📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সাবধান মেয়ে!

📄 সাবধান মেয়ে!


আগেকার দিনে দুর্বল ও ভীত মানুষেরা মানুষরূপী হায়েনাদের থেকে বাঁচতে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করত। আর এখন তো স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের যুগ। এ যুগে নিঃসঙ্গ, একাকী জীবনযাপন রীতিমতো অসম্ভব।
যৌবনে পা রাখার পর অধিকাংশ মেয়ের মনে কী চলে—তা আমি আন্দাজ করতে পারি। তারা এমন কোনো যুবকের সাথে ঘর বাঁধতে চায়, যে বৈবাহিক-জীবনকে গুরুত্ব দিতে জানে। পরিবারের দেখভাল করতে পারে, পরিবারে সুখ-শান্তি এনে দিতে পারে—এমন যুবকই মেয়েদের প্রথম পছন্দ। ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হয়ে মেয়েরা ভুল করে বসে। কখনো সে কোনো যুবকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বসে, কখনোও চ্যাটগ্রুপে কথা বলা শুরু করে, কখনো-বা পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে তার চোখাচোখি চলে। আমি নিশ্চিত, তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে—একজন জীবনসঙ্গী ও ভবিষ্যত সন্তানদের পিতাকে খুঁজে বের করা।
আর ছেলেরাও এ সত্যটা বেশ ভালোমতোই জানে। ছেলেদের মধ্যে যারা ভালো, সৎ, তারা শরয়ী বিধি-বিধান মেনে এ পথে অগ্রসর হয়। তারা মেয়েদের মধ্যে কাউকে পছন্দ করলে সরাসরি তার পরিবারের কাছে প্রস্তাব পেশ করতে যায়; কিন্তু এর বিপরীত চিত্রই বেশি দেখতে পাই। বিয়ের আগেই মেয়েদের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো ছেলের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তারা মেয়েদের সামনে প্রমাণের পর প্রমাণ উপস্থাপন করে; বোঝাতে চায় যে, বিয়ের মাধ্যমেই তারা এ সম্পর্কের অবসান ঘটাতে ইচ্ছুক। এর আগে যা-কিছু তারা করছে, তা কেবল পরিচয় ও উপযুক্ত জীবনসঙ্গিনী খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যেই করছে। এদের অধিকাংশই
মিথ্যুক। আর যদি সত্যবাদী হয়েও থাকে, তবুও কোনো মেয়ের সাথে তাদের এ ধরনের সম্পর্কে বোঝা যায় যে, তারা আদৌ সৎ নয়। পুরো ঘটনায় একটা মেয়ের হয়তো উদ্দেশ্যটা সৎ-ই থাকে, তবুও বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় একসময় সে নিজেকে বড়সড় বিপদের মাঝে আবিষ্কার করে। শেষমেষ এ বিপদ থেকে বের হওয়ার কোনো পথ সে খুঁজে পায় না।
এমন ঘটনা প্রায়ই শুনে থাকবেন—কোনো ছেলে বাইরে কোথাও এক মেয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছে। এরপর সে গোপনে মেয়েটির অস্বাভাবিক একটা ছবি তুলে রেখেছে অথবা তাদের বিশেষ কোনো আলাপ, কথা-বার্তা রেকর্ড করে রেখেছে। কয়েকদিন পর এই ছবি অথবা রেকর্ড দিয়েই ছেলেটা মেয়েটিকে বার বার হুমকি দিতে থাকে। মেয়েটির মনে হয়, সে যেন মাইন পুঁতে রাখা ভূমির ওপর দিয়ে হাঁটছে। কারণ, সে যেদিকেই যাবে সেদিকেই তার জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। আবার এমনও শোনা যায়, মেয়েদের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে কোনো ছেলে তার ক্ষতি করে বসেছে। এরপর ঠিকই তাকে বিয়ের ওয়াদা দেয়, কিন্তু শেষমেষ রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়। তার আর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায় না। মেয়েটার জীবনে তখন ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে। কখনোও কখনোও মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। ফলে একসাথে দুই পাপের বোঝা তাকে বয়ে বেড়াতে হয়—নিজের ব্যাভিচারের পাপ, আর পিতৃ-পরিচয়হীন সন্তান জন্ম দেওয়ার পাপ!
তাই মেয়েদেরকে বলি, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তার বাইরে কিছুই হবে না। একজন মেয়ে যতই দুর্বল বা একাকী হোক না কেন, আল্লাহ তার সাথেই আছেন। আল্লাহ তাআলা-ই জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করে দেন। তাই তাঁর কাছেই চাইতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অবাধ্যতায় এ চাওয়া পূরণ হবে না। তাঁর কাছ থেকে কিছু পেতে হলে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে, তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে।
মেয়েরা বোঝে না, যে মেয়েকে চাইলেই পাওয়া যায়, তাকে কখনোও ছেলেরা নিজের স্ত্রী হবার উপযুক্ত মনে করে না। সেখানে তার সন্তান-সন্ততির মা হিসেবে মেনে নেওয়া তো দূরের ব্যাপার! তাই নিজেকে এমন কোথাও সঁপে দেওয়া ঠিক হবে না, যেখানে কোনো সম্মান নেই। আল্লাহর স্মরণে, তাঁর ভালোবাসায়, তাঁর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমেই অন্তরে প্রশান্তি আসে। এজন্য কোথায় জীবনের স্বাদ সবচেয়ে বেশি সেটি না খুঁজে বরং সবচেয়ে সম্মানজনক স্বাদটা কোথায় সেটিই খুঁজে নিতে হবে।

