📄 এই তো প্রথম!
সবকিছুরই একটা শুরু আছে। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার একটা 'প্রথমবার' আছে। প্রথম সন্তানের জন্ম, প্রথম পা ফেলা, প্রথম বুলি ফোটা, প্রথম কোনো পুরস্কার জেতা, স্ত্রীর প্রতি প্রথম ভালোবাসা, কিংবা স্বামীকে দেখে প্রথম হৃৎকম্পন। এই তো প্রথম আনন্দ!
আমরা যদি বারবার না ভাবি, চিন্তা-ফিকির না করি, তাহলে আমরা বুঝে উঠতে পারি না যে, এটাই প্রথম ছিল! মাঝে মাঝে এমন একজনের প্রয়োজন পড়ে, যে আমাদের দেখিয়ে দেবে এই আনন্দ-অনুভূতি আজই প্রথম। আসলেই! এই প্রথমবারের মতো আমরা অনুভব করছি!
আবার দুঃখ-বেদনা-কষ্টও তো প্রথমবারের মতো হয়ে থাকে! কখনো কি প্রিয়তম রাসুলের কথা ভেবে দেখেছি? প্রথম যখন ওহী নেমে এলো, তখন কি তিনি সচকিত হয়ে উঠেছিলেন! কেমন ছিল সে অনুভূতি? যখন প্রথমবারের মতো দেখেছিলেন দিগন্ত-বিস্তৃত জিবরিলের ডানা, তখন কেমন ছিল তার অনুভূতি?
তায়েফের যাত্রা শেষে ফিরে আসছিলেন যখন, যখন নুড়িপাথরের নিক্ষেপে পা দুটো ক্ষতবিক্ষত, গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত, যখন কোনোমতে ছুটে গিয়ে প্রবেশ করেছিলেন উতবা-শাইবার বাগানে; তখন কেমন ছিল তার অনুভূতি? সেই কি ছিল প্রথমবারের ব্যথা? কেঁদেছিলেন কি প্রিয় রাসুল? শৈশবে যখন মায়ের মৃত্যু-সংবাদ পেলেন তিনি, কেমন ছিল সেই আঘাত? যেদিন প্রথম জেনেছিলেন তিনি ইয়াতিম, তখন কি কেঁদেছিলেন?
কেমন ছিল আল্লাহর ভয়ে প্রথম ক্রন্দন? প্রথম যে বার তাকিয়েছিলেন আসমানের পানে, কেমন ছিল সেই পবিত্র দৃষ্টি? যুদ্ধে যখন হারালেন পবিত্র দাঁত, সেই অনুভূতি কেমন ছিল? আর তার চোখের অশ্রু? যখন খাদিজার মৃত্যুর সংবাদ শুনেছিলেন প্রথমবার? তখনই-বা কেমন ছিল তার অনুভূতি? হিজরতের সময় সাথে ছিলেন আবু বকর। তাকে নিয়ে হেরা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাকে আশ্বাস দিচ্ছিলেন, অভয় দিচ্ছিলেন। কেমন ছিল সেই অনুভূতি?
হায়! কবে তার সাথে প্রথম দেখা হবে হাউজে কাউসারে? তার পবিত্র হাত থেকে কবে সেই পানি পান করার সৌভাগ্য হবে? কবে আল্লাহর সাহচর্য পাব প্রথমবারের মতো? আদৌ তাঁর নৈকট্য পাব কি? কপোল গড়িয়ে পড়া যে অশ্রুতে ভিজিয়ে দিলাম জমিন, সেই অশ্রু কি সত্যিই রবের ভয়ে? তাঁর ভয়ে কাঁদতে পারব কবে? কবে বুঝতে পারব এ অশ্রু কেবল তাঁরই জন্য?
সালাতের তিলাওয়াতে প্রথম খুশু-কবে অনুভব করব? কবে আমরা টের পাব, সালাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছি? তখন কি আমাদের আত্মাগুলো বুকের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বেরিয়ে আসবে? সাঁতরে বেড়াবে রবের সৃষ্টির মাঝে? তারপর আবার ফিরে আসবে সালাম ফেরানোর পর-হৃদয়-মন প্রশান্ত করতে!
কবে গুনাহ ছেড়ে দেবো প্রথমবারের মতো? খাঁটি তাওবা হবে কোনদিন? কবে ফিরে যাব আল্লাহর কাছে? কবে প্রথমবারের মতো দ্বীনের পথে চলব? প্রথম অনুভব করব ঈমানের স্বাদ, বিনয়ের প্রশান্তি? কবে কেবল তাঁরই জন্য সিজদায় অবনত হয়ে অনুভব করব তাঁরই সাহচর্য?
