📄 সবুজ হৃদয়
হৃদয় কখনো প্রেমে পড়ে, উদ্বেলিত হয় ভালোবাসায়। হৃদয় কখনো ব্যাকুল হয়ে ওঠে, জাগ্রত হয় গভীর ব্যথায়! দ্বীনের আলোয় আলোকিত হৃদয় চায় না নিচে নামতে। এ হৃদয় হারাম থেকে বিরত থাকতে চায়। নিজেকে রাখতে চায় পবিত্র। কিছু মানুষের হৃদয়গুলো সবুজ-শ্যামল। সেই সব হৃদয়ে হারাম কিছু আঘাত হানতে পারে না।
আমাদের গল্পটা এমন হৃদয় নিয়েই। দুটি পবিত্র হৃদয়ের ভালোবাসার গল্প। তারা উভয়েই এক বাড়িতে বেড়ে উঠেছে। ছেলের সাথে মেয়ের বাবার আত্মীয়তা ছিল। হালাল পন্থায় স্বপ্নপূরণের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল ছেলেটা। আর সেই মেয়েটা? অনুগ্রহে ভরপুর গৃহে শান্ত মনে বিচরণ করত সে। তাই দেখে উজ্জ্বল হতো বাবার মুখ। নরম পা ফেলে সে এগিয়ে যেত বাবার দিকে। প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বাবার পবিত্র হাতে চুম্বন করত। বাবাও তাকে জড়িয়ে ধরে উত্তম দুআ করে দিতেন। সে বাবার অনুগত। বাবাও তার প্রতি খুব খুশি, প্রচণ্ড ভালোবাসেন মেয়েকে। তাই তো তাকে 'মা' বলে ডাকেন!
মেয়ের বয়স আঠারোর কাছাকাছি। কী সুন্দর মেয়েটা! আমরা কি জানি, সেই মেয়েটি কে? মেয়েটি ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা, প্রিয় নবিজির কন্যা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জন্য একের পর এক প্রস্তাব আসে। আবু বকর এলেন। উমার এলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ফিরিয়ে দেন বিনয়ের সাথে। হয়তো কন্যার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিটিকে তিনি ভেবে রেখেছেন! সেই উপযুক্ত ব্যক্তিটি আর কেউ নন! আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু, নবিজির চাচাতো ভাই।
আলি দূর থেকে দেখে যেতেন সব। হৃৎকম্পন বেড়ে যেত তার। একবার মনকে ধরে রাখছেন, তো আরেকবার তা বিদ্রোহ করে বসছে! একপর্যায়ে আর না পেরে পবিত্র জবানে চেয়ে বসেন ফাতিমাকে; নিজের স্ত্রীরূপে, নয়নজুড়ানো সঙ্গিনীরূপে। সেদিন আলির বুকের ভেতরে চলছিল হাতুড়িপেটা। তবু সলজ্জ হয়ে বসেছিলেন রাসুলের পাশে। মুখে কোনো কথা নেই। জিহ্বা থেমে গেছে। ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন যেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন লজ্জায় আলি কিছু বলতে পারছে না। দয়ার্দ্র চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। নরম সুরে শুধালেন, 'ইবনু আবি তালিবের কী প্রয়োজন?' আলি মৃদু স্বরে জবাব দিলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতিমার কথা বলতে চাইছিলাম।'
কেমন করে যে কথাটা বলে ফেললেন আলি! হৃদয় কেঁপে চলছে অনবরত। ক্ষণিকের নীরবতা। উৎকণ্ঠায়, অপেক্ষায় সে নীরবতাকেও অসীম মনে হচ্ছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে নীরবতা ভাঙলেন অবশেষে। নরম সুরে বললেন, 'মারহাবান ওয়া আহলান।'
