📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 স্থগিত স্বপ্ন

📄 স্থগিত স্বপ্ন


প্রত্যেকটা মেয়ের মনে স্বপ্ন থাকে। নানান রকম স্বপ্ন। ব্যক্তিত্বের ভিন্নতায় স্বপ্নগুলোও ভিন্ন হয়। কিন্তু একটা স্বপ্ন একদম এক। আর তা হলো—বিয়ে। কখনো হয়তো এটাই একমাত্র স্বপ্ন—যা পূরণে দেরি হলে অস্থিরতায় ছেয়ে যায় জীবন। আবার কখনো সে এতটাই সূক্ষ্মভাবে স্বপ্ন সাজায়, তার কাছে মনেই হয় না, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জীবনের অবস্থাগুলো সমাজভেদে ভিন্ন। আবার স্তরের বিভিন্নতাও বিয়ের বয়স নির্ধারণে বড় একটা ভূমিকা রাখে। কিছু সমাজে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে হয়। সেখানে বিশের ওপরে গেলেই ভাবা হয় বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে।

আবার কিছু সমাজে—বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে মেয়ের বা তার পরিবারের সিদ্ধান্ত থাকে পড়ালেখার পর বিয়ে হবে। সেক্ষেত্রে ত্রিশে গেলে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে বলে ধরা হয়। তখন যে-কোনো মানুষ বিয়ের প্রস্তাব দিলেই তাকে তা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয় তার। মাথার মুকুট ভেঙে দেওয়া হয়, ছিটকে পড়ে মুক্তোদানা। তার ঠোঁটের কোণে হাসি মিলিয়ে যায়। দপ করে নিভে যায় চোখের জ্যোতি। যারা জোর-জবরদস্তি করে, তারা মেয়েটার মনোজগতের খবর রাখে না। তারা জানে না, তার নিজস্ব মত আছে। সে হয়তো প্রথম থেকে ‘বিয়ে’কে-ই নিজের একমাত্র স্বপ্ন নির্ধারণ করেনি। সে মূলতবি করে রেখেছিল এ স্বপ্নটা। তার অন্যান্য স্বপ্নের মতো এটাও ছিল একটা স্বপ্ন। [১][২][৩]

রিযিক আসে যথাসময়ে, আল্লাহর আদেশে। একজন নেককার স্বামী মেয়েটার চোখ শীতল করবে। সুতরাং, দেরি না করে উপায় গ্রহণ করাই বুদ্ধিমতীর কাজ। কখনো হয়তো দেরি হচ্ছে মেয়েটার কারণেই। একজন দ্বীনদার চরিত্রবান যুবককে সে ফিরিয়ে দিচ্ছে স্বপ্নের রাজকুমার না হবার কারণে। কখনো আবার তার চিন্তায় পরিপক্কতা আসেনি, সে বুঝতেই পারেনি বিয়ের উপযুক্ত সে। এমন অনেক মেয়েকে দেখেছি যারা কেবল বয়সেই বেড়েছে; আচার-ব্যবহারে বেড়ে ওঠেনি। তাদের ভদ্রতাবোধ বয়সের তুলনায় বড্ড বেমানান। শান্ত মনোভাব, ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা, পর্দা করা-এগুলো মেয়েদের অস্ত্র। আল্লাহর তরফ থেকে নেককার স্বামী পাওয়ার অস্ত্র। তাকে উপযুক্ত হতেই হবে। সে যে একজন রাজকুমারী!

কখনো আবার মেয়ের পরিবার বিয়েতে দেরি হবার কারণ। তারা অনেক কিছু চায়, দাবি করে। কেন জানি মামা-চাচারা এমন অনেক বিষয়ে নাক গলাতে আসে যেখানে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। কেন মেয়েরা চাচাতো বোন বা বান্ধবীর কথায় কান দিয়ে একটা সহজ সম্ভাব্য বিয়েকে নস্যাৎ করে দেয়? কেন তারা আল্লাহর বাণী পড়ে দেখে না?
'তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ থেকে তাদের ধনী করে দেবেন।' [১]
'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কিছু দেন না।' [২]
'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেন না। নিশ্চয় কষ্টের পর আল্লাহ সুখ দেবেন।' [৩]

