📄 সফলতার পথরথি
‘আমাদের কেউ কেউ তার বুদ্ধিমত্তার বলে সফলতা লাভ করে, আর কেউ সফলতা লাভ করে অপরের বোকামি দেখে।’ ছাত্র ও কর্ম-জীবনে সফলতার জন্য এটা হল মুখ্য প্রবেশ-দ্বার। বুদ্ধি অবশ্য আল্লাহর দান। তা আমাদের কাজে লাগানো উচিত। পরন্ত বুদ্ধিকে নষ্ট হতে দেওয়া কোনক্রমেই উচিত নয়। উচিত নয় এমন পথে চলা, যাতে বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়, বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে যায়।
বুদ্ধিভ্রষ্টতা হল বোকামি। বুদ্ধিমানেরা বোকা লোকেদের বুদ্ধিভ্রষ্টতা দেখে নিজেদের বুদ্ধিকে রক্ষা ও তীক্ষ্ণ করে। ফলে তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত ও বর্ধমান হয়।
সাফল্যের দ্বিতীয় পথ হল অভিজ্ঞদের পরামর্শ। শা'বী বলেন, 'পুরুষ তিন শ্রেণীর; স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্ধপূর্ণ এবং অপূর্ণ। যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা আছে অথচ সে অপরের নিকট পরামর্শ নেয় সে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা নেই কিন্তু সে অপরের নিকট পরামর্শ নেয় সে অর্ধপূর্ণ। আর যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা নেই অথচ সে অপরের নিকট পরামর্শও নেয় না, সে অপূর্ণ।'
আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান বলেন, 'পরামর্শ নিয়ে ভুল করা আমার নিকট পরামর্শ না নিয়ে ভুল করা অপেক্ষা অধিক উত্তম।'
'দুটি আয়নাকে আগাপিছা রাখলে নিজের সর্বাঙ্গ দেখা সম্ভব হয়, তেমনি সংকটের সময় অপরের নিকট পরামর্শ নিলে সমাধানের পথ পাওয়া সহজ হয়।' 'সিদ্ধান্তে যখন জং পড়ে, পরামর্শ তখন তা ঝকিয়ে তোলে।' যে পরামর্শ ক'রে কাজ করে, সে বিপন্ন ও লাঞ্ছিত হয় না।
তবে তোমার গুরুত্বপূর্ণ কাজে এমন লোকের পরামর্শ নিয়ো না, যে আল্লাহকে ভয় করে না। জ্ঞানী হলেও কোন ব্যস্ত ব্যক্তির নিকট পরামর্শ নিতে যেয়ো না।
আর জেনে রেখো, 'সৎ পরামর্শের চেয়ে কোন উপহার অধিক মূল্যবান নয়।' 'প্রয়োজনে একটি সুপরামর্শ অনেক জিনিসের চেয়ে মূল্যবান।' পরামর্শভিত্তিক কাজের গুরুত্ব রয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ মুসলিমদের চরিত্র বর্ণনায় এক জায়গায় বলেছেন,
{وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ} (۳۸) سورة الشورى
অর্থাৎ, যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, নামায পড়ে, আপোসে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। (শূরাঃ ৩৮)
নবী হন উম্মতের নেতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তবুও মহান আল্লাহ তাঁকে আদেশ দিয়ে বলেছেন,
{فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (١٥٩) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)
লক্ষণীয় যে, উক্ত আয়াতে পরামর্শ, পরিকল্পনা ও আস্থার কথা একত্রে উল্লিখিত হয়েছে। মহৎ কাজে উক্ত তিনটি বিষয় অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বলেই মহান আল্লাহর ঐ নির্দেশ।
পরন্ত যে কোন বড় বিষয়ে মনের দ্বন্দ্বে মহান আল্লাহর কাছেও ফায়সালা নিতে বিধান রয়েছে ইস্তিখারার। যাতে তাঁর উপর নির্ভরশীলতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ ক'রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ লাভ করা যায়।
কোন সময় কারো বিনা পরামর্শে কোন মহৎ কাজে সফল হলেও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা উচিত নয়। যেহেতু আল্লাহর নির্দেশ 'পরামর্শ কর'। আর অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, 'একবার অভিজ্ঞতা ছাড়াই সফল হলে সত্বর দ্বিতীয়বার অভিজ্ঞদের সহযোগিতা নাও; এতে তোমার সফলতা আরো সুনিশ্চিত ও পাকাপোক্ত হবে।'
তৃতীয় পথ হল পরিশ্রম ও কৃচ্ছ্রসাধন। পরিশ্রম বিনা সফলতা আসে না। শ্রম বিনা সোনার ফসল ফলে না। শ্রম বিনা বিজ্ঞানী হওয়া যায় না। শ্রম বিনা আলেম হওয়া যায় না। শ্রম বিনা অর্থোপার্জন হয় না।
তুমি জ্ঞানী হতে চাইলে 'জ্ঞানীদের পরিশ্রমের কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং তোমাকেও তাঁদের মতো পরিশ্রম করতে হবে।'
