📘 জীবন দর্পণ > 📄 মান-সম্ভ্রম

📄 মান-সম্ভ্রম


মানুষের প্রথম দুটি অক্ষর দিয়ে 'মান' হয়। মান ও হুঁশ দুটি মিলে মানুষ হয়। সুতরাং যে মানুষের 'মান' নেই, মানুষের সম-মান নেই, সৃষ্টিকর্তার কাছে সম্মান নেই, সে মানুষ 'মানুষ' হয় কীভাবে?
৮৭ সম্ভ্রম যাবতীয় সদাচরণের সমষ্টির নাম। সম্ভ্রম পবিত্রতা ও কর্মনিপুণতা। সম্ভ্রম গোপনে এমন কাজ না করা, যা প্রকাশ্যে করলে লজ্জিত হতে হয়।
'সব চাইতে শ্রেষ্ঠ মীরাস হল সম্ভ্রম।' 'একটি মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার চেয়ে সম্মানজনক আর কিছু নেই।'
অর্থ থাকলে সম্মান আসে---এ কথা মানুষের পার্থিব পরিভাষায় ঠিক হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক অর্থশালী সম্মানী হয় না। লোকে তার অর্থের ভয়ে অথবা লোভে তাকে বাহ্যতঃ সম্মান দেয়। সুতরাং তোমার অর্থশালী হওয়ার পর সম্মান পেতে লাগলে তাতে তুমি প্রতারিত হয়ো না। বরং প্রকৃত সম্মানের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা কর। যেহেতু অর্থের সাথে যার সম্পর্ক, অর্থ ফুরিয়ে গেলে তা সহসায় নষ্ট হয়ে যাবে।
ইজ্জতের জন্য পয়সা দাও, কিন্তু পয়সার জন্য ইজ্জত দিয়ো না। সর্বহারা হলেও গর্বহারা খবরদার হয়ো না।
জেনে রেখো, তোমার মান ও সম্ভ্রম হল চোখের মত নাজুক। তা নিয়ে খেলা করা চলে না। খেলা করলে অথবা অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রদর্শন করলে অচিরে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অনুরূপ অপরের সম্মান নিয়েও ছিনিমিনি খেলো না, কারণ অনেক মানুষ আছে, যাদের সম্মানটাই একমাত্র সম্বল। আর সে ক্ষেত্রে তোমার সাথে সে এমন আচরণ করতে পারে, যেমন ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়।
এ সংসারে এমন বহু মানুষ আছে, যাদের কোন সম্মানবোধ নেই। কোন অপযশকে তারা অপমান মনে করে না। যাদের মানই নেই, তাদের আবার অপমান কী? ফলে তাদের সেই অনুভূতিটুকুও থাকে না, যাতে তারা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়।
'কুজনের নাহি লাজ নাহি অপমান, সুজনের এক কথা মরণ সমান।'
যার নিজের আত্মসম্মান নেই, তার নিকট অপরেরও সম্মান নেই। সুতরাং এমন মানহীন মানুষের খপ্পর থেকে সুদূরে বসবাস করবে। আর যদি 'পড়েছি চামারের সাথে, খানা খেতে হবে সাথে'র মতো তোমার অবস্থা হয়, তাহলেই সাবধান। যেহেতু 'মেড়ার শিঙ্গে হীরা ভাঙ্গে, মানীর অপমান।' খবরদার তার প্রতিশোধ নিতে যেয়ো না, তাকে টেক্কা দিতে যেয়ো না, তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়ো না। নচেৎ জেনে রেখো, 'যে ব্যক্তি নিম্নমানের লোকের সাথে শত্রুতার মোকাবিলা করে, তার মান বিনাশপ্রাপ্ত হয়।'
'প্রত্যেক সম্মানী কোন শক্তির নিচে সম্মানহারা হয়ে যায়।' বড় গাছের নিচে আর কোন গাছ বাড়তে পায় না। এ জগতে যার অর্থশক্তি আছে, সেই আসলে মানী। ধান আছে যার, মান আছে তার। যার ধান নেই, তার মান নেই। সেই মান আনয়ন করতে অথবা পেটের জ্বালা নিবারণ করতে কোন অর্থশালীর কাছে চাকরি বা চাকরের কাজ নিলে প্রভুর কাছে কি তার মান থাকে? অবশ্যই না।
মানুষ অর্থ ও বিত্তশালীকে সম্মান দেয়, তার জন্য কাফের হয়েও কত অসম্মানী লোক সম্মানীদের নিকট সেলুট ও সম্মান পায়। প্রকারান্তরে প্রকৃত সম্মানী যাঁরা, তাঁরা তাদের কাছে সম্মান পায় না। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ} (۸) المنافقون
অর্থাৎ, বস্তুতঃ যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের। কিন্তু মুনাফিক (কপট) রা তা জানে না। (মুনাফিকুনঃ ৮)
'আঘাত ও অপমানের মধ্যে আঘাতের কথা সহজে ভুলা যায়, কিন্তু অপমানের কথা সহজে ভুলা যায় না।' লৌহ তরবারির আঘাতে ব্যবহার্য্য মলম আছে, কিন্তু বাক-তরবারির আঘাতের কোন মলম নেই। অবশ্য যাদের সম্মান নেই অথবা আত্মসম্মানবোধ নেই তাদের দেহ-মনে সে আঘাত কোন প্রভাবই ফেলতে পারে না।
'নিজেরে করিতে সম্মান দান নিজেরে করি অপমান।' এমন আচরণ আছে বহু মানুষের, যারা নিজেদের গৌরবগান গাইতে গিয়ে নিজেদেরই অপমান ক'রে বসে। নিজের বংশকে গালি দিয়ে নিজেকে ছোট করে। বাপকে অস্বীকার ক'রে মা-কে ব্যভিচারিণী বানায় এবং নিজেকে বানায় জারজ!
