📄 দুশ্চিন্তার জীবন আর নয়
আমরা বাস্তবতার সামান্যই দেখতে পাই। তাছাড়া আমাদের ওপর বিপদাপদ ও বাধা আসার পথও অনেক। মানুষের জীবনে পানাহারের মতো নিরাপত্তা ও প্রশান্তিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই আমাদের জানা উচিত, কীভাবে আমরা নিরাপদবোধ করতে পারব এবং মন থেকে অযাচিত ভয় দূর করতে পারব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিভিন্ন আয়াতে জানিয়েছেন যে, ঈমান ও সৎকর্ম আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও প্রশান্তির নিশ্চয়তা দেয়। তিনি বলেন-
فَقُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
আমরা বললাম, তোমরা সবাই এ থেকে অবতরণ করো। অনন্তর যখন আমার থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে তখন যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, আর তাদেরকে দুশ্চিন্তাও করতে হবে না।[১]
তিনি আরও বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোনো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে যা তোমরা দাবী করো। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন [১]
একই কথার প্রতিফলন দেখা যায় এ আয়াতটিতেও-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে আস্বাদন করালেন, ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। [২]
আল্লাহর সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, অন্যায়-অবিচার, মানুষের ওপর জুলুম আমাদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ঈমান আনা, সৃষ্টিজগতের প্রতি সদাচরণ করা, দান-সদাকাহ করা, ন্যায়পরায়ণ হওয়া, প্রভৃতি নিরাপত্তা, অনুগ্রহ ও প্রশান্তি অর্জনের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তাই আমাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ভয়কে দূর করে এগিয়ে চলতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যে, যতক্ষণ আমাদের দায়িত্ববোধ আছে, ততক্ষণ পরাজিত বা ব্যর্থ হওয়ার ভয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়; বরং এ ভয় আমাদেরকে যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন করতে ও অধ্যবসায় করে যেতে উৎসাহিত করবে; কিন্তু এ ভয় যদি দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর।
প্রিয় পাঠক, আমাদের এ জীবন চিরস্থায়ী আনন্দ ও নিরন্তর সফলতার জায়গা নয়। এ জীবনে সব রকমের আনন্দ-কষ্টের সংমিশ্রণ আছে। আমরা যেসব বিপদাপদে পড়ছি
তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলে চলবে না। কেননা, এতে আমরা নিজেদের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বলে গণ্য হব। সবসময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহ বান্দার ওপর যে পরিমাণ দুঃখ-কষ্ট নাযিল করেন তা সহ্য করা ও তার থেকে উত্তরণের ক্ষমতাও বান্দাকে দান করেন। তাই বান্দার উচিত, সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করা এবং দুঃখ-কষ্ট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা ও আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আমরা আমাদের সকল দায়িত্ব আল্লাহর দিকেই ন্যস্ত করব। তাহলেই উপলব্ধি করা সম্ভব যে, ভবিষ্যতে কী হবে-না-হবে—তা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করার কোনো দরকার নেই।
মনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভয় দূর করতে আমাদের সত্যের ওপর অটল থাকতে হবে। মিথ্যে ও প্রতারণাকে বর্জন করে দায়িত্বপালনে সচেতন হতে হবে। এছাড়াও ভয়ের উৎস সম্পর্কে সজাগ থাকা প্রয়োজন। সন্দেহ, কুসংস্কার, আর অজ্ঞতা হলো ভয়-ভীতির অন্যতম উৎস। আর জ্ঞান অর্জন, অনুধাবন ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এসব থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, নিরাপত্তার খাতিরে আমরা যেন ঝুঁকি নিতে পিছপা না হই। সামান্য ঝুঁকি আছে—এমন কিছুতে নিজেদেরকে অভ্যস্ত করা খুব জরুরী। কারণ, এর ফলে আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে। ঘরের কোণে বসে থাকার ফলে মনে যে পিছুটান বা হতাশার সৃষ্টি হয়, তা দূর হবে। এক্ষেত্রে এক মনীষীর কথাটা বেশ চমৎকার :
