📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 মার্জিনের ওপাশে

📄 মার্জিনের ওপাশে


স্কুল-মাদরাসায় আমরা শিখেছি, মার্জিন টেনে লিখতে হয়। কখনো আমরা মার্জিনের ওপাশটা ফাঁকা রেখে দিই। কখনো সেখানে আঁকিবুঁকি করি। আবার কখনো ছোট করে সেখানে কিছু 'নোট' বা 'ব্যাখ্যা' লিখে রাখি। জীবনের মার্জিনে এ রকম অনেক লুকায়িত মুখ আছে। আমরা তাদের পড়তে ভুলে যাই। কিন্তু জীবন-কলম তাদের নাম মার্জিনের ওপাশটাতে লিখে রাখে।

প্রিয় ভাই, ছেলেটা প্রতিদিন তোমায় দেখে। তার সতর্ক দুটি চোখে। যখন তুমি সুগন্ধি মেখে দামি জামাটা পরে তার সামনে দিয়ে হেঁটে চলো। যখন তোমার ফোনকল বেজে ওঠে, তখন ছেলেটা চোখ বুজে উপভোগ করে নেয় সেই আতরের ঘ্রাণ। তোমাকে দেখে সে আল্লাহকে ডাকে। তোমার নিআমতগুলো রবের দরবারে চেয়ে বসে। তুমি যখন চলে যাও পাশ কাটিয়ে, তখন আফসোসের সীমা থাকে না তার। একবার মার্জিনের ওপাশে তাকিয়ে তাকে সালাম দিলেই তো পারতে! পারতে এক শিশি আতর উপহার দিতে। সে তো তোমার মতোই যুবক।

প্রিয় বোন, মেয়েটা পায়ের আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারে যে এটা তুমি। রঙিন স্বপ্নে ভরা মাথাটা বাড়িয়ে দেয় স্টোর রুম থেকে, আলগোছে দেখে নেয় তোমাকে। তুমি যখন বাড়িতে প্রবেশ করো, তোমার জুতার দিকে তাকিয়ে তার ভ্রু উঁচু হয়ে যায়। তোমার বাহারি রঙের জামার দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়। গলার হারটা ক্ষণিকের জন্য নজর কেড়ে নেয় তার। হঠাৎ খেয়াল হয় যে চুলায় চা বসিয়েছে। সে ছুটে গিয়ে আগুন নিভিয়ে দেয়। তার ব্যথিত হৃদয়কে পুড়িয়ে দেওয়ার আগেই। হায়! তুমি মার্জিনের ওপাশে তাকালেই কি ভালো করতে না? তার দিকে মুচকি হাসি হেসে তাকে একটা জামা, একটা হার আর এক জোড়া জুতা উপহার দিতে! হয়তো তা-ই হয়ে থাকত রঙিন জ্বলজ্বলে স্মৃতি!

প্রতিদিন তোমার গাড়ির আওয়াজ শুনলেই ছুটে আসে লোকটা। তোমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয় নিজ হাতে। ফলের প্যাকেটও হাতে ধরে। তোমার পেছনে পেছনে নীরবে-নিভৃতি সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে। ওপরে ওঠার পর তুমি তাকে এক টাকা দাও। আর সে সরে পড়ে তোমার সামনে থেকে। রাস্তায় এসে জামাটাতে ধুলাবালি মেখে নেয়। যাতে শরীর থেকে ফলের গন্ধ চলে যায়। না হলে তার বাচ্চাটা সেই গন্ধ শুঁকে ফল চেয়ে বসবে। হায়! তুমি যদি একবার তাকিয়ে দেখতে মার্জিনের ওপাশে! তবে দেখতে ফলের গন্ধ লুকোতে গিয়ে সে জামার কী হাল করেছে। তাকে যদি কিছু ফল একবার উপহার দিতে!