সমাজের কোন মানহীন নিকৃষ্ট লোকে চায় না যে, মানীর মান বজায় থাক। বরং মানীর মান বিলীয়মান হতে দেখে মুচকি হাসির মিষ্ট স্বাদ গ্রহণ করে। অপরকে নিজেদের দলে ভিড়তে দেখে খুশি হয় মনে। সুস্বাগতম জানিয়ে তাকে আরও মানহীন করতে সচেষ্ট হয়।
'সমাজে এক শ্রেণীর লোক থাকে যাহারা মর্যাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিম্নস্তরে থাকিতে বাধ্য হয় বলিয়া উচ্চস্তরের লোকেরা যখন বে-কায়দায় পড়ে, তখন তাহাদের বে-কায়দার সুযোগ পুরো মাত্রায় গ্রহণ করিতে চেষ্টা করে এবং যে হাতি পাঁকে পড়িয়া যায় তাহাকে ঢেলাইবার প্রবৃত্তি তখন শতমুখী হইয়া ওঠে।'
অনেকে চায়, তারা যেমন, দুনিয়াটা তেমন হোক। তারা বেশ্যা বলে সবারই মেয়ে বেশ্যা হয়ে যাক। আর তা হলে তারা মনে মনে শত খুশীর হাসি হাসে। যেমন কাফেরদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
(وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاء) (۸۹) سورة النساء
অর্থাৎ, তারা চায় যে, তারা যেরূপ কাফের, তোমরাও সেরূপ কাফের হও; ফলে তারা ও তোমরা একাকার হয়ে যাও। (নিসাঃ ৮৯)
খুব সাবধান বন্ধু! মানহীনদের এমন চক্রান্তে পড়ে নিজের মান-সম্মান হারিয়ে বসো না। ভিড়ে পড়ে শুধু টাকা-পয়সার পকেটমারিকে ভয় করো না, বরং সেই সাথে সমাজের ঈমান ও সম্মানের পকেটমার থেকেও সাবধান থেকো। আর এ কথাও স্মরণে রেখো যে, ঐ পকেটমারদের সবাই কিন্তু অভদ্রই নয়। তাদের মধ্যে অনেককে ভদ্র সেজেও পকেট মারতে দেখবে। সুতরাং তোমার মন যেন সে সময় ধোঁকা না খায় যে, সে পকেটমার নয়, বরং তোমার কোন হিতাকাঙ্ক্ষী!

📘 জীবন দর্পণ > 📄 আত্মচেতনা

📄 আত্মচেতনা


শরীরে 'সুগার' হওয়া ভাল নয়। তা একটি রোগ। কিন্তু প্রত্যেক শরীরে সুগারের প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে তা বেশি হওয়া ভাল নয়, কম হওয়াও ভাল নয়। অনুরূপই ষড়রিপুর প্রত্যেকটি মানব-চরিত্রে কম-বেশি অপকারী ও উপকারী।
কাম না থাকলে মানুষের বংশরক্ষা হয় না।
ক্রোধ ভিন্ন জয়লাভ হয় না। রাগহীন নিস্তেজ মানুষের ওজন থাকে না।
লোভ না থাকলে অর্থ ও খাদ্য জোগাড় হয় না।
মোহ ছাড়া সংসার গড়ে না। সংসারে সুখ ও শান্তি থাকে না।
মদ বা গর্ব ছাড়া মনুষত্ব থাকে না। আত্মমর্যাদা থাকে না।
মাৎসর্য ও ঈর্ষা থাকলে শ্রীবৃদ্ধি হয়। না থাকলে মানুষ 'মেড়া' হয়। কোন কাজে উন্নতির মন হয় না।
সংযম থাকলে ষড়রিপু (ছয় শত্রু) ষড়মিত্র হয়ে যায়। মানুষের প্রয়োজন আছে আত্মচেতনা, আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরশীলতার। তার উপরেই ভিত্তি ক'রে নির্মাণ করতে হয় সুখী জীবনের ইমারত।
বাবুই পাখির মতো কুঁড়ে ঘরে বাস ক'রে শিল্পের বড়াই কখনও আত্মমর্যাদা হতে পারে। আবার চড়ুই পাখির মতো পরের ঘরে বাস ক'রে সুখের বড়াই হীনতা হতে পারে।
আত্মসম্মানবোধ যার আছে, সে লাঞ্ছিত হয় না। আত্মসম্মানবোধ যার নেই, তার রাগ হয় না। আর যার মোটেই রাগ নেই, সেই মাটির মানুষের কোন ব্যক্তিত্ব থাকে না।
'প্রকৃত মানুষ যে, তার নীতি হবে, জান দেব, মান দেব না। জীবন দেব তবুও মর্যাদা দেব না।'
সংসারের একটা বাস্তব নীতি এই যে, 'আপন থাকে তো খাও, না হয় চারিপানে চাও।' সুতরাং আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজে উপার্জনশীল হতে হবে তোমাকে। নাই-বা হল অনেক, তোমার নিজের সামান্যই অন্যের অনেক থেকে অনেক অনেক উত্তম।
'আপন শ্রমে অর্জিত ধন যতই অল্প হোক, তাহারই দান পরকালে মিলায় স্বর্গলোক।'
আর জানই তো, 'করুণা ও দান নিয়ে গৌরবের মাথা তুলে বাঁচা যায় না।' দান গ্রহণে মানুষ দুর্বল হয়ে যায়। অনুগ্রহের ছায়াতলে প্রতিপালিত জীবন-বৃক্ষ আওতার ঘাসের মতো হয়। পরের ঘাড়ে চেপে জীবন-যাপন আলোকলতার মতো হয়।
কুঁড়ে মানুষের কোন সম্মান নেই। যে বসে খেতে চায়, তার কোন মহত্ত্ব নেই। কৃষক ও জমির কথোপকথন উদ্ধৃত ক'রে কবি বলেছেন,
