📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 ফেরেশতাদের আলাপনে

📄 ফেরেশতাদের আলাপনে


তারা কথা বলছে। ফিসফিস করছে। সংবাদ বহন করছে। আনন্দচিত্তে এগিয়ে চলছে সুসংবাদ নিয়ে। একে অপরকে আহ্বান করছে তোমায় ভালোবাসতে। হ্যাঁ, এই যে তুমি পড়ছ আমার লেখা, তোমাকেই বলছি—তুমিই ফেরেশতাদের আলোচ্য বিষয়। তারা তোমার কণ্ঠস্বর চেনে। অন্ধকার রাতে এক দীর্ঘ সিজদায় কী চেয়েছিলে—সবই তারা শুনেছে। তোমার দু-চোখের অশ্রুধারা সাক্ষ্য দিচ্ছে তোমার পক্ষে। তারা চেনে তোমার সুন্দর চেহারা, যে চেহারা শেষরাতে ইস্তিগফার করে চলে। ফলে সৃষ্টি হয় এক মিষ্টি অবয়ব।

তুমি যে আল্লাহকে সিজদায় ডাকো, সেই ফিসফিসানি, তাওবা করার সময় তোমার চোখ বেয়ে যে অশ্রু ঝরে, যা তোমার মুখমণ্ডল আলোকিত করে দেয়, গুনাহ মুছে দেয়—তা-ও তারা চেনে। যতবার তুমি আল্লাহর কাছে ফিরে চলো, ততবার তোমার মুখে যে পবিত্র ছাপ ফুটে ওঠে—তা তারা জানে। গুনাহর পর তাওবা করার সময় যে আর্তনাদ তুমি করেছ, তাও তারা চেনে।

তোমার যে দয়ার্দ্র হাত ভালোবাসায় মায়ের কাঁধে, বাবার পিঠে পরশ বুলিয়ে দেয়, সসম্মানে দরিদ্রের হাতে কিছু গুঁজে দেয়, অনুগ্রহ ভরে ইয়াতিমের মাথা স্পর্শ করে, বিনয়ের সাথে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে ধরে যাতে তুমি পৌঁছে যাও জান্নাতের উচ্চ স্তরে—সে হাতও তারা চেনে বৈকি! তারা চেনে তোমার নজর। অজুর পানিতে নিয়ত সিক্ত চোখে যে নজর আছে, তা হারাম থেকে কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে তোমায়-তা তাদের জানা। যখন মন্দ দেখে চোখ নামিয়ে নিলে, তখনও তারা দেখেছে তোমায়।

তারা জানে তোমার হৃৎকম্পনের আওয়াজ। এ আওয়াজ বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে। হৃৎকম্পন যেন জানিয়ে দেয় ইবলিসের আক্রমণের কথা, যে আক্রমণের মাধ্যমে ইবলিস তোমাকে পাপাচারে লিপ্ত করতে চায়। আর তুমি সর্বদা আল্লাহর কাছে ধরনা দাও, তারই অনুগ্রহ কামনা করো। তুমি অজু করলে তোমার অন্তর সিজদা করে। কমে আসে তোমার হৃৎকম্পন। তাই তো সালাতে তুমি ধীর-স্থির হতে পারো! তোমার নাম-উপাধি নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা চলে। কারণ, তুমি যে তোমার রবকে ভালোবাসো! আর তিনিও যে তোমায় ভালোবাসেন!
» কারণ, তুমি যে সর্বদা প্রশংসা করো।
» কারণ, কুরআন শুনলে যে তোমার হৃদয়টা কেঁপে ওঠে।
» কারণ, তুমি যে আখিরাতকে ভয় পাও, তোমার রবের অনুগ্রহ চাও।
» কারণ, যিকিরের সময় তোমার হৃদয় বিগলিত হয়।
» কারণ, তুমি যে আল্লাহর চেহারা দেখার গভীর বাসনা ব্যক্ত করো।
» কারণ, তুমি যে সত্যবাদী বিশ্বস্তদের কাতারে হাশর চাও।
» কারণ, আল্লাহর দেওয়া নূরে আলোকিত হয় তোমার মুখ।
» কারণ, তুমি ভালোবাসো নেককারদের, বন্ধুত্ব পাতাও মুত্তাকিদের সাথে।

