📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 গোলাপের পাপড়িগুলো

📄 গোলাপের পাপড়িগুলো


আজ আমি জীবন-গোলাপের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে দেবো শব্দে শব্দে। হয়তো সেই স্মৃতিচারণের জন্য। অথবা এ জন্য যে, তোমাদের জীবনেও এমন দিন আসবে। আমি তখন নীল ফ্রকের ওপর সাদা ওড়না পরতাম। ছিলাম স্কুল-ছাত্রী। নতুন বছরের শুরুর অপেক্ষায় তখন। নতুন বইয়ের সুগন্ধ। খাতাগুলোতে রঙিন মলাট। নতুন কালো জুতো। আগ্রহভরে কেনা নতুন কলম। কখনো ভুলব না সেই পদক্ষেপ। ঠক ঠক ঠক। প্রিয় শিক্ষিকা মিনার আগমন। যাকে আমরা মিনা ম্যাডাম বলে ডাকতাম।

তিনি আমাদের আরবি ভাষা শেখাতেন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দিতেন কিছু নসিহত। আমি কখনো ভুলব না তার সবুজ জামা। সেই জামায় তাকে কী যে সুন্দরী লাগত! সেটা মনে হয় তিনিও জানতেন। তাই সবকিছু পরার সময় তিনি খুব যত্ন নিতেন। এমনকি সুগন্ধিও মাখতেন কড়াভাবে। যখন তিনি কোনো অধ্যায় পড়াতে গিয়ে দুই সারির মাঝে হাঁটতেন অথবা আমার কাছে এসে প্রশ্ন করতেন, তখন আতরের সুবাস নাকে লাগত। ভালো লাগত খুবই। আমরা তাকে যথেষ্ট সম্মান করতাম। তাই বুঝি তাকে সামান্য একটা বিষয় বলতে পারতাম না—তিনি নিজেই নিজের দেওয়া উপদেশগুলো মানেন না!

তিনি আমাদের নিষেধ করেন টাইট-ফিটিং জামা পরতে কিংবা মেক-আপ করতে। তিনি বলতেন, এসব হারাম, জায়েয নেই। অথচ তিনিই আবার আতর মেখে টাইট জামা পরে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে আমাদের কাছে আসতেন। অবশেষে একটি দিন এলো। এ দিনের কথা হয়তো তার সারা জীবন মনে থাকবে। তিনি একজন ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'আমার ব্যাপারে তোমার মূল্যায়ন কী?' অপেক্ষা করছিলেন প্রশংসার জন্য। মেয়েটা বেশ সাহসের সাথে বলে দিল, 'আপনি আমাদের যেসব উপদেশ দেন, সেগুলো নিজেই মানেন না।'

কিছু মেয়ের আঁতকে ওঠা, কারও বিস্ময়ের দৃষ্টি, কারও ফিসফিসানি, আবার কারও হাসি চেপে রাখা—এর মাঝে কিছু সময় কেটে গেল। ঘণ্টা পড়ে শেষ হয়ে গেল পিরিয়ডটা। কয়েকদিন পর। চমক অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। বার্তা পৌঁছে গেছে। ম্যাডামের কাছ থেকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা পেয়ে গেছি। তিনি মোটেও রেগে যাননি। মেয়েটাকে ধমক দেননি। আমাদের থেকে শিখতে তার অহমিকায় এতটুকু বাধেঁনি। তিনি আমাদের সামনে হাজির হলেন এক ভিন্ন অবয়বে! লম্বা ঢিলেঢালা বোরকা পরে এলেন তিনি। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মেক-আপ বা আতর সবকিছুকে যেন বিদায় জানিয়েছেন। কেউ যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাই কয়েক দিন যেতেই এক দ্বীনদার যুবক তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। তাকে প্রস্তাব দিলো। আমরা খুশি হলাম সবাই। সেদিনের কথা ভুলব না কখনো। ক্ষমা করবেন ম্যাডাম, আপনার দেওয়া শিক্ষা এখনো শেষ হয়নি, তার ব্যাখ্যা চলছে।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 সুখের বাজার

