📄 পর্দা করে তবে...
বিয়ের দিন হিজাব খুলে ফেলল সে। মাথাটা তার কোনোমতে এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢাকা। আমি আর আমার স্বামী বরকতের জন্য দুআ করে দিতে গেলাম। দেখতে গেলাম কথা বলার উদ্দেশ্যে। পাশে বসার পর সে বিয়ের ছবিগুলো নিয়ে এলো। আমাদের দেখানোর জন্য। অবশ্য তাকে বলেছিলাম অ্যালবামটা না খুলতে। জানালাম যে তার পরনে হিজাব নেই। এই নন-হিজাবী বিয়ের ছবি আমার স্বামী দেখবে না। পর্দা সে করে বটে, তবে ভুলেই গিয়েছিল যে, সে পর্দা করে!
মেয়েটার বোন আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে গেল সে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো। কারণ, লাগেজ নামাতে সময় লাগে। অবশেষে চোখে পড়ল বোনের মুখ। সাথে তার স্বামীও। যিনি একজন শিক্ষক। ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরল সে। এমনকি তার স্বামীকেও! ভুলে গেল যে, বোনের স্বামী তার জন্য গায়রে-মাহরাম!
বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। উপস্থিত আছে সে ও। সবাই বেশ ফিটফাট। আনন্দঘন পরিবেশ। হাই ভলিউমে গান বাজছে। হাততালি দিয়ে গলা মিলিয়ে চলছে কজন। তার ভেতরটাও নেচে উঠছে। মা তার হাত ধরে টেনে আনল। বলল, 'আনন্দ করো, এটাই তো বয়স!' সে মিশে গেল সবার মাঝে। নেচে-গেয়ে হেসে খেলে একাকার। কেউ কেউ অবশ্য ইশারা ইঙ্গিতে বিদ্রুপের হাসি হেসেছিল। তাকে নিয়ে নয়, তারা হেসেছে তার পর্দা নিয়ে!
কালো লম্বা ফ্রকটা পরে বেরিয়ে এলো সে। বড় একটা চাদরে শরীরের সামনের অংশ ঢাকা। গাড়িতে ওঠার সময় এক পা তুলল। সরে গেল ফ্রকের নিচটা। সবার দৃষ্টি ফর্সা পা দুটোতে। কালো বোরকা কিনেছে সে। হাতার অগ্রভাগ এতই প্রশস্ত যে অর্ধেক হাত দেখতে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। আর হাতটা উঁচু করলে তো পুরোটাই চোখে পড়ে যায়! এমন না, সে জানে না। আলবৎ জানে। এই তো কদিন আগেও কোনো এক অনুষ্ঠানে এমন হাতাওয়ালা গাউন পরেই গিয়েছিল সে। তবে পাতলা হাতার ভেতরে কনুই পর্যন্ত আলাদা কোনো কাপড় ছিল না। পর্দা সে করে বটে, তবে সবই খোলামেলা।
বোরকার গলাটা বেশ বড়। আবরণও এত স্বচ্ছ যে, ভেতরটা দেখা যায়। সুযোগ! হ্যাঁ, চমৎকার গলার যে হারটা পরে আছে, সেটা দেখানোর একটা সুযোগ। স্বচ্ছ হিজাবের নিচে সেটা বেশ সুন্দর দেখায়। অবশ্য তুমি তাকে সতর্ক করতে গেলে সে বাঁকা চোখে তাকাবে। এমনভাবে উত্তর দেবে যেন সে অপরাধী নয়, তুমিই অপরাধী!