একটু অনুভবের চেষ্টা করো তো, ভাবো একবার-তুমি যেন ফেরেশতাদের কলমের খসখসানি শুনতে পাচ্ছ। তোমার ভাবনা, তোমার কর্ম, তোমার অনুভূতি-সবই তারা লিখে রাখছে। কল্পনায় পরিভ্রমণ করো সেদিকে। আরশের নিচে তুমি অপেক্ষা করতে থাকো। ভাবতে থাকো। মনোযোগ দিয়ে শোনো আর এদিক-সেদিক তাকাও। দেখতে পাবে এদিকে নুর, সেদিকে নুর, নুরের ছড়াছড়ি সর্বত্র। ফেরেশতারা সালাম দিয়ে ডাকছে তোমায়। তুমি অবাক হবে! তুমি তো তাদের চেনো না, কিন্তু তারা যে তোমায় চেনে। তুমি যে এ দুনিয়ায় ফেরেশতাদের বাতিতের বিষয়বস্তু!

কল্পনা করো-তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছ। এমন সময় তারা ঘিরে ধরেছে তোমায়। জানাচ্ছে সুসংবাদ। প্রশান্ত করে দিচ্ছে তোমার মন। কারণ, তারা যে তোমায় চেনে! কল্পনা করো যে-তারা তোমার পবিত্র আত্মা নিয়ে উড়ে চলেছে সুউচ্চ আকাশে। কল্পনা করো যে তুমি বিনীত হয়ে মাথা তুলছ। যে চোখ দিয়ে কখনো তুমি হারাম দেখোনি, সে চোখ ভরে আল্লাহকে দেখার জন্য চোখ তুলে তাকাচ্ছ! ইয়া আল্লাহ!

এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা-আমরা কি আদৌ এতটা ভালোবাসা পাবার যোগ্য? আল্লাহ কি আমাদের ভালোবেসে ফেরেশতাকে ডেকে বলেন, 'জিবরিল! অমুককে ভালোবাসো। কেননা আমি তাকে ভালোবাসি।' সুবহানাল্লাহ! মেঘমালা বিদীর্ণ করে কি কোনো ফেরেশতার আওয়াজ শোনা যায়? যে আওয়াজে আসমানগুলো কেঁপে ওঠে, মেঘখণ্ড নড়ে ওঠে, নক্ষত্ররাজি জ্বলজ্বল করে। সে আওয়াজ কি উচ্চ আসমানে বলে ওঠে, 'তোমরা অমুককে ভালোবাসো; কেননা আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন।' ফলে ফেরেশতারা তোমাকে ভালোবেসে ফেলে।

আমাদের হৃদয়গুলো তীব্র কামনা ও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমাণ। চলো, আমরা ছুটে চলি। চলো, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য এগিয়ে চলি। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে আপনার ভালোবাসা প্রসারিত করে দিন। আপনি দৃষ্টিপাত করুন আমাদের প্রতি। আপনাকে দেখার সুযোগ করে দিন। আপনার সাথে সাক্ষাতের কামনা-বাসনা জাগিয়ে দিন। ইয়া ইলাহি! আমাদের বানিয়ে দিন ফেরেশতাদের আলাপের বিষয়!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 জান্নাতের ট্রেন

