📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 প্রকাশকের কথা

📄 প্রকাশকের কথা


আমরা সবাই বড় হতে চাই, সফল হতে চাই; কিন্তু আমরা ক'জন জীবন-পথে সফল হতে পারি? আমরা ক'জন সফলতার চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করতে পারি? পারলেও কি সেই সফলতা আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে? যদি না পারে, তাহলে কীসের জন্য আমরা ছুটছি, কীসের পেছনে আমরা ছুটছি? সফলতার পথ তো অনেক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ; কিন্তু এই সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও যখন কেউ প্রশান্তি আর সন্তুষ্টির সাগরে অবগাহনের অনুভূতি না পায়, বস্তুত তখন তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
আদতে সফলতার সংজ্ঞা কী? সফলতার সংজ্ঞায় রয়েছে বিভিন্নতা। একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে একেকরকম। কেউ মনে করে, সফলতা মানেই কাড়ি কাড়ি অর্থ উপার্জন করা; আবার কারো কাছে হয়তো অনাড়ম্বর জীবনযাপনই সফলতার মাত্রা। কেউ সুবিশাল অট্টালিকা, প্রভাব-প্রতিপত্তির মধ্যে সফলতা খুঁজে, কেউবা আবার নিভৃতচারী হয়ে যাওয়াকেই জীবনের মানে ধরে নেয়। দুনিয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে সফলতার সংজ্ঞা, পথ এবং পদ্ধতি; কিন্তু এই সংজ্ঞা, পথ এবং পদ্ধতির গন্ডিতে ডুবে গিয়ে আমরা বিচ্যুত হয়ে পড়ি প্রকৃত সফলতার কেন্দ্র থেকে। সত্যিকার সফলতার কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়া মানুষগুলোকে প্রকৃত সফলতার পথ দেখাতে সিরিয়ান বংশোদ্ভূত শাইখ আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিজাহুল্লাহ রচনা করেছেন ইলা আবনাঈ ওয়া বানাতী! খামসূনা শাময়াতান লি-ইযায়াতি দুরুবিকুম।
তিনি এই বইটি রচনা করেছেন তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে। একটি জাতির সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক হলো তরুণ প্রজন্ম। শুধু তাই নয়, তরুণ প্রজন্ম হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও ভিত্তি। তাদের মাধ্যমে একটি জাতির বিকশিত হবার দ্বার উন্মোচিত হয়। তরুণ-তরুণীরা যখন সৎকর্মশীল, শক্তিশালী, দক্ষ, দৃঢ় ও প্রত্যয়ী হয়, তখনই একটি জাতি দ্রুতগতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পক্ষান্তরে, তরুণরা যখন দুর্বল, অলস, অদক্ষ ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন পুরো জাতির উন্নতির গ্রাফ হতে থাকে নিম্নমুখী, ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে।
তরুণ-তরুণীদের নিবিড় অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, সীমাহীন ত্যাগ ও ধৈর্য-ধারণের মাধ্যমে সফলতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে দেশ ও জাতির হীরকখণ্ডে পরিণত হবার কথা; অথচ তারা আজ সর্বগ্রাসী মাদকের ভয়াল থাবায় পড়ে পরিণত হচ্ছে পরিবার তথা সমাজের বোঝায়। সংক্রমিত করছে পুরো দেশ ও জাতিকে। আজ তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে। ইন্টারনেট-ই যেন তাদের নির্মল বিনোদন ও অনাবিল প্রশান্তির একমাত্র অবলম্বন। অথচ তারা নিজের অজান্তেই অতি মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। ক্রমান্বয়ে যার প্রভাব পড়ছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই। তাদের মাঝে কেউ বেকারত্বের গ্লানি টানতে না পেরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে, বিসর্জন দিচ্ছে নিজের নৈতিক