📄 তিনি ও চাঁদ!
চোখ মেললেই যেন তাকে দেখতে পাই। স্নেহময় স্বামীর হাতে হাত রেখে তপ্ত বালুর ওপর হেঁটে চলেছেন তিনি। ক্ষীণকায় শরীরটা তার ঢাকা পড়েছে দীর্ঘাঙ্গ স্বামীর ছায়ায়। পালা করে গাধার পিঠে চড়েন তারা। কখনো কখনো দুজনেই নেমে হাঁটতে থাকেন। গাধাটার বিশ্রাম হয়। তার কোলে বাচ্চাটা ক্ষুধার তাড়নায় কেঁদেকেটে একাকার। কী করে দুধপান করাবেন বাচ্চাকে? কী উপায়ে বেড়ে উঠবে তার সন্তান? দুজনের অবস্থা তো একই রকম! মেঘ কী করে বৃষ্টি ঝরাবে, মেঘে যে জল নেই!
এসময় মাথায় মমতাভরা এক হাতের পরশ। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তার স্বামী। স্বামীর ভালোবাসা আর স্নেহের ঝরনাধারা প্রবাহিত হয় তার মনে। দুঃখ-দুর্দশা ভুলে যান। স্বামীর ঐকান্তিক সাহচর্যে প্রশান্তি অনুভূত হয়। কী যে খরা যাচ্ছে এ বছর! ফসলহীন একটা বছর। সব ফসল শুকিয়ে গেছে। প্রাণীর বাটেও দুধ নেই। ক্ষুধার্ত পেটগুলো খাবারের অপেক্ষায়। আত্মাগুলোও শুকিয়ে গেছে যেন। দুজনের চেহারায় হতাশার ছাপ স্পষ্ট। জীর্ণশীর্ণ, বয়স্ক গাধার পিঠে চলেছেন তারা। শিশুটা তখনও কেঁদেই চলেছে। ক্ষুধার জ্বালায় শরীরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। স্নেহভরে বাচ্চার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন তিনি।
সঙ্গীসাথিরা বিরক্ত। দম্পতিটি এ কাফেলার সবচাইতে ধীর গতির যাত্রী। তাদের গাধাটাও ক্লান্তিতে ম্রিয়মাণ। শিশুর নিরন্তর কান্না শুনে মাথা তুলে চাইছে সবাই। তাদের দৃষ্টিতে তিরস্কার, নারীদের মুখে বিরক্তির প্রকাশ। দুজন সব সয়ে যাচ্ছেন অতি কষ্টে। লোকেরা অবাক হয়ে তাকায়—লোকটা কেন এই দরিদ্র মেয়েটাকে ভালোবেসে আগলে রেখেছে? মহিলারাও বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে—এত দরিদ্র, আটপৌরে ছেলেটাকে কী করে মেয়েটা ভালোবাসে? দু-চোখ শুকিয়ে গেছে তার। আর কাঁদতে পারছেন না। তবু প্রিয়তম স্বামীর সহযোগিতা পেয়ে সিক্ত হয়ে ওঠে চোখের কোণ। চোখ বন্ধ করে ফেলেন তিনি। ধৈর্য ধরার চেষ্টা করেন ঢোক গিলে নিয়ে।
একসময় মক্কায় পৌঁছে যায় কাফেলা। নারীরা ঘরে ঘরে খুঁজতে শুরু করে দুগ্ধপোষ্য শিশু। শিশুকে দুধপান করিয়ে জীবিকা নির্বাহ হবে, প্রবাহিত হবে কল্যাণের ফল্গুধারা। সবার নজর ধনাঢ্য পরিবারের দিকে। ওদিকে সেই অসহায় দম্পতির জুটল এক ইয়াতিম শিশু। এমন শিশু পেয়ে বেশ মর্মাহত দুজন। স্বামীকে ফিসফিস করে স্ত্রী বললেন, 'যে শিশুর বাবা নেই, তার মা আমাদের কীই-বা উপকার করতে পারবে?'
অতঃপর সিদ্ধান্ত হলো এ শিশুকে রেখেই চলে যাবেন তারা। ততক্ষণে বাকি নারীরা একটা করে বাচ্চা পেয়ে গেছে। তারা কথা বলতে জানে। হাসিখুশি আলাপ জমিয়ে চেয়ে নিতে পারে। আর সেই ক্ষীণকায় নারী হালিমা—বাকি নারীদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন যোজন যোজন। তার পদচারণা ধীর, দক্ষতাও কম। নিজের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বিভ্রান্তের মতো খুঁজছেন অবিরাম। মনে মনে ভাবনা—'কেন আমি তাদের মতো না?'
