📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সম্মান দিলে সম্মান মিলে

📄 সম্মান দিলে সম্মান মিলে


বর্তমান সমাজ-সভ্যতা, উন্নতি, শিক্ষা ও নগরায়নের চূড়ায় আরোহণ করেছে।
এ সব কিছুই আল্লাহর প্রশংসাকে আবশ্যক করে দেয়। এখনকার মানুষকে আর আদিম যুগের মানুষের মতো দলবদ্ধ হয়ে জীবন কাটাতে হয় না। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল, জনবিচ্ছিন্ন; কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই যে, একাকিত্বের ফলে নিজের মাঝে অত্যাচারের প্রবণতা ও কঠোরতা জন্ম নেয়। এটা অনেকটা সুপ্ত ভাইরাসের মতো, যা যেকোনো সময় প্রকাশিত হতে পারে। এজন্য আমাদের কখনোই একে জেগে ওঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না। অন্যথায় আমাদের সমাজের পতন অনিবার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এক মহান দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যা একে অপরকে সম্মান করতে শেখায়। তিনি বলেন—
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
আর তোমরা মানুষদের সাথে উত্তম কথা বলো।[১]
তাই অপরের সাথে ভালোভাবে কথা বলতে হবে, সদাচরণ করতে হবে, নম্র ব্যবহার করতে হবে। সেইসাথে তাদেরকে উপযুক্ত পরামর্শ দিতে হবে। মানুষ যতই সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে উঠবে, ততই অন্যদের থেকে আরও বেশি সম্মান পেতে চাইবে। এ কারণে আমাদের সবার উচিত, কথাবার্তা ও আচার-ব্যবহারের দিকে সূক্ষ্মভাবে খেয়াল রাখা। যাতে করে অনিচ্ছাবশতও একে অপরকে কষ্ট না দিয়ে
ফেলে। এ ক্ষেত্রে ‘সোনালী সূত্র’ হলো, ‘আমরা মানুষের সাথে তেমনভাবেই কথা বলব, যেমনটা আমরা তাদের কাছে প্রত্যাশা করি’। এ সূত্র মেনে চলতে পারলে অনেক সামাজিক সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুব সুন্দর একটি বাণী রয়েছে—
❝ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ❞ তোমাদের কেউ ততক্ষণ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।[১]
মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে—সে সবসময়ই এমন কারও প্রয়োজন বোধ করে, যে কি না তাকে সম্মান করবে, তার প্রশংসা করবে, তাকে উৎসাহিত করবে বা গুরুত্ব দেবে। এক মনীষী বলে গেছেন—
এ কথা তো প্রবাদতুল্য যে—প্রতিটা মানুষের কপালেই লেখা আছে : প্লিজ, আমাকে গুরুত্ব দাও। আমাকে এড়িয়ে যেয়ো না।
প্রশ্ন হচ্ছে, অপরকে আমরা কীভাবে সম্মান দেখাতে পারি? ছোট ছোট কিছু সৌজন্যের মাধ্যমে সহজেই মানুষকে সম্মান করা যায়। রাস্তাঘাটে যাদের সাথেই দেখা হচ্ছে, তাদেরকে আমরা সালাম দিতে পারি। তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে পারি, অথবা কুশল বিনিময় করতে পারি। এছাড়াও কোনো ভুল হলে মাফ চেয়ে, বিপদাপদে সাহায্য করার মাধ্যমে আমরা অপরকে সম্মান দেখাতে পারি।
আমাদের একে অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন—
অহংকারী ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর আরোহণকারীর মতো। সে নিচের মানুষজনকে ছোট মনে করে। আর নিচের মানুষজনও তাকে ছোট মনে করে।