প্রথমবারের মতো একবার পুলসিরাতে দাঁড়াতেই হবে। আমরা কি প্রস্তুত সেই প্রথম পা ফেলতে? প্রথমবারের মতো কবরে যেতেই হবে, একাকী। প্রথমবার দেখা হবে রবের সাথে! যখন একজন আহ্বানকারী ডাকবে, 'হে জান্নাতবাসী! তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে!' রহমানের সাথে সেই মুহূর্তটা কেমন হবে! আর আমিই-বা এমন কে, যে আল্লাহ সুবহানাহুর সাথে সাক্ষাতে ধন্য হব?
তখন আমি এগিয়ে চলব সানন্দে, হৃষ্টচিত্তে, মাথা উঁচু করে। যে চোখ দিয়ে কোনো হারাম দেখিনি, সেই চোখ তুলে তাকাব। আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দেবেন। তাকিয়ে থাকব অপলক। প্রাণভরে দেখব তাঁকে। ভেতরটা কেঁপে উঠবে, বিনয়ে হব নতজানু। অনুভূত হবে এক অনাবিল, অপার্থিব প্রশান্তি; প্রথমবারের মতো। চোখ বন্ধ করতে পারব না, পারব না মাথা নাড়াতে। এমনকি নিঃশ্বাসও হয়তো থেমে যাবে! দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে আনন্দের অশ্রুধারা!
কী চমৎকার অনুভূতি হবে, প্রথমবারের মতো আল্লাহকে দেখা!
📄 প্রিয়জন আলিঙ্গনে
মানুষমাত্রই আলিঙ্গন খোঁজে। কখনো মায়ের আলিঙ্গন, কখনো বাবার। কখনো-বা অতি আপন কারও উষ্ণ আলিঙ্গনের প্রতীক্ষায় দিন কাটে। কেউ আশায় থাকে প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলিঙ্গনের। হেরা এক নিশ্ছিদ্র নীরবতা আর রহমতের গুহা। জনমানুষ থেকে বহুদূরে। পাহাড়টা যেন ভয়মিশ্রিত অনুগ্রহে আলিঙ্গন করেছে এই গুহাটিকে। গুহাটা নিজ কোলে জায়গা দিয়েছে হাবিবুনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। তিনি সেখানে বসে ভাবেন, ইবাদত করেন, স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হন।
জিবরিল আলাইহিস সালাম নবিজির কাছে এসেছেন ওহি নিয়ে। ধ্বনিত হয়েছে 'ইকরা' বাণী। আল্লাহ তাকে সুন্দরভাবে কুরআন তিলাওয়াতের আদেশ দিয়েছেন। এক প্রিয়জন পড়ে শোনাতে এসেছেন আরেক প্রিয়জনকে। জিবরিল জড়িয়ে ধরলেন নবিজিকে। নবিজি তখন কেঁপে অস্থির। কাঁপছেন আর কাঁপছেন। এক সংকটময় পরিস্থিতি! ভয়াবহ অনুভূতি! অবশেষে তাকে ছেড়ে দিলেন জিবরিল। আর বললেন— পড়ো, তোমার সৃষ্টিকর্তার নামে; যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
এক মহান ফেরেশতার আলিঙ্গনের পরপরই সৃষ্টির সেরা মানুষের কাছে অবতীর্ণ হলো কুরআনের প্রথম আয়াত। জিবরিল তাকে ভালোবেসেছেন; কারণ, আল্লাহ যে তাকে ভালোবাসেন! মহান আলিঙ্গন! একসময় ওই পরিস্থিতির অবসান ঘটে। জিবরিল অদৃশ্য হয়ে যান। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছুটে যান নিজ ঘরে। কম্পিত, ভীত-সন্ত্রস্ত ও গলদঘর্ম। ফিরে চলেন স্ত্রীর আলিঙ্গনে। 'আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।'
আমাদের মা খাদিজা তার গায়ে জড়িয়ে দেন পশমের চাদর। কপাল থেকে মুছে দেন ঘাম। তাকে জড়িয়ে ধরেন, যাতে তিনি ভরসা পান। আবারও এক সম্মানিতা স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে আলিঙ্গন। এ আলিঙ্গন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশান্তি দেবার জন্য, তার মনে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। সম্মানের আলিঙ্গন!
যাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতার যুদ্ধে প্রাণপণে লড়ে শহিদ হলেন। জাফর ইবনু আবি তালিবও তার পরে ছুটে গেলেন। তুলে নিলেন পতাকা। সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন পুরোদমে। ডান হাত কাটা পড়ল। রক্ত গড়িয়ে পড়ল অবিরত। দৃঢ়তার সাথে পতাকা তুলে বাম হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। এবার বাম হাতও কাটা পড়ল। তাও হাল ছাড়েননি। দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন পতাকা। তাওহিদের পতাকা তখন শহিদের রক্তে সিক্ত। সে পতাকা জড়িয়ে ধরছেন তিনি। এ আলিঙ্গন তো সেই হৃদয়ের আলিঙ্গন-যা ভালোবেসেছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে, যাকে ভালোবেসেছেন স্বয়ং প্রিয় নবি! শাহাদাতের আলিঙ্গন!
তার শাহাদাতের খবর পৌঁছে গেল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। তিনি ছুটে গেলেন জাফরের সন্তানদের ঘরে। জড়িয়ে ধরলেন তাদের। আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন সবগুলো শিশুকে। তাদের চুম্বন করে কাঁদতে লাগলেন। অনুগ্রহের আলিঙ্গন!
আবু দুজানা। সাহসী অশ্বারোহী। দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। বীর যুবক। এক মহান সাহাবি। উহুদের যুদ্ধ চলমান। আবু দুজানার মাথায় একটা লাল পাগড়ি বাঁধা। হেলে-দুলে সদর্পে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সাহাসিকতার সাথে লড়াই করছেন। তরবারি উঁচু করে। বিস্ময়কর তার পারদর্শিতা। তাকে দেখলে যে-কেউ ভালোবেসে ফেলতে বাধ্য হতো।
উহুদের প্রান্তরে চলছে তীব্র যুদ্ধ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহত হলেন। রক্ত গড়িয়ে পড়ল তার মুখ বেয়ে। তাকে রক্ষা করতে হাজির পাঁচজন আনসার সাহাবি। সবাই শহিদ হয়ে গেলেন। শত্রু-শিবির ভেদ করে ঢুকে গেলেন আবু দুজানা। জড়িয়ে ধরলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। নিজের পিঠকে বানালেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঢাল। নিজের শরীর, পিঠ ও কাঁধ দিয়ে হিফাযত করছিলেন নবিজিকে। আঘাতের পর আঘাত সয়ে যাচ্ছিলেন। মনের ব্যথা চেপে রাখছিলেন! পিঠ বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ছে রক্তের স্রোত। পিঠ হয়ে গেছে সজারুর মতো, সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তিরের পর তির বিদ্ধ হচ্ছে। তবু ঝুঁকে পড়ে পবিত্র দেহটাকে রক্ষা করে চলেছেন নিজের দেহ বিলিয়ে। তার আত্মা তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য উৎসর্গীকৃত! ত্যাগের আলিঙ্গন!
'আপনার গলার আগে আমার গলা, হে আল্লাহর রাসুল!' বললেন আবু তালহা। মাথা উঁচু করে। ঘাড়টাকে যতদূর পারা যায় বিস্তৃত করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করার জন্য। দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের কাঁধ। তারা তখন আল্লাহর নবির দিকে গোল হয়ে তাকে কেন্দ্র করে মানব-প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। মুশরিকরা ঘিরে আছে চারদিক। তারা চেয়েছিল নবিজিকে কষ্ট দিতে। ভালোবাসার আলিঙ্গন!
