📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 ইচ্ছাশক্তি

📄 ইচ্ছাশক্তি


কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য আমাদের দুটো জিনিসের প্রয়োজন : ইচ্ছে ও সক্ষমতা। আমরা যদি নিজেদেরকে প্রশ্ন করি, কাজে সফল হওয়ার জন্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ইচ্ছে নাকি সক্ষমতা? নির্দ্বিধায় উত্তর আসবে–ইচ্ছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেন? কারণ, মানুষ যখন কিছু পেতে চায়, তখন তার ইচ্ছেই তাকে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দুয়ার খুলে দেয়। যেমন-যে ক্ষুধার্ত লোকের কোনো খাবার নেই, তার খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাকে খাদ্য অন্বেষণের দিকে ঠেলে দেয়। সে খাবারের খোঁজে নানারকম চেষ্টা চালায়। প্রয়োজনে অনেক ফন্দিও আঁটে। তীব্র ইচ্ছে থাকলে অক্ষম ব্যক্তিও সক্ষম হয়ে যায়, সামান্য কিছু থেকেই বড় কিছু তৈরি করে ফেলতে পারে; কিন্তু ইচ্ছে না থাকলে সক্ষম ব্যক্তির পক্ষেও কিছু করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, একজন লোক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার বাড়ির পাশেই সবচেয়ে ভালো হাসপাতালটি আছে। সেখানে বিনামূল্যে সর্বোত্তম চিকিৎসা দেওয়া হয়; কিন্তু সে কোনো এক কারণে হাসপাতালে যেতে রাজি হচ্ছে না। ফলে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, তার তো আরোগ্যলাভের ইচ্ছেই নেই।
এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন-
প্রথমত, সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে এত পার্থক্যের কারণ হলো আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। সফলতা অনেকাংশেই মানুষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে, সামর্থের ওপর নয়। যেমন কারও হয়তো প্রতিদিন এক ঘণ্টা পড়ার ক্ষমতা রয়েছে। সে চাইলেই প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে সালাত আদায় করতে যেতে পারে। রাস্তায় যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হয় তাকেই সালাম দিতে
পারে; কিন্তু সে এর কোনোটিই করে না। কারণ, তার সক্ষমতা থাকলেও ইচ্ছে নেই। অথচ আরেকজন এর সবগুলোই করে। কারণ, সে ইচ্ছে রাখে, সেইসাথে তার সক্ষমতাও আছে।
দ্বিতীয়ত, এমন অনেক মানুষ আছে, যারা দুরবস্থার কারণে সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না; কিন্তু ইচ্ছেকে জোরালো করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর বিশেষ রহমত। বিশেষ করে আমরা যারা দরিদ্র ও দুর্বল, তাদের জন্য এটি আল্লাহর দেওয়া এক অসাধারণ উপহার। তাই যেসব তরুণ সুউচ্চ লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হয় না, তাদের আদৌ কোনো অজুহাত নেই।
তৃতীয়ত, আমরা অনেক সময়ই ইচ্ছে ও সক্ষমতাকে এক করে ফেলি। আমরা বলি, এ কাজটি আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। অথচ আসল কথা হলো, আমরা কাজটা করতে চাচ্ছি না। তাবুক যুদ্ধে যখন মুনাফিকরা না যাওয়ার অজুহাত হিসেবে তাদের অক্ষমতার কথা বলেছিল, তখন আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন—
وَسَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
আর তারা এমনই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরামিথ্যাবাদী [১]
কিন্তু পরে আল্লাহ বলে দিলেন যে, এটা তাদের সক্ষমতার বিষয় নয়; বরং তাদের ইচ্ছের বিষয়। তিনি বলেন—
وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةٌ
আর যদি তারা বের হবার ইচ্ছে করত, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করত। [২]
প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা সবাই নিজেদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখি, আমাদের
সমস্যা আসলে কোথায়? সক্ষমতায়, নাকি ইচ্ছেয়? গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য হব যে, আমাদের ঘাটতিগুলোর কারণ হলো, আমাদের ইচ্ছেশক্তির স্বল্পতা। তাই আমাদের ইচ্ছেশক্তিকে বাড়াতে হবে।
এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হলো নিজ প্রবৃত্তি ও বাজে অভ্যাস-ত্যাগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আর এ সাহায্য অর্জনের উপায় হলো নফসের সাথে সংগ্রাম করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
যারা আমার পথে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব।[১]
তিনি আরও বলেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا
তারা সবর করত বিধায় আমরা তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমাদের আদেশে পথ প্রদর্শন করত।[২]
তাই মনের সাথে সংগ্রাম করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান কাজে আসবে না।
ইচ্ছেশক্তি বাড়ানোর আরেকটি উপায় হলো, মনে মনে নিজের পরিকল্পনাগুলো আওড়ানো। যেমন, 'আমি অমুকের কল্যাণ চাই, তাই তাকে সাহায্য করব'।
অথবা, 'আমি মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করতে চাই, ইন শা আল্লাহ, এটা করবোই। আমার ইচ্ছে দুর্বল নয়, বরং তা খুবই দৃঢ়' ইত্যাদি।
অর্থাৎ আমরা নিজেই নিজেকে অনুপ্রেরণা দেব।
এছাড়াও ইচ্ছেশক্তিকে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করতে হবে।
এরপর বড় কাজে হাত দিতে হবে। যেমন—আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যে কিনা সারাদিন একটুও পড়াশোনা করে না। সে প্রতিদিন বিশ মিনিট পড়ার সময় নির্ধারণ করে নিতে পারে। এভাবে এক বছর যাওয়ার পর, পড়ার সময়সীমা চল্লিশ মিনিটে উন্নীত করতে হবে। একসময় দেখা যাবে, পড়াশোনা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ইচ্ছেশক্তি বাড়াতে মনের কিছু চাহিদাকে অপূর্ণ রাখা জরুরী। কাজের ফাঁকে এক কাপ চা খেতে মন চাইছে, অথবা একজনের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে ইচ্ছে করছে। এক ঘণ্টা পর সেটা করা যেতে পারে।
আবার কারও হয়তো তেমন দরকারি নয় এমন কিছু কিনতে মসজিদ থেকে দ্রুত বের হতে ইচ্ছে করছে। এক্ষেত্রে ইচ্ছেকে প্রশ্রয় না দিয়ে দেরি করে বের হতে হবে। আর যদি মন বলে অপ্রয়োজনীয় কিছু কিনতে, তাহলে তা কেনারই দরকার নেই। সরাসরি তার দাবি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে।
একটা খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করলে তার জায়গায় আরেকটা ভালো অভ্যাস প্রবেশ করাতে হয়। আগে হয়তো আপনি বেশি বেশি অভিযোগ করতেন, এখন তা করা ছেড়ে দিয়েছেন। তার পরিবর্তে বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে, হোক তা গোপনে বা প্রকাশ্য। যে ব্যক্তি খুব বেশি ঘুমায়, সে ঘুম কমিয়ে অন্য কোনো উপকারী কাজে নিজেকে ব্যস্ত করতে পারে।
এছাড়াও আমাদেরকে দৃঢ় সংকল্প ও প্রত্যয়ের অধিকারী মানুষদের সাথে চলাফেরা করতে হবে। এতে নিজের অজান্তেই তাদের দৃঢ়তা ও আত্মিক শক্তি নিজের মাঝে সঞ্চারিত হবে। আমরা তাদের থেকে শিখে নিতে পারি, কী করে নিজের অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছেকে দমন করতে হয়, আর সদিচ্ছাকে জাগ্রত করতে হয়।

