📄 হৃদয়ের আলোয়
রেস্তোরাঁর মৃদু আলোয় আহার সারছে এক দম্পতি। সাজানো গোছানো কক্ষে দামি চেয়ার-টেবিল পাতা। পায়ের তলায় নরম তুলতুলে গালিচা। বেশ কায়দা করে ছুরির ধারালো প্রান্ত দিয়ে মাংস কেটে নেয় মেয়েটা। একদম মুখের মাপমতো। আয়েশ করে মুখে পুরে দেয় মাংসের টুকরো। একদম নিখুঁত জীবনাচার, তবু যেন কীসের অভাব!
এই আকর্ষণীয় আহারের দৃশ্য থেকে এবার চলে যাই এক নারী সাহাবির জীবনে। আনসারি এক নারী সাহাবি। তার আছে সুন্দর এক দস্তরখানা। আর আছেন প্রিয়তম স্বামী-যিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন অপলক। স্ত্রীও ফিরে তাকাতে বাধ্য হন; সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায় তাতে। চোখে চোখে কথা হয়। স্বামী তার দরদমাখা কণ্ঠে কথা বলেন স্ত্রীর সাথে। স্ত্রীও প্রেমের দহনে দগ্ধ হয়ে ভালোবাসার কণ্ঠ শোনেন। তার স্বামী ছিলেন আনসারিদের মাঝে একজন দানশীল ব্যক্তি।
একদিনের কথা। স্ত্রীকে বিদায় জানিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে রওনা হয়েছেন। গন্তব্য-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিস। তার পবিত্র মুখ দেখতে, অনুপম সান্নিধ্যে ধন্য হতে কে না চায়! মজলিসে পৌঁছে সাহাবি জানতে পারলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর উম্মুল মুমিনিনদের তার জন্য খাবার তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। 'আমাদের ঘরে কেবল পানি আছে।' জবাব দিলেন উম্মুল মুমিনিনরা।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদিক-ওদিক তাকালেন। জানতে চাইলেন, 'কে তার মেহমানদারি করবে?' তাই তো! কে এই মর্যাদার অধিকারী হবে? কে প্রিয় নবিজির অতিথিকে আপ্যায়ন করবে? উদ্দীপনায় আমাদের নায়ক সাহাবির হৃদয়তন্ত্রী কেঁপে উঠছে বারংবার! তিনি চাইলেন সাওয়াবের অধিকারী হতে, মর্যাদা লাভ করতে। নবিজির ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এলেন। তিনি যে নিশ্চিত, স্ত্রী তাকে সাহায্য করবেই ইনশাআল্লাহ। মনে দ্বিধা না রেখেই সাহাবি বললেন, 'আমি!' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি হলেন। সাহাবিও অতিথিকে নিয়ে চললেন নিজ বাড়িতে, প্রিয়তমার কাছে।
দরজায় কড়া নাড়লেন আনসারি সাহাবি। হাসিমুখে স্ত্রীকে জানালেন অতিথির কথা। পরম নির্ভরতায় বললেন, 'রাসুলুল্লাহর অতিথিকে সম্মান দাও।' ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলেন তার প্রেমময়ী স্ত্রী। ঘরের সাদামাটা দেওয়ালটাতে অর্থহীন দৃষ্টি ঘুরল কতক্ষণ। তারপর লজ্জামাখা কণ্ঠে বলে উঠল, 'আমাদের কাছে শুধু বাচ্চাদের খাবারটুকুই আছে।'
সাহাবি নীরব রইলেন। তারপর মুচকি হেসে প্রত্যয়ের সাথে বললেন, 'খাবার প্রস্তুত করো। বাতিটা ঠিকঠাক করো। আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও।' স্ত্রী মেনে নিলেন বিনা বাক্যব্যয়ে। 'উফ্' বললেন না। আপত্তি করলেন না। স্নেহমাখা কণ্ঠে গল্প করতে লাগলেন সন্তানদের সাথে। ঘুম পাড়িয়ে দিলেন ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই। বুকটা যেন কষ্টে ফেটে যাবার উপক্রম। কিন্তু এ অতিথি যে যেনতেন কেউ নয়! ইনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতিথি। আর এখন তার স্বামীর অতিথি। দিশেহারা মায়ের হৃদয় শান্ত হলো-শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজে। ঘুমন্ত শিশুগুলোর নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে চলেছে। স্বামীর আনুগত্যের চেয়ে রবের আনুগত্যেই যেন প্রস্তুত হয়ে গেলেন এই নারী সাহাবি।
sাজালেন সামান্য দস্তরখানা। এ দস্তরখানায় নেই কোনো দামি পেয়ালার সমাহার। বসবার জন্য নেই কোনো নরম গদি। অভিজাত গালিচাও অনুপস্থিত। দস্তরখানা বিছিয়ে স্ত্রী চলে গেলেন বাতির কাছে। বাতি ঠিক করবার ভানে নিভিয়ে দিলেন ঘরের আলো। ওদিকে স্বামী-স্ত্রী সঙ্গ দিলেন অতিথিকে, আবছায়া অন্ধকারে অদৃশ্য খাবার খাওয়ার ভঙ্গিতে। নিখুঁত ছিল না কিছুই। তবু সুখ ছিল অন্তহীন। রাত চলে গেছে। তৃপ্তিসহকারে খেয়েছেন অতিথি। বাকিরা ক্ষুধার্ত, আস্বাদন করেছেন ত্যাগের মিষ্টি স্বাদ। পরদিন স্বামী গেলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানালেন, আল্লাহ তাদের কাজে বিস্মিত হয়েছেন, ভালোবেসেছেন।
ফিরে আসি নিজেদের জীবনে। আমাদের ঘরটাও হয়তো সেই নারী সাহাবির ঘরটির মতোই। হয়তো দামি আসবাব নেই। নেই দামি বাসনকোসন। আমাদের স্বামীও হতে পারে সাদাসিধে। সামান্য আয়ে চলে। এরই মাঝে আমরা কেন সুখ খুঁজে নিই না? দুনিয়াবি কিছুতে সুখ খোঁজার মতো বোকামি আর কী হয়! সুখ তো রবের সন্তোষে, যে সন্তোষ আসে স্বামী-স্ত্রীর একাগ্রতায়! সেই নারী সাহাবির কথা ভাবি। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে যিনি জ্বেলে দিয়েছিলেন হৃদয়ের আলো। অল্পে তুষ্ট থেকে আমরাও না-হয় হৃদয়ের আলোয় আলোকিত করি চারদিক! আমরাও না-হয় হয়ে যাই সেই নারী সাহাবির মতো!
📄 সবুজ হৃদয়
হৃদয় কখনো প্রেমে পড়ে, উদ্বেলিত হয় ভালোবাসায়। হৃদয় কখনো ব্যাকুল হয়ে ওঠে, জাগ্রত হয় গভীর ব্যথায়! দ্বীনের আলোয় আলোকিত হৃদয় চায় না নিচে নামতে। এ হৃদয় হারাম থেকে বিরত থাকতে চায়। নিজেকে রাখতে চায় পবিত্র। কিছু মানুষের হৃদয়গুলো সবুজ-শ্যামল। সেই সব হৃদয়ে হারাম কিছু আঘাত হানতে পারে না।
আমাদের গল্পটা এমন হৃদয় নিয়েই। দুটি পবিত্র হৃদয়ের ভালোবাসার গল্প। তারা উভয়েই এক বাড়িতে বেড়ে উঠেছে। ছেলের সাথে মেয়ের বাবার আত্মীয়তা ছিল। হালাল পন্থায় স্বপ্নপূরণের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল ছেলেটা। আর সেই মেয়েটা? অনুগ্রহে ভরপুর গৃহে শান্ত মনে বিচরণ করত সে। তাই দেখে উজ্জ্বল হতো বাবার মুখ। নরম পা ফেলে সে এগিয়ে যেত বাবার দিকে। প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বাবার পবিত্র হাতে চুম্বন করত। বাবাও তাকে জড়িয়ে ধরে উত্তম দুআ করে দিতেন। সে বাবার অনুগত। বাবাও তার প্রতি খুব খুশি, প্রচণ্ড ভালোবাসেন মেয়েকে। তাই তো তাকে 'মা' বলে ডাকেন!
মেয়ের বয়স আঠারোর কাছাকাছি। কী সুন্দর মেয়েটা! আমরা কি জানি, সেই মেয়েটি কে? মেয়েটি ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা, প্রিয় নবিজির কন্যা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জন্য একের পর এক প্রস্তাব আসে। আবু বকর এলেন। উমার এলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ফিরিয়ে দেন বিনয়ের সাথে। হয়তো কন্যার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিটিকে তিনি ভেবে রেখেছেন! সেই উপযুক্ত ব্যক্তিটি আর কেউ নন! আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু, নবিজির চাচাতো ভাই।
আলি দূর থেকে দেখে যেতেন সব। হৃৎকম্পন বেড়ে যেত তার। একবার মনকে ধরে রাখছেন, তো আরেকবার তা বিদ্রোহ করে বসছে! একপর্যায়ে আর না পেরে পবিত্র জবানে চেয়ে বসেন ফাতিমাকে; নিজের স্ত্রীরূপে, নয়নজুড়ানো সঙ্গিনীরূপে। সেদিন আলির বুকের ভেতরে চলছিল হাতুড়িপেটা। তবু সলজ্জ হয়ে বসেছিলেন রাসুলের পাশে। মুখে কোনো কথা নেই। জিহ্বা থেমে গেছে। ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন যেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন লজ্জায় আলি কিছু বলতে পারছে না। দয়ার্দ্র চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। নরম সুরে শুধালেন, 'ইবনু আবি তালিবের কী প্রয়োজন?' আলি মৃদু স্বরে জবাব দিলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতিমার কথা বলতে চাইছিলাম।'
কেমন করে যে কথাটা বলে ফেললেন আলি! হৃদয় কেঁপে চলছে অনবরত। ক্ষণিকের নীরবতা। উৎকণ্ঠায়, অপেক্ষায় সে নীরবতাকেও অসীম মনে হচ্ছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে নীরবতা ভাঙলেন অবশেষে। নরম সুরে বললেন, 'মারহাবান ওয়া আহলান।'
আলির হৃদয়ে সে কথা প্রবাহিত হলো শীতল ঝরনাধারার মতো। হৃদয় ধন্য হলো। ধন্য হলো সকল আবেগ-অনুূর্তি। আলি বুঝে গেলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনের কথা। তিনিও যে আলিকে জামাতা হিসেবে দেখতে চান! এই ছিল সূচনা।
বেশ কদিন পর আলি আবারও গেলেন প্রস্তাব নিয়ে। তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। মোহর ছিল একটি বর্ম। আলির মালিকানায় থাকা হুতামি নামক এক বর্ম! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে সাধ্যাতীত কিছু চাননি। অনুষ্ঠান করেননি গোটা শহর আলোকিত করে। ফাতিমাও পরেননি হীরক খচিত ঝলমলে পোশাক। অন্য মেয়েদের সাথে নিজেকে তুলনায় যাননি। চাননি কোনো জাঁকজমক। অহেতুক সব বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত ছিল তার বিয়ে। বিয়ে তো কোনো কেনাবেচা নয়। নয় কোনো ব্যাবসায়িক চুক্তি।
ফাতিমা এখন আলির ঘরের রানি! সবাই খুশি। খুশি না হয়ে কি পারে? এ যে রাসুলের চোখের মণির বিয়ে! আনসারি সাহাবিরা আয়োজন করল ওয়ালিমার। আনন্দঘন দিনটাতে ছড়িয়ে পড়ল পরিশুদ্ধ হৃদয়ের সুবাতাস। ওয়ালিমায় একত্রিত হলো নানা শ্রেণির মানুষ। এই উত্তম বিয়ের আনন্দে কে না শরিক হতে চায়! ইসলামি বিয়ের পরিবেশ তো এমনই! সাদামাটা অথচ আনন্দঘন আয়োজন। যে ঘরে বিয়ে হলো, তাতে ছিল না কোনো দামি আসবাব। অতিথিদেরও অভ্যর্থনা জানানো হয়নি দামি গালিচায়। দামি পাথর, বর্ণিল ছবি-কোনো কিছুরই বাড়াবাড়ি ছিল না সেখানে। ছিল শুধু একটা বিছানা, খেজুর পাতার বালিশ, আর চামড়ার পানপাত্র। এই তো বাড়ি! কী পবিত্র সেই বাড়ি!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গেলেন বর-কনের কাছে। পানি দিয়ে অজু সেরে সেই পানি ছিটিয়ে দিলেন আলির শরীরে। তারপর বললেন, 'আল্লাহ! আপনি তাদের মাঝে বরকত দিন। তাদের ওপর বরকত বর্ষণ করুন। তাদের বংশেও বরকত দান করুন।' ফাতিমা এগিয়ে গেলেন সলজ্জ পায়ে। সুতীব্র লজ্জায় কাপড়ে হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছেন যেন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শরীরে পানি ছিটিয়ে দিলেন। দুআ করে বললেন, 'ফাতিমা, আমার পরিবারের উত্তম মানুষটার সাথে বিয়ে দিলাম তোমায়!'
পিতা হয়ে কন্যার বিয়েতে বরকতের দুআ করে দিলেন, জানিয়ে দিলেন উত্তম ব্যক্তি বাছাইয়ে কসুর করেননি তিনি। আনন্দে দিন কেটে যাচ্ছিল তাদের। সুন্দর সব মুহূর্ত। সময় তাদের পানে চেয়ে মুচকি হাসল। ঘর আলো করে এলো হাসান, হুসাইন, উম্মু কুলসুম আর যাইনাব। ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা-মা খুশি। খুশি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নাতি-নাতনিরা ছিল তার নয়নের মণি। কী সুন্দর সংসার! কী সুন্দর জীবন!
এমন জীবন পেতে আমরা কেন ফাতিমার মতো হই না? তার মতো হলে হয়তো আমাদের জীবনেও আসত আলির মতো কেউ! ফাতিমার মতো লজ্জাশীল, পিতার অনুগত আর ঈমানদার হলে তবেই না আমরা আলির মতো কাউকে জীবনে পাব! আমাদের হৃদয় হোক সবুজ কুঁড়ির মতো, যা কেবল হালালের স্পর্শেই বেড়ে উঠবে। সমস্ত জঞ্জাল আর নোংরাকে এড়িয়ে আমরা হব ফাতিমার মতো!
টিকাঃ
১. 'ওয়ালিমা' হচ্ছে বিয়ের পর ছেলেপক্ষ কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠান যেখানে আত্মীয়সুজন, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গরিব-মিসকিনদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করানো হয়। বাংলাদেশে এটা 'বউভাত' নামে পরিচিত। 'ওয়ালিমা' নবিজির একটি সুন্নাহ।
📄 ভালোবাসার বাগান
বাগানটা সবাই এক নামে চেনে। বিশাল বাগানে নানারকম গাছ। গাছে গাছে ফলমূল ঝুলছে মণি-মুক্তোর মতো। হাত বাড়িয়ে ফল ছিঁড়ে নেয় মেয়েটা। মিষ্টতা আস্বাদনের আগে পরখ করে নেয় এর সৌন্দর্য। শুকরিয়া জানাতে কসুর করে না সে। এসবই যে তার রবের দেওয়া নিআমত! নিজেদের বিশাল বাগানে পায়চারি করছে সে। বাচ্চারা বাগানে ছুটোছুটি করছে, হাসছে, খেলছে। চোখ জুড়িয়ে যায়। মুখে হাসি ফোটে।
অনেক দিন হলো স্বামী বাড়ি আসছে না। তবু মেয়েটার মনে এতটুকু খেদ নেই, আনন্দের কমতি নেই। হৃদয়টা তার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আকাশের মতো বিশাল হয়ে সবাইকে আপন করে নিচ্ছে, কাছে টেনে নিচ্ছে এক অপরিসীম মমতায়। ঠিক বাগানটার মতো। বাগান যেমন শত শত খেজুর গাছ ধারণ করে নিয়েছে নিজের বুকে! মদিনার প্রত্যেক ব্যাবসায়ীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই সব চমৎকার খেজুর। সুবিশাল প্রাসাদ, সৌন্দর্যমন্ডিত বাগান—সবই ছিল তাদের আলোচনার বিষয়। মেয়েটাও এ বাগানকে ভালোবেসেছিল খুব।
এরই মাঝে ঘটে গেল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। যার সাক্ষী হয়ে রইল মেয়েটা। সাক্ষী হয়ে রইল সম্মানিত ফেরেশতারা। সাক্ষী হয়ে রইল উপস্থিত সবাই। ঘটনার শুরু এক বালকের অস্ফুট কান্নার আওয়াজে। বালকটি কাঁদছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন মেয়েটির স্বামী আবুদ্-দাহদাহ, সুবিশাল সেই বাগানের মালিক। জানতে পারলেন বালকটি ইয়াতিম। হৃদয় গলে গেল তার। বালকের জন্য কিছু একটা করতে ব্যাকুল হলেন তিনি।
ইয়াতিম বালক কান্নাজড়িত কণ্ঠে নবিজিকে তার কষ্টের কথা জানিয়েছিল, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! নিজ বাগানের চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ করছিলাম আমি। কিন্তু প্রতিবেশীর একটা খেজুর গাছ আমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনুরোধ করলাম আমাকে যেন খেজুর গাছটা দিয়ে দেয় অথবা বিক্রি করে দেয়। সে রাজি হলো না।'
এবার প্রতিবেশীকে তলব করা হলো। স্বয়ং আল্লাহর রাসুল তাকে অনুরোধ করলেন গাছটা দান করে দিতে, নতুবা বিক্রি করে দিতে। সামান্য এক খেজুর গাছই তো! ছেলেটা যে ইয়াতিম! ওদিকে প্রতিবেশী নাছোড়বান্দা। আবারও বালকের চোখে অশ্রুর ঢল। বিনীত চাহনিতে নবিজির ফয়সালার অপেক্ষায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার নতুন প্রস্তাব দিলেন, 'এটা বিক্রি করো; বিনিময়ে জান্নাতে পাবে একটি খেজুর গাছ।'
এত সুন্দর প্রস্তাব! নিশ্চয়ই সে এখনই গ্রহণ করে নিবে! সুসংবাদ শোনার জন্য উন্মুখ সবাই। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবারও অসম্মতি জানাল সেই প্রতিবেশী। বালক দুঃখ-শোকে কাতর। প্রতিবেশী বসে আছে সেখানেই। বেশ কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে। কিছু চোখে বিস্ময়, কিছু চোখে ক্রোধ, আবার কিছু চোখে তিরস্কার। সবকিছু উপেক্ষা করে সে নিজের মতে অবিচল।
আবুদ-দাহদাহর অন্তর খুলে গেল যেন! জান্নাতের আকাঙ্ক্ষী হয়ে নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি যদি খেজুর গাছটা কিনে ছেলেটাকে দিয়ে দিই তবে কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছ পাব?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলেন। এবার আবুদ-দাহদাহ ফিরলেন লোকটার দিকে। তাকে বললেন, 'আপনি কি আমার বাগানটা চেনেন?'
'হ্যাঁ।'
'তবে আমার বাগানের বিনিময়ে আপনার খেজুর গাছটা দিয়ে দিন।'
বেচাকেনা হয়ে গেল। দুনিয়ার বাগানের সাথে আখিরাতের বাগানের। আবুদ-দাহদাহ ছুটে চললেন নিজ গৃহে। বুকের ধুকপুকানি ছাপিয়ে যাচ্ছিল তার পদচারণাকে। স্ত্রীকে ডাকলেন। সে ডাক প্রতিধ্বনিত হলো মদিনার প্রাচীরে প্রাচীরে। ‘উন্মুদ দাহদাহ! বাগান থেকে বেরিয়ে এসো। এ বাগান আল্লাহর জন্য।’
উম্মুদ দাহদাহ বেরিয়ে এলো নিজের জগৎ থেকে। হাত থেকে ফেলে দিল সব ফলমূল। বাচ্চাদের মুখ থেকে মুছে দিল খাবারের অবশিষ্ট দাগ। হৃদয় তার স্বামীর আদেশ পালনে উদগ্রীব, রবের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যাকুল। কোনো প্রশ্ন করলেন না তিনি। কোনো আপত্তিও পেশ করলেন না। সন্তুষ্ট মনে স্বামীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন। এ সিদ্ধান্ত যে তাদের রবেরই জন্য!
উম্মুদ দাহদাহ বেরিয়ে এলেন দুনিয়ার বাগান থেকে। এগিয়ে চললেন আখিরাতের বাগানের দিকে। সফল সেই ক্রয়বিক্রয়! উত্তম সেই সন্তুষ্ট স্ত্রী! যে স্ত্রী তার স্বামীকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়তা করেন। যে স্ত্রী স্বামীর সিদ্ধান্তে তিরস্কার করেন না; এমনকি বাগানটা প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও!
আমাদেরও দুনিয়ার বাগান ছেড়ে বেরিয়ে আসা দরকার, তা সে যত সুন্দরই হোক না কেন! প্রিয় জিনিসগুলো রবের সামনে পেশ করবার এই তো সময়! উন্মুদ দাহদাহর মতো আমরাও এগিয়ে চলব আখিরাতের বাগিচার দিকে। আমরাও হয়ে যাব উন্মুদ দাহদাহর মতো।
📄 পবিত্র ফুল
এক পবিত্র ফুলের গল্প শোনাব আজ; যে ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা হবার অধিকার সবার ছিল না। সেই পবিত্র ফুলের মা ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা, আর বাবা প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সেই ফুল যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহা। যাইনাবকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে দিয়েছিলেন তার খালাতো ভাইয়ের সাথে। নাম তার আবুল আস ইবনুর রবী'। বিয়ের পর তিনি পেলেন এক ভালোবাসার ফুল, যার সুধা পানের অধিকার কেবল তারই।
একসময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাড়ে নবুওয়াতের দায়িত্ব এলো। প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু করলেন তিনি। আর তাতেই কাফেররা একাট্টা হয়ে গেল নবিজির বিরুদ্ধে। উঠে পড়ে লাগল তাকে কষ্ট দিতে। আবুল আসের কাছে গেল তারা। সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের পেশ করে প্রস্তাব দিল, তিনি যেন যাইনাবকে তালাক দিয়ে এদের কাউকে বিয়ে করে নেন। আবুল আস তার ফুলকে ছেড়ে যেতে চাননি। পবিত্র সে ফুল, ভালোবাসার ফুল। কেমন করে ছেড়ে দেবেন তাকে? বরং কাফিরদেরই ফিরিয়ে দিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তাকে তালাক দেবো না। কখনো তাকে ছেড়ে যাব না। তোমরা আমাকে আরবের যত মেয়েই দাও না কেন!'