এই সব আলিঙ্গন যেন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার সর্বোচ্চ নমুনা। তাদের প্রতিটি হৃৎস্পন্দন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার জানান দিচ্ছিল। নবিজির পাশে থাকতে পারার আনন্দে উষ্ণ ছিল তাদের মন। আমরা যেন তাদের চোখের সামনে দেখতে পাই। আমাদের প্রতিটি শব্দ, অর্থ ও কথাবার্তায় যেন অনুভব করি তাদের। টের পাই তাদের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। যেন আমরাই তারা, আর তারাই আমরা। তারা ভালোবেসেছিলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। সে জন্যই তাদের ভালোবাসি আমরা! হায় যদি তাদের জায়গায় আমরা হতাম অথবা তারা থাকত আমাদের সাথে! আল্লাহর রাসুল, আপনার সাথে সাক্ষাতের তীব্র বাসনা বুকে লালন করি। আপনার নুর, রহমত, সাক্ষাৎ, সঙ্গ ও ব্যক্তিত্বের আকাঙ্ক্ষী আমরা! আপনার চেহারা দেখতে অধীর আগ্রহী! আল্লাহ! আমরা চাই—আপনি তাদের সাথে আমাদের হাশর করুন। নবিজির পাশেই করুন, তার পেছনে, তারই পতাকাতলে থাকার তাওফিক দান করুন। ইয়া আল্লাহ! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমরা তাদের ভালোবাসি। আরও ভালোবাসি প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে।
টিকাঃ
১. সূরা আলাক, আয়াত: ১
📄 ভালোবাসার ছাপ
জীবনে চলার পথে প্রয়োজন একটু প্রশান্তির, একটু পর্যবেক্ষণের; পবিত্র হৃদয়ের ভালোবাসা অনুভবের। যাতে আমাদের হৃদয় ভরে যায় প্রশান্তিতে। মনের কোণে ভালোবাসার ছাপ তৈরি হয়। আমাদের মন যে রহমতের কেন্দ্রস্থল!
তাকে সুযোগ দিই। ধৈর্য ধরি কথা শেষ করা পর্যন্ত। নামিয়ে রাখি চোখ দুটো। অথবা তার দিকে তাকাই ভালোবাসার চোখে। তিনি তো আমারই বাবা। তার চেহারায় কাঠিন্যের ছাপ? যা সাময়িক! খানিক বাদেই মুচকি হাসিতে উদ্ভাসিত হবে তার মুখমণ্ডল।
তার অনুপস্থিতিতে কি খোঁজ-খবর নিই? হয়তো তার খামতি আছে, আমার সামাজিক অভাব পূরণ করতে পারেননি, তবু তার খোঁজ-খবর রাখা চাই। হয়তো তিনি তেমন নন, যেমনটা আমি চাই। হয়তো তিনি আমার বন্ধুদের মাঝে এক বিশাল বাধা। হয়তো কেউ খেয়ালও করবে না, তিনি আমার সাথেই চলাফেরা করছেন। তবু যেন মনে রাখি, তিনি অন্যরকম মানুষ নন; তবে তার চোখে আমি অন্যরকম। যখন তাকাব, অনুগ্রহভরে তাকাব। কথা বলব কেবল সাওয়াব অর্জনের জন্য। ভাষা হবে উত্তম, বিবাদে লিপ্ত হলেও। ইয়াতিমের কাঁধে-মাথায় বুলিয়ে দেবো মমতার পরশ।
প্রস্তুত হই তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন ভীত হয় আল্লাহর ভয়ে। সারা দুনিয়া রেখে দিই পেছনে। মনে মনে স্মরণ করি তাঁকে। গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাই। বিগলিত হই তাঁর সামনে। ঘোষণা দিই 'আল্লাহু আকবার'। মনের গহীনে গড়ি ভালোবাসার ছাপ।
মনোযোগী শ্রোতা হব। শান্ত হব, যাতে বুঝতে পারি। পড়ব, যাতে জানতে পারি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাহ পড়ব। তার নামে সালাত পাঠ করব প্রতি রাতে। তিনি যে আমাকে ভালোবাসেন। হয়ে যাব সাহাবিদের মতো, যাতে আমাদের সাথে তার দেখা হয় হাউজে কাউসারে, যাতে আমরা ধন্য হই তার সান্নিধ্যে।
ঠোঁট দুটো চেপে ধরি, যাতে এলোমেলো শব্দগুচ্ছ বেরিয়ে না পড়ে। এ শব্দেরা পবিত্র হৃদয়কে কলুষিত করে দেয়, মনকে কষ্ট দেয়, আঘাতে আঘাতে নিঃস্ব করে দেয়। নিঃশ্বাস নিই ভালোবাসার, কথা সাজাই উত্তম শব্দে।
তারা যেন আশাহত না হয় আমার ব্যাপারে। নিশ্চিতভাবে জেনে নিই তারা কী চাইছে আমার কাছে! দৃঢ় বিশ্বাস রাখি, তারা জানে যে আমি-ই পারব। যখনই তারা চাইবে, তখনই সেখানে থাকতে পারি যেন! জেনে নিই কীসে দেবো অগ্রাধিকার? কারণ, আমি তো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রত্যেকের চোখে আমিই সমগ্র পরিবার।
অর্ধাঙ্গীকে কষ্ট দিই না যেন। যাকে নিয়ে পূর্ণ হব, তাকে আঘাত দিই কী করে! আমরা দুজন তো এখন একজনই, দুই দেহে একই প্রাণ। আপন সত্তাকে কি আক্রমণ করা যায়? নিজেকে কি হত্যা করা যায়? আমিই তো সে! সে ই তো আমি!