📄 সুখের বাজার


নিজেকে প্রশ্ন করি, সুখ কী? এর স্বাদই-বা কেমন? আমি কি সেই সুখের কাছে পৌঁছে গিয়েছি? কোথায় তা খুঁজছি? কয় কেজি দরে সুখ কেনা যায়? কোন বাজার থেকে? কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় বেশ কিছু মুখচ্ছবি ফুটে উঠেছে। সবার মুখে মুচকি হাসি। একটা শিশুর কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো তার প্রিয় চকলেটখানা। একজন বৃদ্ধা চূড়ান্ত সুখ পায় যখন কেউ তার রান্না খেয়ে প্রশংসা করে। ষোলো বছর বয়সের একটা মেয়ের কাছে চূড়ান্ত সুখ কী? সুন্দর একটা জামা পরে বান্ধবীদের দেখানো। দশ বছর বয়সি একটা কিশোরের কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো প্রিয় ফুটবল দলের ম্যাচ জেতা। একজন বাবার চূড়ান্ত সুখ তার ছেলের ভালো রেজাল্টে, অথবা যে-কোনো সাফল্যে। একজন ভালো মা চূড়ান্ত সুখ পায় তখনই, যখন কোনো সুদর্শন দ্বীনদার যুবক তার মেয়ের পাণিপ্রার্থী হয়। পৃথিবীর বুকে প্রতিটা মেয়ের চূড়ান্ত সুখ বধূবেশে নিজেকে দেখার মাঝে। একজন নববধূর কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো বিয়ের প্রথম কয়েক মাসের মাথায় নতুন সন্তানের সুসংবাদ পাওয়া। একজন উচ্চাশার অধিকারী যুবকের চূড়ান্ত সুখ কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে।

কিন্তু জীবনের প্রান্তে, কোনো এক জায়গায়... একজন দরিদ্র যুবকের চূড়ান্ত সুখ হলো রাত কাটানোর ঠাঁই খুঁজে পাওয়া। কারণ, তার তো কোনো বাড়ি নেই। যে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, তার কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো গৃহকর্ত্রীর ছেলের প্যান্টটা পুরাতন হয়ে যাওয়া। কারণ, সেটা তার ভাগ্যে জুটবে, সে নিজের ছেলেকে পরতে দেবে। কোনো হোটেলের কর্মচারী বা ওয়েটারের জন্য চূড়ান্ত সুখ বখশিশ পাওয়াতে। তা দিয়ে সে হয়তো এক কেজি গোশত কিনে খাওয়াতে পারবে সন্তানদের। রাস্তার ছেলেদের চূড়ান্ত সুখ হয়তো মিষ্টির দোকানদারের সাধা এক টুকরো মিষ্টিতে; যে টুকরোর দিকে সে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে ছিল। দামি মিষ্টির দোকানের গ্লাসে নাক ঠেকিয়ে। একজন সাধারণ যুবতীর চূড়ান্ত সুখ জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন একজনকে পাওয়া—যিনি তার দেখভাল করবেন, যার হৃদয় আঙিনায় যুবতীর আশ্রয় হবে। এর বদলে চাকরি-বাকরি করে জীবন কাটানো তার আরাধ্য হতে পারে না। একজন রোগীর জন্য চূড়ান্ত সুখ হলো রিপোর্ট বা এক্স-রের দিকে তাকিয়ে যখন ডাক্তার মুচকি হেসে বলেন, 'ভয় নেই'। বড় কোনো রোগের আশঙ্কা থেকে মুক্ত সে।

আসলে আমরা অনেক নিআমতের মাঝে থাকি। যতক্ষণ না আমরা তা হারাচ্ছি ততক্ষণ তার মর্ম বুঝি না। আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনার প্রতি—সেই সব নিআমতের জন্য যেগুলোর মাঝে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি অথচ আমরা সেগুলোর মর্ম জানি না! এরপরও সুখী হওয়া খুব কি কঠিন? দুনিয়ার দুর্ভাবনা ছেড়ে দিই বরং। যা আছে, যা-কিছু সামর্থ্যে কুলায় তা-ই নিয়ে সুখী হয়ে যাই। আর আল্লাহর কাছে বলি, ‘হে আমার রব! আমাকে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা দিন।’ সুখ তো আছেই। সুখের বাজারে সব বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কেবল আমরা রাস্তাটা চিনি না।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 অনেকে আছে