এ সময় স্বামী তার দিকে ফিরে চাইলেন। স্বামীর পেছনে হাঁটছিলেন তিনি। দয়ার্দ্র সুরে স্বামী বললেন, 'সমস্যা নেই। তুমি সেই ইয়াতিমকে নিয়ে চলো। হয়তো আল্লাহ তার মাঝেই কল্যাণ রেখেছেন।'
সত্যিই তো! যে শিশুর বাবা নেই তার কী দোষ? তার রিযিক তো দেবে তার রব! দয়া-ভালোবাসা এসব কি কেবল ধনীদেরই পাওনা! রিযিকদাতা আল্লাহ কত মহান, কতই না পবিত্র তিনি! হালিমা লজ্জা পেয়ে ফিরে গেলেন সেই শিশুর কাছে। কোলে তুলে নিলেন ইয়াতিম শিশুটিকে; যাতে খালি হাতে ফিরতে না হয়, শুনতে না হয় মুখরা রমণীদের তিরস্কার।
তিনি জানতেন না, এক রূপোলি চাঁদকে কোলে বয়ে এনেছেন। শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে মনে হলো ছোট্ট শরীরটায় বুঝি চাঁদ এসে ধরা দিয়েছে! সেই চাঁদ-ঠিকরানো আলোয় নয়ন জুড়িয়ে গেল তার। দুঃখকষ্ট ভুলে গেলেন তিনি। শিশু-চেহারায়ও বুঝি এমন ব্যক্তিত্ব থাকে! ঝলমলে পবিত্র মুখ, নির্মল মুচকি হাসি; হালিমার হৃদয়-মন জয় করতে আর কী লাগে! পাশে কাঁদতে থাকা নিজের বাচ্চাটাও মুহূর্তের মাঝে স্থির হয়ে গেল। কে ছিল সেই শিশু? তিনি তো আল্লাহর প্রিয় হাবিব! প্রিয় রাসুল!
পবিত্র ও স্বচ্ছ দুধ রিযিকস্বরূপ পেলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। পান করে পরিতৃপ্ত হলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন, ছোট্ট হাতের পরশ রাখলেন হালিমার মুখে। এবার হালিমা নিজের বাচ্চাটাকে দুধপান করিয়ে ঘুম পাড়ালেন। দুজনকে পাশাপাশি শুইয়ে দিলেন। স্বামী পাশেই আছেন। তাকিয়ে আছেন অবাক বিস্ময়ে।
সুন্দর না?
খুবই সুন্দর!
মুচকি হাসিটা দেখেছেন?
কী মিষ্টি হাসি!
গন্ধ শুঁকেছেন?
একদম মিসকের মতো!
হাতের তালু দিয়ে স্পর্শ করলেন শিশুর মুখমণ্ডল! কী সম্মানজনক মুহূর্ত! তার আঙুল রাখলেন সেই ছোট্ট হাতের মাঝে। মুখটা মুখের কাছে নিয়ে এলেন। নাকে নাক ছোঁয়ালেন। তার বিশুদ্ধ শ্বাস নিজের বুকে টেনে নিলেন। কতই না সম্মান ও বরকতের ব্যাপার! এত মিষ্টি গন্ধ, ঠিক তার আত্মার মতো পরিশুদ্ধ।
চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া। বকরির ওলান দুধে ভরে উঠেছে। এ অবস্থায় উঠে গিয়ে দুধ দোহালেন তার স্বামী। পান করলেন মন ভরে। প্রিয়তমা হালিমার জন্যও কিছু দুধ নিয়ে এলেন। উত্তম এক রাত কাটালেন তারা। সকাল হয়ে এলো। আলোকিত হয়ে উঠল প্রিয়তম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা। তার পবিত্র বদন মন ভরে দেখল দুজনে। চেহারা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে যেন। পবিত্র ঠোঁট দুটোতে ভেসে উঠছে মায়াময় মুচকি হাসি।
স্বামী ফিসফিস করে বললেন, 'হালিমা, তুমি কি জানো, এক বরকতময় শিশুকে পেয়েছ তুমি?' রাসুলের চেহারার দিকে তাকালেন হালিমা, 'আমারও তা-ই মনে হয়। আশা করি, এ শিশুর মাঝেই আমাদের কল্যাণ!'