'কর্ম-দক্ষতাই মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় বন্ধু।' 'কর্মোজ্জ্বল দিনগুলিই প্রকৃতপক্ষে সোনালী দিন।'
শ্রম-বিমুখতা দারিদ্র্য আনে, টেনে নিয়ে যায় অপরাধ জগতে। 'আলস্য হেন ধন থাকতে দুঃখের আবার অভাব?' 'আলস্য বা পরিশ্রম-বিমুখতা হল মা, তার ছেলের নাম ক্ষুধা এবং মেয়ের নাম চুরি।'
বসে খেলে রাজার ধনও ফুরিয়ে যায়। 'ভরত পাখি দেখল, এক কৃষক কোন পাত্রে কী নিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলে কৃষক বলল, 'কেঁচো। বাজারে বিক্রি ক'রে পালক কিনব।' পাখী বলল, 'আমাকে দাও এবং আমার পালক নাও।' অলস পাখী বসে খেয়ে সমস্ত পালক নষ্ট করল। পরিশেষে সে মারাই গেল। আশা করি, বাপের বা শ্বশুরবাড়ির হোটেলে বসে খাওয়া তুমি সেই অলস নও।
'কর্মবিমুখতা মরিচার মত, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও ক্ষয় করে।' সুতরাং আলস্য ছাড় এবং কাজে লেগে পড়। জীবিকার জন্য, দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য, বৃদ্ধ মা-বাপ ও ছোট-ছোট ভাই-বোনদের জন্য অথবা নিজ স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিছু একটা কর।
'জীবিকার নাই উচ্চ বা নীচ, কোন কাজ নয় হীন, আলস্য পাপ, তাই সঞ্চিত পুণ্যেও করে ক্ষীণ।'
শ্রম ছাড়া কি সফল হওয়া যায়, নাকি ফসল পাওয়া যায়? তকদীরের সাথে তদবীর জরুরী। ভাগ্যের সাথে কর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলা বাহুল্য, কষ্ট স্বীকার ছাড়া ইষ্টলাভ হয় না।
'জাল কহে, পঙ্ক আমি উঠাব না আর, জেলে কহে, মাছ তবে পাওয়া হবে ভার।'
'কর্ম-বিমুখ ছেলেরাই ধনীর মেয়ে বিবাহ করতে চায়।' আর আমল-বিমুখ লোকেরাই পীর ধরতে যায়। আশা করি, তুমি সেই ছেলে ও লোকেদের একজন নও।
তুমি হবে সেই যুবক, যার প্রতি অনেকে হিংসা রাখে। কেননা, 'তোমার হিংসুক বেশী হওয়া, তোমার সফলতারই দলীল।'
তুমি সেই মানুষ হবে, যার প্রতি বন্ধুও কপটতা প্রদর্শন করবে এবং বহু মানুষ শত্রু হয়ে যাবে। কেননা, 'সফল মানুষ হল সেই, যে কপট বন্ধু ও অকপট শত্রু পায়।'
সাফল্যের পর্বতচূড়ায় তুমি আরোহণ কর। তবে জেনে রেখো যে, 'সফলতা অনেক সময় মানুষের জীবনে পতন ডেকে আনে।'
📄 সমালোচনা
এ সংসারে ত্রুটি-বিচ্যুতিহীন মানুষ নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। এমন কেউ নেই, যার পশ্চাতে কেউ গীবত করে না, সমালোচনা করে না। সমালোচনামুক্ত হয়ে জীবন গড়া অসম্ভব। সুতরাং সমালোচনাকে উপেক্ষা ক'রেই জীবন পরিচালনা করা জ্ঞানীর কাজ। 'জীবনের সময় বড় মূল্যবান। কে কী ভুল করেছে সে সমালোচনায় আমাদের সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বরং আমাদের কী করা উচিত, সেই আলোচনা ও পরিকল্পনায় সময় ব্যয় করা উচিত।'
সুতরাং 'লোকে কী বলবে, তা তুমি মোটেও ভেবো না, যতক্ষণ তুমি জানো যে, তুমি ঠিক পথেই আছ।' 'উচিত বলার জন্য আমাদের সৎ সাহস থাকা দরকার। মানুষকে ভয় করা আমাদের উচিত নয়। অপরে আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, সে কথাও চিন্তা করা উচিত নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সৎ হলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।'
'নিজে ঠিক থাকলেই হল। লোকে কী বলে, না বলে, তা নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়।'
তুমি যদি ত্রুটিহীন হও, তাহলে তো সমালোচনার ভয় হওয়ার কথা নয়। 'তোমার যদি কোন দোষ না থাকে, তাহলে তোমার ভাবনা কী? ধোপা কেবল ময়লা জামা-কাপড়কেই পাথরে আছাড় মেরে থাকে।'
যদি লোকের সমালোচনায় কান দাও, তাহলে সাফল্য তোমার মাথাচুম্বন করবে না। লোকেদের কথা উপেক্ষা করতে পারলে তুমি সফল হতে পার। "ব্যাঙের দল প্রতিযোগিতায় শরীক হল, ঐ পুরাতন উঁচু মিনারে উঠতে হবে। অনেক অংশগ্রহণকারী সহ দর্শকরাও বলতে লাগল, 'সম্ভব নয়, সম্ভব নয়! অত উঁচুতে কেউ উঠতে পারে নাকি?' শুরু হল প্রতিযোগিতা। অনেকে পড়তে লাগল। নিচে থেকে চিৎকার, 'কেউ পারবে না, কেউ পারবে না।' কিন্তু দেখা গেল, একজন উঠেই গেছে! কেমন ক'রে? সবারই মনে প্রশ্ন কীভাবে সে পারল? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সে ছিল কানে কালা। কারো সমালোচনা বা অনুৎসাহদান তার অদম্য প্রচেষ্টাকে দমাতে পারেনি.”