টিকাঃ
[১] সূরা তাওবা, ০৯: ৪২
[২] সূরা তাওবা, ০৯: ৪৬
[১] সূরা আনকাবূত, ২৯ : ৬৯
[২] সূরা সাজদা, ৩২: ২৪

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 পড়ো

📄 পড়ো


জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রথম বার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যে শব্দটি নিয়ে এসেছিলেন তা হলো—‘ইক্করা’ অর্থাৎ পড়ো। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কোনো জাতির উত্থানের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক শর্ত হলো পড়াশোনা।
চিন্তার বিকাশে, সবকিছু সম্পর্কে ধারণা সুস্পষ্ট করতে বই পড়ার বিকল্প নেই।
বই ইতিহাসের মহান সব ব্যক্তি ও আমাদের মাঝে সেতু নির্মাণ করে দেয়। এজন্য তাঁদের প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী, রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত জানতে আমাদের প্রচুর পড়তে হবে। সেইসাথে খেয়াল রাখতে হবে, মিডিয়া যেন আমাদেরকে বই থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন উপকারী কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যেই পড়ে থাকি; কিন্তু যখন টিভির সামনে বসি, তখন উপকারী-ক্ষতিকর, বৈধ-অবৈধ সবই আমাদের চোখে পড়ে।
আর মনে রাখতে হবে, আমরা যা-কিছু শুনি, তার চেয়ে যা-কিছু পড়ি, তা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কখনো কখনো একটি বই পড়া কারও সাহচর্যের থেকে উত্তম। তাই আমাদেরকে উপযুক্ত বই বাছাইয়ের জন্য কষ্ট করতে হবে। কারণ, বই হলো জামার মতো। জামার সুতা ভালো হওয়ার চাইতে তা শরীরের সাথে কতটুকু খাপ খায় সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এমন বাজে বই কিনি, যা আমাদের আগ্রহ, প্রয়োজন ও ধাপের সাথে মানানসই নয়, তাহলে টাকা তো গচ্চা যাবেই, সেইসাথে সময়ও নষ্ট হবে। মাঝে মাঝে আমাদের হাতের কাছে এমনকিছু বই থাকে, যার কোনো কোনোটি বুঝতে সহজ, অনায়াসেই পড়ে ফেলা যায়। আবার কোনোটি মোটামুটি কঠিন, যা পড়তে বেশ মনোযোগ দেওয়া লাগে।
এক্ষেত্রে আমরা যেন দ্বিতীয়টি বেছে নিতে কুণ্ঠাবোধ না করি। কারণ, আমরা চাই, বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানের জগতে বিচরণ করতে। আর জ্ঞানের জগত যদি আমাদের তুলনায় একটু উঁচুতে না থাকে, তবে সেখান থেকে আমরা কোনো বাড়তি উপকার পাব না। এজন্য সহজ বই পড়ে তুষ্ট হয়ে গেলে চলবে না। মানুষ জানা জিনিসটাই সহজে বুঝতে পারে। তাই আমরা যদি কোনোকিছু পড়তে গিয়ে অনায়াসে সব বুঝে ফেলি, তাহলে ধরে নিতে হবে সে বিষয়টি আমাদের আগে থেকেই জানা। অর্থাৎ বইটা পড়লে জানা জিনিস আবার পড়া হবে, এ ছাড়া আর কিছু নয়।
আমাদের মনোযোগ সহকারে বই পড়া উচিত, বইয়ের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্তে আনা উচিত। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলোর নিচে দাগ দেওয়া অথবা কাগজে লিখে রাখা যেতে পারে। আর বইয়ে যা আছে তার সবই নিজের মাঝে ধারণ করার চেষ্টা করা উচিত এবং সেসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। তা না হলে বইয়ের বিষয়বস্তু আমাদের আয়ত্তে আসবে না।
একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে, ভালো বই নেই। প্রকৃতপক্ষে ভালো পাঠক নেই। কারণ, যে বেশি বই পড়ে, সে ভালো পাঠক নয়; বরং যে একটা বই ভালোমতো পড়ে, সে-ই ভালো পাঠক। এ কারণে আক্কাদ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন—
একটি বই ভালোমতো তিনবার পড়া, ভালো তিনটি বই একবার করে পড়ার থেকে বেশি উপকারী।
আমরা যদি প্রতিদিন ১৫ মিনিট করেও পড়ি, তাহলে বছরে ২০টি মাঝারি আকারের বই শেষ করতে পারব। এও কিন্তু কম কিছু নয়। আর যদি প্রতিদিন কোনো বিষয়ে আধা ঘণ্টা কোনো বই পড়ি, তাহলে পাঁচ বছরের মাথায় সে বিষয়ে দক্ষ হয়ে যেতে পারব।
তাই আমরা মাসিক খরচের একটি নির্ধারিত অংশ বই কেনার জন্য আলাদা করে রাখতে পারি। খুব ভালো হয় যদি ঘরে ছোটখাট একটা লাইব্রেরি গড়ে তোলা যায়।
আমাদের প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় সূক্ষ্মভাবে গবেষণা করে পড়ার চেষ্টা করা দরকার। বিশেষ করে উদীয়মান ভালো লেখকদের বই পড়া উচিত, যাতে করে নতুন ও গ্রহণযোগ্য জ্ঞান অর্জিত হয়।
আর যারা মনে করে বই পড়ার সময় নেই, তাদের জন্য পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের কাজের জন্য একটি রুটিন তৈরি করে নেওয়া। দৈনন্দিন কাজ সঠিক উপায়ে ভাগ করে নিতে পারলেই দিনশেষে বই পড়ার জন্য বেশ বড় একটা সময় পাওয়া যায়।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 অধ্যবসায় : অসম্ভবকে সম্ভব করে

