📄 আত্মসমালোচনা
তোমার হয়তো অভিজ্ঞতা থাকবে, 'মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে নিজের সাথে।' 'জ্ঞানী মানুষ নিজের মনকেই অধিক শাসিয়ে থাকে।' 'অনেক সময় নিজেকে সংশোধন ক'রে শত্রু দমন করা যায়।' 'সবথেকে কঠিন জিনিস হল নিজেকে চেনা। আর সবথেকে সহজ জিনিস হল অপরকে উপদেশ দেওয়া।'
কিন্তু 'যে মানুষ নিজ মনের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সেই হল উল্লেখযোগ্য মানুষ।' 'যে ব্যক্তি নিজের সমালোচনা করতে পারে, সেই সর্বাপেক্ষা বেশী বুদ্ধিমান।' 'যে মানুষ চেনে সে বড় বুদ্ধিমান। কিন্তু যে নিজেকে চেনে সে সবথেকে বড় বুদ্ধিমান।'
'সেই সত্যিকারের মানুষ, যে অন্যের দোষ-ত্রুটি নিজেকে দিয়ে বিবেচনা করে।'
যে ব্যক্তি পরের ছিদ্র অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকবে, সে ব্যক্তি নিজের ছিদ্র সংশোধনে প্রয়াসী হবে। আর যে নিজের ছিদ্র অন্বেষণ করবে, সে পরের ছিদ্র অন্বেষণ করতে পারবে না।
সুতরাং পরকে ছেড়ে তুমি নিজের দোষ গণনা করায় ব্যাপৃত হও। পরের আগে ঘরের সংশোধন সাধন কর। আত্মসমালোচনায় অভিনিবিষ্ট হও। মানুষের উপকার সাধন ক'রে নিজের ত্রুটির কথা বিস্মৃত হয়ো না।
'চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে।'
'সকল মানুষ যখন তোমার বাহ্যিক গুণগ্রাম দেখে প্রশংসা করবে, তখন তোমার উচিত, তোমার আভ্যন্তরীণ ত্রুটি অন্বেষণ ও বিচার করা। যাতে তুমি তোমার নিজের গোপন ত্রুটি সংশোধন করে নিজের আত্মর কাছে বিশ্বস্ত হতে পার। আর তা লোকের ঐ প্রশংসা থেকে বহুগুণ উত্তম।'
'চোখ সব কিছু দেখতে সাহায্য করে, কিন্তু নিজেকে দেখতে পায় না। তার জন্য মনের প্রয়োজন হয়।'
প্রকাশ থাকে যে, 'পরের দোষ ঢাকতে হবে এবং কারো ছিদ্রান্বেষণ করা যাবে না' মানে এই নয় যে, সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া যাবে না এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হবে না। বরং স্বস্থানে সব কিছুই করা মুসলিমের জন্য বিধেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মুসলিম মুসলিমের ভাই, সে তার উপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে অত্যাচারীর হাতে ছেড়ে দেবে না। যে ব্যক্তি তার ভায়ের প্রয়োজন পূর্ণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের কোন এক বিপদ দূর ক'রে দেবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বহু বিপদের একটি বিপদ দূর ক'রে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন।” (বুখারী, মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোন গর্হিত (বা শরীয়ত বিরোধী) কাজ দেখবে, তখন সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তিত করে। তাতে সক্ষম না হলে যেন তার জিহ্বা দ্বারা, আর তাতেও সক্ষম না হলে তার হৃদয় দ্বারা (তা ঘৃণা জানবে)। তবে এ হল সব চাইতে দুর্বলতম ঈমানের পরিচায়ক।” (মুসলিম ৪৯নং, আহমাদ, আসহাবে সুনান)
📄 হা-হুতাশ করো না
জীবনে পরাজিত তুমি? অথবা লাঞ্চিত ও অপমানিত তুমি? অথবা বঞ্চিত বা প্রবঞ্চিত তুমি? অথবা প্রতারিত বা অত্যাচারিত তুমি? অথবা রোগাক্লিষ্ট বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা শোকসন্তপ্ত তুমি?