'বড় সুখী তারা, যারা লোকেদের সমালোচনা উপেক্ষা ক'রে চলে।' পক্ষান্তরে যারা সমালোচনায় কান দেয়, তারা কর্মে বিচলিত হয়। মোটেই সুখী হতে পারে না।
একদা লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র সহ একটি গাধার পিঠে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কতক লোক বলতে লাগল, লোকটা কত নিষ্ঠুর! একটি গাধার পিঠে দু' দু'টো লোক। এ কথা শুনে হাকীম নেমে হাঁটতে লাগলেন।
কিছু দূর পরে আরো কিছু লোক তাঁদেরকে দেখে বলে উঠল, ছেলেটি কত বড় বেআদব! বুড়োটাকে হাঁটিয়ে নিজে সওয়ার হয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনে ছেলেটি নেমে এল এবং হাকীম সওয়ার হলেন। আরো কিছু দূর পর কিছু লোক বলতে লাগল, বুড়োটির কী আক্কেল! নিজে গাধার পিঠে চড়ে ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনে তিনিও গাধার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু পরে আরো কিছু লোক সমালোচনার সুরে বলল, লোক দু'টো কি বোকা! সঙ্গে সওয়ার থাকতে পায়ে হেঁটে পথ চলছে। এ বারে হাকীম তাঁর ছেলেকে বললেন, 'দেখলে বাবা! তুমি চাপলেও দোষ, আমি চাপলেও দোষ, দু'জনে চড়লেও দোষ, কেউ না চড়লেও দোষ। সুতরাং তুমি কারো কথায় কর্ণপাত করো না।' কারণ, লোকের খোঁটা থেকে বাঁচা কঠিন। নিজের বিবেকে কাজ ক'রে যাওয়া উচিত। হাথী চলতা রহেগা, কুত্তা ভুক্তা রহেগা।
কিন্তু সমালোচনা বন্ধ করার উপায় আছে কী? তা অবশ্যই নেই। 'মানুষের অন্যায় সমালোচনা বন্ধ করতে পারা যায় না বটে, কিন্তু একটা ব্যাপার অবশ্যই বন্ধ করা যায়, আর তা হল, অন্যায় সমালোচনা শুনে দুশ্চিন্তা করা।'
আর তার উপরে যদি পারা যায়, তাহলে সমালোচনার বিনিময়ে সমালোচকের প্রশংসা কর। গালির বদলে তার সুনাম কর।
এক আলেমের ভক্তরা বলল, 'অমুক আপনাকে গালি দেয়, আর আপনি তার প্রশংসা করেন?'
তিনি বললেন, 'ছাড়ো, যার যেমন প্রকৃতি, সে তেমন আচরণ প্রদর্শন করবে। যে হাঁড়িতে যা আছে, সে হাঁড়ি উবুড় করলে তাই পড়বে। কুকুরের ঘেউ-ঘেউ যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে না পারে, তাহলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঘেউ-ঘেউ ক'রে ক্লান্ত হতে দাও।'
অনেকে সমালোচনা করে নিছক কুধারণাবশে। মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সুধারণা না রেখে মন্তব্য করে। অথচ প্রকৃতত্ব না জেনে, আসল ঘটনা না জেনে, নিজের কুধারণার বশবর্তী হয়ে কোন বিষয়ে মন্তব্য করা অন্যায়।
এক বাদশা মৃত্যুর পূর্বে মানুষের শিক্ষণীয় একটি অসিয়ত ক'রে মারা গেলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, 'আমি মারা গেলে কাফনের সাথে আমার হাত দু'টি না বেঁধে খোলা রেখে দিয়ো। যাতে গোরস্থানে যাওয়ার সময় লোকে দেখে এই শিক্ষা নেয় যে, অত বড় বাদশা হয়েও খালি হাতে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হচ্ছে!' তাঁর অসিয়ত পালন ক'রে তাই করা হল। কিন্তু অনেক লোকে তা দেখে বলল, 'সারা জীবন খাজনা আদায় ক'রে গেল। মরার পরেও খাজনা চাইতে চাইতে কবরে যাচ্ছে!'
