📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 ভিন্নমতে শ্রদ্ধা

📄 ভিন্নমতে শ্রদ্ধা


একমত হয়ে মিলেমিশে থাকতে চাওয়াটা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। অন্যের সাথে মতভেদ হলেই আমাদের মনে অস্বস্তির উদ্রেক ঘটে। মাঝেমাঝে বড়মাপের সংঘর্ষও ঘটে যায়। মানুষ যেভাবে অন্যদেরকে নিজের মতের অনুসারী করতে চায়, তেমনই অন্যরাও তার কাছ থেকে একইরকম আশা করে। দুঃখজনকভাবে এ কথা সবাই ভুলে যায়।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যে যুগে সব কিছুর ক্ষেত্রই বিস্তৃত। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের জানাশোনার পরিসরটা বেশ বড়। তাই মতভেদের জায়গাটাও আর অতীতের মতো সংকীর্ণ নেই। এ কারণে আমাদেরকে মতভিন্নতা ও ঐকমত্যের বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে।
সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর সুনির্ধারিত সুন্নাহসমূহের একটি হলো মতভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। এটা আমরা আল্লাহর বাণী থেকে বুঝতে পারি :
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ
তার নিদর্শনসমূহের মাঝে রয়েছে আসমান-যমীন সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও রঙের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।[১]
তিনি আরও বলেন-
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
আর আপনার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই সব মানুষকে একই জাতি-তে পরিণত করতে পারতেন; আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্তও হতো না। অবশ্য আপনার পালনকর্তা যাদের ওপর রহমত করেছেন, তারা ব্যতীত সকলেই মতভেদ করতে থাকবে। এবং তিনি এজন্যই তাদের সৃষ্টি করেছেন। [১]
কিছু আলিম 'আর এ জন্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন' এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, অনুগ্রহ ও মতভেদের জন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন; আবার বান্দাদের মাঝে মতভেদও আল্লাহর অনুমতিতেই হয়। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদীস রয়েছে—
تجدون الناس كابل مائة لا يجد الرجل فيها راحلةً
মানুষ হলো এমন একশোটা উটের ন্যায়, যেখান থেকে একজন লোক একটা উটকেও উপযুক্ত বাহনরূপে খুঁজে পায় না।[৩]
একজন লোকের একশ উট থাকতে পারে; কিন্তু সেই উটগুলোর মাঝে একটাও সে আরোহণের উপযোগী বা ভ্রমণের উপযুক্ত পাবে না। কেননা, এমন কোনো উট নেই, যার মাঝে সকল গুণের সমাবেশ ঘটবে। তাই আমরা যদি নিজ বন্ধুদের মাঝে একশ বা দুইশজনও খুঁজি, তবু একজন মানুষও পাব না-যে চিন্তা-চেতনা বা মতাদর্শে একদম আমাদের মনের মতো হবে।