টাইট জিন্স পরে। ওপরে একটা শার্ট। মাথায় হিজাব। কেউ যদি কিছু বলে তবে রেগে-মেগে উত্তর দেয়, 'আমার এই জিন্স তোমাদের বোরকার থেকে বেশি ঢেকে রাখে।' আচমকা কোথাও বসলে জিন্স চিপসে যায়, তার পায়ের আকৃতি ধরা পড়ে স্পষ্টভাবে। সে এখন পুরুষদের মতো বসে। পা বিছিয়ে দিয়ে। অথবা পায়ের ওপর পা তুলে। বিপদের সময় হলো—যখন সে কোনো বাচ্চাকে কোলে নিতে অথবা জুতা পরতে নিচু হয়। সমস্যা হলো—এ রকম মহিলাদের কেউ আছে খুবই স্থূল। তবু তারা জিন্স ছাড়তে পারে না।
বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আয়নায় তাকাল সে। নিজেকে ডানে-বামে ঘুরে ঘুরে দেখে। হঠাৎ খেয়াল চাপল, সামনের কয়েকটা চুল বের করে দেওয়ার। হয়তো এতে আরও বেশি সুন্দরী লাগবে তাকে। তাই হিজাবের আড়াল থেকে যত্ন করে কিছু চুল বেরিয়ে এলো। হাতাটাও গুটিয়ে নেওয়া হলো যাতে হাতটা দেখা যায়। সবশেষে গায়ে সুগন্ধী সেন্ট। যে সেন্টের ঘ্রাণে যুবকদের মাথা ঘুরে যায়। আয়নায় তাকিয়ে আরেকবার মুচকি হেসে বেরিয়ে পড়ল সে। মুচকি হাসি হাসল শয়তানও।
ভার্সিটির ক্যাম্পাসে সবার সামনে জোরে জোরে ডাকছে বান্ধবীকে। গলার সুর শুনে সবাই উৎস খুঁজে বেড়ায়। আবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে নেয়। সবাই আবার তার দিকে তাকায়। এ রকম করবে না কেন? ছোটবেলা থেকে মাকে দেখেছে রাস্তার মাঝে ছোট ভাইকে বকতে কিংবা বিক্রেতার সাথে জোরে জোরে কথা বলতে। হিজাব যেন কেবল এক টুকরো কাপড়!
ইন্টারনেটে ঢুকলে সবকিছু ভুলে যায়। এর সাথে মজা করে, ওর সাথে হাসে। হাসি-ঠাট্টা, ফান-ট্রলে হাজার হাজার কমেন্ট-রিয়েক্ট করে বেড়ায়। এমন কিছু বলে যা নিজের বাবা অথবা স্বামীর সামনে বলার মতো সাহস হয় না। অনলাইনে এমনটা বলছে, যাকে সামনা-সামনি দেখলেও এমন বলার সাহস করত না সে। অমুক-তমুকের সাথে চ্যাটে-কমেন্টে এত হাসাহাসি, এত মজা যে, সবাই তাকে নিয়ে হাসতে বাধ্য হয়। কিন্তু দিনশেষে তাকে কেউ সম্মান করে না। দুঃখজনকভাবে সে নাকি পর্দাও করে!
এমন জামা পরে যেটা জালের মতো। সে মনে মনে ভাবছে পর্দা হচ্ছে। অথচ সবকিছু প্রকাশ পাচ্ছে সুস্পষ্টরূপে। যার সাথে কথা বলে তার চোখে চোখ রেখে বলে। কখনো চোখের দৃষ্টিতে অন্য কিছু মেশানো থাকে। গলার আওয়াজ খুবই মিষ্টি-মধুর। লিপ্ত হয় উষ্ণ কথাবার্তায়। সহকর্মী বলে কথা! অথচ সে নাকি পর্দানশিন!
সহকর্মীর পাশে বসে স্বামীর নামে গীবত করে। স্বামীর গোপনীয় কথাও বলে ফেলে; যাতে তার সাথে ফ্রি হওয়া যায়। অনেক গভীর বিষয়ও জানা যায়। দীর্ঘ চ্যাট শুরু হয়। দুজনের মাঝে তৈরি হয় অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু দিনশেষে কেউ কাউকে নিয়ে কবরে যাবে না। এমনকি মেয়েটার চোখে-ঠোঁটে মধু থাকলেও না; মেয়েটা সবচেয়ে সুন্দরী হলেও না।
ফেইক আইডি খুলে চ্যাট করতে থাকে। ভালোবাসার জালে আবদ্ধ হয়। রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে। উত্তেজনাকর কথাবার্তাও হয়। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ঠিকই হিজাব পরে। গরিবদের কাছে গিয়ে দান-সাদাকা করে। এই আশায় যে, কিয়ামতের দিন হয়তো জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচবে। তার পর্দা কেন তাকে অনলাইনের পর্দা করাতে পারল না?
