📄 আত্মতুষ্টিকে ‘না’
তরুণ প্রজন্ম একটি জাতির ভবিষ্যত। তরুণ-তরুণীরা যখন সৎকর্মশীল, শক্তিশালী, দক্ষ ও দৃঢ় হয়, তখনই জাতি অগ্রসর হতে পারে। আর মুসলিমজাতি তো নিজের অতীত অবস্থান ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এ জাতির এমন এক প্রজন্ম দরকার, যা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উচ্চাশায় ভরপুর। যে প্রজন্ম উম্মাহকে কিছু দিয়ে যেতে পারবে, আর দীর্ঘ পথে ধৈর্যধারণ করবে। এ প্রজন্মের উচ্চাশার কোনো সীমানা থাকবে না। আর এর শুরুটা হতে হবে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করার মাধ্যমে। বিশুদ্ধ নিয়ত ছোট কাজকেও বড় করে তোলে। আর খারাপ নিয়ত বড় কাজকেও তুচ্ছ কাজে পরিণত করে। আমাদের মাঝে যে সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে, সে যেন অল্পতেই আত্মতুষ্টিতে না ভোগে। এ জাতির বড় বড় ব্যক্তিত্বরা কী সুবিশাল আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাশা বহন করতেন তা যদি আমরা জানতাম, তাহলে হয়তো বুঝতে পারতাম, ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি কীভাবে এত সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়েছিল।
হিন্দ বিনত উতবাহ একবার মক্কার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাথে ছিল তাঁর শিশুসন্তান মুআবিয়া। এ সময় এক নারী বলে উঠল, 'তোমার এই ছেলে তো নিজ সম্প্রদায়ের নেতা হবে।' হিন্দ উত্তর দিয়েছিলেন, 'সে যদি শুধু নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে নেতৃত্ব দিতে না পারে তাহলে তার থাকারই দরকার নেই।' পরবর্তী সময়ে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ ২০ বছর সিরিয়া অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন। তারপর আরও ২০ বছর সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। কবি থেকে শুরু করে মনীষী পর্যন্ত-সকলেই তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করে গেছেন।
বিখ্যাত সালাফ জুনাইদ আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যে দৃঢ় প্রত্যয় ও সদিচ্ছা নিয়ে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছে করে, সে তা পাবেই। পুরোটা না পেলেও কিছুটা পাবে।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
উচ্চাশা বিবেক-বুদ্ধিতে পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেয়। আর সামান্যতেই তুষ্ট ব্যক্তি অতি নীচ।
আরবি সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কবি মুতানাব্বী বলেন-
আত্মার আশা যদি ছাড়ায় দিগন্ত
তার দাবি পূরণে দেহ হয় ক্লান্ত।
এমন অনেকেই আছে, যারা ভাবে-যা হয়েছে তার থেকে ভালো হওয়া সম্ভব না। অথবা মনে করে যে, পূর্ববর্তীরা পরবর্তী যুগের লোকজনের করার মতো কিছুই রেখে যায়নি। এরকম নৈরাশ্যবাদীদের কথায় কান দেওয়া যাবে না। কেননা, বর্তমানেই সুযোগ অনেক বেশি, যা আগে ছিল না। আমাদের প্রয়োজন উচ্চাশার, যে উচ্চাশার মাধ্যমে আমরা সময়কে উপযুক্তভাবে কাজে লাগাতে পারবো। ভবিষ্যত পরিকল্পনা না সাজালে সময় বৃথা যায়। এ কথা অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত। তাই সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনাগুলো অকেজো ও বিকল হয়ে যাবে, যদি তা বড় ও সুউচ্চ লক্ষ্যে পরিণত না করা হয়। এটি একটি সার্বজনীন সত্য বিষয়। এর থেকে মুখ ফেরানোর কোনো সুযোগ নেই।