হা-হুতাশ করো না ভাইটি! আক্ষেপ ও আফসোস করো না বোনটি! দুঃখের চাপা অন্তর্বাপকে নয়নাশ্রু হয়ে প্রবাহিত হয়ে যেতে দাও। মন হাল্কা হয়ে যাবে। কান্না করলে, আল্লাহর কাছে কাঁদ। অভিযোগ করলে তাঁর কাছে কর। তবে তাঁর কাছে তাঁরই বিরুদ্ধে অভিযোগ ক'রে বসো না। কারণ, তাতে সর্বনাশ আছে।
শত্রুকে শায়েস্তা করতে পারছ না? তোমার বিরোধীরা তোমাকে গালাগালি করছে? তাতেও দুঃখ করো না। তোমাকে কেউ 'শয়তান' বা 'কাফের' বলে গালি দিলে, তুমি তা না হলে সেই শয়তান বা কাফের। তোমাকে বলতে হবে না। এটাই আল্লাহর বিধান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "যখন কোন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি 'ফাসেক' অথবা 'কাফের' বলে অপবাদ দেয়, তখনই তা তার উপরেই বর্তায়; যদি তার প্রতিপক্ষ তা না হয়।” (বুখারী)
তিনি আরো বলেন, “বান্দা যখন কোন কিছুকে অভিশাপ করে, তখন সে অভিশাপ আকাশের দিকে উঠে যায়। কিন্তু তাকে প্রবেশ করতে না দিয়ে আকাশের দরজাসমূহকে বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়। ফলে সেখান হতে তা পুনরায় পৃথিবীর দিকে নেমে আসে। কিন্তু তাকে আসতে না দিয়ে পৃথিবীর দরজাসমূহকেও বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়। অতঃপর তা ডাইনে-বামে বিচরণ করতে থাকে। পরিশেষে কোন গতিপথ না পেয়ে অভিশপ্তের দিকে ফিরে আসে। কিন্তু (যাকে অভিশাপ করা হয়েছে সে) অভিশপ্ত (সঙ্গত কারণে) অভিশাপযোগ্য না হলে তা অভিশাপকারী ঐ বান্দার দিকে ফিরে যায়." (অর্থাৎ, নিজের করা অভিশাপ নিজেকেই লেগে বসে!) (আবু দাউদ ৪৯০৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২৬৯নং)
বঞ্চনায়-প্রবঞ্চনায় তুমি আফসোস করো না। যে জিনিস থেকে তোমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা তুমি কিয়ামতে পাবে।
উৎপীড়িত বন্ধু আমার! হৃদয়ের জমিতে যদি তুমি 'যদি ও হায়' রোপণ কর, তাহলে 'আফসোস'-এর কাঁটা ছাড়া কিছুই উৎপাদন হবে না।
দুনিয়াতে হয়তো এমন কিছু লোককে হারিয়ে থাকো, যাদের উপস্থিতি তোমার কোন উপকার করেনি, সুতরাং সে লোকেদের অনুপস্থিতিও তোমার কোন অপকার করবে না। অতএব সে হারানোতে তোমার আফসোস হওয়া উচিত নয়। তবে যাদের হারানোতে তোমার ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তাদের জন্য আফসোস স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে কোন লাভ নেই।
এ সংসারে কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য এ জীবন বড় বোঝা। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এ জীবনের জন্য বড় বোঝা। তারা চলে গেলে আফসোস কীসের?