কাপুরুষেরা প্রকৃত মৃত্যুর আগেই বার বার মরে। অপরদিকে সাহসী ব্যক্তি একবারই মৃত্যুর স্বাদ পায়।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২: ৩৮
[১] সূরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০-৩২
[২] সূরা নাহল, ১৬ : ১১২
📄 যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা
আমাদের বাপ-দাদাদের জীবন-যাপনের সাথে নিজেদের জীবনযাপন তুলনা করলে দেখা যাবে যে, সব যুগেই যেমন ভালো ছিল, তেমনই খারাপও ছিল। কর্মঠ-অলস, দাতা-গ্রহীতার উপস্থিতি দুই প্রজন্মেই বিদ্যমান। তাই নিজ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলায় দোষের কিছু নেই। তবে এই তাল মেলানোর পূর্বশর্ত হলো—নিজ যুগের মানসিকতা বুঝে নেওয়া। এরপর আমাদেরকে যুগের সর্বোত্তম অবস্থার সাথে নিজেদের পারিবারিক সামর্থ্যকে মিলিয়ে নিতে হবে। এক মনীষী বলেছেন—
তুমি যদি কোনো যুগের মানসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করতে না পারো, তাহলে সব অনিষ্ট তোমার ওপর ভর করবে।
এ কথাটি ভীষণ যৌক্তিক। আমরা যদি অজ্ঞদের মাঝে একজন অজ্ঞ হই কিংবা নৈরাজ্যবাদীদের মাঝে একজন নৈরাজ্যবাদী হই, অথবা দরিদ্রদের মাঝে একজন দরিদ্র হই তাতেও অতটা সমস্যা হবে না; যতটা সমস্যা হবে জ্ঞানী এবং শক্তিশালীদের মাঝে অজ্ঞ ও দুর্বল হওয়ার ফলে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। এটা সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর একটি সুন্নাহ। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদেরকে যুগের কোন মানসিকতা ধারণ করতে হবে অথবা কীসের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে?
এর জবাব এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু মূল্যবোধ রয়েছে যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দিকেই সঠিকভাবে চলতে সহায়তা করে। সেগুলোকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যেমন, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, সহযোগিতা, পরের সুখ-দুঃখ বোঝা, অধ্যবসায় ও খোলা-মনে কাজ করা।
আমাদেরকে দৃঢ় মনোভাব ধারণ করতে হবে, যা একজন ব্যক্তিকে সুউচ্চ সফলতা অর্জনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর তাকে গড়ে তোলে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যে কিনা মানুষের কাছে নিজের বার্তাটা পৌঁছে দেয় এবং নিজের ভেতর বড় বড় পরিকল্পনা ধারণ করে।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং তা অর্জনের জন্য দৈনিক প্রচেষ্টা একজন ব্যক্তিকে নিরন্তর এগিয়ে চলতে সাহায্য করে। আর সুশিক্ষা মানুষকে লক্ষ্য নির্ধারণের পথ দেখায়। সুশিক্ষা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি জ্ঞানের কোনো এক শাখায় গুরুত্ব দিয়ে তাতে পারদর্শী হওয়াও সুশিক্ষা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে উপযুক্ত জায়গা।
ব্যক্তিগত জীবনকে সুসংগঠিত করা, সময়ের সদ্ব্যবহার এবং জনকল্যাণ ও অন্যের অধিকার সংরক্ষণের চেষ্টাকে এগিয়ে চলার মূলনীতি ধরে নিতে হবে। এ মূলনীতিগুলোই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মানসিকতার পরিচয় দেয়। আমাদেরকেও এ মানসিকতা ধারণ করতে হবে, যাতে করে এ যুগে সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে চলতে পারি। তাছাড়া এখানে যতগুলো মূল্যবোধের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তার সবই মূলত ইসলামী মূল্যবোধ; কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলিমই এগুলো অবহেলা করছে! যার মাঝে এ মানসিকতা নেই সে হয়তো দ্রুত কোনো এক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারে; কিন্তু তার এ অর্জন দীর্ঘকাল টিকবে না। তার অর্জনটা অবৈধও হতে পারে, তখন উল্টো তা তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