তাই হতাশার করাল গ্রাস থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে হবে। যারা আমাদের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে, পিছু হটতে বলছে তাদের কথা শোনা যাবে না। আমাদেরকে কিছু-না-কিছু অর্জন করতেই হবে, আর তা হতে হবে দ্বীনী মূল্যবোধের সীমার ভেতরে। আমরা আশার লাগাম ছেড়ে দেব। যে স্বপ্ন দেখছি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভাববো। এ ব্যাপারে এক মনীষী বলেছেন- 'কালো চুল বা মসৃণ ত্বক যৌবনের পরিচয় দেয় না; বরং যৌবনের পরিচয় পাওয়া যায় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও শরীর-মনের নিরন্তর ঊর্ধ্বগতির মাঝে।'
তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে ভয় ভেঙে ফেলো। এরপর আমরা চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার ধাপ থেকে কাজ ও বাস্তবায়নের ধাপে পা রাখব।
সামনের দিকে অগ্রসর হতে হলে আত্মিক উন্নয়নে সময় দিতে হবে। আমাদের পতন হবে, তবুও উঠে দাঁড়াবো। হোঁচট খাব, তবুও এগিয়ে যাব। কারণ, মর্যাদালাভের পথটা কাঁটায় পরিপূর্ণ।
বড় মানুষদের আশার মাত্রা বড়। আর ছোট মানুষদের আশার মাত্রা ছোট। কিছু মানুষ মহান হওয়ার সব ক্ষমতাই রাখে; কিন্তু তাদের আর মহান ব্যক্তি হয়ে ওঠা হয় না। এর কারণ, তারা অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে অহেতুক গুরুত্ব দেয়।[১]
টিকাঃ
[১] এই লেখায় আত্মতুষ্ট হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; এর মানে এই না যে, সব ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টি নিন্দনীয় এবং সব ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নন্দিত। যেমন, দাওয়াতি কাজ করে কাফির-মুশরিককে মুসলিম বানানো, দান করা, ইবাদাত পালন, মানবসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্ট হওয়া যাবে না। এসব ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত; কিন্তু পার্থিব ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করা যাবে না। - সম্পাদক।
📄 বিপদ যাবে কেটে
দুনিয়াবি বড় কোনো অর্জনের ফলে আমরা নিজেদের অনেক শক্তিশালী বা ধনী মনে করি। অথচ মহান আল্লাহর কাছে আমাদের শক্তিমত্তা, ধনসম্পদ কিছুই না। তাঁর সামনে আমরা নিতান্তই অসহায় আর গরীব। আল্লাহর দৃষ্টিতে আমাদের অবস্থা কেমন, তা মাথায় রেখে নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। এ ব্যাপারে পাঠকদের জন্য আমার পক্ষ থেকে একটি অমূল্য পরামর্শ রয়েছে। আপনারা প্রত্যেকেই এমন কোনো বিশেষ কাজ করার চেষ্টা করবেন, যা কেবল আপনার ও আল্লাহর মাঝেই থাকবে। তিনি ছাড়া আর কেউ এর কথা জানবে না। পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে এ কাজের বিনিময়ে কিছু চাইবেন। বিশ্বাস রাখবেন যে, আল্লাহ আপনার আহ্বানে সাড়া দেবেন। এ আত্মবিশ্বাস আমাদেরকে তাঁর প্রতি সুধারণা করতে শেখায়।
ওই তিন ব্যক্তির ঘটনা তো সবারই জানা, যারা একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে এক প্রকাণ্ড পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল যে, এটা আল্লাহর আদেশে হয়েছে। আর এ থেকে মুক্তি শুধু আল্লাহর সাহায্যেই সম্ভব। তাদের প্রত্যেকেরই মহান ও বিশেষ কিছু কাজ ছিল। তাই তারা আল্লাহর কাছে নিজ নিজ সৎকাজের বিনিময়ে বিপদ থেকে মুক্তি চাইতে লাগল। ফলে আল্লাহ তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন। আর তারা নিরাপদে বেরিয়ে এলো।
আবার সেই ব্যবসায়ী লোকটির কথা ধরা যাক। তার কাছে যখন কোনো ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তি আসত, সে নিজ কর্মচারীদেরকে বলত, 'তোমরা এই লোকটাকে ছেড়ে দাও। তার কাছে কিছু চেয়ো না। এর বিনিময়ে হয়তো আল্লাহ
আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।' পরে সত্যিই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
এ দু'টি ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিশেষ কাজ মানে হলো এমন এক বিকল্প সঞ্চয়, যাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে কাজে লাগানো যাবে। অথবা একে এমন এক আশ্রয়স্থল বলা যেতে পারে, বড় কোনো বিপদে পড়লে যার আশ্রয় নেওয়া সম্ভব। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই এ দিকটাতে জোর দেওয়া উচিত। আমাদেরকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে সংস্কারক ও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে যেতে হবে। জনসাধারণের উপকারের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর তা সম্ভব হবে সাধ্যমতো চেষ্টা ও অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে। কারণ, কেবল মহান চিন্তা দ্বারা জাতিগঠন সম্ভব না। এ চিন্তাগুলোকে আদর্শ ও সক্ষমতায় ফুটিয়ে তুলতে পারাই প্রকৃত সফলতা। যে যত ভালো দৃষ্টান্ত পেশ করতে পারবে, সে তার দেশগঠনে তত বেশি অবদান রাখতে পারবে।
দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যে অনেক সহায়-সম্পদ বা ক্ষমতা থাকতে হবে এমন নয়; বরং এজন্য সদিচ্ছার প্রয়োজন। যেমন আমাদের মাঝে কেউ নিজ এলাকার কোনো অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে পারে।
যদি বাইরের কাউকে সাহায্য করা সম্ভব না হয়, আমরা নিজ পরিবারের উপকারের মাধ্যমেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। যেমন প্রতিদিন ফজরের সালাতের এক-আধ ঘণ্টা আগে উঠে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা, এরপর পরিবারের লোকদের ফজরের জন্য জাগিয়ে দেওয়া। এজন্য অর্থকড়ি বা প্রবল শক্তির প্রয়োজন নেই। অথচ আপাতদৃষ্টিতে সামান্য এ কাজের প্রভাব অসামান্য।
সামর্থ্য কম হলে অল্প অথচ নিয়মিত দানের অভ্যাসও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে। আবার ধরা যাক, কারও অল্পকিছু দানেরও সামর্থ্য নেই; কিন্তু সে হয়তো পণ করেছে জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন মিথ্যের আশ্রয় নেবে না, সবসময় সত্য কথাই বলবে।
একইভাবে কেউ সময়ানুবর্তী হয়ে, কেউ বা মা-বাবার একান্ত বাধ্যগত সন্তান হয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত রেখে যেতে পারে।
তাই সবসময় প্রভাব-প্রতিপত্তি, বংশ-মর্যাদা, বা অর্থ-কড়ির পেছনে না ছুটে আমাদের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পেছনে শ্রম দিতে হবে। আমাদের বিশেষ কাজগুলোতে নতুনত্ব
আনতে হবে; এতে করে সমাজ উন্নয়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। আর সবসময় মাথায় রাখতে হবে, আমরা যেভাবে নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো ঢেকে রাখি, ঠিক সেভাবে নিজের ভালো কাজগুলোও গোপন রাখব। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অন্য কাউকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি না করে ভালো কাজ প্রকাশ করাও যেতে পারে। এর অনুমতিও রয়েছে।
📄 ইচ্ছাশক্তি
কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য আমাদের দুটো জিনিসের প্রয়োজন : ইচ্ছে ও সক্ষমতা। আমরা যদি নিজেদেরকে প্রশ্ন করি, কাজে সফল হওয়ার জন্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ইচ্ছে নাকি সক্ষমতা? নির্দ্বিধায় উত্তর আসবে–ইচ্ছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেন? কারণ, মানুষ যখন কিছু পেতে চায়, তখন তার ইচ্ছেই তাকে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দুয়ার খুলে দেয়। যেমন-যে ক্ষুধার্ত লোকের কোনো খাবার নেই, তার খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাকে খাদ্য অন্বেষণের দিকে ঠেলে দেয়। সে খাবারের খোঁজে নানারকম চেষ্টা চালায়। প্রয়োজনে অনেক ফন্দিও আঁটে। তীব্র ইচ্ছে থাকলে অক্ষম ব্যক্তিও সক্ষম হয়ে যায়, সামান্য কিছু থেকেই বড় কিছু তৈরি করে ফেলতে পারে; কিন্তু ইচ্ছে না থাকলে সক্ষম ব্যক্তির পক্ষেও কিছু করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, একজন লোক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার বাড়ির পাশেই সবচেয়ে ভালো হাসপাতালটি আছে। সেখানে বিনামূল্যে সর্বোত্তম চিকিৎসা দেওয়া হয়; কিন্তু সে কোনো এক কারণে হাসপাতালে যেতে রাজি হচ্ছে না। ফলে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, তার তো আরোগ্যলাভের ইচ্ছেই নেই।
এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন-
প্রথমত, সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে এত পার্থক্যের কারণ হলো আকাঙ্ক্ষার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। সফলতা অনেকাংশেই মানুষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে, সামর্থের ওপর নয়। যেমন কারও হয়তো প্রতিদিন এক ঘণ্টা পড়ার ক্ষমতা রয়েছে। সে চাইলেই প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে সালাত আদায় করতে যেতে পারে। রাস্তায় যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হয় তাকেই সালাম দিতে
পারে; কিন্তু সে এর কোনোটিই করে না। কারণ, তার সক্ষমতা থাকলেও ইচ্ছে নেই। অথচ আরেকজন এর সবগুলোই করে। কারণ, সে ইচ্ছে রাখে, সেইসাথে তার সক্ষমতাও আছে।
দ্বিতীয়ত, এমন অনেক মানুষ আছে, যারা দুরবস্থার কারণে সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না; কিন্তু ইচ্ছেকে জোরালো করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর বিশেষ রহমত। বিশেষ করে আমরা যারা দরিদ্র ও দুর্বল, তাদের জন্য এটি আল্লাহর দেওয়া এক অসাধারণ উপহার। তাই যেসব তরুণ সুউচ্চ লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হয় না, তাদের আদৌ কোনো অজুহাত নেই।
তৃতীয়ত, আমরা অনেক সময়ই ইচ্ছে ও সক্ষমতাকে এক করে ফেলি। আমরা বলি, এ কাজটি আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। অথচ আসল কথা হলো, আমরা কাজটা করতে চাচ্ছি না। তাবুক যুদ্ধে যখন মুনাফিকরা না যাওয়ার অজুহাত হিসেবে তাদের অক্ষমতার কথা বলেছিল, তখন আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন—
وَسَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
আর তারা এমনই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরামিথ্যাবাদী [১]
কিন্তু পরে আল্লাহ বলে দিলেন যে, এটা তাদের সক্ষমতার বিষয় নয়; বরং তাদের ইচ্ছের বিষয়। তিনি বলেন—
وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةٌ
আর যদি তারা বের হবার ইচ্ছে করত, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করত। [২]
প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা সবাই নিজেদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখি, আমাদের
সমস্যা আসলে কোথায়? সক্ষমতায়, নাকি ইচ্ছেয়? গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য হব যে, আমাদের ঘাটতিগুলোর কারণ হলো, আমাদের ইচ্ছেশক্তির স্বল্পতা। তাই আমাদের ইচ্ছেশক্তিকে বাড়াতে হবে।
এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হলো নিজ প্রবৃত্তি ও বাজে অভ্যাস-ত্যাগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আর এ সাহায্য অর্জনের উপায় হলো নফসের সাথে সংগ্রাম করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
