📄 অধ্যবসায় : অসম্ভবকে সম্ভব করে
মহান ব্যক্তিদের জীবনচরিত পড়লে দেখা যায়, তাদের সবার মাঝেই কিছু উত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল। এগুলোই তাদেরকে মহান করে তুলেছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে একটি হলো, অধ্যবসায়; তথা কাজে লেগে থাকা। একমনে কাজ করে গেলে, ছোট ছোট কাজও বিশাল কাজের স্তূপে পরিণত হতে পারে। কারণ, আমরা তো জানিই যে, পানির ফোঁটা পাথরের ওপর একটানা পড়লে পাথরেও গর্ত সৃষ্টি হয়, এর আকৃতি পরিবর্তিত হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শয়তান আমাদেরকে সৎকর্মে অটল থাকতে দেয় না; বরং হারাম-বিনোদন বা অপ্রয়োজনীয় কাজের দিকে ঠেলে দেয়। এ জন্য আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইবাদত করতে বলেছেন—
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
আর ইয়াকীন (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত আপনি আপনার রবের ইবাদত করুন।[১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
“ من نام عن حزبه ، أو عن شيء منه ، فقرأه فيما بين صلاة الفجر وصلاة الظهر ، كُتِبَ له كأنما قرأه من الليل
যে ব্যক্তি ঘুমের কারণে তার রাতের সালাত বা এর কিছু অংশ পড়তে পারল না এবং ফজর থেকে যোহরের মধ্যকার সময়ে তা পড়ে নিল তাহলে (তার আমলনামায়) লেখা হবে যেন সে রাতে পড়েছিল [১]
মুসলিম ব্যক্তি রাতের বেলা নফল সালাত আদায়ের ব্যাপারে উদগ্রীব থাকে। কোনো কারণে যদি সে পড়তে না-ও পারে তাহলে দিনের প্রথমভাগে সে তা পড়ে নেয়। এর মাধ্যমে সে বোঝাতে চায় যে, সে পরাজিত হয় না, পিছু হটে না; বরং সে অল্প সময়ের মধ্যেই যা হারিয়েছে তা ফিরে পেতে বদ্ধপরিকর। পিছু হটা, ফিরে যাওয়া বা ইবাদতে অটল থাকতে না পারার ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন-
GG يا عبد الله ، لا تكن مثل فلانٍ ، كان يقوم الليل فترك قيام الليل
আব্দুল্লাহ, তুমি অমুকের মতো হবে না, যে আগে রাতে সালাত আদায় করত, এখন আর করে না [২]
তাই আমাদেরকে যেকোনো কাজই নিয়মিত করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, সব কাজে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
পড়াশোনা, ইবাদত-বন্দেগী, উপকারী কাজকর্ম-এ সকল ক্ষেত্রে প্রতিদিনকার জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। এরপর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে নিজ শক্তি-সামর্থ্য অনুসারে তা বাস্তবায়ন করার। তবে খুব বেশি চাপ নেওয়া যাবে না। তাহলে একঘেয়েমি চলে আসবে, একসময় তা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করবে।
কোনো কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য শয়তানের প্ররোচনার মোকাবেলা করা দরকার। এ নিয়ে আত্মার সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য। উচ্চাশা-সম্পন্ন ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তিদের সাহচর্য এক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগে।
মাঝে মাঝে আমরা প্রতিদিনের লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হই। এক্ষেত্রে যেসব কাজ কিছুটা
ছুটে গিয়েছে, তা হিসেব করে পূরণ করে নিতে হবে। এছাড়া যখন কোনো কাজে আমাদের ঘাটতি হয়ে যায় তখন নিজেদেরকে এর জন্য শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। যেমন : এক ঘণ্টা পড়ার কথা ছিল; কিন্তু পড়া হয়নি, এর শাস্তিস্বরূপ অতিরিক্ত আধাঘণ্টা পড়তে হবে।
