📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 তুমি কত সুন্দর

📄 তুমি কত সুন্দর


খুবই ব্যথিত হই যখন জানতে পারি—কেউ কেউ তার বাহ্যিক অবয়বে বিরক্ত, হতাশ। হয়তো সে লোকচক্ষু এড়িয়ে চলে, কারও সাথে মেশে না, মানুষজন থেকে দূরে সরে যায়। কারণ, তার মনে ভীষণ কষ্ট। নিজেকে নিয়ে। থামো ভাই! থামো বোন! এই যে তুমি সুস্থ-সবল আছ, পরিপূর্ণ গড়নে নিজ পায়ে ভর দিয়ে চলতে পারছ, হাত ব্যবহার করতে পারছ, দু-চোখে দেখতে পাচ্ছ, কানে শুনতে পাচ্ছ-এতে কি তুমি খুশি নও? তোমার কি মনে হয়, মানুষজন দুনিয়ার সবকিছু বাদ দিয়ে তোমার নাকের দিকেই তাকিয়ে আছে? তোমার কি মনে হয়, সবাই তোমার গায়ের রং দেখে, তোমার জিহ্বা কী বলে সেটা শোনে না? তুমি কি মনে করো, সাদা রং ভিন্ন বলেই সুন্দর? তুমি কি মনে করো, সুন্দরীরাই কেবল সুখী?

না, আল্লাহর কসম! আমরা প্রতিদিন এমন অনেক নুরানি চেহারার মানুষ দেখি যারা হয়তো ছোটখাটো বা কালো রঙের, তবুও তাদের আমরা অনেক পছন্দ করি। কিছু মানুষের সফলতা আমাদের বিস্মিত করে, যদিও তার মাঝে ততটা সৌন্দর্য নেই। যখন কোনো ছেলে এমন কোনো মেয়েকে বিয়ে করে, যে তার থেকে কম সুন্দরী তখন মহিলাদের আফসোসের অন্ত থাকে না। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করলে তারা হয়তো বুঝতে পারত, স্বামী এ মেয়ের ভেতরের সৌন্দর্যেই আগ্রহী হয়েছে। বাহ্যিকতার আগে হয়তো-বা ভেতরের সৌন্দর্যই তাকে প্রভাবিত করেছে। কেবল 'সুন্দর চেহারা' যেমন সবাই খোঁজে তেমনটা সে খোঁজেনি।

আসলে যারা যৌবনের প্রারম্ভে তাদের মাঝে এ ধরনের চিন্তা আসে। কারণ, তারা নিজেদের ভেতরটা অনুসন্ধান করে দেখে না। তারা কেবল আয়নায় নিজেদের চেহারাটা দেখে। তাদের এমন একজন দরকার, যে তাদের ভেতরটা গড়ে তোলার ব্যাপারে উপদেশ দেবে। আমাদের দরকার জানা, বোঝা, কথাবার্তা বলা, তথ্য সংগ্রহ করা এবং লোকজনের সাথে কী রকম ব্যবহার করতে হবে তা আয়ত্তে আনা। এগুলোকে আমি 'এটিকেটস' বলব না, 'উত্তম গুণাবলি' বলব। সুখ পেতে সৌন্দর্য বা পরিপাটি থাকাই যথেষ্ট নয়। কেননা সৌন্দর্যের সাথে অজ্ঞতা যুক্ত হলে তা কুৎসিত হয়ে যায়। আবার পাপাচার সম্পৃক্ত হলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়। তুমি যদি লাল-সাদা-হলুদ নানা রঙের চকলেট দেখে বেশ সুস্বাদু মনে করো, আর মুখে দেওয়ার পরে দেখো যে তা আসলে লবণ, বালু ও রং দিয়ে তৈরি নকল চকলেট তাহলে কেমন লাগবে?

