📄 জ্ঞানই আলো
জন্মগ্রহণের পর আমরা ধীরে ধীরে আশপাশের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া শুরু করি। তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে আমাদের পরিচিতজনের পরিধি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ফলে একই সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে আমাদের দক্ষতাও।
ব্যাপারটিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক। ধরুন, আপনি একটি অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরটিতে এদিক-ওদিক নানানরকম জিনিসপত্র ছড়ানো, পড়ে আছে কয়েকটি তালাবদ্ধ বাক্স আর কিছু জটিল যন্ত্রপাতি। আরও ধরে নিন যে, এই ঘরটিতে থাকা জিনিসপত্র, বন্ধ বাক্স কিংবা যন্ত্রপাতি এর কোনটি কীসের, কী কাজের, এগুলোর ব্যবহার পদ্ধতি—কোনোকিছু সম্পর্কে আপনার কোনো পূর্ব-ধারণা নেই। এই জিনিসগুলোকে আপনি আগে কখনো দেখেননি। আপনি এগুলোকে চেনেন না। অন্ধকার ঘরে আপনার দৃষ্টিগোচর হওয়া কোনোকিছু সম্পর্কে আপনার কোনোই জ্ঞান নেই। ব্যাপারটিকে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের সাথে মিলিয়ে নিন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا
আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেট থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না।[১]
এই অন্ধকার ঘরে আপনার মনে নানান ধরনের প্রশ্ন খেলে যায়, যার কোনো জবাব সাথে সাথে আপনি খুঁজে পান না। যেমন: এই ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র, অদ্ভুত রকমের যন্ত্রপাতি আর রহস্যাবৃত বদ্ধ বাক্স—এগুলো এখানে কীভাবে এলো? কারা রেখে গেল? কেনই-বা রেখে গেল? এমন হরেক রকমের প্রশ্নের জন্ম নেয় আপনার মনে। এরপর, ঘরটিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের ফলে ধীরে ধীরে একসময় কিছু কিছু রহস্যের সমাধান আপনি করে নিতে পারেন। যন্ত্রপাতিগুলো উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখা, বাক্সগুলো খুলে খুলে দেখা এবং জিনিসপত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে আপনি এগুলোর ব্যবহারও কিছুটা শিখে যান। এরপর ওই প্রাপ্ত জ্ঞান নিয়ে আপনি বেরিয়ে আসেন অন্ধকার ঘর থেকে এবং সেই জ্ঞান দিয়ে আপনি আবিষ্কার করেন নতুন নতুন জিনিস।
সময় গড়াতে থাকে তার নিজস্ব গতিতে। একটা সময়ে এসে আপনি থমকে যাবেন। আপনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করবেন যে, আপনি এতদিন ধরে যা জেনেছেন তা নিতান্তই ক্ষুদ্র। আপনার জানার পরিধি বা পরিমাণ এতই তুচ্ছ যে, আপনি তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এতদিন আপনি ভাবতেন, আপনি অনেক জানেন। জগতের সম্ভাব্য সকল রহস্য উদ্ঘাটন করে আপনি বসে আছেন; কিন্তু যখনই নিজের জ্ঞানের দরিদ্রতা আপনার সামনে প্রকাশ পেয়ে গেল; যখনই এই মহাবিশ্বের মহা রহস্যজাল কিছুটা আপনি চিনতে শিখলেন, তখনই আপনি বুঝলেন যে, আপনি আসলে তেমন কিছুই জানেন না। নিজের অজ্ঞতার এই চিত্র যখন আপনার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে, আপনি তখন আপনার অহংকার-সমেত নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন।
