যবোধ ও মূলনীতি ছেড়ে ফায়দা হাসিলের দিকে এগিয়ে যায়। এমনটা নিন্দনীয় হলেও সমাজে এর উপস্থিতি অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তবতা হিসেবে একে আমাদের মেনে নিতেই হবে। মানুষ-মাত্রই নিজ মূলনীতির ওপর সাধ্যমতো অটল থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। এমনকি কোনো ডাকাত যদি রক্তপাত ছাড়াই কোনোকিছু অর্জন করতে পারে, তবে সে অহেতুক কাউকে হত্যার জন্য অগ্রসর হয় না। অর্থাৎ সমাজের প্রত্যেক ক্ষেত্রেই একটি নীতি আছে। প্রতিটি সম্পর্কেরই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আবার এ প্রতিটি ক্ষেত্র বা সম্পর্কের যৌক্তিক অবস্থানও আছে। সেই যৌক্তিক অবস্থানটা বুঝে নিয়ে আমাদের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
যৌক্তিক অবস্থান বোঝার প্রথম ধাপ হলো নিজেকে চেনা। আমাদের নিজেকে চেনার মাধ্যমে বিশ্বকে চেনার চেষ্টা চালানো উচিত। একমাত্র এর মাধ্যমেই অন্যের
হৃদয়ের ভালো দিকগুলো অনুভব করা সম্ভব। মানুষের হৃদয়ে অনুগ্রহ ও অনুকম্পা রয়েছে। তাদের মাঝে রয়েছে আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত। তারা বিনামূল্যে কাজ করে যেতে পারে; কিন্তু এ সবকিছুরই একটা সীমা আছে, যা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। সবশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, এমন কোনো মানুষ নেই, যে নিজের উপকার বা ভালোকে গুরুত্ব দেয় না। হতে পারে তা দুনিয়াবী বা আখিরাতের উপকার। কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা যাক-
ধরুন, আপনার ভাইয়ের একটি কারখানা রয়েছে। এদিকে আপনি কাজ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বেকার জীবনযাপন করছেন। ভাই কাজে নিচ্ছে না বলে হয়তো আপনি মর্মাহত; কিন্তু আপনার ভাইয়েরও তো হিসাব-নিকাশ আছে। সে হয়তো বিশ্বাস করে যে, আপনাকে সে যে বেতন দিতে পারবে, তা খুবই নগণ্য। এ সামান্য বেতন আপনার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, কারখানা অনবরত ক্ষতির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তাই সে আপনাকে তার কারখানায় কাজের জন্য ডাকেনি। এমনও হতে পারে, আপনার ভাই মনে করে, আত্মীয়দের চাকরি দিলে শুধু সমস্যাই সৃষ্টি হয়। তাই সে তাদেরকে নানারকম সাহায্য করেই ক্ষান্ত হয়, চাকরি দেয় না। একবার নিজেকে ওই কারখানার মালিকের আসনে বসিয়ে দেখুন। দেখবেন, আপনি নিজেও আপনার ভাইয়ের মতোই আচরণ করছেন।
আবার ধরা যাক, আপনার ভাই বাবার কথা বেশি শোনে, তার ডাকে দ্রুত সাড়া দেয়। পারিবারিক দেখভালের ক্ষেত্রেও সে আপনার তুলনায় বেশি দক্ষ। এমন অবস্থায় কী ঘটতে পারে? যৌক্তিক অবস্থান বলে যে, আপনার ভাইয়ের প্রতি আপনার বাবার বেশি টান থাকবে, তিনি তাকে বেশি স্নেহ করবেন এবং তার কাছ থেকে এমন অনেক কিছু চাইবেন—যা আপনার কাছ থেকে চাইবেন না। আপনার চাইতে তার প্রতিই তিনি বেশি সন্তুষ্ট থাকবেন, তাকে আপনার চেয়ে বেশি দেবেন। অবশ্য আপনিও আপনার বাবারই সন্তান। তাই আপনার জন্য তিনি দু’আ করবেন। তবুও তার কাছে আপনাদের দু’জনের অবস্থান ভিন্ন হবে।
মাঝেমাঝে এমন হয়, কোনো লোক আপনাকে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, যা আপনার মাঝে নেই। যেমন—সে হয়তো অভিযোগ করল আপনি কোনো এক মিটিং-এ তার নামে নিন্দা করেছেন, অথচ আপনি তা করেননি। এক্ষেত্রে যৌক্তিক অবস্থান হলো, আপনি আত্মপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে এর জবাব দেবেন; কিন্তু জবাব দিতে গিয়ে তাকে গালি দেবেন না বা ঝগড়া করে সীমা অতিক্রম করবেন।
না। যদি সীমা অতিক্রম করে ফেলেন, তাহলে আপনি সামাজিক প্রথা ও যৌক্তিক অবস্থানের বাইরে চলে গেলেন। আর এটাই অনেক মানুষ করে থাকে। তারা নির্যাতিত ব্যক্তি থেকে অত্যাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
আমরা কেউ যদি চাই যে, ইউরোপের ইতিহাসে দক্ষ হব তাহলে যৌক্তিক অবস্থান হবে যে, আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দুই-তিনটি ভাষা শিখব। তা না হলে আমাদের অবস্থানটা যৌক্তিক হবে না।