মূল্যবোধকে। ফলস্বরূপ, তাদের অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। আজকের এই পথহারা তরুণ সমাজকে আলোর পথ দেখাতে শাইখ আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিজাহুল্লাহ-র এই বইটি অনন্য ভূমিকা পালন করবে, ইন শা আল্লাহ। এই বইতে তিনি জীবনের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা সমস্যা এবং তার সমাধান, সম্ভাবনা এবং তার প্রয়োগ-বিধি নিয়ে আলাপ করেছেন খুব সুন্দর এবং সাবলীলভাবে। তিনি তরুণদের এমন ভাষায়, এমন ঢঙে উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন, যেমন করে বাবা তার প্রিয় সন্তানকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
শাইখের এই মূল্যবান বইটি জীবন-পথে সফল হতে নামে বাংলাভাষী পাঠকদের হাতে তুলে দিতে পেরে সমকালীন প্রকাশন আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত, আলহামদু লিল্লাহ্।
বইটি বাংলাভাষায় রূপান্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে অধ্যয়নরত তরুণ উদীয়মান লেখক ও অনুবাদক প্রিয় আব্দুল্লাহ মজুমদার। করুণাময় আল্লাহ যেন তাকে দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মানিত করেন। এছাড়াও অনন্য অসাধারণ এই বইটিকে সুখপাঠ্য ও পাঠকের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলতে যাদের আন্তরিক শ্রম রয়েছে
সমকালীন পরিবার তাদের সকলের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে। করুণাময় মহান আল্লাহ তাআলা যেন তাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। আমীন।
সমকালীন পরিবারের প্রতিটি সদস্য তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে বইটি নির্ভুলভাবে আপনাদের নিকট উপস্থাপন করতে। তারপরও বইটির কোথাও কোনো ভুল যদি সম্মানিত পাঠকবৃন্দের দৃষ্টিগোচর হয়, তা আমাদেরকে জানানোর বিশেষ অনুরোধ করছি।
সমকালীন প্রকাশন অত্যন্ত উৎসাহী ও আশাবাদী যে, এই বইটি মুসলিম তরুণ-তরুণীদের ভাবনার জগতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাবে। জীবন নিয়ে নতুন করে, নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে, ইন শা আল্লাহ।
প্রকাশক
সমকালীন প্রকাশন

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 সম্পাদকের কথা

📄 সম্পাদকের কথা


জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষণিকের দুনিয়ায় জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে, দুনিয়ার জীবনে সফলতার সোনালী শিখরে আরোহণ করতে মানুষ কতই-না চেষ্টা-সংগ্রাম করে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত পরিশ্রম করে একমুঠো সুখ আর এক টুকরো সফলতার জন্য। তাদের দেখলে দুনিয়ার সকল আয়োজন মনে হয় শুধু দুনিয়ায় সফল হওয়ার জন্য; কিন্তু আসলে তা নয়। এই জীবনের পরেও একটি জীবন আছে। সেই জীবনই আসল ও স্থায়ী জীবন। অথচ মানুষ এই ক্ষণিকের দুনিয়ায় সফল হতে চায়; কিন্তু আখিরাতের সফলতার পথ খোঁজে না।
আল্লাহ শুধু আখিরাতে সফল হতে বলেননি, তিনি মানুষকে আখিরাতের আগে দুনিয়াতেও সফল হতে বলেছেন। এজন্য তিনি দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ চেয়ে দুআ শিখিয়েছেন—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً
হে আমাদের রব, আপনি দুনিয়ায় আমাদের কল্যাণ দান করুন এবং কল্যাণ দান করুন আমাদের আখিরাতেও [১]
কিন্তু আমরা অনেকে আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করতে গিয়ে দুনিয়ার কল্যাণের কথা ভুলেই যাই। অথচ দুনিয়ায় কল্যাণ-ছাড়া থেকে আখিরাতের কল্যাণ পাওয়া
