📄 দেশ : পরিচয়ের সুযোগ ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত
নিজ দেশে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে নিরাপদে থাকতে পারা এক বিশাল নিয়ামত। এ নিয়ামত আল্লাহর প্রশংসাকে আবশ্যক করে দেয়। এর মর্যাদা শুধু তারাই বুঝতে পারে যাদেরকে নিজ দেশ থেকে উৎখাত করা হয়েছে, অথবা যারা এখন শরণার্থী হয়ে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। এরা সার্বক্ষণিক কষ্টে রয়েছে। সবসময় অপেক্ষায় আছে হয়তো কোনো দয়ার্দ্র হাত তাদের শূন্য পাত্রে কিছু খাবার দেবে! মুসলিম যখন নিজ দেশকে ভালোবাসে, নিজ দেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়, দেশ ও দেশের নাগরিকদের কল্যাণের জন্য কাজ করে, তখন সে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে, আমিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। ভালোবাসা ও আনুগত্য দেশের প্রতি ত্যাগের উত্তম উদাহরণ।
নাগরিকের প্রতিটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টা দেশের মান-মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় এবং সার্বিক কল্যাণে নতুন মাত্রা যোগ করে। এ কথাগুলোর মর্ম তারাই ভালোভাবে বুঝতে পারবে যারা দেশের বাইরে গিয়েছে। তারা বিভিন্ন বিমানবন্দর, কর্মক্ষেত্র, সংবাদ-মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় দেয় পাসপোর্টের মাধ্যমে। প্রত্যেক নাগরিক যেন তার দেশের মুখপাত্র। তাই দেশগঠনে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেশকে সমৃদ্ধ করে। এর থেকে তারা যেমন উপকৃত হয়, তেমনই তাদের বংশধররাও উপকৃত হতে থাকে।
মহান ব্যক্তিরা যত উঁচু মর্যাদায়-ই আসীন হন না কেন, তারা মাতৃভূমিকে কখনোও ভুলতে পারেন না। দেশের প্রতি টান তাদের মহত্ত্ব ও বিশ্বস্ততারই বহিঃপ্রকাশ।
আবান ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আবান, মক্কা
'কেমন রেখে আসলে?' তিনি বললেন, 'রেখে আসলাম এমন অবস্থায় যে, ইযখির ঘাস সজীব হয়েছে এবং সিমাম গাছে পাতা ধরেছে।' এ সব ছিল বসন্তকালে মক্কার উদ্ভিদরাজি। তার কথা শুনে শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিময় জায়গাগুলো মনে পড়ে গেল প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। তার দুচোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল।
মুসলিম তার দেশকে ভালোবাসবে তার দ্বীনের কাজ করার একটি অংশ হিসেবে। দুর্বল, অনুন্নত, বিধ্বস্ত দেশে দ্বীনের মর্যাদা উঁচু করা সম্ভব না। আমরা যদি মুসলিম উম্মাহর জাগরণ চাই, সুসংবাদ ও কল্যাণের সাথে ইসলামী পতাকার উত্থান চাই, তাহলে আমাদেরকে শক্তিশালী, সুসংহত ও সুদৃঢ় দেশ গঠন করতে হবে। যে দেশে বিরাজ করবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মমত্ববোধ। যে দেশ হবে নিরাপদ, উন্নত ও স্থিতিশীল।
দেশের সাথে আমাদের আচরণ যেন ব্যবসায়ীর মতো না হয়ে যায়। দেশ আমাকে কী দিল, তাতে আমার কতটা লাভ হলো—এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা দেশপ্রেমের পরিপন্থী। আমরা দেশের জন্য যা-কিছু করি তা তো আমাদের ঘাড়ে থাকা ঋণ পরিশোধের জন্যই! মিসরী কবি আহমাদ শাওকী যেমন বলেছেন—
| প্রত্যেক স্বাধীন ব্যক্তির রয়েছে দেশের জন্য অবধারিত ঋণ।
তাই দেশকে আমরা কতটা দিতে পারলাম সেটাই মুখ্য। সেই দেশ উত্তম যে দেশের মানুষ উত্তম। আর যে দেশে সব খারাপ মানুষের বসবাস, সে দেশ নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট।
তাই দেশগঠনে আমাদেরকে সৎ ও উত্তম নাগরিক হতে হবে। সৎ নাগরিক হলো এমন মানুষ, যে নিজ ভালোবাসা ও আবেগকে দেশের জন্য ব্যয় করে। এরই ধারাবাহিকতায় সে দেশের সেবা করে, দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। সৎ নাগরিক একটি দালানের সুন্দর ইটের মতো। একজন স্থপতি তার দেশ নামক দালানে এ ইটকে জায়গা দিতে পেরে গর্ববোধ করে।
মূল্যবোধ বজায় রেখে ও ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জন করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শক্তিশালী, স্থিতিশীল আর উৎপাদনশীল একটি স্বাধীন দেশ গঠনে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