তারা যেমনই হোক, ভালোবাসা হোক অফুরান। তাদের অপারগতায় জেরা করা অন্যায়। কেননা তারা বাঁচে ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন নিয়মে। সেসব থেকে তাদের আলাদা করে ফেলতে পারি না আমরা। হয়তো অমন অক্ষমতা আমারও আছে ভিন্নরূপে, তবে অন্যেরটা মেনে নিচ্ছি না কেন? আমি কি পারব নিজের দেহের আকৃতি বদলে নিতে? তবে লোকের পরিবর্তন চাইছি কেন!
এ সুন্দর বিশ্বজগৎ দেখি। দুনিয়ার দিকে তাকাই মুসাফিরের চোখে, যে মুসাফির প্রস্তুতি নিচ্ছে অনন্ত যাত্রার। ভ্রমণের পাথেয় গুছিয়ে নিতে ভুলি না যেন। যখন ব্যস্ত হয়ে যাব ওপারে সুন্দর বাড়ি বানাতে, তখন দয়ার্দ্র হব, ভালোবেসে যাব, আগুয়ান হব আখিরাতের পথে। আখিরাতই যে ধ্রুব সত্য!
📄 ফেরেশতাদের আলাপনে
তারা কথা বলছে। ফিসফিস করছে। সংবাদ বহন করছে। আনন্দচিত্তে এগিয়ে চলছে সুসংবাদ নিয়ে। একে অপরকে আহ্বান করছে তোমায় ভালোবাসতে। হ্যাঁ, এই যে তুমি পড়ছ আমার লেখা, তোমাকেই বলছি—তুমিই ফেরেশতাদের আলোচ্য বিষয়। তারা তোমার কণ্ঠস্বর চেনে। অন্ধকার রাতে এক দীর্ঘ সিজদায় কী চেয়েছিলে—সবই তারা শুনেছে। তোমার দু-চোখের অশ্রুধারা সাক্ষ্য দিচ্ছে তোমার পক্ষে। তারা চেনে তোমার সুন্দর চেহারা, যে চেহারা শেষরাতে ইস্তিগফার করে চলে। ফলে সৃষ্টি হয় এক মিষ্টি অবয়ব।
তুমি যে আল্লাহকে সিজদায় ডাকো, সেই ফিসফিসানি, তাওবা করার সময় তোমার চোখ বেয়ে যে অশ্রু ঝরে, যা তোমার মুখমণ্ডল আলোকিত করে দেয়, গুনাহ মুছে দেয়—তা-ও তারা চেনে। যতবার তুমি আল্লাহর কাছে ফিরে চলো, ততবার তোমার মুখে যে পবিত্র ছাপ ফুটে ওঠে—তা তারা জানে। গুনাহর পর তাওবা করার সময় যে আর্তনাদ তুমি করেছ, তাও তারা চেনে।
তোমার যে দয়ার্দ্র হাত ভালোবাসায় মায়ের কাঁধে, বাবার পিঠে পরশ বুলিয়ে দেয়, সসম্মানে দরিদ্রের হাতে কিছু গুঁজে দেয়, অনুগ্রহ ভরে ইয়াতিমের মাথা স্পর্শ করে, বিনয়ের সাথে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে ধরে যাতে তুমি পৌঁছে যাও জান্নাতের উচ্চ স্তরে—সে হাতও তারা চেনে বৈকি! তারা চেনে তোমার নজর। অজুর পানিতে নিয়ত সিক্ত চোখে যে নজর আছে, তা হারাম থেকে কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে তোমায়-তা তাদের জানা। যখন মন্দ দেখে চোখ নামিয়ে নিলে, তখনও তারা দেখেছে তোমায়।
তারা জানে তোমার হৃৎকম্পনের আওয়াজ। এ আওয়াজ বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে। হৃৎকম্পন যেন জানিয়ে দেয় ইবলিসের আক্রমণের কথা, যে আক্রমণের মাধ্যমে ইবলিস তোমাকে পাপাচারে লিপ্ত করতে চায়। আর তুমি সর্বদা আল্লাহর কাছে ধরনা দাও, তারই অনুগ্রহ কামনা করো। তুমি অজু করলে তোমার অন্তর সিজদা করে। কমে আসে তোমার হৃৎকম্পন। তাই তো সালাতে তুমি ধীর-স্থির হতে পারো! তোমার নাম-উপাধি নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা চলে। কারণ, তুমি যে তোমার রবকে ভালোবাসো! আর তিনিও যে তোমায় ভালোবাসেন!