সম্ভব না। কল্যাণ মানে সবসময় হাসি-खुশি থাকা বোঝায় না। কখনো কখনো কারও জন্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ ইত্যাদিও কল্যাণ হয়ে আসে। তার গুনাহ মাফ করিয়ে দেয়, তার সম্মান-মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়।
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে যে চলতে পারে সেই তো বুদ্ধিমান। অনেকে দুনিয়ার বিষয়াবলি পরিচালনা করতে গিয়ে এবং দুনিয়ার সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আখিরাত থেকে দূরে সরে যান; আবার কেউ এমন পথে হাঁটেন, যে পথে সমধান নেই, আছে সমস্যার বহু রূপ। একজন মুসলিমের জন্য এই দুনিয়া যেহেতু জেলখানার মতো, সেহেতু এই দুনিয়ায় তাকে খুব সাবধানে পথ চলতে হবে। সামান্য অসাবধানতা ও ভুল তাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। দুনিয়ার এক পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে তাকে পৌঁছতে হবে আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতার স্টেশনে। এজন্য দরকার কিছু আলোকবর্তিকা—যেগুলো তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সফলতার চূড়ান্ত পথে। এমন কিছু আলোকবর্তিকা নিয়েই এই বইটি লিখেছেন সিরিয়ান শিক্ষক, গবেষক, লেখক শাইখ ড. আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিযাহুল্লাহ।
বর্তমান তরুণ-প্রজন্ম জীবনে সফল হতে গিয়ে হালাল-হারাম বাছবিচার করছে না। তারা দুনিয়ায় সফল হতে যাচ্ছে-তাই করছে। দুনিয়ায় আপাত সফল ব্যক্তিদের দেখে তারা ধোঁকায় পড়ছে। তারা ভুলেই যাচ্ছে যে, তাদের জীবনে যেসকল সমস্যা আছে সেগুলো নতুন নয়। সেই সমস্যাগুলো হয় একই রূপে না-হয় ভিন্ন রূপে অন্যদের জীবনেও আছে। তারা তাদের চাহিদামতো কিছু না পেলেই খুব দ্রুত হতাশ হয়ে জীবন শেষ করে দিতে চাইছে, কেউ তো শেষ করেই দিচ্ছে। তারা মনে করছে—আত্মহত্যাই সমাধান। কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে সকল বয়সী মানুষই জীবনপথে সফল হতে চায়; কিন্তু তারা কীভাবে সফল হবে তা জানে না। তাদের জন্যই শাইখ আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিযাহুল্লাহ জ্বেলেছেন পঞ্চাশটি মোমবাতি। সে মোমবাতিগুলো তাদেরকে পথ দেখাবে যারা জীবনে সফল হতে চায়।
এই বইটিতে লেখক পঞ্চাশটি লেখা পৃথক পৃথক শিরোনামে লিখেছেন। লেখাগুলোর মাধ্যমে তিনি আমাদের খুব সহজ ভাষায় জানিয়েছেন যে, জীবনে কীভাবে সফল হতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে আত্মোন্নয়ন করা যায়, কীভাবে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার স্বর্ণশিখরে উঠে বিজয়ের পতাকা উড়ানো যায়। বইটির আরবী নাম ইলা আবনাঈ ওয়া বানাতী! খামসূনা শাময়াতান লি-ইযায়াতি দুরুবিকুম। বইটি বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন তরুণ অনুবাদক প্রিয়।
ভাই আব্দুল্লাহ মজুমদার, যার অনূদিত তিনিই আমার রব বইটি সমকালীন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়ে ইতোমধ্যেই পাঠকের কাছে পৌঁছেছে এবং বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, আলহামদু লিল্লাহ। সমকালীন প্রকাশন থেকে এটি অনুবাদকের দ্বিতীয় বই। আশা করা যাচ্ছে, প্রথম বইটির মতো এই বইটিও পাঠকের কাছে বেশি সমাদৃত হবে ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে, ইন-শা-আল্লাহ।
বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে আমরা আরবী নামের হুবহু অনুবাদ না করে বিষয়বস্তুর দিকে খেয়াল রেখে নামকরণ করা হয়েছে জীবন পথে সফল হতে। জীবন একটি পথের নাম। সেই পথের শুরু জন্মের মাধ্যমে; কিন্তু মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ নয়। এই জীবন দীর্ঘ পরকাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ পথে কীভাবে সফল হতে হবে এবং কীভাবে সফলতার পথে আসা বাধাগুলো অতিক্রম করতে হবে তাই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন আকর্ষণীয় স্টাইলে। লেখক আরব হওয়ায় এবং তার পাঠকও আরবীভাষী হওয়ার কারণে বাঙালি পাঠকদের উপযোগী করার জন্য বাংলা অনুবাদে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
সর্বশেষে সম্মানিত লেখকের জন্য আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান কামনা করছি। অনুবাদক, সম্পাদক, প্রুফরিডার, প্রচ্ছদ ডিজাইনারসহ বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সম্পাদনা টিমের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম বিনিময় প্রার্থনা করছি। মহান আল্লাহর কাছে বইটি যেন গৃহীত হয় সেই দুআও করছি।
শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল
সম্পাদক, সমকালীন প্রকাশন

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত : ২০১

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য—যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন; পাঠিয়েছেন এ পৃথিবীর বুকে; না চাইতেই অফুরন্ত নিয়ামতরাজি দিয়ে আচ্ছাদিত করেছেন আমাদের; মুসলিম হিসেবে বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন এবং আমাদের জন্য জীবনযাত্রাকে সহজ ও সাবলীল করেছেন। আলহামদু লিল্লাহি হামদান কাসীরা!
এ পৃথিবীর বুকে আমাদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানের মাঝে যে সামান্য সময়টুকু—তা-ই আমাদের জীবন। জীবন খুবই ছোট। দেখতে দেখতে বছরগুলো কেটে যায়। ফুরিয়ে যায় জীবনের দিনগুলো। তারপর শুরু হয় অনন্তের যাত্রা। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি এভাবেই একের পর এক মানুষ আসছে; দুনিয়ার ওপর কিছু দিন থাকছে, বিচরণ করছে, আবার চলে যাচ্ছে সবকিছু ছেড়ে।
জীবনের সফলতা বলতে আসলে কী বোঝায়—এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মনীষীগণ নিজস্ব মতামত দিয়ে গেছেন। জীবনের সফলতা কি শুধু পার্থিব সফলতায় সীমাবদ্ধ, নাকি তা দুনিয়াকে অতিক্রম করে পরবর্তী জীবনের সফলতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করে? জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে? জীবন-ধারণের পন্থা আমাদের কেমন হওয়া উচিত? জীবনের উদ্দেশ্য ও তা বাস্তবায়নের যাবতীয় কর্মপন্থা কীরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়—তা নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই।
মানুষের জীবনে তারুণ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধাপে একজন মানুষ যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে তার জীবনের সার্বিক সফলতা। লোহা দগদগে আগুনে পুড়িয়ে তা থেকে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করা হয়। আগুনে পোড়ানোর সময় নরম থাকে। তাকে যে আকৃতি দেওয়া হয় সে আকৃতিই তা গ্রহণ করে।
করে। তারুণ্যও এমনই। জীবনপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ ধাপে একজন তরুণ কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলবে, একজন তরুণের জন্য তার সঠিক দিক-নির্দেশনা খুবই দরকারী।