📄 অধ্যবসায় : অসম্ভবকে সম্ভব করে


মহান ব্যক্তিদের জীবনচরিত পড়লে দেখা যায়, তাদের সবার মাঝেই কিছু উত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল। এগুলোই তাদেরকে মহান করে তুলেছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে একটি হলো, অধ্যবসায়; তথা কাজে লেগে থাকা। একমনে কাজ করে গেলে, ছোট ছোট কাজও বিশাল কাজের স্তূপে পরিণত হতে পারে। কারণ, আমরা তো জানিই যে, পানির ফোঁটা পাথরের ওপর একটানা পড়লে পাথরেও গর্ত সৃষ্টি হয়, এর আকৃতি পরিবর্তিত হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শয়তান আমাদেরকে সৎকর্মে অটল থাকতে দেয় না; বরং হারাম-বিনোদন বা অপ্রয়োজনীয় কাজের দিকে ঠেলে দেয়। এ জন্য আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইবাদত করতে বলেছেন—
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
আর ইয়াকীন (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত আপনি আপনার রবের ইবাদত করুন।[১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
“ من نام عن حزبه ، أو عن شيء منه ، فقرأه فيما بين صلاة الفجر وصلاة الظهر ، كُتِبَ له كأنما قرأه من الليل
যে ব্যক্তি ঘুমের কারণে তার রাতের সালাত বা এর কিছু অংশ পড়তে পারল না এবং ফজর থেকে যোহরের মধ্যকার সময়ে তা পড়ে নিল তাহলে (তার আমলনামায়) লেখা হবে যেন সে রাতে পড়েছিল [১]
মুসলিম ব্যক্তি রাতের বেলা নফল সালাত আদায়ের ব্যাপারে উদগ্রীব থাকে। কোনো কারণে যদি সে পড়তে না-ও পারে তাহলে দিনের প্রথমভাগে সে তা পড়ে নেয়। এর মাধ্যমে সে বোঝাতে চায় যে, সে পরাজিত হয় না, পিছু হটে না; বরং সে অল্প সময়ের মধ্যেই যা হারিয়েছে তা ফিরে পেতে বদ্ধপরিকর। পিছু হটা, ফিরে যাওয়া বা ইবাদতে অটল থাকতে না পারার ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন-
GG يا عبد الله ، لا تكن مثل فلانٍ ، كان يقوم الليل فترك قيام الليل
আব্দুল্লাহ, তুমি অমুকের মতো হবে না, যে আগে রাতে সালাত আদায় করত, এখন আর করে না [২]
তাই আমাদেরকে যেকোনো কাজই নিয়মিত করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, সব কাজে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
পড়াশোনা, ইবাদত-বন্দেগী, উপকারী কাজকর্ম-এ সকল ক্ষেত্রে প্রতিদিনকার জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। এরপর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে নিজ শক্তি-সামর্থ্য অনুসারে তা বাস্তবায়ন করার। তবে খুব বেশি চাপ নেওয়া যাবে না। তাহলে একঘেয়েমি চলে আসবে, একসময় তা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করবে।
কোনো কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য শয়তানের প্ররোচনার মোকাবেলা করা দরকার। এ নিয়ে আত্মার সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য। উচ্চাশা-সম্পন্ন ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ব্যক্তিদের সাহচর্য এক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগে।
মাঝে মাঝে আমরা প্রতিদিনের লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হই। এক্ষেত্রে যেসব কাজ কিছুটা
ছুটে গিয়েছে, তা হিসেব করে পূরণ করে নিতে হবে। এছাড়া যখন কোনো কাজে আমাদের ঘাটতি হয়ে যায় তখন নিজেদেরকে এর জন্য শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। যেমন : এক ঘণ্টা পড়ার কথা ছিল; কিন্তু পড়া হয়নি, এর শাস্তিস্বরূপ অতিরিক্ত আধাঘণ্টা পড়তে হবে।
আমরা যেন ভালো কাজগুলো লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের সামনে আলোচনা না করি। এর পাশাপাশি আমাদেরকে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পড়তে হবে। আর এসবই আমাদেরকে সফলতার উচ্চ শিখরে উঠতে সাহায্য করবে।