» কারণ, তুমি যে সর্বদা প্রশংসা করো।
» কারণ, কুরআন শুনলে যে তোমার হৃদয়টা কেঁপে ওঠে।
» কারণ, তুমি যে আখিরাতকে ভয় পাও, তোমার রবের অনুগ্রহ চাও।
» কারণ, যিকিরের সময় তোমার হৃদয় বিগলিত হয়।
» কারণ, তুমি যে আল্লাহর চেহারা দেখার গভীর বাসনা ব্যক্ত করো।
» কারণ, তুমি যে সত্যবাদী বিশ্বস্তদের কাতারে হাশর চাও।
» কারণ, আল্লাহর দেওয়া নূরে আলোকিত হয় তোমার মুখ।
» কারণ, তুমি ভালোবাসো নেককারদের, বন্ধুত্ব পাতাও মুত্তাকিদের সাথে।
একটু অনুভবের চেষ্টা করো তো, ভাবো একবার-তুমি যেন ফেরেশতাদের কলমের খসখসানি শুনতে পাচ্ছ। তোমার ভাবনা, তোমার কর্ম, তোমার অনুভূতি-সবই তারা লিখে রাখছে। কল্পনায় পরিভ্রমণ করো সেদিকে। আরশের নিচে তুমি অপেক্ষা করতে থাকো। ভাবতে থাকো। মনোযোগ দিয়ে শোনো আর এদিক-সেদিক তাকাও। দেখতে পাবে এদিকে নুর, সেদিকে নুর, নুরের ছড়াছড়ি সর্বত্র। ফেরেশতারা সালাম দিয়ে ডাকছে তোমায়। তুমি অবাক হবে! তুমি তো তাদের চেনো না, কিন্তু তারা যে তোমায় চেনে। তুমি যে এ দুনিয়ায় ফেরেশতাদের বাতিতের বিষয়বস্তু!
কল্পনা করো-তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছ। এমন সময় তারা ঘিরে ধরেছে তোমায়। জানাচ্ছে সুসংবাদ। প্রশান্ত করে দিচ্ছে তোমার মন। কারণ, তারা যে তোমায় চেনে! কল্পনা করো যে-তারা তোমার পবিত্র আত্মা নিয়ে উড়ে চলেছে সুউচ্চ আকাশে। কল্পনা করো যে তুমি বিনীত হয়ে মাথা তুলছ। যে চোখ দিয়ে কখনো তুমি হারাম দেখোনি, সে চোখ ভরে আল্লাহকে দেখার জন্য চোখ তুলে তাকাচ্ছ! ইয়া আল্লাহ!
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা-আমরা কি আদৌ এতটা ভালোবাসা পাবার যোগ্য? আল্লাহ কি আমাদের ভালোবেসে ফেরেশতাকে ডেকে বলেন, 'জিবরিল! অমুককে ভালোবাসো। কেননা আমি তাকে ভালোবাসি।' সুবহানাল্লাহ! মেঘমালা বিদীর্ণ করে কি কোনো ফেরেশতার আওয়াজ শোনা যায়? যে আওয়াজে আসমানগুলো কেঁপে ওঠে, মেঘখণ্ড নড়ে ওঠে, নক্ষত্ররাজি জ্বলজ্বল করে। সে আওয়াজ কি উচ্চ আসমানে বলে ওঠে, 'তোমরা অমুককে ভালোবাসো; কেননা আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন।' ফলে ফেরেশতারা তোমাকে ভালোবেসে ফেলে।
আমাদের হৃদয়গুলো তীব্র কামনা ও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমাণ। চলো, আমরা ছুটে চলি। চলো, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য এগিয়ে চলি। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে আপনার ভালোবাসা প্রসারিত করে দিন। আপনি দৃষ্টিপাত করুন আমাদের প্রতি। আপনাকে দেখার সুযোগ করে দিন। আপনার সাথে সাক্ষাতের কামনা-বাসনা জাগিয়ে দিন। ইয়া ইলাহি! আমাদের বানিয়ে দিন ফেরেশতাদের আলাপের বিষয়!