হ্যাঁ, এভাবেই আমরা নিজেদেরকে জানার চেষ্টা করি। এভাবেই আমাদের আশপাশের মানুষগুলোকে আরও বুঝে ওঠার চেষ্টা করি। একইভাবে এ জগতে আমাদের অস্তিত্বের যে চিরন্তন নিয়মাবলি, দায়িত্ব ও সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলোও জেনে নিই। তারপর একদিন ঘনিয়ে আসে সেই চরম মুহূর্ত; দুনিয়ার জীবনের পাঠ চুকিয়ে ওপারের জীবনে চলে যাওয়ার সেই প্রতিশ্রুত সময়। আমাদের শরীর থেকে যখন আমাদের আত্মা বেরিয়ে যায়, তখনো আমাদের মনে অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। আমরা সৃষ্টিজগতের সব রহস্যের জাল ভেদ করতে পারি না। বিশাল সমুদ্র-সমান সেই রহস্যের জট খুলতে আরম্ভ করার আগেই ফুরিয়ে আসে আমাদের সময়। আলো জ্বলে ওঠার আগেই যেন নিভে যাওয়ার আয়োজন সম্পন্ন হয়ে যায়। আমরা জানতে পারি খুবই অল্প; যেমনটা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন-
وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
তোমাদেরকে তো সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।[১]
এটি খুব সিরিয়াস একটি আয়াত। এই একটি আয়াতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অনেকগুলো ব্যাপার বলে দিয়েছেন; যেমন :
আমরা মূলত অজ্ঞ; যতক্ষণ না আমরা জানতে শুরু করছি।
আমাদের বিনয়ী হতে হবে। আর সে বিনয়ের পরিমাণ হবে আমাদের অজ্ঞতার সমান।
আমরা যতটুকু জানি বা আয়ত্ত করি ততটুকুই আমাদের মান-মর্যাদা। আমাদের জানার পরিধি বাড়লে তবেই আমাদের মান-মর্যাদা বাড়বে এবং আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে।
আমরা যেহেতু সবকিছু জানি না, সবকিছু বুঝি না এবং সবকিছুর ওপর জ্ঞান রাখি না, তাই আমাদের জন্য উত্তম হচ্ছে কোনো ঘটনা ঘটা-মাত্র তার ওপর মন্তব্য না করে বসা।
এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের জানাটা বাহ্যিক কিংবা আংশিক। এগুলো আরও গভীরভাবে জানা দরকার। এ জন্য আমাদের দরকার খোলা মন আর জানার জন্য আগ্রহী হৃদয়।
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, ১৬: ৭৮
[১] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ৮৫
📄 শেষ ভালো যার সব ভালো তার
দুনিয়া এক অদ্ভুত পরীক্ষাক্ষেত্র। গতানুগতিক পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়, এরপর পরীক্ষা দিতে হয়; কিন্তু দুনিয়া নামক পরীক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি আর পরীক্ষা চলে একই সাথে।
এটা বিস্ময়কর নয় যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানে পরীক্ষা চলতেই থাকবে; বরং মানুষভেদে পরীক্ষার রকমফের আর বৈচিত্র্যই ভীষণ বিস্ময়কর। কেউ হয়তো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, আবার কারও জন্য ধন-সম্পদই বিশাল পরীক্ষা। কেউ নিজের বোকামিতে হয়রান, কারও বুদ্ধিমত্তাই নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ পড়েছে খ্যাতির বিড়ম্বনায়, কেউ বা পরিচিতির অভাবে সুবিধাবঞ্চিত। এভাবেই জীবনের নানান ক্ষেত্রে বিচিত্ররূপে মানুষ পরীক্ষিত হচ্ছে। আমাদের এ পরীক্ষার শেষ হয় পৃথিবী থেকে বিদায়ের মাধ্যমে; যার ইংগিত পাওয়া যায় এই আয়াতে— الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন, তোমাদের মধ্যে কে অধিক উত্তম আমল করে।[১]
আমাদের এ চলমান পরীক্ষায় কে সফল আর কে ব্যর্থ, তা জানা যাবে ওপারে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।[১]
এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা জানিই না, আমাদের পরীক্ষা কোন মুহূর্তে শেষ হচ্ছে? কখনই বা পরীক্ষা-পরিদর্শক উত্তরপত্র ছিনিয়ে নেবেন?