আমাদের চেহারা যেমন ভিন্ন, তেমনই আমাদের চিন্তা-চেতনা বা মানসিকতাও ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন দুজন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে, যাদের চেহারা পুরোপুরি এক। তবে বাহ্যিকভাবে প্রতিটা মুখেই গাল, দুটি চোখ, দুটি ভ্রু, কপাল, নাক, মুখ ও চিবুক থাকে। তাই মানুষের মাঝে কিছু বিষয় এক থাকলেও ছোট ছোট কিছু পার্থক্য থাকবেই। বাহ্যিক অবস্থা গ্রহণ করে এ পার্থক্য আমাদের মেনে নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন মানসিকতা দান করেছেন। কেউ আশাবাদী, কেউ নৈরাশ্যবাদী। কেউ আবার ধৈর্যশীল ও সহনশীল। অন্যদিকে কেউ আছে প্রচণ্ড রাগী, বদমেজাজী ও সংকীর্ণমনা। এ কারণে-ই কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে ঝগড়া-বচসা হয়ে থাকে। আবার কিছু মানুষ এমন পরিবারে বড় হয়েছে, যে পরিবারে শুধু সুখ-শান্তি আর আরাম। তাই তারা মনে করে জীবন তো আরামেরই, এ জীবনে সবাই ভালো মানুষ! আবার কিছু মানুষ আছে দুঃখ-কষ্টে বড় হয়েছে। বাবার অত্যাচার, সৎমা বা সৎবাবার বাজে ব্যবহার তার নিত্যসঙ্গী ছিল। তাই সমাজের দিকে তারা এক কালো চশমা পরে তাকায়। সে যাকেই দেখে, তার ব্যাপারে শুধু খারাপ ধারণাই করে।
এজন্য সবকিছুকে নিজের অবস্থান দিয়ে বিচার করা যাবে না। প্রত্যেক ব্যক্তির প্রশংসনীয় ও নিন্দনীয় দিক আছে। প্রত্যেকেরই ঠিক-বেঠিক দিক আছে। অপরের মতামত, অবস্থা ও কথার পটভূমি বোঝার চেষ্টা করা জরুরী। সম্ভব হলে তাদের জন্য উপযুক্ত অজুহাত তৈরি করে ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম।
মতভেদ হলো বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির মাধ্যম। মৌলিক বিষয়ে না হলে এটা এমন কিছু না-যা মুসলিমজাতিকে একেবারে দুর্বল করে দেবে বা এর শুভ্র পোশাককে কলঙ্কিত করবে। কারণ, আমরা যদি মূল বিষয়গুলোতে এক থাকি, তাহলে শাখাগত বিষয়ে মতভেদ আমাদের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। এরকম শাখাগত বিষয়ে মতভেদ সাহাবীদের মধ্যেও ছিল। ইসলামের প্রথমদিকের শ্রেষ্ঠ তিন যুগে ছিল; কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো, এই মতভেদ যেন আমাদের মধ্যকার মৌলিক ঐক্যকে ধ্বংস করে না দেয়। আর মতভেদ থাকার কারণে কাউকে আমরা যেন খারাপ না জানি।
যখন কোনো ব্যাপার অকাট্য সত্য না হয় এবং গবেষণার সুযোগ থাকে, তখন অধিকাংশের মতই সাধারণত সঠিক হিসেবে বিবেচিত হয়; কিন্তু যখন অকাট্য বিষয়ে মানুষ মতভেদ করে, তখন যার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে, সে-ই সঠিক
পথে আছে। এটিই ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বোঝাতে চেয়েছেন—
GG الجماعة ما وافق الحق؛ ولو كنت وحدك
যা-কিছু সত্যের অনুকূলে তাই জামাআহ, যদিও সেই সত্যের অনুসারী তুমি একাই হও না কেন [১]
অর্থাৎ যদি কোনো গ্রামে শুধু একজন লোকই সালাত আদায় করে তাহলে সেই লোকটিই ইসলামী জামাআহ। সে গ্রামের বাকি সবাইকে তার মতের দিকেই ফিরতে হবে।
সহনশীলতা বাড়ানোর একটি উপায় হলো, অপরের দোষ না খুঁজে, নিজের দোষ খুঁজে বের করা। অন্যের প্রতি সহনশীল হতে পারলেই আমরা মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার ইচ্ছে পোষণ করতে পারব, গঠনমূলক আলোচনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারব।