📄 অনেকে আছে


অনেকে আছে খুব একটা কথা বলে না, তবে বললে এমন মিষ্টি কথা বলে যা ভোলা যায় না। অনেকে বেশি কথা বলে, কিন্তু তার কথাবার্তা সব অর্থহীন। সবাই ভুলে যায়। অনেকে খুব বেশি প্রকাশ করে না নিজেকে। তবে সে যেন সর্বদা উপস্থিত। তাকে অনুভব করা যায়। অনেকে প্রতিদিনই আসে। কিন্তু তার দিকে বারবার ফিরে চাওয়া হলেও তাকে মনে থাকে না। অনেকে সামান্য কাজই করে। কিন্তু তার অবদান ভোলবার নয়। অনেকে অনেক কাজ করে, লোকজনকে জানিয়ে করে। তবুও মনে থাকে না। অনেকে তেমন ভুল করে না। কিন্তু যে কয়টা ভুল করে সেগুলো ব্যথা দেয়। সে ব্যথা কখনো ভোলা যায় না। অনেকে অনেক ভুল করে। তবু আমরা তাকে ক্ষমা করে দিই, তার অবদানের কথা ভেবে।

এদের কাজ অল্প হলেও তা আমাদের অন্তরে জায়গা করে নেয়। এমন এক জায়গা করে নেয় যা ভোলবার নয়। এভাবেই দিনের পরিক্রমায় পরিচিত অনেককে আমরা ভুলে যাই। আমাদের অগোচরে অনেকে চলে যায়। অনেকে পালিয়ে যায় আমাদের রেখে। কাউকে আমরা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। অনেকে আছে যাদের প্রশংসা করলে আমাদের কাছে আসে, আবার তাদের উপদেশ দিলে দূরে সরে যায়। অনেকে আছে যাদের সাথে মতের মিল হলে আমাদের পছন্দ করে, আবার মতের বিপক্ষে গেলে অপখন্দ করে ফেলে। আমরা ভুল করে অনেককে দরকারের থেকে বেশি কাছে টেনে নিই। ফলে সে সম্মান দিতে ভুলে যায়। লাল দাগ অতিক্রম করে ফেলে। ফলে তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। আমরা ভুল করে অনেক মানী ব্যক্তিকে সম্মান দিই না, ফলে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাই। অনেকে বয়সের ব্যবধান ভুলে নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করে, তাকে সবাই বর্জন করে। অনেকের ক্ষেত্রে সম্মানবশত আমরাই বয়সের ব্যবধান মুছে দিই, ফলে সে সফল হয়। অনেকে আমাদের ভালোবাসে, তাই দেখে আমরাও তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করি। অনেকে মারা যায়। আমাদের হৃদয়ে রেখে যায় একটি ক্ষতস্থান, একটি শূন্যস্থান। সে স্থানটা তার জন্য দুআ করে চলে। অনেকে আমাদের মাঝেই বসবাস করে। আমরা তাদের হয়তো ভালো মানুষ ঠাওরে বসি। কিন্তু তার ভেতরটা শূন্য। ভালোমতো তাকালে তার কোনো আকৃতি চোখে পড়ে না।

আবার অনেকে আমাদের হৃদয়ের আঙিনায় অতি সন্তর্পণে জায়গা করে নেয়। অজান্তেই আমরা তাদের খোঁজ করতে শুরু করি। তারা আনন্দিত হলে আমরা আনন্দ পাই। তারা কষ্টে পড়লে আমরাও কষ্ট পাই। তারা অনুপস্থিত থাকলে আমরা তাদের সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষী হই। তাদের প্রয়োজনে আমরা দুআ করি। সবচেয়ে ভালো হলো সবার থেকে দূরে থাকা। হ্যাঁ, সবচাইতে ভালো উপায় হলো সবাইকে রেখে উড়ে চলা। হয়তো আমরা একই আরশের ছায়ায় একবার মিলিত হব। সময়ের পরিক্রমায় তারা যদি হারিয়েও যায়, তবু আল্লাহর জন্য তাদের ভালোবেসে যাব। আল্লাহ! যে আমাকে আপনার জন্য ভালোবাসে, তার প্রতি আমার হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিন।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 স্থগিত স্বপ্ন

