📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 শুভ্র ফুল

📄 শুভ্র ফুল


সে এক মুসলিম নারী! শুভ্র ফুলের মতো, যে ফুল আলোকিত হয়েছে রহমানের আলোয়। যে ফুল বেড়ে উঠেছে কুরআন-প্রেমিকের ঘরে। ফলে স্বচ্ছ হয়েছে বৃষ্টির পানির মতো, হয়েছে পবিত্র। তার স্বচ্ছতা যেন দুধের রং, যেন চাঁদের আলো।

ফুলেরা সুবাস ছড়িয়ে যায় যুগ যুগ ধরে। সমগ্র বিশ্বকে ভরিয়ে দেয় অপরূপ সৌন্দর্যে। আচ্ছন্ন করে কবিকুলকে। তাদের কবিতায় ফুটে ওঠে ফুলেদের হৃদয়কাড়া বর্ণনা। সুখের অনাবিল ধারা প্রবাহিত হয়। ভরে যায় মন ও প্রাণ।

আমরা যেন বাবার ঘরে শুভ্র ফুলের মতো বাড়তে থাকি। প্রতিদিন তার হাতেই যেন ফুলের মতো পাপড়ি মেলি। তার স্নেহমাখা হাতে মেখে দিই আনুগত্যের সুবাস। অনুগ্রহভরে হাত রাখি মায়ের কাঁধে। পরম মমতায় বোনকে দিই অনাবিল সুখ। ঘুচিয়ে দিই সব দুঃখ-বেদনা, মুছে দিই চোখের পানি। কারণ, আমরা যে এক একটা ফুল। শুভ্র ফুল।

ফুলের মর্যাদা আছে। ফুলের সৌন্দর্য দৃঢ়তায়। শ্রেষ্ঠত্ব আসমানের রবের দিকে ফিরে তাঁকে ডাকার মাঝে। তাই ফুল কেবল সূর্যের স্পষ্ট আলোতেই পাপড়ি মেলে। এমনটাই আমি, আমরা। ফুল বড় লজ্জাশীল। সলজ্জ ভঙ্গিতে তার পাপড়িগুলো দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখে, যতক্ষণ না বসন্ত আসে। এমনটা আমরাও। তাই তো হিজাবে নিজেকে আবৃত রাখব, যতক্ষণ না বসন্তের মতো একজন নেককার স্বামী আসে।

ফুলের দৃঢ় শেকড় থাকে। জমিনের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত শেকড়। মৃদুমন্দ বাতাসে তা নড়ে যায়। কিন্তু কখনো তা শেকড় ছেড়ে যায় না। কারণ, সে যে জমিনকে ভালোবাসে। আর জমিনও তাকে ভালোবাসে। এমনটাই আমরা। তাই তো রবের সামনে অবনত হই, মজবুত করি ঈমানের শেকড়। এই শেকড়েই নিরাপত্তা, রবের পক্ষ থেকে। ফুলের আছে বিনয়। সৌন্দর্যের যত প্রতীক, যত ধরন—সবটা ধারণ করে এই ফুল। তবুও সে গর্ব করে না। অপরকে বুঝতে দেয় না নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। নীরবে-নিভৃতে দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলে। কারণ, সে যে একটা ফুল। আমরাও এমন।

ফুল বদান্য। সে নিজের সবুজ পাতাগুলির প্রতিও কৃপণতা করে না। তাই তো নিজের শরীরে জমে থাকা শিশিরবিন্দুও বিলিয়ে দেয় পাতাকে। আর আমাদের সুগন্ধ-সুবাস দিয়ে আনন্দিত করে, সুস্থ রাখে। আমরা মেয়েরাও এমন। ফুল নীরব-নিশ্চুপ। ধীরে ধীরে সে বড় হয়। কোমলতার সাথে সে মাথা তুলে তাকায়। যাতে কেউ চমকে না যায়। দিনে-দিনে সে বেড়ে ওঠে। অনন্য হয় সৌন্দর্যে, সতেজতায়। আমরাও যে এমনই। নারীত্ব এসেছে বলেই তাড়াহুড়ো করা মানায় না আমাদের। ফুলের মতো ধৈর্য ধরব। আস্তে আস্তে সৌন্দর্য পূর্ণতা পাবে, ততদিন অপেক্ষায় রইব।

