📄 পরোপকার
পৃথিবীতে কত শত বৃক্ষলতা আছে যা অকেজো, আকাশে কত মেঘ ভাসে যাতে বৃষ্টি হয় না। কত মানুষ আছে যাদের দ্বারা মানুষের কোন উপকার সাধিত হয় না।
মানুষ হয়ে বিশেষ ক'রে বিপদের সময় যদি মানুষের পাশে কেউ না দাঁড়ায়, তাহলে তার নিজেকে 'মানুষ' বলে পরিচয় দেওয়াটা বড় লজ্জাকর। তোমার জীবন যদি নিজের কাজে না লাগে, তাহলে সে জীবনকে অপরের কাজে লাগিয়ে দাও, শান্তি পাবে। লোহা দিয়ে সোনার গয়না তৈরী হয় না ঠিকই, কিন্তু সোনার গয়না তৈরী করতে লোহার হাতুড়ির দরকার হয়। তুমি সোনা না হয়ে লোহা হলেও তোমার দ্বারা উপকার অবশ্যই হবে। আর পরোপকার সাধনের ফলে তুমিই হবে সর্বোত্তম ব্যক্তি, আল্লাহর কাছে এবং মানুষের কাছেও।
মহানবী বলেছেন, (أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ).
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (সঃ জামে' ১৭৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, (خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ)
অর্থাৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (সঃ জামে' ৩২৮৯, দারাকুত্বনী, সিঃ সহীহাহ ৪২৬নং)
পরোপকারের জন্য তোমাকে মানুষ সম্মান জানাবে। যেহেতু 'মানুষ যা পেয়েছে, তার জন্য তাকে সম্মান জানানো হয় না, মানুষ পৃথিবীকে যা দিয়েছে, তার জন্যই তার সম্মান।'
উপকার করলে তুমি উপকারের বিনিময়ে প্রত্যুপকার পাবে। মানুষের জীবন একটি প্রতিধ্বনির মত, আওয়াজ দিলে সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে তার কাছে।
অপরকে সাহায্য করলে সাহায্য পাওয়া যায়। জীবনের সুন্দরতম প্রাপ্তি হচ্ছে দানের বিনিময়ে প্রতিদান। আন্তরিকভাবে অপরকে সাহায্য করলে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই সাহায্য করা হয়।
না-না, প্রতিদান পাওয়ার আশায় দান দেওয়া উচিত নয়। 'যা কিছু সুন্দর ও ভালো তা নিজস্ব নিয়মে ফিরে আসে। প্রতিদান পাওয়ার বাসনায় ভালো করার প্রয়োজন হয় না। প্রতিদান আপনিই পাওয়া যায়।'
পরোপকার ক'রে মনে আনন্দলাভ হয়। 'আদর্শ মানুষ সেই, যে অন্যের উপকার করে আনন্দ পায়, আর অন্যে উপকার করলে লজ্জিত হয়। কারণ কোন কিছু দান করা মহত্ত্বের লক্ষণ, আর তা গ্রহণ করা নীচতা।'
'আত্মসুখ অন্বেষণে আনন্দ নাহি রে বারে বারে আসে অবসাদ, পরার্থে যে করে কর্ম তিতি ঘর্ম-নীরে সেই লভে স্বর্গের প্রাসাদ।'
শায়খ আলী তানতাবী বলেন, 'সবচেয়ে বড় মধুর হল পরোপকারিতার স্বাদ।'
পরোপকার করলে যেমন আনন্দ পাওয়া যায়, পরোপকার নিলে তেমনি মনের ভিতর এমন এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়, যাতে প্রত্যুপকার বা প্রতিদান না দিতে পারা পর্যন্ত নিজেকে ঋণী মনে হয়। প্রত্যেক উপকারই মানুষকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে।
'পরোপকার একটি বেড়ি, যা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অথবা প্রতিদান ছাড়া ছাড়ানো যায় না।' উপকৃত উপকারীর দাসে পরিণত হয়।
মুলহাব বিন আবী সাফরাহ বলেন, 'আমি দেখে অবাক হই যে, লোকেরা নিজ মাল দিয়ে পরাধীন গোলাম ক্রয় করে অথচ উপকারিতা দিয়ে স্বাধীন মানুষ ক্রয় করে না।'
মানুষ দু'টি মুখ কখনই ভুলতে পারে না, বিপদের সময় যে তার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং বিপদের সময় যে তার সাথ ছাড়ে।
ইবনুল মুকাফফা বলেন, 'যদি তুমি কোন মানুষের প্রতি উপকার ক'রে থাকো, তাহলে খবরদার তা অন্যের কাছে উল্লেখ করো না। আর যদি কোন মানুষ তোমার প্রতি উপকার ক'রে থাকে, তাহলে খবরদার তা ভুলে যেয়ো না।'
অভিজ্ঞজনেরা বলেন, 'পৃথিবীতে দু'রকমের মানুষ আছে। এক : যারা সবকিছু গ্রহণ করে। দুইঃ যারা সবকিছু দিতে পারে। যারা নিতে জানে তারা খায় ভালো; আর যারা দিতে জানে তারা ঘুমায় ভালো। যারা দিতে জানে, তাদের আছে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, একটি ইতিবাচক মনোভাব এবং তারা সমাজ-সেবায় আগ্রহী। (অবশ্য সমাজ সেবার অর্থ বর্তমানে নেতা তথা রাজনৈতিকদের ছদ্ম সমাজসেবা নয়। এরা প্রকৃতপক্ষে সমাজসেবার নামে নিজেদের সেবা ক'রে থাকে।) প্রত্যেক মানুষেরই কিছু নেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং নিতেও হয়। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কেবলমাত্র গ্রহণ করেন না, দেওয়ারও চেষ্টা রাখেন।'
'পরের জন্য আত্মবিসর্জন ভিন্ন পৃথিবীতে স্থায়ী সুখের অন্য কোন মূল্য নাই।' কবি বলেছেন,
'পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি- এ জীবন-মন সকলি দাও, তার মত সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। পরের কারণে মরণেও সুখ সুখ সুখ করি কেঁদো না আর, যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।'
পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না। পরের জন্য তোমার হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফুটিত কর। ফুল পরের জন্য ফুটেই প্রকৃতির কোলে আনন্দের হাসি হাসে। তুমিও পরের তরে কর্ম ক'রে মিষ্টি হাসির আলোকে ভুবন ভরে দাও। তুমি সেই ফলদার গাছের মতো হও, যাকে ঢিল মারলে তার বিনিময়ে তোমাকে ফল দান করে। তুমি তোমার জীবন কর সোনার মত। যত জ্বালাবে তত ঝলমল করবে। আগুনে পুড়লেও ধূপের মতো তুমি তোমার সুগন্ধ বিতরণ কর।
'যাঁরা মহাপুরুষ হন, তাঁদের দুটি হৃদয় হয়। একটি হৃদয়ে ব্যথিত হন এবং অপরটি দিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন।' 'মহাপুরুষগণ উল্কার মত। তাঁরা নিজেদেরকে জ্বালিয়ে নিজ নিজ যুগকে আলোকিত ক'রে থাকেন।'
'নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল। গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধপান, কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্নদান। বংশী করে নিজ সুরে অপরে মোহিত, স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত।
শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জলধরে, সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।'
অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, তুমি নিজেকে ধ্বংস ক'রে অপরকে জীবন্ত রাখো। বরং বলছি, স্বার্থ ত্যাগ ক'রে মানুষের উপকার কর।
অবশ্য অপরের ভাল করতে যাওয়ার আগে তার সে ভাল পছন্দ কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। নচেৎ, অনেকে পরের উপকার করতে গিয়ে অপকার ক'রে বসে। যেমন নদীর জোয়ারে একটি বড় মাছ বালুচরে আটকে গিয়ে তড়পাচ্ছিল। কিছু বানর তা দেখে তাদের মনে দয়া হলে তাকে পাড়ে তুলে দিল, যাতে পানিতে পড়ে প্রাণ না হারায়!