যারা আমার পথে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব।[১]
তিনি আরও বলেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا
তারা সবর করত বিধায় আমরা তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমাদের আদেশে পথ প্রদর্শন করত।[২]
তাই মনের সাথে সংগ্রাম করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান কাজে আসবে না।
ইচ্ছেশক্তি বাড়ানোর আরেকটি উপায় হলো, মনে মনে নিজের পরিকল্পনাগুলো আওড়ানো। যেমন, 'আমি অমুকের কল্যাণ চাই, তাই তাকে সাহায্য করব'।
অথবা, 'আমি মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করতে চাই, ইন শা আল্লাহ, এটা করবোই। আমার ইচ্ছে দুর্বল নয়, বরং তা খুবই দৃঢ়' ইত্যাদি।
অর্থাৎ আমরা নিজেই নিজেকে অনুপ্রেরণা দেব।
এছাড়াও ইচ্ছেশক্তিকে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করতে হবে।
এরপর বড় কাজে হাত দিতে হবে। যেমন—আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যে কিনা সারাদিন একটুও পড়াশোনা করে না। সে প্রতিদিন বিশ মিনিট পড়ার সময় নির্ধারণ করে নিতে পারে। এভাবে এক বছর যাওয়ার পর, পড়ার সময়সীমা চল্লিশ মিনিটে উন্নীত করতে হবে। একসময় দেখা যাবে, পড়াশোনা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ইচ্ছেশক্তি বাড়াতে মনের কিছু চাহিদাকে অপূর্ণ রাখা জরুরী। কাজের ফাঁকে এক কাপ চা খেতে মন চাইছে, অথবা একজনের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে ইচ্ছে করছে। এক ঘণ্টা পর সেটা করা যেতে পারে।
আবার কারও হয়তো তেমন দরকারি নয় এমন কিছু কিনতে মসজিদ থেকে দ্রুত বের হতে ইচ্ছে করছে। এক্ষেত্রে ইচ্ছেকে প্রশ্রয় না দিয়ে দেরি করে বের হতে হবে। আর যদি মন বলে অপ্রয়োজনীয় কিছু কিনতে, তাহলে তা কেনারই দরকার নেই। সরাসরি তার দাবি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে।
একটা খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করলে তার জায়গায় আরেকটা ভালো অভ্যাস প্রবেশ করাতে হয়। আগে হয়তো আপনি বেশি বেশি অভিযোগ করতেন, এখন তা করা ছেড়ে দিয়েছেন। তার পরিবর্তে বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে, হোক তা গোপনে বা প্রকাশ্য। যে ব্যক্তি খুব বেশি ঘুমায়, সে ঘুম কমিয়ে অন্য কোনো উপকারী কাজে নিজেকে ব্যস্ত করতে পারে।
এছাড়াও আমাদেরকে দৃঢ় সংকল্প ও প্রত্যয়ের অধিকারী মানুষদের সাথে চলাফেরা করতে হবে। এতে নিজের অজান্তেই তাদের দৃঢ়তা ও আত্মিক শক্তি নিজের মাঝে সঞ্চারিত হবে। আমরা তাদের থেকে শিখে নিতে পারি, কী করে নিজের অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছেকে দমন করতে হয়, আর সদিচ্ছাকে জাগ্রত করতে হয়।
টিকাঃ
[১] সূরা তাওবা, ০৯: ৪২
[২] সূরা তাওবা, ০৯: ৪৬
[১] সূরা আনকাবূত, ২৯ : ৬৯
[২] সূরা সাজদা, ৩২: ২৪
📄 পড়ো
জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রথম বার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যে শব্দটি নিয়ে এসেছিলেন তা হলো—‘ইক্করা’ অর্থাৎ পড়ো। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কোনো জাতির উত্থানের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক শর্ত হলো পড়াশোনা।
চিন্তার বিকাশে, সবকিছু সম্পর্কে ধারণা সুস্পষ্ট করতে বই পড়ার বিকল্প নেই।