যথাসময়ের পূর্বে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় চলে যাব না। না হলে জীবনের অনেক কিছু শেখা বাকি রয়ে যাবে। কেননা জীবনের প্রতিটি ধাপের অনেক আনন্দ-সুখ আছে, অনেক কিছু শিখে নেওয়ার আছে। কখনো যেন মনে না করি, নারীত্ব মানেই হাই-হিল পরা, নারীত্ব মানেই ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক কিংবা আঁটসাঁট কাপড় পরিধান করা। বরং নারীত্ব হলো কোমল আচরণ। জীবনের সমস্ত ব্যাপারে উত্তম রুচির পরিচয় দেওয়া। নারীত্ব কেবল পোশাকে নয়। নারীত্ব চিন্তায়, কথাবার্তায়, উত্তম আচরণে ও আল্লাহকে সন্তুষ্টকারী ইলম অর্জনে। তাই হতে হবে শুভ্র সফেদ ফুলের মতো, যে ফুল তার সুবাস ধরে রাখে বসন্ত আসার আগ পর্যন্ত।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 স্বপ্নের রাজকুমার

📄 স্বপ্নের রাজকুমার


'অনেক দিন আগের কথা।' নবিজির নামে দরূদ পড়ে শুরু করা যাক। পিচ্চি মেয়েটা বিছানায় শুয়ে আছে। গোলাপি রঙের বালিশটাতে ছড়িয়ে আছে তার চুল, মাঝে তার চাঁদপনা মুখ। চোখে নিষ্পাপ দৃষ্টি। ঘুমের আগে সে দাদির কাছে গল্প শুনছে। দাদি চান গল্পে গল্পেই গড়ে উঠুক ছোট্ট নাতনীর মূল্যবোধ। তাকে শোনান সুন্দর প্রেমের গল্প। স্নেহভরা কণ্ঠে। তাতে মিশে আছে বার্ধক্যের রুক্ষতা। এক সুন্দরী রাজকুমারীর গল্প। কীভাবে প্রথম দেখায় তাকে ভালোবেসে ফেলে এক রাজকুমার। তারপর সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়ে তার কাছে যায়। হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় সুন্দর জামা পরিহিতা রাজকুমারীকে। একত্রে তারা দুর্গে পৌঁছে। তারপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের ঘরভরতি ছেলে-মেয়ে আসে... ইত্যাদি।

শিশু মেয়েটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তার স্বপ্নের রাজকুমারকে নিয়ে। সে কেমন হবে? শক্তিশালী? সুদর্শন? ব্যক্তিত্বসম্পন্ন? প্রেমময়? দ্বীনদার? অর্থ-বিত্তের মালিক? নাকি ভিন্ন কিছু? এমন রাজকুমারের গল্প শুনে মেয়েরা নানান চিন্তায় ভোগে। আন্তার-আল্লা, রোমিও-জুলিয়েট, কাইস-লাইলার মতো তারও যেন একজন রাজকুমার আছে, যাকে কেন্দ্র করে তার জীবন। মেয়েটা অপেক্ষা করে কবে তার দরজায় ঠিক এভাবেই কোনো রাজকুমার আসবে। হাঁটু গেড়ে জানাবে, সে 'এসে গেছে'!

এই যে রাজকুমার আসবে—এ যে শুধুই অলীক কল্পনা; তা মেয়েরা বুঝতে পারে অনেক দেরিতে। ততদিনে হয়তো সময় ফুরিয়ে গেছে। মেয়েরা বুঁদ হয়ে থাকে নানান কল্পনায়। অতঃপর, তুলনা চলে স্বামীর সাথে। কল্পনা আর বাস্তবতার ফারাকে মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। তার স্বপ্নের কল্পিত রাজকুমার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করে না। হাতের কাছে যে সম্পদ আছে তার গুরুত্ব বোঝে না। কারণ, সে যে রাজকুমারের স্বপ্নে বিভোর। সে মনে করে এই অতি সাধারণ ভদ্র ছেলেটা তার স্বপ্নের রাজকুমার হতে পারে না। দুঃখজনক!