অনেকে নিজ মেয়ের সংসার-সুখের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার স্বামীর ভালবাসায় আবিলতা আনে। অন্যের সংসার ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বন্ধুর উপকারে তার অনুপস্থিতিতে তার সংসার দেখাশোনা করতে গিয়ে তার স্ত্রীর প্রেমজালে ফাঁসে!
অনেকেই এমন আছে, যারা বাত ভালো করতে গিয়ে বেদনা সৃষ্টি করে। আর তা নিশ্চয়ই কাম্য নয়।
অনেকে প্রশ্ন করে, পরার্থে কী করব? পকেটে পয়সা না থাকলে গরীবের দুঃখে 'আহা' বলে লাভ কী?
আমরা বলি, উপকার কেবল পয়সা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরন্তু তোমার নিজের পয়সা না থাকলে পয়সা-ওয়ালাদের পয়সা নিয়ে উপকার করতে পার। তা না পারলে যে কোনও ভাবে লোকের উপকার সাধন করতে পার। কবি বলেছেন,
'কোন কাজ ছোট নয়, নয় সে নগণ্য, যদি পার কিছু কর মানুষের জন্য।'
একান্তই যদি মানুষের কোনও উপকারে না আসো, তাহলে অন্ততঃ কারো ক্ষতি করো না। শায়খ সা'দী বলেছেন, 'ঐ মৌমাছিদেরকে বলে দাও যে, যদি তারা মধু না দেয়, তবে যেন হুল না ফোঁড়ে।'
আবু যার বলেন, একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! কোন্ আমল সর্বোত্তম?' তিনি বললেন, "আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা।” আমি বললাম, 'কোন্ গোলাম (কৃতদাস) স্বাধীন করা সর্বোত্তম?' তিনি বললেন, "যে তার মালিকের দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও অধিক মূল্যবান।” আমি বললাম, 'যদি আমি এ সব (কাজ) করতে না পারি।' তিনি বললেন, "তুমি কোন কারিগরের সহযোগিতা করবে অথবা অকারিগরের কাজ ক'রে দেবে।” আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি বলুন, যদি আমি (এর) কিছু কাজে অক্ষম হই (তাহলে কী করব)?' তিনি বললেন, "তুমি মানুষের উপর থেকে তোমার মন্দকে নিবৃত্ত কর। তাহলে তা হবে তোমার পক্ষ থেকে তোমার নিজের জন্য সাদকাহস্বরূপ।” (বুখারী-মুসলিম)
উপকারের পথসমূহ খোলা আছে। যেভাবে হোক, সৃষ্টির উপকার কর। শায়খ সা'দী বলেছেন, "কাদায় পতিত গাধার নিকট যেয়ো না। যদি যাও, তাহলে তার উঠার ব্যবস্থা ক'রে দাও। যখন গেলে এবং জিজ্ঞাসা করলে যে, 'কেমন ক'রে পড়লে?' তখন কোমর বেঁধে কাদায় নেমে পড়.”
আর জানই তো, যে কোন প্রাণীর প্রাণ রক্ষা করলে, যে কোন জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে, তাতে সওয়াব হয়। একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর জন্য বেশ্যা ক্ষমা পেতে পারে। একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে খেতে না দিয়ে মেরে ফেললে মানুষ জাহান্নামে যেতে পারে।
বৃক্ষরোপণ করলে অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ করলে সৃষ্টির উপকার সাধন হয়। 'রোপণ হল দুই প্রকার: বৃক্ষ-রোপণ ও ইষ্ট-রোপণ। মাটিতে বৃক্ষ রোপণ করলে মানুষ উপকৃত হয়। আর মানব-মনের জমিতে ইষ্ট রোপণ করলেও মানুষ উপকৃত হয়।' আর তাতে উপকৃত হয় খোদ রোপণকারীও।
একটি মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে তুমি সওয়াব লাভ করতে পারো। "আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ তাআলা তোমার দ্বারা একটি মানুষকে হিদায়াত করেন, তাহলে তা তোমার জন্য (আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ) লাল উটনী অপেক্ষাও উত্তম।” (বুখারী ও মুসলিম)
মানুষের উপকারে অবহেলা প্রদর্শন করা উচিত নয়। নচেৎ শাস্তি স্বরূপ সে অবহেলা নিজের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ হতে পারে। একদিন এক ট্যাক্সিওয়ালা ভাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। একজন এসে বলল, 'পাশের রোডে এক্সিডেন্ট হয়ে এক মহিলা পড়ে আছে। তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।' কিন্তু সে বলল, 'হাসপাতাল দূরে, আমি যাব না।' অতঃপর সে যখন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এল, তখন দেখল বাড়িতে অনেক লোকজন।
আসলে এক্সিডেন্ট ছিল তার মায়ের।
সে যদি সত্বর দুর্ঘটনাগ্রস্ত লোকের সাহায্যে অগ্রণী হতো, তাহলে হয়তো তার মায়ের জীবনকে বাঁচাতে পারতো। কিন্তু পরিণামে অনুতাপ আর কী ফল দেবে?