সে খুব সুন্দর না, আবার হ্যান্ডসামও না। ভালো পরিবার থেকেও আসেনি। দুনিয়া সম্পর্কে তুমি যা জানো, ততটা সে জানে না। কিন্তু তোমার সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। স্বভাবতই তোমার পাশে বসে যায়। অথচ তুমি তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে হাই-প্রোফাইল ছেলেদের সাথে বসো। সে চায় তোমার আর তোমার বন্ধুদের সাহচর্য। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, যথেষ্ট আত্মমর্যাদা তার। তবে সে একাকিত্বে ভোগে। এটা তার দোষ না। তুমি মার্জিনের ওপাশটাতে যদি তার দিকে তাকাতে! তার সাথে চোখাচোখি করে সালাম দিতে! তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসতে! তবে রহমত নাজিল হতো তোমাদের দুজনের ওপর।

মেয়েটা প্রতিদিন এক জায়গায় বসে থাকে। পথচারীদের ডেকে ডেকে বিক্রি করার চেষ্টা করে। মুচকি হেসে তোমাকে সম্মান জানায়; হয়তো তুমি খুশি হয়ে কিছু কিনবে। কেউ হয়তো তার থেকে কিনে নেয়, দরদাম করে না। আবার কেউ এমন কথা বলে টাকা ছুড়ে দেয় যা শুনে সে আঘাত পায়। কিছুটা বিরক্তি ও সংকোচের সাথে তুলে নেয় টাকা। তার যত আয় হয় তা জমা করলে তোমার মোবাইল কেন, একটা চশমা কেনারও টাকা হবে না। হায়! যদি তুমি তার থেকে কিছু কিনতে। যদি তাকে সম্মানের সাথে টাকা দিতে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। তাহলে দেখতে সে দুআ করে দিচ্ছে আল্লাহর কাছে; যেন তিনি তোমাকে রক্ষা করেন, তোমাকে অসুস্থতার অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করেন।

এই যে মানুষগুলো... গাড়ির ড্রাইভার, সুইপার, গৃহকর্মী, পথশিশু, রুটি-বিক্রেতা, ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী। এরা যে সাধারণ মানুষ, তাতে কোনো দোষ নেই। আবার তুমি যে ধনী বা স্বচ্ছল কিংবা শিক্ষিত সেটাও তোমার দোষ না। তুমি তো রিযিক বণ্টন করো না। নিআমতের অধিকারী হলে আফসোসের কিছু নেই। আমাদের কেবল মার্জিনের ওপাশে তাকাতে হবে। তাহলে হয়তো তাদের আমরা স্পষ্ট দেখতে পাব। তাদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেব। আমাদের হৃদয়ে বরকত নাজিল হবে। অভিযোগ করা বন্ধ হবে, যখন দেখব এত এত নিআমত পেয়েও যে আমরা নিজেদের সুখী মনে করি না। কারণ, প্রকৃতপক্ষে সুখ লুকায়িত ওই মুখগুলোর ভেতরে। আমরা সেগুলো দেখতে পারব না, অনুভবও করতে পারব না, যতক্ষণ না মার্জিনের ওপাশে তাকাই।

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 কতই না ভালো হতো!

📄 কতই না ভালো হতো!


কতই না ভালো হতো! যদি সিদ্ধান্ত নিতে কাছের মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করবে। তাই রাতেই জেগে উঠলে। যাতে লাভ করতে পারো এই সুমহান মর্যাদা! অবশেষে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লে। হাঁটতে লাগলে অমানিশা ভেদ করে। আল্লাহর দেওয়া নূর জ্বলে উঠল তোমার অন্তরে। একটা করে পা ফেলে তুমি পৌঁছে গেলে। কতই না ভালো হলো! তোমার হৃদয়ের ভেতরে এক অনন্য অনুভূতি। হ্যাঁ, এখন বুকের যেখানটাতে হাত দিয়েছ সেখানেই!

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি হতে নীরব শ্রোতা, যদি অশ্রু ঝরত তোমার দু-চোখ বেয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন শাইখ মিম্বরে দাঁড়িয়ে আলোচনা করেন, বর্ষিত হতে থাকে রহমতের বারিধারা। কতই না ভালো হতো যদি তোমার মনে জন্মাত আল্লাহকে দেখবার আকাঙ্ক্ষা। ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন শাইখ জান্নাতের বর্ণনা দেন। কারণ, তুমি যে আল্লাহকে ভালোবাসো!