আরও দুঃখজনক যখন কোনো মেয়ে একটা ছেলেকে ফিরিয়ে দেয় সার্টিফিকেটের অভাবে, কিংবা নাকটা বেমানান বলে, ছেলেটা মোটা বা কালো হওয়াতে। অথবা ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার নয় তাই। কিংবা সে কৃষকের ছেলে অথবা আধুনিক জামা কাপড় পরে না বলে। সুবহানাল্লাহ! সাইয়্যিদুনা মুসা আলাইহিস সালামের গায়ের রং কালো। লোকমান হাকিমেরও। কৃষ্ণত্ব কোনো দোষ নয়। প্রকৃত রাজকুমার সেই যুবক যে পবিত্র, আল্লাহভীরু, ভদ্র ও মর্যাদাসম্পন্ন। যে যুবক বড় হয়েছে আল্লাহর ইবাদতে। অজুর পানি ছিল যার আতর। সে কারও জীবনে এলে তার আগে ফেরেশতারা তার কাছে আসে। আর কাউকে ছেড়ে চলে গেলে রেখে যায় উত্তম কিছু স্মৃতি। তার কথাবার্তায় খুঁজে পাওয়া যায় আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ। কথা বলার সময় তার মুখে থাকে ‘তাসবিহ’। তার প্রতিটা কথোকপথন হয় কৃতজ্ঞতা, বিস্ময়, আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা, ক্ষমা চাওয়ার নিদর্শন। আসতে-যেতে সে কেবল ঐশী কথাবার্তাই বলে।

কোনো মেয়ের কাছে এমন ছেলে এলে মেয়েটা হয় রানি। কারণ, নিজ রাজত্বে সে তাকে বসাবে রানির আসনে। সকল সৌন্দর্য থেকে নিজের দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে চলবে সে। কেবল চোখ রাখবে স্ত্রীর দুচোখে। এর আগে সে কোনো স্বাদ উপভোগ করেনি, স্ত্রী-ই তার প্রথম স্বাদ, প্রথম ভালোবাসা। হতে পারে সে অত ধনী নয়, কিন্তু সে যার স্বামী হবে, সে অবশ্যই ধনী। হতে পারে স্ত্রীর দৃষ্টিতে সে অত সুদর্শন না, কিন্তু তার চেহারা আল্লাহ পছন্দ করেন। সে তো ইউসুফ আলাইহিস সালামের অনুসারী। কোনোদিন মসজিদের পাশ দিয়ে গেলে বোঝা যেত, সে যেন মসজিদের একটি স্তম্ভ। তার হৃদয়কে সে রেখে আসে মসজিদের আঙিনায়। সেখানেই পাঁচবার ফিরে ফিরে আসে। যাতে সে অনুভব করতে পারে, সে বেঁচে আছে। তার হৃৎস্পন্দন যেন তাসবিহ পাঠ করে চলেছে আল্লাহর স্মরণে। স্ত্রী তার অন্তরে প্রশান্তি দেবে, যাতে সে মসজিদের পানে অব্যাহত ছুটে চলতে পারে। সালাতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানসিক তৃপ্তি অর্জন করে নিতে পারে।