বস্তুত অহংকারী ব্যক্তিরা পারস্পরিক ঘৃণার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে আমাদের
দ্বীনের শিক্ষা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও গুরুত্বপ্রদানের শিষ্টাচার শেখায়। এজন্য সবার উচিত, নিজেদের ভেতরে আত্ম-সমালোচনার গুণকে জাগিয়ে তোলা। কারণ, এর মাধ্যমেই মানুষকে সম্মান করা সম্ভব।
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা বিশেষ সম্মান পাওয়ার যোগ্য। যেমন-মা-বাবা, শিক্ষকমণ্ডলী, বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি এবং যেসব মানুষ অন্যের উপকার করেন, দেশের উপকার করেন তারা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
❝ لَيْسَ مِنْ أُمَّتِيْ مَنْ لَّمْ يُجِلَّ كَبِيْرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهٗ
❞ সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা দিতে জানে না।[১]
তিনি আরও বলেন-
❝ إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ ، غَيْرِ الْغَالِي فِيْهِ ، وَلَا الْجَافِي عَنْهُ ، وَإِكْرَامَ ذِيْ السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
❞ নিশ্চয় আল্লাহকে সম্মান করার অংশ হচ্ছে বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, এমন কুরআন বহনকারীকে সম্মান করা, যে কুরআনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও করে না আবার শিথিলতাও দেখায় না, এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা।[২]
তাই আমরা যারা সম্মানিত হতে চাই, তারা যেন মানুষকেও একইভাবে সম্মান করি। কারণ, সৎ, ভদ্র ও উত্তম ব্যক্তি কখনোও রং পরিবর্তন করে না, মানুষের সাথে বহুমুখী আচরণ করে না; বরং সে সবাইকে সম্মান করে, সবার সাথেই ধৈর্য ধরে। সে সবাইকে বোঝার চেষ্টা করে, সাহায্য করে। তাই তো সে সবার কাছেই সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্তই সম্মান দেখানো উচিত, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রচেষ্টা, পছন্দ ও কাজ বৈধতার সীমার
মাঝে থাকে। তাছাড়া কথা বলার সময় আমাদের অবশ্যই ভেবে-চিন্তে শব্দ বাছাই করা উচিত। সবসময় চেষ্টা করা উচিত এমন শব্দ বাছাই করার, যা আমাদের মৌলিকত্বকে ফুটিয়ে তোলে এবং নীচতা থেকে রেহাই দেয়। এমন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণত খারাপ মানুষেরা ব্যবহার করে থাকে।
সেইসাথে খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের কথা ও কাজ যেন কারও বিরক্তির উদ্রেক না করে, কাউকে কষ্ট না দিয়ে ফেলে। আমাদের ব্যবহারও যেন বিনম্র হয়। আর এসব গুণ আয়ত্তে আনতে এ সংক্রান্ত বই পড়ার বিকল্প নেই।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২:৮৩
[১] সহীহ বুখারী, ১৩; সহীহ মুসলিম, ৪৫
[১] মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খণ্ড: ০১; পৃষ্ঠা: ১৩২; হাদীসটি হাসান
[২] সহীহুত তারগীব, ৯৮; হাদীসটি হাসান