অনেকে নিজের উপর অনুমান ক'রে অপরের সমালোচনা করে। নিজে চোর, তাই অপরকেও সন্দেহবশে চোর ধারণা করে। নিজে লম্পট, তাই কুধারণাবশে অপরকেও লম্পট মনে করে।
একটি রাখাল পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল। তা দেখে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক রাখাল বলল, 'এই! তুই কী করছিস্ আমি বলতে পারি।' সে বলল, 'বল তো দেখি, কী করছি?' বলল, 'তুই মুতছিস্। তাই না?' পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা রাখালটি বলল, 'হ্যাঁ মাইরি! তুই কী ক'রে জানতে পারলি?' সে বলল, 'আমিও অমনি ক'রে মুতি।'
কারো প্রতি বিদ্বেষ থাকলে তার সমালোচনা করা স্বাভাবিক। অনেক সময় তার ভালো জিনিসও বিদ্বেষীর কাছে খারাপ মনে হয়। 'দেখতে লারি চলন বাঁকা'র নীতিতে বিদ্বেষী বা হিংসুক হিংসিতের কথায়, লেখায়, চলায় বা বলায় ভুল দেখতে পায়।
'মানুষ যে কোন কিছুরই (ব্যক্তি, পরিবেশ, অবস্থা, আদেশ-উপদেশ, নীতিকথা ইত্যাদির) সম্মুখীন হলে বুঝবার বা জানবার দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তা থেকে কিছু না কিছু পায়। অন্যথা ব্যর্থ হয়। আর বিরূপ বা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তা থেকে বহু দোষ সে খুঁজে পায়। অনেকে খারাপও গেয়ে থাকে; যেমন ফুল থেকে মৌমাছি মধু এবং মাকড়ষা বিষ পায়।'
পক্ষান্তরে মানুষ নিজের দোষ দেখায় অভ্যস্ত হলে পরের দোষ দেখতে পায় না। কিন্তু অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের দোষ দেখতে পায় না। কিন্তু পরের দোষ খুব ভালোরূপে দেখতে পায়।
এমন লোকেরা 'নিজের পানে চায় না শালী, পরকে বলে ডাবরাগালি।' 'আনারস বলে, কাঁঠাল ভায়া তুমি বড় খসখসে!' 'গুয়ে বলে গোবর দাদা, তোর গায়ে কেন গন্ধ?'
এরা নিজের দোষটা দোষ মনে করে না। পরের দোষটাই দোষ বলে ধরে।
'তুমি আপনার দোষ কভু দেখিতে না পাও হে, দেখি, পাইলে পরের দোষ শতমুখে গাও হে। সদা জীবের জীবন হরি সুখে মাংস খাও হে, তবু জীবহত্যাকারী বলে ব্যাঘ্রে দোষ দাও হে।'
অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেদের সাময়িক সুখ নিয়ে গর্বিত হয় এবং অপরকে দুঃখী দেখে নিজের মনে আনন্দ পায়। যথাসময়ে সে ভুলে যায় যে, তারও ঐ দুঃখ অবধারিত। যুবক-যুবতীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, তাদেরকে ভর্ৎসনা করে। 'ঘুঁটে পুড়ে গোবর হাসে, ওরে গোবর তোরও এ দিন আছে।'
'নক্ষত্র খসিল দেখে দীপ মরে হেসে, বলে, এত ধুমধাম, এই হল শেষে! রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে, যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় ঢুকে।' 'মেঘ বলে, সিন্ধু! তব জনম বিফল, পিপাসায় দিতে পার একবিন্দু জল? সিন্ধু কহে, পিতৃনিন্দা কর কোন্ মুখে? তুমিও অপেয় হবে পড়িলে এ বুকে।'