টিকাঃ
[১] সূরা হিজর, ১৫: ৯৯
[১] সহীh মুসলিম, ৭৪৭
[২] সহীহ বুখারী, ১১৫২

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 চিন্তাশক্তি : এক বিশাল নিয়ামত

📄 চিন্তাশক্তি : এক বিশাল নিয়ামত


ঈমানের পর আল্লাহর দেওয়া সর্বোত্তম নিয়ামত হলো চিন্তাশক্তি। কারণ, এরই মাধ্যমে আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করি, নতুন কিছু আবিষ্কার করি, নতুন কিছুর সন্ধান করি, ভুল-ত্রুটি প্রকাশ করি আর নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরি; কিন্তু মানুষ সঠিক পদ্ধতিতে এ নিয়ামত থেকে উপকৃত হতে পারে না। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ তার চিন্তাশক্তির কেবল ১% যথাযথভাবে ব্যবহার করে থাকে। দুঃখজনকভাবে আমরা প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের চিন্তাশক্তিকে উপকারী খাতে ব্যবহার করি না। আর ব্যবহার করলেও খুব ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবহার করি। এর কারণ হলো, চিন্তাশক্তির ব্যবহার খুবই কঠিন। তার ওপর ছোটবেলা থেকেই আমরা এর ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। অথচ চিন্তাশক্তির ব্যবহার নিয়ে আমাদের জানা খুবই জরুরী।
আমাদের কাছে যে সকল তথ্য আছে তা নিয়েই আমাদের চিন্তা সুগঠিত হয়। তথ্যগুলো যদি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে আমাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক বা সঠিকের কাছাকাছি হবে; কিন্তু যদি তথ্যগুলো মিথ্যে বা বিকৃত হয়, তাহলে আমাদের চিন্তার ফলাফলও ভুল আসবে। যেমন কেউ আপনাকে এসে জানাল যে, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বেশ সহজ। আপনি তার কথার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যত-পরিকল্পনা সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন। পরে তা আপনার কাছে বেশ কঠিন মনে হলো। পড়াশোনায় এতই চাপ অনুভব করলেন যে, এর ফাঁকে কোনো কাজও করতে পারলেন না। নিঃসন্দেহে হতাশা আপনাকে গ্রাস করবে। এজন্য কুরআনে কারীমে সংবাদ বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যে কোনো ঘটনা সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
আমরা যা পড়ছি বা শুনছি—তা আমাদের চিন্তায় পৌঁছানোর আগেই এর সত্যতা যাচাই করে নিতে হবে। আমরা অনেক কিছুই শুনি, অনেক কিছুই পড়ে থাকি; কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের মন-মগজ যেন সব ধরনের তথ্যে ভর্তি না হয়ে যায়; বরং আমাদের একটি মুক্ত মনের প্রয়োজন। যে মন সবকিছু নিয়ে ভাববে, গবেষণা করবে, সমালোচনা করবে, বিভিন্ন বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বের করবে। আর এটা সম্ভব হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে। যেমন : আমার বন্ধু এত দরিদ্র হলেও সবসময় সুখী থাকে কী করে? আমার শিক্ষক থেকে উপকৃত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা কোনটি? এ মাসে কোন কাজগুলোতে আমি অগ্রাধিকার দেব? আমার ভাই মারা যাওয়ায় মায়ের এত মন খারাপ, তাকে আমি কীভাবে সান্ত্বনা দিতে পারি?