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 প্রত্যেকেরই সহ্যের সীমা আছে

📄 প্রত্যেকেরই সহ্যের সীমা আছে


আমাদের জীবনের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষের, এমনকি বস্তুরও সীমাবদ্ধতা আছে। কেউ যদি এ সীমাবদ্ধতাকে মেনে না নেয়, একে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে সে নানান সমস্যার মুখোমুখি হবে। সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কিছু কারও ওপর চাপিয়ে দিলে তাকে হারাতে হয়। আবার এমনও হতে পারে, তা বুমেরাং হয়ে আমাদের দিকেই ফিরে আসবে। তাই সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা এবং এর ওপর সাধ্যাতীত ভার নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।
যেমন ধরা যাক বিল্ডিং-এর কথা। বিল্ডিংয়ের ছাদ ঢালাইয়ের জন্য আমাদেরকে কিছু পিলার দাঁড় করাতে হয়। এ পিলারগুলোর নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রয়েছে। এ ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ভার চাপিয়ে দিলে এগুলো হেলে পড়বে। আর পিলার হেলে পড়লে সেটি থাকা আর না থাকার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এতে ছাদটাও ধ্বসে পড়বে।
এটা ছিল একটি বস্তুগত উদাহরণ, যা বুঝতেও বেশ সহজ। এবার মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদাহরণ দেওয়া যাক। পারিবারিক পরিমণ্ডলে আমাদের যে মূল্যবোধ আর বিবেক গড়ে ওঠে, তারও একটা সহ্যসীমা রয়েছে। যখন আমরা কোনো পাপ কাজ করি, অথবা এমন পরিবেশে যাই-যেখানে পাপাচার খুব স্বাভাবিক ব্যাপার; তখন আমাদের বিবেকের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চেপে যায়। যেমন কেউ খারাপ বন্ধুদের সংস্পর্শে গেলে শয়তান তাদের সাথে একত্র হয়ে তার সর্বনাশ করে। যেসব ছেলে-মেয়ে পথভ্রষ্ট হয় তাদের অধিকাংশেরই এ পরিণতির কারণ হলো, তারা চরিত্রের দিক দিয়ে অস্বাভাবিক কিছু চ্যালেঞ্জের
মুখোমুখি হয়েছিল। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মতো সহ্যক্ষমতা তাদের ছিল না। বিবেকবান ব্যক্তিদের এখান থেকে শেখার আছে।
আবার মেধা আর বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারটাই ধরা যাক। অনেকেই আছে—যারা মেধা ও বুদ্ধিতে অন্যদের চাইতে এগিয়ে। তবু তারা আশানুরূপ সফলতা লাভ করতে পারে না। এর কারণ, তাদের সহজাত গুণাবলির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। তারা সফলতার পথে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার ওপর সাধ্যের চেয়ে বেশি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। চারপাশের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, বুদ্ধিমত্তা সফলতার চাবিকাঠি নয়, বরং সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাত্র। এর পাশাপাশি লক্ষ্য নির্ধারণ ও দৃঢ় প্রত্যয়, পরিশ্রম, পড়াশোনা, জ্ঞান অর্জন, অধ্যাবসায় প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে সৌন্দর্য দিয়ে আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কেউ কেউ নিজের সৌন্দর্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। সুন্দরীদের মাঝে অনেকে মনে করে যে, সৌন্দর্যের কারণে স্বামী তার সব ভুল মেনে নেবে, তার সব চাহিদা পূরণ করবে। সে বুঝতেই পারে না, বিয়ের কিছুদিন পার হলেই বাহ্যিক সৌন্দর্যে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন আত্মিক বা চারিত্রিক সৌন্দর্যই বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; কিন্তু যারা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে, কয়েকদিন পরই তাদের সংসার-জীবনে অশান্তি শুরু হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা তালাকেও গড়ায়।
উপরের উদাহরণগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে এগুলো সবই সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ফলাফল। এজন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সীমার মাঝে থাকতে হবে। অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই সব কাজে ভারসাম্য রক্ষা করা খুব প্রয়োজন।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 যে দান যায় না বৃথা