📄 স্থগিত স্বপ্ন


প্রত্যেকটা মেয়ের মনে স্বপ্ন থাকে। নানান রকম স্বপ্ন। ব্যক্তিত্বের ভিন্নতায় স্বপ্নগুলোও ভিন্ন হয়। কিন্তু একটা স্বপ্ন একদম এক। আর তা হলো—বিয়ে। কখনো হয়তো এটাই একমাত্র স্বপ্ন—যা পূরণে দেরি হলে অস্থিরতায় ছেয়ে যায় জীবন। আবার কখনো সে এতটাই সূক্ষ্মভাবে স্বপ্ন সাজায়, তার কাছে মনেই হয় না, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জীবনের অবস্থাগুলো সমাজভেদে ভিন্ন। আবার স্তরের বিভিন্নতাও বিয়ের বয়স নির্ধারণে বড় একটা ভূমিকা রাখে। কিছু সমাজে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে হয়। সেখানে বিশের ওপরে গেলেই ভাবা হয় বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে।

আবার কিছু সমাজে—বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে মেয়ের বা তার পরিবারের সিদ্ধান্ত থাকে পড়ালেখার পর বিয়ে হবে। সেক্ষেত্রে ত্রিশে গেলে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে বলে ধরা হয়। তখন যে-কোনো মানুষ বিয়ের প্রস্তাব দিলেই তাকে তা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয় তার। মাথার মুকুট ভেঙে দেওয়া হয়, ছিটকে পড়ে মুক্তোদানা। তার ঠোঁটের কোণে হাসি মিলিয়ে যায়। দপ করে নিভে যায় চোখের জ্যোতি। যারা জোর-জবরদস্তি করে, তারা মেয়েটার মনোজগতের খবর রাখে না। তারা জানে না, তার নিজস্ব মত আছে। সে হয়তো প্রথম থেকে ‘বিয়ে’কে-ই নিজের একমাত্র স্বপ্ন নির্ধারণ করেনি। সে মূলতবি করে রেখেছিল এ স্বপ্নটা। তার অন্যান্য স্বপ্নের মতো এটাও ছিল একটা স্বপ্ন। [১][২][৩]

রিযিক আসে যথাসময়ে, আল্লাহর আদেশে। একজন নেককার স্বামী মেয়েটার চোখ শীতল করবে। সুতরাং, দেরি না করে উপায় গ্রহণ করাই বুদ্ধিমতীর কাজ। কখনো হয়তো দেরি হচ্ছে মেয়েটার কারণেই। একজন দ্বীনদার চরিত্রবান যুবককে সে ফিরিয়ে দিচ্ছে স্বপ্নের রাজকুমার না হবার কারণে। কখনো আবার তার চিন্তায় পরিপক্কতা আসেনি, সে বুঝতেই পারেনি বিয়ের উপযুক্ত সে। এমন অনেক মেয়েকে দেখেছি যারা কেবল বয়সেই বেড়েছে; আচার-ব্যবহারে বেড়ে ওঠেনি। তাদের ভদ্রতাবোধ বয়সের তুলনায় বড্ড বেমানান। শান্ত মনোভাব, ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা, পর্দা করা-এগুলো মেয়েদের অস্ত্র। আল্লাহর তরফ থেকে নেককার স্বামী পাওয়ার অস্ত্র। তাকে উপযুক্ত হতেই হবে। সে যে একজন রাজকুমারী!