📄 চরিত্র ও ব্যবহার
নবী বলেন, “কিয়ামতের দিন (নেকী) ওজন করার দাঁড়ি-পাল্লায় সচ্চরিত্রতার চেয়ে কোন বস্তুই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও চোয়াড়কে অপছন্দ করেন।” (তিরমিযী)
"তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার (মুসলিম) ভায়ের জন্য সেই জিনিস পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ১৩, মুসলিম ৪৫, ইবনে হিব্বান ২৩৫নং)
"যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, সে দোযখ থেকে মুক্তি পেয়ে বেহেন্তে প্রবেশ করবে, তার উচিত হল এই যে, সে যেন আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রেখে মৃত্যুবরণ করে এবং মানুষের সাথে ঠিক সেই রকম ব্যবহার প্রদর্শন করে, যে রকম ব্যবহার সে তাদের নিকট থেকে পেতে পছন্দ করে।” (মুসলিম ১৮-৪৪নং)
জীবন-যাত্রাপথের যাত্রী বন্ধু আমার! পৃথিবীর এ সংসার চলছে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক লেনদেনের উপর। লেনদেন ঠিক রাখলে পৃথিবীর মানুষ সুখে হাবুডুবু খাবে। সুন্দর আচার-ব্যবহার প্রদর্শন করলে এবং বিনিময়ে তা পাওয়া গেলে, অনুরূপ সুন্দর আচার-ব্যবহার পাওয়া গেলে এবং বিনিময়ে তা প্রদর্শন করা হলে সংসার সুখময় হয়ে উঠবে।
'নিজ প্রতি ব্যবহার আশা কর যে প্রকার, করহ পরের প্রতি সেই ব্যবহার।'
তুমি কারো নিকট থেকে সুন্দর ব্যবহার না পেলেও বিনিময়ে সুন্দর ব্যবহার প্রদর্শন করো। তুমি বলো, 'তুমি অধম, তা বলিয়া আমি উত্তম হইব না কি?' তাতে সুফল ফলবে অতি শীঘ্র এবং অকল্পনীয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيُّ حَمِيمٌ} ( ৩৪) সূরা ফুসসিলাত
অর্থাৎ, ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত কর; তাহলে যাদের সাথে তোমার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। (হা-মীম সাজদাহঃ ৩৪)
{ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ} (٩٦) سورة المؤمنون অর্থাৎ, তুমি ভালো দ্বারা মন্দের মুকাবিলা কর। তারা যা বলে, আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (মু'মিনূনঃ ৯৬)
মন্দের বিনিময়ে ভালো, অপকারের বিনিময়ে উপকার, বদনামের বিনিময়ে প্রশংসা ইত্যাদি না করতে পারলেও মন্দের বিনিময়ে মন্দ ক'রে নিজেকে ছোট করো না। বরং তাকে ক্ষমা ক'রে দিয়ো।
মহানবী ﷺ বলেছেন, “তোমার সঙ্গে যে আত্মীয়তা ছিন্ন করেছে, তুমি তার সাথে তা বজায় কর, তোমাকে যে বঞ্চিত করেছে, তুমি তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার প্রতি অন্যায়াচরণ করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা ক'রে দাও।” (আহমাদ, হাকেম, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৮৯ ১নং)
'যে তোমাকে ডাকে না হে তারে তুমি ডাকো ডাকো, তোমা হতে দূরে যে যায় তারে তুমি রাখো রাখো।'
'জীবনের বহু শিক্ষার মধ্যে একটি শিক্ষা এই যে, তুমি লক্ষ্য করে দেখো, ফায়ার-ব্রিগেডের কর্মীরা আগুন দিয়ে আগুন নিভায় না।' বরং তারা পানি দিয়েই আগুন নিভায়। নচেৎ আগুন দিয়ে আগুন নিভাতে গেলে তা দ্বিগুন তো হবেই।
অবশ্য এ সময়ে এ কথাও স্মরণে রাখা আবশ্যক, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (মুসলিম)
সব পাপ ক্ষমা করা হলে পাপ ছারপোকার মতো বেড়ে যেতে থাকবে। বাঘকে ক্ষমা করলে ছাগের প্রতি অত্যাচার করা হবে। মক্কা-মদীনার হারাম- সীমানার ভিতরে শিকার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু সেখানে মানুষের জন্য ক্ষতিকর প্রাণী সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ইত্যাদি হত্যা করা নিষেধ নয়।
যার মন নেই, সে আসলে মানুষ নয়; সে একটি কলের পুতুল। 'প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।' যার চরিত্র নেই, সেও আসলে মানুষ নয়, সে অন্য কোন প্রাণী। হৃদয়হীন ও চরিত্রহীন মানুষের কাছে কি কোন সুখ আশা করা যায়?
চরিত্রই হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সুন্দর ব্যবহার ও দ্বীনদারীই হল মানবের মানবিকতা। সুন্দর চরিত্র জীবনের অলঙ্কার ও অমূল্য সম্পত্তি। তোমার 'চরিত্রের মাঝে যদি সত্যের শিখা দীপ্ত না হয়, তাহলে জ্ঞান, গৌরব, আভিজাত্য, শক্তি সবই বৃথা।'
'যদি ধন নাশ হয় তায় কিবা আসে যায়, যদি স্বাস্থ্য নাশ হয় তবে কিছু হয় ক্ষয়, হইলে চরিত্র নাশ সর্বনাশ হয়।'
চরিত্র হল মানুষের সর্বোচ্চ বংশ-পরিচয়। আলী (রাঃ) পুত্র হাসানকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিলেন, 'বৎস্য আমার ৪টি কথা মনে রেখো: সবচেয়ে বড় ধনবত্তা হল বুদ্ধিমত্তা, সবচেয়ে বড় নিঃস্বতা হল, মূর্খতা, সবচেয়ে বড় বাতুলতা হল, অহংকার এবং সবচেয়ে উচ্চ বংশ হল সচ্চরিত্রতা।'
সুখ-বাজারের ব্যাপারী বন্ধু আমার! ধন-মাল দিয়ে সকল মানুষের মন সন্তুষ্ট করতে পারবে না, কুলাতেও পারবে না। কিন্তু তোমার সুন্দর চরিত্র দ্বারা তা পারবে।
মানুষের সাথে কৃত ওয়াদা, চুক্তি, অঙ্গীকার যথার্থভাবে পালন কর। মানুষের সাথে এমন ব্যবহারে তুমি সততা ও বিজ্ঞতা প্রয়োগ কর। 'কোনও কাজ নিষ্পত্তি করার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হয় দুটি স্তম্ভের উপর। সে দুটি হল : সততা ও বিজ্ঞতা। যদি তোমার আর্থিক ক্ষতিও হয়, তবু তোমার অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার নামই সততা। আর বিজ্ঞতা হচ্ছে, যেখানে ক্ষতি হবে সেই রকম বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ না হওয়া।'
রূঢ়তা ও কর্কষতা বর্জন কর। কারো সাথে সাক্ষাৎ করলে হাসি মুখে করো, কথা বললে মিষ্টি ভাষায় বলো, কেউ কথা বললে ধ্যান দিয়ে শুনো, অঙ্গীকার করলে যথারূপে পালন করো, মূর্খদের সাথে মজাক করো না, হক ও সত্য যে গ্রহণ করে না তার মজলিসে বসো না, বেআদবের সাথে ওঠাবসা করো না, যে কথা ও কাজে অপমানিত হতে হয়, সে কথা ও কাজে থেকো না।
সচ্চরিত্রের গুণাবলী: মন হবে সরল, হৃদয় হবে উদার, চেহারা হবে হাস্যময় এবং ভাষা হবে মধুর।
