📄 ভাবনার শেষ থেকে
কখনো মনে হয় জীবনটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আলো সরে গেছে চারদিক থেকে। শূন্যতায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। আমরা যে প্রাচীন বাড়িতে বসবাস করি, বৃষ্টির পানিতে খসে গেছে যে বাড়ির পলেস্তারা; সে বাড়িটাও যেন খালি। আমার হৃদয়ের অনুভূতি যত স্থানে যেতে পারে তার প্রতিটিতে যেন অপরিসীম শূন্যতা বিরাজ করছে। তখন আমরা ধীর ক্লান্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলি বালুর ওপর। আমাদের পায়ের নিচে ধুলোবালি উড়ে চলে। সামান্য কিছু আশার পেছনে ছুটোছুটি করে নেতিয়ে পড়ে আমাদের পা।
বিপদাপদে পড়ে আমরা কখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন আমাদের চিন্তাগুলোতে ধস নামে। দুশ্চিন্তা জাল বোনে। স্মৃতিরা ঘোলাটে হয়ে আসে। মনছবি হয়ে যায় বিকৃত। কখনো অশ্রু, আবার কখনো রক্তে সিক্ত হই আমরা। আমি জানি না, কী করে মা সেই চোখের পানি ধরে রাখেন। তার একটা অংশ যে অনুপস্থিত, সেটা তিনি কী করে আমাদের না বলে থাকেন। এখনো কীভাবে এতটা আশা নিয়ে জীবনযাপন করেন। কীভাবে তার হৃদয়ে এত প্রশান্তি! তার দুচোখে রুপার মতো জ্বলজ্বল করে স্নেহ। বাবার কথা বলার সময় গলায় এক আশ্চর্য নম্রতা আসে। বাবার বর্ণনা দিতে গিয়ে, তার বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে চোখের জল নিবারণ করেন তিনি। তারপর আমরা যখন তার থেকে দূরে থাকি তখন তিনি নিজের বেদনায় ডুবে যান। বাবার সুবাস, তার গলার আওয়াজ পাওয়ার জন্য তার মন আনচান করে ওঠে। এদিকে আমরা তাকে ভুলে যাই। কতটা নিষ্ঠুর আমরা! কী নির্মম আমাদের দিনগুলি!
সকাল আসে। সবকিছু ভুলে যাই। আবার এক টুকরো আলোর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু কেবল আল্লাহর স্মরণে তা খুঁজে পাই। হে আমার আশা-ভরসা! হে আল্লাহ! ঔদাসিন্যতায় অলসতায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে আপনার অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকি। জীবনের নতুন একটা পাতা শুরু করতে চাই, যেটা বরফের মতো সাদা, বৃষ্টির পানির মতো পবিত্র— মানুষের নিঃশ্বাস যাকে নোংরা করেনি। আমার অজ্ঞ-প্রত্যজ্ঞা সালাত আদায়ের জন্য আগ্রহী। আমাকে নিয়ে চলুন আপনার দিকে। আমাদের নিয়ে চলুন আপনার তরে। আমি এখনো হোঁচট খেয়ে চলেছি। আমার পা-গুলো হোঁচট খাচ্ছে। আমার হাঁটার জ্ঞান দিন।