আলির হৃদয়ে সে কথা প্রবাহিত হলো শীতল ঝরনাধারার মতো। হৃদয় ধন্য হলো। ধন্য হলো সকল আবেগ-অনুূর্তি। আলি বুঝে গেলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনের কথা। তিনিও যে আলিকে জামাতা হিসেবে দেখতে চান! এই ছিল সূচনা।
বেশ কদিন পর আলি আবারও গেলেন প্রস্তাব নিয়ে। তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। মোহর ছিল একটি বর্ম। আলির মালিকানায় থাকা হুতামি নামক এক বর্ম! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে সাধ্যাতীত কিছু চাননি। অনুষ্ঠান করেননি গোটা শহর আলোকিত করে। ফাতিমাও পরেননি হীরক খচিত ঝলমলে পোশাক। অন্য মেয়েদের সাথে নিজেকে তুলনায় যাননি। চাননি কোনো জাঁকজমক। অহেতুক সব বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত ছিল তার বিয়ে। বিয়ে তো কোনো কেনাবেচা নয়। নয় কোনো ব্যাবসায়িক চুক্তি।
ফাতিমা এখন আলির ঘরের রানি! সবাই খুশি। খুশি না হয়ে কি পারে? এ যে রাসুলের চোখের মণির বিয়ে! আনসারি সাহাবিরা আয়োজন করল ওয়ালিমার। আনন্দঘন দিনটাতে ছড়িয়ে পড়ল পরিশুদ্ধ হৃদয়ের সুবাতাস। ওয়ালিমায় একত্রিত হলো নানা শ্রেণির মানুষ। এই উত্তম বিয়ের আনন্দে কে না শরিক হতে চায়! ইসলামি বিয়ের পরিবেশ তো এমনই! সাদামাটা অথচ আনন্দঘন আয়োজন। যে ঘরে বিয়ে হলো, তাতে ছিল না কোনো দামি আসবাব। অতিথিদেরও অভ্যর্থনা জানানো হয়নি দামি গালিচায়। দামি পাথর, বর্ণিল ছবি-কোনো কিছুরই বাড়াবাড়ি ছিল না সেখানে। ছিল শুধু একটা বিছানা, খেজুর পাতার বালিশ, আর চামড়ার পানপাত্র। এই তো বাড়ি! কী পবিত্র সেই বাড়ি!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গেলেন বর-কনের কাছে। পানি দিয়ে অজু সেরে সেই পানি ছিটিয়ে দিলেন আলির শরীরে। তারপর বললেন, 'আল্লাহ! আপনি তাদের মাঝে বরকত দিন। তাদের ওপর বরকত বর্ষণ করুন। তাদের বংশেও বরকত দান করুন।' ফাতিমা এগিয়ে গেলেন সলজ্জ পায়ে। সুতীব্র লজ্জায় কাপড়ে হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছেন যেন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শরীরে পানি ছিটিয়ে দিলেন। দুআ করে বললেন, 'ফাতিমা, আমার পরিবারের উত্তম মানুষটার সাথে বিয়ে দিলাম তোমায়!'
পিতা হয়ে কন্যার বিয়েতে বরকতের দুআ করে দিলেন, জানিয়ে দিলেন উত্তম ব্যক্তি বাছাইয়ে কসুর করেননি তিনি। আনন্দে দিন কেটে যাচ্ছিল তাদের। সুন্দর সব মুহূর্ত। সময় তাদের পানে চেয়ে মুচকি হাসল। ঘর আলো করে এলো হাসান, হুসাইন, উম্মু কুলসুম আর যাইনাব। ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা-মা খুশি। খুশি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নাতি-নাতনিরা ছিল তার নয়নের মণি। কী সুন্দর সংসার! কী সুন্দর জীবন!
এমন জীবন পেতে আমরা কেন ফাতিমার মতো হই না? তার মতো হলে হয়তো আমাদের জীবনেও আসত আলির মতো কেউ! ফাতিমার মতো লজ্জাশীল, পিতার অনুগত আর ঈমানদার হলে তবেই না আমরা আলির মতো কাউকে জীবনে পাব! আমাদের হৃদয় হোক সবুজ কুঁড়ির মতো, যা কেবল হালালের স্পর্শেই বেড়ে উঠবে। সমস্ত জঞ্জাল আর নোংরাকে এড়িয়ে আমরা হব ফাতিমার মতো!