মানুষকে কেবল বাহ্যিক আকৃতি দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন মানুষ তৈরি হয় মূল্যবোধ, শিক্ষা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও আচরণ দিয়ে। আর এ সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রকাশ্যে বা গোপনে আল্লাহভীতির উপস্থিতি। প্রিয়জনেরা! দ্বীনদারিতা, ঈমান ও হৃদয়ের বিনম্রতাই বিচার্য। এ সবগুলোর সমন্বয় প্রকাশ পায় একটি পবিত্র চেহারায়। তোমরা নিশ্চিত থাকো, সুন্দরী কোনো মেয়ে বা সুদর্শন ছেলে যারা কিনা সর্বদা পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তাদের চেহারায় এমন পবিত্রতার প্রকাশ পাবে না। কত সুন্দর চেহারা আছে যেগুলো গুনাহর কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। রং দিয়েও ঢাকা যায় না সেই মলিনতা, সেই খারাপ চরিত্রের আভাস।

লিপস্টিক কখনো এমন কোনো ঠোঁটকে রাঙাবে না, যে ঠোঁট কেবল মিথ্যে বলে চলে। গালে লাল রং লাগালে তা কখনো লজ্জায় লাল হওয়া গালের সাথে মিলবে না। চোখের নিচে সুরমা মাখলে কখনো সেই চোখ থেকে সুন্দর হবে না, যে চোখ অবনত থাকে। সবচেয়ে দামি সুগন্ধি কখনো সেই মেয়ের চরিত্র থেকে উত্তম নয়, যে আল্লাহভীর। তারা মনে করে, সুন্দর বা লেটেস্ট মডেলের জামা পরা বা সবচেয়ে নতুন ব্রান্ডের নাম জানাই বুঝি আধুনিকতা। মেয়েদের চোখের পাতায় যে সাজ তা লজ্জাকে শেষ করে দেয়। তখন রহমতের দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে আসে। গলায় লাল রং মেখে অহমিকা প্রকাশ করাটা অনেকে সাহসিকতা মনে করে, অদ্ভুত না ব্যাপারটা? যে মেয়েটা রং মেখে শরীরের সমস্ত সৌন্দর্য প্রকাশ করে, সে এখন আধুনিক সভ্য সমাজের ভদ্রমহিলা। আর যে পবিত্র মেয়েটা নিজেকে ঢেকে রাখে, সে হয়ে গেছে সেকেলে ও অসভ্য। এমনকি যদি সেই মেয়েটা সুন্দর যুক্তি দিয়ে কথা বলে, তবুও তারা তার চেহারা খোঁজে। দেখে সেখানে লিপস্টিক আছে কি না!

প্রিয় বোন! নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। দুনিয়ার সমস্ত মেক-আপ এমন মুখকে সুন্দর করতে পারবে না যার নুর নিভে গেছে পাপাচারে। এসো, নিজের ভেতরে সৌন্দর্যের খোঁজ করো। আর ছেলে তোমাকেও বলি, তুমিও নিজের ভেতরের সৌন্দর্যটা খুঁজে বের করো। বুকের মাঝে ঈমানের আলো জ্বেলে দাও। যেখানেই যাও, আল্লাহর ভালোবাসা বুকে লালন করো। দৃপ্তকণ্ঠে বলো, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহকে বলো, 'রব! আমাকে ক্ষমা করুন, আপনার কাছে টেনে নিন। আমার প্রতি সন্তোষের দৃষ্টিতে তাকান।' শুরু করো। দেখেছ কি? তোমার ভেতরে সৌন্দর্য নড়ে-চড়ে বসেছে। অন্তরের সুখ অনুভব করছ তুমি। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিতেই তোমার জীবন সুখী হবে। প্রতিটি শ্বাসে তাওহিদের বাতাস গ্রহণ করো। বুক ভরে নাও কুরআনের সুবাস। দেখলে তো তুমি কী রকম পরিপাটি ও সুন্দর হয়ে গেছো! হ্যাঁ, তুমি সুন্দর, তুমিও সুন্দরী। কারণ, তোমরা দুজনেই আল্লাহকে ভালোবাসো। আল্লাহ! আপনাকে ভালোবাসা যেন আমাদের প্রিয় কাজ হয়ে যায়। আপনাকে ভয় করা যেন আমাদের সবচেয়ে প্রগাঢ় অনুভূতি হয়। আর আমাদেরও ভালোবাসুন, হে রব!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!

📄 সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!