বই ইতিহাসের মহান সব ব্যক্তি ও আমাদের মাঝে সেতু নির্মাণ করে দেয়। এজন্য তাঁদের প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী, রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত জানতে আমাদের প্রচুর পড়তে হবে। সেইসাথে খেয়াল রাখতে হবে, মিডিয়া যেন আমাদেরকে বই থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন উপকারী কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যেই পড়ে থাকি; কিন্তু যখন টিভির সামনে বসি, তখন উপকারী-ক্ষতিকর, বৈধ-অবৈধ সবই আমাদের চোখে পড়ে।
আর মনে রাখতে হবে, আমরা যা-কিছু শুনি, তার চেয়ে যা-কিছু পড়ি, তা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কখনো কখনো একটি বই পড়া কারও সাহচর্যের থেকে উত্তম। তাই আমাদেরকে উপযুক্ত বই বাছাইয়ের জন্য কষ্ট করতে হবে। কারণ, বই হলো জামার মতো। জামার সুতা ভালো হওয়ার চাইতে তা শরীরের সাথে কতটুকু খাপ খায় সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এমন বাজে বই কিনি, যা আমাদের আগ্রহ, প্রয়োজন ও ধাপের সাথে মানানসই নয়, তাহলে টাকা তো গচ্চা যাবেই, সেইসাথে সময়ও নষ্ট হবে। মাঝে মাঝে আমাদের হাতের কাছে এমনকিছু বই থাকে, যার কোনো কোনোটি বুঝতে সহজ, অনায়াসেই পড়ে ফেলা যায়। আবার কোনোটি মোটামুটি কঠিন, যা পড়তে বেশ মনোযোগ দেওয়া লাগে।
এক্ষেত্রে আমরা যেন দ্বিতীয়টি বেছে নিতে কুণ্ঠাবোধ না করি। কারণ, আমরা চাই, বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানের জগতে বিচরণ করতে। আর জ্ঞানের জগত যদি আমাদের তুলনায় একটু উঁচুতে না থাকে, তবে সেখান থেকে আমরা কোনো বাড়তি উপকার পাব না। এজন্য সহজ বই পড়ে তুষ্ট হয়ে গেলে চলবে না। মানুষ জানা জিনিসটাই সহজে বুঝতে পারে। তাই আমরা যদি কোনোকিছু পড়তে গিয়ে অনায়াসে সব বুঝে ফেলি, তাহলে ধরে নিতে হবে সে বিষয়টি আমাদের আগে থেকেই জানা। অর্থাৎ বইটা পড়লে জানা জিনিস আবার পড়া হবে, এ ছাড়া আর কিছু নয়।
আমাদের মনোযোগ সহকারে বই পড়া উচিত, বইয়ের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্তে আনা উচিত। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলোর নিচে দাগ দেওয়া অথবা কাগজে লিখে রাখা যেতে পারে। আর বইয়ে যা আছে তার সবই নিজের মাঝে ধারণ করার চেষ্টা করা উচিত এবং সেসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। তা না হলে বইয়ের বিষয়বস্তু আমাদের আয়ত্তে আসবে না।
একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে, ভালো বই নেই। প্রকৃতপক্ষে ভালো পাঠক নেই। কারণ, যে বেশি বই পড়ে, সে ভালো পাঠক নয়; বরং যে একটা বই ভালোমতো পড়ে, সে-ই ভালো পাঠক। এ কারণে আক্কাদ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন—
একটি বই ভালোমতো তিনবার পড়া, ভালো তিনটি বই একবার করে পড়ার থেকে বেশি উপকারী।
আমরা যদি প্রতিদিন ১৫ মিনিট করেও পড়ি, তাহলে বছরে ২০টি মাঝারি আকারের বই শেষ করতে পারব। এও কিন্তু কম কিছু নয়। আর যদি প্রতিদিন কোনো বিষয়ে আধা ঘণ্টা কোনো বই পড়ি, তাহলে পাঁচ বছরের মাথায় সে বিষয়ে দক্ষ হয়ে যেতে পারব।
তাই আমরা মাসিক খরচের একটি নির্ধারিত অংশ বই কেনার জন্য আলাদা করে রাখতে পারি। খুব ভালো হয় যদি ঘরে ছোটখাট একটা লাইব্রেরি গড়ে তোলা যায়।
আমাদের প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় সূক্ষ্মভাবে গবেষণা করে পড়ার চেষ্টা করা দরকার। বিশেষ করে উদীয়মান ভালো লেখকদের বই পড়া উচিত, যাতে করে নতুন ও গ্রহণযোগ্য জ্ঞান অর্জিত হয়।
আর যারা মনে করে বই পড়ার সময় নেই, তাদের জন্য পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের কাজের জন্য একটি রুটিন তৈরি করে নেওয়া। দৈনন্দিন কাজ সঠিক উপায়ে ভাগ করে নিতে পারলেই দিনশেষে বই পড়ার জন্য বেশ বড় একটা সময় পাওয়া যায়।