সুতরাং তুমি কারো সমালোচনা করো না। বিশেষ ক'রে 'তোমার বাড়ি যদি কাঁচ-নির্মিত হয়, তাহলে অপরের বাড়িতে পাথর মেরো না।' কারণ জানই তো, ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। আর তাতে তোমার কাঁচের বাড়ি ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে যাবে।
সমালোচনামুক্ত হতে চাও? তাহলে কিছু হয়ো না, কিছু করো না। কিছু না করলে সমালোচনার পাত্র হতে হয় না। 'যত বেশি লক্ষ্য সিদ্ধির পথে তুমি এগোবে, ততই সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। মনে হয় সাফল্য ও সমালোচনার মাঝে একটি যোগসূত্র আছে। সাফল্য যত বেশি, সমালোচনাও তত বেশি।' 'তোমার মূল্যমান অনুসারে তোমার সমালোচনাও বৃদ্ধি পাবে।' 'সমালোচনামুক্ত কি মানুষ আছে? যে বড় কাজ করে, লোকেরা তারই সমালোচনা করে। সমুদ্রের প্রতি লক্ষ্য কর, তার মাঝে মড়া ফেলা হয়, মড়া ভাসে উপরে। কিন্তু তার গভীরে থাকে মণি-মুক্তা-প্রবাল-পদ্মরাগ। বনে- বাগানে কত শত গাছ রয়েছে। কিন্তু লোকেরা সব ছেড়ে দিয়ে ফলদার গাছেই ঢিল মারে। আকাশের মাঝে অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে। কিন্তু কেবল চন্দ্র ও সূর্যেই গ্রহণ লেগে থাকে।'
সুতরাং তুমি যদি 'মহান' হও, তাহলে সমালোচনা তোমার কী ক্ষতি করতে পারে? 'বিশাল সমুদ্রে রাখালে পাথর মারলে সমুদ্রের কী যায়-আসে? উজ্জ্বল নক্ষত্রে ঢিল মারলে, সে ঢিল কি তার গায়ে লাগে? জ্ঞানীর মানহানির জন্য অজ্ঞানীর কুমন্তব্য নিতান্ত অসার। তাতে জ্ঞানীর কিছু আসে-যায় না।'
যারা হীন হয়েও মহান ব্যক্তিদের সমালোচনা করে, তারা নিজেদের হীনতারই পরিচয় দেয়। মহানের মহত্ত্ব কিছুও ক্ষয় হয় না, পরন্তু হীনদের হীনতা আরো বৃদ্ধি পায়। যারা 'বড়'কে 'ছোট' করতে প্রয়াসী হয়, আসলে সমাজের চোখে তারা আরো 'ছোট' হয়ে যায়।
'শক্তি যার নাই নিজে বড় হইবারে, বড়োকে করিতে ছোট তাই সে কি পারে? হাউই কহিল, মোর কী সাহস ভাই, তারকার মুখে আমি দিয়ে আসি ছাই। কবি কহে, তার গায়ে লাগে না তো কিছু, সে ছাই ফিরিয়া আসে তারি পিছু পিছু।'
সুফিয়ান সওরী বলেন, 'যে নিজেকে চিনেছে, তার সম্বন্ধে লোকের সমালোচনা কোন ক্ষতি করতে পারে না।'
সমালোচনা তো হবেই। সুতরাং তুমি যদি লোকের সমালোচনাকে ভয় কর, তাহলে কিচ্ছু করো না, কিচ্ছু বলো না, কিচ্ছু লিখো না এবং কিচ্ছু হয়ো না। জেনে রেখো, তুমি সমালোচিত হলেও সমালোচক থেকে তুমিই বড়। কারণ সমালোচনা বড্ড সহজ। কঠিন হল রচনা করা।
'বোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক, এরই তরে মধুকর এত করে জাঁক! মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই, আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই।'
পক্ষান্তরে একজন লেখক, তার গঠনমূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক সমালোচকদেরকে স্বাগত জানানো উচিত। 'যাঁরা সত্যপক্ষে ভূয়সী প্রশংসার দাবী রাখেন, তাঁরাই আসলে নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে খুশী মনে বরণ ক'রে নেন।' 'তুমি যদি সমালোচনা সহ্য ক'রে নেওয়ার ক্ষমতা না রাখ, তাহলে প্রশংসারও যোগ্য নও তুমি।'