কিন্তু যারা চলে গেলে অনেক মানুষের জীবন অচল হয়ে যায়, তাদের প্রতি আফসোস তো হবেই। কিন্তু সৃষ্টির নিয়মে যা ঘটতে বাধ্য তার পশ্চাতে আফসোস আর কোন্ উপকারে আসবে? নবী-অলীগণ চলে গেছেন, তবুও জীবনের চাকা সচল আছে। তোমারও কোন জরুরী ব্যক্তিত্ব বা অবলম্বন বিদায় নিলে তোমার জীবনের চাকাও অচল হবে না।
📄 অক্ষম হয়ো না
বিপদে পতিত বন্ধু আমার! 'জীবন যতক্ষণ আছে, বিপদ ততক্ষণ থাকবেই।' বিপদে পতিত হয়ে পথ চলতে অক্ষম হয়ে বসে পড়ো না। ওঠো, সোজা হয়ে দাঁড়াও, আবার নতুন ক'রে পথ চলতে শুরু কর।
প্রিয় নবী বলেন, “দুর্বল মুমিন অপেক্ষা সবল মুমিনই আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম এবং প্রিয়। আর প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ আছে। তোমার উপকারী বিষয়ে তুমি যত্নবান হও। আল্লাহর নিকট সাহায্য ভিক্ষা কর এবং অক্ষম হয়ে যেয়ো না। তোমার কোন বিপদ এলে বলো না যে, 'যদি আমি এই করতাম, তাহলে এই হত।' বরং বলো, 'আল্লাহ যা ভাগ্যে লিখেছিলেন এবং যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।' কারণ 'যদি' শয়তানের কর্ম উদ্ঘাটন করে।” (মুসলিম)
হা-হুতাশে কোন ফল নেই। আফসোসে কোন লাভ নেই। সুতরাং আবার কাজ শুরু কর। 'যে কাজ করতে গিয়ে বিফল হয়, সে তার থেকে ভালো, যে মোটেই কাজ করে না।'
আর 'পরাজয় এক ধরনের শিক্ষা; যেখানে সত্য আরো মজবুত হতে থাকে।' 'পতন অনেক ক্ষেত্রে সত্যকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।' 'সফলতার চাইতে অসফলতাই তোমাকে অধিক শিক্ষা দিয়ে থাকে।' 'কোন কোন অসফলতা সফলতার দ্বার উদ্ঘাটন করে।'
আর জেনে রেখো, 'যে পতনকে ভয় করে, সে কোন দিন জয়লাভ করতে পারে না।' 'ব্যর্থ লোকেরাই ব্যর্থতাকে ভয় পায়।'
বন্ধু আমার! মনে রেখো যে, 'তীব্র যন্ত্রণা থাকে না বেশীক্ষণ।' সত্বর তীব্রতা দূরীভূত হয়। সুতরাং তোমার যন্ত্রণার উপশম হবে। কষ্টের মেঘ সরে যাবে। 'সূর্য ডোবে বলেই সকাল হয়।' তোমারও সুখের সকাল আসবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا} (৬) سورة الشرح
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। (আলাম নাশ্রাহঃ ৬)
'রাত্রির অন্ধকার দেখে তুমি ভয় করো না, কারণ রাত্রির অন্ধকারের পর তোমার জন্য একটি সুন্দর দিন অপেক্ষা করছে। আর প্রভাতের সূর্য দেখে আনন্দ প্রকাশ করো না, কারণ কুৎসিত একটি অন্ধকার রাত্রি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।'
অবশ্য 'জীবনের সব সন্ধ্যাই অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। তার মধ্যে শুভসন্ধ্যারও পদার্পণ ঘটে।'
আশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছ? 'পড়ে যাওয়াটা মানুষের বিফলতা নয়, বিফলতা হল যেখানে সে পড়ে যায় সেখানেই পড়ে থাকাটা।'
'পথ চলতে চলতে পড়ে যাওয়াটা বিফলতা নয়, বরং পড়ে থাকাটা বিফলতা।' সুতরাং উঠে আবার চলতে শুরু কর।
'যে মাটিতে পড়ে লোক ওঠে তাই ধরে, বারেক হতাশ হয়ে কে কোথায় মরে? বিপদে পতিত তবু ছাড়িব না হাল, আজিকে বিফল হলে হতে পারে কাল।'