সত্যিই তো! কী করে তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন? তিনি যে সেই পবিত্র ফুলের অমিয় সুধা পান করেছেন! দিন চলে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করেন। যাইনাব রয়ে যান নিজ স্বামীর কাছে। স্বামী তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি।
বদরের যুদ্ধের কথা। সে সময় আবুল আস কাফিরদের সাথে যোগ দিলেন। হলেন যুদ্ধবন্দি। মক্কাবাসীরা তাদের জন্য মুক্তিপণ পাঠাল। যাইনাব তার সবকিছু জমা করলেন। এমনকি মা খাদিজা গলার যে হারটা তাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাও! সব পাঠানো হলো। হাজির করা হলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে। হারটা দেখেই চিনে ফেললেন তিনি। হৃদয় গলে দ্রবীভূত। মনে পড়ে গেল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা। সাহাবিদের বুঝতে দেরি হলো না। তারা আবুল আসকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেইসাথে ফিরিয়ে দিলেন মা খাদিজার হার-সহ অন্যান্য মুক্তিপণ।
আবুল আস ওয়াদা দিয়ে গেলেন, বাবার কাছে হিজরতের জন্য স্ত্রীকে ছেড়ে দেবেন তিনি। আবুল আস মক্কায় ফিরলেন মুক্তি পাবার সুখস্মৃতি নিয়ে। আর যাইনাব? স্বামীর হৃদয়কে বশ করে মদিনার পথ ধরলেন। গর্ভে তখন একটি সন্তান। সে সন্তানকে হারাতে হলো যাত্রাপথেই। বুকের ভেতর এক ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। এ হৃদয়ের কান্না থামবার নয়।
দিনের পর দিন চলে যায়। অদৃশ্য প্রেমের জালে আটকা পড়ে আছেন দুজন। আবুল আস ব্যাবসা করতে বের হন। তার কাফেলা বন্দি হয় মুসলিমদের হাতে। তিনি পালিয়ে ছুটে আসেন মদিনায়। কড়া নাড়েন যাইনাবের দরজায়। হৃদয়ের স্পন্দনে কড়া নাড়ার আওয়াজ ঢেকে গিয়েছিল সেদিন। আবুল আস নিরাপত্তা চেয়ে বসেন তার পবিত্র ফুলের কাছে, ভালোবাসার ফুলের কাছে। যাইনাব তাকে ঘরে জায়গা দিয়ে মসজিদে বেরিয়ে আসেন। ঘোষণায় জানিয়ে দেন নিরাপত্তা দিয়েছেন আবুল আসকে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্নেহভরা কণ্ঠে মেয়েকে নসীহা করেন, 'তার উত্তম আথিতেয়তা করো। তবে সে যেন তোমার কাছে না ঘেঁষে। তুমি তার জন্য হালাল নও।'
সলজ্জ কণ্ঠে যাইনাব জানান, 'তিনি তো তার অর্থকড়ি ফেরত চাইতে এসেছেন।'
নিজ গৃহে ফিরে যান যাইনাব। রবের আনুগত্য করে, বাবার কথা মেনে নিয়ে। একান্তে দুআ করে যাচ্ছিলেন দয়াময় আল্লাহর কাছে। তিনি যেন তার প্রিয়তমকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দান করেন। যাইনাব প্রিয়তমের মুখোমুখি হলেন। নিজের সৌরভে মাতোয়ারা হতে দিলেন না, সুধার পাত্র ছুঁতে দিলেন না। না যাইনাব তার জন্য হালাল, না তিনি যাইনাবের জন্য হালাল।
আবুল আস যাইনাবের থেকে সব অর্থকড়ি নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। মনে মনে ভাবছিলেন ইসলামের মাহাত্ম্যের কথা। সবাইকে অর্থকড়ি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি আবারও ছুটে চললেন মদিনায়। শাহাদাহ পাঠ করলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে এসে। অবশেষে বসন্ত নেমে এলো। পবিত্র ফুলের সুবাসে সুরভিত হলেন দুজনে। যাইনাব নিজেকে ধরে রেখেছিলেন। তার সুধা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন হালাল একজনের জন্য। অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর অনুমতির।
আমরা তার মতো হয়ে যাই না কেন? যতক্ষণ না দ্বীনদার জীবনসঙ্গীর দেখা মিলছে, নিজের সুবাস কাউকে পেতে দেবো না। হৃদয়-মনে প্রেমের ঝংকার উঠলেও নিজেকে ধরে রাখব। যেভাবে যাইনাব ধরে ছিলেন। তার মতো হয়ে যাব আমরা। পবিত্র ফুলের মতো।