📄 ভালোবাসার মায়াজালে
জীবন থেকে একেকটা দিন চলে যায়। রেখে যায় তারিখ নামক কিছু সংখ্যা। ফিরে তাকিয়ে হিসেব করি, কতটা বছর পাড়ি দেওয়া হলো! আর কতটাই-বা বাকি আছে! মুহূর্তরা আসে, যায়—কখনো আনন্দের মোড়কে, কখনো আফসোস আর বিষণ্ণতার বার্তা নিয়ে। এভাবেই সময় কেটে যায়। নিস্তরঙ্গ জীবনে কখনো-বা আবেগের জোয়ার আসে মনে। বলে ফেলি, 'হায়! সাহাবিদের যুগে জন্মাতাম যদি!'
তাই কি কখনো হয়? সাহাবিদের যুগে জন্ম—সে কি আর সম্ভব! তবু এ প্রত্যাশা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই সিরাতের পাতায় পাতায়। নাই-বা হলাম তাদের সাথি, তাদের চিনে নিতে, জেনে নিতে তো বাধা নেই! জানতে গিয়ে ভালোবেসেছি উমারের ন্যায়পরায়ণতা, সিদ্দিকের কোমলতা, আলির প্রজ্ঞা, উসমানের বিচ্ছুরিত নূর আর বিলালের সুললিত কণ্ঠস্বর। রাযিয়াল্লাহু আনহুম।
শুধুই কি তা-ই? সে সময়ের মহীয়সী সব নারী সাহাবির কথাই-বা ভুলি কী করে! তাদের জীবনও যে প্রজ্বলিত নক্ষত্রের মতো আলো ছড়ায়! তাদের জীবনী যদি গভীরভাবে দেখতাম, তাহলে হয়তো আমূল বদলে যেতাম আমরা। প্রতিটি মুসলিম নারী হতাম এক-একজন নারী সাহাবিদের মতো।
আজ তেমনই এক নক্ষত্রের ন্যায় নারী সাহাবির গল্প বলব। বলব এক অনুগত কন্যার কথা। ছোটবেলায় বাবার সাথে আমাদের সম্পর্কটা কেমন ছিল মনে আছে? বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেই সালাম জানাতে দৌড়ে যেতাম। হাতের তালুতে চুমু এঁকে দিতেন তিনি। কোলে নিয়ে মুখে মিষ্টি তুলে দিতেন। অপলক তাকিয়ে দেখতেন মেয়ে তার মিষ্টি খাচ্ছে। গভীর মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, মুচকি হাসতেন। কালের পরিক্রমায় আমরা বেড়ে উঠেছি। বাবার স্নেহ ভালোবাসার রূপ বদলেছে। মূলটাও কি বদলেছে? নিশ্চয়ই না!
যে নারী সাহাবির গল্প বলব, তিনিও ছিলেন পিতার স্নেহ আর ভালোবাসায় ধন্য। তিনি হলেন আসমা বিনতু আবি বকর। হিজরতের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর পিতা আবু বকর লুকিয়ে ছিলেন সাওর পর্বতে। সে সময় তাদের জন্য পাথেয় বহন করে নিয়ে যেতেন আসমা। শত্রু আবু জাহল আসমার পিতা আর নবিজির অবস্থান জানতে মরিয়া তখন। আসমাকে জেরার মুখোমুখি হতে হলো। কিছুই বলেননি তিনি। ছিলেন হকের পথে অবিচল, অটল। জিজ্ঞাসাবাদ নীরবেই পার করে দিয়েছিলেন। আর তাই তো আবু জাহল রেগে চলে গিয়েছিল, সজোরে থাপ্পড় বসিয়েছিল আসমার গালে।
কী চমৎকারভাবেই না আসমা তার বাবার গোপনীয়তা রক্ষা করে গেছেন! আমরা মেয়েরা যখন সন্তানের ভূমিকায়, তখন তিনি হতে পারেন আমাদের আদর্শ। কষ্ট সইতে হলে সইব, ঠিক আসমা বিনতু আবি বকরের মতো। তবু জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে হিফাযত করে চলব। অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব, পবিত্র রাখব। 'ভালোবাসা'র নামে ছেলেরা যে মিথ্যে বন্ধুত্বের হাতছানি দেয় তা থেকে সাবধান হব।
এভাবে একদিন দেখব-বাবার কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বেড়ে গেছে। এমনকি বেড়ে গেছে আল্লাহর প্রতিদানও। আমরা হয়ত জানবও না, পিতার আনুগত্যে পরম করুণাময় আমাদের ভালোবাসতে শুরু করেছেন, ফেরেশতারাও ভালোবাসতে শুরু করেছেন তাঁরই ইশারায়। তাই বলছি, এদিক-সেদিক থেকে যত ফিতনাই ধেয়ে আসুক না কেন, আমাদের দৃঢ় থাকা চাই। যুগ তার আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে দিলেও আমাদের আসমা হয়ে থাকা চাই।
সেই আসমা, যে আসমা শুধু পিতার অনুগতই ছিলেন না, বিয়ের পর জীবনসঙ্গীর প্রেমেও মশগুল ছিলেন। তার হৃদয়-মন জানতে পেরেছিল প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ। স্বামী যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে ভালোবেসেছিলেন তিনি। অথচ যুবাইর ছিলেন দরিদ্র। তার ছিল একটি মাত্র ঘোড়া। আসমা ধৈর্য ধরে তা মেনে নিয়েছিলেন। ঘোড়ার দেখভাল করতেন। পানি বয়ে আনতেন। খেজুরের বীচি পিষতেন। সব ওই এক কারণে— আসমা ভালোবাসতেন তাকে। কোনোকিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ছিল না তার। তিনি ছিলেন উত্তম সহযোগী, প্রেমময়ী বিনম্র স্ত্রী। জীবিকার কষ্ট ও তীব্র বঞ্চনার মাঝেও ধৈর্যধারণকারী। আল্লাহ তাদের ওপর বর্ষণ করেছিলেন নিআমতের ফল্গুধারা।
আমাদের এমনই হওয়া চাই! যখন জীবনে একজন নেককার স্বামী আসবে, আমাদেরও নেককার স্ত্রী হওয়া চাই। আমরা হব আসমার মতো।
📄 হৃদয়ের হিজরত
মানুষের হৃদয়টা বড় অদ্ভুত। স্থান ও কালের গণ্ডি পেরিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে যখন খুশি, যেভাবে খুশি। মন চাইলেই এমন যুগে চলে যেতে পারে, যে যুগে সময়ের আকাশে ওড়াউড়ি করত কিছু পবিত্র হৃদয়। সেই হৃদয়েরা আলোর খোঁজে উড়তে উড়তে ছাড়িয়ে যেত মেঘমালায়।
আমরা এমনই এক নারীহৃদয়ের কাছাকাছি যাব আজ, যে নারী ঘোষণা করেছিলেন আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা। একাকী হিজরত করেছিলেন হৃদয় দিয়ে, সশরীরে। তিনি ছেড়ে গিয়েছিলেন বাবাকে। ছেড়ে গিয়েছিলেন নিজ পরিবারকে। ত্যাগ করেছিলেন অর্থসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি। সত্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে।
বলছিলাম প্রিয় উম্মু কুলসুম বিনতু উকবাহর কথা। অশান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয় যে দ্বীন, সেই দ্বীনকে ভালোবেসে উম্মু কুলসুম হিজরত করেছিলেন। বাবা-ভাইয়েরা তখন দুর্বল ও দাসদের অত্যাচারে লিপ্ত। অপরাধ একটাই—ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা। এমন এক পরিবারের সদস্য হয়েও নিজ পিতা উকবাহ, ভাই ওয়ালিদ আর উমারার দ্বারা এতটুকু প্রভাবিত হননি উম্মু কুলসুম। ফিরেও তাকাননি তাদের দিকে। বরং মুসলিমদের সাথেই বাকি জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আমাদেরও কি সুযোগ আছে তার মতো হবার? নিশ্চয়ই আছে। চারদিকে যখন ফিতনার জয়জয়কার; তখন কি মনটাকে ঘুরিয়ে দিতে পারি না আমরা? হৃদয়টাকে হিজরত করাতে পারি না? আমরা চাইলেই পারি। ভুলপথের দুয়ারগুলো যখন খুলে যায়, হাতছানি দিয়ে ডাকে, তখন আমরা আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হয়ে যাব। আসমানের পানে মাথা তুলব চোখটা বন্ধ রেখে। আল্লাহর সাথে অটুট বন্ধনে বুকে বইবে প্রশান্তির সুবাতাস।
উম্মু কুলসুমও এভাবেই হিজরত করেছিলেন। সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ঘর ছেড়ে। রওনা হয়েছিলেন মদিনার পথে। আর পেছনে ফেলে গিয়েছেন পরিবারের সম্মান, বাবার নিরাপত্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক। ডানে-বামে তাকিয়ে কোনো বাহন পাননি তিনি। একাকিনী পথ চলছেন। নিঃসঙ্গ যাত্রা। রাতের অন্ধকার এসে গ্রাস করেছে তাকে। রাতে নিকষ কালো আঁধার, আর দিনে ঝলসে দেওয়া সূর্যের প্রখর তাপ। তবু পেছন ফেরেননি উম্মু কুলসুম। ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়েছিলেন তাসবিহ পড়ে। জামার কোণাটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গিয়েছেন। দুর্গম এ পথে তার সঙ্গী ছিল নিজেরই হৃৎকম্পন। পায়ের তলার নরম বালুও নির্দয় আচরণ করেছিল। গ্রাস করে নিতে চেয়েছিল ছোট্ট পা দুটিকে। এতকিছুর মাঝেও পথ করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। পায়ে হেঁটে হিজরত করেছেন মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে। পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে, হিজরত-প্রত্যাশী হৃদয় নিয়ে।
আমাদের অবস্থাও ঠিক এমন। যখন আমরা দ্বীনকে আঁকড়ে ধরি, হিজাবে নিজেকে আবৃত করে নিই, নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চলি, জীবন কাটাই রবের আনুগত্যে; ঠিক তখনই আমাদের চারপাশটা বৈরী হয়ে ওঠে। তবু আফসোসের কিছু নেই। আমরা তো স্রষ্টার বেঁধে দেওয়া সীমার মাঝেই আছি!
আমরা যখন হারাম থেকে বাঁচতে হালালের খোঁজ করি, মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকি, পাপাচারের হাতছানিতে একটুও না টলে মুখ ঘুরিয়ে নিই, শয়তানের বিকৃত মুখে চপেটাঘাত করি, আমরা তখন সত্যিই একা, বড্ড একা! তবু আফসোসের কিছু নেই। আমরা তো ঠিক উম্মু কুলসুমের মতো একা, যিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন তার হিজরত-প্রত্যাশী হৃদয় নিয়ে।
অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন তিনি। চারপাশের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ঘিরে ধরেছিল তাকে। সেই আনন্দেও ভাটা পড়েছিল। হঠাৎ তার পরিবার হাজির। তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দাবি করে বসল উম্মু কুলসুমকে। তাদের যুক্তি ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তিটি। সে সন্ধিতে মক্কা থেকে আগত সকল মুসলিমকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল।
দুঃখকষ্টে ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল উম্মু কুলসুমের। উৎফুল্ল হৃদয়ে সহসাই জায়গা করে নিয়েছিল তীব্র যাতনা। আসমানের দিকে হাত তুলেছিলেন তিনি। মিনতি করেছিলেন তার রবের কাছে। আসমানে একটু নড়াচড়া। ফেরেশতারা পাখা ঝাপটাচ্ছে। বিশ্বস্ত জিবরিল আলাইহিস সালাম তার অন্তরের প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ নিয়ে আসছেন আল্লাহর বাণী-
যদি তাদের মুমিন নারী পাও তাহলে তোমরা কাফিরদের কাছে তাদের ফিরিয়ে দেবে না। তারা (মুমিন নারী) তাদের (কাফির পুরুষ) জন্য বৈধ না এবং তারা (কাফির পুরুষ) তাদের (মুমিন নারী) জন্য বৈধ না।
আল্লাহু আকবার! সাত আসমানের অধিপতি হিজরত-প্রত্যাশী হৃদয়টিকে শান্ত করেছিলেন। পুনরায় আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিলেন মনকে। এমনই ছিল আমাদের প্রিয় এই নারী সাহাবি। হয়তো সশরীরে নয়, আমাদের হিজরত হবে হৃদয়ে। হৃদয়ের হিজরতে আমরা হব উম্মু কুলসুমের মতো।
টিকাঃ
১. সূরা মুমতাহিনাহ, আয়াত: ১০
📄 হৃদয়ের আলোয়
রেস্তোরাঁর মৃদু আলোয় আহার সারছে এক দম্পতি। সাজানো গোছানো কক্ষে দামি চেয়ার-টেবিল পাতা। পায়ের তলায় নরম তুলতুলে গালিচা। বেশ কায়দা করে ছুরির ধারালো প্রান্ত দিয়ে মাংস কেটে নেয় মেয়েটা। একদম মুখের মাপমতো। আয়েশ করে মুখে পুরে দেয় মাংসের টুকরো। একদম নিখুঁত জীবনাচার, তবু যেন কীসের অভাব!
এই আকর্ষণীয় আহারের দৃশ্য থেকে এবার চলে যাই এক নারী সাহাবির জীবনে। আনসারি এক নারী সাহাবি। তার আছে সুন্দর এক দস্তরখানা। আর আছেন প্রিয়তম স্বামী-যিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন অপলক। স্ত্রীও ফিরে তাকাতে বাধ্য হন; সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায় তাতে। চোখে চোখে কথা হয়। স্বামী তার দরদমাখা কণ্ঠে কথা বলেন স্ত্রীর সাথে। স্ত্রীও প্রেমের দহনে দগ্ধ হয়ে ভালোবাসার কণ্ঠ শোনেন। তার স্বামী ছিলেন আনসারিদের মাঝে একজন দানশীল ব্যক্তি।
একদিনের কথা। স্ত্রীকে বিদায় জানিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে রওনা হয়েছেন। গন্তব্য-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিস। তার পবিত্র মুখ দেখতে, অনুপম সান্নিধ্যে ধন্য হতে কে না চায়! মজলিসে পৌঁছে সাহাবি জানতে পারলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর উম্মুল মুমিনিনদের তার জন্য খাবার তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। 'আমাদের ঘরে কেবল পানি আছে।' জবাব দিলেন উম্মুল মুমিনিনরা।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদিক-ওদিক তাকালেন। জানতে চাইলেন, 'কে তার মেহমানদারি করবে?' তাই তো! কে এই মর্যাদার অধিকারী হবে? কে প্রিয় নবিজির অতিথিকে আপ্যায়ন করবে? উদ্দীপনায় আমাদের নায়ক সাহাবির হৃদয়তন্ত্রী কেঁপে উঠছে বারংবার! তিনি চাইলেন সাওয়াবের অধিকারী হতে, মর্যাদা লাভ করতে। নবিজির ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এলেন। তিনি যে নিশ্চিত, স্ত্রী তাকে সাহায্য করবেই ইনশাআল্লাহ। মনে দ্বিধা না রেখেই সাহাবি বললেন, 'আমি!' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি হলেন। সাহাবিও অতিথিকে নিয়ে চললেন নিজ বাড়িতে, প্রিয়তমার কাছে।
দরজায় কড়া নাড়লেন আনসারি সাহাবি। হাসিমুখে স্ত্রীকে জানালেন অতিথির কথা। পরম নির্ভরতায় বললেন, 'রাসুলুল্লাহর অতিথিকে সম্মান দাও।' ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলেন তার প্রেমময়ী স্ত্রী। ঘরের সাদামাটা দেওয়ালটাতে অর্থহীন দৃষ্টি ঘুরল কতক্ষণ। তারপর লজ্জামাখা কণ্ঠে বলে উঠল, 'আমাদের কাছে শুধু বাচ্চাদের খাবারটুকুই আছে।'
সাহাবি নীরব রইলেন। তারপর মুচকি হেসে প্রত্যয়ের সাথে বললেন, 'খাবার প্রস্তুত করো। বাতিটা ঠিকঠাক করো। আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও।' স্ত্রী মেনে নিলেন বিনা বাক্যব্যয়ে। 'উফ্' বললেন না। আপত্তি করলেন না। স্নেহমাখা কণ্ঠে গল্প করতে লাগলেন সন্তানদের সাথে। ঘুম পাড়িয়ে দিলেন ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই। বুকটা যেন কষ্টে ফেটে যাবার উপক্রম। কিন্তু এ অতিথি যে যেনতেন কেউ নয়! ইনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতিথি। আর এখন তার স্বামীর অতিথি। দিশেহারা মায়ের হৃদয় শান্ত হলো-শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজে। ঘুমন্ত শিশুগুলোর নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে চলেছে। স্বামীর আনুগত্যের চেয়ে রবের আনুগত্যেই যেন প্রস্তুত হয়ে গেলেন এই নারী সাহাবি।
sাজালেন সামান্য দস্তরখানা। এ দস্তরখানায় নেই কোনো দামি পেয়ালার সমাহার। বসবার জন্য নেই কোনো নরম গদি। অভিজাত গালিচাও অনুপস্থিত। দস্তরখানা বিছিয়ে স্ত্রী চলে গেলেন বাতির কাছে। বাতি ঠিক করবার ভানে নিভিয়ে দিলেন ঘরের আলো। ওদিকে স্বামী-স্ত্রী সঙ্গ দিলেন অতিথিকে, আবছায়া অন্ধকারে অদৃশ্য খাবার খাওয়ার ভঙ্গিতে। নিখুঁত ছিল না কিছুই। তবু সুখ ছিল অন্তহীন। রাত চলে গেছে। তৃপ্তিসহকারে খেয়েছেন অতিথি। বাকিরা ক্ষুধার্ত, আস্বাদন করেছেন ত্যাগের মিষ্টি স্বাদ। পরদিন স্বামী গেলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানালেন, আল্লাহ তাদের কাজে বিস্মিত হয়েছেন, ভালোবেসেছেন।
ফিরে আসি নিজেদের জীবনে। আমাদের ঘরটাও হয়তো সেই নারী সাহাবির ঘরটির মতোই। হয়তো দামি আসবাব নেই। নেই দামি বাসনকোসন। আমাদের স্বামীও হতে পারে সাদাসিধে। সামান্য আয়ে চলে। এরই মাঝে আমরা কেন সুখ খুঁজে নিই না? দুনিয়াবি কিছুতে সুখ খোঁজার মতো বোকামি আর কী হয়! সুখ তো রবের সন্তোষে, যে সন্তোষ আসে স্বামী-স্ত্রীর একাগ্রতায়! সেই নারী সাহাবির কথা ভাবি। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে যিনি জ্বেলে দিয়েছিলেন হৃদয়ের আলো। অল্পে তুষ্ট থেকে আমরাও না-হয় হৃদয়ের আলোয় আলোকিত করি চারদিক! আমরাও না-হয় হয়ে যাই সেই নারী সাহাবির মতো!
📄 সবুজ হৃদয়
হৃদয় কখনো প্রেমে পড়ে, উদ্বেলিত হয় ভালোবাসায়। হৃদয় কখনো ব্যাকুল হয়ে ওঠে, জাগ্রত হয় গভীর ব্যথায়! দ্বীনের আলোয় আলোকিত হৃদয় চায় না নিচে নামতে। এ হৃদয় হারাম থেকে বিরত থাকতে চায়। নিজেকে রাখতে চায় পবিত্র। কিছু মানুষের হৃদয়গুলো সবুজ-শ্যামল। সেই সব হৃদয়ে হারাম কিছু আঘাত হানতে পারে না।
আমাদের গল্পটা এমন হৃদয় নিয়েই। দুটি পবিত্র হৃদয়ের ভালোবাসার গল্প। তারা উভয়েই এক বাড়িতে বেড়ে উঠেছে। ছেলের সাথে মেয়ের বাবার আত্মীয়তা ছিল। হালাল পন্থায় স্বপ্নপূরণের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল ছেলেটা। আর সেই মেয়েটা? অনুগ্রহে ভরপুর গৃহে শান্ত মনে বিচরণ করত সে। তাই দেখে উজ্জ্বল হতো বাবার মুখ। নরম পা ফেলে সে এগিয়ে যেত বাবার দিকে। প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বাবার পবিত্র হাতে চুম্বন করত। বাবাও তাকে জড়িয়ে ধরে উত্তম দুআ করে দিতেন। সে বাবার অনুগত। বাবাও তার প্রতি খুব খুশি, প্রচণ্ড ভালোবাসেন মেয়েকে। তাই তো তাকে 'মা' বলে ডাকেন!
মেয়ের বয়স আঠারোর কাছাকাছি। কী সুন্দর মেয়েটা! আমরা কি জানি, সেই মেয়েটি কে? মেয়েটি ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা, প্রিয় নবিজির কন্যা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জন্য একের পর এক প্রস্তাব আসে। আবু বকর এলেন। উমার এলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ফিরিয়ে দেন বিনয়ের সাথে। হয়তো কন্যার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিটিকে তিনি ভেবে রেখেছেন! সেই উপযুক্ত ব্যক্তিটি আর কেউ নন! আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু, নবিজির চাচাতো ভাই।
আলি দূর থেকে দেখে যেতেন সব। হৃৎকম্পন বেড়ে যেত তার। একবার মনকে ধরে রাখছেন, তো আরেকবার তা বিদ্রোহ করে বসছে! একপর্যায়ে আর না পেরে পবিত্র জবানে চেয়ে বসেন ফাতিমাকে; নিজের স্ত্রীরূপে, নয়নজুড়ানো সঙ্গিনীরূপে। সেদিন আলির বুকের ভেতরে চলছিল হাতুড়িপেটা। তবু সলজ্জ হয়ে বসেছিলেন রাসুলের পাশে। মুখে কোনো কথা নেই। জিহ্বা থেমে গেছে। ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন যেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন লজ্জায় আলি কিছু বলতে পারছে না। দয়ার্দ্র চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। নরম সুরে শুধালেন, 'ইবনু আবি তালিবের কী প্রয়োজন?' আলি মৃদু স্বরে জবাব দিলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতিমার কথা বলতে চাইছিলাম।'
কেমন করে যে কথাটা বলে ফেললেন আলি! হৃদয় কেঁপে চলছে অনবরত। ক্ষণিকের নীরবতা। উৎকণ্ঠায়, অপেক্ষায় সে নীরবতাকেও অসীম মনে হচ্ছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে নীরবতা ভাঙলেন অবশেষে। নরম সুরে বললেন, 'মারহাবান ওয়া আহলান।'
আলির হৃদয়ে সে কথা প্রবাহিত হলো শীতল ঝরনাধারার মতো। হৃদয় ধন্য হলো। ধন্য হলো সকল আবেগ-অনুূর্তি। আলি বুঝে গেলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনের কথা। তিনিও যে আলিকে জামাতা হিসেবে দেখতে চান! এই ছিল সূচনা।
বেশ কদিন পর আলি আবারও গেলেন প্রস্তাব নিয়ে। তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। মোহর ছিল একটি বর্ম। আলির মালিকানায় থাকা হুতামি নামক এক বর্ম! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে সাধ্যাতীত কিছু চাননি। অনুষ্ঠান করেননি গোটা শহর আলোকিত করে। ফাতিমাও পরেননি হীরক খচিত ঝলমলে পোশাক। অন্য মেয়েদের সাথে নিজেকে তুলনায় যাননি। চাননি কোনো জাঁকজমক। অহেতুক সব বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত ছিল তার বিয়ে। বিয়ে তো কোনো কেনাবেচা নয়। নয় কোনো ব্যাবসায়িক চুক্তি।
ফাতিমা এখন আলির ঘরের রানি! সবাই খুশি। খুশি না হয়ে কি পারে? এ যে রাসুলের চোখের মণির বিয়ে! আনসারি সাহাবিরা আয়োজন করল ওয়ালিমার। আনন্দঘন দিনটাতে ছড়িয়ে পড়ল পরিশুদ্ধ হৃদয়ের সুবাতাস। ওয়ালিমায় একত্রিত হলো নানা শ্রেণির মানুষ। এই উত্তম বিয়ের আনন্দে কে না শরিক হতে চায়! ইসলামি বিয়ের পরিবেশ তো এমনই! সাদামাটা অথচ আনন্দঘন আয়োজন। যে ঘরে বিয়ে হলো, তাতে ছিল না কোনো দামি আসবাব। অতিথিদেরও অভ্যর্থনা জানানো হয়নি দামি গালিচায়। দামি পাথর, বর্ণিল ছবি-কোনো কিছুরই বাড়াবাড়ি ছিল না সেখানে। ছিল শুধু একটা বিছানা, খেজুর পাতার বালিশ, আর চামড়ার পানপাত্র। এই তো বাড়ি! কী পবিত্র সেই বাড়ি!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গেলেন বর-কনের কাছে। পানি দিয়ে অজু সেরে সেই পানি ছিটিয়ে দিলেন আলির শরীরে। তারপর বললেন, 'আল্লাহ! আপনি তাদের মাঝে বরকত দিন। তাদের ওপর বরকত বর্ষণ করুন। তাদের বংশেও বরকত দান করুন।' ফাতিমা এগিয়ে গেলেন সলজ্জ পায়ে। সুতীব্র লজ্জায় কাপড়ে হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছেন যেন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শরীরে পানি ছিটিয়ে দিলেন। দুআ করে বললেন, 'ফাতিমা, আমার পরিবারের উত্তম মানুষটার সাথে বিয়ে দিলাম তোমায়!'
পিতা হয়ে কন্যার বিয়েতে বরকতের দুআ করে দিলেন, জানিয়ে দিলেন উত্তম ব্যক্তি বাছাইয়ে কসুর করেননি তিনি। আনন্দে দিন কেটে যাচ্ছিল তাদের। সুন্দর সব মুহূর্ত। সময় তাদের পানে চেয়ে মুচকি হাসল। ঘর আলো করে এলো হাসান, হুসাইন, উম্মু কুলসুম আর যাইনাব। ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা-মা খুশি। খুশি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নাতি-নাতনিরা ছিল তার নয়নের মণি। কী সুন্দর সংসার! কী সুন্দর জীবন!
এমন জীবন পেতে আমরা কেন ফাতিমার মতো হই না? তার মতো হলে হয়তো আমাদের জীবনেও আসত আলির মতো কেউ! ফাতিমার মতো লজ্জাশীল, পিতার অনুগত আর ঈমানদার হলে তবেই না আমরা আলির মতো কাউকে জীবনে পাব! আমাদের হৃদয় হোক সবুজ কুঁড়ির মতো, যা কেবল হালালের স্পর্শেই বেড়ে উঠবে। সমস্ত জঞ্জাল আর নোংরাকে এড়িয়ে আমরা হব ফাতিমার মতো!
টিকাঃ
১. 'ওয়ালিমা' হচ্ছে বিয়ের পর ছেলেপক্ষ কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠান যেখানে আত্মীয়সুজন, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গরিব-মিসকিনদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করানো হয়। বাংলাদেশে এটা 'বউভাত' নামে পরিচিত। 'ওয়ালিমা' নবিজির একটি সুন্নাহ।