সৎ নাগরিকের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে সমাজের চাহিদা মানতে গিয়ে স্বেচ্ছাচারিতাকে দমিয়ে রাখে। সমাজের প্রথাগুলো সে মেনে চলে এবং পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে উদ্যোগ নেয়। এধরনের মানুষ দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দেশ যখন বিপদের মুখোমুখি হয় তখন সে সমস্যা সমাধানের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, সে দেশের বোঝা হতে চায় না; বরং দেশের বিপদে ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থিত হতে চায়। আর একজন নাগরিক তখনই এ ভূমিকা রাখতে পারে, যখন সে একজন সৎ ও কর্মতৎপর ব্যক্তি হয়।
সৎ নাগরিক তার অতিরিক্ত সময়, পরিশ্রম ও অর্থ দেশের দুর্বল শ্রেণির সেবায় ব্যয় করে থাকে। তার উদাহরণ এমন এক ব্যক্তির মতো, যে নতুন নতুন বই এনে লাইব্রেরি সাজায়। আর যখন সে এ লাইব্রেরি ছেড়ে চলে যায়, তখন সেখানকার বইয়ের সংগ্রহ, সমৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
দেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো সেইসব মানুষ—যারা দেশ নিয়ে গর্ব করে, দেশের গুণগান গায় অথচ সবসময় দেশের ক্ষতি করে এবং দেশের জন্য কলঙ্কজনক কাজ করে। আমরা তাদের মতো হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
📄 জ্বলে ওঠো
জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হচ্ছে ঈমান ও হিদায়াত। এ নিয়ামতের দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। বান্দা হিসেবে আমাদের অবশ্যই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। আর এটি সম্ভব তাঁরই প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করার মাধ্যমে। ইসলামে প্রতিটি ইবাদতের উদ্দেশ্য একটিই। সেটি হলো মুসলিমের মন, আত্মা, চাল-চলনে ইবাদতের মানসিকতাকে জোরদার করা এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা। ইবাদত করার মাধ্যমে মুসলিম তার রবকে ভালোবাসবে, তাঁর কাছে চাইবে, তাঁর সামনেই কুণ্ঠিত হবে, তাঁকেই ভয় করবে। মুসলিম-মাত্রই আল্লাহর সাহচর্য অনুভবের মাধ্যমে তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনে জোর প্রচেষ্টা চালাবে, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে।
ইবাদত সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত-হাদীস এনে এর অর্থকে বড় পরিসরে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি শুধু এটাই বলব—আমরা জ্ঞান, বুদ্ধি, অর্থনীতি, চিন্তায় অনেক এগিয়ে গেলেও, জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশে পিছিয়ে রয়েছি। আর সেটা হলো—আমাদের আত্মিক শক্তি, যা আমাদেরকে স্রষ্টার সাহচর্য অনুভব করতে সহায়তা করে। আমাদের জীবনটা বেশ আধুনিক হয়ে পড়েছে, আগের চেয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে, জটিলতাও বেড়ে গেছে। তার ওপর অপসংস্কৃতির নষ্ট স্রোতে আমাদের মনের পবিত্রতা হুমকির মুখে। যে কারণে আমাদের আত্মিক শক্তি হয়ে গেছে ক্ষীণ আর দুর্বল।
আমরা ভুলে যাই যে, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে সহজেই ভয় পায়, একাকী বোধ করে। তাই তার চারপাশে নিরাপত্তার একটি বলয় থাকা প্রয়োজন। যে
বলয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে সে অজানা হুমকি ও বস্তুবাদী সভ্যতার প্রবল চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। আর আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেই এ বলয় তৈরি করা সম্ভব। তরুণ প্রজন্ম সন্দেহ-সংশয়, আর প্রবৃত্তির আহ্বানের ফলে কী পরিমাণ বিপদে আছে তা আমার অজানা নয়। আর এ কারণে-ই আমি আত্মিক দিকটাতে জোর দিচ্ছি। নিঃসন্দেহে সফলতা ও সহায়তার সুযোগ বেশ বড় ও বিস্তৃত। আমরা অনেকেই হয়তো বিখ্যাত তাবেয়ী আবু মুসলিম আল-খাওলানী রাহিমাহুল্লাহ-র কথা জানি। তিনি বলেছিলেন-
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীরা কি মনে করতেন যে, তারা আমাদেরকে ছাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলবেন? কক্ষনো না; বরং আমরা তাদের সাথে এমনভাবে ভিড় করব যে, তারা বুঝতে পারবেন, তাদের পরে তারা কিছু পুরুষ রেখে গেছেন!
আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, এ জাতির অনেক যুবক-যুবতী আবু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ-র পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। তিনি সত্যই বলেছিলেন। এ প্রজন্মের তরুণেরা প্রত্যেকেই সেই পুরুষদের মতো হতে পারবে। তারা এ জাতির সেই যুবকদের মতো হবে, যারা দ্বীনের ওপর চলে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ করে। এ পথে অগ্রসর হওয়া খুবই সহজ, সুস্পষ্ট ও সুন্দর।
আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমাদের ভবিষ্যত মহান করুণাময় আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। যত দৃঢ়ভাবে আমরা এ কথাকে নিজের মনে ধারণ করতে পারব, ততই আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হতে পারব। আমাদের সব কাজ করতে হবে মহান রবকে খুশি করার উদ্দেশ্যে। কারও দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসা, সালাম দেওয়া, ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানো, সামান্য হলেও দান করা, বাবা-মা'র হাত চুম্বন করা-এসবই আপাতদৃষ্টিতে সামান্য কিছু কাজ; কিন্তু যখন এসবের সাথে রবের সন্তুষ্টি যুক্ত হবে, তখনই তা অসামান্য রূপ ধারণ করবে।
এছাড়াও একটি বিশেষ কাজ রয়েছে-যা করলে অন্তরের মাঝে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়, তার দয়া ও অনুগ্রহ পাওয়া যায়। সে কাজটি হলো, ফজরের আগে উঠে আল্লাহর কাছে দু'আ করা, তার জন্য সালাত আদায় করা। এ কাজটি নিয়মিত করতে পারলে বিশাল সব অর্জন আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। কারণ, আল্লাহর জন্য বিনয়ী হওয়া, তার সামনে নত হওয়া, তার
কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার থেকে বড় কিছু নেই। তাঁর দয়া ও সাহায্য ছাড়া আমরা অসহায়! তাঁর প্রশংসায়, তাঁর ইবাদতে আমরা নিজেদের অসহায়ত্বকে তুলে ধরব। আর এটা হবে আমাদের অন্তর বিগলিত করার মাধ্যম।
আমাদেরকে ভাবতে হবে আল্লাহর অনুগ্রহ আর মহত্ত্ব নিয়ে। আর এ পথে যেসব শক্তি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাদেরকে শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। এভাবেই আমরা আত্মিক শক্তিকে বৃদ্ধি করতে পারব, অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে পারব, আর পাব নতুন এক জীবন।
📄 কল্যাণের চাবি যেথায় আছে
‘কল্যাণের চাবি’ কথাটির মাঝে চিন্তার খোরাক আছে। আমরা কি জানি, কল্যাণের চাবি কী? কীসের হাত ধরে কল্যাণ আসে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই হাদীসে :
إنَّ الصدق يهدى إلى البر وإنَّ البر يهدى إلى الجنَّةِ وإِنَّ الرَّجلَ ليصدقُ حَتَّى يُكتبَ صَدِّيقًا وَإِنَّ الكذب يهدى إلى الفجور وإنَّ الفجور يهدى إلى النَّارِ وإِنَّ الرَّجلَ ليكذب حتَّى يُكتبَ كَذَّابًا
সত্য কল্যাণে পথ দেখায়। কল্যাণ জান্নাতের পথ দেখায়। একজন লোক সত্য বলতে থাকে; এমনকি সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী বলে গণ্য হয়। আর মিথ্যে পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। একজন লোক মিথ্যে বলতে থাকে; এমনকি সে আল্লাহর কাছে মিথ্যুক বলে গণ্য হয়।[১]
কল্যাণ হলো সব ধরনের ভালোকাজের সমষ্টি। আর সত্যবাদী যেন কল্যাণের ধারক-বাহক! এ জাতির উত্তম ব্যক্তিদের মাঝে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্মানটা সে অর্জন করে নেয়। যে সত্যের ওপর অবিচল, সে যাবতীয় পদস্থলন থেকে নিরাপদ। তার মতো লোকেরাই সমাজের সার্বিক উপকারে আসে।
অন্যদিকে মিথ্যে মানুষের জীবনে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের ভোগবাদী মানসিকতার সুযোগ নিয়ে এখনকার বিজ্ঞাপনগুলোও দেদারসে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপন এমন এক জিনিস—যা প্রকৃতপক্ষে মানুষকে কেনাকাটা করতে
উদ্বুদ্ধ করে। পাশাপাশি মানুষ এখন নিজ সুবিধা বা স্বার্থ আদায়ের জন্য অতিমাত্রায় আগ্রহী। ফলে যে কোনো উপায়ে সর্বক্ষেত্রে সুযোগ লাভের প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে। এ অবস্থায় সত্যের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কল্যাণলাভের আশা নেই।