মানুষের রূপ ও পোশাক নয়, বরং তার ভদ্রতাই তার ব্যবহারকে সুন্দর করে। আর তার সুন্দর ব্যবহারই তাকে সর্বসুন্দর ক'রে তোলে।
উমার বলেন, 'কারো সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ো না, যতক্ষণ না তাকে রাগের সময় পরীক্ষা ক'রে নিয়েছ।' অর্থাৎ, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, অথবা রাগের সময় অশ্লীল বকে, অথবা ভাঙচুর করে, মশা মারতে কামান দাগে, অথবা অসমীচীন কথাবার্তা বলে, উপকারীর উপকার ভুলে গিয়ে তার প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে তাদেরকে অপমান করে, সে সৎ চরিত্রের অধিকারী নয়। চরিত্রবান হতে তুমি বিনয়ী হও। 'দুর্বলদের সাথে ব্যবহারেই মহৎ ব্যক্তির মহত্ত্ব বুঝা যায়।' 'অনেক বড় মানুষ আছেন, যাঁর সামনে গেলে নিজেকে ছোট মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত বড় মানুষ হলেন তিনিই, যাঁর সামনে গেলে কেউ নিজেকে ছোট ভাবে না।' আর 'সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হলেন তিনি, যাঁর মেজাজ বড় ঠান্ডা।' যাঁর ব্যবহার অতি ভদ্র ও বিনয়-নম্র।
ব্যবসার মাঝে সুখ-সন্ধানী বন্ধু আমার! এক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'তুমি বড় সুপ্রতিষ্ঠিত সফল ব্যবসায়ী। তোমার পুঁজি কী?' উত্তরে সে বলল, 'আমার পুঁজি হল আমানতদারী, সত্যবাদিতা এবং আমার প্রতি লোকেদের আস্থা।'
'যার মুখে মৃদু হাসি নেই বা যে মুচকি হাসিও হাসতে জানে না, সে যেন কোন ব্যবসা না খোলে।
যার মুখ মিষ্টি, তার বন্ধু অনেক। তার গ্রাহক অনেক।
'মুচকি হাসি বিদ্যুত অপেক্ষা খরচে কম, কিন্তু চমকে অনেক বেশী।' সর্বদা খেয়ালে রেখো, 'তুমি যেন প্রত্যেক মানুষের ক্যামেরার সামনে আছ, সুতরাং তোমার মুচকি হাসি প্রদর্শন কর, সকলের কাছে তোমার ছবি সুন্দর লাগবে।' মুখে মধুর হাসির বিনিময়ে অপরের গলায় প্রেমের ফাঁসি লাগাতে পারবে। তুমি সুখী হবে, তোমার প্রতি লোক সন্তুষ্ট হবে। কারণ 'হাসমুখ ব্যক্তির প্রতি দীর্ঘক্ষণ রাগান্বিত থাকা যায় না।'
তরবারি দ্বারা জয় অপেক্ষা হাসি দ্বারা জয়ের মান ও স্থায়িত্ব অনেক বেশী। যে রাজা এর বিপরীতভাবে জয়লাভ করেন, তিনি রাজ্য লাভ করেন ঠিকই, কিন্তু রাজসুখ লাভ করেন না।
পরিবেশের দুরবস্থা দেখে খবরদার বলো না যে, ‘চুরি করা মহাপুণ্য যদি পেটে সয়, এ জগতে বোকারাই সত্যবাদী হয়। সততা বা সাধুতার দাম নেই কোন, জোচ্চুরি ও ঠকবাজি মূলমন্ত্র জেনো।’
তুমি সৎ ও সত্যবাদী হও। তোমার রুযীতে বর্কত হবে। পথে-হাটে-ঘাটে বহু মানুষের কাছে তুমি পরিচিত হতে পারো, কিন্তু সুপরিচিত হতে অতিরিক্ত গুণের দরকার। আর তা হল তোমার সুন্দর আচরণ ও অমায়িক ব্যবহার।
আহনাফ বলেন, ‘মিথ্যাবাদীর কোন সম্ভ্রম নেই, বিরক্ত লোকের বন্ধু নেই এবং দুশ্চরিত্রের নেতৃত্ব নেই।’
ইমাম শাফেয়ী বলেন, ‘যদি মানুষের অপরাধ ক্ষমা ক’রে দিই, কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখি, তাহলে কারো শত্রুতার দুশ্চিন্তা থেকে নিজের মনকে মুক্ত রাখতে পারি।’
‘তোমার পরে তোমার চর্চা অবশিষ্ট থেকে যাবে, অতএব তুমি তোমার চর্চাকে ভালো ক’রে গড়ে তোল।’
মৃত্যুর পরে যার জন্য মানুষ মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে, তা হচ্ছে তার সুন্দর ব্যবহার, তার কীর্তি। সুতরাং তুমি তোমার ব্যবহার ও কর্মকে অতি সুন্দর কর।
‘যা রাখি আমার তরে মিছে তারে রাখি, আমিও রব না যবে সেও হবে ফাঁকি। যা রাখি সবার তরে সেই শুধু রবে, মোর সাথে ডোবে না সে, রাখে তারে সবে।’
📄 সফলতার পথরথি
‘আমাদের কেউ কেউ তার বুদ্ধিমত্তার বলে সফলতা লাভ করে, আর কেউ সফলতা লাভ করে অপরের বোকামি দেখে।’ ছাত্র ও কর্ম-জীবনে সফলতার জন্য এটা হল মুখ্য প্রবেশ-দ্বার। বুদ্ধি অবশ্য আল্লাহর দান। তা আমাদের কাজে লাগানো উচিত। পরন্ত বুদ্ধিকে নষ্ট হতে দেওয়া কোনক্রমেই উচিত নয়। উচিত নয় এমন পথে চলা, যাতে বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়, বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে যায়।
বুদ্ধিভ্রষ্টতা হল বোকামি। বুদ্ধিমানেরা বোকা লোকেদের বুদ্ধিভ্রষ্টতা দেখে নিজেদের বুদ্ধিকে রক্ষা ও তীক্ষ্ণ করে। ফলে তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত ও বর্ধমান হয়।
সাফল্যের দ্বিতীয় পথ হল অভিজ্ঞদের পরামর্শ। শা'বী বলেন, 'পুরুষ তিন শ্রেণীর; স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্ধপূর্ণ এবং অপূর্ণ। যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা আছে অথচ সে অপরের নিকট পরামর্শ নেয় সে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা নেই কিন্তু সে অপরের নিকট পরামর্শ নেয় সে অর্ধপূর্ণ। আর যার নিজস্ব রায় দেওয়ার ক্ষমতা নেই অথচ সে অপরের নিকট পরামর্শও নেয় না, সে অপূর্ণ।'
আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান বলেন, 'পরামর্শ নিয়ে ভুল করা আমার নিকট পরামর্শ না নিয়ে ভুল করা অপেক্ষা অধিক উত্তম।'
'দুটি আয়নাকে আগাপিছা রাখলে নিজের সর্বাঙ্গ দেখা সম্ভব হয়, তেমনি সংকটের সময় অপরের নিকট পরামর্শ নিলে সমাধানের পথ পাওয়া সহজ হয়।' 'সিদ্ধান্তে যখন জং পড়ে, পরামর্শ তখন তা ঝকিয়ে তোলে।' যে পরামর্শ ক'রে কাজ করে, সে বিপন্ন ও লাঞ্ছিত হয় না।
তবে তোমার গুরুত্বপূর্ণ কাজে এমন লোকের পরামর্শ নিয়ো না, যে আল্লাহকে ভয় করে না। জ্ঞানী হলেও কোন ব্যস্ত ব্যক্তির নিকট পরামর্শ নিতে যেয়ো না।
আর জেনে রেখো, 'সৎ পরামর্শের চেয়ে কোন উপহার অধিক মূল্যবান নয়।' 'প্রয়োজনে একটি সুপরামর্শ অনেক জিনিসের চেয়ে মূল্যবান।' পরামর্শভিত্তিক কাজের গুরুত্ব রয়েছে ইসলামে। মহান আল্লাহ মুসলিমদের চরিত্র বর্ণনায় এক জায়গায় বলেছেন,
{وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ} (۳۸) سورة الشورى
অর্থাৎ, যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, নামায পড়ে, আপোসে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে এবং তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। (শূরাঃ ৩৮)