বর্তমান যুগ আমাদের দিকে নানারকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে আমাদেরকে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে—দক্ষতা, উপযোগিতা, আর চিন্তাশক্তির বিস্তৃতি ছাড়া এ যুগে চলা সম্ভব নয়। আমাদেরকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তবে তাল মেলানোর নামে আমরা যেন স্রোতে ভেসে না যাই। কারণ, এর ভুল ব্যাখ্যা করে অনেক ছেলে-মেয়েই চারিত্রিক অধঃপতনের দিকে এগিয়েছে, নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তাই আমরা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো হয়েই আত্মতুষ্টিতে ভুগব না; বরং উল্লেখিত পন্থা অনুসারে নেতৃত্ব, আর সফলতার দিকে এগিয়ে যাব।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার অনুগ্রহ ও বদান্যতা দিয়ে আচ্ছাদিত করুন।
📄 ভিন্নমতে শ্রদ্ধা
একমত হয়ে মিলেমিশে থাকতে চাওয়াটা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। অন্যের সাথে মতভেদ হলেই আমাদের মনে অস্বস্তির উদ্রেক ঘটে। মাঝেমাঝে বড়মাপের সংঘর্ষও ঘটে যায়। মানুষ যেভাবে অন্যদেরকে নিজের মতের অনুসারী করতে চায়, তেমনই অন্যরাও তার কাছ থেকে একইরকম আশা করে। দুঃখজনকভাবে এ কথা সবাই ভুলে যায়।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যে যুগে সব কিছুর ক্ষেত্রই বিস্তৃত। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের জানাশোনার পরিসরটা বেশ বড়। তাই মতভেদের জায়গাটাও আর অতীতের মতো সংকীর্ণ নেই। এ কারণে আমাদেরকে মতভিন্নতা ও ঐকমত্যের বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে।
সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর সুনির্ধারিত সুন্নাহসমূহের একটি হলো মতভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। এটা আমরা আল্লাহর বাণী থেকে বুঝতে পারি :
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ
তার নিদর্শনসমূহের মাঝে রয়েছে আসমান-যমীন সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও রঙের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।[১]
তিনি আরও বলেন-
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
আর আপনার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই সব মানুষকে একই জাতি-তে পরিণত করতে পারতেন; আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্তও হতো না। অবশ্য আপনার পালনকর্তা যাদের ওপর রহমত করেছেন, তারা ব্যতীত সকলেই মতভেদ করতে থাকবে। এবং তিনি এজন্যই তাদের সৃষ্টি করেছেন। [১]
কিছু আলিম 'আর এ জন্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন' এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, অনুগ্রহ ও মতভেদের জন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন; আবার বান্দাদের মাঝে মতভেদও আল্লাহর অনুমতিতেই হয়। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদীস রয়েছে—
تجدون الناس كابل مائة لا يجد الرجل فيها راحلةً
মানুষ হলো এমন একশোটা উটের ন্যায়, যেখান থেকে একজন লোক একটা উটকেও উপযুক্ত বাহনরূপে খুঁজে পায় না।[৩]
একজন লোকের একশ উট থাকতে পারে; কিন্তু সেই উটগুলোর মাঝে একটাও সে আরোহণের উপযোগী বা ভ্রমণের উপযুক্ত পাবে না। কেননা, এমন কোনো উট নেই, যার মাঝে সকল গুণের সমাবেশ ঘটবে। তাই আমরা যদি নিজ বন্ধুদের মাঝে একশ বা দুইশজনও খুঁজি, তবু একজন মানুষও পাব না-যে চিন্তা-চেতনা বা মতাদর্শে একদম আমাদের মনের মতো হবে।