📄 যে দান যায় না বৃথা


ছোটবেলায় আমাদের অনেকের ধারণা থাকে, সুখ-শান্তি মানে অর্থ, সৌন্দর্য আর সুস্বাস্থ্যের উপস্থিতি; কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় আশেপাশের মানুষকে সাহায্য করার মাধ্যমে, তাদেরকে সুখী করার মাধ্যমে।
পরিণত বয়সে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমরা মনে করি, অভাবীকে খাবার খাওয়ানো এবং তাদেরকে টাকা-পয়সা দেওয়াই বুঝি দান; কিন্তু যখন পরিণত বয়সে পৌঁছাই, তখন আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে, টাকা-পয়সার দানই প্রকৃত দান নয়; বরং টাকা-পয়সা ছাড়াও দান করার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আর সে দানগুলো আত্মা, বিবেক, দক্ষতা, আর সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। সেগুলোই মূলত প্রকৃত দান। আসুন, আমরা প্রকৃত দানের কিছু রূপ জেনে নিই-
■ আমরা তখনই প্রকৃত দান করতে পারি, যখন কোনো দ্বীনী ভাইয়ের জন্য তার অজান্তেই মন থেকে দু'আ করি।
■ যখন কেউ আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করলেও আমরা তাকে ক্ষমা করে দিই, তখন তা প্রকৃত দান হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে আমাদেরই লাভ; কারণ, এর ফলে অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয়।
■ আমরা তখনই প্রকৃত দান করি যখন কেউ ক্ষমা চাইলে আমরা ক্ষমা করে দিই এবং তার অপরাধ মাফ করে দিই।
■ আমরা তখনই প্রকৃত দান করি, যখন কোনো মহৎ চিন্তা আমরা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিই, যা তাদেরকে উত্তম জীবনের পথ দেখায়।
আমাদের দান তখনই প্রকৃত হয়, যখন মানুষ আমাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ভালো কাজে এগিয়ে আসে।
তখনই আমাদের দান প্রকৃত হয়, যখন আমরা সৎ নাগরিক হই এবং দেশগঠনে অংশ নিই।
আমরা তখনই প্রকৃত দান করি, যখন আমাদের সাথে যে-ই চলাফেরা করে সে-ই অনুভব করতে পারে যে, আমাদের সাহচর্যে জীবনটা বেশ সুন্দর।
আমরা তখনই প্রকৃত দান করি, যখন আমরা কোনো দ্বীনী ভাইকে সহায়তা করার জন্য নিজের সময় ব্যয় করি।
আমরা তখনই প্রকৃত দান করি, যখন সমাজের দৃষ্টিতে সামান্য লোককেও আমরা সম্মান জানাই। কারণ, এটি আমাদের অভ্যাসের বিপরীত।
এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন-
বস্তু দান করা কোনো চিন্তা দান করার মতো দামী নয়। আংটি, হীরাসহ যা-কিছু দামী বস্তু আমরা প্রিয়জনকে দিয়ে থাকি তা প্রকৃত দান না; বরং তা প্রকৃত দান না করতে পারার ওজর হিসেবে বিবেচ্য। প্রকৃত দান হলো জীবন থেকে দান করা।
আমাদের আল্লাহর এ বাণীটি ভেবে দেখা উচিত-
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রসর আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।[১]
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ دَعْوَةَ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ مُسْتَجَابَةٌ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ ، عِنْدَ رَأْسِهِ مَلَكُ مُوَكَّلٌ ، كُلَّمَا دَعَا لِأَخِيهِ بِخَيْرٍ قَالَ آمِينَ ، وَلَكَ بِمِثْلٍ
কোনো ব্যক্তির অগোচরে তার জন্য যদি কোনো মুসলিম ভাই দু'আ করে তাহলে তার জন্য সেই দু'আ কবুল করা হয়। তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য দু'আ করে তখনই সেই নিযুক্ত ফেরেশতা বলে, ‘আ-মীন। তোমার জন্যও অনুরূপ’। [১]
নবীগণ আলাইহিমুস সালাম ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন না; কিছু ব্যতিক্রম বাদে। তারা তাদের জাতিকে কোনো জাগতিক বস্তু দিয়ে যেতে পারেননি; কিন্তু তারা দিয়ে গেছেন চিন্তা-চেতনা, জীবনপদ্ধতি, আর সুবিশাল লক্ষ্য। তাদের দিক-নির্দেশনাতেই আল্লাহওয়ালা দ্বীনের সংস্কারকবৃন্দরা পথ চলেছেন।
এজন্য আশেপাশের মানুষকে খুশি করতে সাধ্যমতো কাজ করে যেতে হবে। এটাই প্রকৃত দান। নিষ্ঠার সাথে কোনো মুসলিমের উপকার করা মানে নিজেদেরই উপকার করা। কারণ, এর মাধ্যমে পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর রহমতে সিক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আমাদের মন উদার করতে হবে। বন্ধুদের সফলতায় হিংসে করলে চলবে না। কারণ, আমার ভাইয়ের সফলতা তো উম্মাহ্রই সফলতা! আমরা একে অন্যকে মুচকি হেসে, উত্তম অভ্যর্থনা দিয়ে আপন করে নেব। মানুষ ভালোবাসা আর মূল্যায়নের কাঙাল তাই আমাদের এই দানগুলোই বেশি বেশি করা উচিত।