'সৎ লোক ৭ বার বিপদে পড়লে আবার ওঠে, কিন্তু অসৎ লোক বিপদে পড়লে একেবারেই নিপাত হয়।'
'দুঃখ, বেদনা ও অভাবকে বাধা মনে না ক'রে সেগুলিকে বরং আশীর্বাদরূপে ধরে নিও। কিছুই তোমার গতিকে রোধ করতে পারবে না। যেমন করে হোক তুমি বড় হবেই। বুক ভেঙ্গে গেছে ভয় নেই। ভাঙ্গা বুক নিয়ে আল্লাহর ভরসা করে দাঁড়াও।'
'গাছের পাতা ঝরা দেখে ভেবে নিয়ো না যে, গাছটি মারা যাচ্ছে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কর, যথা সময়ে তার আবার নতুন পাতা গজাবে।'
'শীতে ফুলের গাছ গেছে শুকাইয়া, পাতাগুলি সমুদয় পড়েছে ঝরিয়া। করো না করো না ভাই তাহারে ইন্ধন, ভিতরে দেখহ তার মধুর কেমন। বহিবে অচিরে যবে বসন্তের বায়, হাসিবে গোলাপ তার শাখায় শাখায়। গৌরবে তাহার হবে কানন উজ্জ্বল, ভাবিয়ো না আজি তার জীবন বিফল। অন্তর নয়নে দেখ, ভিতরের রূপ। বাহির দেখিয়া শুধু হয়ো না বিরূপ।'
যেখানে তোমার সব কিছু শেষ, সেখান থেকে তোমার সব কিছু শুরু কর।
'শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে, হে আরম্ভ! বৃথা তব অহংকার তবে। আরম্ভ কহিল, ভাই! যেথা শেষ হয়, সেইখানে পুনরায় আরম্ভ উদয়।'
'বিফলতা আমাদের অকেজো করে, কিন্তু জীবনে যারা জয়ী হয়েছে, বিফলতার উপর ভিত্তি করেই তাদের সৌভাগ্যের প্রাসাদ রচিত হয়েছে।'
'জ্ঞানী লোকেরা কখনো পরাজয়ের পর নিরাশ হয়ে অলসভাবে বসে থাকে না। তারা চেষ্টা করে ক্ষতিটা পূরণ করতে।'
নিরাশ না হয়ে আশা রাখো আল্লাহর কাছে।
'আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে গো ফুল ফুটবে, আমার সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে।'
নিরাশার অন্ধকারে ভয় পেয়ো না বন্ধু! 'অন্ধকারে তুমি সাহস হারিয়ে ফেলো না, আলোর সন্ধান পাবেই।' 'যখন সব কিছু হারিয়ে যায়, ভবিষ্যৎ তখনও দাঁড়িয়ে থাকে।' 'আকাশের মেঘের ঘনঘটা দেখে ভয় পাওয়া উচিত নয়। কারণ সময় হলে মেঘ সরে যাবে।'
'মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে, হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে।'
বিপদের আশঙ্কায় তো জীবন স্তব্ধ হতে পারে না। ঝুঁকির ভয়ে তো কাজ বন্ধ রাখা চলে না। লোকে বলে, 'কামার লোহা চুরি করে।' তবুও অস্ত্র গড়তে হবে। বলে, 'স্বর্ণকার স্বর্ণ চুরি করে।' তবুও অলংকার গড়াতে হবে।
'যে জাহাজ মহাসমুদ্রে যাত্রা করে, তার ঝড়-তুফানে পড়ার ঝুঁকি আছে। কিন্তু যে জাহাজ বন্দরে থাকে সে জাহাজেরও ধীরে ধীরে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকে। ঝুঁকি না নিয়ে বিজয় লাভ হয় না। বাস দুর্ঘটনায় লোক মরছে দেখে যদি কেউ বাসে না চড়ে, ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে দেখে যদি কেউ ট্রেনে না চড়ে, তাহলে সে চালাক হতে পারে। কিন্তু বহু লোক বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় মারা যেতে দেখে যদি কেউ বিছানায় না শোয়, তাহলে তাকে তুমি কী বলবে?'
