📄 যৌবনের আত্মা
শরীর আর মনের বয়স সবসময় একই হবে—এমন নয়। আশেপাশে এমন অনেক যুবক আছে, যাদের ভেতরকার আত্মা বৃদ্ধের মতো। আবার এমনও মানুষ আছে যার বয়স হয়তো আশি, তবুও তার আত্মা যেন যৌবনের পরিচায়ক! কথাগুলো অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে; কিন্তু এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের পরামর্শদাতা হিসেবেই এ কথাগুলো বলা। কারণ, এটাই চরম বাস্তবতা; আর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমার মতে, সর্বোত্তম যে কাজটা এখন আমরা করতে পারি, তা হলো—যৌবনের আত্মার পরিচায়ক যা-কিছু আছে, সেসবকে চিনে নেওয়া। এতে করে আমরা নিজেদের যাচাই করে নিতে পারব। এছাড়াও যৌবনকে আমরা অন্তরে ধারণ করি কি না—তা সহজেই অনুধাবন করতে পারব।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কোন কাজ বা বৈশিষ্ট্য যৌবনের পরিচয় বহন করে? যখন আমরা কাউকে আল্লাহর বদান্যতা ও সাহায্যের ওপর পরম ভরসা করতে দেখব, তখন বুঝে নেব তার ভেতরকার আত্মাটা যৌবনের প্রতিনিধিত্ব করছে। এ আত্মা সারাক্ষণ আল্লাহর সাহায্য ও অপরিসীম দানের-ই অপেক্ষা করে।
তরুণ মন যেকোনো পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের চিন্তাকে বিকশিত করতে পারে। এমনকি চিন্তার সীমাবদ্ধতা থেকেও বেঁচে থাকতে পারে। তরুণ এই মন প্রাণ খুলে হাসতে জানে, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনায়ও উচ্ছ্বসিত হতে জানে।
একজন ব্যক্তি তখনই বৃদ্ধ হয়, যখন তার স্বপ্নগুলোতে মরিচা ধরে। সে তখনই মরে যায়, যখন তার শেষ স্বপ্নটাও মরে যায়। তারুণ্য ধরে রাখতে বুদ্ধি, লক্ষ্য ও
স্বপ্নের বিকাশ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, যৌবনের আত্মা তো সবসময়ই নতুন পন্থায় চিন্তা-ভাবনা করে, নতুন কোনো বইয়ে মনোনিবেশ করে, কিংবা নতুন কোনো শখ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। পাশাপাশি জগতকে জানার প্রচেষ্টায় সবসময় ব্যস্ত থাকে।
আমরা যারা বয়সে বুড়ো, তাদের মাঝে একমাত্র যৌবনের আত্মাই কর্মস্পৃহা জাগিয়ে তুলতে পারে, যা-কিছু আমাদের পক্ষে করা সম্ভব তা নিয়ে উৎসাহ দিতে পারে। এ আত্মাই আমাদেরকে নিজের ও উম্মাহ্র উজ্জ্বল ভবিষ্যত নির্মাণে ব্যস্ত রাখে।
শরীরের সাথে যাদের আত্মাও বুড়িয়ে গেছে, তারাই কেবল সব কাজে তাড়াহুড়ো করে, সব কাজ দ্রুত শেষ করে ফেলতে চায়। বিপরীতে যৌবনের আত্মা লোকদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেকোনো ভালো কাজ, পরোপকার কিংবা দেশগঠন—যৌবনের আত্মার দ্বারাই সম্ভব। কারণ, যৌবনের আত্মা সহজে হতাশ হয় না। ধ্বংসাত্মক পরিবেশেও সহজে নিজেকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেয় না।
তাই আমাদের উচিত নিজের আত্মাকে নবায়ন করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সাহায্য ও দয়া দিয়ে পরিবেষ্টিত করে রাখবেন।
📄 ব্যক্তিত্বের বিশেষ রূপ
সব মানুষের মাঝেই কিছু মিল থাকে। তাই প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বে এমন কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, যা তাকে শত শত সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে তুলবে। সেটা হতে পারে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ক্ষমতা, নিখুঁত হওয়ার প্রচেষ্টা অথবা উত্তম বাচনভঙ্গি। তবে এ বিশেষত্বের মানে এই নয় যে, নিজেকে বড় মনে করে সবার থেকে গুটিয়ে আলাদা থাকতে হবে; বরং এটি একজন ব্যক্তির উত্তম ধ্যান-ধারণা, বদান্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। এ বিশেষত্ব তাকে এক আদর্শরূপে উপস্থাপন করবে, যার থেকে পরবর্তী প্রজন্ম শিখতে পারবে এবং মলিন হয়ে যাওয়া জীবনকে নতুন উদ্দীপনায় জাগিয়ে তুলতে পারবে।