নবী হন উম্মতের নেতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তবুও মহান আল্লাহ তাঁকে আদেশ দিয়ে বলেছেন,
{فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (١٥٩) سورة آل عمران
অর্থাৎ, আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)
লক্ষণীয় যে, উক্ত আয়াতে পরামর্শ, পরিকল্পনা ও আস্থার কথা একত্রে উল্লিখিত হয়েছে। মহৎ কাজে উক্ত তিনটি বিষয় অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বলেই মহান আল্লাহর ঐ নির্দেশ।
পরন্ত যে কোন বড় বিষয়ে মনের দ্বন্দ্বে মহান আল্লাহর কাছেও ফায়সালা নিতে বিধান রয়েছে ইস্তিখারার। যাতে তাঁর উপর নির্ভরশীলতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ ক'রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ লাভ করা যায়।
কোন সময় কারো বিনা পরামর্শে কোন মহৎ কাজে সফল হলেও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা উচিত নয়। যেহেতু আল্লাহর নির্দেশ 'পরামর্শ কর'। আর অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, 'একবার অভিজ্ঞতা ছাড়াই সফল হলে সত্বর দ্বিতীয়বার অভিজ্ঞদের সহযোগিতা নাও; এতে তোমার সফলতা আরো সুনিশ্চিত ও পাকাপোক্ত হবে।'
তৃতীয় পথ হল পরিশ্রম ও কৃচ্ছ্রসাধন। পরিশ্রম বিনা সফলতা আসে না। শ্রম বিনা সোনার ফসল ফলে না। শ্রম বিনা বিজ্ঞানী হওয়া যায় না। শ্রম বিনা আলেম হওয়া যায় না। শ্রম বিনা অর্থোপার্জন হয় না।
তুমি জ্ঞানী হতে চাইলে 'জ্ঞানীদের পরিশ্রমের কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং তোমাকেও তাঁদের মতো পরিশ্রম করতে হবে।'
'কর্ম-দক্ষতাই মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় বন্ধু।' 'কর্মোজ্জ্বল দিনগুলিই প্রকৃতপক্ষে সোনালী দিন।'
শ্রম-বিমুখতা দারিদ্র্য আনে, টেনে নিয়ে যায় অপরাধ জগতে। 'আলস্য হেন ধন থাকতে দুঃখের আবার অভাব?' 'আলস্য বা পরিশ্রম-বিমুখতা হল মা, তার ছেলের নাম ক্ষুধা এবং মেয়ের নাম চুরি।'
বসে খেলে রাজার ধনও ফুরিয়ে যায়। 'ভরত পাখি দেখল, এক কৃষক কোন পাত্রে কী নিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলে কৃষক বলল, 'কেঁচো। বাজারে বিক্রি ক'রে পালক কিনব।' পাখী বলল, 'আমাকে দাও এবং আমার পালক নাও।' অলস পাখী বসে খেয়ে সমস্ত পালক নষ্ট করল। পরিশেষে সে মারাই গেল। আশা করি, বাপের বা শ্বশুরবাড়ির হোটেলে বসে খাওয়া তুমি সেই অলস নও।
'কর্মবিমুখতা মরিচার মত, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও ক্ষয় করে।' সুতরাং আলস্য ছাড় এবং কাজে লেগে পড়। জীবিকার জন্য, দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য, বৃদ্ধ মা-বাপ ও ছোট-ছোট ভাই-বোনদের জন্য অথবা নিজ স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিছু একটা কর।
'জীবিকার নাই উচ্চ বা নীচ, কোন কাজ নয় হীন, আলস্য পাপ, তাই সঞ্চিত পুণ্যেও করে ক্ষীণ।'
শ্রম ছাড়া কি সফল হওয়া যায়, নাকি ফসল পাওয়া যায়? তকদীরের সাথে তদবীর জরুরী। ভাগ্যের সাথে কর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলা বাহুল্য, কষ্ট স্বীকার ছাড়া ইষ্টলাভ হয় না।
'জাল কহে, পঙ্ক আমি উঠাব না আর, জেলে কহে, মাছ তবে পাওয়া হবে ভার।'
'কর্ম-বিমুখ ছেলেরাই ধনীর মেয়ে বিবাহ করতে চায়।' আর আমল-বিমুখ লোকেরাই পীর ধরতে যায়। আশা করি, তুমি সেই ছেলে ও লোকেদের একজন নও।
তুমি হবে সেই যুবক, যার প্রতি অনেকে হিংসা রাখে। কেননা, 'তোমার হিংসুক বেশী হওয়া, তোমার সফলতারই দলীল।'
তুমি সেই মানুষ হবে, যার প্রতি বন্ধুও কপটতা প্রদর্শন করবে এবং বহু মানুষ শত্রু হয়ে যাবে। কেননা, 'সফল মানুষ হল সেই, যে কপট বন্ধু ও অকপট শত্রু পায়।'
সাফল্যের পর্বতচূড়ায় তুমি আরোহণ কর। তবে জেনে রেখো যে, 'সফলতা অনেক সময় মানুষের জীবনে পতন ডেকে আনে।'
📄 সমালোচনা
এ সংসারে ত্রুটি-বিচ্যুতিহীন মানুষ নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। এমন কেউ নেই, যার পশ্চাতে কেউ গীবত করে না, সমালোচনা করে না। সমালোচনামুক্ত হয়ে জীবন গড়া অসম্ভব। সুতরাং সমালোচনাকে উপেক্ষা ক'রেই জীবন পরিচালনা করা জ্ঞানীর কাজ। 'জীবনের সময় বড় মূল্যবান। কে কী ভুল করেছে সে সমালোচনায় আমাদের সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বরং আমাদের কী করা উচিত, সেই আলোচনা ও পরিকল্পনায় সময় ব্যয় করা উচিত।'
সুতরাং 'লোকে কী বলবে, তা তুমি মোটেও ভেবো না, যতক্ষণ তুমি জানো যে, তুমি ঠিক পথেই আছ।' 'উচিত বলার জন্য আমাদের সৎ সাহস থাকা দরকার। মানুষকে ভয় করা আমাদের উচিত নয়। অপরে আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, সে কথাও চিন্তা করা উচিত নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সৎ হলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।'
'নিজে ঠিক থাকলেই হল। লোকে কী বলে, না বলে, তা নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়।'
তুমি যদি ত্রুটিহীন হও, তাহলে তো সমালোচনার ভয় হওয়ার কথা নয়। 'তোমার যদি কোন দোষ না থাকে, তাহলে তোমার ভাবনা কী? ধোপা কেবল ময়লা জামা-কাপড়কেই পাথরে আছাড় মেরে থাকে।'
যদি লোকের সমালোচনায় কান দাও, তাহলে সাফল্য তোমার মাথাচুম্বন করবে না। লোকেদের কথা উপেক্ষা করতে পারলে তুমি সফল হতে পার। "ব্যাঙের দল প্রতিযোগিতায় শরীক হল, ঐ পুরাতন উঁচু মিনারে উঠতে হবে। অনেক অংশগ্রহণকারী সহ দর্শকরাও বলতে লাগল, 'সম্ভব নয়, সম্ভব নয়! অত উঁচুতে কেউ উঠতে পারে নাকি?' শুরু হল প্রতিযোগিতা। অনেকে পড়তে লাগল। নিচে থেকে চিৎকার, 'কেউ পারবে না, কেউ পারবে না।' কিন্তু দেখা গেল, একজন উঠেই গেছে! কেমন ক'রে? সবারই মনে প্রশ্ন কীভাবে সে পারল? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সে ছিল কানে কালা। কারো সমালোচনা বা অনুৎসাহদান তার অদম্য প্রচেষ্টাকে দমাতে পারেনি.”