ছেলেটা সুদর্শন হতে পারে কিন্তু পাপের কারণে সে কুৎসিত হয়ে গেছে। মেয়েদের জানা উচিত, কীভাবে পুরুষদের মূল্যায়ন করব। এমন এক জামানা চলছে যখন আমাদের মূল্যবোধ ঘোলাটে। আমাদের স্বপ্নের রাজকুমার যাতে বাস্তবে পরিণত হয় কোনো এক নেককার স্বামীর মাঝে, সে দেখতে যেমনই হোক না কেন। বিয়ে হয়ে গেছে একটা চুক্তির মতো। নিজেদের পবিত্র রাখতে চাওয়া যুবকদের চাবুকাঘাত করার মাধ্যম যেন এই বিয়ে। কখনো মোহরানা বৃদ্ধি করে, কখনো এমন জায়গায় বিয়ের আয়োজন করে যার আশেপাশে মদের বার পর্যন্ত আছে। আমরা ঘৃণা করি সেই সব হোটেল বা কনভেনশন হল। এগুলো আল্লাহর অবাধ্যতা করার জায়গা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি জানি না, সেখানে যাওয়ার জন্য এত হুড়োহুড়ি কেন। কখনো এত এত জিনিস চাওয়া হয় যে, এই কর্মচারী (বর) যদি নিজের মালিকানায় থাকা সবকিছু বেচেও দেয়, এমনকি নিজের জামাকাপড়ও, তবু যেন সেই মহামূল্যবান বস্তু (কনে)-কে কিনতে পারবে না।

দুঃখজনকভাবে কেউ কেউ মনে করে, স্বামীর হৃদয়ে স্ত্রীর অবস্থান ততটুকু ওপরে থাকবে যতটুকু কষ্ট হবে তাকে পেতে। আর বিয়ে সহজে হলে বা মোহর কম হলে সেই স্বামী বুঝি তাকে কম দামি মনে করবে! একটা মেয়ের দাম কত? কত টাকা মূল্যে সে 'নেককার স্ত্রী' উপাধি লাভ করতে চায়? আর একটা ছেলের? কত টাকা দিয়ে সে একজন 'নেককার স্ত্রী' কিনতে চায়? বিয়ের অর্থ অনেক গভীর। আজীবন ছুটে চলার সংগ্রাম। পথ দীর্ঘ হতে পারে। বিয়ে মানে জমকালো পোশাক আর গহনা নয়। স্বপ্নের রাজকুমারকে নিয়ে আকাশ-কুসুম কল্পনা নয়। এটা একটা বন্ধন। একটা যাত্রা। এখানে মিল থাকতে হবে। যাতে আল্লাহর তাওফিক আসে। এখানে দায়িত্ব পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। পারস্পরিক বোঝাপড়াটাই আসল। যে যত ধৈর্য ধরতে পারবে, তার অবস্থান তত ওপরে। সে অপর পক্ষকে ততই ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে পারবে।

এটা অনেকটা ছোটবেলার ওই খেলার মতো—যেখানে দুজন হাত ধরাধরি করে ঘুরতে থাকে। এ খেলায় ভারসাম্য হারানোর ভয় আছে। প্রায় পড়ো-পড়ো অবস্থায় অন্যজন শক্ত করে না ধরলে টিকে থাকা মুশকিল। এই খেলা তো আমরা নির্ভরযোগ্য বন্ধুর সাথেই খেলতাম, যাতে হুট করে ছিটকে না যাই। যা-ই হোক, সে তো একটা খেলা মাত্র। বিয়ে তো কোনো খেলা নয়। এটা বাস্তবতা। জীবনের অনেক কিছু কেনা যায় না। যে সব কিনতে অনেক টাকা-পয়সার প্রয়োজন হয়, সেগুলো ছেড়ে দেওয়াতেই মুক্তি।

পুনশ্চ: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যদি তোমাদের কাছে এমন কেউ আসে যার দ্বীনদারি ও চরিত্র নিয়ে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার কাছে বিবাহ দাও। যদি তা না করো তাহলে দুনিয়ার বুকে বড় ধরনের ফিতনা ও ফাসাদ সৃষ্টি হবে।' [১]

টিকাঃ
১. জামি তিরমিযি : ১০৮৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯৬৭, হাদীসটি সহিহ