'একটি কথা ভেবে বল, কোন পথে নেই ঝুঁকি? জীবন চলার পথে ঝুঁকি সবখানে দেয় উকি।'
পায়রা যবাই হওয়ার কথা চিন্তা করলে গমের কাছে আসবে না। তুমিও দুর্ঘটনার ভয় করলে বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারবে না। অতএব ঝুঁকি নিয়েই তোমাকে জীবন-যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।
তোমার 'গন্তব্যস্থল যদি অজানা থাকে, তাহলে যে কোন একটি পথ চললেই তো হয়।' কিন্তু তা তো নয়। তোমার গন্তব্যস্থল তুমি জানো, তোমার উদ্দেশ্য তুমি মনে পোষণ কর। সুতরাং অক্ষমতা কেন? জীবনে অসামঞ্জস্য কেন? বিক্ষিপ্ত আচরণ কেন?
কিছুকে অসম্ভব মনে কর? যা অন্য লোকে পারে, তা তুমিও পারবে। তুমি চেষ্টা ক'রে তো দেখো। 'সম্ভব অসম্ভবকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কোথায় বাস কর? অসম্ভব উত্তরে বলল, অক্ষমের স্বপ্নে।'
অক্ষমতার দুঃখ অবশ্যই হবে তোমার। কারণ 'যে পারে, তার কাছে না পারার দুঃখটা অনেক বেশি হয়।' অতএব সমুদ্রে ঢেউ দেখে লা ডুবিয়ে দেবে কেন?
কর্মের সময় তুমি অকর্মণ্য হবে কেন? কেন তুমি কাজের সময় ঘুমিয়ে আছো? কেন তুমি বসন্তে ফুলহীন থেকে বাগানে হীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছ? 'এখনো ঘুমাও শতরূপা তুমি এই কুসুমের মাসে নির্মুকুল!'
আর ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থেকো না। আর নিজের শক্তিকে চাপা দিয়ে রেখো না। আর বদ্ধ নিষ্কর্মাদের খোঁয়াড়ে নিজেকে বন্দি রেখো না। কুঁড়ি না থেকে এবার ফুল হয়ে ফুটে ওঠো।
'কুসুম-কোরকে থেকো না বন্দী থেকো না আর, মধুর গন্ধে গন্ধবহ দিকে দিকে আজ কর প্রচার।'
তুমি কি এখনও সকালের অপেক্ষায় বিছানায় পড়ে থাকবে? 'ফুলের কুঁড়ি ফুলের কুঁড়ি ঘুমিয়ে কেন ভাই? ভোরের আলো হাসছে দেখ, রাতের কালো নাই।'
ভয় হয় তোমার? শ্রমবিমুখ তুমি? শ্রম ছাড়া কি সুখ আসে বন্ধু? 'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?'
চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে যাও। দীর্ঘ পথ দেখে নিরুদ্যম হয়ে যেয়ো না। 'কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ, উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?'
সফলতা ছাড়া বিফলতার জীবন নিয়ে বেঁচে লাভ কী বন্ধু? সবাই যখন এগিয়ে গেছে, তোমার তখন পিছনে পড়ে থেকে কি সুখ আছে মনে কর? 'আগে চল্ আগে চল ভাই, পড়ে থাকা পিছে মরে থাকা মিছে বেঁচে কী ফল ভাই।' জীবন-যুদ্ধে কোন প্রকার ভয় না ক'রে বল, 'আমি ভয় করব না, ভয় করব না দুবেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না। তরীখানা বাইতে গেলে, মাঝে মাঝে তুফান মেলে- তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি করব না।'
বিপদে-আপদে, বালা-মুসীবতে ভেঙ্গে পড়ো না বন্ধু! কাপুরুষের মতো বসে থেকে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে অসহায় অনাহারে রেখো না। 'আসছে পথে আঁধার নেমে তাই বলে কি রইবি থেমে? বারে বারে জ্বালবি বাতি হয়তো বাতি জ্বলবে না, তাই বলে তোর ভীরুর মতো বসে থাকা চলবে না।'
কোন বৈধ কাজ করতে সমাজকে লজ্জা করো না। কোন বৈধ বাসনা পূরণ করতে জগৎকে ভয় পেয়ো না। বঞ্চিত অধিকার ফিরে পেতে সংগ্রামে পিছ- পা হয়ো না। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে কোন প্রয়াসে নিরুৎসাহ হয়ো না।
'ভাঙ রে হৃদয়, ভাঙ রে বাঁধন, সাধ রে আজিকে প্রাণের সাধন, লহরীর 'পরে লহরী তুলিয়া আঘাতের পর আঘাত কর। মাতিয়া যখন উঠেছে পরান কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ! উথলি যখন উঠেছে বাসনা জগতে তখন কিসের ডর!'