কণ্ঠটা বেশ কর্কশ। কিন্তু ছেলেদের সাথে কথা বলার সময় কঠিনতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কণ্ঠ হয়ে যায় বিড়ালের মতো। ফোন ধরার সাথে সাথে মিষ্টি গলায় কথা বলে। মাঝে মাঝে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নেয়। বেশ পারদর্শী অভিনেত্রী। আচ্ছা, কেন এত রকমফের? সবাই কি পর্দা করছে আদৌ? এ রকম দৃশ্যপট আমরা সবাই দেখেছি হয়তো। দেখে বুঝতে পেরেছি কিছু একটা ঘাপলা আছে। পর্দার প্রকৃত অর্থ তারা বোঝেনি। হয়তো কেউ কেউ সত্যিই পর্দার অর্থ জানে না। এরা কি আসলেই পর্দানশীন? নাকি পর্দা করে, তবে...
📄 সেই মুহূর্তগুলি
সেই মুহূর্ত যখন অজু করে বিনয়ের সাথে দাঁড়াই, সালাত শুরু করি তাকবির ধ্বনিতে। চোখ শীতল হয়, প্রশান্ত হয় অন্তর। সেই মুহূর্ত যখন হয়ে যাই এক সংরক্ষিত মুক্তোদানা। লম্বা বোরকায় নিজেকে আবৃত করে পথ চলি। কোনো মুগ্ধ দৃষ্টি আমায় কুরে কুরে খায় না, এ নিয়ে আমাকে ভাবতেও হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার জন্য যথেষ্ট।
সেই মুহূর্ত যখন মায়ের হাতে চুমু দিতে ঝুঁকে পড়ি। মা আমার প্রতি রাজি-খুশি হয়ে যান। আমি যখন অন্যদিকে ফিরি, তখন তার দুআ মেঘমালা ভেদ করে উড়ে চলে সুউচ্চ আসমানে। আমার মা তখন আসমানের রবের কাছে বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করেন। প্রশান্ত হয় আমার অন্তর। সেই মুহূর্ত যখন বাবা আমার চরিত্র নিয়ে গর্ব করেন। ভরসা রাখেন আমার আচার-ব্যবহারে, সততা ও বিশ্বস্ততায়। আমিও নিজেকে রক্ষা করে চলি, যেন তিনি আমাকে রেখে নিশ্চিন্ত মনে চলে যান। কারণ, তিনি জানেন আমি পবিত্র।
সেই মুহূর্ত যখন একজন নেককার বান্দা আমার সঙ্গী। আমরা একত্রে কুরআনের সুধা পান করি, আস্বাদন করি ঈমানের স্বাদ। একই সাথে ছুটে চলি রবের নির্দেশিত পথে। সেই মুহূর্ত যখন আমার হাত থাকে ইয়াতিমের মাথার ওপর, যখন এ হাত নিঃস্বদের সাহায্য করে, বোঝা বহন করে কোনো বিধবার। যখন তাদের সংকীর্ণতার মুহূর্তে আমি প্রশস্ত হয়ে দাঁড়াতে পারি। তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন পথে যখন হতে পারি এক ঝলক আলো।
সেই মুহূর্ত যখন হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা সংরক্ষণ করে রাখি নেক সঙ্গীর জন্য; যতক্ষণ না সে আসে, অবমুক্ত করে আমার পবিত্র অনুভূতি। সেই মুহূর্ত যখন আমি ব্যথিত মানুষের অশ্রু মুছে দিই, তাদের অন্তরে বুনে দিই আশার বীজ। যখন তার অশ্রুসিক্ত মুখে ফুটে ওঠে মুচকি হাসি। মনে মনে খুশি হই কল্যাণকর কিছু করতে পেরে। সেই মুহূর্ত যখন আমার মস্তক জমিনে ঠেকে। আমি সিজদা করি কেবল আমার রবের জন্যই, অন্য কারও জন্য নয়।
সেই মুহূর্ত যখন আমি জানতে পারি, আনন্দের মুহূর্ত দেরিতে হলেও আসবে। আমার সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা অপেক্ষমাণ আছে সেই আল্লাহর কাছে যিনি আমাকে আশাহত করবেন না। সেই মুহূর্ত যখন নিজের একাকিত্বেও মন খারাপ হয় না। কেননা আসমানে চাঁদও একাকী, তবু কী সুন্দর! সেই মুহূর্ত যখন আমি একা বসে বিনয়ের সাথে হাত তুলি। চাইতে থাকি মহান রবের কাছে। ফলে ধরা দেয় সুখ-সমৃদ্ধি। আমার চাওয়া-পাওয়া যেন এক প্রজাপতির মতো হয়ে যায়—তাড়া করলেই উড়ে যাবে যেন! কিন্তু রবের ওপর ভরসা করেছি আমি। তাই সে আবার অনুগত হয়ে আমার আঙুলের ওপরই বসবে।