কখনো যেন নিজের সৌন্দর্যকে কারণ হিসেবে দেখানো না হয়। মেয়েটা সুন্দরী, কারণ, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। ব্যক্তিভেদে সৌন্দর্য ভিন্ন হয়। যা অন্যের চোখে ভালো লাগে তা আমার ভালো লাগবে না। আবার আমার যা ভালো লাগে তা অন্যের বিন্দুমাত্র পছন্দ নাও হতে পারে। আমরা দুজন একটা মেয়েকে সুন্দরী বললাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো মেয়ে এসে তাকে কুৎসিত বলে দেবে। এর বিপরীতটাও হতে পারে। আর সৌন্দর্যটা ভেতরের জিনিস। এটা মানুষের মন থেকে উৎসারিত। আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা ও তৃপ্তি অনুভব করা ভেতরে অনাবিল সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই হৃদয়-মন খুলে নিজের ভেতরটা দেখাই সমীচীন। সৌন্দর্য একটি সুন্দর বৃক্ষের মতো। একে পানি দিয়ে পরিচর্যা করতে হয় অবিরত। সব মেয়েই সুন্দরী। সত্যিই সুন্দরী। নিজের ওপর বিশ্বাস আনলে মানসিকতায় পরিবর্তন আসে, লোকে তার ওপর ভরসা করতে শুরু করে। তখন মানুষজন চেহারার সাথে ভেতরের সৌন্দর্যটাও দেখে। তাই সতর্ক থাকাই কাম্য। কারণ, চেহারার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ, সবকটা মানুষই। কারণ, মেয়েটা ইসলামের একটি চলন্ত মিম্বর। তাই তাকে সতর্ক থাকতে হবে। মা-বোন-খালা-ফুফু সবসময় নিজের আত্মীয়ের জন্য একটা মেয়ের কথা মনে মনে ভাবে। নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। নিজেকে গুছিয়ে আনতে হবে। বাহ্যিকতা ঠিক রাখতে হবে। সাজিয়ে আনতে হবে জীবনটাকে। নিজের কর্তব্যগুলোকে সুবিন্যস্ত করতে হবে। উদাসীনতা থেকে সাবধান! কে এমন মেয়ে পছন্দ করবে যার হাত অপরিষ্কার? কে এমন মেয়ের কাছে যাবে যার গা থেকে দুর্গন্ধ আসে? যেই মেয়ের জামাকাপড় অগোছালো তার সাথে কে মিশতে চাইবে? যে মেয়ে সবসময় মুখ বাঁকা করে রাখে, তাকে কে সালাম দেবে? আমি বলছি না, সারাক্ষণ সাজগোজ করে থাকা চাই। নরম গলায় কথা বলা চাই। সুগন্ধি মেখে মহিলাদের কাছে যেতে হবে। রংচঙে পোশাক পরতে হবে না, বরং বলছি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও হাসিখুশি হয়ে যেতে হবে। আর বাহ্যিক সৌন্দর্যের আগে গুরুত্ব দেওয়া হোক ভেতরের সৌন্দর্য। সবাই হিংসুককে অপখন্দ করে। যার কথাবার্তা আক্রমণাত্মক, তাকে সবাই পরিহার করে। ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকার সময় মনে রাখতে হবে, এ কাজ কেবল আল্লাহরই জন্য। [১]
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য তিনি নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দেন যা সে ভাবেওনি।' [১]

অবশেষে বলছি-বিয়ে মানেই শেষ নয়, বরং শুরু। বিয়ে একটি দায়িত্ব, একটি অংশীদারিত্ব। যেখানে স্ত্রী তার স্বামীকে গ্রহণ করে, আর স্বামী তার স্ত্রীকে। বিয়ে একপ্রকার আনুগত্য। তাই এর পরে যা আসে তা আনুগত্যই হবে। বিয়েকে একমুখী লক্ষ্য মনে না করে তা যে বহুমুখী লক্ষ্য তা মাথায় রাখতে হবে। যাতে একজন মেয়ে তার স্বামীর সাথে গড়ে তুলতে পারে একটি ইসলামি দ্বীনি পরিবার। ভাবার কোনো কারণ নেই, বিয়ে একটি রঙিন স্বপ্নে ভরপুর সিন্দুক। আমি বলছি না তা রংচঙে না। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি স্তরের সৌন্দর্য ভিন্ন, প্রতিটি পদক্ষেপে সফলতা-ব্যর্থতার হিসেব আসতে পারে।