এজন্য আমাদের উচিত, যেকোনো ক্ষেত্রে, যেকোনো পরিস্থিতিতে যৌক্তিক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করা। যেমন—কেউ যদি ইতালির পণ্য নিয়ে ব্যবসা করতে চায়, তাহলে তাকে কিছুটা হলেও ইতালির ভাষা জানতে হবে। কেউ যদি ভালো একটা উপন্যাস লিখতে চায়, তাহলে তার জন্য যৌক্তিক অবস্থান হলো, যে স্থান বা পরিবেশ নিয়ে সে উপন্যাসটা লিখছে, সে সম্পর্কে কমপক্ষে চল্লিশ-পঞ্চাশটা বই পড়া। তা না হলে তার অবস্থান অযৌক্তিক হয়ে পড়বে।
কাজকর্ম যাতে ভুল খাতে প্রবাহিত না হয়ে যায়, সেজন্যই মূলত সবসময় আমাদের যৌক্তিক অবস্থানে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর অনুগ্রহের চাদরে বেষ্টিত করুন।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সুখময় জীবনের সন্ধানে

📄 সুখময় জীবনের সন্ধানে


মুসলিম যুবক-যুবতীদের সবার মনেই একটা উচ্চাশা কাজ করে। তারা চায় একটি ভালোবাসাপূর্ণ দ্বীনী পরিবার গঠন করতে। এটি মানুষের সহজাত প্রত্যাশা। নারী-পুরুষের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে, পুরুষকে নারীর পাশে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আবার নারীকেও পুরুষের পাশে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকেরই অপরকে খুবই প্রয়োজন। আবার এরা একে অপরকে এমন প্রশান্তি, আর নিরাপত্তা দিতে পারে, যা অন্য কোনো সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
আমি মনে করি, যে যুবক বিবাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা একে গুরুত্ব দেয় না এবং যে যুবতী একজন সংসারী বা মা হওয়ার উচ্চাশা পোষণ করে না তাদের ব্যক্তিত্বের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি আমি এটাও বলব যে, মানুষ বিয়ের পর নতুনরূপে নিজেকে আবিষ্কার করে। বিয়ের পর জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। নতুন অনুভূতি বা মনোভাবের সৃষ্টি হয়। খেয়াল করলে দেখতে পাবো, আমাদের বাবা-মা একে অপরের প্রতি এবং পরিবারের প্রতি ভীষণ সচেতন। আমাদের উচিত, তাদের আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ঘনিষ্ঠতা, বুঝ, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার দিকে লক্ষ্য করা। এ সকল গুণাবলি বাবা-মায়ের মাঝে পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত থাকে। অথচ অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের মাঝে তেমনটা থাকে না। বিয়ের ব্যাপারে আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুললে চলবে না—
এক. নিজেকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা। হারাম কিছু দেখা থেকে নিজের চোখকে বাঁচানো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
GG
يا معشر الشباب، من استطاع منكم الباءة فَلْيَتَزَوَّج، ومَن لم يَسْتَطِعْ فعليه بالصوم فإنه له وجاء
যুবকেরা, তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে; কেননা, তা দৃষ্টি সংবরণে ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণে অধিক কার্যকরী। আর যে তা না পারে সে যেন সাওম পালন করে। কেননা, এটি তার কামনা হ্রাস করবে।[১]
এটা বিয়ের প্রতি সুস্পষ্ট আহ্বান। এখানে দ্রুত বিয়ে করার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যুবক বয়সেই সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো চমৎকার ব্যাপার আর কী হতে পারে! এতে অল্প বয়সেই সন্তানদের সাহচর্য পাওয়া যায়। অপরদিকে আল্লাহ চাইলে সন্তানরাও দীর্ঘ সময় ধরে মা-বাবার সঙ্গ পায়। তাছাড়া তরুণ বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েদের আবেগ-অনুভূতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং তাদের লেখাপড়া ও শিক্ষাদানে বেশি তৎপর হয়।
দুই. পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের আবেগ পূর্ণ করা। আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষের মাঝে এ আবেগ সহজাত করে দিয়েছেন। বিয়ের অন্যতম বরকত হলো এ আবেগের প্রাপ্তি। শিশুরা জীবনের আনন্দ। এরাই মানুষের আশার দিগন্তকে বিস্তৃত করে এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে উৎসাহ দেয়। আর যদি তারা সৎকর্মশীল হয়, তাহলে বাবা-মায়ের সাওয়াবের পাল্লা ভারী করতে থাকে। কারণ, এই বাবা-মাই তার অস্তিত্ব ও সততার পেছনের কাজ করে গেছেন।