পথে তুমি একা? একাকিত্ব বোধ ক'রে নিজের আশা পূরণে তুমি পিছু হটে যাবে? না, কক্ষনো না। বরং তুমি বল, 'বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে তবু একা বসে রব উদ্দেশ্য সাধিতে।'
হকপথে কেউ যদি তোমার সঙ্গ না দেয়, কেউ যদি তোমার মতে মত না মিলায়, কেউ যদি তোমাকে সমর্থন না করে, তাহলে তুমি একলা চলো। 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না-ই আসে তবে একলা চলো রে। যদি কেউ কথা না কয়, যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়--- তবে পরাণ খুলে মুখ ফুটে তুই একলা বলো রে।। যদি সবাই ফিরে যায়, যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়- তবে পথের কাঁটা তোর রক্তমাখা চরণ তলে একলা দলো রে।।'
📄 এ জীবন তোমার নয়
এ জীবন তোমার নয়। এ দেহ, এ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মালিক তুমি নও। এ হৃদয়-মন, এ হৃদি-স্পন্দনের মালিকানা তোমার নয়। তুমি তাতে স্বেচ্ছাচারিতার আচরণ করতে পার না।
জীবন দুর্বিষহ বিষময় হয়ে উঠলে তুমি হয়তো বিষ খেয়ে সেই বিষময়তা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে চাইবে। চিত্ত-বিকারে অনেক সময় মন চাইবে আত্মহত্যা করতে।
মা-বাবার কাছে অযথা বকুনি খেলে জীবনকে ধিক্কার দিয়ে প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার অযোগ্য মনে হতে পারে।
ছেলে-বউয়ের কাছে লাঞ্ছিত হলে বৃদ্ধ বয়সে করুণা-মৃত্যু প্রাধান্য পেতে পারে।
স্বামীর কাছে উপেক্ষিত হলে দুর্বল মনে জীবনকে নষ্ট করাই উত্তম মনে হতে পারে।
স্ত্রী প্রতারণা করলে লাঞ্ছনা ও ধিক্কারে জীবনের পাতা থেকে নিজেকে মুছে দেওয়া ভাল মনে হতে পারে।
শ্বশুর-বাড়িতে অত্যাচারিত, অপমানিত, অবহেলিত ও পদদলিত হলে বউ জীবন থেকে বিদায় নেওয়াকে নিষ্কৃতি মনে করতে পারে।
অভাবের তাড়নায় অতিষ্ঠ হলে দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষ মৃত্যুর পথ বেছে নিতে পারে।
বড় ধরনের অপবাদের শিকার হলে পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মান বজায় রাখাকে উত্তম মনে হতে পারে।
প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছে উপেক্ষিত হলে অথবা প্রেমে অসফল হলে ধিক্কারে জীবন বিসর্জন দেওয়াকে ভাল মনে হতে পারে।
রোগজ্বালায় অতিরিক্ত ক্লিষ্ট হলে আরাম পাওয়ার আশায় নিজেকে হত্যা করা শ্রেয় মনে হতে পারে।
শাস্তির আঘাত অসহনীয় হলে নিজেকে একেবারে ধ্বংস করা ভাল মনে হতে পারে।
জীবনের অবলম্বন ধ্বংস হয়ে গেলে, সমস্ত ফল-ফসল দুর্যোগে নষ্ট হয়ে গেলে, ব্যবসায় সকল পুঁজির ভরাডুবি হলে আত্মহত্যায় মুক্তি আছে ধারণা হতে পারে।