সেই মুহূর্ত যখন আমি অনুভব করতে পারি—কোনো কিছুর জন্যই আমার ব্যথিত হওয়া মানায় না, কেবল আমার গুনাহর জন্য ছাড়া। তাই সর্বদা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ে চলি; হয়তো আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। সেই মুহূর্ত যখন নিজ হাত দিয়ে উপকারী কিছু করি। আঙুল দিয়ে তাসবিহ পাঠ করি। হাত দিয়ে দান করি অথবা কারও প্রতি দয়া করি কিংবা রবকে সন্তুষ্ট করে এমন কিছু লিখি। ফলে কিয়ামতের দিন এই হাতকে যখন আল্লাহ কথা বলতে বলবেন, তখন আমার পক্ষে সুপারিশ করার মতো কিছু পাব। এ হাত আমার সৎকর্মের বিবরণ দেবে। আবার আমি যে পাপ করেছি তা-ও তুলে ধরবে।
সেই মুহূর্ত যখন অনুভব করি গুনাহ করলেও, ভুল করলেও, দূরে সরে গেলেও সঠিক পথেই আছি। যতই হোঁচট খাই না কেন, দিনশেষে আমি গন্তব্যে পৌঁছাবই আল্লাহর ইচ্ছায়। কারণ, আমি যে সুপথ বেছে নিয়েছি। সিজদায় গিয়ে আমার রব, আমার প্রিয় পরম করুণাময়ের কাছে তা চেয়ে নিয়েছি।
সেই মুহূর্ত এই মুহূর্তের কথা লিখে শেষ করবার মতো নয়! কারণ, আল্লাহর আনুগত্যে এমন স্বাদ—যা বর্ণনা করা যায় না। আল্লাহকে মেনে চলায় এমন আনন্দ—যা ভাষায় রূপ দেওয়া সম্ভব না।
📄 হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! তবে ছুটে যেতাম মসজিদের পানে। তখনও শরীরটা অজুর পানিতে ভেজা। বাইরের ঠান্ডা বাতাস শরীরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। ছুটে যেতাম কেবলার দিকে। উচ্চ আওয়াজে আযান দিতাম, 'আল্লাহু আকবার!' ইয়া আল্লাহ! কী সুন্দর! কী চমৎকার!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! তবে প্রতিদিন আমার জন্য অপেক্ষা করত একজন উত্তম স্ত্রী। তাকে আমি নিজে পছন্দ করে নিতাম। ভালোবাসতাম। তার দায়িত্ব থাকত আমার কাঁধে। সে হতো আমার অনুগত। আমার জন্য খাবার প্রস্তুত করত। আমার কাপড় ধুয়ে দিত। রাজ্যের দেখাশোনা করত আমার। সারাদিন কাজ শেষে ঘুমানোর পরিবেশ তৈরি করে দিত। তারপর জেগে উঠতাম ধূমায়িত চায়ের ধোঁয়ায়। মজা করে চুমুকে চুমুকে পান করে চলতাম। সে বসে থাকত আমার পাশে। আমি থাকতাম রাজার হালে।
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! হতাম পবিত্র দ্বীনদার একজন যুবক। চোখ নামিয়ে চলতাম। শরীরকে বাঁচিয়ে রাখতাম গুনাহ থেকে। মুখভঙ্গিতে প্রকাশ পেত হিদায়াতের বার্তা। চলতি পথে জমিনের সবাই আমাকে পছন্দ করত। হাত মেলাতাম সবার সাথে। ঘুমাতাম নিশ্চিন্ত মনে। কারণ, আমার জন্য এক হুরে-ঈন প্রস্তুতি নিচ্ছে, সাজগোছ করছে। আহা! হুরে-ঈন কতই না মিষ্টি!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! যে-কোনো জায়গায় ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই অজু করতে পারতাম। হিজাব খুলে গেলে মাথার চুল প্রকাশিত হয়ে যাবে—এমন ভয় থাকত না। পুরুষ হলে কী সহজেই হয়ে যেত!