টিকাঃ
[১] সূরা রুম, ৩০ : ২২
[১] সূরা হুদ, ১১: ১১৮-১১৯
[২] এ কথার দ্বারা বান্দাদেরকে কখনোই মতভেদে লিপ্ত হতে আদেশ বা উৎসাহ দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; এখানে মূলত মানবসমাজে মতভেদ হওয়াটা যে স্বাভাবিক বিষয়-তা বোঝানো হয়েছে। আর এটিও বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ ইচ্ছে করলেই এসব মতভেদ শতভাগ দূর করতে পারবে না। - সম্পাদক।
[৩] সহীহ বুখারী, ৬৪৯৮; সহীহ মুসলিম, ২৫৪৭; শব্দ মুসলিমের বর্ণনার।
[১] শরহু উসূলি ই'তিকদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, খণ্ড: ০১; পৃষ্ঠা: ১২২

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 বিনোদনও জীবনের অংশ

📄 বিনোদনও জীবনের অংশ


সভ্যতার অগ্রগতির দিক থেকে মুসলিমজাতি পিছিয়ে আছে। এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদেরকে দৃঢ় ও কঠোর হতে হবে। অপরদিকে অতিরিক্ত দৃঢ়তা ও কঠোরতা থেকে বেঁচে থাকাও ভীষণ জরুরী। কারণ, এর থেকে বঞ্চনা ও বিপদের সৃষ্টি হয়। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত পরিশ্রম করে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে চায়, সে যদি চারপাশের সুন্দর দৃশ্যগুলো উপভোগ করে তাতে ক্ষতি কী? যে শিকারী রিস্কের অন্বেষণে বের হয়, সে সমুদ্রের প্রশান্ত ঢেউ দেখলে তাতে দোষ কী? বরং চারপাশের সৌন্দর্য দেখে আল্লাহর স্মরণে মন বিগলিত হতে পারে। সামান্য হাসি-ঠাট্টা, বাচ্চাদের দুষ্টুমি ও বিনোদন জীবনে নতুন স্বাদ এনে দেয়। জীবনে ক্লান্তির পরিমাণও কমিয়ে দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, মহত্ত্ব, আল্লাহভীতি ও উচ্চাশার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তার সাহাবীদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করতেন। তিনিই তো বলেছেন—
لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ
তুমি কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না, যদিও তা হয় হাসিমুখে তোমার ভাইয়ের সাথে দেখা করা।[১]
আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
“ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক মুচকি হাসি দিতে আর কাউকে দেখিনি।[১]
তিনি সুসংবাদ শুনলেই খুশি হয়ে যেতেন। তার মুখে হাসি ফুটত। তার এক সাহাবী বলেন—
“ كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سُرَّ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ، حَتَّى كَأَنَّهُ قِطْعَةُ قَمَرٍ، وَكُنَّا نَعْرِفُ ذَلِكَ مِنْهُ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি হলে তার চেহারা আলোকিত হয়ে যেত। মনে হতো তার চেহারাটা যেন চাঁদের টুকরো। তিনি খুশি হলে আমরা তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই তা বুঝতে পারতাম।[২]
আমাদেরকে মন থেকে হাসতে হবে। কিছু হাসি-ঠাট্টা, বিনোদন, খেলাধুলার মাধ্যমে মনের অবসাদ দূর হয়, বিরক্তি ও একঘেয়েমি দূর হয়। সুখ-শান্তির জন্য এ দুটোর প্রয়োজন আছে। তবে এর সবকিছুই হতে হবে শরীয়তের গণ্ডির ভেতরে, মধ্যপন্থা অনুসারে। গাড়ি চালানোর জন্য যেমন জ্বালানীশক্তির প্রয়োজন হয়, তেমনই মানুষেরও সামনের দিকে এগিয়ে চলার জন্য আত্মিকশক্তির প্রয়োজন। এ শক্তি তাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। উত্তম আশা পোষণ করা, হাসিমুখে থাকা, মজাদার কথাবার্তা বলা—এগুলো আত্মিক শক্তিকে বৃদ্ধি করে।
তাই বিনোদনকে আমরা বিরক্তি ও একঘেয়েমির বিরুদ্ধে ঢাল বানিয়ে নেব, বিবেক ও আত্মা সংরক্ষণের মাধ্যম করে তুলব। এক মনীষী বলেন—
| তুমি কখনো হাসি আর বিরক্তিকে একত্র করতে পারবে না।
তবে এই দুটোর ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থা মেনে চলতে হবে। ভদ্র-কৌতুক অন্তরের গভীরে প্রভাব ফেলে। কেউ যখন এমন কৌতুক শুনে হাসে, সে হাসিতে তখন
কৌতুককারীর জন্য কৃতজ্ঞতাও মিশ্রিত থাকে।
আমরা ছোট শিশুদের থেকে হাসা শিখতে পারি। তারা খুব সহজেই যে কোনো বিষয়ে হাসতে পারে।
হাসি-ঠাট্টা আর বিনোদনের মাধ্যমে অহংকার দূর হয়, কৃত্রিম ব্যক্তিত্ববোধ, আর গাম্ভীর্য থেকে বাঁচা যায়। কোনো এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন-
যে ব্যক্তির মাঝে কোনো রসকষ নেই সে যেন একটা বাম্পার ছাড়া গাড়ির মতো। এ গাড়ি রাস্তায় সামান্য নুড়ি পাথরের সাথে ধাক্কা খেলেও ভয়াবহরূপে নড়ে ওঠে।
তাই জীবনের প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে হলেও বিনোদনের প্রয়োজন। বন্ধুদের সাথে মাঝেমাঝেই নিজেদের জীবনে ঘটা কিছু মজাদার গল্প-গুজব করা যেতে পারে। এটাও এক ধরনের বিনোদন। মানুষ হাসিখুশী লোককে পছন্দ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, হাসি-ঠাট্টা করতে গিয়ে আমরা যেন অন্যকে আঘাত না দিয়ে ফেলি, মিথ্যাচার ও গীবত না করে ফেলি কিংবা এমন কিছু করে না ফেলি-যা ইসলাম অনুমোদন করে না।
কোনো কিছু অর্জন করলে বা আনুগত্যের কাজ করতে পারলে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। এতে মনের একঘেয়েমি দূর হয়। তবে এক্ষেত্রে আল্লাহ যে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, সেজন্য তাঁর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে যেন ভুলে না যাই।

