📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সুযোগ খোঁজ

📄 সুযোগ খোঁজ


আজকাল মানুষ 'সুযোগ' শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করছে সেভাবে আগে কখনো করেননি। শব্দটির অর্থ বর্তমানে অনেকটাই পালটে গেছে। এখন এটা বলতে বরং সুযোগের আধিক্যকেই বোঝায়। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ও জীবনের বাঁকে বাঁকে পরিবর্তন আনাকে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যাতে মানুষজন উপকৃত হতে পারে। তাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা উচিত যে, যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ কাজ, সফলতা, অগ্রগতির সুযোগ অব্যাহত আছে। সুযোগগুলো অনেকটা মাছের মতো। ছোটখাট সুযোগের তুলনা দেওয়া যেতে পারে সাগর-পাড়ের অগভীর পানিতে পাওয়া ছোট মাছের সাথে; কিন্তু বড় সুযোগগুলো সেই বিশাল বড় মাছ ও মণিমুক্তোর মতো, যেগুলো পেতে হলে সমুদ্রের গভীরে অভিযান চালাতে হবে। একজন ব্যক্তি খুবই বিখ্যাত বা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী না হলে সুযোগ তার দরজায় এসে কড়া নাড়বে, এমনটা দুর্লভ। এজন্যই সদ্য স্নাতক পাশ করা ছেলে-মেয়েদের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি মেনে সুযোগ খুঁজতে হয়।
কিছু ছেলে-মেয়ে আছে যারা দশ-বিশদিন চাকরি খোঁজে। এরপর চাকরি খুঁজে না পেলে বসে বসে ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকে। নিজেদের অবস্থার জন্য অন্যদেরকে দোষারোপ করে থাকে। এটি ভালো লক্ষণ নয়। তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রতি অনেক মানুষ মুখাপেক্ষী। অনেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে তারা পড়াতে পারবে। অনেক প্রকল্প আছে যেগুলো চেষ্টা করলেই তারা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে; কিন্তু কোনো রকম সুযোগ না খুঁজলে এমন কিছুতেই অংশগ্রহণ করা যাবে না।
সুযোগের ব্যাপারে আমাদের কিছু তথ্য জেনে রাখা দরকার। এটি আল্লাহ তাআলা -প্রদত্ত রিযক। আল্লাহর কাছে যা আছে তা তার আনুগত্যের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে।
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহ চায়, সে যেন তাকে ভয় করে, তার আদেশ মেনে চলে। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন—
مَّن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে বের হবার পথ করে দেবেন, এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিস্ক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।[১]
মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক, যোগাযোগ, তাদের উপকার করা, তাদের সাথে সদাচরণ করা হচ্ছে আল্লাহকে খুশি করে এমন কিছু কাজের নমুনা। এগুলোই রিস্কের উৎস। এর প্রমাণে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। অন্যদিকে অসৎ চরিত্র, একাকিত্ব, বড়ত্বের মাঝে রয়েছে বিপরীত প্রভাব। এগুলোই সুযোগ কমিয়ে দেয়। এর পরিণতিরও অসংখ্য নমুনা আমাদের জানা।
দান-সদাকাহ করা রিষ্কের অন্যতম দরজা। এক দানশীল তার ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন—
তোমরা যখন বিপদের সম্মুখীন হবে, অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে তখন কম করে হলেও সদাকাহ করবে। কারণ, তোমরা যা ব্যয় করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ বহু গুণে প্রতিদান দেবেন, তোমাদের জীবনকে প্রশস্ত করে দেবেন।