আমাদের চেহারা যেমন ভিন্ন, তেমনই আমাদের চিন্তা-চেতনা বা মানসিকতাও ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন দুজন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে, যাদের চেহারা পুরোপুরি এক। তবে বাহ্যিকভাবে প্রতিটা মুখেই গাল, দুটি চোখ, দুটি ভ্রু, কপাল, নাক, মুখ ও চিবুক থাকে। তাই মানুষের মাঝে কিছু বিষয় এক থাকলেও ছোট ছোট কিছু পার্থক্য থাকবেই। বাহ্যিক অবস্থা গ্রহণ করে এ পার্থক্য আমাদের মেনে নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন মানসিকতা দান করেছেন। কেউ আশাবাদী, কেউ নৈরাশ্যবাদী। কেউ আবার ধৈর্যশীল ও সহনশীল। অন্যদিকে কেউ আছে প্রচণ্ড রাগী, বদমেজাজী ও সংকীর্ণমনা। এ কারণে-ই কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে ঝগড়া-বচসা হয়ে থাকে। আবার কিছু মানুষ এমন পরিবারে বড় হয়েছে, যে পরিবারে শুধু সুখ-শান্তি আর আরাম। তাই তারা মনে করে জীবন তো আরামেরই, এ জীবনে সবাই ভালো মানুষ! আবার কিছু মানুষ আছে দুঃখ-কষ্টে বড় হয়েছে। বাবার অত্যাচার, সৎমা বা সৎবাবার বাজে ব্যবহার তার নিত্যসঙ্গী ছিল। তাই সমাজের দিকে তারা এক কালো চশমা পরে তাকায়। সে যাকেই দেখে, তার ব্যাপারে শুধু খারাপ ধারণাই করে।
এজন্য সবকিছুকে নিজের অবস্থান দিয়ে বিচার করা যাবে না। প্রত্যেক ব্যক্তির প্রশংসনীয় ও নিন্দনীয় দিক আছে। প্রত্যেকেরই ঠিক-বেঠিক দিক আছে। অপরের মতামত, অবস্থা ও কথার পটভূমি বোঝার চেষ্টা করা জরুরী। সম্ভব হলে তাদের জন্য উপযুক্ত অজুহাত তৈরি করে ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম।
মতভেদ হলো বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির মাধ্যম। মৌলিক বিষয়ে না হলে এটা এমন কিছু না-যা মুসলিমজাতিকে একেবারে দুর্বল করে দেবে বা এর শুভ্র পোশাককে কলঙ্কিত করবে। কারণ, আমরা যদি মূল বিষয়গুলোতে এক থাকি, তাহলে শাখাগত বিষয়ে মতভেদ আমাদের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। এরকম শাখাগত বিষয়ে মতভেদ সাহাবীদের মধ্যেও ছিল। ইসলামের প্রথমদিকের শ্রেষ্ঠ তিন যুগে ছিল; কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো, এই মতভেদ যেন আমাদের মধ্যকার মৌলিক ঐক্যকে ধ্বংস করে না দেয়। আর মতভেদ থাকার কারণে কাউকে আমরা যেন খারাপ না জানি।
যখন কোনো ব্যাপার অকাট্য সত্য না হয় এবং গবেষণার সুযোগ থাকে, তখন অধিকাংশের মতই সাধারণত সঠিক হিসেবে বিবেচিত হয়; কিন্তু যখন অকাট্য বিষয়ে মানুষ মতভেদ করে, তখন যার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে, সে-ই সঠিক
পথে আছে। এটিই ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বোঝাতে চেয়েছেন—
GG الجماعة ما وافق الحق؛ ولو كنت وحدك
যা-কিছু সত্যের অনুকূলে তাই জামাআহ, যদিও সেই সত্যের অনুসারী তুমি একাই হও না কেন [১]
অর্থাৎ যদি কোনো গ্রামে শুধু একজন লোকই সালাত আদায় করে তাহলে সেই লোকটিই ইসলামী জামাআহ। সে গ্রামের বাকি সবাইকে তার মতের দিকেই ফিরতে হবে।
সহনশীলতা বাড়ানোর একটি উপায় হলো, অপরের দোষ না খুঁজে, নিজের দোষ খুঁজে বের করা। অন্যের প্রতি সহনশীল হতে পারলেই আমরা মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার ইচ্ছে পোষণ করতে পারব, গঠনমূলক আলোচনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারব।
টিকাঃ
[১] সূরা রুম, ৩০ : ২২
[১] সূরা হুদ, ১১: ১১৮-১১৯
[২] এ কথার দ্বারা বান্দাদেরকে কখনোই মতভেদে লিপ্ত হতে আদেশ বা উৎসাহ দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; এখানে মূলত মানবসমাজে মতভেদ হওয়াটা যে স্বাভাবিক বিষয়-তা বোঝানো হয়েছে। আর এটিও বোঝানো হয়েছে যে, মানুষ ইচ্ছে করলেই এসব মতভেদ শতভাগ দূর করতে পারবে না। - সম্পাদক।
[৩] সহীহ বুখারী, ৬৪৯৮; সহীহ মুসলিম, ২৫৪৭; শব্দ মুসলিমের বর্ণনার।
[১] শরহু উসূলি ই'তিকদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, খণ্ড: ০১; পৃষ্ঠা: ১২২
📄 বিনোদনও জীবনের অংশ
সভ্যতার অগ্রগতির দিক থেকে মুসলিমজাতি পিছিয়ে আছে। এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদেরকে দৃঢ় ও কঠোর হতে হবে। অপরদিকে অতিরিক্ত দৃঢ়তা ও কঠোরতা থেকে বেঁচে থাকাও ভীষণ জরুরী। কারণ, এর থেকে বঞ্চনা ও বিপদের সৃষ্টি হয়। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত পরিশ্রম করে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে চায়, সে যদি চারপাশের সুন্দর দৃশ্যগুলো উপভোগ করে তাতে ক্ষতি কী? যে শিকারী রিস্কের অন্বেষণে বের হয়, সে সমুদ্রের প্রশান্ত ঢেউ দেখলে তাতে দোষ কী? বরং চারপাশের সৌন্দর্য দেখে আল্লাহর স্মরণে মন বিগলিত হতে পারে। সামান্য হাসি-ঠাট্টা, বাচ্চাদের দুষ্টুমি ও বিনোদন জীবনে নতুন স্বাদ এনে দেয়। জীবনে ক্লান্তির পরিমাণও কমিয়ে দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, মহত্ত্ব, আল্লাহভীতি ও উচ্চাশার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তার সাহাবীদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করতেন। তিনিই তো বলেছেন—
لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ
তুমি কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না, যদিও তা হয় হাসিমুখে তোমার ভাইয়ের সাথে দেখা করা।[১]
আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
“ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক মুচকি হাসি দিতে আর কাউকে দেখিনি।[১]
তিনি সুসংবাদ শুনলেই খুশি হয়ে যেতেন। তার মুখে হাসি ফুটত। তার এক সাহাবী বলেন—
“ كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سُرَّ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ، حَتَّى كَأَنَّهُ قِطْعَةُ قَمَرٍ، وَكُنَّا نَعْرِفُ ذَلِكَ مِنْهُ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি হলে তার চেহারা আলোকিত হয়ে যেত। মনে হতো তার চেহারাটা যেন চাঁদের টুকরো। তিনি খুশি হলে আমরা তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই তা বুঝতে পারতাম।[২]
আমাদেরকে মন থেকে হাসতে হবে। কিছু হাসি-ঠাট্টা, বিনোদন, খেলাধুলার মাধ্যমে মনের অবসাদ দূর হয়, বিরক্তি ও একঘেয়েমি দূর হয়। সুখ-শান্তির জন্য এ দুটোর প্রয়োজন আছে। তবে এর সবকিছুই হতে হবে শরীয়তের গণ্ডির ভেতরে, মধ্যপন্থা অনুসারে। গাড়ি চালানোর জন্য যেমন জ্বালানীশক্তির প্রয়োজন হয়, তেমনই মানুষেরও সামনের দিকে এগিয়ে চলার জন্য আত্মিকশক্তির প্রয়োজন। এ শক্তি তাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। উত্তম আশা পোষণ করা, হাসিমুখে থাকা, মজাদার কথাবার্তা বলা—এগুলো আত্মিক শক্তিকে বৃদ্ধি করে।
তাই বিনোদনকে আমরা বিরক্তি ও একঘেয়েমির বিরুদ্ধে ঢাল বানিয়ে নেব, বিবেক ও আত্মা সংরক্ষণের মাধ্যম করে তুলব। এক মনীষী বলেন—
| তুমি কখনো হাসি আর বিরক্তিকে একত্র করতে পারবে না।
তবে এই দুটোর ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থা মেনে চলতে হবে। ভদ্র-কৌতুক অন্তরের গভীরে প্রভাব ফেলে। কেউ যখন এমন কৌতুক শুনে হাসে, সে হাসিতে তখন
কৌতুককারীর জন্য কৃতজ্ঞতাও মিশ্রিত থাকে।
আমরা ছোট শিশুদের থেকে হাসা শিখতে পারি। তারা খুব সহজেই যে কোনো বিষয়ে হাসতে পারে।
হাসি-ঠাট্টা আর বিনোদনের মাধ্যমে অহংকার দূর হয়, কৃত্রিম ব্যক্তিত্ববোধ, আর গাম্ভীর্য থেকে বাঁচা যায়। কোনো এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন-
যে ব্যক্তির মাঝে কোনো রসকষ নেই সে যেন একটা বাম্পার ছাড়া গাড়ির মতো। এ গাড়ি রাস্তায় সামান্য নুড়ি পাথরের সাথে ধাক্কা খেলেও ভয়াবহরূপে নড়ে ওঠে।
তাই জীবনের প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে হলেও বিনোদনের প্রয়োজন। বন্ধুদের সাথে মাঝেমাঝেই নিজেদের জীবনে ঘটা কিছু মজাদার গল্প-গুজব করা যেতে পারে। এটাও এক ধরনের বিনোদন। মানুষ হাসিখুশী লোককে পছন্দ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, হাসি-ঠাট্টা করতে গিয়ে আমরা যেন অন্যকে আঘাত না দিয়ে ফেলি, মিথ্যাচার ও গীবত না করে ফেলি কিংবা এমন কিছু করে না ফেলি-যা ইসলাম অনুমোদন করে না।
কোনো কিছু অর্জন করলে বা আনুগত্যের কাজ করতে পারলে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। এতে মনের একঘেয়েমি দূর হয়। তবে এক্ষেত্রে আল্লাহ যে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, সেজন্য তাঁর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে যেন ভুলে না যাই।
টিকাঃ
[১] সহীহ মুসলিম, ২৬২৬
[১] জামি তিরমিযী, ৩৬৪১; হাদীসটি হাসান গারীব
[২] সহীহ বুখারী, ৩৫৫৬; সহীহ মুসলিম, ২৭৬৯