কিন্তু ব্যক্তিত্বের এ বিশেষ রূপের মানে কী? প্রত্যেকেরই কি এমন বিশেষ রূপ থাকতে পারে? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ, নিশ্চয় থাকতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়টি পরিষ্কার করা সম্ভব।
ধরা যাক, এক শপিংমলের প্রত্যেক দোকানদারই ক্রেতাদেরকে নিজের দোকানের দিকে ডাকে, তাদের নিজের দোকান থেকে কিনতে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে, যখন কেনা-বেচায় মন্দা চলে তখন এ প্রতিযোগিতা আরও চরমে ওঠে; কিন্তু এমন লোকও আছে, যার কাছে কেউ কিছু কিনতে আসলে পাশের দোকান দেখিয়ে দেয়, বলে-
'আলহামদু লিল্লাহ, আমার তো তাও কিছু বিক্রি হয়েছে আজ; কিন্তু পাশের দোকানদারের এখনো কিছুই বিক্রি হয়নি। আপনি বরং তার কাছ থেকে কিনুন, ভাই!'
আবার বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ফোনকলের স্বয়ংক্রিয় ভয়েস মেসেজের কথাই ধরা যাক। সাধারণত লোকেরা সেখানে যে মেসেজ সেট করে রাখে, তাতে বলা হয়—
'অনুগ্রহ করে আপনার নাম, ফোন নাম্বার এবং আপনার প্রয়োজনটা বলবেন।'
অথচ এ মেসেজের ভাষাটা একটু পরিবর্তন করে দিলেই তা অনেক বেশি আন্তরিক হতে পারে। যেমন, 'আপনার প্রয়োজনটা বলবেন'—এ কথার পরিবর্তে কেউ যদি বলে, 'কীভাবে আপনার কাজে লাগতে পারি জানাবেন', তবে তাতে ব্যক্তির বিশেষত্ব প্রকাশ পায়।
আবার সময় মেনে চলার মাধ্যমেও ব্যক্তিত্বের বিশেষ দিক প্রকাশ পায়। কারণ, বর্তমানে অধিকাংশ মানুষই এ ব্যাপারে উদাসীন। প্রায়ই দেখা যায়, কেউ 'আটটার সময় হাজির হবে' কথা দিয়ে নয়টারও পরে হাজির হচ্ছে। এ অবস্থায় কেউ যদি নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়, তবে তা সবার চোখে বিশেষভাবে ধরা দেয়। এমনও মানুষ আছে যারা এতটাই সময়ানুবর্তী যে, তাদের কাজকর্ম দেখে মানুষ সময় আন্দাজ করে নিতে পারে। যেমন—কেউ হয়তো সবসময় সকাল সাতটায় ঘর থেকে বের হয়, তাই তাকে বের হতে দেখলেই বাকিরা বুঝে নেয়, এখন ঘড়িতে সাতটা বাজে।
উপরের উদাহরণগুলো খুব সাধারণ শোনালেও এ বৈশিষ্ট্যগুলোই একজন ব্যক্তিকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। আর মুসলিম উম্মাহ্র এমন বিশেষ লোকদেরকেই প্রয়োজন। আমাদের সবার উচিত এমন লোকদের মতো হওয়ার চেষ্টা করা। সত্যনিষ্ঠ ও সচেতন হতে পারলে আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিত্বের যে কোনো একটি রূপ নিজেদের মাঝে ধারণ করতে পারব, ইন শা আল্লাহ। আর উম্মাহ্র মাঝে যখন এমন ব্যক্তিত্বের সংখ্যা বেশি হবে, তখনই উম্মাহ এগিয়ে যেতে পারবে। তাই আমাদেরকে উম্মাহ্র উন্নতি ও অগ্রগতির হাতিয়ার হতে হবে। এক্ষেত্রে মেয়েদের ব্যাপারে আমি অধিক সুধারণা পোষণ করি। কারণ, তারা ব্যক্তিত্বের বিশেষ রূপ ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে অনেক বেশিই অগ্রসর।
📄 Know Thyself
আত্মোন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো নিজেকে চিনতে পারা। নিজের শক্তিমত্তা কতটুকু, দুর্বলতাই বা কতটুকু—তা উপলব্ধি করতে পারা। পাশাপাশি নিজের ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক এবং অর্জন বা ব্যর্থতা সম্পর্কে জ্ঞান রাখা। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, আগের প্রজন্মের চাইতে এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের যেকোনো কিছু বুঝতে পারার ক্ষমতা অনেক বেশি। কারণ, এ যুগে শিক্ষার অনেক বিস্তার ঘটেছে, প্রচার-মাধ্যমের সংখ্যাও অগণিত। ইন্টারনেটের কল্যাণে যে কোনো তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। তারপরও এ কথা স্বীকার করতেই হবে, নিজেকে চিনতে পারা রীতিমতো দুঃসাধ্য। কেন দুঃসাধ্য—তা অবশ্য ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়ে ছোট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