কখনো ভালোবাসার মানুষটিকে খুব বেশিই ভালোবাসতে মন চায়। ইচ্ছে করে তাকে বেঁধে রাখি অনুভূতির শেকলে। পেরেক দিয়ে এঁটে রাখি, যেন চাইলেও দূরে সরে যেতে না পারে। হয়তো তাকে বাধ্য করি আমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে। সে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ভালোবাসাগুলো আঘাত হয়ে আসে। কখনো আঘাত হয়ে আসে বাগদত্তা নববধূর প্রতি নতুন স্বামীর অনুভূতি। কখনো ছেলে, যে তার বাবা-মার কাছে এমন কিছু চাইছে যা তাদের সাধ্যাতীত। কেন আমরা অন্যকে আঘাত করি ভালোবাসার নামে? কেনই-বা লোকজন আঘাত করে আমাদের?

প্রতিটা কষ্টদায়ক কথা বলার আগে যদি আমরা মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখতাম, তাহলে এতটা কষ্টের কারণ আমরা হতাম না। কিছুক্ষণ দেরি করলে আমরা যা হারিয়েছি তা হারাতাম না। যদি আমরা অন্যদের ভালোবাসতাম, তাহলে তাদের কখনো কষ্ট দিতাম না। কারণ, তখন মানসিক তৃপ্তিলাভই যথেষ্ট মনে করতাম। কারও অপমানে কষ্ট পেতাম না। এক দারুণ পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি মনের ভেতরে সুখানুভূতি দিত। পাশের কাউকে কষ্ট দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন—কীভাবে বন্দি না করেও কাউকে ভালোবাসা যায়। অন্যে আমায় ভালোবাসল কি না, কী পেলাম তাকে ভালোবেসে, এসব না ভেবে, কাউকে কতটা ভালোবাসলাম, ক্ষমা করতে পারলাম কি না তা ভেবে দেখাই শ্রেয়!

ভালোবাসলে হতে হবে সূর্যের মতো। যে আমাকে ভালোবাসে, সে কাছে এলে যেন উষ্ণতা আর প্রশান্তি পায়। ভালোবাসলে হতে হবে সমুদ্রের মতো। সুবিশাল আর স্বচ্ছ। কল্যাণ আর চমকে পরিপূর্ণ। সমুদ্র তার বুকে ভারী জাহাজকে ঠাঁই দেয়, আবার ছোট্ট মাছের মতো প্রাণীকেও ধারণ করে নেয়। ছোট-বড় কাউকে আগলে রাখতে তার কষ্ট হয় না। ভালোবাসলে এমনই হওয়া চাই। তখন সমুদ্রের মতো আমার মাঝে লবণাক্ততা যদিও-বা থাকে, তবু সবাই ভালোবাসবে আমায়। এমনকি আমার ঘ্রাণে, প্রমত্ত ঢেউয়ের আঘাতেও মানব-হৃদয়ে প্রশান্তির উদ্রেক হবে। কারণ, আমার মাঝে ‘ধারণ’ করবার গুণ আছে। মানুষ আমার দিকে আবর্জনা ছুঁড়ে দিলেও আমি কোমলভাবে তা তটে ফেলে দেবো। কখনো-বা তাদের প্রতি বদান্য হয়ে ছুড়ে দেবো ফুটন্ত গোলাপ!

একটা ভালো কথা সুন্দর গোলাপের মতো। একটা ভালো কথাও সাদাকা। তবে দান করতে কার্পণ্য কেন? লোকের কাছে যেমনটা প্রত্যাশা করি, ঠিক তেমনটাই হই না কেন! সবাই যেন আমাকে বলতে বাধ্য হয়-
সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 বিয়ে ও রুলার