'বসুমতী! কেন তুমি এতই কৃপণা? কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে মা প্রসন্ন সহাস, কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস? বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি? শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী, আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে, তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।'
প্রত্যেক কাজেই মহান আল্লাহর পর যথাসাধ্য নিজের উপর ভরসা রাখা উচিত। প্রবাদে বলে, 'বলং বলং বাহু বলং।' (নিজের বলই প্রকৃত বল।) নিজের নখের মতো গা চুলকিয়ে মজা নেই।
'এ দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় তিক্ত কাজ হল, পরের উপর ভরসা করা।' অনেক মানুষ এমন আছে, যারা সংসারে নিজেরাই দুর্বল। তাদেরকে নিয়ে হয়তো সংসারও করা যায়, কিন্তু বড় কাজে তাদের উপর ভরসা করা যায় না। 'কাগজের নৌকা খেলার জন্য নদীতে ভাসানো যায়। কিন্তু তার উপর চড়ে নদী পার হওয়া যায় না।' একজন আহত সৈনিকের কাঁধে ভর ক'রে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না।
বাপের হোটেলে বসে খেতে খুব মজা, কিন্তু কত দিন? শ্বশুরবাড়িতে বসে খেতে আরো মজা। কিন্তু 'শ্বশুরবাড়ি মধুর-হাঁড়ি, তিন দিন পর ঝাঁটার বাড়ি।' অতঃপর তুমি অকর্মণ্য উপার্জনহীন হলে কেউ তোমাকে ভালবাসবে না, মা-বাপ না, বিয়ে করা বউও না। সুতরাং কবির কথা মনের মণিকোঠায় তুলে রাখ, 'আপন কেউ নয় সবাই তোমার পর, উন্নতি করিতে চাও হও ধুরন্ধর।'
বাপের অনেক আছে, খেয়ে-দেয়ে দিন ভাল কাটবে মনে করছ? কিন্তু না, তুমি ব্যাঘ্র-উচ্ছিষ্টভোগী শৃগালের মতো হয়ো না। এক বণিক তার ছেলেকে বাণিজ্যে পাঠাল। পথে এক ক্ষুধার্ত শিয়াল দেখল। ভাবল, এই মিসকীন কোত্থেকে খেতে পায়? তৎক্ষণাৎ দেখল এক বাঘ শিকার ধরে খাচ্ছে। ভয়ে লুকিয়ে দেখল, সে খেয়ে চলে গেলে অবশিষ্টাংশ শিয়াল গিয়ে খেল। মনে করল, এমনি ক'রে তারও দিন যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে এত কষ্ট ক'রে লাভ কী? সুতরাং ফিরে গিয়ে পিতাকে খবর জানাল। পিতা বলল, 'তুই ভুল বুঝেছিস্। আমি আশা করি তুই শিয়ালের অনুসরণ না ক'রে বাঘের অনুসরণ 'করবি।' অর্থাৎ তুই বাঘের মতো নিজে কষ্ট ক'রে কামাই ক'রে খাবি। আর অন্য কেউ তোর উচ্ছিষ্ট খাবে।
মানুষ যখন আশা ও কামনা করে, তখন নিচু না করে উঁচু করতে হয়। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ জানে, 'শৃগালের মতো ১০০ বছর বাঁচার চাইতে সিংহের মতো ১ দিন বাঁচাও ভালো।'
পর-ভরসায় থেকো না বন্ধু! তীর্থের কাকের মতো অথবা বকান্ডপ্রত্যাশীর মতো নিজেকে পরমুখাপেক্ষী করো না।
'আপন যতনে লাভ যখন যা হয়, যাচিত রতন তাহার তুল্য মূল্য নয়। যদিচ বল্কল পর রহ উপবাসী, হয়ো না হয়ো না তবু পরের প্রত্যাশী।'
আত্মচেতনা না থাকার ফলে মানুষ অনেক সময় সঞ্চিত ধনে থেকেও বঞ্চিত হয়। আফ্রিকার এক চাষী শুনল যে, কোন কোন জায়গায় লোকে মাটিতে হীরা পেয়ে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে। সে তার বাকি জমিটুকু বিক্রয় করে হীরার খোঁজে বের হয়ে গেল। অর্থও শেষ হল, হীরাও পেল না। অপর দিকে তার জমির ক্রেতা তার ঐ জমিতে হীরা আবিষ্কার করল। এইরূপই কত মানুষ নিজের কদর না বুঝে অপরের দ্বারস্থ হয়। নিজের কাছে রত্ন থাকা সত্ত্বেও অপরের কাছে সন্ধান ক'রে ফেরে।

📘 জীবন দর্পণ > 📄 পরোপকার

📄 পরোপকার


পৃথিবীতে কত শত বৃক্ষলতা আছে যা অকেজো, আকাশে কত মেঘ ভাসে যাতে বৃষ্টি হয় না। কত মানুষ আছে যাদের দ্বারা মানুষের কোন উপকার সাধিত হয় না।
মানুষ হয়ে বিশেষ ক'রে বিপদের সময় যদি মানুষের পাশে কেউ না দাঁড়ায়, তাহলে তার নিজেকে 'মানুষ' বলে পরিচয় দেওয়াটা বড় লজ্জাকর। তোমার জীবন যদি নিজের কাজে না লাগে, তাহলে সে জীবনকে অপরের কাজে লাগিয়ে দাও, শান্তি পাবে। লোহা দিয়ে সোনার গয়না তৈরী হয় না ঠিকই, কিন্তু সোনার গয়না তৈরী করতে লোহার হাতুড়ির দরকার হয়। তুমি সোনা না হয়ে লোহা হলেও তোমার দ্বারা উপকার অবশ্যই হবে। আর পরোপকার সাধনের ফলে তুমিই হবে সর্বোত্তম ব্যক্তি, আল্লাহর কাছে এবং মানুষের কাছেও।
