📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য—যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন; পাঠিয়েছেন এ পৃথিবীর বুকে; না চাইতেই অফুরন্ত নিয়ামতরাজি দিয়ে আচ্ছাদিত করেছেন আমাদের; মুসলিম হিসেবে বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন এবং আমাদের জন্য জীবনযাত্রাকে সহজ ও সাবলীল করেছেন। আলহামদু লিল্লাহি হামদান কাসীরা!
এ পৃথিবীর বুকে আমাদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানের মাঝে যে সামান্য সময়টুকু—তা-ই আমাদের জীবন। জীবন খুবই ছোট। দেখতে দেখতে বছরগুলো কেটে যায়। ফুরিয়ে যায় জীবনের দিনগুলো। তারপর শুরু হয় অনন্তের যাত্রা। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি এভাবেই একের পর এক মানুষ আসছে; দুনিয়ার ওপর কিছু দিন থাকছে, বিচরণ করছে, আবার চলে যাচ্ছে সবকিছু ছেড়ে।
জীবনের সফলতা বলতে আসলে কী বোঝায়—এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মনীষীগণ নিজস্ব মতামত দিয়ে গেছেন। জীবনের সফলতা কি শুধু পার্থিব সফলতায় সীমাবদ্ধ, নাকি তা দুনিয়াকে অতিক্রম করে পরবর্তী জীবনের সফলতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করে? জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে? জীবন-ধারণের পন্থা আমাদের কেমন হওয়া উচিত? জীবনের উদ্দেশ্য ও তা বাস্তবায়নের যাবতীয় কর্মপন্থা কীরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়—তা নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই।
মানুষের জীবনে তারুণ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধাপে একজন মানুষ যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে তার জীবনের সার্বিক সফলতা। লোহা দগদগে আগুনে পুড়িয়ে তা থেকে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করা হয়। আগুনে পোড়ানোর সময় নরম থাকে। তাকে যে আকৃতি দেওয়া হয় সে আকৃতিই তা গ্রহণ করে।
করে। তারুণ্যও এমনই। জীবনপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ ধাপে একজন তরুণ কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলবে, একজন তরুণের জন্য তার সঠিক দিক-নির্দেশনা খুবই দরকারী।
জীবনের সফলতার সংজ্ঞা অনেকে পার্থিব-জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেয়। বৈষয়িক উন্নতি যাদের মূল চিন্তা বা ধ্যান-ধারণা, তারা পার্থিব জীবনের বড় কোনো অর্জনকে সফলতা মনে করে বসে। বর্তমান আধুনিক ধর্ম-বিমুখ সমাজে এ ধরনের প্রবণতাই বেশি। আবার ইসলামী ভাবধারার অনেকে পার্থিব যেকোনো অর্জনকে-ই ছোট করে দেখে। পরকালীন সফলতাই মুসলিমদের মুখ্য বিষয়। দুনিয়াবী সফলতা গৌণ। তার মানে, দুনিয়ার যে কোনো অর্জনকে একদম ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; বরং সে অর্জনকেও পরকালীন জীবনে সফলতার একটা মাধ্যম বা পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
এবার আসি বইটির ব্যাপারে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে ক্যারিয়ার গঠনের ব্যাপারে সচেতনতা প্রবল। জীবন-পথে কীভাবে সফল হওয়া যায় এবং সে সফলতার সংজ্ঞা কী, জীবনের বিবিধ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে কেমন পথ ও পন্থা অনুসরণ করা উচিত এবং পড়ালেখা ও উপার্জনসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখক সুন্দর সুন্দর পরামর্শ দিয়ে নিজের বইটি সাজিয়েছেন। বইটির বিষয়বস্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী করে শিক্ষার্থীদের সামনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, মুসলিম-চিন্তা-দর্শন ও সভ্যতা বিষয়ক গভীর ভাবনাগুলো লেখক তার রচনাবলিতে প্রকাশ করে থাকেন। তবে বিশেষ করে এই বইটিতে তিনি তরুণদের উপযোগী করে কিছু পরামর্শ চয়ন করেছেন।