একজন নেককার স্বামী পেতে হলে সিজদায় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, যা মেয়েটাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করবে। যদি দেরি হয়, তবে মনে রাখতে হবে, এটা একটা পরীক্ষা। হয়তো আল্লাহ অন্য কিছুর ব্যবস্থা করেছেন। হয়তো আল্লাহ অন্য কোনো কাজে তাঁর বান্দিকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন। হতেই পারে, এখন বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েটার মা একা হয়ে যাবেন। তার কষ্ট হবে; এখন তার সেবা করে হয়তো মেয়েটাকে জান্নাতের পথে এগিয়ে রাখতে চান তার রব। কুরআন পড়া, মুখস্থ করা, সুর করে পড়া বা অন্য কাউকে মুখস্থ করানোর জন্য হয়তো আল্লাহ তাকে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন। হয়তো তাকে এমন একটা কাজে ব্যস্ত রাখছেন, যাতে অভিনব কোনো ফল আসবে এবং ইসলামের উপকার হবে। ইয়াতিম-দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করা বা অসুস্থদের দেখার একটা কাজে হয়তো সে ব্যস্ত, যেটা বিয়ের পর করা হতো না আর। কত মেয়ে আছে যাদের দেরিতে বিয়ে হয়েছে, এমনকি চুলে সাদা রং এসে গেছে, তবু তারা বিনা কষ্টে নেককার স্বামী পেয়ে গেছে। আবার কত মেয়ে আছে যারা তাদের স্বপ্নের সুন্দর রাজকুমারকে বিয়ে করেছে, সবচেয়ে সুন্দর জামা আর গয়নাগাটি পরেছে; শেষ পর্যন্ত তাকে তালাক বরণ করে নিতে হয়েছে! আমাদের সামনে কত মেয়ে আছে যাদের আমরা বিবাহিত দেখে আনন্দিত মনে করছি। কিন্তু আসলে সে হয়তো কষ্টে আছে, আর প্রতিনিয়ত কামনা করছে বিয়ের আগের একাকী জীবন।

একটা কথাই বলতে চাই- 'আল্লাহর সূক্ষ্ম অনুগ্রহ ও করুণা'। হয়তো দেরিতে বিয়ে হওয়াটাই মেয়েটার জন্য নিআমত, অথচ সে বুঝতেই পারছে না। গায়েবের খবর জানলে আমরা বাস্তবতাকে মেনে নিতাম। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য যা ফয়সালা করেছেন তাতে সন্তুষ্ট হই। বিরক্তি প্রকাশ না করি। ধৈর্য ধরতে শিখি। এ দুনিয়া আর কদিনের! জান্নাত তো বাকিই আছে। আল্লাহর কাছে চাই-তিনি যেন আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী করেন।

টিকাঃ
১. সূরা নূর, আয়াত: ৩২
২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
৩. সূরা তালাক, আয়াত: ৭
১. সূরা তালাক, আয়াত: ২-৩

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 তুমি কত সুন্দর

📄 তুমি কত সুন্দর


খুবই ব্যথিত হই যখন জানতে পারি—কেউ কেউ তার বাহ্যিক অবয়বে বিরক্ত, হতাশ। হয়তো সে লোকচক্ষু এড়িয়ে চলে, কারও সাথে মেশে না, মানুষজন থেকে দূরে সরে যায়। কারণ, তার মনে ভীষণ কষ্ট। নিজেকে নিয়ে। থামো ভাই! থামো বোন! এই যে তুমি সুস্থ-সবল আছ, পরিপূর্ণ গড়নে নিজ পায়ে ভর দিয়ে চলতে পারছ, হাত ব্যবহার করতে পারছ, দু-চোখে দেখতে পাচ্ছ, কানে শুনতে পাচ্ছ-এতে কি তুমি খুশি নও? তোমার কি মনে হয়, মানুষজন দুনিয়ার সবকিছু বাদ দিয়ে তোমার নাকের দিকেই তাকিয়ে আছে? তোমার কি মনে হয়, সবাই তোমার গায়ের রং দেখে, তোমার জিহ্বা কী বলে সেটা শোনে না? তুমি কি মনে করো, সাদা রং ভিন্ন বলেই সুন্দর? তুমি কি মনে করো, সুন্দরীরাই কেবল সুখী?