মহানবী বলেছেন, (أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ).
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (সঃ জামে' ১৭৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, (خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ)
অর্থাৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। (সঃ জামে' ৩২৮৯, দারাকুত্বনী, সিঃ সহীহাহ ৪২৬নং)
পরোপকারের জন্য তোমাকে মানুষ সম্মান জানাবে। যেহেতু 'মানুষ যা পেয়েছে, তার জন্য তাকে সম্মান জানানো হয় না, মানুষ পৃথিবীকে যা দিয়েছে, তার জন্যই তার সম্মান।'
উপকার করলে তুমি উপকারের বিনিময়ে প্রত্যুপকার পাবে। মানুষের জীবন একটি প্রতিধ্বনির মত, আওয়াজ দিলে সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে তার কাছে।
অপরকে সাহায্য করলে সাহায্য পাওয়া যায়। জীবনের সুন্দরতম প্রাপ্তি হচ্ছে দানের বিনিময়ে প্রতিদান। আন্তরিকভাবে অপরকে সাহায্য করলে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই সাহায্য করা হয়।
না-না, প্রতিদান পাওয়ার আশায় দান দেওয়া উচিত নয়। 'যা কিছু সুন্দর ও ভালো তা নিজস্ব নিয়মে ফিরে আসে। প্রতিদান পাওয়ার বাসনায় ভালো করার প্রয়োজন হয় না। প্রতিদান আপনিই পাওয়া যায়।'
পরোপকার ক'রে মনে আনন্দলাভ হয়। 'আদর্শ মানুষ সেই, যে অন্যের উপকার করে আনন্দ পায়, আর অন্যে উপকার করলে লজ্জিত হয়। কারণ কোন কিছু দান করা মহত্ত্বের লক্ষণ, আর তা গ্রহণ করা নীচতা।'
'আত্মসুখ অন্বেষণে আনন্দ নাহি রে বারে বারে আসে অবসাদ, পরার্থে যে করে কর্ম তিতি ঘর্ম-নীরে সেই লভে স্বর্গের প্রাসাদ।'
শায়খ আলী তানতাবী বলেন, 'সবচেয়ে বড় মধুর হল পরোপকারিতার স্বাদ।'
পরোপকার করলে যেমন আনন্দ পাওয়া যায়, পরোপকার নিলে তেমনি মনের ভিতর এমন এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়, যাতে প্রত্যুপকার বা প্রতিদান না দিতে পারা পর্যন্ত নিজেকে ঋণী মনে হয়। প্রত্যেক উপকারই মানুষকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে।
'পরোপকার একটি বেড়ি, যা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অথবা প্রতিদান ছাড়া ছাড়ানো যায় না।' উপকৃত উপকারীর দাসে পরিণত হয়।
মুলহাব বিন আবী সাফরাহ বলেন, 'আমি দেখে অবাক হই যে, লোকেরা নিজ মাল দিয়ে পরাধীন গোলাম ক্রয় করে অথচ উপকারিতা দিয়ে স্বাধীন মানুষ ক্রয় করে না।'
মানুষ দু'টি মুখ কখনই ভুলতে পারে না, বিপদের সময় যে তার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং বিপদের সময় যে তার সাথ ছাড়ে।
ইবনুল মুকাফফা বলেন, 'যদি তুমি কোন মানুষের প্রতি উপকার ক'রে থাকো, তাহলে খবরদার তা অন্যের কাছে উল্লেখ করো না। আর যদি কোন মানুষ তোমার প্রতি উপকার ক'রে থাকে, তাহলে খবরদার তা ভুলে যেয়ো না।'
অভিজ্ঞজনেরা বলেন, 'পৃথিবীতে দু'রকমের মানুষ আছে। এক : যারা সবকিছু গ্রহণ করে। দুইঃ যারা সবকিছু দিতে পারে। যারা নিতে জানে তারা খায় ভালো; আর যারা দিতে জানে তারা ঘুমায় ভালো। যারা দিতে জানে, তাদের আছে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, একটি ইতিবাচক মনোভাব এবং তারা সমাজ-সেবায় আগ্রহী। (অবশ্য সমাজ সেবার অর্থ বর্তমানে নেতা তথা রাজনৈতিকদের ছদ্ম সমাজসেবা নয়। এরা প্রকৃতপক্ষে সমাজসেবার নামে নিজেদের সেবা ক'রে থাকে।) প্রত্যেক মানুষেরই কিছু নেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং নিতেও হয়। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কেবলমাত্র গ্রহণ করেন না, দেওয়ারও চেষ্টা রাখেন।'
'পরের জন্য আত্মবিসর্জন ভিন্ন পৃথিবীতে স্থায়ী সুখের অন্য কোন মূল্য নাই।' কবি বলেছেন,
'পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি- এ জীবন-মন সকলি দাও, তার মত সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। পরের কারণে মরণেও সুখ সুখ সুখ করি কেঁদো না আর, যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।'
পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না। পরের জন্য তোমার হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফুটিত কর। ফুল পরের জন্য ফুটেই প্রকৃতির কোলে আনন্দের হাসি হাসে। তুমিও পরের তরে কর্ম ক'রে মিষ্টি হাসির আলোকে ভুবন ভরে দাও। তুমি সেই ফলদার গাছের মতো হও, যাকে ঢিল মারলে তার বিনিময়ে তোমাকে ফল দান করে। তুমি তোমার জীবন কর সোনার মত। যত জ্বালাবে তত ঝলমল করবে। আগুনে পুড়লেও ধূপের মতো তুমি তোমার সুগন্ধ বিতরণ কর।
'যাঁরা মহাপুরুষ হন, তাঁদের দুটি হৃদয় হয়। একটি হৃদয়ে ব্যথিত হন এবং অপরটি দিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন।' 'মহাপুরুষগণ উল্কার মত। তাঁরা নিজেদেরকে জ্বালিয়ে নিজ নিজ যুগকে আলোকিত ক'রে থাকেন।'
'নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল। গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধপান, কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্নদান। বংশী করে নিজ সুরে অপরে মোহিত, স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত।
শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জলধরে, সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।'
অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, তুমি নিজেকে ধ্বংস ক'রে অপরকে জীবন্ত রাখো। বরং বলছি, স্বার্থ ত্যাগ ক'রে মানুষের উপকার কর।
অবশ্য অপরের ভাল করতে যাওয়ার আগে তার সে ভাল পছন্দ কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। নচেৎ, অনেকে পরের উপকার করতে গিয়ে অপকার ক'রে বসে। যেমন নদীর জোয়ারে একটি বড় মাছ বালুচরে আটকে গিয়ে তড়পাচ্ছিল। কিছু বানর তা দেখে তাদের মনে দয়া হলে তাকে পাড়ে তুলে দিল, যাতে পানিতে পড়ে প্রাণ না হারায়!
অনেকে নিজ মেয়ের সংসার-সুখের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার স্বামীর ভালবাসায় আবিলতা আনে। অন্যের সংসার ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বন্ধুর উপকারে তার অনুপস্থিতিতে তার সংসার দেখাশোনা করতে গিয়ে তার স্ত্রীর প্রেমজালে ফাঁসে!
অনেকেই এমন আছে, যারা বাত ভালো করতে গিয়ে বেদনা সৃষ্টি করে। আর তা নিশ্চয়ই কাম্য নয়।
অনেকে প্রশ্ন করে, পরার্থে কী করব? পকেটে পয়সা না থাকলে গরীবের দুঃখে 'আহা' বলে লাভ কী?
আমরা বলি, উপকার কেবল পয়সা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরন্তু তোমার নিজের পয়সা না থাকলে পয়সা-ওয়ালাদের পয়সা নিয়ে উপকার করতে পার। তা না পারলে যে কোনও ভাবে লোকের উপকার সাধন করতে পার। কবি বলেছেন,
'কোন কাজ ছোট নয়, নয় সে নগণ্য, যদি পার কিছু কর মানুষের জন্য।'
একান্তই যদি মানুষের কোনও উপকারে না আসো, তাহলে অন্ততঃ কারো ক্ষতি করো না। শায়খ সা'দী বলেছেন, 'ঐ মৌমাছিদেরকে বলে দাও যে, যদি তারা মধু না দেয়, তবে যেন হুল না ফোঁড়ে।'
আবু যার বলেন, একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! কোন্ আমল সর্বোত্তম?' তিনি বললেন, "আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা।” আমি বললাম, 'কোন্ গোলাম (কৃতদাস) স্বাধীন করা সর্বোত্তম?' তিনি বললেন, "যে তার মালিকের দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও অধিক মূল্যবান।” আমি বললাম, 'যদি আমি এ সব (কাজ) করতে না পারি।' তিনি বললেন, "তুমি কোন কারিগরের সহযোগিতা করবে অথবা অকারিগরের কাজ ক'রে দেবে।” আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি বলুন, যদি আমি (এর) কিছু কাজে অক্ষম হই (তাহলে কী করব)?' তিনি বললেন, "তুমি মানুষের উপর থেকে তোমার মন্দকে নিবৃত্ত কর। তাহলে তা হবে তোমার পক্ষ থেকে তোমার নিজের জন্য সাদকাহস্বরূপ।” (বুখারী-মুসলিম)
উপকারের পথসমূহ খোলা আছে। যেভাবে হোক, সৃষ্টির উপকার কর। শায়খ সা'দী বলেছেন, "কাদায় পতিত গাধার নিকট যেয়ো না। যদি যাও, তাহলে তার উঠার ব্যবস্থা ক'রে দাও। যখন গেলে এবং জিজ্ঞাসা করলে যে, 'কেমন ক'রে পড়লে?' তখন কোমর বেঁধে কাদায় নেমে পড়.”
