📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 কখনোই ভেঙো পড়ো না

📄 কখনোই ভেঙো পড়ো না


এ দুনিয়ায় আমাদেরকে কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম জানতে হয়, সেগুলোকে মেনে চলতে হয়। এ নিয়মগুলো আমাদের জীবনে বাধা সৃষ্টি করার জন্য নয়, বরং দুনিয়ার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। এ নিয়মের ছায়াতলেই জীবনের সব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
ব্যর্থতা জগতের এমনই এক অনিবার্য নিয়ম যে, আমরা সবসময় একইভাবে আমাদের প্রচেষ্টার ফলাফল পাব না। যতই আমরা বড় কিছু অর্জনের দিকে ছুটব, ততই আমাদের কাজকর্ম নিখুঁত হতে হবে, সেইসাথে ঝুঁকির পরিমাণও বাড়বে। তাই এ বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে, এর সাথে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ইসলামের কিছু শিক্ষা আছে, যা আমাদেরকে বড় লক্ষ্যের দিকে আহ্বান করে, এবং অল্পেই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নিষেধ করে।
আমাদেরকে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ, যারা ঝুঁকি নেয় না, তারা কখনোও সফল হতে পারে না। অথবা সফল হলেও তা খুবই নগণ্য। আল্লাহ যে ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন, এর মাঝে আমরা এ কথার প্রতিফলন দেখতে পাই। ব্যবসার মাঝে ঝুঁকি আছে। তবু এতে লাভের দিগন্তটা বিস্তৃত, সুবিশাল। অন্যদিকে সুদের মাঝে সাধারণত ঝুঁকি থাকে না, কিন্তু এতে লাভটা সবসময় নির্ধারিত এবং হিসেবে কমই।
জীবনে বার বার লক্ষ্য অর্জিত না-ও হতে পারে, পদে পদে হোঁচট খেতে হতে পারে। এটাই জগতের নিয়ম। ব্যর্থতাকে জীবনে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে। বড়মাপের অর্জন করতে হলে অধিক পরিশ্রম আর চেষ্টা করা প্রয়োজন।
কারণ, সম্ভাবনার দুয়ার সহজে খুলবে না, সবার জন্য উন্মোচিত হবে না। ব্যর্থ হলে ধরে নিতে হবে আমরা বড় কিছু অর্জনের চেষ্টায় আছি। একমাত্র অলস, পশ্চাৎপদ আর উচ্চাশা বঞ্চিতরাই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়।
আমাদেরকে ভাগ্যের লিখনে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর হুকুম তো বাস্তবায়ন হবেই। এর কোনো নড়চড় নেই। আমরা মানুষেরা খুবই কমই জানি, খুবই কম বুঝি। আমরা হয়তো কোনো কিছু আঁকড়ে ধরি, তা অর্জনের জন্য উঠেপড়ে লাগি। পরে দেখা যায়, সেটার মাঝে বড় ধরনের ক্ষতি লুকিয়ে ছিল, অথবা সেটা ছিল আদতে তুচ্ছ একটা বিষয়। তাই সবসময় আল্লাহর এ বাণীটি মনে রাখতে হবে—
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করবে—যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, হয়তো তোমরা এমন কিছু পছন্দ করবে—যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না। [১]
এজন্য আমাদেরকে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। এরপর ফলাফল যা-ই হোক না কেন, প্রশান্ত মনে, সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নিতে হবে।
আমাদের জীবনে যা-কিছু ঘটে, তা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না; বরং ঘটনাগুলো আমাদের অন্তর কীভাবে গ্রহণ করছে তা-ই পার্থক্য গড়ে দেয়। যেমন—কেউ হয়তো প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তার হৃদয় যদি আগে থেকেই গভীর হতাশায় ডুবে থাকে, তাহলে প্রিয়জন হারানোর শোকে সে জীবনপথের দিশা হারিয়ে ফেলবে। অপরদিকে সে যদি প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হয়, তাহলে এ শোক তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। তাই জীবনে কী ঘটল তা বিবেচনা না করে, আমাদেরকে নিজ অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সবকিছুকে বিচার করতে হবে। সমুদ্রের পানি জাহাজকে ধারণ করে, জাহাজের কোনো ক্ষতি করে না; কিন্তু যখন সেই পানি জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তা জাহাজকে ডুবিয়ে ছাড়ে। আমাদের সাথে ঘটা যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই এমনটা হয়।
তাই ব্যর্থতাকে সাদরে গ্রহণ করে নিতে হবে। যতবারই আমরা ব্যর্থ হব, ততবারই প্রবল শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ইতিহাস ঘেঁটে আমরা শিক্ষা নেব। বন্ধ রাস্তাগুলো চিনে নেব, যাতে ওই পথে আর সময় নষ্ট না হয়। আমরা এমনভাবে নতুন পথের দিকে এগিয়ে যাব, যেন আশেপাশের মানুষ এই বার্তা পায় যে—ব্যর্থতা নবজাগরণের নতুন পথ দেখিয়ে দিয়েছে, নতুন উদ্যোম ও সাহস যুগিয়েছে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ২১৬