'মহান ব্যক্তিত্বের মহানতার আন্দাজ তখনই হয়, যখন দেখা যায় যে, তিনি তাঁর সমালোচকদেরকে খুশী মনে ক্ষমা ক'রে দিচ্ছেন।'
'আশ্চর্য সেই ব্যক্তির প্রতি, যে তার সেই গুণের কথা শুনে আনন্দিত হয়, যা তার মধ্যে নেই। কিন্তু যে দোষ তার মধ্যে আছে, তার কথা শুনে সে রাগান্বিত হয়।' আশা করি, তুমি সেই ব্যক্তি হবে না।
'আমাদের সমালোচকদের গোল্লায় পাঠানোর একমাত্র উপায় হল এ কথাই বলা, আমার সমালোচক যদি আমার সমস্ত ত্রুটির কথা জানতো, তাহলে আরো জোর সমালোচনা করতে পারতো।'
সুতরাং সমালোচনা গঠনমূলক হলে অথবা নিজের মধ্যে ত্রুটি থাকলে তা মেনে নিতে কোন প্রকার অহংকার বা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। উচিত নয় গোঁড়ামির অন্ধ একগুঁয়েমিকে নিজের চরিত্রে সগর্বে লালন করা। বরং উচিত হল, উদারতা প্রদর্শন করা এবং নিজেকে সংশোধন ক'রে নেওয়া।
আর ভক্তদের উচিত, সেই গঠনমূলক সমালোচনাকে সাদরে গ্রহণ ক'রে নিজেদের সঞ্চিত জ্ঞানে সংশোধন আনয়ন করা এবং সমালোচিত ভক্তিভাজনের প্রতি কেবল অন্ধ ভক্তির ফলে তা প্রত্যাখ্যান না করা।
এ কথাও সত্য যে, সমাজে বহু অবিবেচক সমালোচক আছে, অযোগ্য সমালোচক আছে। 'যারা প্রত্যেক বস্তুরই দাম জানে, কিন্তু কোন বস্তুরই প্রকৃত মূল্য জানে না, তারাই সমালোচক।'
যে খামোখা লোকের ভুল ধরে বেড়ায়, তার ভুল ছোট নয়। যারা বড়দের ভুল ধরে নিজেদেরকে 'বড়' প্রমাণ করতে চায়, তারা আসলে বড় নয়। 'নীচ ও হীন মনের মানুষেরাই বড় মানুষদের ত্রুটি খুঁজে পেয়ে তার সমালোচনায় প্রচুর আনন্দ পায়।'
'নোংরা মানুষেরাই বিখ্যাত মানুষদের ভুল আর বোকামিতে আনন্দবোধ করে।'
'কানাকড়ি পিঠ তুলি কহে টাকাটিকে, তুমি ষোল আনা মাত্র, নহ পাঁচ সিকে, টাকা কয়, আমি তাই, মূল্য মোর যথা, তোমার যা মূল্য তার ঢের বেশি কথা।' 'কহিল কঞ্চির বেড়া, ওগো পিতামহ বাঁশবন! নুয়ে কেন পড় অহরহ? আমরা তোমারি বংশে ছোট ছোট ডাল, তবু মাথা উঁচু করে থাকি চিরকাল। বাঁশ কহে, ভেদ তাই ছোটতে বড়তে, নত হই, ছোট নাহি হই কোন মতে।'
'যে ব্যক্তি নিজের গুণ ও পরের দোষ ছাড়া অন্য কিছু দেখে না, সে ব্যক্তি অপেক্ষা অন্ধই উত্তম।' সুতরাং ছিদ্রান্বেষণের অভ্যাস বর্জন কর। ভেবে দেখো, 'তুমি কারো ভুল ধরলে সে তোমার প্রতি রেগে যাবে। তোমার জ্ঞান দ্বারা সে উপকৃত হবে, অথচ সে তোমাকে নিজের দুশমন মনে করবে।' তাছাড়া দোষ ধরে বেড়ানো সাধারণতঃ ভালো লোকের কাজ নয়। কবি বলেছেন,
'দুষ্টগণে ঘাট পেলে হাট মাঝে বলে, অনাসে মানীর মান ফেলে দেয় জলে। দোষ দেখে রোষ করা ইহা এক দোষ, কেন না জানিয়া কেহ নাহি করে দোষ। মহাজ্ঞানী হইলেও দোষশূন্য নয়, প্রমাণ তাহার দেখ ময়ুরের পায়।'
অনেকে নিছক হিংসাবশে অথবা স্বার্থবশে অথবা শত্রুতাবশে কেবল ছোট করার জন্য নির্ভুলকে ভুল প্রমাণ করার অপচেষ্টায় সমালোচনা করে। কিন্তু 'চামচিকা যদি দিনের বেলায় চোখে দেখতে না পায়, তাহলে তাতে সূর্যের দোষ কী?'