পরীক্ষার শেষ সময়ের ব্যাপারে কত মানুষ যে ভুল করেছে! কত মানুষ যে শেষ মুহূর্তে আধ-ঘণ্টা বাড়তি সময়ের জন্য হা-হুতাশ করেছে! কিন্তু তাদের দাবি মানা হয়নি। তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি। আল্লাহ তাআলার এ বাণী সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়-
فَأَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
অতঃপর আমরা হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলি; এমনভাবে (ধরি) যে তারা বুঝতেও পারে না।[২]
তিনি আরও বলেছেন-
فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহূর্তকাল দেরিও করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না।[৩]
এ আয়াত দুটি গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা কখন পড়বে তা আমরা জানি না। তাই কী করছি, কেন করছি-এ অনুভূতিকে সবসময় জাগ্রত রাখতে হবে, মনে রাখতে হবে, আল্লাহ সব দেখছেন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখা,
তার অসন্তোষের কাজ থেকে দূরে থাকাকেই জীবনের মূলমন্ত্র করে নিতে হবে। যদি কখনো ভুল হয়ে যায়, মনে রাখতে হবে, তাওবার দরজা খোলা আছে। ভুল বোঝার সাথে সাথে নিজেকে সংশোধন করে নিতে হবে; কে জানে, তখনই যদি শেষ সময়ের ঘণ্টা বেজে যায়! আর যারা এ পরীক্ষাকে তুচ্ছ মনে করে, তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। একবার ভুল মানুষের সাথে ভুলের স্রোতে ভেসে গেলে, ফিরে আসার সুযোগ না-ও মিলতে পারে।
টিকাঃ
[১] সূরা মুলক, ৬৭ : ০২
[১] সূরা আলে ইমরান, ০৩ : ১৮৫
[২] সূরা আরাফ, ০৭ : ৯৫
[৩] সূরা আরাফ, ০৭ : ৩৪
📄 জন্মের সময় অভিন্ন; কিন্তু মৃত্যুর সময় ভিন্ন
মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে পার্থক্যটা বেশ চোখে পড়ার মতো। সদ্য জন্ম নেওয়া সব শিশু বলতে গেলে একই পর্যায়ের। তাদেরকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। তাদের কাউকে নিয়ে আমাদের আশা, সে বড় হয়ে মহান কেউ হবে। আবার কাউকে নিয়ে আশংকা কাজ করে, হয়তো সে বিপথে চলে যাবে। নবজাতক শিশুকে নিয়ে আমাদের দেখা স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে পাল্টে যায়। তার সম্বন্ধে যা-কিছু অজানা ছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আর অজানা থাকে না। যে স্বপ্ন তাকে নিয়ে দেখা হয়েছিল, সে স্বপ্নের দাবিদার হয়ে যায় অন্য কেউ।
ওদিকে সব মানুষ মৃত্যুর সময়ে একই অবস্থায় থাকে না। অনেকেই এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় মনীষী হয়ে। মানুষের অন্তর তাদেরকে ভালোবেসে ফেলে। এর কারণ তো এটাই যে, তারা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন না; বরং তাদের কেউ ছিলেন দ্বীনের দাঈ (অর্থাৎ ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী); কেউ ছিলেন জ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক; কেউ-বা ছিলেন পরোপকারী নেতা। তাদের দেহটাই কেবল এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে; কিন্তু তাদের জ্ঞান, মর্যাদা, উত্তম কাজসমূহ, অবদান—সবই রয়ে গেছে। তারা মানুষের দিকে যে কল্যাণের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা সবার হৃদয়ে এখনোও বিরাজমান। কৃতজ্ঞ মানুষেরা যুগ যুগ ধরে তাদের প্রশংসা করে আর অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে চলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদেরকে অনুসরণীয় হিসেবে গণ্য করে।
আখিরাতে আল্লাহর কাছে তারা যে সম্মান পাবে, তা এ নশ্বর দুনিয়ার প্রাপ্তির তুলনায় অনেক বিশাল; কিন্তু দুনিয়ার এ প্রাপ্তি মুমিনের জন্য আগাম সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ মর্মে হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন-
"إذا أحب الله العبد نادى جبريل إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ ، فَيُحِبُّهُ جِبريل ، فينادي جبريل في أَهْلِ السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحبُّوهُ ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ ، ثُمَّ يَوضَعُ لَه القبول في أَهل الأرض"
আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরীল তাকে ভালোবাসেন। এবার জিবরীল আসমানবাসীকে ডাক দিয়ে বলেন : আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন। তাই তোমরাও তাকে ভালোবাসো। এরপর আসমানবাসী তাকে ভালোবেসে ফেলে। ফলে পৃথিবীতে তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা লিখে রাখা হয়।[১]
এরা হলেন সংখ্যায় নগণ্য কিছু মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ নিজে বাছাই করেছেন। অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ যতদিনই বাঁচুক না কেন, জীবনটা খেয়াল-খুশিতে পার করে দেয়। তাদের কেউ কেউ এ পৃথিবীতে যা-কিছু রেখে যায়, তা পরবর্তী সময়ে তাদের আফসোসের কারণ হয়। আবার কেউ কিছুই রেখে যেতে পারে না। ফলে কাছের কিংবা দূরের মানুষেরা একসময় তাদেরকে ভুলতে বসে।
মৃত্যুর পর এভাবেই এ পৃথিবীর মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়। বংশ, সম্পদ বা শক্তির কারণে কেউ তাদেরকে মনে রাখে না; বরং জ্ঞান, অবিচলতা, রেখে যাওয়া কল্যাণকর কাজের জন্য মানুষ তাদের স্মরণ করে।