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সুখ

📄 সুখ


সুখের সংজ্ঞা সবার কাছে একরকম নয়। বিজ্ঞ লোকেরা বলেন—সুখ এক ধরনের আত্মিক অনুভূতি। কেউ আবার এ কথা মানতে নারাজ; বরং পালটা প্রশ্ন করে বসে, তাহলে কি প্রচার-মাধ্যমের কথাগুলো ভুল? তারা তো বলছে সুখ আছে ধন-সম্পদে, ভালো চাকরিতে, কিংবা ভ্রমণে! বঞ্চিতদের মানসিক সান্ত্বনা দিতেই কি সুখকে আত্মিক অনুভূতি বলা হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রথমেই আমাদেরকে সুখ ও স্বাদের মাঝে পার্থক্য করতে হবে। কোনোকিছু খেলে, স্পর্শ করলে বা তাকালেই স্বাদ অনুভূত হয়। এটা একটা সাময়িক অনুভূতি। পানাহার করা, নরম বিছানায় ঘুমানোর যে স্বাদ, তা যতক্ষণ আমরা এগুলো করছি, ততক্ষণই পাই। এরপর সেগুলো ছেড়ে দিলেই স্বাদ শেষ। তখন এ স্বাদটা হয়ে যায় স্মৃতি। আর যদি কেউ হারাম কোনো স্বাদ ভোগ করে তাহলে তার আত্মিক কষ্ট অনুভূত হয়। তার ভেতরে আফসোস ও তিরস্কারের অনুভূতি জন্ম নেয়। কারণ, সে অনুভব করতে পারে যে, সে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত ছিল। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুর্বল ছিল।
অপরদিকে সুখ সাময়িক বিষয় নয়। এ যেন প্রশান্তি, আনন্দ আর সন্তুষ্টির সাগরে অবগাহনের অনুভূতি। এ অনুভূতি তখনই হয় যখন ব্যক্তি বুঝতে পারে যে, সে সঠিক পথে চলছে, সঠিক অবস্থানেই আছে এবং সঠিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যখন ব্যক্তি অনুভব করে যে, সে নিজ মূল্যবোধ, নীতি ও পন্থা অনুসারে জীবনযাপন করছে, তখন সে সুখ পায়। এ কারণে-ই ঈমানদার ব্যক্তিরা সবচেয়ে সুখী এবং সর্বাধিক প্রশান্ত। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন—
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যে ঈমানদার নারী বা পুরুষ সৎকর্ম করে তাকে আমরা উত্তম জীবনযাপন করাবো এবং তাদের সর্বোত্তম কাজের জন্য প্রতিদান দেব।[১]
তিনি আরও বলেন-
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে শিরক মিশ্রিত করেনি তাদের জন্যেই রয়েছে নিরাপত্তা আর তারাই সুপথপ্রাপ্ত [২]
* সুখ তো তখনই পাওয়া যায়, যখন আমরা পরম করুণাময়ের সামনে বিগলিত হয়ে প্রার্থনা করি, তাঁর কাছেই চাই এবং তাঁর কাছেই নিজের অভিযোগ পেশ করি।
* সুখ পাওয়া যায় নিজের কুপ্রবৃত্তিকে পরাজিত করার মাধ্যমে, খারাপ কাজের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার মাধ্যমে।
* সুখ যেন আতরের মতো। অন্য কাউকে সুবাসিত করতে গেলে নিজের হাতেও সে সুবাস রয়ে যায়। তাই তো অন্যের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোতেই সুখ পাওয়া যায়।
* সুখ রয়েছে মহৎ সব চেতনার মাঝে, যা আমাদেরকে উত্তম কথা বলতে শেখায়, এর সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে শেখায়।
* আর সুখ রয়েছে মহান কিছু অর্জনে, যে অর্জন আমাদের শরীর ও মনকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখে।
* শিশুর মুচকি হাসি, বন্ধুর আবেগমাখা চিঠি কিংবা ছোট্ট চড়ুইয়ের কিচিরমিচির— এসবই আমাদের মাঝে এক অপার্থিব অনুভূতির সৃষ্টি করে। এরই নাম সুখ।
আমরা যেন ভোগবিলাসকে সুখের সাথে মিলিয়ে না ফেলি। আত্মিক এ অনুভূতিকে লালন করতে হলে আমাদের সবসময় সৎকাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে। অলসতা, বেকারত্ব, বিশৃঙ্খলাকে বিদায় জানাতে হবে। তবেই না চিরন্তন সুখ লাভ করা সম্ভব!
মনে রাখতে হবে, সুখ শুধু নিজের মাঝে বন্দী করে রাখার জিনিস নয়, সুখকে পরিবার-পরিজন আর বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্যের মুখে হাসি ফোটানো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি বড় মাধ্যমে। মূলত সুখ পাওয়া যায় অল্পে তুষ্ট থাকার মাঝে। তাই নিজের সামনে যা-কিছু আছে সবকিছুকেই সুখের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, ১৬:৯৭
[২] সূরা আনআম, ০৬ : ৮২