আমি এখনো রবের আনুগত্যের পবিত্র গুহার অনুসন্ধানে ধৈর্যের অতিক্রম্য পাহাড়গুলোতে উঠতে ভয় করি। এখনো আমি দূরত্ব ও পথ হারানোর বেদনায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রির অমানিশায় ঘুরপাক খাচ্ছি। জান্নাতের তীব্র কামনা আমাকে মাঝে মাঝে ঘিরে ধরে। তখন আপনার সুধারর্ণার পোশাক পরি। আপনার কিতাবে দেওয়া সুসংবাদে নিজের হৃদয়কে প্রশান্ত করার চেষ্টা করি। আমার মনে গভীর আকাঙ্ক্ষা জন্মে ভোরবেলার বিনয়ী আওয়াজ শোনার, ফজরের সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যে মানুষগুলো অন্ধকার রাত ভেদ করে হেঁটে চলেছে, যাদের কপালে চাঁদের আলো পড়ছে—তাদের আওয়াজ শোনার।
আমি সেই নারীদের দেখতে চাই যারা নিজেদের পবিত্রতার পোশাকে আবৃত করেছে। যারা নিজেদের মাথার পরে নিয়েছে নিরাপত্তা ও সম্মানের পোশাক। আমার সকল ভাবনা অস্ত গেলে সূর্যোদয় ঘটে তার সমস্ত সৌন্দর্য ও মর্যাদা নিয়ে। আমাকে মুগ্ধ করে সে। সকল কিছুকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠে সূর্য। কারও দিকে তাকায় না। হোঁচট খায় না। কোনো অজুহাত পেশ করে না। তার পূর্বে বিরাজমান। অন্ধকারের ওপর দোষ চাপায় না। ঘন মেঘ তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। অবিরত বর্ষণ তাকে থামাতে পারে না। সে নিজের মতো ওঠে, চলে। তার অফুরান দান অব্যাহত রাখে। কী দৃঢ়তা তার মাঝে! তার আশা কত বিশাল! সূর্য অনবরত দান করে চলেছে তার আলো, এতটুকু ক্লান্তি অনুভব করে না সে। সে সত্তা কতই না মহান যিনি সূর্যকে এত ভালোবাসা দিয়েছেন। তার অনুগ্রহ ঢেলে দিয়েছেন। আলোর পোশাক পরিয়ে আলোকিত করেছেন। তাই তো সূর্যের আলো পাওয়ার জন্য সবাই প্রতিদিন উন্মুখ থাকে। সুবহানাল্লাহ!
ঝেড়ে ফেলি দুঃখ-ব্যথা। আল্লাহর কাছে দুআ করি। আশা পেশ করি তাঁর কাছে। ফিরে চলি সালাতে। পরিশুদ্ধ করে তুলি নিজেদের অন্তর। হতাশ হব না। ভেঙে পড়ব না একদম। অতীতের আঁধার-প্রান্তে বসে চলবে পর্যবেক্ষণ। ধীরে ধীরে তা বিলীন হয়ে আসছে। আল্লাহর অনুগ্রহে নতুন সূর্যোদয় হতে যাচ্ছে আগামীকাল, সে সূর্যোদয় নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেবে জীবনটাকে।
📄 শেষ কথা
আল্লাহর বান্দি! আমরা যা লিখি তা আবার পড়ে দেখি। তাতে অনেক ভুল পাই। কখনো-বা চিন্তাগুলো মনঃপূত হয় না। তখন আবার মুছে ফেলি। কিছু কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিই। আবার লিখি। কখনো ভুলটাকে কেটে দিই। সেই কেটে ফেলা লেখাটা দেখে আমরা শিক্ষা নিই; যাতে ভবিষ্যতে আর এমন ভুল না হয়। এভাবে আমরা একটা প্যারা শেষ করে সেখানে দাঁড়ি দিই। তারপর নতুন প্যারা শুরু করি আরেক লাইন থেকে। কিছুটা ফাঁকা রেখে নতুন লাইনে শুরু করা মানে আরেকটা ভালো সুযোগ পাওয়া। কিন্তু দাঁড়ি দেবো কোথায়? আর কোত্থেকই-বা নতুন লাইন শুরু করব?