আবার বাবা-মায়ের আনুগত্য আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাও রিষ্কের উৎস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
" مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিফ্ট বাড়িয়ে দেওয়া হোক, তার জীবন দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।[২]
সুযোগ একইসাথে পাওয়া যায় আবার কখনো পাওয়া যায় না। সুযোগ কেবল তাদের জন্য, যারা তা গ্রহণে প্রস্তুত। অন্যদিকে যারা অলস, অকর্মা ও উচ্ছৃঙ্খল তাদের সামনে কোনো সুযোগ নেই।
তাছাড়া ব্যক্তির প্রস্তুতি ও যোগ্যতা যত বেশি হবে তার প্রতি মানুষের প্রয়োজন তত বাড়বে, তাকে লোকজন তত বেশি খুঁজবে; কিন্তু তার প্রস্তুতি, যোগ্যতা ও দক্ষতা যত কম হবে, মানুষের প্রতি তার প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতা তত বৃদ্ধি পাবে। আর লোকেরা তার প্রয়োজনীয়তা তত কম অনুভব করবে।
যে ছাত্র উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তার সামনে অনেক বিভাগের দরজা খোলা থাকে। অনুরূপ যে ছাত্র ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হয়, সে গ্রাজুয়েশনের আগেই ভালো চাকরির সন্ধান পেয়ে যেতে পারে।
ধরা যাক, আমাদেরকে কোনো কাজ ছাড়া ঘরে অলস বসে থাকা অথবা বিনা বেতনে কাজ করার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়েছে। তখন আমাদের উচিত হবে বিনা বেতনে কাজ করার সুযোগ বেছে নেওয়া। কারণ, পরবর্তী সময়ে এই কাজের মাধ্যমেই বেতনসহ চাকরির খোঁজ পাওয়া যাবে। আবার এতে চাকরিদাতা অনেকের সাথে আমাদের যোগাযোগ হবে। ফলে অতিরিক্ত দক্ষতাও অর্জন করা সম্ভব হবে।
এছাড়াও সহপাঠীদের থেকে বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে থাকার চেষ্টা করা উচিত। যেমন : একটি বিদেশী ভাষা জানা, কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা, কোনো একটি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান থাকা, পেশাগত বা টেকনিক্যাল কোনো জ্ঞানে পারদর্শিতা, বিশেষ কোনো সার্টিফিকেট ইত্যাদি।
সেইসাথে উপযুক্ত কাজ না পেলে ঘরে বসে থাকা যাবে না। যে কাজ পাওয়া যাবে তা-ই গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি উপযুক্ত আরও ভালো কোনো চাকরির খোঁজ করাও জরুরী।
এছাড়াও আমাদেরকে নিজের মতামত যথাযথভাবে প্রকাশ করা শিখতে হবে। সেটা হতে পারে নিজের সিভি সুন্দরভাবে লেখার মাধ্যমে, চাকরির জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে অথবা চাকরির চুক্তি নিশ্চিতের আগে নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতা প্রদর্শন করার মাধ্যমে।
সবসময় মাথায় রাখতে হবে, একজন মানুষ তার চাকরি-জীবনের শুরুতেই উপযুক্ত চাকরি পাবে না—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু চার/পাঁচ বছর পর সমস্যা দূর হয়ে যায়, একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। তাই হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

টিকাঃ
[১] সূরা তালাক, ৬৫: ০২-০৩
[২] সহীহ বুখারী, ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, ২৫৫৭

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 যত পরিশ্রম, তত সাফল্য

📄 যত পরিশ্রম, তত সাফল্য