ছাত্রজীবনে লক্ষ্য-পানে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মপন্থা একজন ছাত্রকে গ্রহণ করতে হয়। এগুলো যেমন সে পরিবার, শিক্ষকবৃন্দ ও সমাজ থেকে পায়, তেমনই কোনো কোনো বইও এক্ষেত্রে তাকে প্রেরণা যোগায়। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে হতাশা প্রবল হয়ে উঠেছে। ক্যারিয়ার গাইডলাইন বা সফলতা অর্জনের নানা পন্থা নিয়ে বই এবং মোটিভেশনাল লেকচার আছে। তবুও সেগুলোতে যেন পূর্ণতার বড় অভাব। এ ধরনের যা কিছু পাওয়া যায়—তার অধিকাংশই সামাজিক মূল্যবোধ বা চারিত্রিক উৎকর্ষতা অর্জনের দিকে তেমন জোর দেয় না। তার ব্যতিক্রম এ বইটি।
আমি যখন উঠতি তরুণ, তখন থেকেই কিশোরদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে—এমন বইগুলো খোঁজা শুরু করেছিলাম। কেননা, কিশোর বয়সে যদি কারও ভেতর
উত্তম অভ্যাস ও চিন্তাধারা গড়ে তোলা যায়, তাহলে তার বাকি জীবন সে সঠিক ও উত্তমরূপে পরিচালনা করার যথেষ্ট রসদ সাথে পাবে। প্রথমে আমার হাতে পড়ে দুটো বই। আহসান হাবীব ইমরোজের মোরা বড় হতে চাই এবং মুহাম্মাদ যাইনুল আবিদীনের বড় যদি হতে চাও। প্রথম বইটিতে বেশ কিছু বাস্তব উদাহরণ এনে ক্যারিয়ার গঠনের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মনীষীর জীবনী থেকেও অনেক সুন্দর ঘটনা এতে এসেছে। দ্বিতীয় বইটি ছিল আরও চমৎকার। এ বইটিতে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করার মতো অনেক ভালো ভালো পরামর্শ রয়েছে। সালাফদের জীবনচরিত এ বই রচনায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। তারপর সফিউল্লাহ ফুয়াদ হাফিযাহুল্লাহ-র শিক্ষার্থীদের সফলতার রাজপথ : লেখাপড়ার আদর্শ পদ্ধতি বইটি সংগ্রহ করি। আকারে বেশ বড় এই বইটিও আমার ওপর বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। পড়াশোনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে আমার সামনে। জীবন-পথে চলার ক্ষেত্রে আমি নানাবিধ পরামর্শ ওখান থেকেই নিয়েছি। এরই ধারাবাহিকতায় সবশেষে পড়লাম আব্দুল হামীদ ফাইযী হাফিযাহুল্লাহ রচিত আদর্শ ছাত্র জীবন। ছোট একটি বই, তবে যথারীতি তার অন্যান্য বইয়ের মতো বেশ সুখপাঠ্য ও উপভোগ্য।
এ সকল বই পড়ে আমি যেসব দিক-নির্দেশনা, পরামর্শ ও শিক্ষা পেলাম-তার তালিকা করা কঠিন। তবে সংকলন করে রাখলে হয়তো আমার জন্যই ভালো হতো। একদিন আমি ড. আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিযাহুল্লাহ-র কিছু বই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। তার বইগুলো মনের আঙিনায় নতুন নতুন শুভচিন্তার উদ্রেক ঘটাতে সহায়তা করে। যে কোনো বিষয় নিয়ে তিনি খুব গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং এরপর তার সার্বিক চিন্তার সার-নির্যাস উপস্থাপন করে থাকেন। আমার নজরে পড়ল বইটি। পড়ার জন্য বেছে নিলাম। পড়ে ফেললামও কিছু দিন সময় নিয়ে। বইটি তরুণ সমাজের সামনে উপস্থাপনের উপযোগী মনে হলো আমার। রামাদান মাসে কাজ শুরু করলাম। আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা কাজটি আমাকে করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বইটি পড়বে এবং তাদের জীবনে বইটির কল্যাণবাহী প্রভাব পড়বে-এমনটিই আশা রাখি। তরুণ সমাজের জন্য পরামর্শমূলক খুঁটি-নাটি অনেক কিছু বইটিতে পাওয়া যাবে। তাই আমি এখানে আর কথা বাড়াবো না। তবে তরুণ-সমাজের জন্য আমার পক্ষ থেকে অপু ভাইয়ের পরামর্শটিই থাকবে-