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 আমরা ভালো বন্ধু হবো

📄 আমরা ভালো বন্ধু হবো


আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে বিনামূল্যে কিছুই পাওয়া যায় না। আর ঘনঘন দামের উত্থান-পতন ঘটে—এমন জিনিসের সংখ্যাই এখানে বেশি। মানবিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। এ কারণে অধিকাংশ মানুষ ভয় পায়, মনকে সংকীর্ণ করে ফেলে। তারা এমন সম্পর্ক খুঁজে ফেরে, যা মানবিক ও কল্যাণকর। আর কেবল প্রকৃত বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের মাঝেই তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে আমাদের জীবন যেন এক রৌদ্রতপ্ত মরুভূমি। এ মরুভূমিতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু নির্মল বাতাসের মতো, সুশীতল ছায়ার মতো। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় এক ফোঁটা ঠান্ডা জলের মতো; কিন্তু কী করলে এমন বন্ধু পাওয়া যাবে? এজন্য প্রথমেই আমাদেরকে ভালো বন্ধু হওয়ার শর্তগুলো জানতে হবে। তবেই আমরা প্রকৃত বন্ধু নির্বাচন করতে পারব, অন্যদের ক্ষেত্রে নিজেরাও ভালো বন্ধু হতে পারব।
বন্ধু নির্বাচনে প্রথমেই দেখতে হবে, সে সৎকর্মশীল কি না। তার সাহচর্যে আমি উপকৃত হবে কি না, তার চরিত্র থেকে উত্তম কিছু গ্রহণ করা সম্ভব কি না। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
"
إنَّما مثل الجليس الصالح والجليس السوء ، كحامل المسك ونافخ الكير فحامل المسك ، إما أن يُحذيك ، وإما أن تبتاع منه ، وإما أن تجد منه ريحًا طيبة ونافخ الكير ، إما أن يحرق ثيابك ، وإما أن تجد ريحا خبيثة
ভালো বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর উদাহরণ যেন সুগন্ধি বহনকারী ও হাপরে ফুঁকদানকারীর[১] মতো। সুগন্ধি বহনকারী তোমাকে কিছু দেবে অথবা তুমি তার থেকে কিনবে অথবা অন্তত তার থেকে সুঘ্রাণ হলেও পাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে নতুবা তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে।[২]
তাই খারাপ বন্ধু থেকে সাবধান। এদের কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই। এদের প্রভাব আমরা যতটা মনে করি, তার থেকেও মারাত্মক। বন্ধু জাগতিক উপকারে আসছে কি না—সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং দেখতে হবে, বন্ধু আল্লাহর পথে চলছে কি না। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন—
GG
أين المتحابون بجلالي ، اليوم أظلُّهم في ظلي يوم لا ظل إلا ظلي যারা আমার মর্যাদাবান সত্তার জন্য একে অপরকে ভালোবাসত তারা কোথায়? আজকে তাদেরকে আমার (আরশের) ছায়ায় ছায়া দেব। এমন এক দিনে—যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই।[৩]