আমরা যেন ভালো কাজগুলো লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের সামনে আলোচনা না করি। এর পাশাপাশি আমাদেরকে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পড়তে হবে। আর এসবই আমাদেরকে সফলতার উচ্চ শিখরে উঠতে সাহায্য করবে।
টিকাঃ
[১] সূরা হিজর, ১৫: ৯৯
[১] সহীh মুসলিম, ৭৪৭
[২] সহীহ বুখারী, ১১৫২
📄 চিন্তাশক্তি : এক বিশাল নিয়ামত
ঈমানের পর আল্লাহর দেওয়া সর্বোত্তম নিয়ামত হলো চিন্তাশক্তি। কারণ, এরই মাধ্যমে আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করি, নতুন কিছু আবিষ্কার করি, নতুন কিছুর সন্ধান করি, ভুল-ত্রুটি প্রকাশ করি আর নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরি; কিন্তু মানুষ সঠিক পদ্ধতিতে এ নিয়ামত থেকে উপকৃত হতে পারে না। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ তার চিন্তাশক্তির কেবল ১% যথাযথভাবে ব্যবহার করে থাকে। দুঃখজনকভাবে আমরা প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের চিন্তাশক্তিকে উপকারী খাতে ব্যবহার করি না। আর ব্যবহার করলেও খুব ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবহার করি। এর কারণ হলো, চিন্তাশক্তির ব্যবহার খুবই কঠিন। তার ওপর ছোটবেলা থেকেই আমরা এর ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। অথচ চিন্তাশক্তির ব্যবহার নিয়ে আমাদের জানা খুবই জরুরী।
আমাদের কাছে যে সকল তথ্য আছে তা নিয়েই আমাদের চিন্তা সুগঠিত হয়। তথ্যগুলো যদি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে আমাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক বা সঠিকের কাছাকাছি হবে; কিন্তু যদি তথ্যগুলো মিথ্যে বা বিকৃত হয়, তাহলে আমাদের চিন্তার ফলাফলও ভুল আসবে। যেমন কেউ আপনাকে এসে জানাল যে, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বেশ সহজ। আপনি তার কথার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যত-পরিকল্পনা সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন। পরে তা আপনার কাছে বেশ কঠিন মনে হলো। পড়াশোনায় এতই চাপ অনুভব করলেন যে, এর ফাঁকে কোনো কাজও করতে পারলেন না। নিঃসন্দেহে হতাশা আপনাকে গ্রাস করবে। এজন্য কুরআনে কারীমে সংবাদ বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যে কোনো ঘটনা সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
আমরা যা পড়ছি বা শুনছি—তা আমাদের চিন্তায় পৌঁছানোর আগেই এর সত্যতা যাচাই করে নিতে হবে। আমরা অনেক কিছুই শুনি, অনেক কিছুই পড়ে থাকি; কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের মন-মগজ যেন সব ধরনের তথ্যে ভর্তি না হয়ে যায়; বরং আমাদের একটি মুক্ত মনের প্রয়োজন। যে মন সবকিছু নিয়ে ভাববে, গবেষণা করবে, সমালোচনা করবে, বিভিন্ন বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বের করবে। আর এটা সম্ভব হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে। যেমন : আমার বন্ধু এত দরিদ্র হলেও সবসময় সুখী থাকে কী করে? আমার শিক্ষক থেকে উপকৃত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা কোনটি? এ মাসে কোন কাজগুলোতে আমি অগ্রাধিকার দেব? আমার ভাই মারা যাওয়ায় মায়ের এত মন খারাপ, তাকে আমি কীভাবে সান্ত্বনা দিতে পারি?