অতঃপর দুজনেই মক্কা থেকে বেরিয়ে এলেন সেই ক্ষীণকায় গাধার পিঠে চড়ে। হালিমা তার দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন নবিজি। তখনই ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা! গাধাটা অন্য সবার উটকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই তাকিয়ে আছে অবাক বিস্ময়ে! হালিমা হাসছেন, হাসছেন তার স্বামীও। বিস্ময়ে বলছেন, 'ইয়া আল্লাহ! কী বদান্যতা আর কী অনুপম বরকত আমাদের ওপর নেমে এসেছে!'
তা-ই তো হবার কথা! যারা অনাথ শিশুর প্রতি দয়া করে, তাদের ওপর বরকত নাজিল হবে না কেন? হালিমা ফিরে এলেন নিজ গোত্রে বানু সা'দের বসতিতে। জায়গাটা সবচাইতে অনুর্বর ও দুর্ভিক্ষপ্রবণ। কিন্তু তিনি যে চাঁদকে সাথে করে এনেছেন! প্রতি সকালে তার মেষগুলো চরতে যায়। সন্ধ্যায় ফিরে আসে। মেষের দুধপান করে পরিতৃপ্ত হন তারা; অথচ বাকিরা এক ফোঁটা দুধও পায় না। এমনকি তার সম্প্রদায়ের অন্য মানুষগুলো রাখালদের তিরস্কার করে। উপদেশ দেয় হালিমার মেষগুলোর সাথে নিজেদের মেষ চরাতে।
এভাবে কেটে যায় দুই দুটি বছর। নেমে আসে সুখ-প্রাচুর্য। অবতীর্ণ হয় অপরিসীম বরকত, এক সতীসাধ্বী নারীর ওপরে। কারণ, তিনি এক অনাথ শিশুর প্রতি রহমদিল হয়েছিলেন। তাকে কোলে তুলে দুধ পান করিয়েছিলেন। সদ্ব্যবহার করেছিলেন সেই বাচ্চাটার সাথে। অবশ্য স্বামীর দেওয়া উপদেশের ফলেই। দুজনে যেভাবে শিশুটির প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছিলেন, তাতে আল্লাহও তাদের প্রতি দয়ালু হয়েছিলেন।
এভাবে আমাদের ওপরও সুখ নেমে আসতে পারে, বর্ষিত হতে পারে বরকতের অমিয় ধারা। যদি কোনোদিন কোনো ইয়াতিম শিশুর প্রতি দয়া করি, খাইয়ে দিই নিজ সন্তানের মতো করে, পোশাক পরিয়ে দিই ঠিক তেমনি করে, যেমনটি নিজ বাচ্চাকে পরাই, পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় আমাদের অপ্রাপ্তিগুলোও ঘুচে যেতে পারে। এমনও হতে পারে, আমাদের কারও ভাগ্যে আল্লাহ সন্তান লেখেননি। এ এক বিশাল পরীক্ষা। এর মাঝে আল্লাহর কোন অনুগ্রহ লুকিয়ে আছে কে জানে! হয়তো গর্ভে সন্তান আসেনি, তবু মাতৃত্বের চেতনা তো সুপ্ত রয়ে গেছে! কোনো এক ইয়াতিমকে সেই মাতৃত্বের স্বাদ আমরা চাইলেই দিতে পারি।
হালিমা যে সুখ পেয়েছিলেন নবিজিকে মায়ের আদরে বড় করে, তার কি কোনো তুলনা চলে? তার মতো হবার চেষ্টা করেই দেখি না! চেষ্টা করি হালিমার মতো হতে।
📄 মিষ্টি জুঁই
মানুষটার পবিত্র চেহারা প্রতি মুহূর্তেই চোখে ভাসে তার। ভালোবাসা বেড়ে যায়। উথলে ওঠে প্রেমের জোয়ার! বিয়ের পর অল্পকটা দিন হলো মাত্র। ভাবতেও পারেননি কাউকে এতটা আপন করে নেবেন। মনে হচ্ছে যেন একে অপরের সেই কবে থেকে চেনা! তার স্নেহময় দৃষ্টি, উষ্ণ কণ্ঠ, পবিত্র বদন, উত্তম চরিত্র... চোখ ফেরানো দায়!