সত্যবাদিতার মানে হলো, সঠিক পথে অবিচল থাকা। ব্যক্তির অন্তর ও বাহির একই রকম হওয়া। সত্যবাদিতা সবসময় একজন মানুষকে তার ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে সহায়তা করে। কারণ, সত্যবাদী ব্যক্তি-মাত্রই জানে যে, ভুল-ভ্রান্তিতে জড়ালে মিথ্যের স্রোতে ভেসে যেতে হবে। তখন নিজের ভুলকে বৈধ করা ও আত্মরক্ষার জন্য মিথ্যে বলতেই হবে। তাই সত্যবাদী-মাত্রই সরল পথে চলার চেষ্টা করে।
মুসলিমজাতির প্রতিটি সদস্যের সত্যবাদী হওয়া খুব প্রয়োজন। কারণ, পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে সততাই মূল ভূমিকা রাখে। তাছাড়া আস্থা অর্জন না হলে সামাজিক অবকাঠামো ধ্বসে পড়বে। একবার আস্থা হারিয়ে ফেললে কয়েক যুগ চেষ্টা করেও তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ওদিকে মিথ্যেবাদী বেশ বড় পরিসরে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে। সে নিজের যেমন ক্ষতি করে, অন্যেরও তেমন ক্ষতি করে। সত্যবাদিতা আমাদের নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও সুস্পষ্ট জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। এ উম্মাহ্র সালাফগণ সত্যবাদিতা ও সঠিক কথার প্রতি ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মিথ্যাবাদিতা ও অশ্লীলতার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা মারাত্মক অপরাধ। এ ব্যাপারে বর্ণিত আছে-
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনিল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু কাবাঘরের চারদিকে তাওয়াফ শেষে দুই রাকাআত সালাত আদায় করলেন। এ সময় কুরাইশের এক লোক তাকে বলল, 'আপনি এত দ্রুত তাওয়াফ করলেন! এত দ্রুত সালাত আদায় করলেন, হে আবু আব্দির রহমান।' ইবনু উমার বললেন, 'তোমরা আমাদের থেকে বেশি বেশি তাওয়াফ করে থাকো, সিয়াম পালন করে থাকো; কিন্তু আমরা তোমাদের থেকে উত্তম। কেননা, আমরা সত্য বলি, আমানত রক্ষা করি আর ওয়াদা পূরণ করি।'
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম, ২৬০৭
📄 প্রান্তিকতা পরিহার করো
নিজেকে ভালোবাসা, নিজের কাজে সন্তুষ্ট হওয়া মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। যা-কিছু নিজের সাথে জড়িত তার সব নিয়েই মানুষ ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, সে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করা ও অর্থোপার্জনের ব্যাপারে খুবই উদ্যোগী। এরপরও একে অন্যের সাথে লেনদেন বা আচার-ব্যবহার করার সময় মানুষকে নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আবার মানুষ যখন বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখনও তারা সমস্যায় পড়ে। এ সমস্যাগুলোর উদ্ভব হয় সাধারণত প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে, মনের চাহিদা দমনে দুর্বল হওয়ার কারণে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্য ও সঠিক কথা বলতে এবং কাছে দূরের সবার সাথে ইনসাফ বজায় রাখতে আদেশ দিয়েছেন। এসব ব্যাপারে যেন নিন্দার ভয় আমাদের দমিয়ে রাখতে না পারে। সত্য সত্যই, ভালো ভালোই-সেটা বন্ধু করুক বা শত্রু। সত্য ও ইনসাফ কায়েম করার জন্য আমাদেরকে একটি মূলনীতি মেনে চলতে হবে। আমরা সবাই-ই আল্লাহর এ বাণীটা জানি-
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্যে দুর্ভোগ। যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সেই মহাদিবসে, যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে [১]
আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ আয়াতটি আবু জুহাইনা নামের এক লোক সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। তার এক বড় পাত্র ছিল। কেনার সময় সেটা দিয়ে মেপে নিত। আর ছোট্ট একটা পাত্র ছিল। বিক্রি করার সময় সেটা দিয়ে মেপে দিত। নিঃসন্দেহে এ ধরনের কাজ নিন্দনীয়। অনেক মানুষই কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই এ ধরনের কাজ করে থাকে।
এরকম আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক, এক কবি কোনো শাসকের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করল, প্রশংসা করতে করতে তাকে বেশ উপরে তুলল। কিছুদিন পর তার সাথে মনোমালিন্য হলো। এবার তার নিন্দা করে কবিতা লিখল। তাকে এমন খারাপ বিশেষণ দিল যে, লোকেরা বলেই ফেলল, 'আপনি কীভাবে একই লোকের এত প্রশংসা করে আবার এত নিন্দা করলেন?!'