কখনো আবার মেয়ের পরিবার বিয়েতে দেরি হবার কারণ। তারা অনেক কিছু চায়, দাবি করে। কেন জানি মামা-চাচারা এমন অনেক বিষয়ে নাক গলাতে আসে যেখানে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। কেন মেয়েরা চাচাতো বোন বা বান্ধবীর কথায় কান দিয়ে একটা সহজ সম্ভাব্য বিয়েকে নস্যাৎ করে দেয়? কেন তারা আল্লাহর বাণী পড়ে দেখে না?
'তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ থেকে তাদের ধনী করে দেবেন।' [১]
'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কিছু দেন না।' [২]
'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেন না। নিশ্চয় কষ্টের পর আল্লাহ সুখ দেবেন।' [৩]

কখনো যেন নিজের সৌন্দর্যকে কারণ হিসেবে দেখানো না হয়। মেয়েটা সুন্দরী, কারণ, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। ব্যক্তিভেদে সৌন্দর্য ভিন্ন হয়। যা অন্যের চোখে ভালো লাগে তা আমার ভালো লাগবে না। আবার আমার যা ভালো লাগে তা অন্যের বিন্দুমাত্র পছন্দ নাও হতে পারে। আমরা দুজন একটা মেয়েকে সুন্দরী বললাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো মেয়ে এসে তাকে কুৎসিত বলে দেবে। এর বিপরীতটাও হতে পারে। আর সৌন্দর্যটা ভেতরের জিনিস। এটা মানুষের মন থেকে উৎসারিত। আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা ও তৃপ্তি অনুভব করা ভেতরে অনাবিল সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। তাই হৃদয়-মন খুলে নিজের ভেতরটা দেখাই সমীচীন। সৌন্দর্য একটি সুন্দর বৃক্ষের মতো। একে পানি দিয়ে পরিচর্যা করতে হয় অবিরত। সব মেয়েই সুন্দরী। সত্যিই সুন্দরী। নিজের ওপর বিশ্বাস আনলে মানসিকতায় পরিবর্তন আসে, লোকে তার ওপর ভরসা করতে শুরু করে। তখন মানুষজন চেহারার সাথে ভেতরের সৌন্দর্যটাও দেখে। তাই সতর্ক থাকাই কাম্য। কারণ, চেহারার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ, সবকটা মানুষই। কারণ, মেয়েটা ইসলামের একটি চলন্ত মিম্বর। তাই তাকে সতর্ক থাকতে হবে। মা-বোন-খালা-ফুফু সবসময় নিজের আত্মীয়ের জন্য একটা মেয়ের কথা মনে মনে ভাবে। নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। নিজেকে গুছিয়ে আনতে হবে। বাহ্যিকতা ঠিক রাখতে হবে। সাজিয়ে আনতে হবে জীবনটাকে। নিজের কর্তব্যগুলোকে সুবিন্যস্ত করতে হবে। উদাসীনতা থেকে সাবধান! কে এমন মেয়ে পছন্দ করবে যার হাত অপরিষ্কার? কে এমন মেয়ের কাছে যাবে যার গা থেকে দুর্গন্ধ আসে? যেই মেয়ের জামাকাপড় অগোছালো তার সাথে কে মিশতে চাইবে? যে মেয়ে সবসময় মুখ বাঁকা করে রাখে, তাকে কে সালাম দেবে? আমি বলছি না, সারাক্ষণ সাজগোজ করে থাকা চাই। নরম গলায় কথা বলা চাই। সুগন্ধি মেখে মহিলাদের কাছে যেতে হবে। রংচঙে পোশাক পরতে হবে না, বরং বলছি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও হাসিখুশি হয়ে যেতে হবে। আর বাহ্যিক সৌন্দর্যের আগে গুরুত্ব দেওয়া হোক ভেতরের সৌন্দর্য। সবাই হিংসুককে অপখন্দ করে। যার কথাবার্তা আক্রমণাত্মক, তাকে সবাই পরিহার করে। ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকার সময় মনে রাখতে হবে, এ কাজ কেবল আল্লাহরই জন্য। [১]
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য তিনি নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দেন যা সে ভাবেওনি।' [১]