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 গোলাপের পাপড়িগুলো

📄 গোলাপের পাপড়িগুলো


আজ আমি জীবন-গোলাপের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে দেবো শব্দে শব্দে। হয়তো সেই স্মৃতিচারণের জন্য। অথবা এ জন্য যে, তোমাদের জীবনেও এমন দিন আসবে। আমি তখন নীল ফ্রকের ওপর সাদা ওড়না পরতাম। ছিলাম স্কুল-ছাত্রী। নতুন বছরের শুরুর অপেক্ষায় তখন। নতুন বইয়ের সুগন্ধ। খাতাগুলোতে রঙিন মলাট। নতুন কালো জুতো। আগ্রহভরে কেনা নতুন কলম। কখনো ভুলব না সেই পদক্ষেপ। ঠক ঠক ঠক। প্রিয় শিক্ষিকা মিনার আগমন। যাকে আমরা মিনা ম্যাডাম বলে ডাকতাম।

তিনি আমাদের আরবি ভাষা শেখাতেন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দিতেন কিছু নসিহত। আমি কখনো ভুলব না তার সবুজ জামা। সেই জামায় তাকে কী যে সুন্দরী লাগত! সেটা মনে হয় তিনিও জানতেন। তাই সবকিছু পরার সময় তিনি খুব যত্ন নিতেন। এমনকি সুগন্ধিও মাখতেন কড়াভাবে। যখন তিনি কোনো অধ্যায় পড়াতে গিয়ে দুই সারির মাঝে হাঁটতেন অথবা আমার কাছে এসে প্রশ্ন করতেন, তখন আতরের সুবাস নাকে লাগত। ভালো লাগত খুবই। আমরা তাকে যথেষ্ট সম্মান করতাম। তাই বুঝি তাকে সামান্য একটা বিষয় বলতে পারতাম না—তিনি নিজেই নিজের দেওয়া উপদেশগুলো মানেন না!

তিনি আমাদের নিষেধ করেন টাইট-ফিটিং জামা পরতে কিংবা মেক-আপ করতে। তিনি বলতেন, এসব হারাম, জায়েয নেই। অথচ তিনিই আবার আতর মেখে টাইট জামা পরে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করে আমাদের কাছে আসতেন। অবশেষে একটি দিন এলো। এ দিনের কথা হয়তো তার সারা জীবন মনে থাকবে। তিনি একজন ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'আমার ব্যাপারে তোমার মূল্যায়ন কী?' অপেক্ষা করছিলেন প্রশংসার জন্য। মেয়েটা বেশ সাহসের সাথে বলে দিল, 'আপনি আমাদের যেসব উপদেশ দেন, সেগুলো নিজেই মানেন না।'

কিছু মেয়ের আঁতকে ওঠা, কারও বিস্ময়ের দৃষ্টি, কারও ফিসফিসানি, আবার কারও হাসি চেপে রাখা—এর মাঝে কিছু সময় কেটে গেল। ঘণ্টা পড়ে শেষ হয়ে গেল পিরিয়ডটা। কয়েকদিন পর। চমক অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। বার্তা পৌঁছে গেছে। ম্যাডামের কাছ থেকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা পেয়ে গেছি। তিনি মোটেও রেগে যাননি। মেয়েটাকে ধমক দেননি। আমাদের থেকে শিখতে তার অহমিকায় এতটুকু বাধেঁনি। তিনি আমাদের সামনে হাজির হলেন এক ভিন্ন অবয়বে! লম্বা ঢিলেঢালা বোরকা পরে এলেন তিনি। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মেক-আপ বা আতর সবকিছুকে যেন বিদায় জানিয়েছেন। কেউ যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাই কয়েক দিন যেতেই এক দ্বীনদার যুবক তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। তাকে প্রস্তাব দিলো। আমরা খুশি হলাম সবাই। সেদিনের কথা ভুলব না কখনো। ক্ষমা করবেন ম্যাডাম, আপনার দেওয়া শিক্ষা এখনো শেষ হয়নি, তার ব্যাখ্যা চলছে।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 সুখের বাজার