না, আল্লাহর কসম! আমরা প্রতিদিন এমন অনেক নুরানি চেহারার মানুষ দেখি যারা হয়তো ছোটখাটো বা কালো রঙের, তবুও তাদের আমরা অনেক পছন্দ করি। কিছু মানুষের সফলতা আমাদের বিস্মিত করে, যদিও তার মাঝে ততটা সৌন্দর্য নেই। যখন কোনো ছেলে এমন কোনো মেয়েকে বিয়ে করে, যে তার থেকে কম সুন্দরী তখন মহিলাদের আফসোসের অন্ত থাকে না। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করলে তারা হয়তো বুঝতে পারত, স্বামী এ মেয়ের ভেতরের সৌন্দর্যেই আগ্রহী হয়েছে। বাহ্যিকতার আগে হয়তো-বা ভেতরের সৌন্দর্যই তাকে প্রভাবিত করেছে। কেবল 'সুন্দর চেহারা' যেমন সবাই খোঁজে তেমনটা সে খোঁজেনি।

আসলে যারা যৌবনের প্রারম্ভে তাদের মাঝে এ ধরনের চিন্তা আসে। কারণ, তারা নিজেদের ভেতরটা অনুসন্ধান করে দেখে না। তারা কেবল আয়নায় নিজেদের চেহারাটা দেখে। তাদের এমন একজন দরকার, যে তাদের ভেতরটা গড়ে তোলার ব্যাপারে উপদেশ দেবে। আমাদের দরকার জানা, বোঝা, কথাবার্তা বলা, তথ্য সংগ্রহ করা এবং লোকজনের সাথে কী রকম ব্যবহার করতে হবে তা আয়ত্তে আনা। এগুলোকে আমি 'এটিকেটস' বলব না, 'উত্তম গুণাবলি' বলব। সুখ পেতে সৌন্দর্য বা পরিপাটি থাকাই যথেষ্ট নয়। কেননা সৌন্দর্যের সাথে অজ্ঞতা যুক্ত হলে তা কুৎসিত হয়ে যায়। আবার পাপাচার সম্পৃক্ত হলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়। তুমি যদি লাল-সাদা-হলুদ নানা রঙের চকলেট দেখে বেশ সুস্বাদু মনে করো, আর মুখে দেওয়ার পরে দেখো যে তা আসলে লবণ, বালু ও রং দিয়ে তৈরি নকল চকলেট তাহলে কেমন লাগবে?

মানুষকে কেবল বাহ্যিক আকৃতি দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন মানুষ তৈরি হয় মূল্যবোধ, শিক্ষা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও আচরণ দিয়ে। আর এ সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রকাশ্যে বা গোপনে আল্লাহভীতির উপস্থিতি। প্রিয়জনেরা! দ্বীনদারিতা, ঈমান ও হৃদয়ের বিনম্রতাই বিচার্য। এ সবগুলোর সমন্বয় প্রকাশ পায় একটি পবিত্র চেহারায়। তোমরা নিশ্চিত থাকো, সুন্দরী কোনো মেয়ে বা সুদর্শন ছেলে যারা কিনা সর্বদা পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তাদের চেহারায় এমন পবিত্রতার প্রকাশ পাবে না। কত সুন্দর চেহারা আছে যেগুলো গুনাহর কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। রং দিয়েও ঢাকা যায় না সেই মলিনতা, সেই খারাপ চরিত্রের আভাস।

লিপস্টিক কখনো এমন কোনো ঠোঁটকে রাঙাবে না, যে ঠোঁট কেবল মিথ্যে বলে চলে। গালে লাল রং লাগালে তা কখনো লজ্জায় লাল হওয়া গালের সাথে মিলবে না। চোখের নিচে সুরমা মাখলে কখনো সেই চোখ থেকে সুন্দর হবে না, যে চোখ অবনত থাকে। সবচেয়ে দামি সুগন্ধি কখনো সেই মেয়ের চরিত্র থেকে উত্তম নয়, যে আল্লাহভীর। তারা মনে করে, সুন্দর বা লেটেস্ট মডেলের জামা পরা বা সবচেয়ে নতুন ব্রান্ডের নাম জানাই বুঝি আধুনিকতা। মেয়েদের চোখের পাতায় যে সাজ তা লজ্জাকে শেষ করে দেয়। তখন রহমতের দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে আসে। গলায় লাল রং মেখে অহমিকা প্রকাশ করাটা অনেকে সাহসিকতা মনে করে, অদ্ভুত না ব্যাপারটা? যে মেয়েটা রং মেখে শরীরের সমস্ত সৌন্দর্য প্রকাশ করে, সে এখন আধুনিক সভ্য সমাজের ভদ্রমহিলা। আর যে পবিত্র মেয়েটা নিজেকে ঢেকে রাখে, সে হয়ে গেছে সেকেলে ও অসভ্য। এমনকি যদি সেই মেয়েটা সুন্দর যুক্তি দিয়ে কথা বলে, তবুও তারা তার চেহারা খোঁজে। দেখে সেখানে লিপস্টিক আছে কি না!