হায়! যদি আমি পুরুষ হতাম! তাহলে পায়জামা পরে সাগরপাড়ে হেঁটে যেতাম। জোরে হাসতাম। কেউ আমাকে কিছু বলত না। সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম, সাঁতার কেটে উপভোগ করতাম। গরমের ছুটি কাটাতাম চমৎকারভাবে। যদি পুরুষ হতাম!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! সন্তানেরা আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকত। যদিও আমি তাদের নয় মাস পেটে ধরিনি, দুধ পান করাইনি, জামা-কাপড় বদলে দিইনি, শীতের রাতে তাদের জন্য ঘুম থেকে উঠে যাইনি; তবুও তো এ ডাক শোনার অধিকার থাকত!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! পছন্দের সব খেলাধুলা করতে পারতাম। ছুটে চলতাম সাদা ঘোড়ার পিঠে। ভ্রমণ করতাম যেখানে খুশি!
হায়, যদি আমি পুরুষ হতাম! তাহলে গর্বভরে বলতে পারতাম নবি-রাসুলরা পুরুষ ছিলেন। যে সম্প্রদায় নারীকে নেতৃত্বের আসনে বসায় তারা সফল হয় না-এ কথা জানাতাম।
কিন্তু আমি এমন পুরুষ হতে চাই না, যে এই নিআমতগুলো জানে না। হয়তো আমি পুরুষ হলে স্ত্রীর ওপর জুলুম করতাম। তাকে বারবার হুমকি দিতাম যে, আমি আরেকটা বিয়ে করব। হয়তো আমি পুরুষ হলে ঘুমাতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম টিভি-কম্পিউটারের সামনে। সালাত আদায় করতাম না মসজিদে গিয়ে। হয়তো আমি পুরুষ হলে মেয়েদের ফিতনায় পড়তাম। চোখের হিফাযত করতাম না, অন্তর পচে যেত। উদাসীন হয়ে পতিত হতাম ধ্বংসের মুখে। হয়তো আমি পুরুষ হলে এমন বাবা হতাম যে থেকেও নেই। হয়তো আমি পুরুষ হলে এমন বিভ্রান্ত যুবক হতাম যার কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। হয়তো আমি পুরুষ হলে এমন হতাম যার অস্তিত্ব থাকলেও যেন অস্তিত্বহীন।
আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন নারী। হে আল্লাহ, আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা! একজন নারী স্বামীর সেবা করেও এ সমস্ত নেকীর অধিকারী হতে পারে! সর্বদা বলে যাব, আল্লাহ! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা!