📄 জান্নাতের ট্রেন


চায়ের ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে। এদিকে ওদিকে বিক্রেতাদের বিচরণ। পথ লোকে লোকারণ্য। ছাতা নিয়ে কারও আগমন। বাচ্চাদের ছুটোছুটি। সুন্দরী এক যুবতী সলাজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। নরম হাতের তালুতে ঢেকে রেখেছে চোখের পানি। সামনে যুবকটা দাঁড়িয়ে। তার অশ্রু মুছে দেওয়ার সাহস করছে না। ট্রেন যেন না আসে—এমনটাই তার কামনা। বিদায়ের ক্ষণটা দীর্ঘ করবার আশা তার মনে। এক ভাই কাঁদছে অপর ভাইয়ের সাথে বিচ্ছেদের মুহূর্তে। স্ত্রী কাঁদছে প্রিয়তম স্বামীর বিদায়ে। অনেক অনেক অনুভূতি। অসংখ্য বেদনার ঢল। বিদায়বেলায় যেন কলিজাটা ছিঁড়ে নিচ্ছে তারা। কেউ কাঁদে। কেউ-বা মুচকি হাসে, তবে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। হাত নেড়ে বিদায় জানায় প্রিয়জনকে। অপরজন চিৎকার করে ছেলেকে বিদায় জানিয়ে বলে—‘নিরাপদে থেকো! ভালোবাসি বাবা! আবার দেখা হবে। পড়াশোনা কোরো ভালো করে।’ ট্রেন ছেড়ে দেয়। বৃষ্টির ফোঁটাগুলি পড়তে থাকে। মিশে যায় অশ্রুবিন্দুর সাথে। এই তো দুনিয়া!

আমরা সবাই যাত্রী। প্রস্তুতি নিচ্ছি অনন্ত যাত্রার। আমাদের পাথেয় কম, পথ দীর্ঘ। আর আমাদের ট্রেন? সে তো অন্য কোনো ট্রেনের মতো নয়! কেউ নিজের অজান্তেই চড়ে বসে সেই ট্রেনে। কেউ হয়তো জানেই না যে, সে টিকিট কেটে ফেলেছে। কেউ বা আবার মূল্য পরিশোধ করছে। কামাল। দয়ালু মানুষ। পবিত্র চেহারা। সত্যদর্শী দু-চোখের ওপরে ভ্রু দুটো যেন নতুন চাঁদের মতো। মাথায় পরিপাটি করে বিছানো কেশ, স্থানে স্থানে পাক ধরেছে। প্রতিটা কেশ যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে তার হয়ে। পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এক উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তির। যিনি প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুতে ধৈর্য ধরে গেছেন। একনিষ্ঠতার সাথে বড় করেছেন তিন-তিনটা মেয়েকে। আল্লাহর কাছে নেকি কামনা করে। সাওয়াবের আশায়। মেয়ে তিনটা যেন তিনটা তারকা। স্বামীদের আকাশে জ্বলজ্বলে তারকা। যে তারকা ছড়ায় উত্তম চরিত্রের সুবাতাস, কুরআনের আলো। প্রজাপতির মতো এখানে-সেখানে ছড়িয়ে দেয় পবিত্রতার আবেশ। কামাল জানতেন না তার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। তার দাম দিচ্ছেন তিনি। তাই চলে এলো বিদায়ের ক্ষণ। দ্রুততর হলো শ্বাস-প্রশ্বাস। ধীরে ধীরে থেমে গেল হৃৎস্পন্দন। শিয়রে তখন তিনটি ফুল, 'বিদায় বাবা, দেখা হবে জান্নাতে!'

হাবিবা। বুদ্ধিমতী এক তরুণী। সবার প্রিয়। এর খবর নেয়। ওকে খাওয়ায়। রাতে প্রতিবেশিনীর বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়, সাহায্য করে বাড়িভাড়া দিতে। প্রতিবেশী ডাক্তারের বাড়িতে অসুস্থ কোনো বাচ্চাকে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে ফিরিয়ে দেন না। কারণ, ডাক্তার তার মহানুভবতার কথা জানেন। বান্ধবীদের থেকে টাকা তুলে কারও জন্য ঔষধ কিনে দেয় হাবিবা। আলমারি খুলে নিজের সবচেয়ে ভালো জামাগুলো বের করে অন্যকে দান করে। সফেদ শুভ্র জামাটা দেখেও থমকে যায় না। জামার ওপরে খচিত মুক্তোদানার ঝলকানি তার মন কেড়ে নেয় না। বরং সে থমকে যায় বিধবা নারীকে দেখে। তার মন কেড়ে নেয় ইয়াতিম শিশুর চোখের ঝলকানি। তার হৃদয়ে নাড়া দেয় অসুস্থ ব্যক্তির করুণ চাহনি। অসুস্থ নারীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সে। এই তো ট্রেন এসে গেছে। তাকেও উঠে বসতে হবে। তার ডানে একটা মেয়ে তার সেবা করে চলছে। তার বোন না, মেয়েও না। কিন্তু সেই মেয়েটা তাকে চেনে। কারণ, সে যে ভালোবেসে তার যত্ন নিয়েছিল একবার। 'বিদায় হাবিবা, দেখা হবে জান্নাতে!'