📄 সুখের বাজার


নিজেকে প্রশ্ন করি, সুখ কী? এর স্বাদই-বা কেমন? আমি কি সেই সুখের কাছে পৌঁছে গিয়েছি? কোথায় তা খুঁজছি? কয় কেজি দরে সুখ কেনা যায়? কোন বাজার থেকে? কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় বেশ কিছু মুখচ্ছবি ফুটে উঠেছে। সবার মুখে মুচকি হাসি। একটা শিশুর কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো তার প্রিয় চকলেটখানা। একজন বৃদ্ধা চূড়ান্ত সুখ পায় যখন কেউ তার রান্না খেয়ে প্রশংসা করে। ষোলো বছর বয়সের একটা মেয়ের কাছে চূড়ান্ত সুখ কী? সুন্দর একটা জামা পরে বান্ধবীদের দেখানো। দশ বছর বয়সি একটা কিশোরের কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো প্রিয় ফুটবল দলের ম্যাচ জেতা। একজন বাবার চূড়ান্ত সুখ তার ছেলের ভালো রেজাল্টে, অথবা যে-কোনো সাফল্যে। একজন ভালো মা চূড়ান্ত সুখ পায় তখনই, যখন কোনো সুদর্শন দ্বীনদার যুবক তার মেয়ের পাণিপ্রার্থী হয়। পৃথিবীর বুকে প্রতিটা মেয়ের চূড়ান্ত সুখ বধূবেশে নিজেকে দেখার মাঝে। একজন নববধূর কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো বিয়ের প্রথম কয়েক মাসের মাথায় নতুন সন্তানের সুসংবাদ পাওয়া। একজন উচ্চাশার অধিকারী যুবকের চূড়ান্ত সুখ কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে।

কিন্তু জীবনের প্রান্তে, কোনো এক জায়গায়... একজন দরিদ্র যুবকের চূড়ান্ত সুখ হলো রাত কাটানোর ঠাঁই খুঁজে পাওয়া। কারণ, তার তো কোনো বাড়ি নেই। যে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, তার কাছে চূড়ান্ত সুখ হলো গৃহকর্ত্রীর ছেলের প্যান্টটা পুরাতন হয়ে যাওয়া। কারণ, সেটা তার ভাগ্যে জুটবে, সে নিজের ছেলেকে পরতে দেবে। কোনো হোটেলের কর্মচারী বা ওয়েটারের জন্য চূড়ান্ত সুখ বখশিশ পাওয়াতে। তা দিয়ে সে হয়তো এক কেজি গোশত কিনে খাওয়াতে পারবে সন্তানদের। রাস্তার ছেলেদের চূড়ান্ত সুখ হয়তো মিষ্টির দোকানদারের সাধা এক টুকরো মিষ্টিতে; যে টুকরোর দিকে সে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে ছিল। দামি মিষ্টির দোকানের গ্লাসে নাক ঠেকিয়ে। একজন সাধারণ যুবতীর চূড়ান্ত সুখ জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন একজনকে পাওয়া—যিনি তার দেখভাল করবেন, যার হৃদয় আঙিনায় যুবতীর আশ্রয় হবে। এর বদলে চাকরি-বাকরি করে জীবন কাটানো তার আরাধ্য হতে পারে না। একজন রোগীর জন্য চূড়ান্ত সুখ হলো রিপোর্ট বা এক্স-রের দিকে তাকিয়ে যখন ডাক্তার মুচকি হেসে বলেন, 'ভয় নেই'। বড় কোনো রোগের আশঙ্কা থেকে মুক্ত সে।

আসলে আমরা অনেক নিআমতের মাঝে থাকি। যতক্ষণ না আমরা তা হারাচ্ছি ততক্ষণ তার মর্ম বুঝি না। আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনার প্রতি—সেই সব নিআমতের জন্য যেগুলোর মাঝে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি অথচ আমরা সেগুলোর মর্ম জানি না! এরপরও সুখী হওয়া খুব কি কঠিন? দুনিয়ার দুর্ভাবনা ছেড়ে দিই বরং। যা আছে, যা-কিছু সামর্থ্যে কুলায় তা-ই নিয়ে সুখী হয়ে যাই। আর আল্লাহর কাছে বলি, ‘হে আমার রব! আমাকে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা দিন।’ সুখ তো আছেই। সুখের বাজারে সব বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কেবল আমরা রাস্তাটা চিনি না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px