বর্তমান যুগ সুযোগ ও চাহিদার যুগ। এ যুগে চ্যালেঞ্জও অনেক। একজন মানুষের পক্ষে অনেককিছু অর্জনের সুযোগ এখানে রয়েছে। তবে কোনোকিছুই সে বিনামূল্যে পাবে না। এ যুগে সম্মান ও দক্ষতা কিনে নিতে হবে প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও লক্ষ্য নির্ধারণের বিনিময়ে। মানুষ অতীতে মনে করত, যে যত বেশি মুখস্থ করতে পারে সে তত জ্ঞানী। সে-ই মানুষের বেশি উপকার করতে পারবে। তাই বার বার করে পড়া ও মুখস্থ বিষয়গুলো ধারণ করাই ছিল শিক্ষার্থীদের মূল প্রচেষ্টা; কিন্তু বর্তমান অবস্থা ভিন্ন।
আমাদের প্রত্যেককে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কুরআনের কিছু আয়াত মুখস্থ করতে হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কিছু হাদীস আয়ত্ত করতে হয়েছে। পাশাপাশি ভালো গদ্য-পদ্য, বাগধারা ও প্রবচন জানতে হয়েছে। এ সবই আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। আর এর মাধ্যমে একজন মানুষ আজীবন উপকৃত হতে পারে; কিন্তু আমাদেরকে শিক্ষা অর্জনের আধুনিক পদ্ধতিগুলোর প্রতিও নজর দিতে হবে। এসব পদ্ধতির মূলনীতি হলো-একজন শিক্ষার্থী শেখার জন্য যত পরিশ্রম করবে, সে তত বেশি উপকৃত হতে পারবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি ব্যাপারে আলোকপাত করা প্রয়োজন। যেমন: শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কী বলছেন সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনা। প্রতিটি সুন্দর চিন্তা ও উপকারী উপদেশ নোট করে নেওয়া; কেননা, পরবর্তী সময়ে তা বেশ কাজে লাগে।
ক্লাসে আগ্রহী ও প্রাণবন্ত থাকা জরুরী। তা না হলে শিক্ষকের পড়ানোর সাথে তাল মিলিয়ে চলা মুশকিল।
জ্ঞানার্জনে যেমন চেষ্টা করতে হয়, তেমনই সেই জ্ঞান ধরে রাখার জন্য আরও বেশি চেষ্টার প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে যে পরিমাণে অংশগ্রহণ করে, সে পরিমাণ শিখতে পারে। আর এ অংশগ্রহণের শুরুটা হয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। তারপরের ধাপগুলো হচ্ছে তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করা, অস্পষ্ট কিছু থাকলে প্রশ্ন করা এবং শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা।
জ্ঞানার্জনের পথে আরেকটি উপকারী কৌশল হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার আগে জানা অধ্যায়গুলো আরেকবার পড়ে আসা। যে কথাগুলো সহজবোধ্য তা বোঝার চেষ্টা করা এবং যেগুলো দুর্বোধ্য সেগুলোর নিচে দাগ দিয়ে রাখা—যেন যথাসময়ে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা যায়।
এছাড়াও বাড়ির কাজ ও অনুশীলনে উৎসাহ-উদ্দীপনা বজায় রাখা প্রয়োজন। এ অনুশীলনগুলো সম্পন্ন করলে একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কারণ, এজন্য তাকে বেশ চিন্তা-ভাবনা করতে হয়।
যথাযথভাবে শিক্ষা অর্জন করতে কিছু কৌশল রপ্ত করা দরকার। যেমন: গবেষণাপত্র লেখার নিয়ম-কানুন জেনে রাখা, লেখালেখির চর্চা করা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ছোটখাট একজন গবেষক বলা যায়। একটি ছোট গবেষণাপত্র, প্রবন্ধ-নিবন্ধ বা ছোটগল্প লেখার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী লেখালেখির জগতে পা রাখে। এগুলো তাকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তোলে এবং নিজের ভেতরের সম্ভাবনাগুলো বুঝতে সহায়তা করে।
আমাদেরকে দ্রুত পড়তে শিখতে হবে। সেইসাথে সূক্ষ্মভাবে পড়াও শিখে নিতে হবে। এর মাধ্যমে বইকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানা যায় এবং সর্বোচ্চ উপকারিতা পাওয়া যায়।