কেউ মনে করতে পারে, 'চিন্তা আর চিতা দু'ই এক। তবে চিতাটা ভাল, একেবারে পুড়িয়ে মারে। কিন্তু চিন্তা সারা জীবন জ্বালায়।'
কিন্তু জীবনের বাস্তবতা এড়িয়ে যারা রেহাই বা নিষ্কৃতির লোভে নিজেদেরকে ধ্বংস করে, তারা আসলে রেহাই বা নিষ্কৃতি পায় না। যে প্রেমিক-প্রেমিকা প্রেমে অসফল হয়ে পর-জীবনে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় আত্মহনন করে, তাদের আকাঙ্ক্ষা আদৌ পূর্ণ হয় না। পরন্তু সেখানে গিয়ে ভোগ ক'রে অতিরিক্ত শাস্তি। প্রাণ হত্যা করার শাস্তি।
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোন পাহাড় হতে নিজেকে ফেলে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে ফেলে অনুরূপ শাস্তিভোগ করবে। যে ব্যক্তি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা চিরকালের জন্য বিষ পান ক'রে যাতনা ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহখন্ড (ছুরি ইত্যাদি) দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও ঐ লৌহখন্ড দ্বারা সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে আঘাত ক'রে যাতনা ভোগ করতে থাকবে.” (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ১০৯নং প্রমুখ)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি দোযখেও অনুরূপ ফাঁসি নিয়ে আযাব ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি বর্শা বা ছুরিকাঘাত দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি দোযখেও অনুরূপ বর্শা বা ছুরিকাঘাত দ্বারা (নিজে নিজে) আযাব ভোগ করবে.” (বুখারী ১৩৬৫নং)
আত্মহত্যা আসলে অধৈর্য হওয়ারই চরম পরিণতি। অথচ ধৈর্য হল জীবনের অন্ধকারে আলোকবর্তিকা। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে ধৈর্যধারণ করার আদেশ দিয়েছেন।
তাছাড়া জীবন যখন মানুষ দান করতে পারে না, তখন তা ধ্বংস করার অধিকারও তার নেই। জীবনদাতা মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا (۲۹) وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ عُدْوَانًا وَظُلْمًا فَسَوْفَ تُصْلِيهِ نَارًا وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرًا } (۳۰) سورة النساء
অর্থাৎ, তোমরা আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। পরন্ত যে কেউ সীমা লংঘন ক'রে অন্যায়ভাবে তা করবে, আমি অচিরেই তাকে অগ্নিদগ্ধ করব এবং তা আল্লাহর পক্ষে সহজসাধ্য। (নিসাঃ ২৯-৩০)
বলা বাহুল্য, যে জীবন তোমার সৃষ্ট নয়, সে জীবনকে নষ্ট করায় তোমার কোন এখতিয়ার নেই। দুনিয়ার যন্ত্রণা থেকে আরাম পাওয়ার আশায় পরবর্তী জীবনের দিকে দৌড়ে পালালেও পালাবার পথ নেই। কারণ যাকে তুমি মুক্তিদাতা মনে কর, সে আসলে আরো বড় জল্লাদ।