এরই মাঝে একদিন স্বামী বললেন, 'সব গুছিয়ে নাও প্রিয়তমা! আগামীকালই আমরা চলে যাব।' স্বামীর কথামতো কিছু কাপড় নিলেন তিনি। বুকভরা আশাকে সম্বল করে চলল প্রস্তুতি। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত; তবে তার দৃঢ় কাঁধে ভর করে ভরসা পেলেন যেন, 'দুশ্চিন্তা কোরো না, আমরা একসাথেই যাব।'
হিজরতের দিন সমস্ত শরীর আবৃত করে নিলেন জিলবাবে। হাঁটছেন সলজ্জ ভঙ্গিতে, স্বামীর পদচিহ্ন অনুসরণ করে। স্বামীর প্রতি তার একগুচ্ছ ভালোবাসা আর আনুগত্যের অনুভূতি। একটা হৃদয় অনুসরণ করছে আরেকটা হৃদয়কে। এই অনুসরণেই যেন হৃদয়ের প্রশান্তি। বলছিলাম আসমা বিনত উমাইসের কথা। নিজ দ্বীনের ওপর অটল থেকে স্বামী জাফরের সাথে হিজরত করেছিলেন হাবশা অভিমুখে। এক বিস্তৃত ধু-ধু প্রান্তর আর বালুময় পাথেয় ছিল তাওহিদের মর্মবাণী। তাওহিদকে আঁকড়ে ধরেই হিজরত করেছিলেন তারা।
দিনে সূর্যের প্রখর তাপ। সে তাপ হেরে গিয়েছিল জাফরের আলোকিত চেহারার কাছে। স্ত্রী তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে পারেননি। রাত্রির গূঢ় অন্ধকারেও তাকিয়ে ছিলেন অনিমেষ নয়নে। তার চেহারা যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো! রাত্রির নিকষ আঁধার তা কী করে ঢেকে দেবে?
আসমার প্রবাস জীবনটা তীব্র কষ্টে ঘেরা। তবু ধৈর্য ধরেছিলেন, আগলে রেখেছিলেন আপন হৃদয়কে। দীর্ঘ রাতগুলি পাড়ি দিয়েছিলেন আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হয়ে। পরিবার-পরিজন ছেড়ে সে সময় সঙ্গী কেবল কুরআন, স্বস্তি কেবল ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ। আল্লাহ এ চির-সবুজ হৃদয়ের ওপর দয়া করলেন। স্বামীর ঔরস থেকে একটি সন্তান উপহার দিলেন তাকে। প্রথম সন্তান। জীবনের প্রথম আনন্দ। নাম রাখা হলো আব্দুল্লাহ।
ছেলে সন্তানকে কোলে নিয়ে জাফরের চেহারায় ফুটে উঠল আনন্দের রেখা। ছেলেটা দেখতে ঠিক তারই মতো। আর তিনি তো প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো। মনে পড়ে গেল নবিজির বাণী, 'তোমার আকৃতি আর চরিত্র আমার মতো।' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাতের জন্য তার মন আনচান করে উঠল। ছেলেকে যতবার দেখেন ততবারই এ আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়। আসমাও যতবার দু-চোখ দিয়ে তার স্বামী-সন্তানকে দেখে, ততবারই মনে পড়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। তার নেক সাহচর্য পাওয়ার জন্য মন উদ্বেল হয়ে ওঠে। গোটা পরিবার রাসুলকে দেখতে উন্মুখ। মনের আকাঙ্ক্ষা বদ্ধ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধ্বনিত হয়, তীব্র থেকে তীব্রতর হয় সময়ের পালাবদলে।
দিন চলে যায়। এরই মাঝে আসমা জন্ম দিয়েছেন মুহাম্মাদ আর আওনকে। কলিজার তিনটা টুকরোকে গড়ে তোলায় শশব্যস্ত আসমা। একদিন খুশির সংবাদ এলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুহাজিরদের মদিনায় ফেরার আদেশ দিয়েছেন। খুশিতে উড়তে চাইল মনটা। সন্তানদের নিয়ে স্বামীর পদচিহ্ন অনুসরণ করলেন তিনি। সম্বল ছিল স্বামীর প্রতি ভালোবাসা আর আনুগত্য।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ফিরলেন প্রিয়জনদের কাছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির হলেন জাফর। নবিজি তাকে দেখে মুচকি হাসলেন, চুম্বন করলেন কপালে। তারপর বললেন, 'আল্লাহর কসম! জানি না, আমি কীসে বেশি খুশি-খাইবার বিজয়ে নাকি জাফরের আগমনে?' আসমার খুশির অন্ত ছিল না। সুস্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে ভালোবাসেন, তাকে ভালো না বেসে পারা যায়? শুধুই কি তা-ই? প্রিয় নবিজি আর নিজ সন্তানের চেহারায় কী ভীষণ সাদৃশ্য! মনে আশা রাখলেন, ছেলেটা যাতে চরিত্রেও প্রিয় নবির মতো হয়। এর চেয়ে মর্যাদার আর কী হতে পারে! কিন্ত জীবন তো অবিমিশ্র সুখের হয় না। জীবনে বিপদ আসে, পরীক্ষা হানা দেয়। আর তারা দুজনে তো কেবল জান্নাতের জন্যই বাঁচেন। বিপদাপদ আর ধৈর্য পরীক্ষায় উন্নীত হয়ে তবেই না জান্নাত!