আমরা কেউ যখন কোনো কাজ করতে চাইব, তখন মাথার ভেতরে নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একধরনের প্রশ্নের ঝড় তুলতে হবে। হতে পারে সেটা একাকী বা বন্ধুদের সহায়তায়। ধরা যাক, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয় বাছাই করব। তখন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমি যে বিষয়টা নিতে যাচ্ছি সেটার বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? আমি কি তা পড়ার জন্য প্রস্তুত? এ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে কী কাজ করার সুযোগ পাবো? পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমার কী কী বাধা আসতে পারে? আমি যা নিয়ে পড়ছি সেটাই কি আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত? এভাবে আরও অনেক প্রশ্ন করে যেতে হবে। মাথায় প্রশ্নের ঝড় তোলার সময় কোনো কথা-ই ফেলনা নয়। প্রতিটি চিন্তাই গ্রহণযোগ্য, কোনোটিকেই তুচ্ছ ভাবার সুযোগ নেই। চিন্তাগুলো জমা হওয়ার পর সেগুলোকে ছেকে দুর্বল ও অযৌক্তিক চিন্তাগুলো দূর করে দিতে হবে।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই চূড়ান্ত একটা ক্ষেত্র থাকে, যেখানে বড় ধরনের কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সব ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চিন্তা ও পরামর্শের আশ্রয় নেব। বড় রকমের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনে বড় মাপের প্রভাব ফেলে। যেমন বিয়ে, পড়াশোনা, বাড়ি পরিবর্তন করে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া, দীর্ঘকালের জন্য বিদেশে যাওয়া, বড় একটি প্রকল্পে সমস্ত অর্থ ব্যয় করা ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুইটা ভয়াবহ ত্রুটি আছে আর সেগুলো হলো- তাড়াহুড়ো করা এবং বেপরোয়াভাবে অগ্রসর হওয়া। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথ পড়াশোনা না করা।
চিন্তা করার সময় আমাদের যুক্তি-প্রমাণ খাটাতে হবে। আর এজন্য জীবনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও অনুরূপ ঘটনার শিক্ষা বেশ কাজে আসে। আমাদেরকে নিজ ইন্দ্রিয়গুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। এগুলোও আমাদেরকে অনেক কিছু বলতে চায়, তা শোনার মতো কান তৈরি করে নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অন্তর নামক ইন্দ্রিয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
GG
البر ما اطمأنت إليه النفس ، واطمأنّ إليه القلب ، والإثم ما حاك فى النفس وتردد في الصدر ، وإن أفتاك الناس وأفتوك
পুণ্য হলো যা দ্বারা অন্তর ও হৃদয় প্রশান্ত হয়; আর পাপ হলো যা অন্তরে বিব্রতভাব ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করে। যদিও সেই (দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরিকারী কাজটি) করার জন্য লোকেরা পরামর্শ দেন (তবুও তা করা উচিত হবে না। কারণ, সুস্থ ও প্রশান্ত অন্তর কেবল সেই ক্ষেত্রেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যা মূলত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম)।[১]
তাই আমরা যা পড়ছি, যা শুনছি তা নিয়ে ভেবে দেখব। লেখক যা লিখেছেন তা নিয়ে লেখকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করব। দিনশেষে লেখকও একজন মানুষ। তিনি ভুল করতেই পারেন, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করাও অস্বাভাবিক নয়। বুদ্ধিমান তরুণপ্রজন্ম জানে, কীভাবে বইকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়। এর মাধ্যমে তারা বই থেকে নতুন কিছু শিখে নেওয়ারও চেষ্টা করে।
টিকাঃ
[১] মুসনাদের আহমাদ, ১৮০২৮; সুনান দারিমী, ২৫৩৩; হাদিসটি হাসান
📄 দয়া করে যেইজন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বিশ্বজাহানের জন্য রহমত তথা দয়াস্বরূপ পাঠিয়েছেন। তাই প্রত্যেক মুসলিমকে তাঁর নবীর অনুসারী হতে হবে। এতে মানবসমাজ দয়া, মমত্ববোধ আর পুণ্যে ছেয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দৌহিত্র হাসানকে চুম্বন করেছিলেন। তাঁর সামনে বসা ছিলেন আকরা ইবনু হাবেস রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বললেন, 'আমার তো দশটা ছেলে আছে। আমি এদের কাউকে চুম্বন করি না।' তার দিকে তাকিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন—