আমাদের জীবনটা এমনই। বেশ কিছু ঘটনা-ব্যক্তি-কথাবার্তা-অবস্থার সমষ্টি। কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী মানুষ থাকবে। তাদের মুছে ফেলতে হবে জীবনের আঙিনা থেকে। খারাপ বন্ধুরা সবকিছু বিনষ্ট করার আগেই তাদের দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে। আমরা যে পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ি তা থেকে অবশ্যই আমাদের পবিত্র হতে হবে। যাতে আমাদের প্রশান্ত আত্মা গঠনে তা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তারপরই একটা দাঁড়ি দেবো। কিছু হিংসুক আছে। এদের আমরা বন্ধনীর মাঝে রেখে দেবো। এড়িয়ে চলব। এদের সাথে এমন ব্যবহার করব যেন এরা অতিরিক্ত বাক্য। এদের গুরুত্বও দেবো না। এদের পেছনে সময় দিতে গেলে আমরা গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু হয়তো মিস করে ফেলব। কিছু চমৎকার মানুষ আছে। এরা আমাদের জীবনে সবসময় জাদুকরী স্পর্শ দিয়ে যায়। এদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করব। এদের নিচে লাল দাগ দিয়ে সযত্নে রেখে দেবো।
কিছু আল্লাহভীরু পবিত্র মনের মানুষ আছে। এরা আমাদের কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে। কোনো কল্যাণকর কাজে আমাদের দেখলে এরা উৎসাহ দেয়। ভুল করলে উপদেশ দেয়। পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে উঠিয়ে দেয়। তাদের দেখলে আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি। যেন তারা তাসবিহ! এদের থেকে দূরে চলে গেলেও এরা আমাদের জন্য দুআ করে। আর সাক্ষাৎ হলে আমাদের ঈমান বেড়ে যায়, ইচ্ছে তীব্র হয়। এদের অনুপস্থিতি আমাদের প্রবাস জীবনের একাকিত্বে ভোগায়। আমরা বুকে এক গভীর ব্যথা অনুভব করি। সাথে এক ভিন্ন স্বাদ; কারণ, আল্লাহর জন্য যাদের ভালোবাসি, যারা আমাদের উত্তম সঙ্গী—তাদের সাথে সাক্ষাতের বাসনা মনে পুষে রাখার এক অনাবিল তৃপ্তি আছে।
এদের কেবল লাল দাগ দিয়ে রাখলে হবে না। এদের কথা ভাষায় প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। এদের পৃথকভাবে লিখে রাখতে হবে। এদের জন্য বরাদ্দ থাকবে ভালোবাসার ভিন্ন পাতা। হৃদয়ের গহীনে একটা পৃথক উষ্ণ অবস্থান তাদের জন্য রাখতে হবে। মাঝে মাঝে হয়তো তাদের জন্য দুআর প্রজাপতি উড়িয়ে দেবো, সে প্রজাপতি সততার সাথে উড়ে যাবে আকাশের দিকে। বহন করে নিয়ে যাবে ভালোবাসা আর আশা। চলে যাবে রাব্বে কারীমের দরবারে। কবুল হয়ে যাবে দুআগুলি। সে দুআ থাকবে—'তাদের সাথে আমাদের জান্নাতে একত্র করার'।
ছিঁড়ে ফেলো সকল পাতা। কেটে ফেলো যত ভুল আছে জীবনের। সকল গুনাহর সমাপ্তি টেনে দাও। আল্লাহ আমাদের নতুন করে শুরু করার সুযোগ দিয়েছেন। কারণ, আমরা তাওবা করলে তো প্রতিটা গুনাহ রূপান্তরিত হবে নেকিতে। তখন আমাদের আমলনামাগুলো সাদা পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। নব-উদ্দীপনায় শুরু করতে পারব আমরা। দাঁড়ি দিয়ে। সূচনা হবে নতুন বাক্যের।
তোমরা উত্তম সাথিদের খুঁজে বের করো। যারা তোমাদের কল্যাণ ও আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। যারা সাদা মুক্তোর মতো পবিত্র। তাদের সাথে সবসময় চলবে। যাতে সবাই মিলে হতে পারো দামি মুক্তোর মালা। যে মালা বিক্রি করা যায় না, কেনা যায় না। যে মালার বাঁধন কখনো ছিঁড়ে যায় না।