প্রকৃত ভালো বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা খুব কম মানুষেরই আছে। এজন্যই উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন—
GG
إذا أصاب أحدكم ودّاً من أخيه فليتمسك به، فقلما يصيب ذلك
তোমাদের কেউ যদি তার ভাইকে ভালোবেসে থাকে, তবে যেন এটা বজায় রাখে। কেননা, সে কম মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটা করতে পারবে।[৪]
মানুষ অভিযোগ করে তার বন্ধুসংখ্যা খুব কম। তারা অসংখ্য প্রকৃত বন্ধুর আশা করে। অথচ এ রকম পাওয়া কঠিন। আবার এমনও মানুষ আছে, যে একটাও ভালো বন্ধু
খুঁজে পায় না। কেননা, সে নিজেই তেমন ভালো মানুষ নয়। আবার বন্ধুত্বের দাবিতে অনেক দায়ভার চেপে বসবে, এ আশঙ্কায়ও অনেকে বন্ধুর সংখ্যা কমিয়ে ফেলে।
আমরা যেন বন্ধুদের আস্থাভাজন হতে পারি। তারা যেন প্রতিনিয়ত অনুভব করতে পারে যে, বিপদাপদে আমরা তাদের পাশেই আছি। তারা যেন আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে কোনো দ্বিধায় না ভোগে, খোঁটার ভয় না করে। বন্ধুরা যেন তাদের গোপন কথা নির্ভয়ে আমাদেরকে বলতে পারে। আমরাও যেন তাদের কথার গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারি, এমনকি পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেও!
বন্ধুদের ভুল-ত্রুটি থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখতে হয়। তাদের দোষ পেলে তা ঢেকে ফেলতে হয়। এক মনীষী বলেছিলেন—
| আমি কোথায় পাবো এমন মানুষ, যাকে রাগালে সে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে জবাব দেয়?
আরেকজন বলেছেন—
| আমি এমন বন্ধু খুঁজি, যার সাথে খারাপ আচরণ করে ফেললেও সে আমার সাথে ভালো আচরণ করে।
উপরের উক্তি দু'টি প্রমাণ করে যে, বন্ধুত্বের কিছু দাবি আছে। এর মধ্যে একটি হলো—তাকে গোপনে উপদেশ দেওয়া এবং অন্যদের সামনে তার প্রশংসা করা। পাশাপাশি তার আপাত নেতিবাচক কথাগুলোর ভালো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টাও বন্ধুত্বের দাবি।
আমাদের নিজেদেরকেই ভালো বন্ধু হতে হবে। বন্ধুরা ভালো হয়ে যাবে—এ অপেক্ষায় থাকলে চলবে না; কেননা, বন্ধুর প্রতি কোনো কিছু নিবেদনের বিপরীতে প্রতিদানের অপেক্ষা করা বন্ধুত্বের পরিপন্থী। মূলত বন্ধুত্ব একটি ছোট্ট চারাগাছের মতো। এতে ঘন ঘন পানি দিতে হয়, এর যত্ন নিতে হয়। তা না হলে চারাগাছ মরে যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, বন্ধুত্ব কোনো দায়ভার নয়, কোনো অতিরিক্ত বোঝাও নয়। আমরা বন্ধুদের সাথে যেমন আচরণ করব, তেমনটাই তাদের থেকে পাব। তারা যেমন আমাদের থেকে ভালো ব্যবহার পাচ্ছে, এর বিপরীতে তাদের ভালো ব্যবহারও আমরা পেয়ে যাব।