মুসলিম তরুণদেরকে পড়াশোনার ব্যাপারে খুব সিনসিয়ার হতে হবে; কারণ, এটিই অন্যান্য ছাত্রদের থেকে তাকে পৃথক করে দেবে। একজন ধার্মিক ছাত্র তার ক্লাসের টপ স্টুডেন্ট ও সবচেয়ে ভালো ছাত্র হওয়ার চেষ্টা করবে। তখন সবার কাছে সে আদর্শে পরিণত হবে। একইভাবে একজন মুসলিম চাকুরিজীবীর তার অফিসে টপ পারফর্মার হওয়া উচিত। কেননা, সবার মাঝে তখন এ ধ্যান- ধারণা বদ্ধমূল হবে যে, ছেলেটি ইসলাম পালন করে, তাই তার ভেতর এ রকম দায়িত্ববোধ আছে। আবার যে ছেলেটি ইসলাম মেনে চলে, সে তার মা-বাবার কাছে সবচেয়ে ভালো ছেলে হওয়ার চেষ্টা করবে; যাতে তারা মনে করতে পারে যে, আমার অন্যান্য যে ছেলেগুলো ইসলাম মানে না, তাদের তুলনায় এই ছেলেটি আমাদের কত অনুগত! এর কারণ, তার মাঝে গ্রোথিত ইসলামের বুঝ। কুরআন-সুন্নাহ্র শিক্ষাটা সে পালন করছে। মুসলিম তরুণ মানে শুধু ধর্মীয় কার্যাদি পালনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলাম পালনের কারণে সে যে অন্যরকম একজন মানুষ এবং তার যে প্রোডাক্টিভিটি আছে তা তাকে প্রমাণ করতে হবে।
পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই সমকালীন প্রকাশনকে—যারা বইটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বইটিতে থাকা আমার অনুবাদের ভাষাগত যেসব দুর্বলতা ছিল—তা দূর করে সামান্য সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে সম্পাদকমণ্ডলী সেটি পাঠকের উপযোগী করে তুলেছেন। এ জন্য তাদের প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আর আল্লাহর কাছে চাচ্ছি—আল্লাহ, অনুগ্রহ করে এ বইটি কবুল করে নিন আপনার জন্যই। এ বইটির ওসীলায় লেখক-পাঠক-প্রকাশক এবং অধম অনুবাদককে কবুল করে নিন। সবাইকে অনন্তকালের ও চিরসুখের জান্নাত নসীব করুন। আমীন।
আব্দুল্লাহ মজুমদার
২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 পূর্বকথা

📄 পূর্বকথা


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গ ও সাহাবীদের ওপর।
আমাদের সাধারণ প্রবণতা হলো, আমরা বয়স্কদের উদ্দেশ্য করে লিখে লিখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি; কারণ, আমরা মনে করি, লেখালেখির মাধ্যমে বয়স্কদের দিক-নির্দেশনা প্রদানের দ্বারা সন্তান-প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে, নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সুযোগ মিলবে। ফলে বয়স্কদের জন্য লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রচুর হলেও কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্য করে লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। বিশেষত বলতে গেলে এমন রচনা তো চোখেই পড়বে না-যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তা থেকে উৎসারিত আলোচনায় সমৃদ্ধ। হতে পারে, 'বয়স্করাই শুধু বই কেনে; আর সন্তান প্রতিপালনসহ বিভিন্ন দিক-নির্দেশনামূলক কাজের ক্ষেত্রে তারাই মূল ভূমিকা রাখে'-আমাদের এ ধারণাই শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের জন্য লেখা বইয়ের সংখ্যা-স্বল্পতার মূল কারণ।
আমরা আরও হয়তো মনে করি, 'উঠতি তরুণ ও যুবকদের সাথে কথা বলা অকার্যকর; কেননা, তারা তাদের মা-বাবা'র উদ্বেগের বিষয় নিয়ে অতটা চিন্তিত হয় না।' এ ধারণা সত্য হোক বা না হোক, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সরাসরি তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই লেখার চিন্তা করলাম-যাদেরকে ভবিষ্যত পৃথিবীর কাজে লাগবে। আমার এ প্রচেষ্টা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ; কেননা, শুধু বড় মাপের লেখকগণই ছোটদের জন্য লিখতে পারেন। তারপরও আমি খুবই সহজ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে অর্থের গভীরতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। এটি আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ।