মুসলিম সেনাবাহিনীর মুতার যুদ্ধের ঘটনা। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে আল্লাহ আসমার প্রিয়তম, জীবনের স্পন্দন স্বামীকে শাহাদাতের জন্য কবুল করে নিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার গৃহে এলেন। চেহারায় ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত। আসমা অনুভব করতে পেরেছিলেন কিছু একটা হয়েছে! হৃদয় কেঁপে উঠছিল তার। অন্তরের মাঝে এক অজানা ভয় কষ্ট দিচ্ছিল নিরন্তর। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। ইয়াতিম বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে তাদের শরীরের ঘ্রাণ নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন পরম মমতায়। পবিত্র চোখ দুটি বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁদছেন!
'হাবিবুল্লাহ! কীসে আপনি এত ব্যথিত?'
আসমা কাছে এলেন। তার হৃদয়ে আশঙ্কা। মনে মনে যা ভয় করছিলেন তা-ই বুঝি হলো। ক্ষীণ সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! কী আপনাকে কাঁদাচ্ছে? জাফর বা তার সাথিদের কোনো সংবাদ পেয়েছেন কি?'
'হ্যাঁ, তারা আজ মারা গিয়েছে।'
প্রিয়তমকে হারিয়ে আসমার হৃদয় ভেঙে চুরমার। বিচ্ছেদের বেদনায় কেঁদে উঠলেন তিনি। দুজনার হৃদয় ছিল এক সুতোয় গাঁথা। আজ সে বাঁধন ছিঁড়ে জাফর পাড়ি জমিয়েছেন অন্য জীবনে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধবা সাহাবিকে সান্ত্বনা দিলেন। দুআ করে দিলেন।
আমাদের প্রিয় আসমা সবর করলেন। ধৈর্যধারণ করলেন। রবকে আঁকড়ে ধরলেন হৃদয় দিয়ে। কষ্ট ঢেকে নিলেন দুআর চাদরে। সাওয়াব কামনা করলেন তীব্র মনেঃকষ্টের বিনিময়ে। স্বামী যেমন আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন, তেমন শহিদ হওয়ার জন্য দুআ করে চললেন। একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে তার ছেলেকে সালাম দিয়ে বলেন-
হে দুই ডানাওয়ালার ছেলে, আসসালামু আলাইকা।
আসমা রাযিয়াল্লাহু আনহা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মর্মার্থ বুঝতে পারলেন। তার স্বামী দুটি কাটা হাত দিয়ে তাওহিদের পতাকা উড্ডীন করে রেখেছিলেন, যাতে তা জমিনে পড়ে গিয়ে পদদলিত না হয়। সেই দুটি হাতের পরিবর্তে আল্লাহ তাকে দুটি ডানা দিয়েছেন। এ ডানা দুটিতে ভর করে তিনি যেখানে ইচ্ছে উড়ে যেতে পারেন। প্রিয়তমা বুঝতে পারলেন তার প্রিয়তম এখন জান্নাতে উড়ে বেড়াচ্ছেন।
তাই হতাশ হননি, ভেঙে পড়েননি একেবারেই। তিন ছেলেকে গড়ে তোলার জন্য ধৈর্য ধরে গেলেন। বেশ কিছুদিন না গড়াতেই তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। প্রিয়তমা উম্মু রুমানকে মাত্রই হারিয়েছেন আবু বকর। আসমা তো সিদ্দিকের মতো কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারেন না। বিয়ে করে চলে গেলেন সিদ্দিকে আকবরের ঘরে; ঈমান ও আখলাকের আলোয় আলোকিত হতে আর ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতার প্রলেপ মেখে দিতে। সেই ঘরে একটি ছেলে সন্তান হলো আসমার।