অবশেষে বলছি-বিয়ে মানেই শেষ নয়, বরং শুরু। বিয়ে একটি দায়িত্ব, একটি অংশীদারিত্ব। যেখানে স্ত্রী তার স্বামীকে গ্রহণ করে, আর স্বামী তার স্ত্রীকে। বিয়ে একপ্রকার আনুগত্য। তাই এর পরে যা আসে তা আনুগত্যই হবে। বিয়েকে একমুখী লক্ষ্য মনে না করে তা যে বহুমুখী লক্ষ্য তা মাথায় রাখতে হবে। যাতে একজন মেয়ে তার স্বামীর সাথে গড়ে তুলতে পারে একটি ইসলামি দ্বীনি পরিবার। ভাবার কোনো কারণ নেই, বিয়ে একটি রঙিন স্বপ্নে ভরপুর সিন্দুক। আমি বলছি না তা রংচঙে না। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি স্তরের সৌন্দর্য ভিন্ন, প্রতিটি পদক্ষেপে সফলতা-ব্যর্থতার হিসেব আসতে পারে।

একজন নেককার স্বামী পেতে হলে সিজদায় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, যা মেয়েটাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করবে। যদি দেরি হয়, তবে মনে রাখতে হবে, এটা একটা পরীক্ষা। হয়তো আল্লাহ অন্য কিছুর ব্যবস্থা করেছেন। হয়তো আল্লাহ অন্য কোনো কাজে তাঁর বান্দিকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন। হতেই পারে, এখন বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েটার মা একা হয়ে যাবেন। তার কষ্ট হবে; এখন তার সেবা করে হয়তো মেয়েটাকে জান্নাতের পথে এগিয়ে রাখতে চান তার রব। কুরআন পড়া, মুখস্থ করা, সুর করে পড়া বা অন্য কাউকে মুখস্থ করানোর জন্য হয়তো আল্লাহ তাকে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন। হয়তো তাকে এমন একটা কাজে ব্যস্ত রাখছেন, যাতে অভিনব কোনো ফল আসবে এবং ইসলামের উপকার হবে। ইয়াতিম-দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করা বা অসুস্থদের দেখার একটা কাজে হয়তো সে ব্যস্ত, যেটা বিয়ের পর করা হতো না আর। কত মেয়ে আছে যাদের দেরিতে বিয়ে হয়েছে, এমনকি চুলে সাদা রং এসে গেছে, তবু তারা বিনা কষ্টে নেককার স্বামী পেয়ে গেছে। আবার কত মেয়ে আছে যারা তাদের স্বপ্নের সুন্দর রাজকুমারকে বিয়ে করেছে, সবচেয়ে সুন্দর জামা আর গয়নাগাটি পরেছে; শেষ পর্যন্ত তাকে তালাক বরণ করে নিতে হয়েছে! আমাদের সামনে কত মেয়ে আছে যাদের আমরা বিবাহিত দেখে আনন্দিত মনে করছি। কিন্তু আসলে সে হয়তো কষ্টে আছে, আর প্রতিনিয়ত কামনা করছে বিয়ের আগের একাকী জীবন।

একটা কথাই বলতে চাই- 'আল্লাহর সূক্ষ্ম অনুগ্রহ ও করুণা'। হয়তো দেরিতে বিয়ে হওয়াটাই মেয়েটার জন্য নিআমত, অথচ সে বুঝতেই পারছে না। গায়েবের খবর জানলে আমরা বাস্তবতাকে মেনে নিতাম। তাই আল্লাহ আমাদের জন্য যা ফয়সালা করেছেন তাতে সন্তুষ্ট হই। বিরক্তি প্রকাশ না করি। ধৈর্য ধরতে শিখি। এ দুনিয়া আর কদিনের! জান্নাত তো বাকিই আছে। আল্লাহর কাছে চাই-তিনি যেন আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী করেন।

টিকাঃ
১. সূরা নূর, আয়াত: ৩২
২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
৩. সূরা তালাক, আয়াত: ৭
১. সূরা তালাক, আয়াত: ২-৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px