যদি কাউকে তার ব্যক্তিত্বের পাঁচটি শক্তির জায়গা আর পাঁচটি দুর্বলতার জায়গা চিহ্নিত করতে বলা হয়, তাহলে সে স্পষ্ট বা অকাট্য কোনো উত্তর দিতে পারবে না; বরং যে উত্তরই দেবে তা নিয়ে সংশয় বা মতভেদের সৃষ্টি হবে।
তাহলে এ দুঃসাধ্য কাজ আমরা কীভাবে করব? কীভাবে নিজেকে চিনতে পারব? সত্যি বলতে, নিজেকে চিনতে পারা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। এ ব্যাপারে আমরা কিছু পদ্ধতি বা মাধ্যমের আশ্রয় নিতে পারি। যেমন—
একজন বুদ্ধিমান, শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুর কাছে নিজ চরিত্রের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে তাকে বেশ জোরালোভাবে সত্যটা জানাতে হবে। তার মন্তব্যগুলো টুকে রেখে পরবর্তী সময়ে আমরা তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারি। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, বন্ধুরা আমাদের সম্পর্কে যা বলে,
তা তাদের চিন্তাপ্রসূত। তাদের ধারণা ঠিক হতে পারে, ভুলও হতে পারে। তবে নিজেকে যাচাই করতে মন্তব্যগুলো সাদরে গ্রহণ করা উচিত।
নিজেকে চেনার আরও একটি উপায় হলো, নিজের অনুভূতি, ধ্যান-ধারণাকে আলোচনা, সমালোচনার উপযোগী করে তোলা। অনুভূতিকে সুন্দর বাক্যে সাজিয়ে নিলে পর্যালোচনা সহজ হয়। যেমন নিজের সম্পর্কে এভাবে বলা যেতে পারে— আমার কল্পনাশক্তি বেশ প্রখর, আমি সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি, কোনো ফরয কাজে ঘাটতি করি না, আবার বুদ্ধিমত্তার সাথে সুস্পষ্টভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে পারি। একইভাবে নিজের দুর্বলতাগুলোও উল্লেখ করা যেতে পারে—সময় নষ্ট করার কারণে আমি অনেক কিছু অর্জনে ব্যর্থ হই, মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক যতটা ভালো হওয়া উচিত, ততটা নয়, অথবা বন্ধুরা আমাকে খেলায় নিতে আপত্তি করে ইত্যাদি।
খেয়াল রাখতে হবে যে, এ রকম বর্ণনা কেবল প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করে। বার বার আত্ম-জিজ্ঞাসার মাধ্যমে এ ধারণাগুলোর পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের ফরয ইবাদতে গাফলতি আছে কি না, কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে আমরা সতর্ক কি না—এসব ব্যাপারে প্রতি মুহূর্তে নিজের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। নিজের মাঝে নেতিবাচক কিছু পেলে তৎক্ষণাৎ তা থামিয়ে দিতে হবে, তাওবা করতে হবে। আমাদেরকে নিজেদের কুপ্রবৃত্তির বিপরীতে জোরালো অবস্থান নিতে হবে। আর যদি এমন হয়, আমরা নিজেদের মাঝে তেমন বড়সড় কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না, তাহলে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
নিজেকে জানার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো—তুলনা করা। আমরা প্রত্যেকেই নিজের সাথে এমন বন্ধুদের তুলনা করতে পারি, যারা কিনা আমাদের মতোই জীবন-যাপন করছে, আমাদের মতোই যাদের সক্ষমতা। তাদের অর্জনগুলোর দিকে মনোযোগের সাথে তাকাতে হবে, তাদের ভালো কাজগুলোকে অনুসরণ করতে হবে। তাদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিজের সাথে মেলাতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, আমাদের অবস্থা কি এর চেয়ে ভালো, না খারাপ?