টিকাঃ
[১] সহীহ মুসলিম, ২৬২৬
[১] জামি তিরমিযী, ৩৬৪১; হাদীসটি হাসান গারীব
[২] সহীহ বুখারী, ৩৫৫৬; সহীহ মুসলিম, ২৭৬৯

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সর্বদা সত্য খোঁজ

📄 সর্বদা সত্য খোঁজ


একজন ব্যক্তি কতটা মহৎ তা বোঝা যায় তার বিশ্বাস, ত্যাগ ও অন্যায়ের বিপরীতে অটল থাকার গুণ দেখে। আমাদের দ্বীন সর্বদা সত্যের মর্যাদা দিতে এবং বাস্তবতাকে মেনে নিতে শেখায়। এ দ্বীন আমাদেরকে শেখায় বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ি না করেও স্বাভাবিকভাবে কোনোকিছুকে গ্রহণ করা সম্ভব। আল্লাহ নিজেই সত্য এবং সকল সত্যের উৎস। তাই তিনি তাঁর নিজের গুণবাচক নামই রেখেছেন 'আল-হাক্ক', যার অর্থই হচ্ছে সত্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সত্য নিয়ে এসেছেন। এই সত্যের ভিত্তিতেই আসমান-যমীন সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই সত্যের মর্যাদা এবং সত্যকে সহায়তা করার একটি প্রাথমিক অংশ হলো, আমরা যা-কিছু শুনি বা পড়ি তার সত্যতা যাচাই করা।
আজকাল আমরা টিভিতে খবর দেখি, ইন্টারনেটে বিভিন্ন লেখা পড়ি। এর মধ্যে অনেক কিছুই আছে যেগুলোর সূত্র অজ্ঞাত। একইভাবে অনেক অজ্ঞাতনামা বই বা এমন সন্দেহজনক সূত্র থেকে বর্ণিত বিষয় আছে, যা আমাদের যাচাই করার উপায় নেই। ব্যাপারটা এমন নয় যে, যা-কিছু শুনছি বা পড়ছি তার সবটাই বিশ্বাস করে নিতে হবে, প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যে প্রচারের অংশীদার না হয়ে যাই। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ nādímīn
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কাছে যদি একজন ফাসেক কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা নিরীক্ষণ করবে এ আশংকায় যে তোমরা অজ্ঞাতসারে কোনো সম্প্রদায়কে আক্রান্ত করবে। ফলে তোমরা যা করলে তা নিয়ে আফসোস করবে।[১]
আল্লাহ সুবহানাহু আরও বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَياةِ الدُّنْيَا
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় বের হলে পরীক্ষা করে দেখবে। যে তোমাদেরকে সালাম দেয় তাকে তোমরা বলবে না- 'তুমি মুমিন নও'। (এর দ্বারা) তোমরা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্যবস্তু চেয়ে থাকো। [২]
এ আয়াতটি মুমিনদেরকে যুদ্ধে বের হলে দ্রুত হত্যায় লিপ্ত হতে নিষেধ করে, যতক্ষণ না কাফের থেকে মুমিন আলাদা করা যায়।
তাই আমরা যা-ই শুনব তা-ই অবিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করব। এটাই আমাদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। আমরা সব ব্যাপারে প্রশ্ন তুলব, মাথা খাটাব। সব খবর মানুষের কাছে প্রচার করা থেকে বিরত থাকব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG كفى بالمرء كذبًا أن يُحَدِّثَ بكل ما سمع
কারও মিথ্যেবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বর্ণনা করে।[৩]
সবসময় নিজেদের কথার উৎস খোঁজা উচিত। কথাটা কারা বর্ণনা করল তা জানার চেষ্টা চালানো উচিত। তারা কি সত্যবাদী? তারা কি বিশ্বস্ত?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা যা শুনে থাকি, তার চাইতে যা দেখি তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
কোনো সংবাদ যদি অনেক মানুষের হাত ঘুরে আমাদের কাছে আসে, তবে তা ভুল হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। কারণ, মৌখিক বর্ণনা পুরোপুরি নিখুঁত হয় না। এটি অসংখ্য গবেষণা ও ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত। মৌখিক বর্ণনার ক্ষেত্রে লোকেরা নিজেদের বুঝ, ইচ্ছে ও রুচি অনুসারে বাড়িয়ে বলে থাকে। তাই আমরা যা শুনব, তা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করে নেব না। শোনা কথার প্রতিটা শব্দই পুরোপুরি বিশ্বাস করব না।
কোনো সংবাদে যদি অজানা কিছু বা অদ্ভুত কোনো ব্যাপার থাকে, তবে তার সত্যতা নিয়ে গবেষণা করা আমাদের জন্য আবশ্যক হয়ে যায়। কারণ, এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে, বাড়িয়ে বলা হয়েছে কিংবা মিথ্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুর আসল আকৃতি, ঠিক-বেঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝা সম্ভব না, যতক্ষণ না তা শেষ হচ্ছে। তাই বক্তার কথা বা লেখকের লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই কাম্য। কারণ, সে তার বক্তব্য কয়েক পর্বে বলে বা লিখে প্রকাশ করতে পারে।