টিকাঃ
১. 'ওয়ালিমা' হচ্ছে বিয়ের পর ছেলেপক্ষ কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠান যেখানে আত্মীয়সুজন, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গরিব-মিসকিনদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করানো হয়। বাংলাদেশে এটা 'বউভাত' নামে পরিচিত। 'ওয়ালিমা' নবিজির একটি সুন্নাহ।
📄 ভালোবাসার বাগান
বাগানটা সবাই এক নামে চেনে। বিশাল বাগানে নানারকম গাছ। গাছে গাছে ফলমূল ঝুলছে মণি-মুক্তোর মতো। হাত বাড়িয়ে ফল ছিঁড়ে নেয় মেয়েটা। মিষ্টতা আস্বাদনের আগে পরখ করে নেয় এর সৌন্দর্য। শুকরিয়া জানাতে কসুর করে না সে। এসবই যে তার রবের দেওয়া নিআমত! নিজেদের বিশাল বাগানে পায়চারি করছে সে। বাচ্চারা বাগানে ছুটোছুটি করছে, হাসছে, খেলছে। চোখ জুড়িয়ে যায়। মুখে হাসি ফোটে।
অনেক দিন হলো স্বামী বাড়ি আসছে না। তবু মেয়েটার মনে এতটুকু খেদ নেই, আনন্দের কমতি নেই। হৃদয়টা তার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আকাশের মতো বিশাল হয়ে সবাইকে আপন করে নিচ্ছে, কাছে টেনে নিচ্ছে এক অপরিসীম মমতায়। ঠিক বাগানটার মতো। বাগান যেমন শত শত খেজুর গাছ ধারণ করে নিয়েছে নিজের বুকে! মদিনার প্রত্যেক ব্যাবসায়ীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই সব চমৎকার খেজুর। সুবিশাল প্রাসাদ, সৌন্দর্যমন্ডিত বাগান—সবই ছিল তাদের আলোচনার বিষয়। মেয়েটাও এ বাগানকে ভালোবেসেছিল খুব।
এরই মাঝে ঘটে গেল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। যার সাক্ষী হয়ে রইল মেয়েটা। সাক্ষী হয়ে রইল সম্মানিত ফেরেশতারা। সাক্ষী হয়ে রইল উপস্থিত সবাই। ঘটনার শুরু এক বালকের অস্ফুট কান্নার আওয়াজে। বালকটি কাঁদছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন মেয়েটির স্বামী আবুদ্-দাহদাহ, সুবিশাল সেই বাগানের মালিক। জানতে পারলেন বালকটি ইয়াতিম। হৃদয় গলে গেল তার। বালকের জন্য কিছু একটা করতে ব্যাকুল হলেন তিনি।
ইয়াতিম বালক কান্নাজড়িত কণ্ঠে নবিজিকে তার কষ্টের কথা জানিয়েছিল, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! নিজ বাগানের চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ করছিলাম আমি। কিন্তু প্রতিবেশীর একটা খেজুর গাছ আমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনুরোধ করলাম আমাকে যেন খেজুর গাছটা দিয়ে দেয় অথবা বিক্রি করে দেয়। সে রাজি হলো না।'
এবার প্রতিবেশীকে তলব করা হলো। স্বয়ং আল্লাহর রাসুল তাকে অনুরোধ করলেন গাছটা দান করে দিতে, নতুবা বিক্রি করে দিতে। সামান্য এক খেজুর গাছই তো! ছেলেটা যে ইয়াতিম! ওদিকে প্রতিবেশী নাছোড়বান্দা। আবারও বালকের চোখে অশ্রুর ঢল। বিনীত চাহনিতে নবিজির ফয়সালার অপেক্ষায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার নতুন প্রস্তাব দিলেন, 'এটা বিক্রি করো; বিনিময়ে জান্নাতে পাবে একটি খেজুর গাছ।'
এত সুন্দর প্রস্তাব! নিশ্চয়ই সে এখনই গ্রহণ করে নিবে! সুসংবাদ শোনার জন্য উন্মুখ সবাই। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবারও অসম্মতি জানাল সেই প্রতিবেশী। বালক দুঃখ-শোকে কাতর। প্রতিবেশী বসে আছে সেখানেই। বেশ কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে। কিছু চোখে বিস্ময়, কিছু চোখে ক্রোধ, আবার কিছু চোখে তিরস্কার। সবকিছু উপেক্ষা করে সে নিজের মতে অবিচল।
আবুদ-দাহদাহর অন্তর খুলে গেল যেন! জান্নাতের আকাঙ্ক্ষী হয়ে নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি যদি খেজুর গাছটা কিনে ছেলেটাকে দিয়ে দিই তবে কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছ পাব?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলেন। এবার আবুদ-দাহদাহ ফিরলেন লোকটার দিকে। তাকে বললেন, 'আপনি কি আমার বাগানটা চেনেন?'