প্রিয় বোন! নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। দুনিয়ার সমস্ত মেক-আপ এমন মুখকে সুন্দর করতে পারবে না যার নুর নিভে গেছে পাপাচারে। এসো, নিজের ভেতরে সৌন্দর্যের খোঁজ করো। আর ছেলে তোমাকেও বলি, তুমিও নিজের ভেতরের সৌন্দর্যটা খুঁজে বের করো। বুকের মাঝে ঈমানের আলো জ্বেলে দাও। যেখানেই যাও, আল্লাহর ভালোবাসা বুকে লালন করো। দৃপ্তকণ্ঠে বলো, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আল্লাহকে বলো, 'রব! আমাকে ক্ষমা করুন, আপনার কাছে টেনে নিন। আমার প্রতি সন্তোষের দৃষ্টিতে তাকান।' শুরু করো। দেখেছ কি? তোমার ভেতরে সৌন্দর্য নড়ে-চড়ে বসেছে। অন্তরের সুখ অনুভব করছ তুমি। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিতেই তোমার জীবন সুখী হবে। প্রতিটি শ্বাসে তাওহিদের বাতাস গ্রহণ করো। বুক ভরে নাও কুরআনের সুবাস। দেখলে তো তুমি কী রকম পরিপাটি ও সুন্দর হয়ে গেছো! হ্যাঁ, তুমি সুন্দর, তুমিও সুন্দরী। কারণ, তোমরা দুজনেই আল্লাহকে ভালোবাসো। আল্লাহ! আপনাকে ভালোবাসা যেন আমাদের প্রিয় কাজ হয়ে যায়। আপনাকে ভয় করা যেন আমাদের সবচেয়ে প্রগাঢ় অনুভূতি হয়। আর আমাদেরও ভালোবাসুন, হে রব!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!

📄 সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!


কখনো ভালোবাসার মানুষটিকে খুব বেশিই ভালোবাসতে মন চায়। ইচ্ছে করে তাকে বেঁধে রাখি অনুভূতির শেকলে। পেরেক দিয়ে এঁটে রাখি, যেন চাইলেও দূরে সরে যেতে না পারে। হয়তো তাকে বাধ্য করি আমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে। সে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ভালোবাসাগুলো আঘাত হয়ে আসে। কখনো আঘাত হয়ে আসে বাগদত্তা নববধূর প্রতি নতুন স্বামীর অনুভূতি। কখনো ছেলে, যে তার বাবা-মার কাছে এমন কিছু চাইছে যা তাদের সাধ্যাতীত। কেন আমরা অন্যকে আঘাত করি ভালোবাসার নামে? কেনই-বা লোকজন আঘাত করে আমাদের?

প্রতিটা কষ্টদায়ক কথা বলার আগে যদি আমরা মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখতাম, তাহলে এতটা কষ্টের কারণ আমরা হতাম না। কিছুক্ষণ দেরি করলে আমরা যা হারিয়েছি তা হারাতাম না। যদি আমরা অন্যদের ভালোবাসতাম, তাহলে তাদের কখনো কষ্ট দিতাম না। কারণ, তখন মানসিক তৃপ্তিলাভই যথেষ্ট মনে করতাম। কারও অপমানে কষ্ট পেতাম না। এক দারুণ পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি মনের ভেতরে সুখানুভূতি দিত। পাশের কাউকে কষ্ট দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন—কীভাবে বন্দি না করেও কাউকে ভালোবাসা যায়। অন্যে আমায় ভালোবাসল কি না, কী পেলাম তাকে ভালোবেসে, এসব না ভেবে, কাউকে কতটা ভালোবাসলাম, ক্ষমা করতে পারলাম কি না তা ভেবে দেখাই শ্রেয়!