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 কৃতজ্ঞ হও

📄 কৃতজ্ঞ হও


আমরা কি জানি, আল্লাহ আমাদেরকে কী পরিমাণ নিয়ামত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন? তাঁর নিয়ামত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এ আয়াতটির মাধ্যমে—
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
আর যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ গণনা করো, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবেনা।[১]
বর্তমান যুগের দিকে তাকালে আমরা দেখি, প্রায় সবাই নিজের অবস্থা নিয়ে আফসোস করছে, হতাশায় ডুবে আছে। এর কারণ, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার তুলনায় তাদের সক্ষমতা ও অর্জিত বস্তুর পরিমাণ বেশ কম; কিন্তু আমাদের এ হতাশার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলে চলবে না। আমাদেরকে মূলে ফিরে আসতে হবে। সবসময় মনে রাখতে হবে যে, অবস্থা যতই খারাপ হোক, বিপদাপদ যতই বেড়ে যাক; অবশ্যই আল্লাহ আমাদেরকে এমন কিছু দিয়েছেন, যার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া আবশ্যক।
আমাদের অন্তরে যে ঈমান রয়েছে, তা কি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত নয়? না চাইতেই আল্লাহ আমাদের দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন, শোনার জন্য দুটি কান দিয়েছেন, একাকিত্ব ঘোচাতে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব দিয়েছেন—এ সবই আল্লাহর দেওয়া
নিয়ামত। শুধু তাই নয়, আমরা ভুল করলে তাওবার সুযোগ পাই, ভালো মানুষ হলে আরও সৎকাজ করার সুযোগ পাই—এগুলোও তাঁর দেওয়া নিয়ামত। তাই আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কৃতজ্ঞতা হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। আল্লাহ যে তাঁর বান্দাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ ও সামর্থ্য দিয়েছেন, এটিই বরং আরেকটি নিয়ামত। এ নিয়ামতই দ্বিতীয়বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দাবি রাখে। তাই কৃতজ্ঞতাকে আনন্দ, সন্তুষ্টি আর প্রশান্তির উৎস বানিয়ে নিতে হবে। সম্ভবত এ কারণে-ই আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَمَن شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তা নিজের কল্যাণের জন্যই করে। আর যে অকৃতজ্ঞ হয় সে জেনে রাখুক যে, আমার রব অভাবমুক্ত, দানশীল।[১]
আমরা এমন অনেক মানুষকে চিনি—যারা বিরতিহীনভাবে অভিযোগ করে যায়, কখনোই ক্লান্ত হয় না। অন্যদের ব্যাপারে কথা বলতেও তাদের বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই। তাদের সাথে বসলে মনে হয়, তারা কোনোকিছুতেই তৃপ্তি পাচ্ছে না। যেন সব ব্যাপারেই অসন্তুষ্ট! এ এমন এক বেদনার উৎস—যার কোনো শেষ নেই। এ প্রজাতির লোকেরা উপযুক্ত কারণ ছাড়াই বিরক্তি আর কষ্টে জর্জরিত থাকে।
এ কারণে-ই যারা আমাদের উপকার করেছে, উপকারের প্রতিদানস্বরূপ আমাদের উচিত তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এর মাধ্যমে অন্তর বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পায়।
আমাদের কাউকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে, কেমন আছি; তখন যেন আমরা বলি, 'আল্লাহর নিয়ামতের মাঝে ডুবে আছি।' অথবা, 'আমি সবচেয়ে ভালো আছি।' অথবা আমরা যেন এ কথা বলি, 'আমি আল্লাহর কাছে চাইছি, তিনি যেন আমার প্রতি তার অনুগ্রহ জারী রাখেন এবং তার নিয়ামতসমূহ বৃদ্ধি করে দেন।'
কৃতজ্ঞতা আসলে অন্তর থেকে আসতে হয়। যিনি আমাদের প্রতি নিয়ামত দিয়েছেন, যিনি আমাদেরকে সহায়তা করেছেন, আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর প্রতি খুশি হয়ে নিজের কৃতজ্ঞতাবোধকে জাগিয়ে তুলতে হয়। আর এ কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হতে হবে জিহ্বার দ্বারা, উত্তম কথাবার্তার দ্বারা, ভালো কাজের দ্বারা। তাই কিছু মানুষকে বলতে
চাই, কেউ যদি আপনার উপকার করে, তবে তার প্রশংসায় মুখ খুলুন। এমনভাবে প্রশংসা করুন-যাতে বোঝা যায় যে, যা বলছেন তা মনের গভীর থেকেই বলছেন। প্রয়োজনে তাদের উপকারের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। প্রতিটি নিয়ামতের জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপযুক্ত উপায় আছে। আমাদেরকে এ উপায়গুলো শিখতে হবে। আর এটি শিখতে উঁচু মাপের সংবেদনশীল একটি মন থাকা প্রয়োজন।
সৃষ্টির উপকারের মাধ্যমে মূলত সৃষ্টিকর্তার প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। তাই আসুন, আমরা নিজ পরিবারের উপকার করি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সূচনা হোক পরিবার থেকেই। আল্লাহ তাআলা-ই এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।

টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, ১৬ : ১৮
[১] সূরা নামল, ২৭:৪০

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 মা-বাবা : জান্নাতের দরজা

📄 মা-বাবা : জান্নাতের দরজা


পশ্চিমা সভ্যতার ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের একটি দিক হচ্ছে আমাদের পারিবারিক বন্ধন। মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনের সুদৃঢ় বন্ধন, অধিকাংশ ইসলামী পরিবারের বোঝাপড়া ও সমাঝোতা নিয়ে গর্ব করি। যদিও জীবনের ব্যস্ততা ও কাজের চাপে অধিকাংশ মানুষ মা-বাবা'র পরিবর্তে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস হারাচ্ছে। এ জিনিস তাদের অর্জিত সকল কিছু থেকে বড়। সে কথায় যাওয়ার আগে আল্লাহর এ আয়াত দু'টি অনুধাবন করা যাক-
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত না করতে এবং মা-বাবা'র প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো। আর দয়াপরবশ হয়ে তাদের প্রতি নম্রতার ডানা নত করো এবং বলো, হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন [১]
একই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীও অনুধাবন করা প্রয়োজন-
"رغم أنفُ ، ثم رغم أنف ، ثم رغم أنف قيل من ؟ يا رسول الله قال من أدرك أبويه عند الكبر ، أحدهما أو كليهما فلم يدخل الجنة
তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধুলিমলিন হোক, তার নাক ধুলিমলিন হোক, যে তার মা-বাবা'র মাঝে একজনকে বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেল; কিন্তু (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।[১]
এখানে ধূলিমলিন বলতে লাঞ্ছিত হওয়ার দিকে ইংগিত করা হয়েছে। মা-বাবা'র সেবা না করার কারণে একজন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ হারিয়ে ফেলে, যা নিজের চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ারই নামান্তর।
সন্তানদের প্রতি বাবার বিরাট অবদান। এ অবদানের মাত্রা এত বিশাল যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা প্রতিদান দেওয়া অসম্ভব। অবশ্য এক অবস্থায় সম্ভব, যার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا يَجْزِى ولد والدًا إلا أَنْ يَجِده مملوكًا فيشتريه فيعتقه
সন্তান কখনোও তার বাবার প্রতিদান দিতে পারবে না, কেবল একটি উপায় ছাড়া। তা হলো, সে যদি তার বাবাকে দাসরূপে পেয়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেয়।[২]
আর মায়ের হক তো বাবার থেকেও বেশি। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল-
يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قَالَ : أُمُّكَ . قَالَ ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ : أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ : أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ : ثُمَّ أَبُوكَ .
হে আল্লাহর রাসূল! কে আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে তৃতীয় বার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। ওই ব্যক্তি চতুর্থবার প্রশ্ন করল, তারপর কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার বাবা।[১]
এমন অনেক অনুগত ছেলে আছে যারা মাস শেষে যা বেতন পায়, তা বাবা-মায়ের সামনে রেখে বলে, 'আপনারা দু'জন এর থেকে যা খুশি নিন। আর যা খুশি রেখে দিন। আপনারা যা রেখে দেবেন, তার চাইতে যা নেবেন তা-ই আমার কাছে প্রিয়!'
কোনো কোনো ছেলে-মেয়ে মা-বাবা'র কথার ওপর দ্বিতীয় কোনো কথা বলে না। আবার কেউ কেউ প্রতিদিন সকালে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে বাবা-মার সাথে দেখা করে যায়। তাদের খোঁজ-খবর নেয়, প্রয়োজন পূরণ করে দেয়, তাদের সেবা করে।
এরা এ কাজের মাধমে আল্লাহর সাথে ব্যবসা করছে। এরাই সফলকাম। এ ব্যাপারে আমার একটি ছোট্ট বক্তব্য রয়েছে। মা-বাবা করুণার বশবর্তী হয়ে সন্তানদের প্রতি দু'আ করে থাকেন। সন্তানরা যদি অনুগত না-ও হয়, তবু তারা এ রকম দু'আ করে থাকেন; কিন্তু কিছু দু'আ আছে যেগুলো মনের গভীর থেকে আসে। এর কারণ, সন্তানের আনুগত্য ও তার কাজকর্মে তাদের সন্তুষ্টি ও আনন্দ। এ দু'আই কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তাই মা-বাবা'র সাথে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে সুন্দর ভাষায় কথা বলা উচিত, সর্বোত্তম শব্দ চয়ন করা উচিত। তাদের সাথে যেন আমরা বাড়াবাড়ি না করে ফেলি।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। আর মা-বাবা'র আনুগত্যের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব। স্ত্রী-সন্তানের চেয়েও মা-বাবা'কেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত, তা না হলে তাদের যথাযথ আনুগত্য করা সম্ভব না। ভুলে গেলে চলবে না, তারা আমাদের ওপর আর কাউকে প্রাধান্য দেন না।
মা-বাবা বেশ অল্পতেই খুশি হয়ে যান। আমরা চাইলেই তাদেরকে বিস্ময়কর সব উপহার দিয়ে চমকে দিতে পারি। আর তা যদি হয় সঠিক পথে অবিচল থাকা, তবে এর চাইতে উত্তম উপহার আর কী হতে পারে!

টিকাঃ
[১] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭ : ২৩-২৪
[১] সহীহ মুসলিম, ২৫৫১
[২] সহীহ মুসলিম, ১৫১০
[১] সহীহ বুখারী, ৫৯৭১; সহীহ মুসলিম

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 যোগ্যতার ষোলকলা

📄 যোগ্যতার ষোলকলা


কেউ কেউ প্রশ্ন করে—আমাদের প্রত্যেকের পক্ষেই কি একই সাথে যোগ্যতা আর সফলতা অর্জন করা সম্ভব, সব কাজে এগিয়ে থাকা সম্ভব? নাকি তা শুধু যারা বুদ্ধিমান বা ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়েছে, কিংবা যাদের অর্থ-কড়ি আছে, কেবল তাদের দ্বারাই সম্ভব?
এর জবাবে বলতে হয়, আমরা সবাই-ই আল্লাহর বান্দা। আমাদের সব দায়িত্ব তাঁরই হাতে ন্যস্ত। আমাদের প্রতিটি কাজ পরিচালিত হয় তাঁর ইচ্ছায়। অবশ্য এসব কাজে আমাদেরকে বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করতে হয়। এ দুনিয়া মাধ্যম গ্রহণ ও ফলাফল লাভের জায়গা। চারপাশে সফল ও ব্যর্থদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে তাদের সফলতা বা ব্যর্থতার কারণ বোঝা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা কর্মঠদের কাজ ও ধৈর্যশীলদের প্রচেষ্টাকে বিফলে যেতে দেন না। আমাদেরকে এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই জীবনে অগ্রসর হতে হবে।
ধরা যাক, আমরা প্রত্যেকেই সাদা রঙের বিশাল একটি বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নানা রঙের কৌটো দিয়ে আমাদেরকে নিজের মনমতো একটি ছবি আঁকতে বলা হয়েছে। এ রঙগুলোর কোনোটা আমাদের চিন্তা, পছন্দ অথবা জ্ঞানের প্রতিফলন। কোনোটা আবার চরিত্র, দক্ষতা, লক্ষ্য কিংবা স্বপ্নের প্রতিফলন। এ রঙগুলোর সমন্বয়ে যে ছবিটি আঁকা হবে, তা যেন চোখ জুড়ানো হয়, হৃদয়কাড়া হয়। কারণ, এ ছবিটিই আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি, জীবনের অর্জন।
এজন্য ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আমাদেরকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমেই আমাদেরকে নিজস্ব যোগ্যতার অর্থ অনুধাবন করতে হবে। আমরা মনে করি, যে
কারণে অন্যের ওপর প্রাধান্য পাচ্ছি, সেটিই বোধহয় আমাদের যোগ্যতা। অথচ যোগ্যতা হলো, আপন সত্তাকে যথাযথভাবে গড়ে তোলার ফলাফল। অর্থাৎ যোগ্যতার কারণে আমরা নিজের ওপর বিজয়ী হই, এটি অন্যের ওপর জয়লাভের হাতিয়ার নয়।
অনেক বেশি উপার্জন কিংবা সুউচ্চ মর্যাদার দ্বারা যেন আমরা সফলতাকে সংজ্ঞায়িত না করি; বরং আমরা যেন অন্তরের গহীন থেকে অনুভব করতে পারি যে, আমরা একটি মহান কাজে হাত দিয়েছি। আর তা করতে গিয়ে আমাদের ভেতর যেন ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি কাজ করে।