জীবনের সফলতার সংজ্ঞা অনেকে পার্থিব-জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেয়। বৈষয়িক উন্নতি যাদের মূল চিন্তা বা ধ্যান-ধারণা, তারা পার্থিব জীবনের বড় কোনো অর্জনকে সফলতা মনে করে বসে। বর্তমান আধুনিক ধর্ম-বিমুখ সমাজে এ ধরনের প্রবণতাই বেশি। আবার ইসলামী ভাবধারার অনেকে পার্থিব যেকোনো অর্জনকে-ই ছোট করে দেখে। পরকালীন সফলতাই মুসলিমদের মুখ্য বিষয়। দুনিয়াবী সফলতা গৌণ। তার মানে, দুনিয়ার যে কোনো অর্জনকে একদম ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; বরং সে অর্জনকেও পরকালীন জীবনে সফলতার একটা মাধ্যম বা পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
এবার আসি বইটির ব্যাপারে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে ক্যারিয়ার গঠনের ব্যাপারে সচেতনতা প্রবল। জীবন-পথে কীভাবে সফল হওয়া যায় এবং সে সফলতার সংজ্ঞা কী, জীবনের বিবিধ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে কেমন পথ ও পন্থা অনুসরণ করা উচিত এবং পড়ালেখা ও উপার্জনসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখক সুন্দর সুন্দর পরামর্শ দিয়ে নিজের বইটি সাজিয়েছেন। বইটির বিষয়বস্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী করে শিক্ষার্থীদের সামনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, মুসলিম-চিন্তা-দর্শন ও সভ্যতা বিষয়ক গভীর ভাবনাগুলো লেখক তার রচনাবলিতে প্রকাশ করে থাকেন। তবে বিশেষ করে এই বইটিতে তিনি তরুণদের উপযোগী করে কিছু পরামর্শ চয়ন করেছেন।
ছাত্রজীবনে লক্ষ্য-পানে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মপন্থা একজন ছাত্রকে গ্রহণ করতে হয়। এগুলো যেমন সে পরিবার, শিক্ষকবৃন্দ ও সমাজ থেকে পায়, তেমনই কোনো কোনো বইও এক্ষেত্রে তাকে প্রেরণা যোগায়। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে হতাশা প্রবল হয়ে উঠেছে। ক্যারিয়ার গাইডলাইন বা সফলতা অর্জনের নানা পন্থা নিয়ে বই এবং মোটিভেশনাল লেকচার আছে। তবুও সেগুলোতে যেন পূর্ণতার বড় অভাব। এ ধরনের যা কিছু পাওয়া যায়—তার অধিকাংশই সামাজিক মূল্যবোধ বা চারিত্রিক উৎকর্ষতা অর্জনের দিকে তেমন জোর দেয় না। তার ব্যতিক্রম এ বইটি।
আমি যখন উঠতি তরুণ, তখন থেকেই কিশোরদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে—এমন বইগুলো খোঁজা শুরু করেছিলাম। কেননা, কিশোর বয়সে যদি কারও ভেতর
উত্তম অভ্যাস ও চিন্তাধারা গড়ে তোলা যায়, তাহলে তার বাকি জীবন সে সঠিক ও উত্তমরূপে পরিচালনা করার যথেষ্ট রসদ সাথে পাবে। প্রথমে আমার হাতে পড়ে দুটো বই। আহসান হাবীব ইমরোজের মোরা বড় হতে চাই এবং মুহাম্মাদ যাইনুল আবিদীনের বড় যদি হতে চাও। প্রথম বইটিতে বেশ কিছু বাস্তব উদাহরণ এনে ক্যারিয়ার গঠনের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মনীষীর জীবনী থেকেও অনেক সুন্দর ঘটনা এতে এসেছে। দ্বিতীয় বইটি ছিল আরও চমৎকার। এ বইটিতে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করার মতো অনেক ভালো ভালো পরামর্শ রয়েছে। সালাফদের জীবনচরিত এ বই রচনায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। তারপর সফিউল্লাহ ফুয়াদ হাফিযাহুল্লাহ-র শিক্ষার্থীদের সফলতার রাজপথ : লেখাপড়ার আদর্শ পদ্ধতি বইটি সংগ্রহ করি। আকারে বেশ বড় এই বইটিও আমার ওপর বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। পড়াশোনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে আমার সামনে। জীবন-পথে চলার ক্ষেত্রে আমি নানাবিধ পরামর্শ ওখান থেকেই নিয়েছি। এরই ধারাবাহিকতায় সবশেষে পড়লাম আব্দুল হামীদ ফাইযী হাফিযাহুল্লাহ রচিত আদর্শ ছাত্র জীবন। ছোট একটি বই, তবে যথারীতি তার অন্যান্য বইয়ের মতো বেশ সুখপাঠ্য ও উপভোগ্য।