'হ্যাঁ।'
'তবে আমার বাগানের বিনিময়ে আপনার খেজুর গাছটা দিয়ে দিন।'
বেচাকেনা হয়ে গেল। দুনিয়ার বাগানের সাথে আখিরাতের বাগানের। আবুদ-দাহদাহ ছুটে চললেন নিজ গৃহে। বুকের ধুকপুকানি ছাপিয়ে যাচ্ছিল তার পদচারণাকে। স্ত্রীকে ডাকলেন। সে ডাক প্রতিধ্বনিত হলো মদিনার প্রাচীরে প্রাচীরে। ‘উন্মুদ দাহদাহ! বাগান থেকে বেরিয়ে এসো। এ বাগান আল্লাহর জন্য।’
উম্মুদ দাহদাহ বেরিয়ে এলো নিজের জগৎ থেকে। হাত থেকে ফেলে দিল সব ফলমূল। বাচ্চাদের মুখ থেকে মুছে দিল খাবারের অবশিষ্ট দাগ। হৃদয় তার স্বামীর আদেশ পালনে উদগ্রীব, রবের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যাকুল। কোনো প্রশ্ন করলেন না তিনি। কোনো আপত্তিও পেশ করলেন না। সন্তুষ্ট মনে স্বামীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন। এ সিদ্ধান্ত যে তাদের রবেরই জন্য!
উম্মুদ দাহদাহ বেরিয়ে এলেন দুনিয়ার বাগান থেকে। এগিয়ে চললেন আখিরাতের বাগানের দিকে। সফল সেই ক্রয়বিক্রয়! উত্তম সেই সন্তুষ্ট স্ত্রী! যে স্ত্রী তার স্বামীকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়তা করেন। যে স্ত্রী স্বামীর সিদ্ধান্তে তিরস্কার করেন না; এমনকি বাগানটা প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও!
আমাদেরও দুনিয়ার বাগান ছেড়ে বেরিয়ে আসা দরকার, তা সে যত সুন্দরই হোক না কেন! প্রিয় জিনিসগুলো রবের সামনে পেশ করবার এই তো সময়! উন্মুদ দাহদাহর মতো আমরাও এগিয়ে চলব আখিরাতের বাগিচার দিকে। আমরাও হয়ে যাব উন্মুদ দাহদাহর মতো।
📄 পবিত্র ফুল
এক পবিত্র ফুলের গল্প শোনাব আজ; যে ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা হবার অধিকার সবার ছিল না। সেই পবিত্র ফুলের মা ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা, আর বাবা প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সেই ফুল যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহা। যাইনাবকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে দিয়েছিলেন তার খালাতো ভাইয়ের সাথে। নাম তার আবুল আস ইবনুর রবী'। বিয়ের পর তিনি পেলেন এক ভালোবাসার ফুল, যার সুধা পানের অধিকার কেবল তারই।
একসময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাড়ে নবুওয়াতের দায়িত্ব এলো। প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু করলেন তিনি। আর তাতেই কাফেররা একাট্টা হয়ে গেল নবিজির বিরুদ্ধে। উঠে পড়ে লাগল তাকে কষ্ট দিতে। আবুল আসের কাছে গেল তারা। সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের পেশ করে প্রস্তাব দিল, তিনি যেন যাইনাবকে তালাক দিয়ে এদের কাউকে বিয়ে করে নেন। আবুল আস তার ফুলকে ছেড়ে যেতে চাননি। পবিত্র সে ফুল, ভালোবাসার ফুল। কেমন করে ছেড়ে দেবেন তাকে? বরং কাফিরদেরই ফিরিয়ে দিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তাকে তালাক দেবো না। কখনো তাকে ছেড়ে যাব না। তোমরা আমাকে আরবের যত মেয়েই দাও না কেন!'