ভালোবাসলে হতে হবে সূর্যের মতো। যে আমাকে ভালোবাসে, সে কাছে এলে যেন উষ্ণতা আর প্রশান্তি পায়। ভালোবাসলে হতে হবে সমুদ্রের মতো। সুবিশাল আর স্বচ্ছ। কল্যাণ আর চমকে পরিপূর্ণ। সমুদ্র তার বুকে ভারী জাহাজকে ঠাঁই দেয়, আবার ছোট্ট মাছের মতো প্রাণীকেও ধারণ করে নেয়। ছোট-বড় কাউকে আগলে রাখতে তার কষ্ট হয় না। ভালোবাসলে এমনই হওয়া চাই। তখন সমুদ্রের মতো আমার মাঝে লবণাক্ততা যদিও-বা থাকে, তবু সবাই ভালোবাসবে আমায়। এমনকি আমার ঘ্রাণে, প্রমত্ত ঢেউয়ের আঘাতেও মানব-হৃদয়ে প্রশান্তির উদ্রেক হবে। কারণ, আমার মাঝে ‘ধারণ’ করবার গুণ আছে। মানুষ আমার দিকে আবর্জনা ছুঁড়ে দিলেও আমি কোমলভাবে তা তটে ফেলে দেবো। কখনো-বা তাদের প্রতি বদান্য হয়ে ছুড়ে দেবো ফুটন্ত গোলাপ!

একটা ভালো কথা সুন্দর গোলাপের মতো। একটা ভালো কথাও সাদাকা। তবে দান করতে কার্পণ্য কেন? লোকের কাছে যেমনটা প্রত্যাশা করি, ঠিক তেমনটাই হই না কেন! সবাই যেন আমাকে বলতে বাধ্য হয়-
সমুদ্র, তোমায় ধন্যবাদ!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 বিয়ে ও রুলার

📄 বিয়ে ও রুলার


কেউ কেউ মনে করে এমন কিছু মানুষ থাকবেই—যারা আদর্শ, যাদের কোনো ভুল নেই, যারা শতভাগ দ্বীনদার। তারা কখনো রুলারের টানা দাগ অতিক্রম করবে না। মেয়েটা এমন একজন ছেলে চায়, যে তার চাইতেও দ্বীনদার। সে তাকে হাত ধরে জান্নাতে নিয়ে যাবে। কখনো ভুল করবে না। কোনো গুনাহ করবে না। সবসময় চোখ অবনত রাখবে। সারাদিন কুরআন তিলাওয়াত করবে। সারারাত তাহাজ্জুদ পড়বে। আবার কর্মক্ষেত্রেও সফল হবে। অকাতরে ব্যয় করবে তার জন্য। আবার ছেলেটা তার চেয়েও দ্বীনদার মেয়ে চায়। রাতে বিছানায় ওপাশ ফেরার সময় তাকে দেখবে সালাত আদায় করছে। মেয়েটা কখনো রাগ করবে না। কখনো দুঃখ পাবে না। আবার সুন্দরীদের মাঝে হবে সবচাইতে সুন্দরী। একাধারে হবে কুরআনের হাফিযা, আলিমা। বাচ্চাদেরও খাইয়ে দিতে পারবে। বাচ্চাদের লালন-পালনে এতটুকু কমতি হবে না।

এখানেই থামা দরকার। কেন আমরা আরেকজনের হাত ধরার অপেক্ষায় আছি? কেন নিজেই দায়িত্ব নিচ্ছি না? নিজেই ভালো হয়ে যাচ্ছি না? দ্বীনদারি, ধার্মিকতা ও আল্লাহর নৈকট্য—এগুলো কোনো রুলার দিয়ে মেপে দেখা যায় না। দুনিয়ায় 'একশোতে একশো' কোনো মানুষ নেই। আমরা তো রোবট নই, যে যন্ত্রের মতো সেটাপ দেওয়া আছে, অনবরত আমল করেই যাব। খুশুর কোনো সুইচ নেই, যে চাপলেই অনুভব করা যায়। ঈমানের স্বাদ কোনো কৌটায় সংরক্ষণ করা যায় না। চাওয়া-পাওয়ার ছাদকে আসমানে তুলে দিতে নেই। রাজকুমার বা রাজকুমারীর স্বপ্ন দেখতে গিয়ে তাকে অসম্ভব গুণে বিশেষায়িত করা অনুচিত। যার সাথে আমার বন্ধন হবে, সেও ভুল করতে পারে। কখনো তার মাঝে কসুর হতে পারে। দুয়েকবার ফজরের সালাতে দেরি হয়ে যেতেও পারে, এতে ভেঙে পড়লে চলবে না। একটা মেয়ে স্বামীর সেবা, সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে একদিন সকালে কুরআন নাও পড়তে পারে, তাতে আঁতকে ওঠার কিছু নেই!