আর জানই তো, যে কোন প্রাণীর প্রাণ রক্ষা করলে, যে কোন জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে, তাতে সওয়াব হয়। একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর জন্য বেশ্যা ক্ষমা পেতে পারে। একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে খেতে না দিয়ে মেরে ফেললে মানুষ জাহান্নামে যেতে পারে।
বৃক্ষরোপণ করলে অথবা তার রক্ষণাবেক্ষণ করলে সৃষ্টির উপকার সাধন হয়। 'রোপণ হল দুই প্রকার: বৃক্ষ-রোপণ ও ইষ্ট-রোপণ। মাটিতে বৃক্ষ রোপণ করলে মানুষ উপকৃত হয়। আর মানব-মনের জমিতে ইষ্ট রোপণ করলেও মানুষ উপকৃত হয়।' আর তাতে উপকৃত হয় খোদ রোপণকারীও।
একটি মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে তুমি সওয়াব লাভ করতে পারো। "আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ তাআলা তোমার দ্বারা একটি মানুষকে হিদায়াত করেন, তাহলে তা তোমার জন্য (আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ) লাল উটনী অপেক্ষাও উত্তম।” (বুখারী ও মুসলিম)
মানুষের উপকারে অবহেলা প্রদর্শন করা উচিত নয়। নচেৎ শাস্তি স্বরূপ সে অবহেলা নিজের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ হতে পারে। একদিন এক ট্যাক্সিওয়ালা ভাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। একজন এসে বলল, 'পাশের রোডে এক্সিডেন্ট হয়ে এক মহিলা পড়ে আছে। তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।' কিন্তু সে বলল, 'হাসপাতাল দূরে, আমি যাব না।' অতঃপর সে যখন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এল, তখন দেখল বাড়িতে অনেক লোকজন।
আসলে এক্সিডেন্ট ছিল তার মায়ের।
সে যদি সত্বর দুর্ঘটনাগ্রস্ত লোকের সাহায্যে অগ্রণী হতো, তাহলে হয়তো তার মায়ের জীবনকে বাঁচাতে পারতো। কিন্তু পরিণামে অনুতাপ আর কী ফল দেবে?

📘 জীবন দর্পণ > 📄 চরিত্র ও ব্যবহার

📄 চরিত্র ও ব্যবহার


নবী বলেন, “কিয়ামতের দিন (নেকী) ওজন করার দাঁড়ি-পাল্লায় সচ্চরিত্রতার চেয়ে কোন বস্তুই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও চোয়াড়কে অপছন্দ করেন।” (তিরমিযী)
"তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার (মুসলিম) ভায়ের জন্য সেই জিনিস পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ১৩, মুসলিম ৪৫, ইবনে হিব্বান ২৩৫নং)
"যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, সে দোযখ থেকে মুক্তি পেয়ে বেহেন্তে প্রবেশ করবে, তার উচিত হল এই যে, সে যেন আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রেখে মৃত্যুবরণ করে এবং মানুষের সাথে ঠিক সেই রকম ব্যবহার প্রদর্শন করে, যে রকম ব্যবহার সে তাদের নিকট থেকে পেতে পছন্দ করে।” (মুসলিম ১৮-৪৪নং)
জীবন-যাত্রাপথের যাত্রী বন্ধু আমার! পৃথিবীর এ সংসার চলছে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক লেনদেনের উপর। লেনদেন ঠিক রাখলে পৃথিবীর মানুষ সুখে হাবুডুবু খাবে। সুন্দর আচার-ব্যবহার প্রদর্শন করলে এবং বিনিময়ে তা পাওয়া গেলে, অনুরূপ সুন্দর আচার-ব্যবহার পাওয়া গেলে এবং বিনিময়ে তা প্রদর্শন করা হলে সংসার সুখময় হয়ে উঠবে।
'নিজ প্রতি ব্যবহার আশা কর যে প্রকার, করহ পরের প্রতি সেই ব্যবহার।'
তুমি কারো নিকট থেকে সুন্দর ব্যবহার না পেলেও বিনিময়ে সুন্দর ব্যবহার প্রদর্শন করো। তুমি বলো, 'তুমি অধম, তা বলিয়া আমি উত্তম হইব না কি?' তাতে সুফল ফলবে অতি শীঘ্র এবং অকল্পনীয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيُّ حَمِيمٌ} ( ৩৪) সূরা ফুসসিলাত
অর্থাৎ, ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত কর; তাহলে যাদের সাথে তোমার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। (হা-মীম সাজদাহঃ ৩৪)
{ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ} (٩٦) سورة المؤمنون অর্থাৎ, তুমি ভালো দ্বারা মন্দের মুকাবিলা কর। তারা যা বলে, আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (মু'মিনূনঃ ৯৬)
মন্দের বিনিময়ে ভালো, অপকারের বিনিময়ে উপকার, বদনামের বিনিময়ে প্রশংসা ইত্যাদি না করতে পারলেও মন্দের বিনিময়ে মন্দ ক'রে নিজেকে ছোট করো না। বরং তাকে ক্ষমা ক'রে দিয়ো।
মহানবী ﷺ বলেছেন, “তোমার সঙ্গে যে আত্মীয়তা ছিন্ন করেছে, তুমি তার সাথে তা বজায় কর, তোমাকে যে বঞ্চিত করেছে, তুমি তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার প্রতি অন্যায়াচরণ করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা ক'রে দাও।” (আহমাদ, হাকেম, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৮৯ ১নং)
'যে তোমাকে ডাকে না হে তারে তুমি ডাকো ডাকো, তোমা হতে দূরে যে যায় তারে তুমি রাখো রাখো।'
'জীবনের বহু শিক্ষার মধ্যে একটি শিক্ষা এই যে, তুমি লক্ষ্য করে দেখো, ফায়ার-ব্রিগেডের কর্মীরা আগুন দিয়ে আগুন নিভায় না।' বরং তারা পানি দিয়েই আগুন নিভায়। নচেৎ আগুন দিয়ে আগুন নিভাতে গেলে তা দ্বিগুন তো হবেই।
অবশ্য এ সময়ে এ কথাও স্মরণে রাখা আবশ্যক, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (মুসলিম)
সব পাপ ক্ষমা করা হলে পাপ ছারপোকার মতো বেড়ে যেতে থাকবে। বাঘকে ক্ষমা করলে ছাগের প্রতি অত্যাচার করা হবে। মক্কা-মদীনার হারাম- সীমানার ভিতরে শিকার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু সেখানে মানুষের জন্য ক্ষতিকর প্রাণী সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ইত্যাদি হত্যা করা নিষেধ নয়।
যার মন নেই, সে আসলে মানুষ নয়; সে একটি কলের পুতুল। 'প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।' যার চরিত্র নেই, সেও আসলে মানুষ নয়, সে অন্য কোন প্রাণী। হৃদয়হীন ও চরিত্রহীন মানুষের কাছে কি কোন সুখ আশা করা যায়?
চরিত্রই হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সুন্দর ব্যবহার ও দ্বীনদারীই হল মানবের মানবিকতা। সুন্দর চরিত্র জীবনের অলঙ্কার ও অমূল্য সম্পত্তি। তোমার 'চরিত্রের মাঝে যদি সত্যের শিখা দীপ্ত না হয়, তাহলে জ্ঞান, গৌরব, আভিজাত্য, শক্তি সবই বৃথা।'
'যদি ধন নাশ হয় তায় কিবা আসে যায়, যদি স্বাস্থ্য নাশ হয় তবে কিছু হয় ক্ষয়, হইলে চরিত্র নাশ সর্বনাশ হয়।'
চরিত্র হল মানুষের সর্বোচ্চ বংশ-পরিচয়। আলী (রাঃ) পুত্র হাসানকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিলেন, 'বৎস্য আমার ৪টি কথা মনে রেখো: সবচেয়ে বড় ধনবত্তা হল বুদ্ধিমত্তা, সবচেয়ে বড় নিঃস্বতা হল, মূর্খতা, সবচেয়ে বড় বাতুলতা হল, অহংকার এবং সবচেয়ে উচ্চ বংশ হল সচ্চরিত্রতা।'
সুখ-বাজারের ব্যাপারী বন্ধু আমার! ধন-মাল দিয়ে সকল মানুষের মন সন্তুষ্ট করতে পারবে না, কুলাতেও পারবে না। কিন্তু তোমার সুন্দর চরিত্র দ্বারা তা পারবে।
মানুষের সাথে কৃত ওয়াদা, চুক্তি, অঙ্গীকার যথার্থভাবে পালন কর। মানুষের সাথে এমন ব্যবহারে তুমি সততা ও বিজ্ঞতা প্রয়োগ কর। 'কোনও কাজ নিষ্পত্তি করার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হয় দুটি স্তম্ভের উপর। সে দুটি হল : সততা ও বিজ্ঞতা। যদি তোমার আর্থিক ক্ষতিও হয়, তবু তোমার অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার নামই সততা। আর বিজ্ঞতা হচ্ছে, যেখানে ক্ষতি হবে সেই রকম বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ না হওয়া।'
রূঢ়তা ও কর্কষতা বর্জন কর। কারো সাথে সাক্ষাৎ করলে হাসি মুখে করো, কথা বললে মিষ্টি ভাষায় বলো, কেউ কথা বললে ধ্যান দিয়ে শুনো, অঙ্গীকার করলে যথারূপে পালন করো, মূর্খদের সাথে মজাক করো না, হক ও সত্য যে গ্রহণ করে না তার মজলিসে বসো না, বেআদবের সাথে ওঠাবসা করো না, যে কথা ও কাজে অপমানিত হতে হয়, সে কথা ও কাজে থেকো না।