সত্যিই তো! কী করে তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন? তিনি যে সেই পবিত্র ফুলের অমিয় সুধা পান করেছেন! দিন চলে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করেন। যাইনাব রয়ে যান নিজ স্বামীর কাছে। স্বামী তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি।
বদরের যুদ্ধের কথা। সে সময় আবুল আস কাফিরদের সাথে যোগ দিলেন। হলেন যুদ্ধবন্দি। মক্কাবাসীরা তাদের জন্য মুক্তিপণ পাঠাল। যাইনাব তার সবকিছু জমা করলেন। এমনকি মা খাদিজা গলার যে হারটা তাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাও! সব পাঠানো হলো। হাজির করা হলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে। হারটা দেখেই চিনে ফেললেন তিনি। হৃদয় গলে দ্রবীভূত। মনে পড়ে গেল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা। সাহাবিদের বুঝতে দেরি হলো না। তারা আবুল আসকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেইসাথে ফিরিয়ে দিলেন মা খাদিজার হার-সহ অন্যান্য মুক্তিপণ।
আবুল আস ওয়াদা দিয়ে গেলেন, বাবার কাছে হিজরতের জন্য স্ত্রীকে ছেড়ে দেবেন তিনি। আবুল আস মক্কায় ফিরলেন মুক্তি পাবার সুখস্মৃতি নিয়ে। আর যাইনাব? স্বামীর হৃদয়কে বশ করে মদিনার পথ ধরলেন। গর্ভে তখন একটি সন্তান। সে সন্তানকে হারাতে হলো যাত্রাপথেই। বুকের ভেতর এক ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। এ হৃদয়ের কান্না থামবার নয়।
দিনের পর দিন চলে যায়। অদৃশ্য প্রেমের জালে আটকা পড়ে আছেন দুজন। আবুল আস ব্যাবসা করতে বের হন। তার কাফেলা বন্দি হয় মুসলিমদের হাতে। তিনি পালিয়ে ছুটে আসেন মদিনায়। কড়া নাড়েন যাইনাবের দরজায়। হৃদয়ের স্পন্দনে কড়া নাড়ার আওয়াজ ঢেকে গিয়েছিল সেদিন। আবুল আস নিরাপত্তা চেয়ে বসেন তার পবিত্র ফুলের কাছে, ভালোবাসার ফুলের কাছে। যাইনাব তাকে ঘরে জায়গা দিয়ে মসজিদে বেরিয়ে আসেন। ঘোষণায় জানিয়ে দেন নিরাপত্তা দিয়েছেন আবুল আসকে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নেহভরা কণ্ঠে মেয়েকে নসীহা করেন, 'তার উত্তম আথিতেয়তা করো। তবে সে যেন তোমার কাছে না ঘেঁষে। তুমি তার জন্য হালাল নও।'
সলজ্জ কণ্ঠে যাইনাব জানান, 'তিনি তো তার অর্থকড়ি ফেরত চাইতে এসেছেন।'
নিজ গৃহে ফিরে যান যাইনাব। রবের আনুগত্য করে, বাবার কথা মেনে নিয়ে। একান্তে দুআ করে যাচ্ছিলেন দয়াময় আল্লাহর কাছে। তিনি যেন তার প্রিয়তমকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দান করেন। যাইনাব প্রিয়তমের মুখোমুখি হলেন। নিজের সৌরভে মাতোয়ারা হতে দিলেন না, সুধার পাত্র ছুঁতে দিলেন না। না যাইনাব তার জন্য হালাল, না তিনি যাইনাবের জন্য হালাল।
আবুল আস যাইনাবের থেকে সব অর্থকড়ি নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। মনে মনে ভাবছিলেন ইসলামের মাহাত্ম্যের কথা। সবাইকে অর্থকড়ি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি আবারও ছুটে চললেন মদিনায়। শাহাদাহ পাঠ করলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে এসে। অবশেষে বসন্ত নেমে এলো। পবিত্র ফুলের সুবাসে সুরভিত হলেন দুজনে। যাইনাব নিজেকে ধরে রেখেছিলেন। তার সুধা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন হালাল একজনের জন্য। অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর অনুমতির।