আহমদ। চমৎকার এক যুবক। তার দিকে তাকালে মনে হবে তারুণ্যে সবচেয়ে সুন্দর রূপটা বোধহয় সে ই পেয়েছে। কালো দু-চোখ আবৃত করে থাকে মমতায় ভরা চোখের পাতা। চোখের পাতা খোলে আর বন্ধ হয়। যেন তা একটি কবুতরের মতো ডানা ঝাপটায়। দীর্ঘ শরীর। সুঠাম শক্তিশালী দেহ। কিছুটা ব্যথিত অভিব্যক্তি। দুর্বলতার ছাপ প্রকাশিত। তার ওপর নানা বিপদ নেমে এলেও সে বেশ সন্তুষ্ট। এর বিনিময়ে নেকির আশা করে সে। তীব্র কষ্টেও তার কান্না আসে না। বরং কেঁদে চলে তার নেক আমলের স্বল্পতায়। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে। যৌবনের পাপ স্মরণ করে প্রচণ্ড আফসোসে। এখন দ্বীনের পথে দৃঢ়পদ। তার বন্ধু কুরআন। এই তো ট্রেন এসে পড়েছে। কুয়াশার পর্দা ছিন্ন করে। ফেরেশতাদের কণ্ঠ ডাকছে তাকে। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ঔষধ পান করাচ্ছেন। 'শাহাদাতাইন'-এর সুমিষ্ট স্বাদ নিচ্ছে তার জিহ্বা। মায়ের ফিসফিস কথা, 'বিদায় চোখের মণি আমার, দেখা হবে জান্নাতে!'

হুসাম। বুদ্ধিমান যুবক। দৃঢ় ব্যক্তিত্ব তার। সফল ও অধ্যবসায়ী। চরিত্রবান ও ভদ্র। এমনটাই তার ব্যাপারে সবাই বলে। জান্নাতের প্রতি তার তীব্র বাসনা। তাই তো স্ত্রী-মাকে বিদায় জানিয়ে ছুটে গেছে সেদিকে, যেদিকে রক্তের ঘ্রাণও সুরভি ছড়ায়। যেখানে তারাই নাজাত পায়, যারা মাটির নিচে চলে যেতে পারে। যে স্থানে অন্যায়-অবিচার মাত্রা ছাড়িয়েছে। বাহন নামাল সেখানে। টিকিট কেটে নিল। উঠে বসল ট্রেনে। শাহাদাতের মর্যাদা অর্জন করে নিল। তাকে বিদায় জানাল পৃথিবী। আসমান তার তরে সেজেছে সুন্দর করে। তার আগমনে অভ্যর্থনা জানাল আসমানি পাখিরা। ভালোবাসা, তীব্র কামনা ও উদগ্র বাসনা নিয়ে তাকে ঘিরে ফেলল জান্নাতের হুর। 'শহিদ, তোমাকে সালাম জানাই। দেখা হবে জান্নাতে!'