তাই আমাদের উচিত, মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করা। আমরা যেন আমাদের লক্ষ্যকে সীমিত না করে ফেলি, সামান্য সাফল্যেই তুষ্ট না হয়ে যাই। কারণ, এমনও হতে পারে, আল্লাহ আমাদের কাউকে এমন কোনো গুণ দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী কাউকে দেননি। তাই মৃত্যুর কথা স্মরণে রেখে এমন লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, যার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহর কাছেই পাওয়া যাবে।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৬০৪০; সহীহ মুসলিম, ২৬৩৭
📄 প্রবৃত্তি : যেন পাহাড়-চূড়ার পাথর
মানুষের জন্মধারাকে জারি রাখার জন্য আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের মাঝে প্রবৃত্তি বা আকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন। তরুণ-তরুণীদের ওপর প্রবৃত্তির এ প্রভাব প্রকট। নিজের ভেতরে থাকা এ সুপ্ত শক্তির সাথে ব্যক্তির আচরণ কেমন হবে, এ সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে দৃঢ়ভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন। এ প্রবৃত্তির ধরন বোঝাতে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। একে বরং জ্বালানীর সাথে তুলনা করা যায়। জ্বালানী ততক্ষণ পর্যন্ত উপকারী যতক্ষণ আমরা একে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করব; কিন্তু যখন এ জ্বালানীকে আমরা আগুনের কাছে নিয়ে যাব, তখনই তা ধ্বংসাত্মক শক্তি হয়ে যাবে; এমনকি মানুষকে তা জ্যান্ত পুড়িয়েও ফেলতে পারে। একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তাই এ প্রবৃত্তি বা শক্তিকে তুলনা করেছেন এমন একটি পাথরের সাথে। যে পাথরটি এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় যুগ যুগ ধরে অবস্থান করছে। হুট করে কেউ যদি একে নাড়িয়ে দেয়, তাহলে তা চূড়া থেকে গড়াতে থাকবে। আর একবার এ পাথর গড়ানো শুরু করলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই, যা একে থামাতে পারে। ঠিক তেমনই-তরুণ প্রজন্মের প্রবৃত্তিকে যদি একবার নাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা সামলানোর শক্তি তাদের নেই।
কিছু প্রভাবক আছে, যা তরুণ-তরুণীর এ আকর্ষণকে আলোড়িত করে। অলস সময় কাটানো, কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার প্রবণতা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অহেতুক জল্পনা-কল্পনার সুযোগ করে দেয়। তাছাড়া খোলামেলা দৃশ্য, পুরুষদের দিকে নারীদের দৃষ্টিপাত, নারীদের দিকে পুরুষদের দৃষ্টিপাত ও অবাধ মেলামেশা এ প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। পথ হারানো তরুণ-তরুণীর সঙ্গও এখানে বিশাল ভূমিকা রাখে। যাদের জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই, যারা সবসময় প্রবৃত্তি জাগ্রতকারী আলোচনায়
মত্ত থাকে, তাদের সাথে সময় কাটানো এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এজন্য প্রত্যেকেরই উচিত, উপকারী বিষয় নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, নিজের সার্বিক শক্তি উপকারী সব কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করা। নিয়মিত শরীরচর্চা নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটি ভালো উপায় হতে পারে। এতে শরীরের শক্তি ক্ষয় হয়, আবার শরীরও সুস্থ থাকে।
নিজের প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য বিয়ে করা জরুরী। সক্ষম ব্যক্তির জন্য দ্রুত বিয়ে করা একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ কাজ। বিয়ে এক শক্তিশালী দুর্গের মতো। যুবক-যুবতীদের উচিত, এ দুর্গ গঠনে গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করা। পরিবার ও সমাজেরও উচিত বিয়ের পথ সুগম করে দেওয়া।
এছাড়াও যুবক-যুবতীকে আত্মিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হতে হবে। প্রবৃত্তির দমনে আত্মার পরিশুদ্ধি একটি মৌলিক বিষয়। প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবকদেরকে সাওম পালন করার উপদেশ দিয়ে গেছেন। প্রবৃত্তির শক্তি মোকাবেলায় হৃদয়কে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে—যেন তা ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলতে পারে। আর এটি সম্ভব সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাহচর্যের মাধ্যমে। যারা প্রবৃত্তি জাগ্রতকারী আলোচনা এড়িয়ে চলে, যাদের জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, আখিরাতে সফলতার ব্যাপারে উচ্চাশা আছে—তাদেরকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে। এতে নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখা, সাধ্যানুযায়ী বিপরীত লিঙ্গের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা সহজ হয়ে যায়।
তাছাড়া যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন, নতুবা একটি ভুল পদক্ষেপে জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, পাহাড়-চূড়ার পাথরকে কোনোভাবেই নাড়ানো যাবে না। আর এক্ষেত্রে আল্লাহই আমাদের উত্তম অভিভাবক।