তাই বিয়ের মাধ্যমে দ্বীনি সৌহার্দপূর্ণ পরিবার গঠনের উচ্চাশা লালন করা প্রয়োজন। এজন্য অনেক কিছুই করা জরুরী, তবে এর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা করছি।
প্রথমত, বিয়ে ও পরিবার গঠনের চিন্তাটা ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার মাঝে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মানে হলো, পড়াশোনা করার সময়ই ছেলে-মেয়েদের মাথায় এ চিন্তা থাকবে—বিয়ে কবে করা উচিত? পড়াশোনা ও বিয়ের মাঝে কি সমন্বয় করা সম্ভব? সমন্বয় করা গেলে কীভাবে করতে হবে? নাকি পড়াশোনা শেষ করেই বিয়ে করতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মেয়েদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মেয়েরা এমন এক বিষয়ে পড়া শুরু করে যা শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনোও উচ্চশিক্ষা শুরু করার ফলে পড়াশোনা শেষ করতে তাদের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে যায়। এসময় তাদের বিয়ের সুযোগগুলো সীমিত হয়ে যায়। এমনকি তখন তারা এমন মানুষকে বিয়ে করতে রাজি হয়, যে কিনা তার জন্য অনুপযুক্ত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, টাকা-পয়সা থাকলে বিয়ে কখনোও পড়াশোনার পথে বাঁধা হয় না। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে সময়কে যথাযথরূপে কাজে লাগাতে হবে। তাই কোনো মেয়ে যদি উচ্চমাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে যাওয়ার পর পড়াশোনা ও বিয়ের মাঝে সমন্বয় করতে না পারে, তবে তার বিয়েকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তারপর না হয় সে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, অথবা অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল।
দ্বিতীয়ত, ছেলে বা মেয়ে প্রত্যেকে যেন চরিত্র ও দ্বীনদারী খোঁজে। কারণ, এ দুটিই দাম্পত্য-জীবনকে পরিচালিত করার মৌলিক উপাদান। কিছু ছেলে বা মেয়ে আছে যারা ফরয সালাত-সাওম পালন করে, কবীরাহ গুনাহ করে না; কিন্তু তাদের আচার-ব্যবহার বেশ খারাপ। আবার কিছু ছেলে বা মেয়ে আছে যাদের আচার-আচরণ খুবই নম্র ও পছন্দনীয়; কিন্তু যারা ফরয পালন করা বা হারাম ত্যাগ করার ক্ষেত্রে খুবই উদাসীন। উভয় প্রকার ছেলে বা মেয়েই বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ, এদের মাঝে দ্বীনদারী ও উত্তম আখলাক নেই। বর্তমানে পরিবারগুলো যত সমস্যার সম্মুখীন, তার পেছনে দায়ী দ্বীনদারীর অভাব বা চারিত্রিক ত্রুটি।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচ্ছেদ ও পারিবারিক অশান্তি সম্পর্কে ধারণা থাকা। বর্তমান সময়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ও পারিবারিক সমস্যার পরিমাণ লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। এর কারণ, বিশ্বায়নের ছড়িয়ে দেওয়া সংস্কৃতি, যা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে উসকে দেয়। এ সংস্কৃতি আমিত্বকে গুরুত্ব দেয় এবং খেল-তামাশায় লিপ্ত থাকতে উৎসাহিত করে। শান্তিপূর্ণ বৈবাহিক জীবনকে স্থায়ী করার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল বাধা। তাই প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের উচিত, সেই সংস্কৃতি অর্জন করা, যা তাদেরকে একটি উত্তম পরিবারের উত্তম সদস্যে পরিণত করবে। এটি তখনই সম্ভব হবে, যখন সে বৈবাহিক জীবনের শিষ্টাচার, দায়িত্ব ও পারিবারিক সৌহার্দ্যের শর্তাবলি সঠিকভাবে জানবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সন্তান প্রতিপালনের জন্যও তাকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
যে দুজন মানুষ একে অপরকে সবচেয়ে খুশি করতে পারে, বা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে, তারা হলো স্বামী-স্ত্রী। তাই সফল পরিবার গঠনের উপায়গুলো জানা এবং তা বাস্তবায়ন করা জরুরী। উত্তম প্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করলে দ্রুত তালাকের পথ খুলে যেতে পারে।

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৫০৬৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00