আসমা ছিলেন অনুগত একনিষ্ঠ স্ত্রী। রাসুলের দিয়ে যাওয়া খিলাফত নামক আমানতের দায়িত্ব পালনে আবু বকরকে সাহায্য করতেন তিনি। ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতেন। আল্লাহর কাছে কামনা করতেন পুণ্য। তিনি ছিলেন স্নেহময়ী, প্রিয়তমা, করুণাময়ী ও মহান হৃদয়ের অধিকারী। কিন্তু এ সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। একসময় স্বামী অসুস্থ হলেন। তীব্র মাত্রায় পৌঁছাল তার অসুস্থতা। কপালে ঘাম জমে গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রকৃত মুমিনের মতো অনুভব করতে পারলেন মৃত্যুর নৈকট্য। তাড়াতাড়ি অসিয়ত করে গেলেন। স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস যাতে তাকে গোসল করান। আরও একটা অসিয়ত ছিল তার। আসমা যেন তার বিদায়ের দিনে সিয়াম না রাখেন। আবু বকর বলেছিলেন, 'এটা তোমার জন্য অধিক শক্তিদায়ক।'
আবু বকরের মৃত্যু সন্নিকটে। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' ও 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পড়ে চললেন আসমা। ইতঃপূর্বে আল্লাহ তাকে যেমনিভাবে দৃঢ় রেখেছেন, তেমনই দৃঢ় রইলেন তিনি। স্বামীর থেকে মুখ ফেরালেন না আসমা। স্বামীর চেহারা বিবর্ণ হয়ে আসতে লাগল। একসময় রূহ চলে গেল সৃষ্টিকর্তার কাছে। স্ত্রীর চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। হৃদয় বিগলিত হলো। বিদীর্ণ হলো অন্তর। তবু আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে কিছুই উচ্চারণ করলেন না। ধৈর্য ধরলেন আরও একবার। বিনিময়ে আল্লাহর কাছে নেকী কামনা করলেন।
স্বামীর দেওয়া দায়িত্ব পালন করলেন তারপর। তাকে যে বড় বিশ্বাস করে এ দায়ভার দিয়ে গেছেন আবু বকর! দুঃখ-কষ্ট-বেদনাক্লিষ্ট হয়েও গোসল করালেন স্বামীকে। তবে ভুলে গেলেন দ্বিতীয় অসিয়ত। সাওমরত রয়ে গেলেন আসমা। মুহাজিররা এলে তাদের বললেন, 'আমি সাওম রেখেছিলাম। আজ তো খুবই শীত। আমার কি আজ গোসল করতেই হবে?'
'না।' তারা উত্তর দিল।
দিনের শেষভাগে মনে পড়ে গেল স্বামীর অসিয়ত। এখন কীই-বা করার আছে? দিন তো প্রায় শেষ। কিছুক্ষণ পরই সূর্য ডুববে, সিয়াম পালনকারীরা ইফতার করবে। এখন কি স্বামীর অসিয়ত অনুসারে আমল করবেন? হ্যাঁ, তা-ই করলেন। মারা যাওয়ার পরও স্বামীর আনুগত্য করলেন। পানি নিয়ে এসে তা পান করে সাওম ভেঙে ফেললেন স্বামীর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণে!
বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি পরবর্তীতে ওয়াদা ভঙ্গের সাওম পালন করব না।'
শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। ঘরে থেকে গড়ে তুলতে লাগলেন জাফর ও আবু বকরের ছেলেদের। দুই-দুইবার স্বামী হারানোর যন্ত্রণা উপশমে আঁকড়ে ধরলেন সন্তানদের। আসমা দুআ করতেন-যাতে আল্লাহ তাদের নেককার করেন, তাদের দ্বারা মানুষকে উপকৃত করেন আর মুত্তাকিদের সর্দার হিসেবে তাদের কবুল করে নেন। দিন কেটে গেল। এবার দুই ডানা ওয়ালা জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাই আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু এলেন বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে। কিছুটা দ্বিধার পর রাজি হলেন আসমা; যাতে আলি নিজ ভাতিজাদের প্রতিপালনে ভূমিকা রাখতে পারে। আসমা আলির সাথে চলে গেলেন তার ঘরে। নেককার স্ত্রী হলেন আসমা। আলিও ছিলেন তার উত্তম স্বামী। আলির চোখে আসমার সম্মান দিনে দিনে বেড়ে চলল। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘরে বড় হচ্ছে জাফর ও সিদ্দিকের সন্তানেরা! কী সম্মানজনক ব্যাপার!