চোখ মুছে ফেলি। কেন কাঁদব তাদের জন্য? তারা তো এগিয়ে চলেছে। সফল তো তারাই। ভালো মতো চোখটা কচলে সরিয়ে ফেলি চোখের পর্দা; যাতে স্পষ্ট দেখতে পারি। ভাবি, কোথায় আছি আমি? আমার টিকিটটা কোথায়? অপেক্ষা করি ট্রেনের জন্য। এই ট্রেনের তো কোনো নির্ধারিত সময় নেই। নেই কোনো বড় স্টেশন, যেখানে চায়ের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে! যত পারি সৎকর্ম করে নিই। আর যদি টিকিটের পর ট্রেন চলে আসে, তবে তাতে উঠে পড়ি এই বেলা। দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আচ্ছা, একসাথে সবাই অপেক্ষা করি না কেন? সফরের জন্য প্রস্তুত করি সব পাথেয়। সেই যাত্রা বড় কঠিন! তবু তো যেতেই হবে! এ যাত্রা যে জান্নাতের পথে!

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 পর্দা করে তবে...

📄 পর্দা করে তবে...


বিয়ের দিন হিজাব খুলে ফেলল সে। মাথাটা তার কোনোমতে এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢাকা। আমি আর আমার স্বামী বরকতের জন্য দুআ করে দিতে গেলাম। দেখতে গেলাম কথা বলার উদ্দেশ্যে। পাশে বসার পর সে বিয়ের ছবিগুলো নিয়ে এলো। আমাদের দেখানোর জন্য। অবশ্য তাকে বলেছিলাম অ্যালবামটা না খুলতে। জানালাম যে তার পরনে হিজাব নেই। এই নন-হিজাবী বিয়ের ছবি আমার স্বামী দেখবে না। পর্দা সে করে বটে, তবে ভুলেই গিয়েছিল যে, সে পর্দা করে!

মেয়েটার বোন আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে গেল সে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো। কারণ, লাগেজ নামাতে সময় লাগে। অবশেষে চোখে পড়ল বোনের মুখ। সাথে তার স্বামীও। যিনি একজন শিক্ষক। ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরল সে। এমনকি তার স্বামীকেও! ভুলে গেল যে, বোনের স্বামী তার জন্য গায়রে-মাহরাম!

বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। উপস্থিত আছে সে ও। সবাই বেশ ফিটফাট। আনন্দঘন পরিবেশ। হাই ভলিউমে গান বাজছে। হাততালি দিয়ে গলা মিলিয়ে চলছে কজন। তার ভেতরটাও নেচে উঠছে। মা তার হাত ধরে টেনে আনল। বলল, 'আনন্দ করো, এটাই তো বয়স!' সে মিশে গেল সবার মাঝে। নেচে-গেয়ে হেসে খেলে একাকার। কেউ কেউ অবশ্য ইশারা ইঙ্গিতে বিদ্রুপের হাসি হেসেছিল। তাকে নিয়ে নয়, তারা হেসেছে তার পর্দা নিয়ে!

কালো লম্বা ফ্রকটা পরে বেরিয়ে এলো সে। বড় একটা চাদরে শরীরের সামনের অংশ ঢাকা। গাড়িতে ওঠার সময় এক পা তুলল। সরে গেল ফ্রকের নিচটা। সবার দৃষ্টি ফর্সা পা দুটোতে। কালো বোরকা কিনেছে সে। হাতার অগ্রভাগ এতই প্রশস্ত যে অর্ধেক হাত দেখতে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। আর হাতটা উঁচু করলে তো পুরোটাই চোখে পড়ে যায়! এমন না, সে জানে না। আলবৎ জানে। এই তো কদিন আগেও কোনো এক অনুষ্ঠানে এমন হাতাওয়ালা গাউন পরেই গিয়েছিল সে। তবে পাতলা হাতার ভেতরে কনুই পর্যন্ত আলাদা কোনো কাপড় ছিল না। পর্দা সে করে বটে, তবে সবই খোলামেলা।

বোরকার গলাটা বেশ বড়। আবরণও এত স্বচ্ছ যে, ভেতরটা দেখা যায়। সুযোগ! হ্যাঁ, চমৎকার গলার যে হারটা পরে আছে, সেটা দেখানোর একটা সুযোগ। স্বচ্ছ হিজাবের নিচে সেটা বেশ সুন্দর দেখায়। অবশ্য তুমি তাকে সতর্ক করতে গেলে সে বাঁকা চোখে তাকাবে। এমনভাবে উত্তর দেবে যেন সে অপরাধী নয়, তুমিই অপরাধী!

টাইট জিন্স পরে। ওপরে একটা শার্ট। মাথায় হিজাব। কেউ যদি কিছু বলে তবে রেগে-মেগে উত্তর দেয়, 'আমার এই জিন্স তোমাদের বোরকার থেকে বেশি ঢেকে রাখে।' আচমকা কোথাও বসলে জিন্স চিপসে যায়, তার পায়ের আকৃতি ধরা পড়ে স্পষ্টভাবে। সে এখন পুরুষদের মতো বসে। পা বিছিয়ে দিয়ে। অথবা পায়ের ওপর পা তুলে। বিপদের সময় হলো—যখন সে কোনো বাচ্চাকে কোলে নিতে অথবা জুতা পরতে নিচু হয়। সমস্যা হলো—এ রকম মহিলাদের কেউ আছে খুবই স্থূল। তবু তারা জিন্স ছাড়তে পারে না।

বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আয়নায় তাকাল সে। নিজেকে ডানে-বামে ঘুরে ঘুরে দেখে। হঠাৎ খেয়াল চাপল, সামনের কয়েকটা চুল বের করে দেওয়ার। হয়তো এতে আরও বেশি সুন্দরী লাগবে তাকে। তাই হিজাবের আড়াল থেকে যত্ন করে কিছু চুল বেরিয়ে এলো। হাতাটাও গুটিয়ে নেওয়া হলো যাতে হাতটা দেখা যায়। সবশেষে গায়ে সুগন্ধী সেন্ট। যে সেন্টের ঘ্রাণে যুবকদের মাথা ঘুরে যায়। আয়নায় তাকিয়ে আরেকবার মুচকি হেসে বেরিয়ে পড়ল সে। মুচকি হাসি হাসল শয়তানও।

ভার্সিটির ক্যাম্পাসে সবার সামনে জোরে জোরে ডাকছে বান্ধবীকে। গলার সুর শুনে সবাই উৎস খুঁজে বেড়ায়। আবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে নেয়। সবাই আবার তার দিকে তাকায়। এ রকম করবে না কেন? ছোটবেলা থেকে মাকে দেখেছে রাস্তার মাঝে ছোট ভাইকে বকতে কিংবা বিক্রেতার সাথে জোরে জোরে কথা বলতে। হিজাব যেন কেবল এক টুকরো কাপড়!

ইন্টারনেটে ঢুকলে সবকিছু ভুলে যায়। এর সাথে মজা করে, ওর সাথে হাসে। হাসি-ঠাট্টা, ফান-ট্রলে হাজার হাজার কমেন্ট-রিয়েক্ট করে বেড়ায়। এমন কিছু বলে যা নিজের বাবা অথবা স্বামীর সামনে বলার মতো সাহস হয় না। অনলাইনে এমনটা বলছে, যাকে সামনা-সামনি দেখলেও এমন বলার সাহস করত না সে। অমুক-তমুকের সাথে চ্যাটে-কমেন্টে এত হাসাহাসি, এত মজা যে, সবাই তাকে নিয়ে হাসতে বাধ্য হয়। কিন্তু দিনশেষে তাকে কেউ সম্মান করে না। দুঃখজনকভাবে সে নাকি পর্দাও করে!

এমন জামা পরে যেটা জালের মতো। সে মনে মনে ভাবছে পর্দা হচ্ছে। অথচ সবকিছু প্রকাশ পাচ্ছে সুস্পষ্টরূপে। যার সাথে কথা বলে তার চোখে চোখ রেখে বলে। কখনো চোখের দৃষ্টিতে অন্য কিছু মেশানো থাকে। গলার আওয়াজ খুবই মিষ্টি-মধুর। লিপ্ত হয় উষ্ণ কথাবার্তায়। সহকর্মী বলে কথা! অথচ সে নাকি পর্দানশিন!

সহকর্মীর পাশে বসে স্বামীর নামে গীবত করে। স্বামীর গোপনীয় কথাও বলে ফেলে; যাতে তার সাথে ফ্রি হওয়া যায়। অনেক গভীর বিষয়ও জানা যায়। দীর্ঘ চ্যাট শুরু হয়। দুজনের মাঝে তৈরি হয় অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু দিনশেষে কেউ কাউকে নিয়ে কবরে যাবে না। এমনকি মেয়েটার চোখে-ঠোঁটে মধু থাকলেও না; মেয়েটা সবচেয়ে সুন্দরী হলেও না।

ফেইক আইডি খুলে চ্যাট করতে থাকে। ভালোবাসার জালে আবদ্ধ হয়। রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে। উত্তেজনাকর কথাবার্তাও হয়। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ঠিকই হিজাব পরে। গরিবদের কাছে গিয়ে দান-সাদাকা করে। এই আশায় যে, কিয়ামতের দিন হয়তো জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচবে। তার পর্দা কেন তাকে অনলাইনের পর্দা করাতে পারল না?

কণ্ঠটা বেশ কর্কশ। কিন্তু ছেলেদের সাথে কথা বলার সময় কঠিনতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কণ্ঠ হয়ে যায় বিড়ালের মতো। ফোন ধরার সাথে সাথে মিষ্টি গলায় কথা বলে। মাঝে মাঝে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নেয়। বেশ পারদর্শী অভিনেত্রী। আচ্ছা, কেন এত রকমফের? সবাই কি পর্দা করছে আদৌ? এ রকম দৃশ্যপট আমরা সবাই দেখেছি হয়তো। দেখে বুঝতে পেরেছি কিছু একটা ঘাপলা আছে। পর্দার প্রকৃত অর্থ তারা বোঝেনি। হয়তো কেউ কেউ সত্যিই পর্দার অর্থ জানে না। এরা কি আসলেই পর্দানশীন? নাকি পর্দা করে, তবে...

📘 জীবন যদি হতো নারী সাহাবীর মতো 📄 সেই মুহূর্তগুলি

📄 সেই মুহূর্তগুলি


সেই মুহূর্ত যখন অজু করে বিনয়ের সাথে দাঁড়াই, সালাত শুরু করি তাকবির ধ্বনিতে। চোখ শীতল হয়, প্রশান্ত হয় অন্তর। সেই মুহূর্ত যখন হয়ে যাই এক সংরক্ষিত মুক্তোদানা। লম্বা বোরকায় নিজেকে আবৃত করে পথ চলি। কোনো মুগ্ধ দৃষ্টি আমায় কুরে কুরে খায় না, এ নিয়ে আমাকে ভাবতেও হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার জন্য যথেষ্ট।

সেই মুহূর্ত যখন মায়ের হাতে চুমু দিতে ঝুঁকে পড়ি। মা আমার প্রতি রাজি-খুশি হয়ে যান। আমি যখন অন্যদিকে ফিরি, তখন তার দুআ মেঘমালা ভেদ করে উড়ে চলে সুউচ্চ আসমানে। আমার মা তখন আসমানের রবের কাছে বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করেন। প্রশান্ত হয় আমার অন্তর। সেই মুহূর্ত যখন বাবা আমার চরিত্র নিয়ে গর্ব করেন। ভরসা রাখেন আমার আচার-ব্যবহারে, সততা ও বিশ্বস্ততায়। আমিও নিজেকে রক্ষা করে চলি, যেন তিনি আমাকে রেখে নিশ্চিন্ত মনে চলে যান। কারণ, তিনি জানেন আমি পবিত্র।

সেই মুহূর্ত যখন একজন নেককার বান্দা আমার সঙ্গী। আমরা একত্রে কুরআনের সুধা পান করি, আস্বাদন করি ঈমানের স্বাদ। একই সাথে ছুটে চলি রবের নির্দেশিত পথে। সেই মুহূর্ত যখন আমার হাত থাকে ইয়াতিমের মাথার ওপর, যখন এ হাত নিঃস্বদের সাহায্য করে, বোঝা বহন করে কোনো বিধবার। যখন তাদের সংকীর্ণতার মুহূর্তে আমি প্রশস্ত হয়ে দাঁড়াতে পারি। তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন পথে যখন হতে পারি এক ঝলক আলো।

সেই মুহূর্ত যখন হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা সংরক্ষণ করে রাখি নেক সঙ্গীর জন্য; যতক্ষণ না সে আসে, অবমুক্ত করে আমার পবিত্র অনুভূতি। সেই মুহূর্ত যখন আমি ব্যথিত মানুষের অশ্রু মুছে দিই, তাদের অন্তরে বুনে দিই আশার বীজ। যখন তার অশ্রুসিক্ত মুখে ফুটে ওঠে মুচকি হাসি। মনে মনে খুশি হই কল্যাণকর কিছু করতে পেরে। সেই মুহূর্ত যখন আমার মস্তক জমিনে ঠেকে। আমি সিজদা করি কেবল আমার রবের জন্যই, অন্য কারও জন্য নয়।

সেই মুহূর্ত যখন আমি জানতে পারি, আনন্দের মুহূর্ত দেরিতে হলেও আসবে। আমার সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা অপেক্ষমাণ আছে সেই আল্লাহর কাছে যিনি আমাকে আশাহত করবেন না। সেই মুহূর্ত যখন নিজের একাকিত্বেও মন খারাপ হয় না। কেননা আসমানে চাঁদও একাকী, তবু কী সুন্দর! সেই মুহূর্ত যখন আমি একা বসে বিনয়ের সাথে হাত তুলি। চাইতে থাকি মহান রবের কাছে। ফলে ধরা দেয় সুখ-সমৃদ্ধি। আমার চাওয়া-পাওয়া যেন এক প্রজাপতির মতো হয়ে যায়—তাড়া করলেই উড়ে যাবে যেন! কিন্তু রবের ওপর ভরসা করেছি আমি। তাই সে আবার অনুগত হয়ে আমার আঙুলের ওপরই বসবে।

সেই মুহূর্ত যখন আমি অনুভব করতে পারি—কোনো কিছুর জন্যই আমার ব্যথিত হওয়া মানায় না, কেবল আমার গুনাহর জন্য ছাড়া। তাই সর্বদা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ে চলি; হয়তো আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। সেই মুহূর্ত যখন নিজ হাত দিয়ে উপকারী কিছু করি। আঙুল দিয়ে তাসবিহ পাঠ করি। হাত দিয়ে দান করি অথবা কারও প্রতি দয়া করি কিংবা রবকে সন্তুষ্ট করে এমন কিছু লিখি। ফলে কিয়ামতের দিন এই হাতকে যখন আল্লাহ কথা বলতে বলবেন, তখন আমার পক্ষে সুপারিশ করার মতো কিছু পাব। এ হাত আমার সৎকর্মের বিবরণ দেবে। আবার আমি যে পাপ করেছি তা-ও তুলে ধরবে।

সেই মুহূর্ত যখন অনুভব করি গুনাহ করলেও, ভুল করলেও, দূরে সরে গেলেও সঠিক পথেই আছি। যতই হোঁচট খাই না কেন, দিনশেষে আমি গন্তব্যে পৌঁছাবই আল্লাহর ইচ্ছায়। কারণ, আমি যে সুপথ বেছে নিয়েছি। সিজদায় গিয়ে আমার রব, আমার প্রিয় পরম করুণাময়ের কাছে তা চেয়ে নিয়েছি।

সেই মুহূর্ত এই মুহূর্তের কথা লিখে শেষ করবার মতো নয়! কারণ, আল্লাহর আনুগত্যে এমন স্বাদ—যা বর্ণনা করা যায় না। আল্লাহকে মেনে চলায় এমন আনন্দ—যা ভাষায় রূপ দেওয়া সম্ভব না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px