“ مَنْ لا يَرْحَمْ لا يُرْحَمْ
যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করাও হয় না।[১]
বিশ্বায়ন আজ আমাদের মাঝে শক্তিমত্তা, দখলদারিত্ব ও প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে দিয়েছে। এগুলো হালের বিভিন্ন ট্রেনিং কোর্সে গেলেই উপলব্ধি করা যায়। এছাড়া অসংখ্য ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন আলোচনায় এ মনোভাবই উঠে আসে। নিঃসন্দেহে মুসলিমজাতির শক্তিশালী ও সফল মানুষের ব্যাপক প্রয়োজন; কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আশেপাশের মানুষের প্রতি আমাদের দয়া-অনুগ্রহের যে মনোভাব তা উঠে যেতে হবে। দয়া-অনুগ্রহ তৈরি হয় দান, পরোপকার ইত্যাদির মাধ্যমে। অন্যদিকে শক্তির উত্থান হয় জোর-জবরদস্তি, প্রতিযোগিতা ও দখলের
মাধ্যমে। আমাদেরকে এটা ভালোভাবে বুঝতে হবে।
দরিদ্র, দুর্বল, দুস্থ, অভাবী ও অনাথদের সহায়তা করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
GG ابعونى الضُّعَفاء؛ فإنَّما تُرزقون وتنصرون بضعفابكم
তোমাদের মাঝে দুর্বলদেরকে আমার কাছে হাজির করো। তোমরা তো এ সকল দুর্বলদের কারণে-ই রিযক ও সহায়তা পেয়ে থাকো।[১]
তাই আমাদের প্রত্যেককেই সতর্ক থাকতে হবে যেন নিজ শক্তি, সম্পদ বা পদ নিয়ে আমাদের মাঝে অহংবোধের সৃষ্টি না হয়। আমরা যেন এমন অহংকারী জুলুমবাজ না হয়ে যাই, যে দয়া-ই করতে জানে না। কেননা, এ প্রজাতির লোকেরা আল্লাহর শাস্তিকে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
GG ألا أُخبركم بأهل الجنَّةِ؟ كُل ضَعيف مُتضعف، لو أقسم على الله لأبره، ألا أخبركم بأهل النَّارِ؟ كل عتل، جوا، مُستكبر
আমি কি তোমাদের জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে জানাবো না? (তারা হলো) প্রত্যেক বিনয়ী মানুষ, যে আল্লাহর জন্য নিজেকে বিনয়ী হিসেবে উপস্থাপন করে; ফলে মানুষ তাকে দুর্বল মনে করে এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে; সে আল্লাহর নামে কসম করলে তিনি তা পূর্ণ করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসী সম্পর্কে জানাবো না? (তারা হলো) প্রত্যেক বদমেজাজি লোক এবং অহংকারী হয়ে হেঁটে বেড়ানো লোক কিংবা অতিরিক্ত খেতে খেতে মোটা হয়ে যাওয়া ব্যক্তি।[২]
অন্যের দুঃখ-কষ্ট যেন আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। আমরা যেন বন্ধু, প্রতিবেশী ও দ্বীনী ভাইদের কষ্টে কষ্ট পেতে অভ্যস্ত হই, তাদেরকে এসব ক্ষেত্রে সান্ত্বনা দিতে পারি, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি।
আমাদের চাকরদের প্রতি দয়ালু হতে হবে। তাদের ছোট-খাট ভুল ক্ষমা করে দিতে হবে। তাদের জায়গায় আমরা নিজেরাও থাকতে পারতাম। ওই অবস্থায় আমরা কতটুকু দয়া-অনুগ্রহ কামনা করতাম—তা চিন্তার দাবি রাখে। নিজেরা যেমন আশা করতাম, তাদের সাথেও আমাদের তেমন ব্যবহারই করা উচিত।
প্রত্যেক মানুষের প্রতি আমাদের অনুভূতি জাগ্রত রাখা উচিত। যেমন পাপীদের ক্ষেত্রে আমাদের সদয় আচরণ করতে হবে। তাদেরকে গালমন্দ করলে চলবে না। তাদের প্রতি আমরা দয়া করব, তাদেরকে সদুপদেশ দেব। তাদেরকে হাত ধরে হিদায়াতের পথে নিয়ে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, অনুগ্রহ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার আমাদের ভেতরের সত্তা। নিজ সত্তার প্রতি অনুগ্রহ করার মানে হলো—ভালো কাজ ও সুপথে চলার মাধ্যমে একে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করা। সর্বদা একে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকাও এক প্রকার অনুগ্রহ। কারণে-অকারণে নিজেকে দোষ দেওয়া উচিত নয়; বরং আমাদের উচিত নিজেদের কাজগুলো বিশ্লেষণ করে আল্লাহর প্রশংসা করা, কৃতজ্ঞতা পোষণ করা। পাশাপাশি নিজেকে উৎসাহ দেওয়া ও উত্তম ফলাফলের আশা করা। তবে কখনো কখনো নিজেকে দোষ দিয়ে পাপকাজ থেকে বিরত থাকাও অনুগ্রহের অংশ হতে পারে।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৫৯৯৭
[১] সুনান আবু দাউদ, ২৫৯৪; হাদীসটি হাসান
[২] সহীহ বুখারী, ৪৯১৮
📄 দুশ্চিন্তার জীবন আর নয়
আমরা বাস্তবতার সামান্যই দেখতে পাই। তাছাড়া আমাদের ওপর বিপদাপদ ও বাধা আসার পথও অনেক। মানুষের জীবনে পানাহারের মতো নিরাপত্তা ও প্রশান্তিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই আমাদের জানা উচিত, কীভাবে আমরা নিরাপদবোধ করতে পারব এবং মন থেকে অযাচিত ভয় দূর করতে পারব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিভিন্ন আয়াতে জানিয়েছেন যে, ঈমান ও সৎকর্ম আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও প্রশান্তির নিশ্চয়তা দেয়। তিনি বলেন-
فَقُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
আমরা বললাম, তোমরা সবাই এ থেকে অবতরণ করো। অনন্তর যখন আমার থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে তখন যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, আর তাদেরকে দুশ্চিন্তাও করতে হবে না।[১]
তিনি আরও বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোনো। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে যা তোমরা দাবী করো। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন [১]
একই কথার প্রতিফলন দেখা যায় এ আয়াতটিতেও-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে আস্বাদন করালেন, ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। [২]
আল্লাহর সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, অন্যায়-অবিচার, মানুষের ওপর জুলুম আমাদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ঈমান আনা, সৃষ্টিজগতের প্রতি সদাচরণ করা, দান-সদাকাহ করা, ন্যায়পরায়ণ হওয়া, প্রভৃতি নিরাপত্তা, অনুগ্রহ ও প্রশান্তি অর্জনের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তাই আমাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ভয়কে দূর করে এগিয়ে চলতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যে, যতক্ষণ আমাদের দায়িত্ববোধ আছে, ততক্ষণ পরাজিত বা ব্যর্থ হওয়ার ভয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়; বরং এ ভয় আমাদেরকে যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন করতে ও অধ্যবসায় করে যেতে উৎসাহিত করবে; কিন্তু এ ভয় যদি দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর।
প্রিয় পাঠক, আমাদের এ জীবন চিরস্থায়ী আনন্দ ও নিরন্তর সফলতার জায়গা নয়। এ জীবনে সব রকমের আনন্দ-কষ্টের সংমিশ্রণ আছে। আমরা যেসব বিপদাপদে পড়ছি
তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলে চলবে না। কেননা, এতে আমরা নিজেদের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বলে গণ্য হব। সবসময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহ বান্দার ওপর যে পরিমাণ দুঃখ-কষ্ট নাযিল করেন তা সহ্য করা ও তার থেকে উত্তরণের ক্ষমতাও বান্দাকে দান করেন। তাই বান্দার উচিত, সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করা এবং দুঃখ-কষ্ট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা ও আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আমরা আমাদের সকল দায়িত্ব আল্লাহর দিকেই ন্যস্ত করব। তাহলেই উপলব্ধি করা সম্ভব যে, ভবিষ্যতে কী হবে-না-হবে—তা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করার কোনো দরকার নেই।
মনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভয় দূর করতে আমাদের সত্যের ওপর অটল থাকতে হবে। মিথ্যে ও প্রতারণাকে বর্জন করে দায়িত্বপালনে সচেতন হতে হবে। এছাড়াও ভয়ের উৎস সম্পর্কে সজাগ থাকা প্রয়োজন। সন্দেহ, কুসংস্কার, আর অজ্ঞতা হলো ভয়-ভীতির অন্যতম উৎস। আর জ্ঞান অর্জন, অনুধাবন ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এসব থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, নিরাপত্তার খাতিরে আমরা যেন ঝুঁকি নিতে পিছপা না হই। সামান্য ঝুঁকি আছে—এমন কিছুতে নিজেদেরকে অভ্যস্ত করা খুব জরুরী। কারণ, এর ফলে আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে। ঘরের কোণে বসে থাকার ফলে মনে যে পিছুটান বা হতাশার সৃষ্টি হয়, তা দূর হবে। এক্ষেত্রে এক মনীষীর কথাটা বেশ চমৎকার :
কাপুরুষেরা প্রকৃত মৃত্যুর আগেই বার বার মরে। অপরদিকে সাহসী ব্যক্তি একবারই মৃত্যুর স্বাদ পায়।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২: ৩৮
[১] সূরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০-৩২
[২] সূরা নাহল, ১৬ : ১১২