আমরা তার মতো হয়ে যাই না কেন? যতক্ষণ না দ্বীনদার জীবনসঙ্গীর দেখা মিলছে, নিজের সুবাস কাউকে পেতে দেবো না। হৃদয়-মনে প্রেমের ঝংকার উঠলেও নিজেকে ধরে রাখব। যেভাবে যাইনাব ধরে ছিলেন। তার মতো হয়ে যাব আমরা। পবিত্র ফুলের মতো।
📄 উন্ম ভালোবাসা
দিনগুলো সব একই রকম। রাতেও তেমন হেরফের নেই। এরই মাঝে কিছু সময় আসে, যা মনের মণিকোঠায় স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়। খুব সাধারণ এক দিনে বোনের মাথায় মাথা রেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছেন কখনো? অথবা ঘর গুছাতে গিয়ে ফিসফিসিয়ে কথা? কখনো পছন্দের খাবারটা ভাগাভাগি করে খেয়ে নেওয়া। কিংবা খুব প্রিয় জিনিসটা বোনের থেকে উপহার পেয়ে যাওয়া। যার বোন আছে সে জানে। সে-ই জানে কী করে বোনের ভালোবাসার পরশে সাধারণ দিনগুলি অসাধারণ হয়ে ওঠে। কখনো রাতের গল্পগুলো দীর্ঘ হয়। মোড় নেয় ভিন্ন কাহিনিতে। স্বপ্নেরা উড়তে থাকে। ভালোবাসা গভীর হয়। বোন থাকলে জীবন এমনই। ভালোবাসা আর পবিত্রতার মেলবন্ধনে অনুভূতিরা সতেজ হয়ে ওঠে।
আজ এক বোনের কথা বলব। বলব তার পবিত্র ও আনন্দঘন জীবনের কথা। বড় বোনের সাথে তিনি থাকতেন সম্মানিত গৃহে। গৃহে ছিল এক মহান আলো। না না, দুই-দুইটা আলো। আজকের গল্প উম্মু কুলসুমকে নিয়ে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা। তার জন্ম হয় নবুওয়াত প্রাপ্তির ছয় বছর আগে। যে সময় আরবের লোকেরা কেবল ছেলে সন্তান কামনা করত, সে সময় নবিজির তৃতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের জন্ম। তাকে নিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই আনন্দিত। আনন্দিত তার প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাও।
দিন চলে যায়। মেয়েরা বড় হয়। উম্মু কুলসুম ও রুকাইয়া দুজনই বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যান। তাদের বিয়ের প্রস্তাব দেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো দুই ভাই। সে চাচার নাম আব্দুল উয্যা, সবাই যাকে আবু লাহাব বলে চেনে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভের পর ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। অতঃপর কাফের নেতৃবৃন্দ তাকে কষ্ট দেওয়া শুরু করল আবু লাহাবের পরিবারের মাধ্যমে। নবিজির কন্যাদের তালাক দিলেন আবু লাহাবের পুত্রদ্বয়। দাম্পত্যজীবন শুরুর আগেই। ধৈর্য ধরলেন উম্মু কুলসুম। ধৈর্য ধরলেন রুকাইয়া।
দিন চলে গেল। রুকাইয়ার বিয়ে হলো উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে। হিজরত করে তিনি চলে গেলেন হাবশায়। প্রথমবারের মতো প্রাণের দোসরকে হারালেন উম্মু কুলসুম। হারালেন হৃদয়ের স্পন্দনকে। ছোট বোন ফাতিমা মায়াভরা চোখে তার দিকে চেয়ে আছে তখন। উম্মু কুলসুম তাকে কাছে টেনে নিলেন ভালোবাসার উষ্ণতায়। কাটতে থাকে নৈঃশব্দের রাত। কখনো কানে আসে ছোট বোনের মৃদু হাসি। জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো পাড়ি দিচ্ছেন তখন। মা-বাবার সাথে আবু তালিবের বাড়িতে বন্দি তিনি। খাবার নেই। অবরোধ চলছে। ঈমানের ওপর, ইসলামের ওপর অটল রইলেন বাবা-মার সাথে। কখনো অভিযোগ করেননি, করেননি কোনো অনুযোগ। ঘরের মাঝে ঠায় হয়ে ছিলেন প্রাচীরের মতো। নববি গৃহে সবাইকে উষ্ণ ভালোবাসায় আপন করে নিতে তিনি ছিলেন সদা তৎপর।