'বড় সুখী তারা, যারা লোকেদের সমালোচনা উপেক্ষা ক'রে চলে।' পক্ষান্তরে যারা সমালোচনায় কান দেয়, তারা কর্মে বিচলিত হয়। মোটেই সুখী হতে পারে না।
একদা লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র সহ একটি গাধার পিঠে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কতক লোক বলতে লাগল, লোকটা কত নিষ্ঠুর! একটি গাধার পিঠে দু' দু'টো লোক। এ কথা শুনে হাকীম নেমে হাঁটতে লাগলেন।
কিছু দূর পরে আরো কিছু লোক তাঁদেরকে দেখে বলে উঠল, ছেলেটি কত বড় বেআদব! বুড়োটাকে হাঁটিয়ে নিজে সওয়ার হয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনে ছেলেটি নেমে এল এবং হাকীম সওয়ার হলেন। আরো কিছু দূর পর কিছু লোক বলতে লাগল, বুড়োটির কী আক্কেল! নিজে গাধার পিঠে চড়ে ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনে তিনিও গাধার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু পরে আরো কিছু লোক সমালোচনার সুরে বলল, লোক দু'টো কি বোকা! সঙ্গে সওয়ার থাকতে পায়ে হেঁটে পথ চলছে। এ বারে হাকীম তাঁর ছেলেকে বললেন, 'দেখলে বাবা! তুমি চাপলেও দোষ, আমি চাপলেও দোষ, দু'জনে চড়লেও দোষ, কেউ না চড়লেও দোষ। সুতরাং তুমি কারো কথায় কর্ণপাত করো না।' কারণ, লোকের খোঁটা থেকে বাঁচা কঠিন। নিজের বিবেকে কাজ ক'রে যাওয়া উচিত। হাথী চলতা রহেগা, কুত্তা ভুক্তা রহেগা।
কিন্তু সমালোচনা বন্ধ করার উপায় আছে কী? তা অবশ্যই নেই। 'মানুষের অন্যায় সমালোচনা বন্ধ করতে পারা যায় না বটে, কিন্তু একটা ব্যাপার অবশ্যই বন্ধ করা যায়, আর তা হল, অন্যায় সমালোচনা শুনে দুশ্চিন্তা করা।'
আর তার উপরে যদি পারা যায়, তাহলে সমালোচনার বিনিময়ে সমালোচকের প্রশংসা কর। গালির বদলে তার সুনাম কর।
এক আলেমের ভক্তরা বলল, 'অমুক আপনাকে গালি দেয়, আর আপনি তার প্রশংসা করেন?'
তিনি বললেন, 'ছাড়ো, যার যেমন প্রকৃতি, সে তেমন আচরণ প্রদর্শন করবে। যে হাঁড়িতে যা আছে, সে হাঁড়ি উবুড় করলে তাই পড়বে। কুকুরের ঘেউ-ঘেউ যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে না পারে, তাহলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঘেউ-ঘেউ ক'রে ক্লান্ত হতে দাও।'
অনেকে সমালোচনা করে নিছক কুধারণাবশে। মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সুধারণা না রেখে মন্তব্য করে। অথচ প্রকৃতত্ব না জেনে, আসল ঘটনা না জেনে, নিজের কুধারণার বশবর্তী হয়ে কোন বিষয়ে মন্তব্য করা অন্যায়।
এক বাদশা মৃত্যুর পূর্বে মানুষের শিক্ষণীয় একটি অসিয়ত ক'রে মারা গেলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, 'আমি মারা গেলে কাফনের সাথে আমার হাত দু'টি না বেঁধে খোলা রেখে দিয়ো। যাতে গোরস্থানে যাওয়ার সময় লোকে দেখে এই শিক্ষা নেয় যে, অত বড় বাদশা হয়েও খালি হাতে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হচ্ছে!' তাঁর অসিয়ত পালন ক'রে তাই করা হল। কিন্তু অনেক লোকে তা দেখে বলল, 'সারা জীবন খাজনা আদায় ক'রে গেল। মরার পরেও খাজনা চাইতে চাইতে কবরে যাচ্ছে!'
অনেকে নিজের উপর অনুমান ক'রে অপরের সমালোচনা করে। নিজে চোর, তাই অপরকেও সন্দেহবশে চোর ধারণা করে। নিজে লম্পট, তাই কুধারণাবশে অপরকেও লম্পট মনে করে।
একটি রাখাল পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল। তা দেখে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক রাখাল বলল, 'এই! তুই কী করছিস্ আমি বলতে পারি।' সে বলল, 'বল তো দেখি, কী করছি?' বলল, 'তুই মুতছিস্। তাই না?' পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা রাখালটি বলল, 'হ্যাঁ মাইরি! তুই কী ক'রে জানতে পারলি?' সে বলল, 'আমিও অমনি ক'রে মুতি।'
কারো প্রতি বিদ্বেষ থাকলে তার সমালোচনা করা স্বাভাবিক। অনেক সময় তার ভালো জিনিসও বিদ্বেষীর কাছে খারাপ মনে হয়। 'দেখতে লারি চলন বাঁকা'র নীতিতে বিদ্বেষী বা হিংসুক হিংসিতের কথায়, লেখায়, চলায় বা বলায় ভুল দেখতে পায়।
'মানুষ যে কোন কিছুরই (ব্যক্তি, পরিবেশ, অবস্থা, আদেশ-উপদেশ, নীতিকথা ইত্যাদির) সম্মুখীন হলে বুঝবার বা জানবার দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তা থেকে কিছু না কিছু পায়। অন্যথা ব্যর্থ হয়। আর বিরূপ বা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে তা থেকে বহু দোষ সে খুঁজে পায়। অনেকে খারাপও গেয়ে থাকে; যেমন ফুল থেকে মৌমাছি মধু এবং মাকড়ষা বিষ পায়।'
পক্ষান্তরে মানুষ নিজের দোষ দেখায় অভ্যস্ত হলে পরের দোষ দেখতে পায় না। কিন্তু অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের দোষ দেখতে পায় না। কিন্তু পরের দোষ খুব ভালোরূপে দেখতে পায়।
এমন লোকেরা 'নিজের পানে চায় না শালী, পরকে বলে ডাবরাগালি।' 'আনারস বলে, কাঁঠাল ভায়া তুমি বড় খসখসে!' 'গুয়ে বলে গোবর দাদা, তোর গায়ে কেন গন্ধ?'