সচ্চরিত্রের গুণাবলী: মন হবে সরল, হৃদয় হবে উদার, চেহারা হবে হাস্যময় এবং ভাষা হবে মধুর।
মানুষের রূপ ও পোশাক নয়, বরং তার ভদ্রতাই তার ব্যবহারকে সুন্দর করে। আর তার সুন্দর ব্যবহারই তাকে সর্বসুন্দর ক'রে তোলে।
উমার বলেন, 'কারো সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ো না, যতক্ষণ না তাকে রাগের সময় পরীক্ষা ক'রে নিয়েছ।' অর্থাৎ, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, অথবা রাগের সময় অশ্লীল বকে, অথবা ভাঙচুর করে, মশা মারতে কামান দাগে, অথবা অসমীচীন কথাবার্তা বলে, উপকারীর উপকার ভুলে গিয়ে তার প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে তাদেরকে অপমান করে, সে সৎ চরিত্রের অধিকারী নয়। চরিত্রবান হতে তুমি বিনয়ী হও। 'দুর্বলদের সাথে ব্যবহারেই মহৎ ব্যক্তির মহত্ত্ব বুঝা যায়।' 'অনেক বড় মানুষ আছেন, যাঁর সামনে গেলে নিজেকে ছোট মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত বড় মানুষ হলেন তিনিই, যাঁর সামনে গেলে কেউ নিজেকে ছোট ভাবে না।' আর 'সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হলেন তিনি, যাঁর মেজাজ বড় ঠান্ডা।' যাঁর ব্যবহার অতি ভদ্র ও বিনয়-নম্র।
ব্যবসার মাঝে সুখ-সন্ধানী বন্ধু আমার! এক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, 'তুমি বড় সুপ্রতিষ্ঠিত সফল ব্যবসায়ী। তোমার পুঁজি কী?' উত্তরে সে বলল, 'আমার পুঁজি হল আমানতদারী, সত্যবাদিতা এবং আমার প্রতি লোকেদের আস্থা।'
'যার মুখে মৃদু হাসি নেই বা যে মুচকি হাসিও হাসতে জানে না, সে যেন কোন ব্যবসা না খোলে।
যার মুখ মিষ্টি, তার বন্ধু অনেক। তার গ্রাহক অনেক।
'মুচকি হাসি বিদ্যুত অপেক্ষা খরচে কম, কিন্তু চমকে অনেক বেশী।' সর্বদা খেয়ালে রেখো, 'তুমি যেন প্রত্যেক মানুষের ক্যামেরার সামনে আছ, সুতরাং তোমার মুচকি হাসি প্রদর্শন কর, সকলের কাছে তোমার ছবি সুন্দর লাগবে।' মুখে মধুর হাসির বিনিময়ে অপরের গলায় প্রেমের ফাঁসি লাগাতে পারবে। তুমি সুখী হবে, তোমার প্রতি লোক সন্তুষ্ট হবে। কারণ 'হাসমুখ ব্যক্তির প্রতি দীর্ঘক্ষণ রাগান্বিত থাকা যায় না।'
তরবারি দ্বারা জয় অপেক্ষা হাসি দ্বারা জয়ের মান ও স্থায়িত্ব অনেক বেশী। যে রাজা এর বিপরীতভাবে জয়লাভ করেন, তিনি রাজ্য লাভ করেন ঠিকই, কিন্তু রাজসুখ লাভ করেন না।
পরিবেশের দুরবস্থা দেখে খবরদার বলো না যে, ‘চুরি করা মহাপুণ্য যদি পেটে সয়, এ জগতে বোকারাই সত্যবাদী হয়। সততা বা সাধুতার দাম নেই কোন, জোচ্চুরি ও ঠকবাজি মূলমন্ত্র জেনো।’
তুমি সৎ ও সত্যবাদী হও। তোমার রুযীতে বর্কত হবে। পথে-হাটে-ঘাটে বহু মানুষের কাছে তুমি পরিচিত হতে পারো, কিন্তু সুপরিচিত হতে অতিরিক্ত গুণের দরকার। আর তা হল তোমার সুন্দর আচরণ ও অমায়িক ব্যবহার।
আহনাফ বলেন, ‘মিথ্যাবাদীর কোন সম্ভ্রম নেই, বিরক্ত লোকের বন্ধু নেই এবং দুশ্চরিত্রের নেতৃত্ব নেই।’
ইমাম শাফেয়ী বলেন, ‘যদি মানুষের অপরাধ ক্ষমা ক’রে দিই, কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখি, তাহলে কারো শত্রুতার দুশ্চিন্তা থেকে নিজের মনকে মুক্ত রাখতে পারি।’
‘তোমার পরে তোমার চর্চা অবশিষ্ট থেকে যাবে, অতএব তুমি তোমার চর্চাকে ভালো ক’রে গড়ে তোল।’
মৃত্যুর পরে যার জন্য মানুষ মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকে, তা হচ্ছে তার সুন্দর ব্যবহার, তার কীর্তি। সুতরাং তুমি তোমার ব্যবহার ও কর্মকে অতি সুন্দর কর।
‘যা রাখি আমার তরে মিছে তারে রাখি, আমিও রব না যবে সেও হবে ফাঁকি। যা রাখি সবার তরে সেই শুধু রবে, মোর সাথে ডোবে না সে, রাখে তারে সবে।’

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00