এরপর এলো এক বিষাদের দিন। ব্যথিত হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ব্যথিত হলেন উম্মু কুলসুমও। মহীয়সী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে বিদায় নিয়েছেন। এ ছিল এক তীব্র আঘাত, যে আঘাত শরীর-মন ভেঙে চুরমার করে দেয়। তবু ধৈর্য ধরলেন উম্মু কুলসুম। মায়ের ঘরে চলতে লাগলেন তারই দেখানো পথে। দেখভাল করতে লাগলেন ছোটবোন ফাতিমার। বাবার পাশে দাঁড়ালেন উষ্ণ ভালোবাসায়, নিঃশর্ত আনুগত্যে। নরম মন নিয়ে দৃঢ়তার ভান করে রইলেন উম্মু কুলসুম। সে দৃঢ়তায়ও ভাটা পড়ল একসময়। প্রিয় বাবার শরীরে কাফিররা যখন বালু নিক্ষেপ করল, তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। ছুটে গিয়ে ধুলোবালি ঝেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বাবা সান্ত্বনা দিলেন, 'কেঁদো না। আল্লাহ তো তোমার বাবাকে রক্ষা করবেনই।'
এখানেই শেষ নয়। অপেক্ষা করছিল আরও এক আঘাত। রুকাইয়া অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মৃত্যুর ক্ষণ ঘনিয়ে এলো তার। প্রিয় বোনকে হারিয়ে আবারও দুঃখকষ্টে জর্জরিত হয়ে পড়লেন উম্মু কুলসুম। হার মানলেন না তবু। মায়ের বিচ্ছেদে যেমন ধৈর্য ধরে ছিলেন, তেমনি বোনের বিচ্ছেদেও ধৈর্য ধরলেন। ছোট বোন ফাতিমাকে পরম ভালোবাসায় আগলে রাখলেন বাবার ঘরে। বাবাকে সমস্ত কাজে সাহায্য করে চললেন আগের মতো। সবকিছুতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ রইলেন।
অপরদিকে উসমান ইবনু আফফান স্ত্রী হারানোর বেদনায় কাতর, তার চেয়েও কাতর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদে। রুকাইয়ার মৃত্যুর এক বছর পেরিয়ে গেল। এ সময় উম্মু কুলসুমের সাথে তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন প্রিয় নবিজি। উসমান ইবনু আফফানের ঘরে দ্বিতীয় আলো হয়ে এলেন উম্মু কুলসুম। উসমানের চোখ জুড়িয়ে যায় উম্মু কুলসুমকে দেখে। উম্মু কুলসুমের চোখ জুড়িয়ে যায় উসমানের দর্শনে। স্বামীর সাথে ছয় বছর কাটে তার। সংসারে আসেনি কোনো নতুন অতিথি। এতেও তার কোনো অনুযোগ-অভিযোগ ছিল না। দৃঢ়তার সাথে ধৈর্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি। 'ধৈর্য'-ও তাকে ছেড়ে যেতে চায়নি। ধৈর্য তো ছিল তার আজন্ম পথ চলার সাথি, পরিচয়বাহী পতাকা।
একদিন তার শরীরেও রোগ বাসা বাঁধল। বিছানায় পড়ে ছটফট করতে লাগলেন উম্মু কুলসুম। নীরবে চলে গেলেন একসময়। ব্যথিত পিতা নিজের লুঙ্গি দিয়ে কাফনের কাপড় পরালেন তাকে। কবরের পাশে বসে কাঁদলেন অঝোরে। স্নেহময়ী কন্যার সাথে বিচ্ছেদের কান্না। স্ত্রী বিয়োগে কাঁদলেন তার স্বামী। বোনকে হারিয়ে কাঁদলেন ফাতিমা।
এক জীবনে কত কষ্টের সময়! বিবাহ-বিচ্ছেদ, মা-বোনের মৃত্যু, পিতার অপমান, নিঃসন্তান দাম্পত্যজীবন, শেষ জীবনে নিদারুণ শারীরিক কষ্ট। সব রকমের দুঃখ এক হৃদয়ে জড়ো হবার পরও সে হৃদয়ে আলোকচ্ছটা এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং সে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ভালোবাসার পরশ হয়ে। আমরা আজও তাকে স্মরণ করি। অনুভব করি তার উষ্ণ ভালোবাসা। তার জীবনের গল্প শুনে ভালোবেসে ফেলি তাকে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়েকে ভালোবাসি। ভালোবাসি উম্মু কুলসুমকে। বিপদে আপদে তার জীবন থেকে পাই ধৈর্যের প্রেরণা। উদ্বুদ্ধ হই উষ্ণ ভালোবাসায় সবকিছু আগলে রাখতে। আমরা হতে চাই তার মতো।