হয়ে উঠেছে। তবুও আমার পূর্বের কাজে যে ফলাফল আল্লাহ দিয়েছেন-তার ওপর ভিত্তি করেই চ্যালেঞ্জটি আমি গ্রহণ করলাম।
এ বইটির পাঠক অনুভব করতে পারবেন যে, বইয়ে আলোচিত প্রদীপতুল্য বিষয়গুলো আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে; আর এগুলোর উদ্দেশ্যে একটিই : আমাদের সন্তানদের ব্যক্তিত্বকে যথাযথরূপে গড়ে তোলা; সঠিক পথে চলতে তাদেরকে সহযোগিতা করা। পড়াশোনা-কর্মক্ষেত্রসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রেই যোগ্যতা অর্জন করা।
তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, আলোচিত বিষয়গুলো শুধু তরুণ-তরুণী-ই নয়-সবার জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। কোথাও যদি তাদের জন্য বিশেষভাবে কিছু থেকেই থাকে, সেটি যথাস্থানে স্পষ্ট করে দেওয়া হবে। তবে এর সংখ্যা যৎসামান্যই।
আরেকটি ব্যাপার বলে রাখতে চাই : আমার এ বইয়ের মূল উদ্দিষ্ট পাঠকশ্রেণি হলো উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। তবে অন্যরাও এ বই থেকে সমান উপকৃত হতে পারবেন; কারণ, আমি বিশ্বাস করি, মাধ্যমিক স্তরের মেধাবী ছাত্ররাও বইয়ে উল্লিখিত অনেক বিষয় আয়ত্ত করতে সক্ষম হবেন।
আমি আল্লাহর কাছে তাঁর পবিত্র নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলির মাধ্যমে চাইব যে-তিনি যেন এ কাজটি তারই জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। আর বিচারের দিন আমার নেকির পাল্লায় এর সাওয়াব লিখে দেন। অনুরূপভাবে চাইব, আমার প্রিয় ছেলে-মেয়েরাও যেন এ বই থেকে উপকৃত হতে পারে। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও জবাবদাতা।
ড. আব্দুল করীম বাক্কার
রিয়াদ, ২১ রবিউস সানী ১৪২৮ হিজরী

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 জ্ঞানই আলো

📄 জ্ঞানই আলো


জন্মগ্রহণের পর আমরা ধীরে ধীরে আশপাশের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া শুরু করি। তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে আমাদের পরিচিতজনের পরিধি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ফলে একই সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে আমাদের দক্ষতাও।
ব্যাপারটিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক। ধরুন, আপনি একটি অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরটিতে এদিক-ওদিক নানানরকম জিনিসপত্র ছড়ানো, পড়ে আছে কয়েকটি তালাবদ্ধ বাক্স আর কিছু জটিল যন্ত্রপাতি। আরও ধরে নিন যে, এই ঘরটিতে থাকা জিনিসপত্র, বন্ধ বাক্স কিংবা যন্ত্রপাতি এর কোনটি কীসের, কী কাজের, এগুলোর ব্যবহার পদ্ধতি—কোনোকিছু সম্পর্কে আপনার কোনো পূর্ব-ধারণা নেই। এই জিনিসগুলোকে আপনি আগে কখনো দেখেননি। আপনি এগুলোকে চেনেন না। অন্ধকার ঘরে আপনার দৃষ্টিগোচর হওয়া কোনোকিছু সম্পর্কে আপনার কোনোই জ্ঞান নেই। ব্যাপারটিকে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের সাথে মিলিয়ে নিন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا
আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেট থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না।[১]