📄 চমৎকার অনুভূতি
দাঁড়িয়ে আছি আতঙ্কে। আর সবাইও অপেক্ষা করছে ভয়ে ভয়ে। চারদিকে বিরাজ করছে অপরিসীম নীরবতা। হতচকিত হয়ে আছি, দুআ পড়ছি। রহমানের কাছে চলছে কাকুতি-মিনতি, যাতে আমার গুনাহগুলো গোপন রাখেন। দূর থেকে আওয়াজ শোনা যায়। পাশ দিয়ে কে যেন আসে। শরীর কেঁপে ওঠে ভয়ে। হঠাৎ আমার হাত উঠল। খুলে গেল মুষ্ঠি। ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হলো। প্রশান্ত হলো মন। আনন্দিত হলো হৃদয়। ফেরেশতারা আমায় নিয়ে খুশি। তারা পরম করুণার সাথে বলছে, 'তোমার আমলনামা পড়ো।'
কী চমৎকার অনুভূতি! কোনো একটি গুনাহ জেনে করতাম, পরে তাওবা করেছিলাম আন্তরিকভাবে। সে কথা আমার বিবেক জানে। জানে আমার হৃদয়। শরীরের কাছেও তা অজ্ঞাত নয়। হিসেব-নিকেশের দিন দেখব পরম করুণাময় রব সে গুনাহ ঢেকে দিয়েছেন। তারপর স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন; অথচ আমারই মনে ছিল না সেটা। আমার সব গুনাহকে তিনি পরিবর্তন করে দিয়েছেন নেকিতে। কী চমৎকার অনুভূতি হবে তখন! যে তাওবার কারণে আমি নবজীবন লাভ করব, অনন্তকাল বসবাস করব জান্নাতে।
কী চমৎকার অনুভূতি! যখন হাউজ দেখতে পাব। পিপাসায় কাতর আমি। ছুটে চলেছি তার উদ্দেশে। সবাই ভিড় করছে। একে অপরকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় চিৎকার করে কাঁদছি। হঠাৎ ফেরেশতাদের ডাক। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উজ্জ্বল চেহারা। তিনি আমায় চিনতে পেরেছেন। আমিও চিনতে পেরেছি তাকে। তাকে আগে কখনো দেখিনি, তবুও। তখন সারিগুলো অতিক্রম করে সামনে চলে যাব। তিনি বাড়িয়ে দেবেন পবিত্র হাত। তার হাত স্পর্শ করবে আমার হাতকে। তিনি পান করাবেন। এরপর আর কখনো পিপাসার্ত হব না আমি। নবিজির সাথে দেখা হওয়ার অনুভূতিটা কী চমৎকারই না হবে!
কী চমৎকার অনুভূতি! যখন কোনো এক আহ্বানকারী ডাকবে, 'হে জান্নাতবাসী! তোমাদের সাথে আল্লাহ সাক্ষাৎ করবেন।' ভয়ে বিগলিত হয়ে যাব আমি। আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ! মহীয়ান- গরীয়ান 'আর-রহমান'-এর সাথে দেখা! আর আমিই-বা কে যে সেই সুমহান সত্তার সাথে দেখা করব! মিছিলে হেঁটে যাব আমি। মন পুলকিত। আনন্দে হাসতে থাকব। তারপর মাথা তুলব। যে চোখ দিয়ে কখনো হারাম দেখিনি, সেই চোখ তুলে তাকাব। আল্লাহ সরিয়ে দেবেন পর্দা। আমি চেয়ে রইব। চেয়েই রইব। যত খুশি দেখে নেব। কেঁপে উঠবে শরীর। বিনীত হয়ে উঠবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এমন এক নতুন স্বাদ অনুভব করব যা আগে পাইনি কক্ষনো। চোখ মুদতে পারব না। পারব না মাথাটাও নাড়াতে। নিঃশ্বাস পর্যন্ত থেমে যাবে। মনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবার ক্ষণে অশ্রু গড়াবে চোখ বেয়ে। কী চমৎকার অনুভূতি আল্লাহকে দেখার মাঝে! ইয়া আল্লাহ!
কী চমৎকার অনুভূতি! যখন আমি আকাঙ্ক্ষী হব আল্লাহর প্রতি। আর তাই আগ্রহী হব সালাত আদায়ে। কারণ-সালাত যে তাঁরই সামনে দাঁড়ানোর নাম। আকাঙ্ক্ষী হব কুরআন পড়তে। কুরআন যে তাঁরই কথা! ভালোবাসব রাত্রিকে। তখন যে তিনি আমায় ডাকেন! অপেক্ষা করব দিনের জন্য। তখন যে তিনি সব দিয়ে যান অকাতরে! পছন্দ করব আযানের ধ্বনি। আযান যে তাঁরই আহ্বান! ভালোবাসব প্রিয় নবিজিকে। তিনি যে তাঁরই প্রিয়জন! কামনা করব জান্নাত। সেখানে যে তাঁকেই দেখা যাবে! দিন গুনব মৃত্যুর। এরপরই যে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ! কী চমৎকার সেই অনুভূতি! আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে!