📄 জন্মের সময় অভিন্ন; কিন্তু মৃত্যুর সময় ভিন্ন
মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে পার্থক্যটা বেশ চোখে পড়ার মতো। সদ্য জন্ম নেওয়া সব শিশু বলতে গেলে একই পর্যায়ের। তাদেরকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। তাদের কাউকে নিয়ে আমাদের আশা, সে বড় হয়ে মহান কেউ হবে। আবার কাউকে নিয়ে আশংকা কাজ করে, হয়তো সে বিপথে চলে যাবে। নবজাতক শিশুকে নিয়ে আমাদের দেখা স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে পাল্টে যায়। তার সম্বন্ধে যা-কিছু অজানা ছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আর অজানা থাকে না। যে স্বপ্ন তাকে নিয়ে দেখা হয়েছিল, সে স্বপ্নের দাবিদার হয়ে যায় অন্য কেউ।
ওদিকে সব মানুষ মৃত্যুর সময়ে একই অবস্থায় থাকে না। অনেকেই এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় মনীষী হয়ে। মানুষের অন্তর তাদেরকে ভালোবেসে ফেলে। এর কারণ তো এটাই যে, তারা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন না; বরং তাদের কেউ ছিলেন দ্বীনের দাঈ (অর্থাৎ ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী); কেউ ছিলেন জ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক; কেউ-বা ছিলেন পরোপকারী নেতা। তাদের দেহটাই কেবল এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে; কিন্তু তাদের জ্ঞান, মর্যাদা, উত্তম কাজসমূহ, অবদান—সবই রয়ে গেছে। তারা মানুষের দিকে যে কল্যাণের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা সবার হৃদয়ে এখনোও বিরাজমান। কৃতজ্ঞ মানুষেরা যুগ যুগ ধরে তাদের প্রশংসা করে আর অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে চলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদেরকে অনুসরণীয় হিসেবে গণ্য করে।
আখিরাতে আল্লাহর কাছে তারা যে সম্মান পাবে, তা এ নশ্বর দুনিয়ার প্রাপ্তির তুলনায় অনেক বিশাল; কিন্তু দুনিয়ার এ প্রাপ্তি মুমিনের জন্য আগাম সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ মর্মে হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন-
"إذا أحب الله العبد نادى جبريل إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ ، فَيُحِبُّهُ جِبريل ، فينادي جبريل في أَهْلِ السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحبُّوهُ ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ ، ثُمَّ يَوضَعُ لَه القبول في أَهل الأرض"
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরীল তাকে ভালোবাসেন। এবার জিবরীল আসমানবাসীকে ডাক দিয়ে বলেন : আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন। তাই তোমরাও তাকে ভালোবাসো। এরপর আসমানবাসী তাকে ভালোবেসে ফেলে। ফলে পৃথিবীতে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা লিখে রাখা হয়।[১]
এরা হলেন সংখ্যায় নগণ্য কিছু মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ নিজে বাছাই করেছেন। অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ যতদিনই বাঁচুক না কেন, জীবনটা খেয়াল-খুশিতে পার করে দেয়। তাদের কেউ কেউ এ পৃথিবীতে যা-কিছু রেখে যায়, তা পরবর্তী সময়ে তাদের আফসোসের কারণ হয়। আবার কেউ কিছুই রেখে যেতে পারে না। ফলে কাছের কিংবা দূরের মানুষেরা একসময় তাদেরকে ভুলতে বসে।
মৃত্যুর পর এভাবেই এ পৃথিবীর মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়। বংশ, সম্পদ বা শক্তির কারণে কেউ তাদেরকে মনে রাখে না; বরং জ্ঞান, অবিচলতা, রেখে যাওয়া কল্যাণকর কাজের জন্য মানুষ তাদের স্মরণ করে।
তাই আমাদের উচিত, মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা। আমরা যেন আমাদের লক্ষ্যকে সীমিত না করে ফেলি, সামান্য সাফল্যেই তুষ্ট না হয়ে যাই। কারণ, এমনও হতে পারে, আল্লাহ আমাদের কাউকে এমন কোনো গুণ দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী কাউকে দেননি। তাই মৃত্যুর কথা স্মরণে রেখে এমন লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, যার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহর কাছেই পাওয়া যাবে।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৬০৪০; সহীহ মুসলিম, ২৬৩৭
📄 প্রবৃত্তি : যেন পাহাড়-চূড়ার পাথর
মানুষের জন্মধারাকে জারি রাখার জন্য আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের মাঝে প্রবৃত্তি বা আকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন। তরুণ-তরুণীদের ওপর প্রবৃত্তির এ প্রভাব প্রকট। নিজের ভেতরে থাকা এ সুপ্ত শক্তির সাথে ব্যক্তির আচরণ কেমন হবে, এ সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে দৃঢ়ভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন। এ প্রবৃত্তির ধরন বোঝাতে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। একে বরং জ্বালানীর সাথে তুলনা করা যায়। জ্বালানী ততক্ষণ পর্যন্ত উপকারী যতক্ষণ আমরা একে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করব; কিন্তু যখন এ জ্বালানীকে আমরা আগুনের কাছে নিয়ে যাব, তখনই তা ধ্বংসাত্মক শক্তি হয়ে যাবে; এমনকি মানুষকে তা জ্যান্ত পুড়িয়েও ফেলতে পারে। একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তাই এ প্রবৃত্তি বা শক্তিকে তুলনা করেছেন এমন একটি পাথরের সাথে। যে পাথরটি এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় যুগ যুগ ধরে অবস্থান করছে। হুট করে কেউ যদি একে নাড়িয়ে দেয়, তাহলে তা চূড়া থেকে গড়াতে থাকবে। আর একবার এ পাথর গড়ানো শুরু করলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই, যা একে থামাতে পারে। ঠিক তেমনই-তরুণ প্রজন্মের প্রবৃত্তিকে যদি একবার নাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা সামলানোর শক্তি তাদের নেই।
কিছু প্রভাবক আছে, যা তরুণ-তরুণীর এ আকর্ষণকে আলোড়িত করে। অলস সময় কাটানো, কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার প্রবণতা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অহেতুক জল্পনা-কল্পনার সুযোগ করে দেয়। তাছাড়া খোলামেলা দৃশ্য, পুরুষদের দিকে নারীদের দৃষ্টিপাত, নারীদের দিকে পুরুষদের দৃষ্টিপাত ও অবাধ মেলামেশা এ প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। পথ হারানো তরুণ-তরুণীর সঙ্গও এখানে বিশাল ভূমিকা রাখে। যাদের জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই, যারা সবসময় প্রবৃত্তি জাগ্রতকারী আলোচনায়
মত্ত থাকে, তাদের সাথে সময় কাটানো এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এজন্য প্রত্যেকেরই উচিত, উপকারী বিষয় নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, নিজের সার্বিক শক্তি উপকারী সব কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করা। নিয়মিত শরীরচর্চা নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটি ভালো উপায় হতে পারে। এতে শরীরের শক্তি ক্ষয় হয়, আবার শরীরও সুস্থ থাকে।
নিজের প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য বিয়ে করা জরুরী। সক্ষম ব্যক্তির জন্য দ্রুত বিয়ে করা একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ কাজ। বিয়ে এক শক্তিশালী দুর্গের মতো। যুবক-যুবতীদের উচিত, এ দুর্গ গঠনে গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করা। পরিবার ও সমাজেরও উচিত বিয়ের পথ সুগম করে দেওয়া।
এছাড়াও যুবক-যুবতীকে আত্মিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হতে হবে। প্রবৃত্তির দমনে আত্মার পরিশুদ্ধি একটি মৌলিক বিষয়। প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবকদেরকে সাওম পালন করার উপদেশ দিয়ে গেছেন। প্রবৃত্তির শক্তি মোকাবেলায় হৃদয়কে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে—যেন তা ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলতে পারে। আর এটি সম্ভব সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাহচর্যের মাধ্যমে। যারা প্রবৃত্তি জাগ্রতকারী আলোচনা এড়িয়ে চলে, যাদের জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, আখিরাতে সফলতার ব্যাপারে উচ্চাশা আছে—তাদেরকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে। এতে নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখা, সাধ্যানুযায়ী বিপরীত লিঙ্গের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা সহজ হয়ে যায়।
তাছাড়া যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন, নতুবা একটি ভুল পদক্ষেপে জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, পাহাড়-চূড়ার পাথরকে কোনোভাবেই নাড়ানো যাবে না। আর এক্ষেত্রে আল্লাহই আমাদের উত্তম অভিভাবক।
📄 তুমিই অনন্য
এ সমাজের অধিকাংশ মানুষই নিজ অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা যেভাবে আছে, তার চাইতেও উত্তম অবস্থানে নিজেকে দেখতে চায়। এর কারণ হলো—মানুষের মনে আল্লাহ অর্থকড়ি ও অধিক সুখ অন্বেষণের একটি সহজাত প্রবৃত্তি গড়ে দিয়েছেন।
এমন অনেকেই আছে, যারা নিজ জন্মভূমি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা আফসোস করে এই ভেবে যে, তারা আরও বড় কোনো শহরে, উন্নত কোনো দেশে জন্ম নিতে পারত। অথবা তাদের পিতা বিশাল সহায়-সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন, আর তারা বেড়ে উঠতে পারত ধন-সম্পদ আর প্রাচুর্যের মাঝে।
আবার অনেক মেয়ে আছে—যারা নিজ গড়ন বা গায়ের রং নিয়ে অসন্তুষ্ট। এমন উদাহরণের শেষ নেই। অথচ আমরা কখনো এ সত্য উপলব্ধি করি না যে, সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে যে সম্ভাবনা দিয়ে গড়ে তুলেছেন, যে অবস্থায় আমরা বেড়ে উঠেছি, তা আমাদের ভবিষ্যতে পুরোপুরি প্রভাব ফেলে না। আশেপাশে একটু তাকালেই দেখা যাবে, শত শত ছেলে-মেয়ে আমাদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় বেড়ে উঠেছে। সে অনুযায়ী তাদের আরও ভালো, সফল ও সুখী হওয়ার কথা ছিল। অথচ এর কোনোটিই ঘটেনি। অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েও পড়াশোনা, চাকরি, ব্যক্তিগত জীবনে ব্যর্থ হওয়ার উদাহরণ অজস্র।
অন্যদিকে অনেক মহান ব্যক্তি আছে—যারা ইতিহাসের পট পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়েছে। অথচ তারা হয়তো বড় হয়েছেন বংশ-মর্যাদাহীন কোনো পরিবারে, নিতান্তই দরিদ্র অবস্থায়। এমনকি তাদের হয়তো থাকার মতো ভালো কোনো বাসস্থানও ছিল না। ইতিহাস
ও বাস্তবতা তা-ই বলে। আমাদেরকে এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ইবনুল ওয়ারদী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—
তুমি বলো না, আমার বংশ আছে, এতেই আমার হবে
বরং ব্যক্তি তা-ই তো আছে যা সে অর্জন করবে
বাবার সাহায্য ছাড়াই ব্যক্তি নেতা হতে পারে।
বিশ্বের ইতিহাসে এমন অনেক নারী-পুরুষের পরিচয় আমরা পাই, যাদের জন্ম দিতে পেরে তাদের পিতা-মাতা গর্বিত। কত পিতা তার সন্তানের পরিচয়ে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হয়েছেন—তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাই ধরা যাক। কুরাইশ বংশের সম্মান ও মর্যাদা তাঁর মাধ্যমেই বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এজন্য আমাদের উচিত আল্লাহ যা-কিছু দিয়েছেন, সেসবে জন্য তাঁর প্রশংসা করা। তাঁর দেওয়া নিয়ামতের পরিধি বিশাল, যদিও আমরা অন্যের সাথে তুলনায় লিপ্ত হয়ে এর যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের যা-কিছু সামান্য মনে হচ্ছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট। কারণ, আল্লাহর দেওয়া সামান্য দানও মানুষের জন্য অসামান্য কিছু।
তাই প্রথমেই নিজের অবস্থাকে মেনে নিতে হবে। নিজের যা-কিছু আছে তা নিয়েই সুখে থাকা সম্ভব, সামনের দিকে এগিয়ে চলা সম্ভব। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অহেতুক হিসাব করে মনকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে ফেলা অর্থহীন। আমাদেরকে কর্মপ্রচেষ্টা, অধ্যবসায় আর উচ্চাশার মাধ্যমে হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে হবে, অপ্রাপ্তির বেদনাকে মন থেকে মুছে ফেলতে হবে।
আমরা জানি না, আমাদের প্রত্যেকের মাঝেই সম্ভাবনার সুপ্ত এক অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রয়েছে। আমরাই পারি একে ফুঁক দিয়ে বিরাট আলোকবর্তিকায় পরিণত করতে।
তাই অন্যের ছায়া না হয়ে আমরা বরং আলো হই, যা অন্যকে পথ দেখাবে। অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা না করে আমরা বরং এমন আদর্শ হই, যা অন্যকে উপকৃত করবে।
📄 আপন আলোয় দেখা
এ পৃথিবীতে আমরা আসি একদম অজ্ঞ অবস্থায়। জন্মের পরপরই আমাদের আবিষ্কারের যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে আমরা অজানাকে জানতে শিখি, অচেনাকে চিনতে শিখি। আর এ প্রক্রিয়ার হাতেখড়ি হয় পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু আর শিক্ষকদের মাধ্যমে। চারপাশের মানুষের বিশ্বাস, চিন্তাধারা, আচার-আচরণ আমাদেরকে শেখায়, ভাবায়। এভাবেই অন্যের প্রভাবে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। তবে আমাদের মূল্যবোধ সঠিকভাবে গড়ে উঠছে কি না-সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরী। এর পাশাপাশি আমাদের কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে চলা দরকার সেটিও-জানা প্রয়োজন।
চারপাশে একটু তাকালেই দেখা যায় একইসাথে দ্বীনদারী, পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর যুবক-যুবতীর সংখ্যা প্রায় হাতে-গোনা। অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে বিপুল সম্ভাবনা রেখে দিয়েছেন, অসংখ্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। তবুও কেন তরুণ প্রজন্ম এতটা পিছিয়ে আছে? এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো-তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের ধরন। জীবনের চলার পথে তারা যে বিশ্বাস ও মূলনীতি ধারণ করে, তা তাদের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে।
এযুগের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা হতাশা আর হাহাকারে ডুবে আছে। তারা কেবল এ পৃথিবীর নিকৃষ্ট জিনিসগুলোই দেখতে পায়। কোনোকিছুকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা তাদের মাঝে গড়ে ওঠেনি। তারা মনে করে যে, তাদের সাথে সবসময় খারাপটাই ঘটবে। এদের অনেকে এমন পরিবারে বড় হয়েছে, যে পরিবারে
জ্ঞানের ন্যূনতম স্পর্শও নেই। অধিকাংশই সেখানে অজ্ঞ। শুধু তাই নয়, দ্বীনদারীর ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে। যে কারণে সে পরিবারের সন্তানরা উপযুক্তভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। তারা উপযুক্ত দিক-নির্দেশনা তো দূরে থাক, পরিবার থেকে কোনোরূপ পরামর্শ বা সহায়তাও পায়নি। ফলে তারা অযথা হীনম্মন্যতায় ভোগে, ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ পায় না।
আবার অনেকে বেশ দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে উঠেছে। তারা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। তাদের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, সামান্য অর্জনেই তারা আত্মতুষ্টিতে ভোগে। যে কোনো লক্ষ্যকেই তারা সাধ্যের বাইরে মনে করে পিছিয়ে যায়। তারা কেবল ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেই ব্যস্ত। অথচ এমনও হতে পারে, আল্লাহ তাদেরকে এমন অনন্য মেধা বা ক্ষমতা দিয়েছেন, যার দ্বারা তারা এ সমাজকে পালটে দিতে পারত!
আমরা প্রত্যেকে যেন নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরেকবার পরখ করে নিই। এমনও তো হতে পারে যে, আমাদের সব ধ্যান-ধারণা সঠিক নয়। আমরা চাইলেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে জীবনকে সাজাতে পারি। এজন্য আমাদেরকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে।
ভালো-মন্দ সব মিলিয়েই এ পৃথিবী। আমরা কেন ভালো বাদ দিয়ে কেবল খারাপটাই দেখব? কেনই-বা হতাশা আর হাহাকারে জীবন কাটিয়ে দেব? আল্লাহ আমাদের জন্য এগিয়ে চলার পথ তৈরি করে রেখেছেন। এ পথ খুঁজে পেতে হলে নৈরাশ্যবাদীদের এড়িয়ে চলতে হবে। নিজেদের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্যকে জিইয়ে রাখতে হবে; যেন জীবনের একটা অর্থ থাকে, মূল্য থাকে। তবেই সফল হওয়া সম্ভব। আর যদি আপাতদৃষ্টিতে দুনিয়ায় সফল না-ও হওয়া যায়, তবুও জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণের মর্যাদাটুকু তো থাকবে! আর এই মর্যাদার প্রতিদান আর কেউ না দিলেও আল্লাহ অবশ্যই দেবেন, ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ কোনো মুমিনের সৎকর্মকে অগ্রাহ্য করেন না।