অনেক মৌলিক বিষয় আছে, সেগুলোতে নজর রাখা দরকার। আমার সামনের মানুষটা একজন মানুষই, ফেরেশতা নয়। আমার স্বপ্নগুলো তার সামনে পেশ করতে হবে, তার মতামত যাচাই করে নিতে হবে। অধিকাংশ মতামত ভালো হলে ছোটখাটো হিসেব-নিকেশ এড়িয়ে যাওয়াই সমীচীন। বিয়ের সময় খুঁজতে হবে চরিত্রবান সঙ্গী। খেয়াল রাখতে হবে স্বভাবের দিকে। কখনো দ্বীনদারির সাথে খারাপ চরিত্র এসে হাজির হয়। এমন স্ত্রী জুটে, যে দ্বীনি ইলমে পারদর্শী কিন্তু খুব জেদি। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে। স্বামীর সাথে প্রতিটা তর্কে জেতার চেষ্টা করে। তাকে সম্মান করে না। তাই স্বামীও তার সাথে কথা বলতে অপখন্দ করে। অথচ মেয়েটা বুদ্ধিমতী। তার বাড়িই শান্ত থাকে না, সেখানে বাচ্চাকাচ্চা শান্ত থাকবে কী করে!

অন্যদিকে দেখা যায় এমন মেয়েও আছে, যে ফাতিহা আর ছোট্ট কয়েকটি সূরা মুখস্থ জানে। কিন্তু সে তার স্বামীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। স্বামীর প্রশান্তির কারণ সে। স্বামীকে অনুভব করতে দেয় যে, তিনিই তার পরিচালক। ফলে ঘরে প্রশান্তি বিরাজ করে। বাচ্চারাও উত্তমরূপে গড়ে ওঠে। কারণ, তারা একটি শান্ত নীড়ে বড় হয়েছে। কখনো এমন স্বামী থাকে, যে খুব কর্কশ ও রুক্ষ স্বভাবের। স্ত্রীর মতামতের প্রতি তুচ্ছ মনোভাব পোষণ করে। এমনকি তাকে মারেও। ওদিকে সবার সামনে সে চমৎকার একজন মানুষ, দ্বীনদার, মুসল্লি। বিপরীতে এমন স্বামীও পাওয়া যাবে, যে তেমন একটা জানে না, কিন্তু বেশ দয়ার্দ্র, স্ত্রীর প্রতি ইহসান করে।

রুলার দিয়ে মাপা যায় না। সামনে যে মানুষটা আসবে তাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হয়। মনে রাখতে হয়, সে আমাদের মতোই একজন মানুষ। আমরা যেমন সবসময় নিখুঁত না, ভুল করি, গুনাহ করি; তেমনি কেউই নিখুঁত না। সবারই ভুল হয়, সবারই গুনাহ হয়। কাল্পনিক চরিত্র খুঁজে সময় নষ্ট করা অর্থহীন। এদের জন্ম এখনো হয়নি পৃথিবীতে। আবার কেবল বাহ্যিকতা দেখেও ফাঁদে পা দিতে নেই। পরে বাস্তবতা জেনে হোঁচট খেতে হবে, হৃদয় ব্যথিত হবে। আমরা জানি না, আমাদের মাঝে কে অপরকে ছাড়িয়ে গেছে তার দ্বীনদারি দিয়ে। হতে পারে আমাদের কেউ একটা আয়াত ইখলাসের সাথে পড়ে সবাইকে অতিক্রম করে গেছে। আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন প্রত্যেককে এমন একজন উত্তম সঙ্গী দান করেন, যিনি উভয় জগতে চোখজুড়ানোর কারণ হবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px