টিকাঃ
[১] সূরা হুজরাত, ৪৯:০৬
[২] সূরা নিসা, ০৪: ৯৪
[৩] সহীহ মুসলিম-এর ভূমিকাতে ইমাম মুসলিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সুযোগ খোঁজ

📄 সুযোগ খোঁজ


আজকাল মানুষ 'সুযোগ' শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করছে সেভাবে আগে কখনো করেননি। শব্দটির অর্থ বর্তমানে অনেকটাই পালটে গেছে। এখন এটা বলতে বরং সুযোগের আধিক্যকেই বোঝায়। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ও জীবনের বাঁকে বাঁকে পরিবর্তন আনাকে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যাতে মানুষজন উপকৃত হতে পারে। তাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা উচিত যে, যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ কাজ, সফলতা, অগ্রগতির সুযোগ অব্যাহত আছে। সুযোগগুলো অনেকটা মাছের মতো। ছোটখাট সুযোগের তুলনা দেওয়া যেতে পারে সাগর-পাড়ের অগভীর পানিতে পাওয়া ছোট মাছের সাথে; কিন্তু বড় সুযোগগুলো সেই বিশাল বড় মাছ ও মণিমুক্তোর মতো, যেগুলো পেতে হলে সমুদ্রের গভীরে অভিযান চালাতে হবে। একজন ব্যক্তি খুবই বিখ্যাত বা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী না হলে সুযোগ তার দরজায় এসে কড়া নাড়বে, এমনটা দুর্লভ। এজন্যই সদ্য স্নাতক পাশ করা ছেলে-মেয়েদের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি মেনে সুযোগ খুঁজতে হয়।
কিছু ছেলে-মেয়ে আছে যারা দশ-বিশদিন চাকরি খোঁজে। এরপর চাকরি খুঁজে না পেলে বসে বসে ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকে। নিজেদের অবস্থার জন্য অন্যদেরকে দোষারোপ করে থাকে। এটি ভালো লক্ষণ নয়। তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রতি অনেক মানুষ মুখাপেক্ষী। অনেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে তারা পড়াতে পারবে। অনেক প্রকল্প আছে যেগুলো চেষ্টা করলেই তারা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে; কিন্তু কোনো রকম সুযোগ না খুঁজলে এমন কিছুতেই অংশগ্রহণ করা যাবে না।
সুযোগের ব্যাপারে আমাদের কিছু তথ্য জেনে রাখা দরকার। এটি আল্লাহ তাআলা -প্রদত্ত রিযক। আল্লাহর কাছে যা আছে তা তার আনুগত্যের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে।
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহ চায়, সে যেন তাকে ভয় করে, তার আদেশ মেনে চলে। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন—
مَّن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে বের হবার পথ করে দেবেন, এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিস্ক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।[১]
মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক, যোগাযোগ, তাদের উপকার করা, তাদের সাথে সদাচরণ করা হচ্ছে আল্লাহকে খুশি করে এমন কিছু কাজের নমুনা। এগুলোই রিস্কের উৎস। এর প্রমাণে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। অন্যদিকে অসৎ চরিত্র, একাকিত্ব, বড়ত্বের মাঝে রয়েছে বিপরীত প্রভাব। এগুলোই সুযোগ কমিয়ে দেয়। এর পরিণতিরও অসংখ্য নমুনা আমাদের জানা।
দান-সদাকাহ করা রিষ্কের অন্যতম দরজা। এক দানশীল তার ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন—