পাঠক, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, কবি যখন সন্তুষ্ট ছিল, তখন শাসক সম্পর্কে বেশ ভালো বলল; কিন্তু যখন অসন্তুষ্ট হলো তখন আর ভালো থাকতে পারল না, সীমা ছাড়িয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলল। অথচ আমরা যাদেরকে পছন্দ করি বা ঘৃণা করি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন। তিনি বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো, এটাই আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।[১]
এ অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
فمن أحب أن يزحزح عن النار ويدخل الجنة ، فلتأته منيته وهو يؤمن بالله واليوم الآخر وليأت إلى الناس الذي يحب أن يؤتى إليه
যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন মৃত্যুর সময় আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান রাখে আর মানুষের সাথে তেমন আচরণই করে যেমন আচরণ তার সাথে হওয়াকে সে পছন্দ করে [১]
আমরা চাই অন্যেরা আমাদেরকে সঠিকভাবে বুঝুক। আমরা ভুল করে থাকলে তারা আমাদের পক্ষে অজুহাত খুঁজে নিক। আবার আমাদের মাঝে যে দোষ নেই, কেউ যেন সে দোষে আমাদের অভিযুক্ত না করে। আমরা এটাও চাই যে, আমাদের যে গুণাবলি, যে সক্ষমতা আছে সেগুলোকে যেন তারা ছোট করে না দেখে।
আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে চাই, তাহলে যেন ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে অন্যদের পাশে দাঁড়াই। কারণ, এটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় ও ইনসাফের সাক্ষ্য প্রদান করে।
এর মানে হলো, মানুষের সাথে কোনোরকম চেষ্টা ছাড়াই অনায়াসে ইনসাফ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার আল্লাহর ভয় ও নফসের সাথে যুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে নফসের সাথে যুদ্ধ প্রতিটা পথে, প্রতিটা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়াও প্রান্তিকতা এড়ানোর জন্য অবশ্যই আমাদের কথাবার্তায় বিচক্ষণ হতে হবে। তাই কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিত তা জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। যেমন-খুব সাধারণ কোনো ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সেটাকে 'চমৎকার', 'অসাধারণ' বলে অভিহিত করা অতিরঞ্জনের পর্যায়ে পড়ে। আবার মামুলি কোনো অপরাধকে যদি আমরা খুব গর্হিত হিসেবে অন্যের সামনে উপস্থাপন করি, সেটাও ইনসাফ-বহির্ভূত বলে বিবেচিত হবে। মোটকথা, আমরা বিচক্ষণতার সাথে নিজেকে এবং অন্যকে মূল্যায়ন করব।
ইনসাফ করতে হলে কেবল ধারণার মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। ব্যক্তিগত অনুমান বা সংবাদ থেকে একটা ফলাফলে চলে আসা উচিত হবে না। কেননা, এ রকম সিদ্ধান্ত এক প্রকারের গুরুদায়িত্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন-
۞ وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমান-ভিত্তিক কথাবার্তা বলে থাকে।[১]
তাই মানুষের নিয়ত বা মনের ইচ্ছে, যা আমরা জানি না, তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে চলে আসা থেকে আমরা বিরত থাকব। কারণ, এমন বিষয় আল্লাহ তাআলাই জানেন। আমরা কেবল বাহ্যিকতা দেখে বিচার করব। আর আল্লাহ অন্তরের খবর বলতে পারবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নেব কথা ও কাজের ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে নিয়তসহ যাবতীয় উহ্য বিষয়ে আল্লাহর ভয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকব, যেন কারও ব্যাপারে আমরা এমন কিছু বলে না ফেলি, যা তাদের মাঝে নেই। তাই একটু আগে উল্লিখিত হাদীসের কথা ভুলে গেলে চলবে না। সবসময় মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সাথে তেমন ব্যবহারই করা উচিত, যেমনটা আমরা নিজেরা তাদের থেকে প্রত্যাশা করি।
টিকাঃ
[১] সূরা মুতাফফিফীন, ৮৩: ০১-০৬
[১] সূরা মায়িদা, ০৫:০৮
[১] সহীহ মুসলিম, ১৮৪৪
[১] সূরা আনআম, ০৬ : ১১৬