টিকাঃ
[১] হাপরে ফুঁকদানকারী বলতে আমাদের দেশের কামারকে বোঝানো হয়েছে, যারা জলন্ত কয়লায় বিশেষ পদ্ধতিতে ফুঁ দিয়ে আগুন দীর্ঘ সময় জ্বালিয়ে রাখে এবং এতে লোহা পুড়িয়ে দা, কোদাল, খুন্তি, কাস্তে ইত্যাদি লোহার জিনিসপত্র বানায়। - সম্পাদক
[২] সহীহ মুসলিম, ২৬২৮
[৩] সহীহ মুসলিম, ২৫৬৬
[৪] আবকারিয়াতু উমার, আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ, পৃষ্ঠা ২৯০

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 আত্মতুষ্টিকে ‘না’

📄 আত্মতুষ্টিকে ‘না’


তরুণ প্রজন্ম একটি জাতির ভবিষ্যত। তরুণ-তরুণীরা যখন সৎকর্মশীল, শক্তিশালী, দক্ষ ও দৃঢ় হয়, তখনই জাতি অগ্রসর হতে পারে। আর মুসলিমজাতি তো নিজের অতীত অবস্থান ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এ জাতির এমন এক প্রজন্ম দরকার, যা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উচ্চাশায় ভরপুর। যে প্রজন্ম উম্মাহকে কিছু দিয়ে যেতে পারবে, আর দীর্ঘ পথে ধৈর্যধারণ করবে। এ প্রজন্মের উচ্চাশার কোনো সীমানা থাকবে না। আর এর শুরুটা হতে হবে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করার মাধ্যমে। বিশুদ্ধ নিয়ত ছোট কাজকেও বড় করে তোলে। আর খারাপ নিয়ত বড় কাজকেও তুচ্ছ কাজে পরিণত করে। আমাদের মাঝে যে সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে, সে যেন অল্পতেই আত্মতুষ্টিতে না ভোগে। এ জাতির বড় বড় ব্যক্তিত্বরা কী সুবিশাল আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাশা বহন করতেন তা যদি আমরা জানতাম, তাহলে হয়তো বুঝতে পারতাম, ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি কীভাবে এত সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়েছিল।
হিন্দ বিনত উতবাহ একবার মক্কার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাথে ছিল তাঁর শিশুসন্তান মুআবিয়া। এ সময় এক নারী বলে উঠল, 'তোমার এই ছেলে তো নিজ সম্প্রদায়ের নেতা হবে।' হিন্দ উত্তর দিয়েছিলেন, 'সে যদি শুধু নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে নেতৃত্ব দিতে না পারে তাহলে তার থাকারই দরকার নেই।' পরবর্তী সময়ে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ ২০ বছর সিরিয়া অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন। তারপর আরও ২০ বছর সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। কবি থেকে শুরু করে মনীষী পর্যন্ত-সকলেই তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করে গেছেন।
বিখ্যাত সালাফ জুনাইদ আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
যে দৃঢ় প্রত্যয় ও সদিচ্ছা নিয়ে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছে করে, সে তা পাবেই। পুরোটা না পেলেও কিছুটা পাবে।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
উচ্চাশা বিবেক-বুদ্ধিতে পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেয়। আর সামান্যতেই তুষ্ট ব্যক্তি অতি নীচ।