📄 বিয়ে ও রুলার


কেউ কেউ মনে করে এমন কিছু মানুষ থাকবেই—যারা আদর্শ, যাদের কোনো ভুল নেই, যারা শতভাগ দ্বীনদার। তারা কখনো রুলারের টানা দাগ অতিক্রম করবে না। মেয়েটা এমন একজন ছেলে চায়, যে তার চাইতেও দ্বীনদার। সে তাকে হাত ধরে জান্নাতে নিয়ে যাবে। কখনো ভুল করবে না। কোনো গুনাহ করবে না। সবসময় চোখ অবনত রাখবে। সারাদিন কুরআন তিলাওয়াত করবে। সারারাত তাহাজ্জুদ পড়বে। আবার কর্মক্ষেত্রেও সফল হবে। অকাতরে ব্যয় করবে তার জন্য। আবার ছেলেটা তার চেয়েও দ্বীনদার মেয়ে চায়। রাতে বিছানায় ওপাশ ফেরার সময় তাকে দেখবে সালাত আদায় করছে। মেয়েটা কখনো রাগ করবে না। কখনো দুঃখ পাবে না। আবার সুন্দরীদের মাঝে হবে সবচাইতে সুন্দরী। একাধারে হবে কুরআনের হাফিযা, আলিমা। বাচ্চাদেরও খাইয়ে দিতে পারবে। বাচ্চাদের লালন-পালনে এতটুকু কমতি হবে না।

এখানেই থামা দরকার। কেন আমরা আরেকজনের হাত ধরার অপেক্ষায় আছি? কেন নিজেই দায়িত্ব নিচ্ছি না? নিজেই ভালো হয়ে যাচ্ছি না? দ্বীনদারি, ধার্মিকতা ও আল্লাহর নৈকট্য—এগুলো কোনো রুলার দিয়ে মেপে দেখা যায় না। দুনিয়ায় 'একশোতে একশো' কোনো মানুষ নেই। আমরা তো রোবট নই, যে যন্ত্রের মতো সেটাপ দেওয়া আছে, অনবরত আমল করেই যাব। খুশুর কোনো সুইচ নেই, যে চাপলেই অনুভব করা যায়। ঈমানের স্বাদ কোনো কৌটায় সংরক্ষণ করা যায় না। চাওয়া-পাওয়ার ছাদকে আসমানে তুলে দিতে নেই। রাজকুমার বা রাজকুমারীর স্বপ্ন দেখতে গিয়ে তাকে অসম্ভব গুণে বিশেষায়িত করা অনুচিত। যার সাথে আমার বন্ধন হবে, সেও ভুল করতে পারে। কখনো তার মাঝে কসুর হতে পারে। দুয়েকবার ফজরের সালাতে দেরি হয়ে যেতেও পারে, এতে ভেঙে পড়লে চলবে না। একটা মেয়ে স্বামীর সেবা, সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে একদিন সকালে কুরআন নাও পড়তে পারে, তাতে আঁতকে ওঠার কিছু নেই!

অনেক মৌলিক বিষয় আছে, সেগুলোতে নজর রাখা দরকার। আমার সামনের মানুষটা একজন মানুষই, ফেরেশতা নয়। আমার স্বপ্নগুলো তার সামনে পেশ করতে হবে, তার মতামত যাচাই করে নিতে হবে। অধিকাংশ মতামত ভালো হলে ছোটখাটো হিসেব-নিকেশ এড়িয়ে যাওয়াই সমীচীন। বিয়ের সময় খুঁজতে হবে চরিত্রবান সঙ্গী। খেয়াল রাখতে হবে স্বভাবের দিকে। কখনো দ্বীনদারির সাথে খারাপ চরিত্র এসে হাজির হয়। এমন স্ত্রী জুটে, যে দ্বীনি ইলমে পারদর্শী কিন্তু খুব জেদি। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে। স্বামীর সাথে প্রতিটা তর্কে জেতার চেষ্টা করে। তাকে সম্মান করে না। তাই স্বামীও তার সাথে কথা বলতে অপখন্দ করে। অথচ মেয়েটা বুদ্ধিমতী। তার বাড়িই শান্ত থাকে না, সেখানে বাচ্চাকাচ্চা শান্ত থাকবে কী করে!