এ সকল বই পড়ে আমি যেসব দিক-নির্দেশনা, পরামর্শ ও শিক্ষা পেলাম-তার তালিকা করা কঠিন। তবে সংকলন করে রাখলে হয়তো আমার জন্যই ভালো হতো। একদিন আমি ড. আব্দুল কারীম বাক্কার হাফিযাহুল্লাহ-র কিছু বই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। তার বইগুলো মনের আঙিনায় নতুন নতুন শুভচিন্তার উদ্রেক ঘটাতে সহায়তা করে। যে কোনো বিষয় নিয়ে তিনি খুব গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং এরপর তার সার্বিক চিন্তার সার-নির্যাস উপস্থাপন করে থাকেন। আমার নজরে পড়ল বইটি। পড়ার জন্য বেছে নিলাম। পড়ে ফেললামও কিছু দিন সময় নিয়ে। বইটি তরুণ সমাজের সামনে উপস্থাপনের উপযোগী মনে হলো আমার। রামাদান মাসে কাজ শুরু করলাম। আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা কাজটি আমাকে করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বইটি পড়বে এবং তাদের জীবনে বইটির কল্যাণবাহী প্রভাব পড়বে-এমনটিই আশা রাখি। তরুণ সমাজের জন্য পরামর্শমূলক খুঁটি-নাটি অনেক কিছু বইটিতে পাওয়া যাবে। তাই আমি এখানে আর কথা বাড়াবো না। তবে তরুণ-সমাজের জন্য আমার পক্ষ থেকে অপু ভাইয়ের পরামর্শটিই থাকবে-
মুসলিম তরুণদেরকে পড়াশোনার ব্যাপারে খুব সিনসিয়ার হতে হবে; কারণ, এটিই অন্যান্য ছাত্রদের থেকে তাকে পৃথক করে দেবে। একজন ধার্মিক ছাত্র তার ক্লাসের টপ স্টুডেন্ট ও সবচেয়ে ভালো ছাত্র হওয়ার চেষ্টা করবে। তখন সবার কাছে সে আদর্শে পরিণত হবে। একইভাবে একজন মুসলিম চাকুরিজীবীর তার অফিসে টপ পারফর্মার হওয়া উচিত। কেননা, সবার মাঝে তখন এ ধ্যান- ধারণা বদ্ধমূল হবে যে, ছেলেটি ইসলাম পালন করে, তাই তার ভেতর এ রকম দায়িত্ববোধ আছে। আবার যে ছেলেটি ইসলাম মেনে চলে, সে তার মা-বাবার কাছে সবচেয়ে ভালো ছেলে হওয়ার চেষ্টা করবে; যাতে তারা মনে করতে পারে যে, আমার অন্যান্য যে ছেলেগুলো ইসলাম মানে না, তাদের তুলনায় এই ছেলেটি আমাদের কত অনুগত! এর কারণ, তার মাঝে গ্রোথিত ইসলামের বুঝ। কুরআন-সুন্নাহ্র শিক্ষাটা সে পালন করছে। মুসলিম তরুণ মানে শুধু ধর্মীয় কার্যাদি পালনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলাম পালনের কারণে সে যে অন্যরকম একজন মানুষ এবং তার যে প্রোডাক্টিভিটি আছে তা তাকে প্রমাণ করতে হবে।
পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই সমকালীন প্রকাশনকে—যারা বইটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বইটিতে থাকা আমার অনুবাদের ভাষাগত যেসব দুর্বলতা ছিল—তা দূর করে সামান্য সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে সম্পাদকমণ্ডলী সেটি পাঠকের উপযোগী করে তুলেছেন। এ জন্য তাদের প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আর আল্লাহর কাছে চাচ্ছি—আল্লাহ, অনুগ্রহ করে এ বইটি কবুল করে নিন আপনার জন্যই। এ বইটির ওসীলায় লেখক-পাঠক-প্রকাশক এবং অধম অনুবাদককে কবুল করে নিন। সবাইকে অনন্তকালের ও চিরসুখের জান্নাত নসীব করুন। আমীন।
আব্দুল্লাহ মজুমদার
২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

📘 জীবন পথে সফল হতে > 📄 পূর্বকথা

📄 পূর্বকথা


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর, তার পরিবারবর্গ ও সাহাবীদের ওপর।