দিন চলে যায়। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন দেখতে পেলেন জাফরের এক ছেলে মুহাম্মাদ ইবনু আবু বকরের সাথে তর্ক করছে। একে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছে। জাফরের ছেলে বলছে, 'আমি তোমার থেকে বেশি মর্যাদার অধিকারী। আমার বাবা তোমার বাবা থেকে উত্তম।'
আলি বুঝতে পারলেন না কী বলবেন তাদের। কীভাবে দুজনের মাঝে সন্তোষজনক মীমাংসা করে দেবেন। ডাকলেন তাদের মা আসমাকে। তাকে বললেন, 'তাদের মাঝে বিচার করো।'
'আমি আরবের মাঝে জাফর থেকে উত্তম কোনো যুবক দেখিনি, আর আবু বকর থেকে উত্তম কোনো বৃদ্ধ দেখিনি।' প্রজ্ঞা আর উপস্থিত বুদ্ধির ওপর ভর করে আসমা তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন। ব্যস! ঝগড়া থেমে গেল মুহূর্তেই। বাচ্চা দুটো আবার গলায় গলা মিলিয়ে খেলাধুলায় মত্ত হয়ে গেল। আর আলি! তিনি তো চমৎকার বিচার দেখে চেয়ে রইলেন বুদ্ধিমতী স্ত্রীর দিকে। বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। আসমার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল তার।
উসমান ইবনু আফফানের পর মুসলিমরা খলিফা হিসেবে বেছে নিল আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। আসমা আবারও কোনো এক আমিরুল মুমিনিনের স্ত্রী হতে পারলেন। চতুর্থ খলিফা আলির স্ত্রী এবার তিনি। অথচ তার জীবনে বারবার নেমে এসেছিল পরীক্ষা। তবু আমাদের প্রিয় এই সাহাবিয়্যা দৃঢ় ছিলেন। ধৈর্যধারণ ও সালাতের মাধ্যমে প্রিয় রবের কাছে সাহায্য চেয়ে গেলেন। স্বামীহারা নারীদের জন্য ধৈর্যের উত্তম প্রতীক তিনি। আসমা বেঁচে ছিলেন জুঁই ফুলের ডালের মতো। জাফরের মৃত্যুর পর তিনি ছিলেন কচি তরুলতা। খরাপ্রবণ ভূমিতে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করছিলেন আপ্রাণ। জুঁই ফুল যেমনি পানির স্বল্পতা মেনে নেয়, ঠিক তেমনি জীবনের কষ্ট-দুর্ভোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন আসমা। যতবার তার অস্তিত্ব বিলীনের উপক্রম, ততবার আল্লাহ তাকে একটি ছায়া দিয়েছিলেন আশ্রয়ের জন্য। তাই জাফরের মৃত্যুর পর তার বিবাহ হয় সিদ্দিকের সাথে। তারপর আলির সাথে। রাযিয়াল্লাহু আনহুমা। জীবনের কষ্ট ও শত মানি মেনে নিয়ে সবাই দিয়ে গেছেন অফুরন্ত ভালোবাসা, স্নেহ, নিরাপত্তা আর দয়া।
আসমাও জুঁই হয়ে চারদিকে নিজের সুবাস ছড়িয়ে গেছেন; যে সুবাসে আত্মা-মন প্রশান্ত হয়। জান্নাতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আজীবন সবাইকে দিয়ে গেছেন ভালোবাসা। আমাদের মাঝে কেউ কি প্রিয়তমকে হারিয়েছি? হৃদয় কি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে স্বামীর বিরহে? যদি তা-ই হয়, তবে আমরা কেন আসমার মতো হয়ে যাই না? আমরা আসমার মতো হব। মিষ্টি জুঁইয়ের মতো।