এরা নিজের দোষটা দোষ মনে করে না। পরের দোষটাই দোষ বলে ধরে।
'তুমি আপনার দোষ কভু দেখিতে না পাও হে, দেখি, পাইলে পরের দোষ শতমুখে গাও হে। সদা জীবের জীবন হরি সুখে মাংস খাও হে, তবু জীবহত্যাকারী বলে ব্যাঘ্রে দোষ দাও হে।'
অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেদের সাময়িক সুখ নিয়ে গর্বিত হয় এবং অপরকে দুঃখী দেখে নিজের মনে আনন্দ পায়। যথাসময়ে সে ভুলে যায় যে, তারও ঐ দুঃখ অবধারিত। যুবক-যুবতীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, তাদেরকে ভর্ৎসনা করে। 'ঘুঁটে পুড়ে গোবর হাসে, ওরে গোবর তোরও এ দিন আছে।'
'নক্ষত্র খসিল দেখে দীপ মরে হেসে, বলে, এত ধুমধাম, এই হল শেষে! রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে, যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় ঢুকে।' 'মেঘ বলে, সিন্ধু! তব জনম বিফল, পিপাসায় দিতে পার একবিন্দু জল? সিন্ধু কহে, পিতৃনিন্দা কর কোন্ মুখে? তুমিও অপেয় হবে পড়িলে এ বুকে।'
সুতরাং তুমি কারো সমালোচনা করো না। বিশেষ ক'রে 'তোমার বাড়ি যদি কাঁচ-নির্মিত হয়, তাহলে অপরের বাড়িতে পাথর মেরো না।' কারণ জানই তো, ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। আর তাতে তোমার কাঁচের বাড়ি ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে যাবে।
সমালোচনামুক্ত হতে চাও? তাহলে কিছু হয়ো না, কিছু করো না। কিছু না করলে সমালোচনার পাত্র হতে হয় না। 'যত বেশি লক্ষ্য সিদ্ধির পথে তুমি এগোবে, ততই সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। মনে হয় সাফল্য ও সমালোচনার মাঝে একটি যোগসূত্র আছে। সাফল্য যত বেশি, সমালোচনাও তত বেশি।' 'তোমার মূল্যমান অনুসারে তোমার সমালোচনাও বৃদ্ধি পাবে।' 'সমালোচনামুক্ত কি মানুষ আছে? যে বড় কাজ করে, লোকেরা তারই সমালোচনা করে। সমুদ্রের প্রতি লক্ষ্য কর, তার মাঝে মড়া ফেলা হয়, মড়া ভাসে উপরে। কিন্তু তার গভীরে থাকে মণি-মুক্তা-প্রবাল-পদ্মরাগ। বনে- বাগানে কত শত গাছ রয়েছে। কিন্তু লোকেরা সব ছেড়ে দিয়ে ফলদার গাছেই ঢিল মারে। আকাশের মাঝে অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে। কিন্তু কেবল চন্দ্র ও সূর্যেই গ্রহণ লেগে থাকে।'
সুতরাং তুমি যদি 'মহান' হও, তাহলে সমালোচনা তোমার কী ক্ষতি করতে পারে? 'বিশাল সমুদ্রে রাখালে পাথর মারলে সমুদ্রের কী যায়-আসে? উজ্জ্বল নক্ষত্রে ঢিল মারলে, সে ঢিল কি তার গায়ে লাগে? জ্ঞানীর মানহানির জন্য অজ্ঞানীর কুমন্তব্য নিতান্ত অসার। তাতে জ্ঞানীর কিছু আসে-যায় না।'
যারা হীন হয়েও মহান ব্যক্তিদের সমালোচনা করে, তারা নিজেদের হীনতারই পরিচয় দেয়। মহানের মহত্ত্ব কিছুও ক্ষয় হয় না, পরন্তু হীনদের হীনতা আরো বৃদ্ধি পায়। যারা 'বড়'কে 'ছোট' করতে প্রয়াসী হয়, আসলে সমাজের চোখে তারা আরো 'ছোট' হয়ে যায়।
'শক্তি যার নাই নিজে বড় হইবারে, বড়োকে করিতে ছোট তাই সে কি পারে? হাউই কহিল, মোর কী সাহস ভাই, তারকার মুখে আমি দিয়ে আসি ছাই। কবি কহে, তার গায়ে লাগে না তো কিছু, সে ছাই ফিরিয়া আসে তারি পিছু পিছু।'
সুফিয়ান সওরী বলেন, 'যে নিজেকে চিনেছে, তার সম্বন্ধে লোকের সমালোচনা কোন ক্ষতি করতে পারে না।'
সমালোচনা তো হবেই। সুতরাং তুমি যদি লোকের সমালোচনাকে ভয় কর, তাহলে কিচ্ছু করো না, কিচ্ছু বলো না, কিচ্ছু লিখো না এবং কিচ্ছু হয়ো না। জেনে রেখো, তুমি সমালোচিত হলেও সমালোচক থেকে তুমিই বড়। কারণ সমালোচনা বড্ড সহজ। কঠিন হল রচনা করা।
'বোলতা কহিল, এ যে ক্ষুদ্র মউচাক, এরই তরে মধুকর এত করে জাঁক! মধুকর কহে তারে, তুমি এসো ভাই, আরো ক্ষুদ্র মউচাক রচো দেখে যাই।'
পক্ষান্তরে একজন লেখক, তার গঠনমূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক সমালোচকদেরকে স্বাগত জানানো উচিত। 'যাঁরা সত্যপক্ষে ভূয়সী প্রশংসার দাবী রাখেন, তাঁরাই আসলে নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে খুশী মনে বরণ ক'রে নেন।' 'তুমি যদি সমালোচনা সহ্য ক'রে নেওয়ার ক্ষমতা না রাখ, তাহলে প্রশংসারও যোগ্য নও তুমি।'
'মহান ব্যক্তিত্বের মহানতার আন্দাজ তখনই হয়, যখন দেখা যায় যে, তিনি তাঁর সমালোচকদেরকে খুশী মনে ক্ষমা ক'রে দিচ্ছেন।'
'আশ্চর্য সেই ব্যক্তির প্রতি, যে তার সেই গুণের কথা শুনে আনন্দিত হয়, যা তার মধ্যে নেই। কিন্তু যে দোষ তার মধ্যে আছে, তার কথা শুনে সে রাগান্বিত হয়।' আশা করি, তুমি সেই ব্যক্তি হবে না।
'আমাদের সমালোচকদের গোল্লায় পাঠানোর একমাত্র উপায় হল এ কথাই বলা, আমার সমালোচক যদি আমার সমস্ত ত্রুটির কথা জানতো, তাহলে আরো জোর সমালোচনা করতে পারতো।'