তাই নিজ সত্তাকে রহস্যময় কিছু মনে করে বসলে চলবে না। এটা অহংকারের বহিঃপ্রকাশ; বরং নিজ সত্তাকে ক্রমাগত আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিজেকে জানতে হবে আত্মোন্নয়নের জন্য; নিজের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে মনে
কষ্ট পাবার জন্য নয়। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষই এ পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। তাই মানুষ যতই নিজেকে চিনতে পারবে, ততই সে এ জগতকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে।
📄 সম্মান দিলে সম্মান মিলে
বর্তমান সমাজ-সভ্যতা, উন্নতি, শিক্ষা ও নগরায়নের চূড়ায় আরোহণ করেছে।
এ সব কিছুই আল্লাহর প্রশংসাকে আবশ্যক করে দেয়। এখনকার মানুষকে আর আদিম যুগের মানুষের মতো দলবদ্ধ হয়ে জীবন কাটাতে হয় না। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল, জনবিচ্ছিন্ন; কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই যে, একাকিত্বের ফলে নিজের মাঝে অত্যাচারের প্রবণতা ও কঠোরতা জন্ম নেয়। এটা অনেকটা সুপ্ত ভাইরাসের মতো, যা যেকোনো সময় প্রকাশিত হতে পারে। এজন্য আমাদের কখনোই একে জেগে ওঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না। অন্যথায় আমাদের সমাজের পতন অনিবার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এক মহান দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যা একে অপরকে সম্মান করতে শেখায়। তিনি বলেন—
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
আর তোমরা মানুষদের সাথে উত্তম কথা বলো।[১]
তাই অপরের সাথে ভালোভাবে কথা বলতে হবে, সদাচরণ করতে হবে, নম্র ব্যবহার করতে হবে। সেইসাথে তাদেরকে উপযুক্ত পরামর্শ দিতে হবে। মানুষ যতই সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে উঠবে, ততই অন্যদের থেকে আরও বেশি সম্মান পেতে চাইবে। এ কারণে আমাদের সবার উচিত, কথাবার্তা ও আচার-ব্যবহারের দিকে সূক্ষ্মভাবে খেয়াল রাখা। যাতে করে অনিচ্ছাবশতও একে অপরকে কষ্ট না দিয়ে
ফেলে। এ ক্ষেত্রে ‘সোনালী সূত্র’ হলো, ‘আমরা মানুষের সাথে তেমনভাবেই কথা বলব, যেমনটা আমরা তাদের কাছে প্রত্যাশা করি’। এ সূত্র মেনে চলতে পারলে অনেক সামাজিক সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুব সুন্দর একটি বাণী রয়েছে—
❝ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ❞ তোমাদের কেউ ততক্ষণ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।[১]
মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে—সে সবসময়ই এমন কারও প্রয়োজন বোধ করে, যে কি না তাকে সম্মান করবে, তার প্রশংসা করবে, তাকে উৎসাহিত করবে বা গুরুত্ব দেবে। এক মনীষী বলে গেছেন—
এ কথা তো প্রবাদতুল্য যে—প্রতিটা মানুষের কপালেই লেখা আছে : প্লিজ, আমাকে গুরুত্ব দাও। আমাকে এড়িয়ে যেয়ো না।
প্রশ্ন হচ্ছে, অপরকে আমরা কীভাবে সম্মান দেখাতে পারি? ছোট ছোট কিছু সৌজন্যের মাধ্যমে সহজেই মানুষকে সম্মান করা যায়। রাস্তাঘাটে যাদের সাথেই দেখা হচ্ছে, তাদেরকে আমরা সালাম দিতে পারি। তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে পারি, অথবা কুশল বিনিময় করতে পারি। এছাড়াও কোনো ভুল হলে মাফ চেয়ে, বিপদাপদে সাহায্য করার মাধ্যমে আমরা অপরকে সম্মান দেখাতে পারি।
