📄 আমার জীবন
এ সংসারে মানুষের কত কষ্ট, কত যন্ত্রণা হয়, তবুও সে জীবনে বাঁচতে চায়। একান্ত নিরাশ ব্যক্তি ছাড়া মরতে কেউ চায় না। অবশ্য আত্মহত্যা মহাপাপ। মৃত্যুকামনা করাও বৈধ নয়। বৈধ নয় করুণা-মৃত্যু আনয়ন করা। আল্লাহর রসূল বলেন, "কোন বিপদ-রোগ এলে তোমাদের মধ্যে কেউ যেন অবশ্যই মৃত্যু-কামনা না করে। আর যদি একান্ত করতেই হয়, তাহলে সে যেন বলে, 'হে আল্লাহ! যতক্ষণ বেঁচে থাকা আমার জন্য কল্যাণকর, ততক্ষণ আমাকে জীবিত রাখ। আর যদি মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে আমাকে মরণ দাও.” (বুখারী ৫৬৭১, মুসলিম ২৬৮০ নং)
তিনি আরো বলেন, "মৃত্যু আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তা কামনা না করে এবং তা চেয়ে দুআও না করে। যেহেতু তোমাদের কেউ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ মুমিনের জীবন তো মঙ্গলই বৃদ্ধি ক'রে থাকে." (মুসলিম ২৬৮-২নং)
মরলে প্রস্তুতি নিয়ে মরতে হবে। জীবনের ক্ষেতকে দস্তুরমতো আবাদ ক'রে মরতে হবে। জীবনের ডাইরিকে নেক আমলের কালি দিয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সময়ের অপচয় না ঘটে।
'একটা দিন চলে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে, জীবন থেকে একটা দিন ঝরে যাওয়া।' সুতরাং জীবনকে যদি তুমি ভালোবাস, তাহলে সময়ের অপচয় করো না। কারণ জীবনটা সময়ের সমষ্টি দ্বারা তৈরী।
ছাত্র-জীবনে সময়ের অপচয় ক'রে ঠিকমতো পড়াশোনা না ক'রে, উপার্জনকালে ঠিকমতো পিতামাতার সেবা না ক'রে, সবল ও সুস্থ অবস্থায় মহান আল্লাহর ইবাদত না ক'রে যদি সময় নষ্ট ক'রে ফেলো, তাহলে যথাসময়ে পস্তানি ছাড়া আর কী আছে বল?
সময়ের অপচয় করো না। সময় অমূল্য ধন, সদা তার সদ্ব্যবহার কর। তোমার জীবন চিরস্থায়ী নয়, সুদীর্ঘও নয়। হৃদয়ের স্পন্দন সদা যেন বলেই চলেছে, জীবন তো কয়টা মিনিট ও সেকেন্ডের নাম।
'সময় বহিয়া যায়, নদীর স্রোতের ন্যায়, যে জন না বুঝে তারে ধিক্ শত ধিক, বলিছে সোনার ঘড়ি, টিক টিক টিক।'
'তোমার জীবনও তিথিময় চাঁদের মত। যার দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, পূর্ণিমা ও পরিশেষে অমাবশ্যার অন্ধকার আছে। তবে মাসের মাস নতুন চাঁদের জন্ম হয়। কিন্তু তোমার জীবনের পুনর্জন্ম কেবল একটাই।'
'মানুষের প্রত্যেকটি শ্বাস হল মৃত্যুর দিকে ধাবমান এক একটি পদক্ষেপ।'
'জন্ম-মৃত্যু দোঁহে মিলে জীবনের খেলা, যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা পা-ফেলা।'
মরণ কামনা করা বৈধ নয়। মু'মিনের দীর্ঘ জীবন তার উপকার সাধন করে। কিন্তু আয়ু দীর্ঘ হলে পার্থিব অশান্তি ভুগতেই হয়---এটাই নিয়ম। তবে স্থবিরতা নিশ্চয় কাম্য নয়। তাতে ছেলে-বউয়ের নিকট থেকে প্রাপ্য শুধু লাঞ্চনা ও গঞ্জনা। বাড়ির একটা ভাঙ্গা খাট অথবা আলমারির মতো একটা বুড়ো অথবা বুড়ির মান। এক জীবন ছিল, যখন সবাই চেয়েছে, তুমি দিয়েছ। আর এখন তুমি নিজেই ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে আছ অন্যের দিকে। সে জীবনও কি জীবন? তুমি দিয়েছ আনন্দের সাথে, এখন তোমাকে দেয় বিরক্তির সাথে। তাতে কি তোমার মনে ব্যথা লাগে না? কিন্তু তোমার মতো বুড়ো-বুড়ি ছাড়া কে বুঝে সে ব্যথা?
সে সময় হয়তো তুমি চাইবে মৃত্যুর করুণা। কিন্তু তার জন্য তো প্রস্তুতি চাই। 'মৃত্যুর চেয়ে কঠিন হচ্ছে জীবন। কেন না, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ জীবনেই ভোগ করতে হয়। আর মৃত্যু তা থেকে মুক্তি দেয়।' যদি না তার পরে পারলৌকিক কোন শান্তি ভোগ করতে হয়।
জীবনে কত মারাত্মক বিপদ আসে, কত দুর্ঘটনা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। মরতে গিয়ে যে ফিরে আসে, সে এক নতুন জীবন পায়। আর সে জীবন হয় পূর্বাপেক্ষা উত্তম। 'মরণ যখন খুব কাছে এসে চলে যায়, তখন জীবনকে এক নতুন রঙ ও স্বাদে পরিপূর্ণ ক'রে দিয়ে যায়।' এ জীবন হয় আমল-আখলাকে ভরা, ঈমানী আলোয় আলোকিত।
মরতে সকলকে হবে, ধীরে-ধীরে অথবা অকস্মাৎ। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে সর্বদা। এ জীবন পরজীবনের জন্য ক্ষেত স্বরূপ। ফসল বুনে নিতে হবে সে ক্ষেতে। যাতে কাল খামার-ভরা ফসল দেখতে পাই। আজকের জন্যেও রেখে যেতে হবে স্মৃতি। দুনিয়াতেও ছেড়ে যেতে হবে আমার পদচিহ্ন। এই স্মৃতি ও পদচিহ্ন হবে আমার কালকের বেহেস্তী পথের মাইল-স্টোন।
'আমি চলে গেলে কেউ যদি আমার জন্য না কাঁদে, তবে আমার অস্তিত্বের কোন মূল্য নেই।'
'আমাকে সব সময় মনে রাখতে হবে, আমার জন্মটা যেন মৃত্যুর মধ্যেই শেষ না হয়ে যায়।'
কবির মতো আমার মন যেন গাইতে পারে, 'মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।'
পরকালের পথিক বন্ধু আমার! 'প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে, তুমি মাত্র কেঁদেছিলে হেসেছিল সবে। এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।'