'শত্রুতার চক্ষে গুণ দোষ ভয়ানক, পুষ্পসম সা'দী শত্রু-চক্ষেতে কন্টক। পারি আমি কারো হৃদে কষ্ট নাহি দিতে, শত্রুর কী করি? সে যে স্বতঃ ক্ষুন্ন চিতে।'
ভুল করলেও 'এ সংসারে এমন কেউ নেই যে একাধারে ভুল করেই যায়। এমনকি খারাপ ঘড়িও প্রত্যহ দুইবার সঠিক সময় নির্দেশ করে।' 'পানি নোংরা হলেও তার দ্বারা আগুন নিভানো যায়।' 'আমরা সবাই চাঁদের মতো। অপর পিঠ অন্ধকারাচ্ছন্ন।' একদিকে সুনাম থাকলে অন্যদিকে দুর্নাম থাকা অস্বাভাবিক নয়। একদিকে ভালো হলে অন্য দিকে মন্দ হওয়া অবাস্তব নয়। একদিকে ছোট হলে অন্যদিকে বড় হওয়া অলৌকিক নয়।
'ভিমরুলে মৌমাছিতে হল রেষারেষি, দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি। ভিমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ, তোমার দংশন নহে আমার সমান। মধুকর নিরুত্তর, ছলছল আঁখি- বনদেবী কহে তারে কানে কানে ডাকি, কেন বাছা নতশির! এ কথা নিশ্চিত, বিষে তুমি হার মানো, মধুতে যে জিত।'
তুমি যত বেশি ভাল লোক হবে, তোমার সামান্য দোষ তত বেশি সমালোচিত হবে। কাপড় যত সাদা হবে, তার দাগ তত স্পষ্ট হবে। লোকেরা যখন তোমার সম্পর্কে সমালোচনার কিছুই না পাবে, তখন তোমার বয়স নিয়ে সমালোচনা করবে।
তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, সমাজে গঠনমূলক সমালোচনা না হলে, মন্দকে 'মন্দ' বলে সাধারণ লোকেরা চিনতে পারবে না। কোন সমালোচনা, কোন প্রতিবাদ না হলে কোন অন্যায়কে মানুষ 'অন্যায়' বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে না।
'দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের জন্য সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। যদি সৎ ব্যক্তিরা কিছুই না করেন, তাহলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করে।'
পরিশেষে বলি, মহানবী ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার (কোন মুসলমান) ভাইয়ের উপর তার সম্ভ্রম অথবা কোন বিষয়ে যুলুম করেছে, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তার কাছে (ক্ষমা চেয়ে) হালাল ক'রে নেয়, ঐ দিন আসার পূর্বে যেদিন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। তার যদি কোন নেক আমল থাকে, তবে তার যুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা হতে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার নেকী না থাকে, তবে তার (মযলুম) সঙ্গীর পাপরাশি নিয়ে তার (যালেমের) উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
📄 আত্মসমালোচনা
তোমার হয়তো অভিজ্ঞতা থাকবে, 'মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে নিজের সাথে।' 'জ্ঞানী মানুষ নিজের মনকেই অধিক শাসিয়ে থাকে।' 'অনেক সময় নিজেকে সংশোধন ক'রে শত্রু দমন করা যায়।' 'সবথেকে কঠিন জিনিস হল নিজেকে চেনা। আর সবথেকে সহজ জিনিস হল অপরকে উপদেশ দেওয়া।'
কিন্তু 'যে মানুষ নিজ মনের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সেই হল উল্লেখযোগ্য মানুষ।' 'যে ব্যক্তি নিজের সমালোচনা করতে পারে, সেই সর্বাপেক্ষা বেশী বুদ্ধিমান।' 'যে মানুষ চেনে সে বড় বুদ্ধিমান। কিন্তু যে নিজেকে চেনে সে সবথেকে বড় বুদ্ধিমান।'
'সেই সত্যিকারের মানুষ, যে অন্যের দোষ-ত্রুটি নিজেকে দিয়ে বিবেচনা করে।'
যে ব্যক্তি পরের ছিদ্র অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকবে, সে ব্যক্তি নিজের ছিদ্র সংশোধনে প্রয়াসী হবে। আর যে নিজের ছিদ্র অন্বেষণ করবে, সে পরের ছিদ্র অন্বেষণ করতে পারবে না।
সুতরাং পরকে ছেড়ে তুমি নিজের দোষ গণনা করায় ব্যাপৃত হও। পরের আগে ঘরের সংশোধন সাধন কর। আত্মসমালোচনায় অভিনিবিষ্ট হও। মানুষের উপকার সাধন ক'রে নিজের ত্রুটির কথা বিস্মৃত হয়ো না।
'চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে।'
'সকল মানুষ যখন তোমার বাহ্যিক গুণগ্রাম দেখে প্রশংসা করবে, তখন তোমার উচিত, তোমার আভ্যন্তরীণ ত্রুটি অন্বেষণ ও বিচার করা। যাতে তুমি তোমার নিজের গোপন ত্রুটি সংশোধন করে নিজের আত্মর কাছে বিশ্বস্ত হতে পার। আর তা লোকের ঐ প্রশংসা থেকে বহুগুণ উত্তম।'
'চোখ সব কিছু দেখতে সাহায্য করে, কিন্তু নিজেকে দেখতে পায় না। তার জন্য মনের প্রয়োজন হয়।'
প্রকাশ থাকে যে, 'পরের দোষ ঢাকতে হবে এবং কারো ছিদ্রান্বেষণ করা যাবে না' মানে এই নয় যে, সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া যাবে না এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হবে না। বরং স্বস্থানে সব কিছুই করা মুসলিমের জন্য বিধেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মুসলিম মুসলিমের ভাই, সে তার উপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে অত্যাচারীর হাতে ছেড়ে দেবে না। যে ব্যক্তি তার ভায়ের প্রয়োজন পূর্ণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের কোন এক বিপদ দূর ক'রে দেবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বহু বিপদের একটি বিপদ দূর ক'রে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন।” (বুখারী, মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোন গর্হিত (বা শরীয়ত বিরোধী) কাজ দেখবে, তখন সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তিত করে। তাতে সক্ষম না হলে যেন তার জিহ্বা দ্বারা, আর তাতেও সক্ষম না হলে তার হৃদয় দ্বারা (তা ঘৃণা জানবে)। তবে এ হল সব চাইতে দুর্বলতম ঈমানের পরিচায়ক।” (মুসলিম ৪৯নং, আহমাদ, আসহাবে সুনান)
📄 হা-হুতাশ করো না
জীবনে পরাজিত তুমি? অথবা লাঞ্চিত ও অপমানিত তুমি? অথবা বঞ্চিত বা প্রবঞ্চিত তুমি? অথবা প্রতারিত বা অত্যাচারিত তুমি? অথবা রোগাক্লিষ্ট বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা শোকসন্তপ্ত তুমি?