অন্যদিকে দেখা যায় এমন মেয়েও আছে, যে ফাতিহা আর ছোট্ট কয়েকটি সূরা মুখস্থ জানে। কিন্তু সে তার স্বামীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। স্বামীর প্রশান্তির কারণ সে। স্বামীকে অনুভব করতে দেয় যে, তিনিই তার পরিচালক। ফলে ঘরে প্রশান্তি বিরাজ করে। বাচ্চারাও উত্তমরূপে গড়ে ওঠে। কারণ, তারা একটি শান্ত নীড়ে বড় হয়েছে। কখনো এমন স্বামী থাকে, যে খুব কর্কশ ও রুক্ষ স্বভাবের। স্ত্রীর মতামতের প্রতি তুচ্ছ মনোভাব পোষণ করে। এমনকি তাকে মারেও। ওদিকে সবার সামনে সে চমৎকার একজন মানুষ, দ্বীনদার, মুসল্লি। বিপরীতে এমন স্বামীও পাওয়া যাবে, যে তেমন একটা জানে না, কিন্তু বেশ দয়ার্দ্র, স্ত্রীর প্রতি ইহসান করে।

রুলার দিয়ে মাপা যায় না। সামনে যে মানুষটা আসবে তাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হয়। মনে রাখতে হয়, সে আমাদের মতোই একজন মানুষ। আমরা যেমন সবসময় নিখুঁত না, ভুল করি, গুনাহ করি; তেমনি কেউই নিখুঁত না। সবারই ভুল হয়, সবারই গুনাহ হয়। কাল্পনিক চরিত্র খুঁজে সময় নষ্ট করা অর্থহীন। এদের জন্ম এখনো হয়নি পৃথিবীতে। আবার কেবল বাহ্যিকতা দেখেও ফাঁদে পা দিতে নেই। পরে বাস্তবতা জেনে হোঁচট খেতে হবে, হৃদয় ব্যথিত হবে। আমরা জানি না, আমাদের মাঝে কে অপরকে ছাড়িয়ে গেছে তার দ্বীনদারি দিয়ে। হতে পারে আমাদের কেউ একটা আয়াত ইখলাসের সাথে পড়ে সবাইকে অতিক্রম করে গেছে। আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন প্রত্যেককে এমন একজন উত্তম সঙ্গী দান করেন, যিনি উভয় জগতে চোখজুড়ানোর কারণ হবেন।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 ভাবনার শেষ থেকে

📄 ভাবনার শেষ থেকে


কখনো মনে হয় জীবনটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আলো সরে গেছে চারদিক থেকে। শূন্যতায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। আমরা যে প্রাচীন বাড়িতে বসবাস করি, বৃষ্টির পানিতে খসে গেছে যে বাড়ির পলেস্তারা; সে বাড়িটাও যেন খালি। আমার হৃদয়ের অনুভূতি যত স্থানে যেতে পারে তার প্রতিটিতে যেন অপরিসীম শূন্যতা বিরাজ করছে। তখন আমরা ধীর ক্লান্ত পদক্ষেপে হেঁটে চলি বালুর ওপর। আমাদের পায়ের নিচে ধুলোবালি উড়ে চলে। সামান্য কিছু আশার পেছনে ছুটোছুটি করে নেতিয়ে পড়ে আমাদের পা।

বিপদাপদে পড়ে আমরা কখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন আমাদের চিন্তাগুলোতে ধস নামে। দুশ্চিন্তা জাল বোনে। স্মৃতিরা ঘোলাটে হয়ে আসে। মনছবি হয়ে যায় বিকৃত। কখনো অশ্রু, আবার কখনো রক্তে সিক্ত হই আমরা। আমি জানি না, কী করে মা সেই চোখের পানি ধরে রাখেন। তার একটা অংশ যে অনুপস্থিত, সেটা তিনি কী করে আমাদের না বলে থাকেন। এখনো কীভাবে এতটা আশা নিয়ে জীবনযাপন করেন। কীভাবে তার হৃদয়ে এত প্রশান্তি! তার দুচোখে রুপার মতো জ্বলজ্বল করে স্নেহ। বাবার কথা বলার সময় গলায় এক আশ্চর্য নম্রতা আসে। বাবার বর্ণনা দিতে গিয়ে, তার বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে চোখের জল নিবারণ করেন তিনি। তারপর আমরা যখন তার থেকে দূরে থাকি তখন তিনি নিজের বেদনায় ডুবে যান। বাবার সুবাস, তার গলার আওয়াজ পাওয়ার জন্য তার মন আনচান করে ওঠে। এদিকে আমরা তাকে ভুলে যাই। কতটা নিষ্ঠুর আমরা! কী নির্মম আমাদের দিনগুলি!