স্কুল-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিষয় আমাদের পড়ানো হয়, সেগুলো বেশ বিস্তৃত পরিসরে আমাদের অনুধাবন করতে হবে। তথ্যসূত্রে উল্লেখ থাকা বইপত্রে ফিরে যাওয়া এবং ওই বিষয়ের ইতিহাসটা জেনে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা এ কাজটি করতে পারি। আমরা কোনো জ্ঞানই পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে পারব না, যদি-না এর পেছনের ইতিহাস ভালো করে জেনে না নিই।
বর্তমান যুগ বিশেষ কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের যুগ। এক কথায়, বিশেষজ্ঞ হওয়ার যুগ। তাই প্রত্যেকের উচিত, জ্ঞানের যে কোনো একটি শাখায় পারদর্শিতা
অর্জনের চেষ্টা করা, যাতে একদিন সে ওই বিষয়ে একজন পণ্ডিত বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে। এটা অসম্ভব নয় যদি ইচ্ছে থাকে আর তার মাঝে দৃঢ় প্রত্যয় কাজ করে।
এ যুগে জ্ঞান অর্জন করা এবং তথ্য আহরণ করা খুবই সহজ হয়ে গেছে; কিন্তু আমরা এ তথ্য ও জ্ঞানকে কীভাবে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, কী করে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে পারি—এটাই মূলত চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়টাতে আমাদের জানা, গবেষণা করা ও প্রচুর অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া দরকার।
এছাড়াও আমরা জ্ঞানী-গুণীদের সাহচর্যের মাধ্যমে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি। নতুন কোনো চিন্তা পেলে এমনভাবে আনন্দিত হতে পারি, যেভাবে কোনো পরিবার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে সন্তানকে ফিরে পেলে আনন্দিত হয়।
অনেকে হয়তো বলবেন, এত উপদেশ মানা সহজ না। কথা সত্য; কিন্তু সফলতা ও মর্যাদার অর্জনের পথ কি এতই সহজ? তবে সত্যি বলতে একজন অধ্যবসায়ী ছাত্র পরিশ্রম করে যতটুকু শারীরিক কষ্ট অনুভব করে, তার থেকে একজন অলস ছাত্র বহুগুণ বেশি মানসিক কষ্টে ভোগে। তাই পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে আমাদের ঘিরে রাখুন। আমীন।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 ইচ্ছেরা হোক শুদ্ধ আজি

📄 ইচ্ছেরা হোক শুদ্ধ আজি


গুণীজন বলেন-
তোমরা যদি কোনো ব্যক্তিকে গভীরভাবে জানতে চাও তাহলে তার আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও ইচ্ছেগুলোর দিকে তাকাও। সে একাকী কী নিয়ে ভাবে তা দেখো। যদি তার ভাবনাগুলো ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে, তাহলে সে ছোট। আর যদি তা জনকল্যাণ ও বড় ধরনের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে তাহলে সে বড়।
এটাকে একটি সূক্ষ্ম পরিমাপক বলা যেতে পারে। একজন মানুষ ভালো-খারাপ যা-কিছু করতে পারে, তা তার অবস্থা ও সম্ভাবনার মাঝেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে তারা যা আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে তা তাদের আত্মার সাথে সম্পৃক্ত, তা যেকোনো বাধা-বন্ধন থেকে মুক্ত। এ আশা-আকাঙ্ক্ষাই তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দেয়।
বাস্তবতা হচ্ছে, যে মুসলিম দ্বীন মেনে চলে সে হয় ভালো কোনো কাজে লেগে থাকে অথবা কোনো ভালো কাজ করার পরিকল্পনা করে। তাই তার হৃদয় সবসময় উজ্জ্বল থাকে। তার অন্তরে বিরাজ করে এক মহান প্রশান্তি। আমাদের কাছে অনেক দলীল আছে, যা থেকে বোঝা যায়-একজন মুসলিমকে ভালো ইচ্ছে পোষণ করতে হবে এবং ভালো কাজের প্রতি আগ্রহী হতে হবে।
এর মাঝে রয়েছে আল্লাহর বাণী-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
নিশ্চয় ভালো কাজসমূহ মন্দ কাজসমূহকে দূরীভূত করে দেয়।[১]