হা-হুতাশ করো না ভাইটি! আক্ষেপ ও আফসোস করো না বোনটি! দুঃখের চাপা অন্তর্বাপকে নয়নাশ্রু হয়ে প্রবাহিত হয়ে যেতে দাও। মন হাল্কা হয়ে যাবে। কান্না করলে, আল্লাহর কাছে কাঁদ। অভিযোগ করলে তাঁর কাছে কর। তবে তাঁর কাছে তাঁরই বিরুদ্ধে অভিযোগ ক'রে বসো না। কারণ, তাতে সর্বনাশ আছে।
শত্রুকে শায়েস্তা করতে পারছ না? তোমার বিরোধীরা তোমাকে গালাগালি করছে? তাতেও দুঃখ করো না। তোমাকে কেউ 'শয়তান' বা 'কাফের' বলে গালি দিলে, তুমি তা না হলে সেই শয়তান বা কাফের। তোমাকে বলতে হবে না। এটাই আল্লাহর বিধান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "যখন কোন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি 'ফাসেক' অথবা 'কাফের' বলে অপবাদ দেয়, তখনই তা তার উপরেই বর্তায়; যদি তার প্রতিপক্ষ তা না হয়।” (বুখারী)
তিনি আরো বলেন, “বান্দা যখন কোন কিছুকে অভিশাপ করে, তখন সে অভিশাপ আকাশের দিকে উঠে যায়। কিন্তু তাকে প্রবেশ করতে না দিয়ে আকাশের দরজাসমূহকে বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়। ফলে সেখান হতে তা পুনরায় পৃথিবীর দিকে নেমে আসে। কিন্তু তাকে আসতে না দিয়ে পৃথিবীর দরজাসমূহকেও বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়। অতঃপর তা ডাইনে-বামে বিচরণ করতে থাকে। পরিশেষে কোন গতিপথ না পেয়ে অভিশপ্তের দিকে ফিরে আসে। কিন্তু (যাকে অভিশাপ করা হয়েছে সে) অভিশপ্ত (সঙ্গত কারণে) অভিশাপযোগ্য না হলে তা অভিশাপকারী ঐ বান্দার দিকে ফিরে যায়." (অর্থাৎ, নিজের করা অভিশাপ নিজেকেই লেগে বসে!) (আবু দাউদ ৪৯০৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২৬৯নং)
বঞ্চনায়-প্রবঞ্চনায় তুমি আফসোস করো না। যে জিনিস থেকে তোমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা তুমি কিয়ামতে পাবে।
উৎপীড়িত বন্ধু আমার! হৃদয়ের জমিতে যদি তুমি 'যদি ও হায়' রোপণ কর, তাহলে 'আফসোস'-এর কাঁটা ছাড়া কিছুই উৎপাদন হবে না।
দুনিয়াতে হয়তো এমন কিছু লোককে হারিয়ে থাকো, যাদের উপস্থিতি তোমার কোন উপকার করেনি, সুতরাং সে লোকেদের অনুপস্থিতিও তোমার কোন অপকার করবে না। অতএব সে হারানোতে তোমার আফসোস হওয়া উচিত নয়। তবে যাদের হারানোতে তোমার ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তাদের জন্য আফসোস স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে কোন লাভ নেই।
এ সংসারে কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য এ জীবন বড় বোঝা। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এ জীবনের জন্য বড় বোঝা। তারা চলে গেলে আফসোস কীসের?
কিন্তু যারা চলে গেলে অনেক মানুষের জীবন অচল হয়ে যায়, তাদের প্রতি আফসোস তো হবেই। কিন্তু সৃষ্টির নিয়মে যা ঘটতে বাধ্য তার পশ্চাতে আফসোস আর কোন্ উপকারে আসবে? নবী-অলীগণ চলে গেছেন, তবুও জীবনের চাকা সচল আছে। তোমারও কোন জরুরী ব্যক্তিত্ব বা অবলম্বন বিদায় নিলে তোমার জীবনের চাকাও অচল হবে না।