কতই না ভালো হতো! যদি রামাদান ছাড়া তুমি নফল সাওমের নিয়ত করতে। ক্লান্তি অনুভব করছ তুমি। পিপাসায় গলা কাঠের মতো শুকিয়ে গেছে। শরীরটা কেমন মিইয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের জন্য চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলে। অবশেষে ঘনিয়ে এলো ইফতারের ক্ষণ। খেজুর তুলে নিলে। তা মুখে পুরবার আগেই পেলে চোখ-গড়ানো নোনা জলের স্বাদ। কতই না ভালো হতো! যদি কোনো দ্বীনি ভাইকে প্রথমবারের মতো জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করতে পারতে। উভয়েই স্মরণ করতে আল্লাহকে। তার কাঁধে ফিসফিস করে কাঁপা গলায় বলতে, 'উহিব্বকা ফিল্লাহ'!

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি ফিরে যেতে চাইতে রবের কাছে। কোনো অশ্রুভেজা তিলাওয়াত শুনে ঢুকে পড়লে আয়াতের আঙিনায়। প্রতিটি হরফের মাঝে বিচরণ করলে তুমি। বিগলিত হলো তোমার অন্তর। হৃদয়টা উড়ে চলে গেল জান্নাতে। তার আশপাশটা ঘুরে এলো যেন। নাড়া দিল তোমার অন্তরকে। তুমি কাঁদলে আর কাঁদলে। কেঁদেই চললে অবিরাম!

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি বহন করতে কোনো ইয়াতিমের বোঝা। সে হাসলে তার নিষ্পাপ চেহারাটা উদ্ভাসিত হতো। তার চোখ মিলিত হতো তোমার দুচোখে। আনন্দের ঝলকানিতে অবগাহন করতে দুজন। কতই না ভালো হতো! যদি সালাতে তোমার ভাইয়ের পাশে দাঁড়াতে। কাঁধে কাঁধ মেলাতে। সিজদায় গেলে দুজনেই অবনত করতে মাথা। মাটিতে মিশে যেত পাশাপাশি দুটি কপাল। আসমানে উড়ে চলত কিছু দুআ। কখনো বিচ্ছিন্ন, কখনো মিলিত। কবুল হতো আল্লাহর দরবারে।

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি আল্লাহ সুবহানাহুর সামনে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় থাকতে। প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে আযানের ধ্বনি শুনবার। হঠাৎ শূন্য ভেদ করে সেই সুমহান আওয়াজ ভেসে আসল। ভেঙে গেল নীরবতা। কেঁপে উঠল তোমার ভেতরটা। কতই না ভালো হতো, যদি তুমি জায়নামাযের দিকে ছুটে যেতে। বিনয়ের সাথে দিতে তাকবির ধ্বনি-'আল্লাহু আকবার'।

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি অপেক্ষা করতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎলাভের, তার সাহচর্য লাভের। না দেখেই ভালোবেসে ফেলতে তার চেহারাকে। কতই না ভালো হতো, যদি তার কথা ও কাজ তোমাকে টানত। সাহাবিদের জন্য তিনি কেঁদেছেন শুনে তোমার মাঝে ঈর্ষা হতো। কতই না ভালো হতো, যদি তুমি তার হাত ছুঁয়ে দেখার জন্য কেঁদে উঠতে।

কতই না ভালো হতো! যদি গুনাহ করে ব্যথিত হতো তোমার হৃদয়। তারপর ক্ষমা চাইতে আল্লাহর কাছে। কারণ, তুমি জানো, আল্লাহ সেটা ক্ষমা করে দেবেন। তোমার দোষ-ত্রুটি তিনি গোপন রাখবেন। তারপরও তোমার ভয় হয় যে, এ গুনাহর শাস্তি হয়তো আল্লাহ পিছিয়ে রাখছেন। তাই তুমি কান্নায় ভেঙে পড়লে তাঁর কাছে আবারও তাওবাহ করলে।

কতই না ভালো হতো! যদি তুমি পৌঁছে যেতে মক্কায়। দূর থেকে চোখে পড়ত কাবাঘর। তার চারদিকে তাওয়াফ করতে। তারপর সাঈ। দৌড়াতে দুটি পাহাড়ের মাঝে। তারপর কেঁদে ফেলতে তুমি। রবের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ হতো তোমার। তুমি ভালোবেসে ফেলতে তাঁকে। সকল কিছুর মাঝে তাঁরই নিদর্শন দেখতে পেতে। কতই না ভালো হতো, প্রতি মুহূর্তে যদি নতুন করে জীবনের স্বাদ পেতে। কারণ, তুমি যে তাঁকে ভালোবাসো!

ফন্ট সাইজ
15px
17px