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
من هم بحسنةٍ فلم يعملها، كُتِبَت لَهُ حسَنةً ومَن همَّ بحسَنةٍ فعملها، كُتِبَت لَهُ عَشْرًا إلى سبعمائة ضعف
কোনো মুসলিম যদি ভালো কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করার পর তা না করে, তবুও তার জন্য একটি সাওয়াব লিখে দেওয়া হয়। আর যদি সে ভালো কাজের ইচ্ছে পোষণ করে এবং তা করেও থাকে তাহলে আল্লাহ তার জন্য দশ নেকী বা সাতশগুণ বৃদ্ধি করে সাওয়াব দেন।[২]
এই যে 'ইচ্ছেপোষণ', এর মানে শুধু মাথায় ইচ্ছেটি এসে আবার ক্ষণিকের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া নয়; বরং দৃঢ় ইচ্ছে, যা কর্মে অগ্রসর হতে উৎসাহ দেয়।
সৎকর্ম ও ভালো ইচ্ছে পোষণের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে এমন বার্তা আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে পাওয়া যায়, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
من أتى فراشه، وهو ينوى أن يقوم يصلى من الليل، فغلبته عيناه حتى أصبحَ كُتِبَ له ما نوى، وكان نومه صدقةً عليه من ربه، عز وجل
যে ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে শেষ রাতে উঠে সালাত আদায়ের নিয়ত করে ঘুমায়; কিন্তু ঘুমের গভীরতার কারণে সে উঠতে পারে না, সে ব্যক্তি যা নিয়ত করেছে তার সাওয়াব তাকে দিয়ে দেওয়া হয়। আর তার ঘুমটা তার রবের পক্ষ থেকে দান হিসেবে গণ্য হয়।[৩]
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যে ব্যক্তি সালাত, সিয়াম কিংবা হজ বা উমরাহ করার নিয়ত করে; কিন্তু বাধাগ্রস্ত হয়, সে যা নিয়ত করেছিল আল্লাহ তাকে তা দিয়ে দেন।
যাইদ ইবনু আসলাম রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন—
এক লোক আলিমদের কাছে ঘুরে ঘুরে বলছিল, 'কে আমাকে এমন আমল বলে দেবেন যা আমি সবসময় করতে পারব? কারণ, আমি দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর জন্য কাজ করে যেতে চাই।' তাকে উত্তর দেওয়া হলো, 'তোমার প্রয়োজন পূর্ণ করছি। তুমি যতটুকু পারো ভালো কাজ করতে থাকো। যখন ক্লান্ত হয়ে যাবে বা কাজ ছেড়ে দেবে তখন ভালো কাজের ইচ্ছে পোষণ করবে। কেননা, ভালো কাজের ইচ্ছে পোষণকারী ওই ব্যক্তির মতো, যে ভালো কাজ করে।'
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ-এর ছেলে আব্দুল্লাহ তার বাবার কাছে বলেছিলেন, 'বাবা, আমাকে উপদেশ দিন।' জবাবে তিনি বললেন, 'ছেলে আমার, তুমি ভালো কাজের ইচ্ছে পোষণ করবে। মনে রেখো, যতদিন তুমি ভালো কাজের ইচ্ছে পোষণ করবে ততদিন তুমি ভালোই আছ।'
ভালো মানুষেরা জনকল্যাণমূলক কাজ করতে পছন্দ করেন। তারা অন্য মানুষকেও সুখী দেখতে চান। ভালো কাজের আগ্রহ ও ইচ্ছে যে তাদের আছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, তারা সবসময় ভালো কাজে রত থাকেন। যখন পরিবেশ পরিস্থিতি তাদেরকে ভালো কাজ করতে বাধা দেয়, তখন তারা নিজেদের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ভালোতে রূপান্তরিত করেন। তারপর সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন—কখন নিজেদের ইচ্ছেগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
জনকল্যাণের মাধ্যমে যারা উপকৃত হয় তারা প্রকৃত লাভবান নয়; বরং যারা করছে তারা বেশি লাভবান। কারণ, দুনিয়ার কোনো প্রাপ্তিই আল্লাহর দেওয়া সাওয়াবের সমান হতে পারে না।