সকাল আসে। সবকিছু ভুলে যাই। আবার এক টুকরো আলোর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু কেবল আল্লাহর স্মরণে তা খুঁজে পাই। হে আমার আশা-ভরসা! হে আল্লাহ! ঔদাসিন্যতায় অলসতায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে আপনার অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকি। জীবনের নতুন একটা পাতা শুরু করতে চাই, যেটা বরফের মতো সাদা, বৃষ্টির পানির মতো পবিত্র— মানুষের নিঃশ্বাস যাকে নোংরা করেনি। আমার অজ্ঞ-প্রত্যজ্ঞা সালাত আদায়ের জন্য আগ্রহী। আমাকে নিয়ে চলুন আপনার দিকে। আমাদের নিয়ে চলুন আপনার তরে। আমি এখনো হোঁচট খেয়ে চলেছি। আমার পা-গুলো হোঁচট খাচ্ছে। আমার হাঁটার জ্ঞান দিন।

আমি এখনো রবের আনুগত্যের পবিত্র গুহার অনুসন্ধানে ধৈর্যের অতিক্রম্য পাহাড়গুলোতে উঠতে ভয় করি। এখনো আমি দূরত্ব ও পথ হারানোর বেদনায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রির অমানিশায় ঘুরপাক খাচ্ছি। জান্নাতের তীব্র কামনা আমাকে মাঝে মাঝে ঘিরে ধরে। তখন আপনার সুধারর্ণার পোশাক পরি। আপনার কিতাবে দেওয়া সুসংবাদে নিজের হৃদয়কে প্রশান্ত করার চেষ্টা করি। আমার মনে গভীর আকাঙ্ক্ষা জন্মে ভোরবেলার বিনয়ী আওয়াজ শোনার, ফজরের সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যে মানুষগুলো অন্ধকার রাত ভেদ করে হেঁটে চলেছে, যাদের কপালে চাঁদের আলো পড়ছে—তাদের আওয়াজ শোনার।

আমি সেই নারীদের দেখতে চাই যারা নিজেদের পবিত্রতার পোশাকে আবৃত করেছে। যারা নিজেদের মাথার পরে নিয়েছে নিরাপত্তা ও সম্মানের পোশাক। আমার সকল ভাবনা অস্ত গেলে সূর্যোদয় ঘটে তার সমস্ত সৌন্দর্য ও মর্যাদা নিয়ে। আমাকে মুগ্ধ করে সে। সকল কিছুকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠে সূর্য। কারও দিকে তাকায় না। হোঁচট খায় না। কোনো অজুহাত পেশ করে না। তার পূর্বে বিরাজমান। অন্ধকারের ওপর দোষ চাপায় না। ঘন মেঘ তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। অবিরত বর্ষণ তাকে থামাতে পারে না। সে নিজের মতো ওঠে, চলে। তার অফুরান দান অব্যাহত রাখে। কী দৃঢ়তা তার মাঝে! তার আশা কত বিশাল! সূর্য অনবরত দান করে চলেছে তার আলো, এতটুকু ক্লান্তি অনুভব করে না সে। সে সত্তা কতই না মহান যিনি সূর্যকে এত ভালোবাসা দিয়েছেন। তার অনুগ্রহ ঢেলে দিয়েছেন। আলোর পোশাক পরিয়ে আলোকিত করেছেন। তাই তো সূর্যের আলো পাওয়ার জন্য সবাই প্রতিদিন উন্মুখ থাকে। সুবহানাল্লাহ!

ঝেড়ে ফেলি দুঃখ-ব্যথা। আল্লাহর কাছে দুআ করি। আশা পেশ করি তাঁর কাছে। ফিরে চলি সালাতে। পরিশুদ্ধ করে তুলি নিজেদের অন্তর। হতাশ হব না। ভেঙে পড়ব না একদম। অতীতের আঁধার-প্রান্তে বসে চলবে পর্যবেক্ষণ। ধীরে ধীরে তা বিলীন হয়ে আসছে। আল্লাহর অনুগ্রহে নতুন সূর্যোদয় হতে যাচ্ছে আগামীকাল, সে সূর্যোদয় নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেবে জীবনটাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px