সুতরাং সমালোচনা গঠনমূলক হলে অথবা নিজের মধ্যে ত্রুটি থাকলে তা মেনে নিতে কোন প্রকার অহংকার বা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। উচিত নয় গোঁড়ামির অন্ধ একগুঁয়েমিকে নিজের চরিত্রে সগর্বে লালন করা। বরং উচিত হল, উদারতা প্রদর্শন করা এবং নিজেকে সংশোধন ক'রে নেওয়া।
আর ভক্তদের উচিত, সেই গঠনমূলক সমালোচনাকে সাদরে গ্রহণ ক'রে নিজেদের সঞ্চিত জ্ঞানে সংশোধন আনয়ন করা এবং সমালোচিত ভক্তিভাজনের প্রতি কেবল অন্ধ ভক্তির ফলে তা প্রত্যাখ্যান না করা।
এ কথাও সত্য যে, সমাজে বহু অবিবেচক সমালোচক আছে, অযোগ্য সমালোচক আছে। 'যারা প্রত্যেক বস্তুরই দাম জানে, কিন্তু কোন বস্তুরই প্রকৃত মূল্য জানে না, তারাই সমালোচক।'
যে খামোখা লোকের ভুল ধরে বেড়ায়, তার ভুল ছোট নয়। যারা বড়দের ভুল ধরে নিজেদেরকে 'বড়' প্রমাণ করতে চায়, তারা আসলে বড় নয়। 'নীচ ও হীন মনের মানুষেরাই বড় মানুষদের ত্রুটি খুঁজে পেয়ে তার সমালোচনায় প্রচুর আনন্দ পায়।'
'নোংরা মানুষেরাই বিখ্যাত মানুষদের ভুল আর বোকামিতে আনন্দবোধ করে।'
'কানাকড়ি পিঠ তুলি কহে টাকাটিকে, তুমি ষোল আনা মাত্র, নহ পাঁচ সিকে, টাকা কয়, আমি তাই, মূল্য মোর যথা, তোমার যা মূল্য তার ঢের বেশি কথা।' 'কহিল কঞ্চির বেড়া, ওগো পিতামহ বাঁশবন! নুয়ে কেন পড় অহরহ? আমরা তোমারি বংশে ছোট ছোট ডাল, তবু মাথা উঁচু করে থাকি চিরকাল। বাঁশ কহে, ভেদ তাই ছোটতে বড়তে, নত হই, ছোট নাহি হই কোন মতে।'
'যে ব্যক্তি নিজের গুণ ও পরের দোষ ছাড়া অন্য কিছু দেখে না, সে ব্যক্তি অপেক্ষা অন্ধই উত্তম।' সুতরাং ছিদ্রান্বেষণের অভ্যাস বর্জন কর। ভেবে দেখো, 'তুমি কারো ভুল ধরলে সে তোমার প্রতি রেগে যাবে। তোমার জ্ঞান দ্বারা সে উপকৃত হবে, অথচ সে তোমাকে নিজের দুশমন মনে করবে।' তাছাড়া দোষ ধরে বেড়ানো সাধারণতঃ ভালো লোকের কাজ নয়। কবি বলেছেন,
'দুষ্টগণে ঘাট পেলে হাট মাঝে বলে, অনাসে মানীর মান ফেলে দেয় জলে। দোষ দেখে রোষ করা ইহা এক দোষ, কেন না জানিয়া কেহ নাহি করে দোষ। মহাজ্ঞানী হইলেও দোষশূন্য নয়, প্রমাণ তাহার দেখ ময়ুরের পায়।'
অনেকে নিছক হিংসাবশে অথবা স্বার্থবশে অথবা শত্রুতাবশে কেবল ছোট করার জন্য নির্ভুলকে ভুল প্রমাণ করার অপচেষ্টায় সমালোচনা করে। কিন্তু 'চামচিকা যদি দিনের বেলায় চোখে দেখতে না পায়, তাহলে তাতে সূর্যের দোষ কী?'
'শত্রুতার চক্ষে গুণ দোষ ভয়ানক, পুষ্পসম সা'দী শত্রু-চক্ষেতে কন্টক। পারি আমি কারো হৃদে কষ্ট নাহি দিতে, শত্রুর কী করি? সে যে স্বতঃ ক্ষুন্ন চিতে।'
ভুল করলেও 'এ সংসারে এমন কেউ নেই যে একাধারে ভুল করেই যায়। এমনকি খারাপ ঘড়িও প্রত্যহ দুইবার সঠিক সময় নির্দেশ করে।' 'পানি নোংরা হলেও তার দ্বারা আগুন নিভানো যায়।' 'আমরা সবাই চাঁদের মতো। অপর পিঠ অন্ধকারাচ্ছন্ন।' একদিকে সুনাম থাকলে অন্যদিকে দুর্নাম থাকা অস্বাভাবিক নয়। একদিকে ভালো হলে অন্য দিকে মন্দ হওয়া অবাস্তব নয়। একদিকে ছোট হলে অন্যদিকে বড় হওয়া অলৌকিক নয়।
'ভিমরুলে মৌমাছিতে হল রেষারেষি, দুজনায় মহাতর্ক শক্তি কার বেশি। ভিমরুল কহে, আছে সহস্র প্রমাণ, তোমার দংশন নহে আমার সমান। মধুকর নিরুত্তর, ছলছল আঁখি- বনদেবী কহে তারে কানে কানে ডাকি, কেন বাছা নতশির! এ কথা নিশ্চিত, বিষে তুমি হার মানো, মধুতে যে জিত।'
তুমি যত বেশি ভাল লোক হবে, তোমার সামান্য দোষ তত বেশি সমালোচিত হবে। কাপড় যত সাদা হবে, তার দাগ তত স্পষ্ট হবে। লোকেরা যখন তোমার সম্পর্কে সমালোচনার কিছুই না পাবে, তখন তোমার বয়স নিয়ে সমালোচনা করবে।
তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, সমাজে গঠনমূলক সমালোচনা না হলে, মন্দকে 'মন্দ' বলে সাধারণ লোকেরা চিনতে পারবে না। কোন সমালোচনা, কোন প্রতিবাদ না হলে কোন অন্যায়কে মানুষ 'অন্যায়' বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে না।
'দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের জন্য সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। যদি সৎ ব্যক্তিরা কিছুই না করেন, তাহলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করে।'
পরিশেষে বলি, মহানবী ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার (কোন মুসলমান) ভাইয়ের উপর তার সম্ভ্রম অথবা কোন বিষয়ে যুলুম করেছে, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তার কাছে (ক্ষমা চেয়ে) হালাল ক'রে নেয়, ঐ দিন আসার পূর্বে যেদিন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। তার যদি কোন নেক আমল থাকে, তবে তার যুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা হতে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার নেকী না থাকে, তবে তার (মযলুম) সঙ্গীর পাপরাশি নিয়ে তার (যালেমের) উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)