আমাদের নিয়তই যেন হয় আমাদের পরিমাপক। এর মাধ্যমে আমরা নিজ ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাব এবং কোন মূল্যবোধে বিশ্বাসী—তা নির্ণয় করতে পারব। আমরা বুঝতে পারব যে, পরিবার, দেশ ও মানুষের কল্যাণে আমরা কতটা আগ্রহী।
এজন্য দৈনিক একটি করে ছোটখাটো কল্যাণমূলক কাজ করা যেতে পারে। যেমন :
এক টাকা দান করা, অন্তত একজন বন্ধুর বা প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেওয়া কিংবা সাধারণ মানুষকে উপদেশ দেওয়া। আবার অজ্ঞকে শেখানো, বন্ধুকে পড়াশোনায় সাহায্য করা, অন্যকে আগে সালাম দেওয়া ইত্যাদি কাজও ছোট ছোট ভালো কাজের উদাহরণ।
আমরা কী কী ভালো কাজ করছি আর কী কী ভালো কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করছি তা তুলনা করে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ইচ্ছের পাল্লা যেন ভারী থাকে। ভালো ইচ্ছেপোষণ খারাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকের কাজ করে। শুধু তাই নয়, এটি আমাদেরকে আমিত্বের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া থেকেও বাঁচায়।
এছাড়াও নিজেদের ইচ্ছেগুলো নিয়ে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে কথাবার্তা বলা দরকার। তাদের পরামর্শ ও সাহায্য আমাদের কাজ সহজ করে দিতে পারে।

টিকাঃ
[১] সূরা হুদ, ১১ : ১১৪
[২] সহীহ মুসলিম, ১৩০
[৩] সুনান নাসায়ী, ১৭৮৭, সুনান ইবনু মাজাহ, ১৩৪৪

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 দেশ : পরিচয়ের সুযোগ ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত

📄 দেশ : পরিচয়ের সুযোগ ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত


নিজ দেশে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে নিরাপদে থাকতে পারা এক বিশাল নিয়ামত। এ নিয়ামত আল্লাহর প্রশংসাকে আবশ্যক করে দেয়। এর মর্যাদা শুধু তারাই বুঝতে পারে যাদেরকে নিজ দেশ থেকে উৎখাত করা হয়েছে, অথবা যারা এখন শরণার্থী হয়ে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। এরা সার্বক্ষণিক কষ্টে রয়েছে। সবসময় অপেক্ষায় আছে হয়তো কোনো দয়ার্দ্র হাত তাদের শূন্য পাত্রে কিছু খাবার দেবে! মুসলিম যখন নিজ দেশকে ভালোবাসে, নিজ দেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়, দেশ ও দেশের নাগরিকদের কল্যাণের জন্য কাজ করে, তখন সে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে, আমিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। ভালোবাসা ও আনুগত্য দেশের প্রতি ত্যাগের উত্তম উদাহরণ।
নাগরিকের প্রতিটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টা দেশের মান-মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় এবং সার্বিক কল্যাণে নতুন মাত্রা যোগ করে। এ কথাগুলোর মর্ম তারাই ভালোভাবে বুঝতে পারবে যারা দেশের বাইরে গিয়েছে। তারা বিভিন্ন বিমানবন্দর, কর্মক্ষেত্র, সংবাদ-মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় দেয় পাসপোর্টের মাধ্যমে। প্রত্যেক নাগরিক যেন তার দেশের মুখপাত্র। তাই দেশগঠনে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেশকে সমৃদ্ধ করে। এর থেকে তারা যেমন উপকৃত হয়, তেমনই তাদের বংশধররাও উপকৃত হতে থাকে।
মহান ব্যক্তিরা যত উঁচু মর্যাদায়-ই আসীন হন না কেন, তারা মাতৃভূমিকে কখনোও ভুলতে পারেন না। দেশের প্রতি টান তাদের মহত্ত্ব ও বিশ্বস্ততারই বহিঃপ্রকাশ।
আবান ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আবান, মক্কা