আমরা কেউ যখন কোনো কাজ করতে চাইব, তখন মাথার ভেতরে নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একধরনের প্রশ্নের ঝড় তুলতে হবে। হতে পারে সেটা একাকী বা বন্ধুদের সহায়তায়। ধরা যাক, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয় বাছাই করব। তখন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমি যে বিষয়টা নিতে যাচ্ছি সেটার বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? আমি কি তা পড়ার জন্য প্রস্তুত? এ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে কী কাজ করার সুযোগ পাবো? পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমার কী কী বাধা আসতে পারে? আমি যা নিয়ে পড়ছি সেটাই কি আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত? এভাবে আরও অনেক প্রশ্ন করে যেতে হবে। মাথায় প্রশ্নের ঝড় তোলার সময় কোনো কথা-ই ফেলনা নয়। প্রতিটি চিন্তাই গ্রহণযোগ্য, কোনোটিকেই তুচ্ছ ভাবার সুযোগ নেই। চিন্তাগুলো জমা হওয়ার পর সেগুলোকে ছেকে দুর্বল ও অযৌক্তিক চিন্তাগুলো দূর করে দিতে হবে।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই চূড়ান্ত একটা ক্ষেত্র থাকে, যেখানে বড় ধরনের কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সব ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চিন্তা ও পরামর্শের আশ্রয় নেব। বড় রকমের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনে বড় মাপের প্রভাব ফেলে। যেমন বিয়ে, পড়াশোনা, বাড়ি পরিবর্তন করে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া, দীর্ঘকালের জন্য বিদেশে যাওয়া, বড় একটি প্রকল্পে সমস্ত অর্থ ব্যয় করা ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুইটা ভয়াবহ ত্রুটি আছে আর সেগুলো হলো- তাড়াহুড়ো করা এবং বেপরোয়াভাবে অগ্রসর হওয়া। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথ পড়াশোনা না করা।
চিন্তা করার সময় আমাদের যুক্তি-প্রমাণ খাটাতে হবে। আর এজন্য জীবনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও অনুরূপ ঘটনার শিক্ষা বেশ কাজে আসে। আমাদেরকে নিজ ইন্দ্রিয়গুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। এগুলোও আমাদেরকে অনেক কিছু বলতে চায়, তা শোনার মতো কান তৈরি করে নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অন্তর নামক ইন্দ্রিয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
GG
البر ما اطمأنت إليه النفس ، واطمأنّ إليه القلب ، والإثم ما حاك فى النفس وتردد في الصدر ، وإن أفتاك الناس وأفتوك
পুণ্য হলো যা দ্বারা অন্তর ও হৃদয় প্রশান্ত হয়; আর পাপ হলো যা অন্তরে বিব্রতভাব ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করে। যদিও সেই (দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরিকারী কাজটি) করার জন্য লোকেরা পরামর্শ দেন (তবুও তা করা উচিত হবে না। কারণ, সুস্থ ও প্রশান্ত অন্তর কেবল সেই ক্ষেত্রেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যা মূলত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম)।[১]
তাই আমরা যা পড়ছি, যা শুনছি তা নিয়ে ভেবে দেখব। লেখক যা লিখেছেন তা নিয়ে লেখকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করব। দিনশেষে লেখকও একজন মানুষ। তিনি ভুল করতেই পারেন, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করাও অস্বাভাবিক নয়। বুদ্ধিমান তরুণপ্রজন্ম জানে, কীভাবে বইকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়। এর মাধ্যমে তারা বই থেকে নতুন কিছু শিখে নেওয়ারও চেষ্টা করে।

টিকাঃ
[১] মুসনাদের আহমাদ, ১৮০২৮; সুনান দারিমী, ২৫৩৩; হাদিসটি হাসান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00