টিকাঃ
[১] সূরা হাশর, ৫৯ : ১০
[১] সহীহ আদাবুল মুফরাদ: ৪৮৭; হাদিসটি সহীহ

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 কখনোই ভেঙো পড়ো না

📄 কখনোই ভেঙো পড়ো না


এ দুনিয়ায় আমাদেরকে কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম জানতে হয়, সেগুলোকে মেনে চলতে হয়। এ নিয়মগুলো আমাদের জীবনে বাধা সৃষ্টি করার জন্য নয়, বরং দুনিয়ার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। এ নিয়মের ছায়াতলেই জীবনের সব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
ব্যর্থতা জগতের এমনই এক অনিবার্য নিয়ম যে, আমরা সবসময় একইভাবে আমাদের প্রচেষ্টার ফলাফল পাব না। যতই আমরা বড় কিছু অর্জনের দিকে ছুটব, ততই আমাদের কাজকর্ম নিখুঁত হতে হবে, সেইসাথে ঝুঁকির পরিমাণও বাড়বে। তাই এ বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে, এর সাথে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ইসলামের কিছু শিক্ষা আছে, যা আমাদেরকে বড় লক্ষ্যের দিকে আহ্বান করে, এবং অল্পেই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নিষেধ করে।
আমাদেরকে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ, যারা ঝুঁকি নেয় না, তারা কখনোও সফল হতে পারে না। অথবা সফল হলেও তা খুবই নগণ্য। আল্লাহ যে ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন, এর মাঝে আমরা এ কথার প্রতিফলন দেখতে পাই। ব্যবসার মাঝে ঝুঁকি আছে। তবু এতে লাভের দিগন্তটা বিস্তৃত, সুবিশাল। অন্যদিকে সুদের মাঝে সাধারণত ঝুঁকি থাকে না, কিন্তু এতে লাভটা সবসময় নির্ধারিত এবং হিসেবে কমই।
জীবনে বার বার লক্ষ্য অর্জিত না-ও হতে পারে, পদে পদে হোঁচট খেতে হতে পারে। এটাই জগতের নিয়ম। ব্যর্থতাকে জীবনে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে। বড়মাপের অর্জন করতে হলে অধিক পরিশ্রম আর চেষ্টা করা প্রয়োজন।
কারণ, সম্ভাবনার দুয়ার সহজে খুলবে না, সবার জন্য উন্মোচিত হবে না। ব্যর্থ হলে ধরে নিতে হবে আমরা বড় কিছু অর্জনের চেষ্টায় আছি। একমাত্র অলস, পশ্চাৎপদ আর উচ্চাশা বঞ্চিতরাই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়।
আমাদেরকে ভাগ্যের লিখনে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর হুকুম তো বাস্তবায়ন হবেই। এর কোনো নড়চড় নেই। আমরা মানুষেরা খুবই কমই জানি, খুবই কম বুঝি। আমরা হয়তো কোনো কিছু আঁকড়ে ধরি, তা অর্জনের জন্য উঠেপড়ে লাগি। পরে দেখা যায়, সেটার মাঝে বড় ধরনের ক্ষতি লুকিয়ে ছিল, অথবা সেটা ছিল আদতে তুচ্ছ একটা বিষয়। তাই সবসময় আল্লাহর এ বাণীটি মনে রাখতে হবে—
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করবে—যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, হয়তো তোমরা এমন কিছু পছন্দ করবে—যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহই জানেন, তোমরা জানো না। [১]
এজন্য আমাদেরকে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। এরপর ফলাফল যা-ই হোক না কেন, প্রশান্ত মনে, সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নিতে হবে।
আমাদের জীবনে যা-কিছু ঘটে, তা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না; বরং ঘটনাগুলো আমাদের অন্তর কীভাবে গ্রহণ করছে তা-ই পার্থক্য গড়ে দেয়। যেমন—কেউ হয়তো প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তার হৃদয় যদি আগে থেকেই গভীর হতাশায় ডুবে থাকে, তাহলে প্রিয়জন হারানোর শোকে সে জীবনপথের দিশা হারিয়ে ফেলবে। অপরদিকে সে যদি প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হয়, তাহলে এ শোক তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। তাই জীবনে কী ঘটল তা বিবেচনা না করে, আমাদেরকে নিজ অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সবকিছুকে বিচার করতে হবে। সমুদ্রের পানি জাহাজকে ধারণ করে, জাহাজের কোনো ক্ষতি করে না; কিন্তু যখন সেই পানি জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তা জাহাজকে ডুবিয়ে ছাড়ে। আমাদের সাথে ঘটা যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই এমনটা হয়।
তাই ব্যর্থতাকে সাদরে গ্রহণ করে নিতে হবে। যতবারই আমরা ব্যর্থ হব, ততবারই প্রবল শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ইতিহাস ঘেঁটে আমরা শিক্ষা নেব। বন্ধ রাস্তাগুলো চিনে নেব, যাতে ওই পথে আর সময় নষ্ট না হয়। আমরা এমনভাবে নতুন পথের দিকে এগিয়ে যাব, যেন আশেপাশের মানুষ এই বার্তা পায় যে—ব্যর্থতা নবজাগরণের নতুন পথ দেখিয়ে দিয়েছে, নতুন উদ্যোম ও সাহস যুগিয়েছে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ২১৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00