আমাদের একে অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন—
অহংকারী ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর আরোহণকারীর মতো। সে নিচের মানুষজনকে ছোট মনে করে। আর নিচের মানুষজনও তাকে ছোট মনে করে।
বস্তুত অহংকারী ব্যক্তিরা পারস্পরিক ঘৃণার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে আমাদের
দ্বীনের শিক্ষা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও গুরুত্বপ্রদানের শিষ্টাচার শেখায়। এজন্য সবার উচিত, নিজেদের ভেতরে আত্ম-সমালোচনার গুণকে জাগিয়ে তোলা। কারণ, এর মাধ্যমেই মানুষকে সম্মান করা সম্ভব।
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা বিশেষ সম্মান পাওয়ার যোগ্য। যেমন-মা-বাবা, শিক্ষকমণ্ডলী, বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি এবং যেসব মানুষ অন্যের উপকার করেন, দেশের উপকার করেন তারা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
❝ لَيْسَ مِنْ أُمَّتِيْ مَنْ لَّمْ يُجِلَّ كَبِيْرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهٗ
❞ সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা দিতে জানে না।[১]
তিনি আরও বলেন-
❝ إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ ، غَيْرِ الْغَالِي فِيْهِ ، وَلَا الْجَافِي عَنْهُ ، وَإِكْرَامَ ذِيْ السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
❞ নিশ্চয় আল্লাহকে সম্মান করার অংশ হচ্ছে বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, এমন কুরআন বহনকারীকে সম্মান করা, যে কুরআনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও করে না আবার শিথিলতাও দেখায় না, এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা।[২]
তাই আমরা যারা সম্মানিত হতে চাই, তারা যেন মানুষকেও একইভাবে সম্মান করি। কারণ, সৎ, ভদ্র ও উত্তম ব্যক্তি কখনোও রং পরিবর্তন করে না, মানুষের সাথে বহুমুখী আচরণ করে না; বরং সে সবাইকে সম্মান করে, সবার সাথেই ধৈর্য ধরে। সে সবাইকে বোঝার চেষ্টা করে, সাহায্য করে। তাই তো সে সবার কাছেই সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্তই সম্মান দেখানো উচিত, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রচেষ্টা, পছন্দ ও কাজ বৈধতার সীমার
মাঝে থাকে। তাছাড়া কথা বলার সময় আমাদের অবশ্যই ভেবে-চিন্তে শব্দ বাছাই করা উচিত। সবসময় চেষ্টা করা উচিত এমন শব্দ বাছাই করার, যা আমাদের মৌলিকত্বকে ফুটিয়ে তোলে এবং নীচতা থেকে রেহাই দেয়। এমন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণত খারাপ মানুষেরা ব্যবহার করে থাকে।
সেইসাথে খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের কথা ও কাজ যেন কারও বিরক্তির উদ্রেক না করে, কাউকে কষ্ট না দিয়ে ফেলে। আমাদের ব্যবহারও যেন বিনম্র হয়। আর এসব গুণ আয়ত্তে আনতে এ সংক্রান্ত বই পড়ার বিকল্প নেই।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২:৮৩
[১] সহীহ বুখারী, ১৩; সহীহ মুসলিম, ৪৫
[১] মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খণ্ড: ০১; পৃষ্ঠা: ১৩২; হাদীসটি হাসান
[২] সহীহুত তারগীব, ৯৮; হাদীসটি হাসান