তোমরা যখন বিপদের সম্মুখীন হবে, অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে তখন কম করে হলেও সদাকাহ করবে। কারণ, তোমরা যা ব্যয় করবে তার বিনিময়ে আল্লাহ বহু গুণে প্রতিদান দেবেন, তোমাদের জীবনকে প্রশস্ত করে দেবেন।
আবার বাবা-মায়ের আনুগত্য আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাও রিষ্কের উৎস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
" مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিফ্ট বাড়িয়ে দেওয়া হোক, তার জীবন দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।[২]
সুযোগ একইসাথে পাওয়া যায় আবার কখনো পাওয়া যায় না। সুযোগ কেবল তাদের জন্য, যারা তা গ্রহণে প্রস্তুত। অন্যদিকে যারা অলস, অকর্মা ও উচ্ছৃঙ্খল তাদের সামনে কোনো সুযোগ নেই।
তাছাড়া ব্যক্তির প্রস্তুতি ও যোগ্যতা যত বেশি হবে তার প্রতি মানুষের প্রয়োজন তত বাড়বে, তাকে লোকজন তত বেশি খুঁজবে; কিন্তু তার প্রস্তুতি, যোগ্যতা ও দক্ষতা যত কম হবে, মানুষের প্রতি তার প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতা তত বৃদ্ধি পাবে। আর লোকেরা তার প্রয়োজনীয়তা তত কম অনুভব করবে।
যে ছাত্র উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তার সামনে অনেক বিভাগের দরজা খোলা থাকে। অনুরূপ যে ছাত্র ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হয়, সে গ্রাজুয়েশনের আগেই ভালো চাকরির সন্ধান পেয়ে যেতে পারে।
ধরা যাক, আমাদেরকে কোনো কাজ ছাড়া ঘরে অলস বসে থাকা অথবা বিনা বেতনে কাজ করার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়েছে। তখন আমাদের উচিত হবে বিনা বেতনে কাজ করার সুযোগ বেছে নেওয়া। কারণ, পরবর্তী সময়ে এই কাজের মাধ্যমেই বেতনসহ চাকরির খোঁজ পাওয়া যাবে। আবার এতে চাকরিদাতা অনেকের সাথে আমাদের যোগাযোগ হবে। ফলে অতিরিক্ত দক্ষতাও অর্জন করা সম্ভব হবে।
এছাড়াও সহপাঠীদের থেকে বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে থাকার চেষ্টা করা উচিত। যেমন : একটি বিদেশী ভাষা জানা, কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা, কোনো একটি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান থাকা, পেশাগত বা টেকনিক্যাল কোনো জ্ঞানে পারদর্শিতা, বিশেষ কোনো সার্টিফিকেট ইত্যাদি।
সেইসাথে উপযুক্ত কাজ না পেলে ঘরে বসে থাকা যাবে না। যে কাজ পাওয়া যাবে তা-ই গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি উপযুক্ত আরও ভালো কোনো চাকরির খোঁজ করাও জরুরী।
এছাড়াও আমাদেরকে নিজের মতামত যথাযথভাবে প্রকাশ করা শিখতে হবে। সেটা হতে পারে নিজের সিভি সুন্দরভাবে লেখার মাধ্যমে, চাকরির জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে অথবা চাকরির চুক্তি নিশ্চিতের আগে নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতা প্রদর্শন করার মাধ্যমে।
সবসময় মাথায় রাখতে হবে, একজন মানুষ তার চাকরি-জীবনের শুরুতেই উপযুক্ত চাকরি পাবে না—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু চার/পাঁচ বছর পর সমস্যা দূর হয়ে যায়, একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। তাই হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

টিকাঃ
[১] সূরা তালাক, ৬৫: ০২-০৩
[২] সহীহ বুখারী, ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, ২৫৫৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00