এই অন্ধকার ঘরে আপনার মনে নানান ধরনের প্রশ্ন খেলে যায়, যার কোনো জবাব সাথে সাথে আপনি খুঁজে পান না। যেমন: এই ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র, অদ্ভুত রকমের যন্ত্রপাতি আর রহস্যাবৃত বদ্ধ বাক্স—এগুলো এখানে কীভাবে এলো? কারা রেখে গেল? কেনই-বা রেখে গেল? এমন হরেক রকমের প্রশ্নের জন্ম নেয় আপনার মনে। এরপর, ঘরটিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের ফলে ধীরে ধীরে একসময় কিছু কিছু রহস্যের সমাধান আপনি করে নিতে পারেন। যন্ত্রপাতিগুলো উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখা, বাক্সগুলো খুলে খুলে দেখা এবং জিনিসপত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে আপনি এগুলোর ব্যবহারও কিছুটা শিখে যান। এরপর ওই প্রাপ্ত জ্ঞান নিয়ে আপনি বেরিয়ে আসেন অন্ধকার ঘর থেকে এবং সেই জ্ঞান দিয়ে আপনি আবিষ্কার করেন নতুন নতুন জিনিস।
সময় গড়াতে থাকে তার নিজস্ব গতিতে। একটা সময়ে এসে আপনি থমকে যাবেন। আপনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করবেন যে, আপনি এতদিন ধরে যা জেনেছেন তা নিতান্তই ক্ষুদ্র। আপনার জানার পরিধি বা পরিমাণ এতই তুচ্ছ যে, আপনি তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এতদিন আপনি ভাবতেন, আপনি অনেক জানেন। জগতের সম্ভাব্য সকল রহস্য উদ্ঘাটন করে আপনি বসে আছেন; কিন্তু যখনই নিজের জ্ঞানের দরিদ্রতা আপনার সামনে প্রকাশ পেয়ে গেল; যখনই এই মহাবিশ্বের মহা রহস্যজাল কিছুটা আপনি চিনতে শিখলেন, তখনই আপনি বুঝলেন যে, আপনি আসলে তেমন কিছুই জানেন না। নিজের অজ্ঞতার এই চিত্র যখন আপনার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে, আপনি তখন আপনার অহংকার-সমেত নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন।
হ্যাঁ, এভাবেই আমরা নিজেদেরকে জানার চেষ্টা করি। এভাবেই আমাদের আশপাশের মানুষগুলোকে আরও বুঝে ওঠার চেষ্টা করি। একইভাবে এ জগতে আমাদের অস্তিত্বের যে চিরন্তন নিয়মাবলি, দায়িত্ব ও সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলোও জেনে নিই। তারপর একদিন ঘনিয়ে আসে সেই চরম মুহূর্ত; দুনিয়ার জীবনের পাঠ চুকিয়ে ওপারের জীবনে চলে যাওয়ার সেই প্রতিশ্রুত সময়। আমাদের শরীর থেকে যখন আমাদের আত্মা বেরিয়ে যায়, তখনো আমাদের মনে অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। আমরা সৃষ্টিজগতের সব রহস্যের জাল ভেদ করতে পারি না। বিশাল সমুদ্র-সমান সেই রহস্যের জট খুলতে আরম্ভ করার আগেই ফুরিয়ে আসে আমাদের সময়। আলো জ্বলে ওঠার আগেই যেন নিভে যাওয়ার আয়োজন সম্পন্ন হয়ে যায়। আমরা জানতে পারি খুবই অল্প; যেমনটা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন-
وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
তোমাদেরকে তো সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।[১]
এটি খুব সিরিয়াস একটি আয়াত। এই একটি আয়াতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অনেকগুলো ব্যাপার বলে দিয়েছেন; যেমন :
আমরা মূলত অজ্ঞ; যতক্ষণ না আমরা জানতে শুরু করছি।
আমাদের বিনয়ী হতে হবে। আর সে বিনয়ের পরিমাণ হবে আমাদের অজ্ঞতার সমান।
আমরা যতটুকু জানি বা আয়ত্ত করি ততটুকুই আমাদের মান-মর্যাদা। আমাদের জানার পরিধি বাড়লে তবেই আমাদের মান-মর্যাদা বাড়বে এবং আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে।
আমরা যেহেতু সবকিছু জানি না, সবকিছু বুঝি না এবং সবকিছুর ওপর জ্ঞান রাখি না, তাই আমাদের জন্য উত্তম হচ্ছে কোনো ঘটনা ঘটা-মাত্র তার ওপর মন্তব্য না করে বসা।
এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের জানাটা বাহ্যিক কিংবা আংশিক। এগুলো আরও গভীরভাবে জানা দরকার। এ জন্য আমাদের দরকার খোলা মন আর জানার জন্য আগ্রহী হৃদয়।

টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, ১৬: ৭৮
[১] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ৮৫

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 শেষ ভালো যার সব ভালো তার

📄 শেষ ভালো যার সব ভালো তার


দুনিয়া এক অদ্ভুত পরীক্ষাক্ষেত্র। গতানুগতিক পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়, এরপর পরীক্ষা দিতে হয়; কিন্তু দুনিয়া নামক পরীক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তুতি আর পরীক্ষা চলে একই সাথে।
এটা বিস্ময়কর নয় যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানে পরীক্ষা চলতেই থাকবে; বরং মানুষভেদে পরীক্ষার রকমফের আর বৈচিত্র্যই ভীষণ বিস্ময়কর। কেউ হয়তো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, আবার কারও জন্য ধন-সম্পদই বিশাল পরীক্ষা। কেউ নিজের বোকামিতে হয়রান, কারও বুদ্ধিমত্তাই নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ পড়েছে খ্যাতির বিড়ম্বনায়, কেউ বা পরিচিতির অভাবে সুবিধাবঞ্চিত। এভাবেই জীবনের নানান ক্ষেত্রে বিচিত্ররূপে মানুষ পরীক্ষিত হচ্ছে। আমাদের এ পরীক্ষার শেষ হয় পৃথিবী থেকে বিদায়ের মাধ্যমে; যার ইংগিত পাওয়া যায় এই আয়াতে— الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন, তোমাদের মধ্যে কে অধিক উত্তম আমল করে।[১]
আমাদের এ চলমান পরীক্ষায় কে সফল আর কে ব্যর্থ, তা জানা যাবে ওপারে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।[১]
এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা জানিই না, আমাদের পরীক্ষা কোন মুহূর্তে শেষ হচ্ছে? কখনই বা পরীক্ষা-পরিদর্শক উত্তরপত্র ছিনিয়ে নেবেন?
পরীক্ষার শেষ সময়ের ব্যাপারে কত মানুষ যে ভুল করেছে! কত মানুষ যে শেষ মুহূর্তে আধ-ঘণ্টা বাড়তি সময়ের জন্য হা-হুতাশ করেছে! কিন্তু তাদের দাবি মানা হয়নি। তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি। আল্লাহ তাআলার এ বাণী সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়-
فَأَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
অতঃপর আমরা হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলি; এমনভাবে (ধরি) যে তারা বুঝতেও পারে না।[২]
তিনি আরও বলেছেন-
فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহূর্তকাল দেরিও করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না।[৩]
এ আয়াত দুটি গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা কখন পড়বে তা আমরা জানি না। তাই কী করছি, কেন করছি-এ অনুভূতিকে সবসময় জাগ্রত রাখতে হবে, মনে রাখতে হবে, আল্লাহ সব দেখছেন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখা,
তার অসন্তোষের কাজ থেকে দূরে থাকাকেই জীবনের মূলমন্ত্র করে নিতে হবে। যদি কখনো ভুল হয়ে যায়, মনে রাখতে হবে, তাওবার দরজা খোলা আছে। ভুল বোঝার সাথে সাথে নিজেকে সংশোধন করে নিতে হবে; কে জানে, তখনই যদি শেষ সময়ের ঘণ্টা বেজে যায়! আর যারা এ পরীক্ষাকে তুচ্ছ মনে করে, তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। একবার ভুল মানুষের সাথে ভুলের স্রোতে ভেসে গেলে, ফিরে আসার সুযোগ না-ও মিলতে পারে।

টিকাঃ
[১] সূরা মুলক, ৬৭ : ০২
[১] সূরা আলে ইমরান, ০৩ : ১৮৫
[২] সূরা আরাফ, ০৭ : ৯৫
[৩] সূরা আরাফ, ০৭ : ৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00