আমরা জীবনে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই, তা আমাদের মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে। এ কারণে-ই দৃঢ়তা আর সৌভাগ্যের আশা নিয়ে আমরা এগিয়ে চলতে পারি। জীবনের লক্ষ্য জানার পর সে লক্ষ্যে পৌঁছার সবচেয়ে সহজ, দ্রুত ও সর্বোত্তম পথটি খুঁজে বের করা জরুরী। এজন্য নিজের চিন্তা-ভাবনাকে গুছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, মৌলিক বিষয়ে নিজের মনোযোগ আবদ্ধ করা প্রয়োজন। পকেটে সবসময় একটি নোটবুক রাখলে এ কাজটি সহজ হয়ে যায়। এর ফলে, যখনই আমরা ভালো কিছু জানতে পারব, নিজেদের মাঝে মহান কোনো চিন্তার উদ্রেক হবে, তখনই তা নোটবুকে টুকে রাখতে পারব।
শুধু তাই নয়, আত্ম-অনুধাবনের জন্য ছয়টি ক-বাচক শব্দের সাথে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। সেগুলো হলো—কী, কেন, কখন, কীভাবে, কে, আর কোথায়। এ শব্দগুলোর মাধ্যমে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, নিজেকেই এর যথাযথ উত্তর বের করতে হবে। এছাড়াও যে কোনো কাজে আমাদেরকে বিজ্ঞ ও দক্ষ লোকদের পরামর্শ নিতে হবে। বিজ্ঞজনের এমন অনেক পরামর্শ আছে, যা কোনো কোনো যুবকের কয়েক বছরের অযথা শ্রম ও কষ্টকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
জীবনের চলতি পথে আমাদের মাঝে যেন স্থবিরতা চলে না আসে। এজন্য আমাদেরকে নতুন নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ সময়টা উপভোগ করতে আমরা নিজেরাই নিজেদের উৎসাহ দিতে পারি, নিজেদেরকে পুরস্কৃত করতে পারি। তবে অবশ্যই তা বৈধ সীমারেখার ভেতরে হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যোগ্যতা আর কৃতিত্ব অর্জনের এ চেষ্টায় সবসময় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা দরকার, ভারসাম্য রক্ষা করে চলা উচিত। আর এ দুটোই সফল জীবনের মূলভিত্তি। এছাড়াও প্রত্যেক হকদারকে তার হক বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।
সফল হওয়ার জন্য কাজের প্রতি গুরুত্ব প্রদান, ধৈর্যধারণ, অধ্যবসায়কে নিজের মাঝে ধারণ করার কোনো বিকল্প নেই। তাই সুখ-দুঃখে এগুলোকে নিজের পাথেয় বানিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর তাওফিক ও সাহায্যই সফলতার চাবিকাঠি। আর একনিষ্ঠ না হলে, সৎপথে অবিচল না থাকলে, তা কখনোই লাভ করা সম্ভব নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00