অবশ্য তোমার মনের বিশ্বাস অদৃঢ় হওয়ার ফলে এমন সিদ্ধান্ত হয়তো গ্রহণ করতে পার। যেহেতু মরণের পর তোমার কী হবে, তা জানা না থাকলে অথবা জানা থাকলেও তাতে অবিশ্বাস থাকলে অথবা অমূলক বিশ্বাস থাকলে তুমি আত্মহত্যায় প্ররোচিত হতে পার।
যেমন, তুমি যদি ধারণা কর যে, মরণের পর মানুষের আর কোন জীবন নেই। মৃত্যুর পরেই সব কিছু শেষ। তাহলে এ জীবনের কষ্ট থেকে মুক্তিলাভের আশায় তুমি আত্মহত্যা করতে পার।
যদি মনে কর, মরণের পর জীবন আছে এবং সে জীবনে তুমি তোমার মনের মানুষটির সাথে মিলিত হতে পারবে, তাহলে প্রেমে অসফল হয়ে আত্মহত্যা ক'রে কেবল বাসা বা হোটেল পরিবর্তন করার মতো পরজীবনে গিয়ে দু'জনে মিলিত হয়ে সফল প্রেম-জীবন লাভ করবে। তাহলে তো অতি সহজে বুকে মাথা রেখে অথবা হাত ধরাধরি ক'রে বাসা বা হোটেল পরিবর্তন করাই ভালো।
তখন তুমি গাইতে পারো, ‘একদিন হবে প্রাণ অবশ্য হরণ, তার তরে মরি সে তো সুখের মরণ। প্রিয়তম সে আমার অতি প্রিয়তম, মরণ তাহার পথে সুধাময় সম। প্রকৃত প্রেমের জানো ইহাই ধরণ, নীরবে সহিয়া লয় জীবন-মরণ। জীবন যে ধন্য তার প্রেমের পূজায়, জীবন জুড়ায় এই মরণের পায়।’
অথবা তুমি যদি বিশ্বাস রাখ, মরণের পর আবার তোমার পুনর্জন্ম হবে এই পৃথিবীতে। অথবা জন্মান্তরে তুমি ইচ্ছামতো জন্ম নিতে পারবে, তাহলে তুমি আত্মহত্যা করতে পার। কুমোর যেমন নরম মাটিকে ইচ্ছামতো এক পাত্র গড়ে পুনরায় তা ভেঙ্গে অন্য পাত্র গড়তে পারে, তেমনি তুমিও নিজের জীবনটাকে ইচ্ছা ও মনোমতো গড়ে নেবে না কেন?
আর সেই ক্ষেত্রে সেই বহুল প্রচলিত গান তুমিও হয়তো গাইতে পার, 'এবার ম'লে সুতো হব তাঁতির ঘরে জন্ম নেব পাছা-পেড়ে শাড়ি হয়ে দুলব তোমার কোমরে!'
অথচ এসব ধারণা তোমার আদৌ সঠিক নয়, এমন বিশ্বাস তোমার যথার্থ নয়। সঠিক ও যথার্থ বিশ্বাস হল, মরণের পরে একটাই জীবন। হিসাবের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম। সঠিক ঈমান রেখে সৎ কাজ ক'রে ইহলোক ত্যাগ করতে পারলে জান্নাতে অবশ্য ইচ্ছাসুখ পাবে। সেখানে গিয়ে তুমি তোমার মনের মানুষটিকে চেয়ে নিতে পারবে। মনের মতো ক'রে জীবন-যাপন করতে পারবে। আর অসৎ কাজ ক'রে ইহলীলা সাঙ্গ করলে জাহান্নামে যেতে হবে। আর সেখানে কোন সুখ নেই, চাওয়া নেই, পাওয়া নেই। সেখানে আছে শান্তি আর শান্তি। পরন্ত আত্মহত্যা মহাপাপ। আর তার শাস্তির কথাও পূর্বে জেনেছ। তাহলে আত্মহত্যায় যে নিষ্কৃতি নেই, তা সহজে অনুমান করতে পারছ।
সুতরাং জীবন থেকে নিরাশ হওয়া হতাশগ্রস্ত বন্ধু আমার! জীবনের কঠিনতার মোকাবেলা করতে শিখো। পলায়নবাদী না হয়ে দুর্বার মনোবল নিয়ে সম্মুখীন হও জীবনের নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার। জয় কর জীবনকে। বীরের মতো জীবন গড়, ভীরুর মতো মরতে চেয়ো না।