আরবি সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কবি মুতানাব্বী বলেন-
আত্মার আশা যদি ছাড়ায় দিগন্ত
তার দাবি পূরণে দেহ হয় ক্লান্ত।
এমন অনেকেই আছে, যারা ভাবে-যা হয়েছে তার থেকে ভালো হওয়া সম্ভব না। অথবা মনে করে যে, পূর্ববর্তীরা পরবর্তী যুগের লোকজনের করার মতো কিছুই রেখে যায়নি। এরকম নৈরাশ্যবাদীদের কথায় কান দেওয়া যাবে না। কেননা, বর্তমানেই সুযোগ অনেক বেশি, যা আগে ছিল না। আমাদের প্রয়োজন উচ্চাশার, যে উচ্চাশার মাধ্যমে আমরা সময়কে উপযুক্তভাবে কাজে লাগাতে পারবো। ভবিষ্যত পরিকল্পনা না সাজালে সময় বৃথা যায়। এ কথা অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত। তাই সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনাগুলো অকেজো ও বিকল হয়ে যাবে, যদি তা বড় ও সুউচ্চ লক্ষ্যে পরিণত না করা হয়। এটি একটি সার্বজনীন সত্য বিষয়। এর থেকে মুখ ফেরানোর কোনো সুযোগ নেই।
তাই হতাশার করাল গ্রাস থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে হবে। যারা আমাদের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে, পিছু হটতে বলছে তাদের কথা শোনা যাবে না। আমাদেরকে কিছু-না-কিছু অর্জন করতেই হবে, আর তা হতে হবে দ্বীনী মূল্যবোধের সীমার ভেতরে। আমরা আশার লাগাম ছেড়ে দেব। যে স্বপ্ন দেখছি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভাববো। এ ব্যাপারে এক মনীষী বলেছেন- 'কালো চুল বা মসৃণ ত্বক যৌবনের পরিচয় দেয় না; বরং যৌবনের পরিচয় পাওয়া যায় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও শরীর-মনের নিরন্তর ঊর্ধ্বগতির মাঝে।'
তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে ভয় ভেঙে ফেলো। এরপর আমরা চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনার ধাপ থেকে কাজ ও বাস্তবায়নের ধাপে পা রাখব।
সামনের দিকে অগ্রসর হতে হলে আত্মিক উন্নয়নে সময় দিতে হবে। আমাদের পতন হবে, তবুও উঠে দাঁড়াবো। হোঁচট খাব, তবুও এগিয়ে যাব। কারণ, মর্যাদালাভের পথটা কাঁটায় পরিপূর্ণ।
বড় মানুষদের আশার মাত্রা বড়। আর ছোট মানুষদের আশার মাত্রা ছোট। কিছু মানুষ মহান হওয়ার সব ক্ষমতাই রাখে; কিন্তু তাদের আর মহান ব্যক্তি হয়ে ওঠা হয় না। এর কারণ, তারা অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে অহেতুক গুরুত্ব দেয়।[১]

টিকাঃ
[১] এই লেখায় আত্মতুষ্ট হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; এর মানে এই না যে, সব ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টি নিন্দনীয় এবং সব ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নন্দিত। যেমন, দাওয়াতি কাজ করে কাফির-মুশরিককে মুসলিম বানানো, দান করা, ইবাদাত পালন, মানবসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্ট হওয়া যাবে না। এসব ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত; কিন্তু পার্থিব ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করা যাবে না। - সম্পাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00