আমাদের সাধারণ প্রবণতা হলো, আমরা বয়স্কদের উদ্দেশ্য করে লিখে লিখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি; কারণ, আমরা মনে করি, লেখালেখির মাধ্যমে বয়স্কদের দিক-নির্দেশনা প্রদানের দ্বারা সন্তান-প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে, নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সুযোগ মিলবে। ফলে বয়স্কদের জন্য লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রচুর হলেও কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্য করে লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। বিশেষত বলতে গেলে এমন রচনা তো চোখেই পড়বে না-যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তা থেকে উৎসারিত আলোচনায় সমৃদ্ধ। হতে পারে, 'বয়স্করাই শুধু বই কেনে; আর সন্তান প্রতিপালনসহ বিভিন্ন দিক-নির্দেশনামূলক কাজের ক্ষেত্রে তারাই মূল ভূমিকা রাখে'-আমাদের এ ধারণাই শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের জন্য লেখা বইয়ের সংখ্যা-স্বল্পতার মূল কারণ।
আমরা আরও হয়তো মনে করি, 'উঠতি তরুণ ও যুবকদের সাথে কথা বলা অকার্যকর; কেননা, তারা তাদের মা-বাবা'র উদ্বেগের বিষয় নিয়ে অতটা চিন্তিত হয় না।' এ ধারণা সত্য হোক বা না হোক, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সরাসরি তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই লেখার চিন্তা করলাম-যাদেরকে ভবিষ্যত পৃথিবীর কাজে লাগবে। আমার এ প্রচেষ্টা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ; কেননা, শুধু বড় মাপের লেখকগণই ছোটদের জন্য লিখতে পারেন। তারপরও আমি খুবই সহজ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে অর্থের গভীরতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। এটি আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ।
হয়ে উঠেছে। তবুও আমার পূর্বের কাজে যে ফলাফল আল্লাহ দিয়েছেন-তার ওপর ভিত্তি করেই চ্যালেঞ্জটি আমি গ্রহণ করলাম।
এ বইটির পাঠক অনুভব করতে পারবেন যে, বইয়ে আলোচিত প্রদীপতুল্য বিষয়গুলো আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে; আর এগুলোর উদ্দেশ্যে একটিই : আমাদের সন্তানদের ব্যক্তিত্বকে যথাযথরূপে গড়ে তোলা; সঠিক পথে চলতে তাদেরকে সহযোগিতা করা। পড়াশোনা-কর্মক্ষেত্রসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রেই যোগ্যতা অর্জন করা।
তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, আলোচিত বিষয়গুলো শুধু তরুণ-তরুণী-ই নয়-সবার জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। কোথাও যদি তাদের জন্য বিশেষভাবে কিছু থেকেই থাকে, সেটি যথাস্থানে স্পষ্ট করে দেওয়া হবে। তবে এর সংখ্যা যৎসামান্যই।
আরেকটি ব্যাপার বলে রাখতে চাই : আমার এ বইয়ের মূল উদ্দিষ্ট পাঠকশ্রেণি হলো উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। তবে অন্যরাও এ বই থেকে সমান উপকৃত হতে পারবেন; কারণ, আমি বিশ্বাস করি, মাধ্যমিক স্তরের মেধাবী ছাত্ররাও বইয়ে উল্লিখিত অনেক বিষয় আয়ত্ত করতে সক্ষম হবেন।
আমি আল্লাহর কাছে তাঁর পবিত্র নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলির মাধ্যমে চাইব যে-তিনি যেন এ কাজটি তারই জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। আর বিচারের দিন আমার নেকির পাল্লায় এর সাওয়াব লিখে দেন। অনুরূপভাবে চাইব, আমার প্রিয় ছেলে-মেয়েরাও যেন এ বই থেকে উপকৃত হতে পারে। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও জবাবদাতা।
ড. আব্দুল করীম বাক্কার
রিয়াদ, ২১ রবিউস সানী ১৪২৮ হিজরী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00