'কেমন রেখে আসলে?' তিনি বললেন, 'রেখে আসলাম এমন অবস্থায় যে, ইযখির ঘাস সজীব হয়েছে এবং সিমাম গাছে পাতা ধরেছে।' এ সব ছিল বসন্তকালে মক্কার উদ্ভিদরাজি। তার কথা শুনে শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিময় জায়গাগুলো মনে পড়ে গেল প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। তার দুচোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল।
মুসলিম তার দেশকে ভালোবাসবে তার দ্বীনের কাজ করার একটি অংশ হিসেবে। দুর্বল, অনুন্নত, বিধ্বস্ত দেশে দ্বীনের মর্যাদা উঁচু করা সম্ভব না। আমরা যদি মুসলিম উম্মাহর জাগরণ চাই, সুসংবাদ ও কল্যাণের সাথে ইসলামী পতাকার উত্থান চাই, তাহলে আমাদেরকে শক্তিশালী, সুসংহত ও সুদৃঢ় দেশ গঠন করতে হবে। যে দেশে বিরাজ করবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মমত্ববোধ। যে দেশ হবে নিরাপদ, উন্নত ও স্থিতিশীল।
দেশের সাথে আমাদের আচরণ যেন ব্যবসায়ীর মতো না হয়ে যায়। দেশ আমাকে কী দিল, তাতে আমার কতটা লাভ হলো—এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা দেশপ্রেমের পরিপন্থী। আমরা দেশের জন্য যা-কিছু করি তা তো আমাদের ঘাড়ে থাকা ঋণ পরিশোধের জন্যই! মিসরী কবি আহমাদ শাওকী যেমন বলেছেন—
| প্রত্যেক স্বাধীন ব্যক্তির রয়েছে দেশের জন্য অবধারিত ঋণ।
তাই দেশকে আমরা কতটা দিতে পারলাম সেটাই মুখ্য। সেই দেশ উত্তম যে দেশের মানুষ উত্তম। আর যে দেশে সব খারাপ মানুষের বসবাস, সে দেশ নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট।
তাই দেশগঠনে আমাদেরকে সৎ ও উত্তম নাগরিক হতে হবে। সৎ নাগরিক হলো এমন মানুষ, যে নিজ ভালোবাসা ও আবেগকে দেশের জন্য ব্যয় করে। এরই ধারাবাহিকতায় সে দেশের সেবা করে, দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। সৎ নাগরিক একটি দালানের সুন্দর ইটের মতো। একজন স্থপতি তার দেশ নামক দালানে এ ইটকে জায়গা দিতে পেরে গর্ববোধ করে।
মূল্যবোধ বজায় রেখে ও ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জন করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শক্তিশালী, স্থিতিশীল আর উৎপাদনশীল একটি স্বাধীন দেশ গঠনে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
সৎ নাগরিকের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে সমাজের চাহিদা মানতে গিয়ে স্বেচ্ছাচারিতাকে দমিয়ে রাখে। সমাজের প্রথাগুলো সে মেনে চলে এবং পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে উদ্যোগ নেয়। এধরনের মানুষ দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দেশ যখন বিপদের মুখোমুখি হয় তখন সে সমস্যা সমাধানের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, সে দেশের বোঝা হতে চায় না; বরং দেশের বিপদে ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থিত হতে চায়। আর একজন নাগরিক তখনই এ ভূমিকা রাখতে পারে, যখন সে একজন সৎ ও কর্মতৎপর ব্যক্তি হয়।
সৎ নাগরিক তার অতিরিক্ত সময়, পরিশ্রম ও অর্থ দেশের দুর্বল শ্রেণির সেবায় ব্যয় করে থাকে। তার উদাহরণ এমন এক ব্যক্তির মতো, যে নতুন নতুন বই এনে লাইব্রেরি সাজায়। আর যখন সে এ লাইব্রেরি ছেড়ে চলে যায়, তখন সেখানকার বইয়ের সংগ্রহ, সমৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
দেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো সেইসব মানুষ—যারা দেশ নিয়ে গর্ব করে, দেশের গুণগান গায় অথচ সবসময় দেশের ক্ষতি করে এবং দেশের জন্য কলঙ্কজনক কাজ করে। আমরা তাদের মতো হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00